প্যাসকেলের দরজায় টরিসেলি
বিজ্ঞানী টরিসেলি প্রচণ্ড অসুস্থ। ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না, খেতে পারছেন না। একদম মুমূর্ষু অবস্থা। টরিসেলি নিজের মনে বিড়বিড় করছেন—‘প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কিন্তু পরীক্ষাটা আমি যতবার করেছি, ততবারই শূন্যস্থান দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কেন? তাহলে আমাদের ভাবনা কি ভুল! আমরা যেভাবে ভাবছি, প্রকৃতি সেভাবে কাজ করছে না!’
ডাক্তার তাঁর বাঁচার আশা ছেড়ে দিলেন। কিন্তু অলৌকিকভাবে হলেও সত্যি, কিছুদিন পর টরিসেলি সুস্থ হয়ে উঠলেন। যে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় দুশ্চিন্তায় ছিলেন, সুস্থ হয়ে তিনি আবার সেই পরীক্ষাই করলেন। কিন্তু ফলাফল একই! টরিসেলি বুঝতে পারলেন, তিনি কোনো বিপ্লবী নিয়ম আবিষ্কার করেছেন।
তবে তখনো তিনি জানতেন না, কেন প্রকৃতি এমন আচরণ করে। তিনি শুধু এতটুকুই বুঝেছেন, প্রকৃতিকে আমরা যেভাবে দেখছি, সে সেভাবে কাজ করে না। সেভাবেই যদি কাজ করত, তাহলে টিউবের ওপরে কোনো ফাঁকা জায়গা থাকত না।
এই ঘটনার বহু বছর পর প্যাসকেল বুঝতে পেরেছিলেন, টিউবে কেন শূন্যস্থান তৈরি হলো। এই লেখাটা টরিসেলির সেই বৈপ্লবিক পরীক্ষা ও বায়ুমণ্ডলের চাপ নিয়ে। এই লেখার প্রতিটি ব্যাখ্যা নিউটনীয় মেকানিকস অনুসারে দেওয়া হয়েছে। আমাদের পৃথিবীপৃষ্ঠে খুব সুন্দরভাবে নিউটনীয় বলবিদ্যা কাজ করে। এই লেখায় মূলত নিউটনীয় বলবিদ্যার সাহায্যে ভাবনার জায়গাগুলোকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।
টরিসেলি শুধু এতটুকুই বুঝেছেন, প্রকৃতিকে আমরা যেভাবে দেখছি, সে সেভাবে কাজ করে না। সেভাবেই যদি কাজ করত, তাহলে টিউবের ওপরে কোনো ফাঁকা জায়গা থাকত না।
দুই
ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ ইভানজেলিস্তা টরিসেলির (১৬০৮-১৬৪৭ খ্রি.) পরীক্ষার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। কিন্তু এই পরীক্ষা কীভাবে কাজ করে, এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। প্রথমেই একটা জিনিস বলে রাখি, ওপরের গল্পে টরিসেলির যে অবস্থার কথা বলা হয়েছে, তার অনেকটাই আমার কল্পনা। কিন্তু গল্পের মূল ভাবটি সত্যি। এখন দেখি, কী ছিল এই টরিসেলির পরীক্ষা, আর কী ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার কারণ!
টরিসেলি এই পরীক্ষাটি করেন ১৬৪৩ সালে। এই পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক দিকের চেয়ে দার্শনিক দিকটাই সে সময় বেশি চাঞ্চল্যকর ছিল। কিন্তু কেন?
