সময়ের প্রহেলিকা
ধরুন, টাইম মেশিন আবিষ্কৃত হয়েই গেছে। চাইলে অতীত ভ্রমণ করতে পারবেন আপনি। চট করে চলে গেলেন অতীতে। কোনো ঘটনা বদলে দিলেন কিংবা বাঁচানোর চেষ্টা করলেন অকালপ্রয়াত প্রিয়জনকে। আসলেই তা পারবেন কি? সময় কি আপনাকে ক্ষমা করবে?
২৮ জুন ২০০৯। আমাদের কালের নায়ক, বিখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতিঃপদার্থবিদ স্টিফেন হকিং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ এক পার্টির আয়োজন করলেন। ব্যানার-ফেস্টুন, বেলুন থেকে শুরু করে শ্যাম্পেইনের মতো পানীয়—কী ছিল না সেই পার্টিতে! আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বহু অতিথিকেও। মজার (!) ব্যাপার হলো, সেদিন একজন মানুষও হাজির হয়নি সেই পার্টিতে। তবে এর জন্য অতিথিদের একদমই দোষ দেওয়া চলে না। স্টিফেন হকিংয়ের জন্য দুঃখিত বোধ করারও সুযোগ নেই। কারণ, হকিং জেনে-বুঝেই আমন্ত্রণপত্র বিলি করেছিলেন পার্টি শেষ হওয়ার পরে! কী, বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন? আসলে সেই বিশেষ আয়োজনটি ছিল মূলত ভবিষ্যৎ থেকে আসা সম্ভাব্য টাইমট্রাভেলার বা সময় পরিভ্রামকদের জন্য। হকিংয়ের ভাষায়, ‘আ ওয়েলকাম রিসেপশন ফর দ্য ফিউচার টাইম ট্রাভেলারস।’
হকিং আশা করেছিলেন, হাজার বছর পরও হয়তো টিকে থাকবে তাঁর তৈরি আমন্ত্রণপত্রের কয়েকটি কপি। সেগুলো হাতে পেয়ে অকল্পনীয় প্রযুক্তিতে সময়কে বশ মানানো ভবিষ্যতের মানুষেরা এক নিমেষে অতীত ভ্রমণ করে চলে আসবেন এই আনন্দ আয়োজনে। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। অধীর আগ্রহে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও সেদিন দেখা মেলেনি কারোই। হকিং এ ঘটনাকে আখ্যা দিয়েছিলেন সময় পরিভ্রমণের অসম্ভবতার পক্ষে পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ হিসেবে। অর্থাৎ বর্তমান তো বটেই, ভবিষ্যতের উন্নত সভ্যতার মানুষের পক্ষেও হয়তো কোনো দিনই সময়কে বশে আনা সম্ভব হবে না। আসলেই কি বিষয়টা তা–ই?
শুরু থেকেই বিজ্ঞানীরা সময় পরিভ্রমণকে নিছক কাল্পনিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। বিজ্ঞানের চোখে সময় যেন ছিল বহতা নদী। একে কোনোভাবেই প্রভাবিত করা সম্ভব নয়।
২.
জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তে নিশ্চিতভাবেই আমাদের সবারই একবারের জন্য হলেও সময় পরিভ্রমণের সাধ জেগেছে। শৈশবের দুরন্ত দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া, পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য পুনরায় পাওয়া, জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়া ভুল শুধরে নেওয়া, ইতিহাস ঘটতে দেখা চোখের সামনে বা ভবিষ্যৎ আগাম জেনে যাওয়া—এ রকম নানা কারণ জড়িয়ে থাকতে পারে এ চাওয়ার সঙ্গে। সময় ভ্রমণ করে অতীত বা ভবিষ্যতে চলে যাওয়ার মতো আপাতদৃষ্টে অসম্ভব ধারণার সঙ্গে আমাদের বেশির ভাগেরই প্রথম পরিচয় মূলত কল্পবিজ্ঞানের মাধ্যমে।
১৮৯৫ সালে বিখ্যাত লেখক এইচ জি ওয়েলস তাঁর কালজয়ী বিজ্ঞান কল্পকাহিনি দ্য টাইম মেশিন-এ আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অন্য রকম এক দুনিয়ার সঙ্গে। যেখানে রয়েছে অদ্ভুত এক যন্ত্র। এতে চেপে ইচ্ছেমতো চলে যাওয়া সম্ভব অতীত বা ভবিষ্যতের যেকোনো মুহূর্তে। আর রুপালি পর্দায় সময় পরিভ্রমণের ধারণা ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আশির দশকে। এর পেছনে ছিল ব্যাক টু দ্য ফিউচার চলচ্চিত্রটি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিশ্বের নানা দেশে নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। এভাবে রুপালি পর্দার ছোঁয়ায় ক্রমেই জনপ্রিয় হতে শুরু করে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি। ফিকে হতে শুরু করে টাইম ট্রাভেল নিয়ে বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের সীমারেখা।
শুরু থেকেই বিজ্ঞানীরা সময় পরিভ্রমণকে নিছক কাল্পনিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। বিজ্ঞানের চোখে সময় যেন ছিল বহতা নদী। একে কোনোভাবেই প্রভাবিত করা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে এক সেকেন্ড সময় যতটুকু, মহাবিশ্বের অন্য যেকোনো প্রান্তেও এক সেকেন্ড ঠিক ততটুকুই। সময়ের এ সরলীকরণ অবশ্য খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
১৮৯৫ সালে বিখ্যাত লেখক এইচ জি ওয়েলস তাঁর কালজয়ী বিজ্ঞান কল্পকাহিনি দ্য টাইম মেশিন-এ আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অন্য রকম এক দুনিয়ার সঙ্গে। যেখানে রয়েছে অদ্ভুত এক যন্ত্র।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মানবসভ্যতার ইতিহাসসেরা পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা–ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায় সবকিছু। নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়, সময় সবার জন্য এক নয়। আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল বস্তুদের বেলায় সময় তুলনামূলক ধীরগতিতে প্রবাহিত হয়। এরই পথ ধরে প্রথমবারের মতো সত্যি সত্যি সম্ভাবনা জাগে ভবিষ্যৎ ভ্রমণের! তবে এখানে রয়েছে আপাতদৃষ্টে প্রায় অসম্ভব এক শর্ত। যেমনটা বললাম—ভবিষ্যতে যেতে হলে আমাদের ছুটতে হবে ভয়ংকর গতিতে, প্রায় আলোর কাছাকাছি বেগে।
একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, এক নভোচারী আলোর ৮০ শতাংশ বেগ নিয়ে চলতে সক্ষম কোনো নভোযানে চেপে মহাশূন্য অভিযানে গেলেন। টানা ৩০ বছর ধরে চলল সেই অভিযান। এই দীর্ঘ সময়ের পুরোটা জুড়েই তাঁর মহাকাশযান ছুটে চলল সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বেগে। অভিযান শেষে তিনি পৃথিবীতে ফিরে এলেন। মহাবিশ্বের সবখানে যদি সময় একই গতিতে প্রবাহিত হতো, তাহলে অভিযানের ব্যাপ্তিকালে পৃথিবীতেও অতিবাহিত হতো ঠিক ৩০ বছর। কিন্তু আপেক্ষিকতার অদ্ভুতুড়ে নিয়মে সেই নভোচারী ঘরে ফিরে দেখবেন, ইতিমধ্যে পৃথিবীতে পেরিয়ে গেছে ৫০টি বসন্ত। অর্থাৎ নিজের অজান্তেই তিনি ২০ বছর ভবিষ্যতে পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন! না, এটা কোনো গালগল্প নয়। আলোর কাছাকাছি বেগে ভ্রমণের সক্ষমতা অর্জন করলে সত্যি সত্যি এমনটা ঘটতে দেখব আমরা।
আপেক্ষিকতার অদ্ভুতুড়ে নিয়মে নভোচারী ঘরে ফিরে দেখবেন, ইতিমধ্যে পৃথিবীতে পেরিয়ে গেছে ৫০টি বসন্ত। অর্থাৎ নিজের অজান্তেই তিনি ২০ বছর ভবিষ্যতে পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন!
