মিথ বনাম বিজ্ঞান
আইনস্টাইন কি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলেন
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি অনিশ্চয়তা তত্ত্ব। তাই একে নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানে অদ্ভুত সব নীতি রয়েছে। একে ঘিরে মিথেরও কোনো অভাব নেই। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এসব মিথ নিয়ে বিজ্ঞানচিন্তায় নিয়মিত আলোচনা করা হবে। আজ রইল তার চতুর্থ কিস্তি।
‘আগে যদি জানতাম, বিজ্ঞান এভাবে কাজ করে, তাহলে বিজ্ঞানী না হয়ে ফুটপাতের মুচি হতাম!’ এভাবেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে কটাক্ষ করেছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। ১৯৩০-এর দশকে আইনস্টাইন বনাম নীলস বোরের বিখ্যাত কথার লড়াই এবং যুক্তি-তর্ক এখন বিজ্ঞানের ইতিহাসেই কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।
১৯২৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম মেকানিকসের অনিশ্চয়তা নীতি প্রকাশ করেন। গোলটা বাধে ঠিক এখানেই। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের সৌন্দর্য হলো, এটি খাঁটি পাটিগণিতের নিয়মে বাঁধা। ২ + ২ সবসময় চার হবেই। ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা কোনো একটি গাড়ির কথা ভাবুন। নিউটনের গতিসূত্র দিয়ে আপনি আগেভাগেই ঠিক ঠিক কষে ফেলতে পারবেন গাড়িটার চলাচলের নিখুঁত হিসাব। গাড়িটা কখন, ঠিক কোথায় থাকবে—তার ভবিষ্যদ্বাণীও করে ফেলতে পারবেন। শুধু গাড়ি নয়, চিরায়ত বলবিদ্যার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যই হলো এর ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা। কিন্তু এই ক্ষমতাই হোঁচট খায় কোয়ান্টাম মেকানিকসে।
অনিশ্চয়তা তত্ত্ব বলে, নিউটন-আইনস্টাইনের চিরায়ত গতিবিদ্যা খুদে কণাদের জগতে পুরোপুরি অচল। এখানে আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করার কোনো সুযোগ নেই। সুযোগ নেই নিখুঁতভাবে কোনো কণার অবস্থান ও ভরবেগ একই সঙ্গে পরিমাপ করারও। আপনি কণার ভরবেগ নিখুঁতভাবে মাপতে চাইলে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এর অবস্থান। আর যদি অবস্থান ঠিক ঠিক জানতে চান, তাহলে অনিশ্চিত হয়ে যাবে কণার ভরবেগ।
অনিশ্চয়তা তত্ত্ব বলে, নিউটন-আইনস্টাইনের চিরায়ত গতিবিদ্যা খুদে কণাদের জগতে পুরোপুরি অচল। এখানে আগে থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করার কোনো সুযোগ নেই।
অনিশ্চয়তার এই নীতিই ছড়িয়ে পড়ে কোয়ান্টাম মেকানিকসের সব শাখায়। কণারা একই সঙ্গে তরঙ্গ এবং কণার সুপারপজিশনে থাকে। সুপারপজিশন আবার জন্ম দেয় অদ্ভুত সব তত্ত্বের। অনিশ্চয়তা নীতি বলে, আপনি একটি কণাকে ঠিক কীভাবে দেখতে চান, কণাটি সেই রূপেই আপনার কাছে ধরা দেবে। কণাকে আপনি যদি কণার মতো দেখতে চান, তাহলে সেভাবে যন্ত্রপাতি সেট করতে হবে। অর্থাৎ কণা হিসেবে দেখার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি লাগবে, সেগুলো আপনি রাখবেন কণার চলার পথে। তখন কণাকে আপনি কণা হিসেবেই দেখতে পাবেন। অন্যদিকে যদি তরঙ্গ হিসেবে দেখতে চান, তাহলে আপনাকে তরঙ্গ শনাক্তকারী যন্ত্র বসাতে হবে; তখন কণাটি আপনার কাছে ধরা দেবে তরঙ্গ হিসেবে! আইনস্টাইনের প্রশ্ন ছিল, কণারা কি তাহলে মানুষের মন পড়তে পারে?
