ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের হারানো প্রবন্ধের গোপন রহস্য ১৫ বছর পর কে ফাঁস করল

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কছবি: উইকিপিডিয়া

২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসের এক শীতের দিন। জার্মানির একটি বিজ্ঞান পত্রিকার ওয়েবসাইটে কেউ একজন বোতাম চাপল। কোনো ঘোষণা নেই, নেই কোনো ব্যাখ্যা। চোখের পলকে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের লেখা দুটো প্রবন্ধের পাতা ফাঁকা হয়ে গেল! সেখানে শুধু এক লাইনের একটি নোটিশ ঝুলছে—‘কপিরাইট লঙ্ঘনের কারণে প্রত্যাহার’। প্রবন্ধ দুটো ছাপা হয়েছিল চল্লিশের দশকে, নাচুরভিসেনশাফটেন নামে একটি পত্রিকায়। এরপর প্রায় দেড় দশক কেটে গেল, কিন্তু কেউ টেরই পেল না।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক তখন আর বেঁচে নেই। তিনি মারা গেছেন ১৯৪৭ সালে। তাঁকে বলা হয় কোয়ান্টাম তত্ত্বের জনক। ১৯১৮ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে হিটলারের সামনে দাঁড়িয়ে ইহুদিবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদও করেছিলেন। অথচ হঠাৎ করেই রিট্র্যাকশন ওয়াচের একটি তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসে! যে নোবেলজয়ীদের প্রবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়েছে, এটি মূলত তাদেরই তালিকা।

তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল ২০২৪ সালে। ঠিক দুই বছর পর এই তালিকায় চোখ বোলাতে গিয়ে থমকে যান কানাডার ইতিহাসবিদ ইভ জাঁগ্রা। প্ল্যাঙ্কের নাম দেখে তাঁর খটকা লাগে। তিনি বুঝতে পারেন, কোথাও একটা গড়বড় আছে! মন্ট্রিয়লে বসে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন কুইবেক ত্রোয়া-রিভিয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী মাহদি খেলফাউইকে। দুজনের কথা হয়, কৌতূহল বাড়ে। রহস্য উদ্ঘাটনে দুজনে মিলে শুরু করেন খোঁড়াখুঁড়ি।

আরও পড়ুন
১৯১৮ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে হিটলারের সামনে দাঁড়িয়ে ইহুদিবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদও করেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে যা বেরিয়ে এল, তাতে কেলেঙ্কারির কোনো গন্ধই নেই! প্রথম প্রবন্ধটি ছাপা হয়েছিল ১৯৪০ সালে। সেটি ছিল আরেকজন বিজ্ঞানীর একটি লেখার জবাব। তখনকার প্রথা মেনে আগের লেখাটির শিরোনামই হুবহু রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয় লেখাটি ছিল একটি দার্শনিক রচনা, যা প্রকাশিত হয় দুই বছর পর। নাম ছিল ‘সিন উন্ড গ্রেনৎসেন ডেয়ার এক্সাক্টেন ভিসেনশাফট’। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘সঠিক বিজ্ঞানের অর্থ ও তার সীমা’। বিজ্ঞান কীভাবে নিশ্চয়তায় পৌঁছায়, তা নিয়ে একজন প্রবীণ বিজ্ঞানীর ভাবনা ছাড়া এটি আর কিছুই না।

ইতিহাসবিদ খেলফাউই খুঁজে বের করেন, লেখাগুলো সে সময় একাধিক জায়গায় ছাপা হয়েছিল। এমনকি দুটি বইয়েও পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। আজকের যুগে একে বলা যায় স্বকপিরাইট লঙ্ঘন। মানে নিজের লেখার কপিরাইট নিজেই ভাঙা। কিন্তু চল্লিশের দশকে এটি ছিল একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার। তখন ইন্টারনেট ছিল না। বিজ্ঞানজগৎ ছিল ছোট ছোট অংশে বিভক্ত। একেকটি পত্রিকা কেবল একেক দলের পাঠকের কাছে পৌঁছাত। এ প্রসঙ্গে খেলফাউই বলেন, লেখকেরা চাইতেন তাঁদের কাজ যেন আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছায়। বিজ্ঞান তখন আজকের মতো একীভূত ছিল না। শোনা যায়, স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনও এমনটা করতেন! অথচ তাঁর নামে আজ পর্যন্ত কোনো প্রবন্ধ প্রত্যাহারের অভিযোগ নেই।

আরও পড়ুন
ইতিহাসবিদ খেলফাউই খুঁজে বের করেন, লেখাগুলো সে সময় একাধিক জায়গায় ছাপা হয়েছিল। এমনকি দুটি বইয়েও পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। আজকের যুগে একে বলা যায় স্বকপিরাইট লঙ্ঘন।

রহস্যের জট খুলতে মে মাসে জাঁগ্রা ও খেলফাউই আরকাইভ ওয়েবসাইটে একটি প্রি-প্রিন্ট গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা জানান, স্প্রিঙ্গার নেচার প্রকাশনীর এই সিদ্ধান্তটি সেকেলে এবং ঐতিহাসিক রেকর্ডকে বিকৃত করছে। জুনের শেষ দিকে বিখ্যাত সায়েন্স ম্যাগাজিনে এই খসড়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। সেখান থেকেই বাতাসে একটি নতুন তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে—হয়তো এর পেছনে কোনো স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট দায়ী!