ভবিষ্যতে যাওয়ার পথ খোলা থাকলেও অতীত ভ্রমণ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুখবর নেই বিজ্ঞানীদের কাছে। সাধারণ আপেক্ষিকতার সমীকরণগুলো থেকে প্রাপ্ত সমাধানের অনেকগুলোতে এ ধরনের ভ্রমণ নিষিদ্ধ নয় বটে, তবে মোটাদাগে এ প্রায় অসম্ভবেরই নামান্তর। এর অন্যতম কারণ, অতীতে ফিরে গেলে বড় বড় কিছু ঝামেলায় পড়তে হয় আমাদের। মুখোমুখি হতে হয় বিচিত্র সব সমস্যার। বিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাগুলোর নাম টাইম প্যারাডক্স। সময়ের প্রহেলিকা।
বিজ্ঞানীরা এগুলোকে মোটামুটি দুটি ভাগে ভাগ করেছেন—ক্লোজড কজাল লুপ ও কনসিস্ট্যান্সি প্যারাডক্স। প্রথমটিতে কার্যকারণ ও ফলাফল আবর্তিত হয় চক্রাকারে। এর ফলে ঠিক কোন ঘটনার মাধ্যমে চক্রের সূচনা হয়েছে, তা নির্ধারণ করা যায় না। অবশ্য নতুন কোনো টাইমলাইন বা সময়রেখার ধারণার প্রয়োজন পড়ে না এগুলোর জন্য। যেমন প্রিডেস্টিনেশন প্যারাডক্স ও বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স। অন্যদিকে বিখ্যাত গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স এবং এর অন্য সংস্করণগুলো—যেমন লেটস কিল হিটলার প্যারাডক্স হলো দ্বিতীয় ভাগের উদাহরণ। অতীতের ঘটনাপ্রবাহে পরিবর্তন ঘটালে এদের উদ্ভব হতে পারে। অসংগতি দূর করতে তখন প্রয়োজন পড়ে সময়রেখার নতুন শাখা সৃষ্টির ধারণার। প্রিয় পাঠক, চলুন এই প্যারাডক্সগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক।
অতীতে ফিরে গেলে বড় বড় কিছু ঝামেলায় পড়তে হয় আমাদের। মুখোমুখি হতে হয় বিচিত্র সব সমস্যার। বিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাগুলোর নাম টাইম প্যারাডক্স। সময়ের প্রহেলিকা।
৩.
শুরু করা যাক প্রিডেস্টিনেশন প্যারাডক্স দিয়ে। যখন কোনো টাইম ট্রাভেলার বা সময় পরিব্রাজক অতীতে ফিরে গিয়ে এমন কোনো ঘটনার অংশ হয়ে যান, যা ক্রমান্বয়ে তিনি যে ঘটনা থামাতে এখানে এসেছিলেন, সেটাই আবার ঘটতে বাধ্য করে—তখনই এর আবির্ভাব। কী, বড্ড গোলমেলে লাগছে? তাহলে একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক।
ধরুন, আপনার খুব কাছের কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারালেন। প্রিয়জন হারানোর ব্যথা সইতে না পেরে আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রকৃতির চিরায়ত নিয়মের বিরুদ্ধে যাবেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তৈরি করলেন অতীত ভ্রমণে সক্ষম ও কার্যকর এক টাইম মেশিন। তারপর ছুটে চললেন সময়ের উল্টো দিকে। উদ্দেশ্য একটাই—যে করেই হোক, মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনতে হবে প্রিয় মানুষটিকে। কিন্তু এ কী! অতীতে ফিরে গিয়ে আপনি আকস্মিকভাবে আবিষ্কার করলেন এক ভয়ংকর সত্য। নিষ্ঠুর প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে আপনার সময় পরিভ্রমণই কোনো না কোনোভাবে সেই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী! এখানেই শেষ নয়। অতীতে এসে আপনি যে চেষ্টাই করছেন না কেন, সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাকে থামাতে নয়, বরং ঘটতে সহায়তা করছে! হৃদয়বিদারক, তাই না? মোটামুটি এটাই প্রিডেস্টিনেশন প্যারাডক্সের মূল কথা। এতে অতীত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ থাকে না। সময় আটকে যায় এক বদ্ধ চক্রে।
অতীতে ফিরে গিয়ে আপনি আকস্মিকভাবে আবিষ্কার করলেন এক ভয়ংকর সত্য। নিষ্ঠুর প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে আপনার সময় পরিভ্রমণই কোনো না কোনোভাবে সেই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী!