টরিসেলির পরীক্ষার সিস্টেম ছিল খুব চমৎকার। এখন একটু ভাবি, একটা গ্লাসে পানি নিয়ে যদি গ্লাসটা উল্টো করি, তাহলে কী হবে? অবশ্যই পানি মাটিতে পড়ে যাবে। এবার চিন্তা করুন, আমার হাতে একটা পারদভর্তি টেস্টটিউব আছে। আমি যদি এটি উল্টো করি, অবশ্যই পারদ নিচে পড়ে যাবে। আমি এখন এই কাজটা আরেকটু বুদ্ধি খাঁটিয়ে করব। এবার পারদভর্তি টেস্টটিউবটি অন্য একটি পারদভর্তি মগ বা পাত্রের ওপর উল্টো করে চেপে ধরি। এমনভাবে চেপে ধরেছি, যাতে টেস্টটিউব থেকে কোনো পারদ পড়ে না যায় অথবা কোনো বাতাস ভেতরে ঢুকতে না পারে। এটাই ছিল টরিসেলির এক্সপেরিমেন্টের সিস্টেম। টরিসেলি ১০০ সেন্টিমিটারের একটি পারদভর্তি টেস্টটিউব অন্য একটি পারদভর্তি পাত্রে লম্বভাবে চেপে ধরেছিলেন।
টরিসেলি এই পরীক্ষাটি করেন ১৬৪৩ সালে। এই পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক দিকের চেয়ে দার্শনিক দিকটাই সে সময় বেশি চাঞ্চল্যকর ছিল।
এখন পরীক্ষার ফল কী হবে? অবশ্যই টেস্টটিউবের পারদগুলো পাত্রের পারদের সঙ্গে মিশে গিয়ে টেস্টটিউব খালি হয়ে যাবে! কিন্তু বাস্তবে এমন হয় না। বাস্তবে টেস্টটিউবের ২৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ফাঁকা থাকে। বাকি ৭৬ সেন্টিমিটার পারদ টেস্টটিউবেই থেকে যায়! আমাদের সাধারণ জ্ঞান তো বলে, সবটুকু পারদ মিশে গিয়ে টেস্টটিউব খালি হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানে সামান্য কিছু পারদই মিশতে পারে। এই প্রশ্নটাই ভাবিয়েছিল টরিসেলিকে।
তৎকালীন দার্শনিকেরা মনে করতেন, প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, প্রকৃতিতে শূন্যস্থান থাকতে পারে, যা হলো টেস্টটিউবের ওপরের ২৪ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা। আর এ জন্যই এই এক্সপেরিমেন্টটা এত বেশি বিখ্যাত।
ওই ২৪ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গাকে বলা হয় টরিসেলির শূন্যস্থান। টরিসেলির এই পরীক্ষা এতই চমৎকার যে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যারোমিটারে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। এই লেখাটার মূল উদ্দেশ্য হলো, টরিসেলির এক্সপেরিমেন্টের সাহায্যে বাতাসের চাপ বের করা।
কিন্তু প্রশ্ন এখানেই শেষ নয়! চাপ কী? বাতাস চাপ দিলে তো আমাদের শরীর অক্ষত থাকার কথা নয়, তাহলে বাতাসের চাপ কোথায়? এ ছাড়া, কেন ৭৬ সেন্টিমিটার পারদ অন্য পাত্রের পারদের সঙ্গে মিশল না? এই উত্তর জানতেন না টরিসেলি নিজেও। এর উত্তর পরে দেন প্যাসকেল! এখন আমরা শুনব প্যাসকেলের সেই অপরূপ ব্যাখ্যা।
তার আগে আরেকটা প্রশ্ন, টরিসেলি কেন এই এক্সপেরিমেন্টে পারদ ব্যবহার করলেন, অন্য কোনো তরল কেন নয়? বিষয়টা আপনারা একটু ভাবতে থাকুন, এই ফাঁকে আমি শোনাতে থাকি প্যাসকেলের বিবৃতি।