ওই পত্রিকাটির নাম এখন বদলে রাখা হয়েছে দ্য সায়েন্স অব নেচার। পত্রিকাটির সম্পাদক সুজান স্কারলেট প্রকাশনা সংস্থার ভেতরের নজরদারি ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে বটের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। কিন্তু স্প্রিঙ্গার নেচার কর্তৃপক্ষ এটি সরাসরি অস্বীকার করে। তাদের একজন মুখপাত্র সায়েন্স ম্যাগাজিনকে জানান, প্রবন্ধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি মানুষেরই ভুল ছিল, কোনো সফটওয়্যার বা বট এর সঙ্গে জড়িত নয়। রিট্র্যাকশন ওয়াচের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইভান অরান্সকিরও এই বট তত্ত্বে ভরসা নেই। কারণ, ২০১১ সালে এখনকার মতো বটের এত ব্যাপক ব্যবহার ছিল না।

তবে জাঁগ্রা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। কারণ, কে বিশ্বাস করবে যে ২০১১ সালে স্প্রিঙ্গার-এর কোনো কর্মী বসে বসে ঠিক করলেন যে, একজন মৃত বিজ্ঞানীর দুটো সাধারণ প্রবন্ধ সরিয়ে ফেলা দরকার? তা-ও আবার এমন একজন মানুষ, যিনি তত দিনে ৬৪ বছর ধরে পৃথিবীতে নেই! কী কারণে, কার স্বার্থে এই কাজ করা হলো; সেই প্রশ্নের উত্তর আজও ঠিকমতো পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন
পত্রিকাটির সম্পাদক সুজান স্কারলেট প্রকাশনা সংস্থার ভেতরের নজরদারি ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে বটের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। কিন্তু স্প্রিঙ্গার নেচার কর্তৃপক্ষ এটি সরাসরি অস্বীকার করে।

অবশেষে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে স্প্রিঙ্গার নেচার নিজেদের সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলে। ৬ জুলাই প্রবন্ধ দুটি আবার ওয়েবসাইটে ফিরিয়ে আনা হয়। ওই পাতায় এখন দুটি তারিখ পাশাপাশি বসেছে। একটি ২৩ ডিসেম্বর ২০১১, যেদিন প্রবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। অন্যটি ৬ জুলাই ২০২৬, যেদিন মানবিক ভুলের কারণে তা আবার ফিরিয়ে আনা হলো।

স্প্রিঙ্গার নেচার-এর গবেষণা সততা বিভাগের প্রধান টিম কেয়ারশেস আগেই গিজমোডো ওয়েবসাইটকে জানিয়েছিলেন, ভুলটা মানুষেরই ছিল। কিন্তু কোন বিভাগে, কার হাতে, কোন প্রক্রিয়ায় এই ভুল হলো—তার বিস্তারিত জবাব আজও কেউ দেয়নি। রিট্র্যাকশন ওয়াচের নিবন্ধের নিচে এক পাঠক মন্তব্য করেছেন, ‘যে বা যারা এই কাজ করেছিল, তারা নিশ্চয়ই এখন আর ওখানে চাকরি করে না!’ আরেকজন লিখেছেন, ‘একজন মৃত মানুষকে নিয়ে এভাবে চুপিসারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী হতে পারে, তা কি কেউ ভেবে দেখেছে?’

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্ল্যাঙ্কের ওই প্রবন্ধ দুটোর বৈজ্ঞানিক সততা নিয়ে কিন্তু কখনো কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। সেখানে কোনো তথ্য জালিয়াতি ছিল না, নৈতিক নিয়মও ভাঙা হয়নি, কিংবা কোনো বড় ভুল হিসাবও ছিল না। ব্যাপারটা অনেকটা পুরোনো দিনের নিয়মকে আজকের মানদণ্ডে বিচার করার মতো। সেই বিচারের শাস্তি গিয়ে পড়ল এমন একজনের ঘাড়ে, যিনি নিজে কখনো এর জবাব দিতে পারবেন না।

আরও পড়ুন
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্ল্যাঙ্কের প্রবন্ধ দুটোর বৈজ্ঞানিক সততা নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। সেখানে কোনো তথ্য জালিয়াতি ছিল না, নৈতিক নিয়মও ভাঙা হয়নি, কিংবা কোনো বড় ভুল হিসাবও ছিল না।

জাঁগ্রা ও খেলফাউই তাঁদের প্রি-প্রিন্টে লিখেছেন, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সে সময়ের জীবিত পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। ইতিহাসবিদরা তাঁকে অত্যন্ত সরল ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাই ইতিহাসবিদদের কাছে এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, প্ল্যাঙ্কের জীবদ্দশায় এ লেখাগুলো প্রত্যাহার করা হতে পারত, কিংবা পরে কোনো যুক্তিসংগত কারণে এগুলো সরিয়ে ফেলা হতো।

যে প্রবন্ধ দুটো নিয়ে এত তুলকালাম কাণ্ড, সেগুলোতে নতুন কোনো সমীকরণ নেই। নেই কোনো যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। আছে শুধু একজন বয়স্ক বিজ্ঞানীর কিছু অমূল্য ভাবনা—বিজ্ঞান কত দূর যেতে পারে আর কোথায় তার সীমা টানা উচিত। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সেই ভাবনাগুলো একটি ওয়েবসাইটের পাতায় ফাঁকা পড়ে ছিল। এখন সেগুলো ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু কেন হারিয়ে গিয়েছিল, সেই রহস্য এখনো কারও টেবিলে ফাইলবন্দী হয়ে আছে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স

আরও পড়ুন