আরেক ধরনের সময়ের বদ্ধ চক্রের দেখা মেলে বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্সে। কোনো বস্তু, মানুষ বা তথ্য অতীতে পাঠানোর ফলে যদি এর মূল উৎস বা সূচনাবিন্দুটাই হারিয়ে যেতে বসে, তখন দেখা যায় এ প্যারাডক্স। উদাহরণ দেওয়া যাক। দেশবরেণ্য প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের নাম নন্দিত নরকে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বইটি প্রকাশের পরে সাহিত্যাঙ্গনের সব আলো যেন টেনে নিয়েছিলেন তিনি। এরপর আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। এখন ধরুন, পরিণত বয়সের পুরোদস্তুর লেখক হুমায়ূন আহমেদ অতীতে ফিরে গিয়ে প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের একটা পাণ্ডুলিপি রেখে এলেন অখ্যাত নবীন হুমায়ূনের জন্য। তারপর নবীন হুমায়ূন সেটা অনুকরণ করে প্রথমবারের (!) মতো করে লিখে ফেললেন উপন্যাসটি। কালের পরিক্রমায় এই নবীন হুমায়ূন বৃদ্ধ হবেন, পুনরায় সময় পরিভ্রমণ করে অতীতে যাবেন এবং রেখে আসবেন সেই উপন্যাসের আরেকটা পাণ্ডুলিপি। অর্থাৎ পূর্ণ হবে চক্র। এ রকম ঘটনাপ্রবাহ আমাদের অদ্ভুত এক প্রশ্নের মুখোমুখি করে, নন্দিত নরকে উপন্যাসের প্রকৃত লেখক আসলে কে?
আসলে এ পর্যায়ে এসে প্রশ্নটির নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই। সময়ের প্রহেলিকায় যেন হারিয়ে গেছে উপন্যাসটির মূল উৎস। এটাই বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স।
দেশবরেণ্য প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের নাম নন্দিত নরকে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বইটি প্রকাশের পরে সাহিত্যাঙ্গনের সব আলো যেন টেনে নিয়েছিলেন তিনি।
এবারে দৃষ্টি ফেরানো যাক কনসিস্ট্যান্সি প্যারাডক্সগুলোর দিকে। এই শ্রেণির সবচেয়ে জনপ্রিয় হেঁয়ালিটির নাম গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স। এটি আসলে খুব সরল একটা প্রশ্ন—কেউ যদি অতীতে গিয়ে নিজের দাদাকে সন্তান (টাইমট্রাভেলারের বাবা) জন্ম দেওয়ার আগেই খুন করেন, তাহলে কী ঘটবে?