১৯২৭ সালে বেলজিয়ামে বসে ঐতিহাসিক সলভে সম্মেলন। সেখানে আইনস্টাইন তোপ দাগেন নীলস বোর এবং তাঁর সাগরেদদের ওপর। বলেন, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এসব ভুতুড়ে ব্যাপারস্যাপার তাঁর মোটেও পছন্দ নয়। তিনি একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন বোরদের। তাঁর প্রতিটি প্রশ্নের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেন বোর আর তাঁর দল। কিন্তু আইনস্টাইনের সেসব পছন্দ হয় না। তিনিও দমবার পাত্র নন। তিনি লেগে থাকেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানার বিরুদ্ধে। কখনো ফোটন বক্স এক্সপেরিমেন্ট, কখনো ইপিআর প্যারাডক্সের মতো থট এক্সপেরিমেন্ট করে কোয়ান্টামের অদ্ভুত সব বিষয় সামনে নিয়ে আসেন। সেগুলোকে যুক্তি-ব্যাখ্যাহীন বলে খারিজ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বোর ব্রিগেড আইনস্টাইনের প্রতিটি যুক্তি খণ্ডন করে কোয়ান্টাম মেকানিকসকে প্রতিষ্ঠা করেন।
আইনস্টাইনের প্রতিটি প্রশ্নের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেন বোর আর তাঁর দল। কিন্তু তাঁর সেসব পছন্দ হয় না। তিনিও দমবার পাত্র নন। তিনি লেগে থাকেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানার বিরুদ্ধে।
২.
কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অদ্ভুত নীতিগুলোর বিরুদ্ধে আইনস্টাইন ছিলেন সবসময় সোচ্চার। ঠিক এ কারণেই অনেকে মনে করেন, তিনি বোধ হয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলেন। তাঁর আরেকটি মন্তব্য এই ধারণার ভিত আরও মজবুত করতে ভূমিকা রেখেছে। হতাশ আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, ‘আমি যদি তাকিয়ে না থাকি, তাহলে কি আকাশে চাঁদটা থাকে না!’
কোয়ান্টাম বলবিদ্যা চলে অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনার তত্ত্ব মেনে। তাই এই জগতের কাজকারবার এত অদ্ভুত। কিন্তু আইনস্টাইনের মত ছিল ভিন্ন। তিনি মনে করতেন, কোনো কিছু নিশ্চিতভাবে জানতে না পারাটা আমাদেরই সীমাবদ্ধতা, প্রকৃতির নিয়মে কোনো খুঁত নেই। আইনস্টাইনের বন্ধু ম্যাক্স বর্ন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অসামান্য। তাঁকে আইনস্টাইন একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে আইনস্টাইন বলেন, ‘কোয়ান্টাম মেকানিকস সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু আমার ভেতরের অন্য সত্তা বলছে, এটি খাঁটি কোনো তত্ত্ব নয়। এই তত্ত্ব অনেক কিছু ব্যাখ্যা করে, কিন্তু এটি প্রকৃতির নিখুঁত কোনো তত্ত্ব নয়। আমি অন্তত নিশ্চিত, ঈশ্বর পাশা খেলেন না।’
‘ঈশ্বর পাশা খেলেন না’ উক্তিটি সে সময় রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায়। আর এই একটি উক্তির কারণেই আইনস্টাইন পরিণত হন কোয়ান্টাম মেকানিকসের শত্রু’তে। শোনা যায়, নীলস বোর আইনস্টাইনের এই উক্তির কড়া জবাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর কী করবেন আর কী করবেন না, তা আপনাকে বলে দিতে হবে না।’ তাই এত কিছুর পরও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, আসলেই কি আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিকসের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলেন? এই প্রশ্নের জবাবে শেষ পেরেক ঠোকার আগে আমরা কিছু ঐতিহাসিক পরম্পরা দেখে আসতে পারি। আচ্ছা বলুন তো, আইনস্টাইন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন কেন?