তৎকালীন দার্শনিকেরা মনে করতেন, প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, প্রকৃতিতে শূন্যস্থান থাকতে পারে, যা হলো টেস্টটিউবের ওপরের ২৪ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা।
তিন
ফরাসি গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী ব্লেইজ প্যাসকেলের (১৬২৩-১৬৬২ খ্রি.) ব্যাখ্যাটা ছিল প্রবাহীর মধ্যে চাপের প্রভাব নিয়ে। এখন এখানে দুটি প্রশ্ন—চাপ কী এবং প্রবাহী কী? চাপ মানে কোনো ক্ষেত্রের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে কতটুকু বল প্রয়োগ করা হচ্ছে। সংজ্ঞাটা খুব কঠিন মনে হচ্ছে? একটু সহজভাবে দেখি।
চাপ মানে হলো প্রতি একক ক্ষেত্রফলে বল প্রয়োগের পরিমাণ। একটা ৪ বর্গমিটার টেবিলের ওপর আমি ১২ নিউটন বলে ঘুষি দিলাম। এখন ওই টেবিলের প্রতি ১ বর্গমিটারে কতটুকু বল প্রয়োগ হবে? ৪ বর্গমিটারে বল প্রয়োগ হয় ১২ নিউটন, ১ বর্গমিটারে বল প্রয়োগ হয় ৩ নিউটন।
আমরা একটু আগেই দেখেছি, প্রতি একক ক্ষেত্রফলে যতটুকু বল প্রয়োগ করা হয়, তা-ই চাপ। তাই টেবিলে চাপ হবে ৩ প্যাসকেল। আসলে একটি সমীকরণ কেমন হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে সংজ্ঞার ওপর। এখন এই জিনিসটারই বীজগাণিতিক রূপ দেখি। যদি টেবিলের ক্ষেত্রফল হয় A বর্গমিটার এবং বল প্রয়োগ করা হয় F পরিমাণ, তাহলে চাপ হবে P = F ÷ A।
এখন জানব, প্রবাহী কী। প্রবাহী সম্পর্কে আমাদের সবারই একটা ধারণা আছে—যা প্রবাহিত হয়, তা-ই প্রবাহী। আর এই যুক্তিতে তরল ও বায়বীয় পদার্থ হলো প্রবাহী। উদাহরণটা ঠিক আছে, কিন্তু যুক্তিটা ঠিক নেই। যা প্রবাহিত হয়, তা-ই প্রবাহী; এটা তো কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো না, এটা হলো এককথায় প্রকাশ। প্রবাহী কী, তা আমরা দেখি।
চাপ দেওয়ার আগে পানির অণুগুলো একটি সাম্যাবস্থায় ছিল। যখন ওপর থেকে চাপ দেওয়া শুরু হবে, তখন ওপরের পানিগুলো অতিরিক্ত একটি বল অনুভব করবে।
আমরা জানি, তরল একটি প্রবাহী। এখন চিন্তা করুন, আপনার কাছে এক গ্লাস পানি আছে। পানিতে তো অনেকগুলো স্তর থাকে। যেসব পদার্থের একটি স্তরের সাপেক্ষে আরেকটির আপেক্ষিক বেগ থাকে, তাদের প্রবাহী বলে। এ জন্যই পানি একটি প্রবাহী। একটি স্তরের সাপেক্ষে আরেকটির আপেক্ষিক বেগ মানে একটার সাপেক্ষে আরেকটা গতিশীল। যেমন রাস্তায় চলা একটি রিকশা ও সিএনজির কথা ভাবুন। রাস্তায় যখন রিকশা ও সিএনজি চলে, তখন রিকশার তুলনায় সিএনজি দ্রুত এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, রিকশার সাপেক্ষে সিএনজি গতিশীল। আশা করি, ব্যাপারটা বোঝা গেছে।
এখন আসি প্যাসকেলের ব্যাখ্যায়। প্রবাহী, অর্থাৎ তরল ও বায়বীয় পদার্থে চাপ দেওয়া নিয়ে প্যাসকেল বলেন—‘একটি আবদ্ধ পাত্রে তরল বা গ্যাসীয় পদার্থে বাইরে থেকে চাপ দেওয়া হলে, সেটি সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং পাত্রের গায়ে চাপটা লম্বভাবে কাজ করবে।’