বাবা জন্ম না নিলে কোনোভাবেই অস্তিত্ব থাকার কথা নয় সন্তান তথা টাইমট্রাভেলারের। আর এমনটা হলে অতীতে গিয়ে তার পক্ষে দাদাকে মেরে ফেলার প্রশ্নই আসে না! এভাবেই তৈরি হয় গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স।
এরই আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংস্করণ হলো ‘লেটস কিল হিটলার’ প্যারাডক্স। একটু আগে দেওয়া উদাহরণের মতো কেউ যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই হিটলারকে খুন করতে পারেন, তাহলে আদতে কোনো যুদ্ধই সংঘটিত হওয়ার কথা নয়। হিটলার না থাকলে নিমেষেই পাল্টে যাওয়ার কথা ভূরাজনীতির সব হিসাব-নিকাশ। হয়তো তখন সত্যি সত্যি শান্তি ফিরে আসত পৃথিবীর বুকে। এমনটা হলে সুদূর ভবিষ্যৎ থেকে টাইম মেশিনে চড়ে কাউকে অতীতে আসতে হবে না। এমনকি প্রয়োজনই পড়বে না যন্ত্রটি বানানোর। অর্থাৎ ঘুরেফিরে আবারও সেই বেরসিক হেঁয়ালি!
বাবা জন্ম না নিলে কোনোভাবেই অস্তিত্ব থাকার কথা নয় সন্তান তথা টাইমট্রাভেলারের। আর এমনটা হলে অতীতে গিয়ে তার পক্ষে দাদাকে মেরে ফেলার প্রশ্নই আসে না!
৪.
অতীত ভ্রমণের পুরো বিষয়টাই ভীষণ গোলমেলে। হরেক রকম প্যারাডক্সের উপস্থিতি যেন একে নিয়ে গেছে প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। প্রশ্ন হলো—এদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার কি কোনো উপায় নেই? বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতীত ভ্রমণের পুরো বিষয়টি যদি কিছু নিয়ম মেনে ঘটে বা বাস্তবে সমান্তরাল মহাবিশ্বের (প্যারালাল ইউনিভার্স) অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে প্যারাডক্সগুলোকে হয়তো পাশ কাটানো সম্ভব। ব্যাখ্যা করা যাক।
ইতিহাসের অন্যতম সেরা কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভের রোবোটিকসের তিনটি সূত্র আছে। সেগুলো অনেকটা এ রকম—এক. রোবট কখনো কোনো মানুষকে হত্যা করতে বা মানুষের ক্ষতি হয়, এমন কিছুতে অংশ নিতে পারবে না। দুই. রোবট অবশ্যই মানুষের আদেশ মানতে বাধ্য থাকবে (যদি না সেটা প্রথম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়)। আর তিন. রোবট নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা প্রথম ও দ্বিতীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।
এই কাল্পনিক আইনগুলোর মতো করে যদি অতীত ভ্রমণের জন্যও কিছু নিয়মকানুন থাকে, তাহলে টাইম প্যারাডক্সগুলো নিয়ে মাথা না ঘামালেও হয়তো দিব্যি চলে যাবে। গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্সের কথাই ভাবুন। কেমন হবে, যদি কেউ অতীত ভ্রমণ করতে পারলেও নিজের পূর্বপুরুষকে কোনোক্রমে মেরে ফেলতে না পারেন? হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মুহূর্তে এমন কিছু ঘটবে—যেমন কোনো কারণ ছাড়াই বন্দুক থেকে গুলি বের না হওয়া, পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকেও লক্ষ্যভেদ না হওয়া ইত্যাদি—যাতে পণ্ড হয়ে যাবে সব পরিকল্পনা। আর এটা নিশ্চিত করবে স্বয়ং প্রকৃতি। প্যারাডক্স এড়ানোর এই তত্ত্বের নাম দেওয়া হয়েছে ‘টাইমলাইন প্রটেকশন হাইপোথিসিস’।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতীত ভ্রমণের পুরো বিষয়টি যদি কিছু নিয়ম মেনে ঘটে বা বাস্তবে সমান্তরাল মহাবিশ্বের অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে প্যারাডক্সগুলোকে হয়তো পাশ কাটানো সম্ভব।