শোনা যায়, নীলস বোর আইনস্টাইনের এই উক্তির কড়া জবাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর কী করবেন আর কী করবেন না, তা আপনাকে বলে দিতে হবে না।’
এই জায়গায় বেশির ভাগ মানুষ ভুল করেন। তাঁরা মনে করেন, আইনস্টাইন নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন বুঝি থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জন্য। আইনস্টাইন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯২১ সালে। তত দিনে স্পেশাল ও জেনারেল—দুই রিলেটিভিটিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সুতরাং তিনি এই দুই তত্ত্বের যেকোনো একটার জন্য নোবেল পুরস্কার পেতেই পারতেন। কিন্তু তিনি নোবেল পান ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার কারণে।
১৯০৫ সাল। আইনস্টাইনের সোনালি বছর। সে বছরই বিশেষ আপেক্ষিকতার পাশাপাশি তিনি ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তবে ওটাকে শুধু ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা বলা চলে না। ১৯০০ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক প্রথম কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রকাশ করেন। কিন্তু সেই তত্ত্বের শক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল না। আইনস্টাইন ফটো-তড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যার জন্য প্ল্যাঙ্কের সেই কোয়ান্টাম তত্ত্বই ব্যবহার করেন। ১৯১৪-১৬ সালের দিকে রবার্ট অ্যান্ড্রুজ মিলিক্যান পরীক্ষাগারে আইনস্টাইনের ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার সেই ব্যাখ্যা প্রমাণ করেন। আর সেটাও করা হয়েছিল ওই কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করেই।
অর্থাৎ কোয়ান্টাম তত্ত্ব যে কেবল খাতাকলমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ব্যবহার করে যে বাস্তব কাজও করা যেতে পারে, তার পথ আইনস্টাইনই করে দিয়েছিলেন। তাই আইনস্টাইনকে বলা হয় কোয়ান্টাম তত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তবে প্ল্যাঙ্ক-আইনস্টাইনের সেই কোয়ান্টাম তত্ত্বকে বলা হয় প্রাচীন কোয়ান্টাম তত্ত্ব। এর ঠিক ২০ বছর পর হাইজেনবার্গ-শ্রোডিঙ্গাররা প্রাচীন তত্ত্বটাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বলবিদ্যায় পরিণত করেন। আর সেটাকেই বলে কোয়ান্টাম মেকানিকস। এই বলবিদ্যার ভিত্তি হলো পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্যতা তত্ত্ব। তাই এর ফলাফল এত অনিশ্চয়তায় মোড়া। ঠিক এই জায়গাতেই ছিল আইনস্টাইনের ঘোর আপত্তি।
১৯০৫ সাল। আইনস্টাইনের সোনালি বছর। সে বছরই বিশেষ আপেক্ষিকতার পাশাপাশি তিনি ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তবে ওটাকে শুধু ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা বলা চলে না।
৩.
আগেই বলেছি, আইনস্টাইন নিজেই কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। সেটা প্রাচীন কোয়ান্টাম তত্ত্ব। তবে আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তি প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু কোয়ান্টাম তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ব্যবহার করেছিলেন বিশুদ্ধ পরিসংখ্যান; যা এখন বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান নামে পরিচিত। কারণ এই পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠিত করতেও আইনস্টাইনের ব্যাপক ভূমিকা ছিল।
অনিশ্চয়তা নীতি বলে, একটি ইলেকট্রন শক্তিস্তরের নির্দিষ্ট কোনো বিন্দুতে থাকে না। থাকে শক্তিস্তরের পুরোটা জুড়ে, কণা-তরঙ্গের মতো করে। তাই নির্দিষ্ট বিন্দুতে এর অবস্থান নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আপনি বড়জোর বলতে পারবেন, ইলেকট্রনটি কোনো একটা বিন্দুতে পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা। কিন্তু যখনই ইলেকট্রন বা খুদে কণাদের কোনো একটি ধর্ম পরিমাপ করা হয়, ঠিক তখনই কণাদের সেই ধর্ম নির্দিষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ পরিমাপের আগে কণাদের কোনো ধর্মই নির্দিষ্ট নয়! অনিশ্চয়তায় ঘেরা এমন তত্ত্বে ঘোর আপত্তি ছিল আইনস্টাইনের। তিনি ঘোরতর বস্তুবাদী মানুষ ছিলেন। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়মকানুনগুলোকে সেকালে বস্তুবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা মুশকিল হয়ে ওঠে।
অনিশ্চয়তা নীতি বলে, একটি ইলেকট্রন শক্তিস্তরের নির্দিষ্ট কোনো বিন্দুতে থাকে না। থাকে শক্তিস্তরের পুরোটা জুড়ে, কণা-তরঙ্গের মতো করে। তাই নির্দিষ্ট বিন্দুতে এর অবস্থান নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন তাঁর সহকর্মী বরিস পডলস্কি ও নাথান রোজেনকে নিয়ে একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করেন। তিন বিজ্ঞানীর নামের আদ্যক্ষরে সেটার নাম দেওয়া হয় ইপিআর প্যারাডক্স। এই প্যারাডক্স থেকেই বেরিয়ে আসে কোয়ান্টাম মেকানিকসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব—কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট।‘এনট্যাঙ্গেল মানে একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত হওয়া। আইনস্টাইনরা বললেন, ধরা যাক, দুটি ফোটন বা আলোর কণাকে এনট্যাঙ্গেলড বা বিজড়িত করা হলো। এদের একটিকে ধরে রাখা হলো পৃথিবীতে, আরেকটিকে ছেড়ে দেওয়া হলো মহাকাশের উদ্দেশে। দেড় সেকেন্ড পরে ফোটনটি পৌঁছে গেল চাঁদে।
এখন আপনি চাঁদের ফোটনটির স্পিন জানতে চান। এ কাজটা মোটেও কঠিন নয়। ওই ফোটনের এনট্যাঙ্গেলড ফোটনটা রয়ে গেছে ল্যাবরেটরিতে। সেটার স্পিন মাপুন। এটির স্পিন বা ঘূর্ণন যদি +১ হয়, তবে কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতা নীতি অনুযায়ী চাঁদের ফোটনটির স্পিন হবে -১।
এখানে আইনস্টাইনের দুটি খটকা ছিল— ১. সরাসরি পর্যবেক্ষণ না করা সত্ত্বেও চাঁদের ফোটনটির স্পিন ধর্ম আপনি নিশ্চিতভাবে জেনে যাচ্ছেন। এটা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনিশ্চয়তার তত্ত্বকেই লঙ্ঘন করে। ২. চাঁদের ফোটনের স্পিন ধর্ম জানতে আপনার মোটেও সময় ব্যয় করতে হচ্ছে না। এটি স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের লঙ্ঘন। কারণ এই তত্ত্ব বলে, আলোর চেয়ে বেশি গতিতে কোনো বস্তু এমনকি তথ্যও পৌঁছাতে পারে না।
আইনস্টাইনের এসব প্রশ্নের যেমন যুক্তি আছে, তেমনি এগুলোর ব্যাখ্যাও পরে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানীরা দিয়েছিলেন। সেগুলো আমাদের এখনকার আলোচনার বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো, আইনস্টাইন নিজে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শত্রু ছিলেন কি না!
