পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ২১
তাপ দিলে বস্তুর তাপমাত্রা বাড়ে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাপ দেওয়ার পরও যদি বস্তুর তাপমাত্রা না বাড়ে, তাহলে ব্যাপারটা বেশ অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। ভাবছেন, এমনটাও আবার হয় নাকি?
আসলে হয়! তবে হরহামেশা নয়, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়। নির্দিষ্ট চাপে কঠিন বস্তুতে তাপ দিলে বস্তুর ভেতরের অণুগুলোর আন্তঃআণবিক বন্ধন শিথিল হয়ে ভেঙে পড়ে। বন্ধনমুক্ত হয়ে অণুগুলো তখন অনেকটা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। ফলে বস্তুর ভেতরের কণাগুলো গতিশীল হয় এবং কঠিন বস্তু গলে তরলে পরিণত হয়।
যত সহজে কথাটা বললাম, ব্যাপারটা ঠিক অতটাও সহজ নয়। কঠিন বস্তুর অণুগুলো শক্তিশালী আন্তঃআণবিক বন্ধনে যুক্ত থাকে। এই বন্ধন ভাঙতে শক্তির প্রয়োজন হয়। বারবার শক্তি সঞ্চয়ের ফলে বন্ধন আলগা হয়ে যায় এবং একসময় তা ভেঙে পড়ে।
আমাদের হয়তো অজানা নয় যে, ০°C তাপমাত্রায় বরফ গলে পানিতে পরিণত হয়। ধরা যাক, আপনি একটি ল্যাবরেটরিতে আছেন। সেখানকার তাপমাত্রা -২৫°C। সেখানে বসে আপনি একটি পরীক্ষা করতে চান। এক টুকরো বরফ নিয়ে একটি পাত্রে রেখে হিটারের ওপর বসিয়ে দিন। পাত্রের ভেতর একটি থার্মোমিটার রাখুন, যা বরফের তাপমাত্রার ওঠানামা দেখাবে।
কঠিন বস্তুর অণুগুলো শক্তিশালী আন্তঃআণবিক বন্ধনে যুক্ত থাকে। এই বন্ধন ভাঙতে শক্তির প্রয়োজন হয়। বারবার শক্তি সঞ্চয়ের ফলে বন্ধন আলগা হয়ে যায় এবং একসময় তা ভেঙে পড়ে।
এবার হিটারটি জ্বালিয়ে দিন। হিটার থেকে অল্প অল্প করে তাপ বরফে যেতে থাকবে। ফলে বরফের তাপমাত্রাও বাড়তে থাকবে। কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে ০°C-এ আসার আগপর্যন্ত বরফ গলবে না। ০°C-এ পৌঁছানোর পরপরই বরফের অণুগুলোর আন্তঃআণবিক বন্ধন ভাঙতে শুরু করবে। তবে এর মানে এই নয় যে, ০°C-এ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই পুরো বরফখণ্ড একবারে তরল পানিতে পরিণত হয়ে যাবে।
এখানে আরও একটি মজার ব্যাপার ঘটবে। ০°C-এ পৌঁছানোর পর আপনি তাপ দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু থার্মোমিটারে তাপমাত্রা আর বাড়ছে না! বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই চলতে থাকবে।
সেটা কতক্ষণ? যতক্ষণ না সম্পূর্ণ বরফ গলে পানিতে পরিণত হচ্ছে। এই সময়ের তাপশক্তি গ্রহণ করে একে একে সবগুলো আন্তঃআণবিক বন্ধন ভেঙে পড়বে। অণুগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হবে এবং এরা অনেকটাই মুক্তভাবে চলাচল করবে। এই পুরোটা সময় সরবরাহ করা তাপ কেবল আন্তঃআণবিক বন্ধন ভাঙার কাজেই ব্যস্ত থাকবে। এ কারণেই এই সময়ে তাপমাত্রা বাড়ে না। আবার, সবগুলো আন্তঃআণবিক বন্ধন একসঙ্গে ভাঙবেও না।
সব আন্তঃআণবিক বন্ধন একসময় ভেঙে যাবে এবং সম্পূর্ণ বরফ তরল পানিতে পরিণত হবে। এরপর আবার তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করবে। এই যে পুরো বরফখণ্ডকে গলানোর জন্য বাড়তি তাপটা লাগল, অথচ তাপমাত্রা বাড়ল না; একেই বলে গলনের সুপ্ততাপ।
১০০°C-এ পৌঁছানোর পর সবটুকু পানি বাষ্পে পরিণত হওয়ার আগপর্যন্ত যতটুকু তাপ প্রয়োগ করতে হয়, সেটাই হলো বাষ্পীভবনের সুপ্ততাপ।
একই ধরনের ঘটনা ঘটে বাষ্পীভবনের সময়ও। সম্পূর্ণ বরফ পানিতে পরিণত হওয়ার পরও হিটার নেভাবেন না, তাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখুন। এবার তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে। পানির অণুগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব আরও বাড়তে থাকবে এবং আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বল কমতে থাকবে। তাপমাত্রা ১০০°C-এ পৌঁছালে পানি ফুটতে বা বাষ্পীভূত হতে শুরু করে। একে বলে বাষ্পীভবন।
এখানেও একই রকম ঘটনা ঘটে। পানির তাপমাত্রা ১০০°C-এ পৌঁছানোর পর তাপ দিলেও আর তাপমাত্রা বাড়ে না। কারণ, সব পানি একসঙ্গে বাষ্প হতে সময় লাগে। তাই সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হওয়ার আগপর্যন্ত তাপমাত্রা ১০০°C-এ স্থির থাকবে।
তারপর কীসের তাপমাত্রা বাড়বে? বাষ্পীভূত হওয়ার পর পাত্রে তো আর কোনো পানিই থাকবে না। তাপ দেবেন কিসে? হ্যাঁ, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি যদি আবদ্ধ কোনো পাত্রে করা হয়, তাহলে বাষ্প উড়ে যেতে পারবে না। তখন আরও তাপ দিলে বাষ্পের তাপমাত্রাও বাড়বে।
১০০°C-এ পৌঁছানোর পর সবটুকু পানি বাষ্পে পরিণত হওয়ার আগপর্যন্ত যতটুকু তাপ প্রয়োগ করতে হয়, সেটাই হলো বাষ্পীভবনের সুপ্ততাপ। এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি। গলন ও বাষ্পীভবনের এই সুপ্ততাপ কিন্তু ভরের ওপর নির্ভরশীল। বরফের আকার যত বড় হবে, তত বেশি তাপের দরকার হবে। তাই পদার্থের সঠিক সুপ্ততাপ বের করতে হলে একটি নির্দিষ্ট ভরের বস্তু নিয়ে হিসাব করতে হয়। আবার, এই সুপ্ততাপ সর্বজনীন নয়। লোহার সুপ্ততাপের পরিমাণ বরফের চেয়ে বেশি। স্বর্ণের সুপ্ততাপ লোহার চেয়ে আরও বেশি।