পৃথিবীর সরে যাওয়া ভরকেন্দ্রের নিখুঁত হিসাব বের করেছে নাসা

পৃথিবীর ভরের অবস্থানের পরিবর্তন হলে এর ভরকেন্দ্র জ্যামিতিক কেন্দ্রের তুলনায় সামান্য এদিক-ওদিক সরে যায়ছবি: নাসা

দূর থেকে পৃথিবীকে দেখলে মনে হবে এটি বুঝি স্থির একটি গোলক। কিন্তু আসলে পৃথিবীর ভেতরে ও বাইরের প্রায় সবকিছুই কমবেশি নড়াচড়া করছে। সমুদ্রের পানি, বরফ, বৃষ্টি, তুষার এমনকি বাতাসের ওজনের কারণেও পৃথিবীর ভরের অবস্থান বদলায়। ফলে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র জ্যামিতিক কেন্দ্রের তুলনায় সামান্য এদিক-ওদিক সরে যায়।

এই সরে যাওয়া ঠিক কতটুকু? নাসার বিজ্ঞানীরা নতুন এক পদ্ধতিতে এটি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপার উপায় বের করেছেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ঋতু বদলের সঙ্গে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক সরে যায়।

ভরকেন্দ্রের এই নড়াচড়া কৃত্রিম উপগ্রহের অবস্থান নির্ণয়, মানচিত্র তৈরি এবং পৃথিবীর উচ্চতা মাপার মতো কাজে লাগে। এই কেন্দ্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট বা নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির (জেপিএল) নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী ঋতুভেদে পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের এই নড়াচড়া আরও নিখুঁতভাবে হিসাব করার নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছেন। তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জিওফিজিক্যাল জার্নাল ইন্টারন্যাশনালে। 

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই মহাকাশ ও পৃথিবীতে থাকা বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করে পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের অবস্থান মাপছেন। কিন্তু কতটা নড়াচড়া হচ্ছে, তা নিয়ে আগের হিসাবগুলোতে কিছুটা পার্থক্য ছিল।

পৃথিবীর ভরকেন্দ্র কেন নড়ে?

ধরা যাক একটি শক্ত নীল মার্বেল। এটির ভর যদি সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে এর ভরকেন্দ্র ঠিক মাঝখানে থাকবে। পৃথিবী অবশ্য এমন না। এখানে কোথাও বিশাল সমুদ্র, কোথাও বরফের চাদর, কোথাও জমে থাকা তুষার, আবার কোথাও প্রচুর পানি বা ঘন বাতাস। ঋতু বদলের সঙ্গে এসবের পরিমাণ ও অবস্থান বদলায়। ফলে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র জ্যামিতিক কেন্দ্রের চারপাশে সামান্য ঘুরতে থাকে। এই নড়াচড়ার পরিমাণ কয়েক মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই মহাকাশ ও পৃথিবীতে থাকা বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করে পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের অবস্থান মাপছেন। কিন্তু কতটা নড়াচড়া হচ্ছে, তা নিয়ে আগের হিসাবগুলোতে কিছুটা পার্থক্য ছিল।

২০১৭ ও ২০২৩ সালে করা দুটি আন্তর্জাতিক হিসাবের মধ্যে পার্থক্য ছিল ০.২৭ ইঞ্চি বা ৭ মিলিমিটার। প্রায় তিনটি এক টাকার ধাতব কয়েন একটির ওপর আরেকটি রাখলে যতটা উঁচু হয়, এটি প্রায় ততটা। মজার বিষয় হলো, এই পার্থক্য পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের মোট নড়াচড়ার প্রায় সমান।

আরও পড়ুন
২০১৭ ও ২০২৩ সালে করা দুটি আন্তর্জাতিক হিসাবের মধ্যে পার্থক্য ছিল ০.২৭ ইঞ্চি বা ৭ মিলিমিটার। প্রায় তিনটি এক টাকার ধাতব কয়েন একটির ওপর আরেকটি রাখলে যতটা উঁচু হয়, এটি প্রায় ততটা।

মহাকাশ থেকে ভরকেন্দ্রের নড়াচড়া যেভাবে দেখা হয়

নতুন পদ্ধতিটি তৈরি করেছেন নাসার জেপিএলের ভূবিজ্ঞানী ডোনাল্ড আরগাস। পৃথিবীর ভরকেন্দ্রকে আরও নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে তিনি কৃত্রিম উপগ্রহের অত্যন্ত নির্ভুল গতিপথের তথ্য ব্যবহার করেছেন।

মহাকর্ষের কারণে কৃত্রিম উপগ্রহগুলো স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর ভরকেন্দ্রকে ঘিরে ঘোরে। তাই উপগ্রহ ও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে থাকা মাপযন্ত্রের মধ্যকার দূরত্বে খুব সামান্য পরিবর্তন হলেও সেখান থেকে পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