খুবই সাদামাটা একটি বাক্য, কিন্তু এর মাঝে লুকিয়ে আছে হাইড্রোলিক প্রেসের মতো সুন্দর ভাবনাগুলো। এই বাক্যটা বোঝার জন্য একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। একটি কাচের গ্লাসে পানি নিয়ে পানির ওপরের পৃষ্ঠে পিস্টন দিয়ে চাপ দিলে কী হবে? দেখুন, চাপ দেওয়ার আগে পানির অণুগুলো একটি সাম্যাবস্থায় ছিল। যখন ওপর থেকে চাপ দেওয়া শুরু হবে, তখন ওপরের পানিগুলো অতিরিক্ত একটি বল অনুভব করবে। কারণ, চাপ = বল ÷ ক্ষেত্রফল, বা প্রতি ১ বর্গমিটার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হওয়া বল। এই অতিরিক্ত বলের কারণে অণুগুলোর সাম্যাবস্থা নষ্ট হবে। তখন তারা আবার সাম্যাবস্থায় যেতে চাইবে। তাই ওই অণুগুলো তাদের চারপাশের অণুগুলোতে বল প্রয়োগ করবে।
প্যাসকেল বলেন— ‘একটি আবদ্ধ পাত্রে তরল বা গ্যাসীয় পদার্থে বাইরে থেকে চাপ দেওয়া হলে, সেটি সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং পাত্রের গায়ে চাপটা লম্বভাবে কাজ করবে।’
এভাবে সমানভাবে চাপ সঞ্চালিত হয় বা ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে চাপ দিতে থাকলে এই চাপ ছড়াতে থাকবে এবং একসময় গ্লাসের গায়ে লেগে থাকা কণাগুলোকে চাপ প্রয়োগ করবে। তখন গ্লাসের গায়ের অণুগুলো লম্বভাবে গ্লাসে চাপ দেবে। আর একসময় গ্লাস সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে পড়বে। এই অভিজ্ঞতার কথাটাই প্যাসকেল বলেছেন বৈজ্ঞানিকভাবে!
এখন আবার আসি টরিসেলির পরীক্ষায়। এ পরীক্ষায় আমরা দেখেছি, সেখানে মাত্র ২৪ সেন্টিমিটার পারদ অন্য পারদের সঙ্গে মিশতে পারে, কিন্তু ৭৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পারদ মিশতে পারে না। কিন্তু কেন? তার উত্তর লুকিয়ে আছে প্যাসকেলের ব্যাখ্যায়। আপনারা জানেন, পারদ একটি তরল পদার্থ। তাই পারদে চাপ দিলে সেই চাপ সমানভাবে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং পাত্রের দেয়ালে লম্বালম্বিভাবে আঘাত করে।
কিন্তু পারদকে চাপ দেবে কে? টরিসেলির পরীক্ষায় তো তিনি পারদকে কোনো পিস্টন দিয়ে চাপ দেননি, তাহলে চাপ আসবে কোথা থেকে? চাপ আসে বায়ুমণ্ডল থেকে। আমাদের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের কণা ছড়িয়ে আছে। তারা বিভিন্ন বেগে আমাদের আশপাশে ছোটাছুটি করছে। ফলে তারা পারদের পাত্রে বল প্রয়োগ করতে পারে। আমরা যেহেতু জানি, চাপ হলো বল প্রয়োগের পরিমাণ। তাই পারদ একটি চাপ অনুভব করবে। এটি আসলে বলের সূত্র (F = ma) থেকেও দেখা যায়। যেহেতু বাতাসের কণার ভর ও ত্বরণ আছে, তাই এটি বল প্রয়োগ করতে পারে। আর এই বলের কারণেই ৭৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পারদকে জাগিয়ে রাখতে পারে।
চাপ আসে বায়ুমণ্ডল থেকে। আমাদের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের কণা ছড়িয়ে আছে। তারা বিভিন্ন বেগে আমাদের আশপাশে ছোটাছুটি করছে। ফলে তারা পারদের পাত্রে বল প্রয়োগ করতে পারে।