আইনস্টাইনরা বললেন, ধরা যাক, দুটি ফোটন বা আলোর কণাকে এনট্যাঙ্গেলড বা বিজড়িত করা হলো। এদের একটিকে ধরে রাখা হলো পৃথিবীতে, আরেকটিকে ছেড়ে দেওয়া হলো মহাকাশের উদ্দেশে।
৪.
আইনস্টাইন অদ্ভুত এই নিয়মগুলো মানতে না পারলেও কোয়ান্টাম নিয়ে গবেষণা কিন্তু থামিয়ে দেননি। বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান তো বটেই, বোস-আইনস্টাইন কন্ডেনসেট তত্ত্ব প্রতিষ্ঠাতেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। আইনস্টাইন একটি থিওরি অব এভরিথিং বা সর্বজনীন তত্ত্ব পেতে মরিয়া ছিলেন। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। মৃত্যুর পর তাঁর নিজের গবেষণার ডেস্কের খাতাপত্র ঘেঁটেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
থিওরি অব এভরিথিং হলো কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও জেনারেল রিলেটিভিটির সমন্বিত একটি তত্ত্ব। যে তত্ত্ব একই সঙ্গে মহাকর্ষ, গ্রহদের গতিপ্রকৃতি, সাধারণ বলবিদ্যা এবং খুদে কণাদের জগৎ নিয়ে গবেষণা করতে সক্ষম। কিন্তু এই তত্ত্বের দেখা আজও মেলেনি। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে, সমালোচনা করলেও আইনস্টাইন এই কোয়ান্টাম মেকানিকসের শত্রু ছিলেন না। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটির বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড কাইজার বলেন, ‘আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিকসের শত্রু ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন এই তত্ত্বের সবচেয়ে কড়া এবং সবচেয়ে দরকারী সমালোচক। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করতে চাননি, চেয়েছিলেন এই তত্ত্বকে পূর্ণ করতে।’
থিওরি অব এভরিথিং হলো সেই তত্ত্ব, যা একই সঙ্গে মহাকর্ষ, গ্রহদের গতিপ্রকৃতি, সাধারণ বলবিদ্যা এবং খুদে কণাদের জগৎ নিয়ে গবেষণা করতে সক্ষম। কিন্তু এই তত্ত্বের দেখা আজও মেলেনি।
আইনস্টাইন সে সময় সমালোচনা করেছেন, নতুন ত্রুটি বের করেছেন, বোর ও তাঁর দলবল সেগুলোর জবাব দিতে নতুন নতুন ব্যাখ্যার খোঁজ করেছেন। সেসব ব্যাখ্যাই কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে কালক্রমে আরও নিখুঁত করে তুলেছিল। এ বিষয়ে মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এবং লেখক শন ক্যারল বলেন, ‘এখন আমরা বুঝি, আইনস্টাইনের প্রশ্নগুলো কতটা গভীর ছিল। তিনি কোয়ান্টাম মেকানিকসের দুর্বলতাগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন। সেগুলোই আজ কোয়ান্টাম ইনফরমেশন এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। আইনস্টাইন না থাকলে আমরা কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্টের মতো অদ্ভুত বিষয়কে এত গুরুত্ব দিয়ে ভাবতামই না।’
মোদ্দা কথা হলো, আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিকসের যত বড় সমালোচকই হোন না কেন, তাঁকে কোনোভাবেই শত্রু বলা চলে না।