প্যারাডক্সগুলোর আরেকটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে টাইমলাইনের নতুন শাখা সৃষ্টি। অর্থাৎ কেউ যদি অতীত পরিবর্তন করেই ফেলেন, তাহলে প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য সৃষ্টি হবে নতুন করে একটি আলাদা শাখা টাইমলাইন। এ তত্ত্ব অনুসারে, অতীতে গিয়ে পূর্বপুরুষকে ঠিকই খুন করা সম্ভব, তবে সেটার ফলাফল হবে অচিন্তনীয়। বদলে যাবে গোটা ভবিষ্যতের গতিপথ। টাইমট্রাভেলার প্রবেশ করবে নতুন এক সময়রেখায়। সেখানে অস্তিত্ব থাকবে না তার চেনাজানা কারোরই। আর এমনটা হতে পারবে তখনই, যখন বাস্তবে অস্তিত্ব থাকবে প্যারালাল ইউনিভার্সের। অবশ্য এত ঝক্কি-ঝামেলায় না গিয়ে খুব সহজেই কিন্তু টাইম প্যারাডক্সের একটা জুতসই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। সময়ের উল্টো দিকে ভ্রমণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ হলেই তো সব মুশকিলের অবসান। নো টাইমট্রাভেল, নো প্যারাডক্স! তা–ই না?
একটা মজার তথ্য জানিয়ে আজকের আলোচনা শেষ করব। সিনেমাগুলোতে হরহামেশাই দেখা যায়, কোনো এক খ্যাপাটে বৈজ্ঞানিক বহু কষ্টে টাইম মেশিন আবিষ্কার করেছেন। তারপর বিশেষ কোনো লক্ষ্য পূরণে সেটিতে চেপে নিমেষেই চলে যান অতীত বা ভবিষ্যতে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই মেশিনটাকে পরিভ্রমণের সময়ে একচুলও অবস্থান পরিবর্তন করতে দেখা যায় না। কেবল যন্ত্রটির আশপাশের পরিবেশের দৃশ্য বদলাতে দেখা যায়। ক্রমে দ্রুত হতে থাকে পরিবর্তনের গতি। একটু ভাবুন তো, অবস্থান পরিবর্তন না করে এভাবে অতীত বা ভবিষ্যতে পৌঁছে যাওয়া কি আদৌ যুক্তিযুক্ত? এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু গতিশীল। চাঁদ ঘুরছে পৃথিবীকে ঘিরে, আর পৃথিবী সূর্যকে।
টাইমট্রাভেলার প্রবেশ করবে নতুন এক সময়রেখায়। সেখানে অস্তিত্ব থাকবে না তার চেনাজানা কারোরই। আর এমনটা হতে পারবে তখনই, যখন বাস্তবে অস্তিত্ব থাকবে প্যারালাল ইউনিভার্সের।
আটটি গ্রহ, কয়েক শ উপগ্রহ এবং মিলিয়ন মিলিয়ন গ্রহাণুকে সঙ্গে নিয়ে সূর্য ছুটে চলেছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মধ্য দিয়ে। কেউ যদি হাজার বছর আগের অতীতে ফিরে যেতে চায়, তাহলে তার টাইম মেশিনকে সময়ের উল্টো পথে চলার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই অবস্থানও পরিবর্তন করতে হবে। কারণ, হাজার বছর আগের পৃথিবী ও বর্তমান পৃথিবীর মধ্যে ব্যবধান যোজন যোজন। সিনেমার দেখানো পথে টাইম মেশিন কাজ করলে নিশ্চিতভাবেই সময় পরিভ্রামকের ঠিকানা হবে মহাশূন্যের হিমশীতল পরিবেশে। অবশ্য এরও একটা ভালো দিক আছে। টাইম প্যারাডক্সের হেঁয়ালির হাত থেকে মুক্তি তো মিলবে, নাকি?