কিন্তু সেটি কীভাবে হয়? এই চাপ আমরা অনুভব করি না কেন? প্রথম প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া যাবে টরিসেলির পরীক্ষার সিস্টেমে। টরিসেলির পরীক্ষায় বড় আকারের পাত্রে বাতাস ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। ফলে এই চাপ সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বড় পাত্রে বাতাসের চাপ ছড়াতে ছড়াতে একসময় টেস্টটিউবের প্রান্তে পৌঁছে যায়। ফলে সেই চাপটাই পারদকে জাগিয়ে রাখে। যার কারণে ২৪ সেন্টিমিটার পারদ বড় পাত্রে মিশতে পারে। এখন কথা হলো, বাতাস কেন ৭৬ সেন্টিমিটার পারদকে জাগিয়ে রাখে? এটি বুঝতে হলে তরল পদার্থের ধর্ম বুঝতে হবে।
আরেকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো দেওয়া হয়নি, বাতাসের চাপ কেন আমরা অনুভব করি না? কারণ আমাদের হৃৎপিণ্ড পাম্প করার মাধ্যমে রক্ত প্রতিনিয়ত আমাদের ত্বকে চাপ দিচ্ছে। একদিকে বাতাসের চাপ, অন্যদিকে রক্তের চাপ—দুটি ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই এই বায়ুচাপ আমরা অনুভব করি না।
এখন আসি, ঘনত্বের আলোচনায়।
টরিসেলির পরীক্ষায় বড় আকারের পাত্রে বাতাস ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। ফলে এই চাপ সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বড় পাত্রে বাতাসের চাপ ছড়াতে ছড়াতে একসময় টেস্টটিউবের প্রান্তে পৌঁছে যায়।
চার
আমরা সাধারণত কঠিন পদার্থের পরিমাণ জানার জন্য ভর মাপি। কিন্তু প্রবাহী, অর্থাৎ তরল বা বায়বীয় পদার্থে এটি মাপা একটু কঠিন। কারণ, তরল বা বায়বীয় পদার্থকে যে পাত্রে রাখা হয়, তারা সেই পাত্রেরই আকার ধারণ করে। যেমন গ্যাসের কথাই চিন্তা করা যাক। গ্যাসকে যে পাত্রে রাখা হয়, সে ওই পাত্রের সম্পূর্ণ আকার জুড়ে থাকে। এ জন্য গ্যাস বেশি নাকি কম, তা মাপার জন্য ঘনত্ব অনেক বেশি কার্যকর। ঘনত্বের কারণে দুটি প্রবাহীকে খুব সহজে আলাদা করা যায়। শুধু তা-ই নয়, প্রবাহী ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধর্ম দেখায়।
এখন একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করি। আমার কাছে দুটি সিলিন্ডার আছে। একটি ১ ঘনমিটারের, অন্যটি ৩.৩৭৫ ঘনমিটারের। এখন আমি দুটি সিলিন্ডারেই ১ কেজি করে নাইট্রোজেন ঢোকালাম। প্রশ্ন হলো, দুটি নাইট্রোজেনভর্তি সিলিন্ডারে আমি যদি ১০ গ্রামের একটি কাগজ এমনভাবে ফেলি, যাতে বাইরে থেকে নতুন কোনো গ্যাস ঢুকতে না পারে, তাহলে কোন সিলিন্ডারে কাগজ বেশি বাধা অনুভব করবে?
অবশ্যই ১ ঘনমিটারের সিলিন্ডারে। কারণ, সেখানে সিলিন্ডারের জায়গা কম। তাই নাইট্রোজেন গাদাগাদি করে অবস্থান করবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় সিলিন্ডারে জায়গা বেশি, তাই নাইট্রোজেনের অণুগুলো প্রথমটার তুলনায় কম গাদাগাদি করে অবস্থান করবে। এ কারণে প্রথম সিলিন্ডারে বাধা বেশি পাবে, অনেকটা ট্রাফিক জ্যামের মতো!
এই পার্থক্যের কারণ কী? এর কারণ ঘনত্ব। এখন আসি, ঘনত্ব কী। ঘনত্ব হলো একক আয়তনে (১ ঘনমিটার) কতটুকু ভর থাকবে তার পরিমাপ।
গ্যাসকে যে পাত্রে রাখা হয়, সে ওই পাত্রের সম্পূর্ণ আকার জুড়ে থাকে। এ জন্য গ্যাস বেশি নাকি কম, তা মাপার জন্য ঘনত্ব অনেক বেশি কার্যকর। ঘনত্বের কারণে দুটি প্রবাহীকে খুব সহজে আলাদা করা যায়।
ওপরের উদাহরণ দেখি। সেখানে প্রথম পাত্রের আয়তন ১ ঘনমিটার। যেহেতু ১ ঘনমিটারে যতটুকু পদার্থ থাকতে পারে, তাই প্রথম সিলিন্ডারে ঘনত্ব হবে ১ কেজি প্রতি ঘনমিটার। দ্বিতীয় পাত্রের আয়তন ৩.৩৭৫ ঘনমিটার। তাই প্রতি ১ ঘনমিটারে ভর বা পদার্থের পরিমাণ হবে (১ ÷ ৩.৩৭৫) = ০.২৯৬ কেজি প্রতি ঘনমিটার।
এটিকে বীজগাণিতিক আকারে লেখা যায়: V আয়তনে প্রবাহীর ভর = m
১ একক আয়তনে প্রবাহীর ভর = m ÷ V। আর এ জন্যই ঘনত্ব, ρ (রো) = m ÷ V
এটাই ঘনত্বের সূত্র। এখন সূত্রটি একটু বিশ্লেষণ করি। ρ = M ÷ V আমরা জেনেছি, ঘনত্ব মানে প্রতি একক আয়তনে পদার্থের ভর। আর ভর মানে কোনো বস্তুতে থাকা মোট পদার্থের পরিমাণ। ধরা যাক, 10 m³ আয়তনের একটি ঘরের প্রতি একক আয়তনে ১ কেজি বায়ু আছে। আমরা যদি ওই ঘরে থাকা বায়ুর ভর বের করতে চাই, তবে ওই ঘরে কী পরিমাণ বায়ুকণা আছে, তা বের করতে হবে। যদি প্রতি একক আয়তনে ১ কেজি কণা থাকে, তবে ওই ঘরে মোট বায়ুর ভর হবে ১০ কেজি।
আসলে আমরা m = ρv সূত্র থেকে কোনো স্থানে পদার্থের ভর বের করতে পারি। এটি খুবই কার্যকর একটি সূত্র। এখান থেকে ভর বোঝা যায়। যেমন একটি বোতলে পানি নিয়ে ওই সমান আরেকটি বোতলে তরল গুড় নিলে গুড়ের বোতলটি বেশি ভারী মনে হবে। কেন? কারণ গুড়ের ঘনত্ব বেশি। এতক্ষণ ঘনত্ব নিয়ে এই আলাপের কারণ এটি বোঝানো যে, ঘনত্ব আর আয়তনের গুণফল থেকে ভর পাওয়া যায়। এটি কঠিন, তরল বা বায়বীয় পদার্থ—সবার জন্যই সত্যি।
ρ = M ÷ V আমরা জেনেছি, ঘনত্ব মানে প্রতি একক আয়তনে পদার্থের ভর। আর ভর মানে কোনো বস্তুতে থাকা মোট পদার্থের পরিমাণ।
পাঁচ
আমরা ঘনত্বের আলাপ শুরু করেছিলাম টরিসেলির এক্সপেরিমেন্টে কেন ৭৬ সেন্টিমিটার পারদকে বায়ুমণ্ডল জাগিয়ে রাখে, তা জানার জন্য। এখন আমরা আস্তে আস্তে সেদিকে এগোব। তার আগে প্রশ্ন, একটি পাত্রে পানি বা তরল পদার্থ নিলে সে ওই পাত্রে কী পরিমাণ চাপ দেবে?
আমরা দেখেছি, চাপ P = F ÷ A কোনো পাত্রে ২ কেজি পানি নিলে এবং তার ক্ষেত্রফল 0.4 m² হলে আমরা চাপ বের করতে পারি। পানি যে বল প্রয়োগ করবে, তা হলো F = mg, যা পানির ওজন। এখানে m হলো পানির ভর (2 kg) আর g মহাকর্ষীয় ত্বরণ (9.8)। তাই F = 19.6 N। এবার চাপ হলো: P = F ÷ A = 19.6 ÷ 0.4 = 49 Pa।
আচ্ছা এবার দেখুন, পাত্রের তলায় তো পানি F = mg বল দিচ্ছে। আবার আমরা দেখেছি m = ρV, তাই লিখতে পারি: F = mg = ρVg। এখানে V হলো আয়তন। আমরা জানি, আয়তন = ক্ষেত্রফল × উচ্চতা। V = Ah, F = Ahρg এবার এটি চাপের সূত্রে বসাই: P = F ÷ A, P = (Ahρg) ÷ A, P = hρg।
আমরা দেখেছি, চাপ P = F ÷ A কোনো পাত্রে ২ কেজি পানি নিলে এবং তার ক্ষেত্রফল 0.4 m² হলে আমরা চাপ বের করতে পারি। পানি যে বল প্রয়োগ করবে, তা হলো F = mg, যা পানির ওজন।
এবার দেখি P = hρg সূত্রটি কতটুকু কার্যকর। ধরুন, একটি সুষম পাত্রের ওপরে ও তলার ক্ষেত্রফল একই। কিন্তু একটি কোণকের ফ্রাস্টামে ওপরের আর তলার ক্ষেত্রফল একই নয়। এ জন্য সুষম পাত্রে পানি বল প্রয়োগ করবে Ahρg পরিমাণ। কারণ, এতে h সংখ্যক A আছে। A মানে প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল। সুষম পাত্রকে ভূমির সমান্তরালে কাটলে সব সময় একই ক্ষেত্রফল পাওয়া যাবে, যা হলো A। সুতরাং চাপ, P = (Ahρg) ÷ A = hρg। কিন্তু যেহেতু ফ্রাস্টামের পাত্র সুষম নয়, তাই এর আয়তন V-কে Ah বলা যাবে না। কারণ এতে h সংখ্যক A নেই বা প্রতিবার ভূমির সমান্তরালে কাটলে একই ক্ষেত্রফল পাওয়া যাবে না। ফলে এর চাপ হবে, P = (Vρg) ÷ A অর্থাৎ এখানে আমরা V-কে ভেঙে Ah লিখতে পারিনি।
এবার টরিসেলির এক্সপেরিমেন্টে আবার ফিরি। টরিসেলির পরীক্ষায় একটি পারদভর্তি পাত্রে আরেকটি পারদভর্তি টেস্টটিউব লম্বভাবে বসানো হয়। আর বাতাসের চাপের কারণে সেটি ৭৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঠে থাকে। এই চাপকে 1 atm বা বাতাসের স্বাভাবিক চাপ বলা হয়। এখন আমরা দেখব 1 atm সমান কত প্যাসকেল।
টরিসেলি যে পাত্র ব্যবহার করেছিলেন, সেটি ছিল সুষম। তাই এর চাপ P = hρg (এখানে ঘনত্ব হবে পারদের ঘনত্ব)। মান বসিয়ে, P = 0.76 × 13600 × 9.8 = 101292.8 প্যাসকেল। 1 atm = 1.012 × 10⁵ pascal (প্যাসকেল)
এখন তো আমরা পেয়ে গেলাম, বাতাস কত প্যাসকেল চাপ দেয়। এখান থেকে বুঝতে পারব এই চাপ কতটুকু পারদকে জাগিয়ে রাখতে পারবে। বাতাস তো পাত্রে সব সময় চাপ দিচ্ছে। যখন টেস্টটিউব পাত্রে ডোবানো হয়, তখন পারদ একটি ছিদ্র পেয়ে যায়। ফলে পারদ ওই ছিদ্রে প্রবেশ করে। প্রবেশের পর কতটুকু উচ্চতা পর্যন্ত পারদ ওপরে উঠবে, তা সূত্র থেকে দেখা যায়: P = hρg => h = P ÷ ρg।
একটি কোণকের ফ্রাস্টামে ওপরের আর তলার ক্ষেত্রফল একই নয়। এ জন্য সুষম পাত্রে পানি বল প্রয়োগ করবে Ahρg পরিমাণ। কারণ, এতে h সংখ্যক A আছে। A মানে প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল।
যেহেতু আমরা একটু আগেই বাতাসের চাপ কত প্যাসকেল, সেটা মেপেছি; এখন সেই মান বসালে আমরা পাব ০.৭৬ মিটার বা ৭৬ সেমি। টরিসেলির এই পরীক্ষা এত দারুণ যে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যারোমিটারে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। আমরা চাইলে পারদস্তম্ভের ওঠানামা দেখে বাতাসের চাপ মেপে ফেলতে পারব খুব সহজেই।
এখন শেষ একটি প্রশ্ন, টরিসেলি কেন পারদ ব্যবহার করলেন? এর উত্তর পাব আরেকটি প্রশ্ন থেকে। টরিসেলির পরীক্ষায় পারদের পরিবর্তে পানি ব্যবহার করলে কী হতো? পারদের জায়গায় পানি ব্যবহার করলে পরীক্ষাটিতে পরিবর্তন আনতে হবে। নলটি হতে হবে ১১ মি. বা ১১০০ সেমি লম্বা। বাকি সব একই থাকবে। যেহেতু চাপ 1 atm, তাই P = hρg => h = P ÷ ρg = 101292.8 ÷ (1000 × 9.8) = 10.336 m।
যেখানে পানি ওঠে ১০.৩৩৬ মিটার, সেখানে পারদ ওঠে ০.৭৬ মিটার। আমরা যদি নলটা ১১ মিটার না নিয়ে ১৩ মিটারও নিতাম, পানি ১০.৩৩৬ মিটার পর্যন্তই উঠত। পানি ১০.৩৩৬ মিটার আর পারদ ০.৭৬ মিটার ওঠে কেন? কারণ, একই বায়ুমণ্ডলীয় চাপে: h ∝ 1/ρ।
পদার্থের ঘনত্ব যত কম হবে, বস্তু তত ওপরে উঠবে। আবার পদার্থের ঘনত্ব যত বেশি হবে, বস্তু তত কম ওপরে উঠবে। কারণ, ঘনত্ব বাড়া মানে ভর বাড়া বা ভারী হওয়া। টরিসেলি পারদ নিয়েছিলেন, কারণ পারদ ভারী তরল। যদি পাতলা তরল (যেমন পানি) নিতেন, তাহলে ল্যাবে ১১ মিটার লম্বা টেস্টটিউব আনতে হতো! যা অনেক কষ্টকর ও ব্যয়বহুল।
টরিসেলি এই অদ্ভুত সুন্দর পরীক্ষাটি করে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এর ব্যাখ্যা পরে দিয়েছেন প্যাসকেল! এখন কী মনে হয়—‘আমরা প্রকৃতিকে যেভাবে দেখি, সে ওইভাবেই কাজ করে, নাকি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই ভুল?’