এই কাজে উপগ্রহ ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭৬ ও ১৯৯২ সালে উৎক্ষেপণ করা দুটি বিশেষ উপগ্রহ পৃথিবীর ভরকেন্দ্র নির্ণয়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোর নাম লেজিওস ১ ও লেজিওস ২। প্রতিটির ওজন প্রায় ৪০৮ কেজি। দেখতে অনেকটা ধাতব বলের মতো এসব উপগ্রহের গায়ে অসংখ্য প্রতিফলক বসানো আছে। বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে থাকা ভূ-স্টেশন থেকে লেজার পাঠিয়ে এগুলোর অবস্থান খুব নিখুঁতভাবে মাপা হয়।

তবে এই পদ্ধতির একটি সমস্যা আছে। পৃথিবীর সব জায়গায় ভূমির স্টেশন সমানভাবে ছড়িয়ে নেই।

নতুন পদ্ধতিতে তাই শুধু লেজার দিয়ে উপগ্রহের অবস্থান মাপা হয়নি। এর সঙ্গে জিপিএস এবং পৃথিবীর নিচু কক্ষপথে থাকা আরও কয়েকটি উপগ্রহের কক্ষপথের তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি পানি ও বরফের ওজনের কারণে পৃথিবীর ভূত্বক সামান্য বেঁকে যাওয়ার  বিষয়টিও হিসাবের মধ্যে রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন
১৯৭৬ ও ১৯৯২ সালে উৎক্ষেপণ করা দুটি বিশেষ উপগ্রহ পৃথিবীর ভরকেন্দ্র নির্ণয়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোর নাম লেজিওস ১ ও লেজিওস ২। প্রতিটির ওজন প্রায় ৪০৮ কেজি।

নতুন এই পদ্ধতি তৈরি করতে ডোনাল্ড আরগাসের সঙ্গে নাসার জেপিএল, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নেভাদা এবং ইউনিভার্সিটি অব মন্টানা এবং জার্মানির হেলমহোল্টজ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেসের গবেষকেরা কাজ করেছেন।

আরগাস বলেছেন, তাঁদের নতুন হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের এদিক-ওদিক নড়াচড়ার পরিমাণ আট বছর আগের ধারণার প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ পৃথিবীর এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে যে পানি ও বাতাসের ভর স্থানান্তরিত হয়, তার পরিমাণ আগের ধারণার চেয়ে কম।

জেপিএলের গবেষক ফেলিক্স ল্যান্ডেরার বলেন, এই নড়াচড়া খুব সামান্য মনে হলেও আধুনিক পৃথিবীতে খুব নির্ভুলভাবে অবস্থান নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বিভিন্ন রেফারেন্স সিস্টেম কীভাবে বদলায়, তা বোঝা গেলে মানচিত্র তৈরি থেকে শুরু করে নৌপরিবহনে আরও ভালোভাবে অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
আরগাস বলেছেন, তাঁদের নতুন হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের এদিক-ওদিক নড়াচড়ার পরিমাণ আট বছর আগের ধারণার প্রায় অর্ধেক।

কখন ভরকেন্দ্র সরে যায়?

গবেষকেরা পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের ঋতুভিত্তিক নড়াচড়া বিশ্লেষণ করে এর কারণকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। সমুদ্র, বায়ুমণ্ডল এবং স্থলভাগের পানির ভিত্তিতে এই ভাগ করা হয়েছে। স্থলভাগের পানির মধ্যে রয়েছে বরফ, তুষার, হ্রদ ও নদীর পানি, মাটির আর্দ্রতা এবং ভূগর্ভস্থ পানি।

উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ায় শীতের তুষার মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি জমে। এর ফলে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র প্রায় ৩ মিলিমিটার উত্তর মেরুর দিকে সরে যায়।

এর এক মাস পর এপ্রিলে আমাজন নদীর অববাহিকায় বৃষ্টির পানি সবচেয়ে বেশি জমে। সেখানে পানির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৪০০ গিগাটনে পৌঁছায়। এর ফলে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র প্রায় ২.২ মিলিমিটার দক্ষিণ আমেরিকার দিকে সরে যায়।

ছয় মাস পর নভেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বর্ষার পানি সর্বোচ্চ প্রায় ৬০০ গিগাটনে পৌঁছায়। এটিও পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের বার্ষিক নড়াচড়ায় সামান্য প্রভাব ফেলে।

আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে সমুদ্রে বরফ গলার পানি ও বৃষ্টির পানি জমে সমুদ্রের পানির পরিমাণ বাড়ে। তখন পৃথিবীর ভরকেন্দ্র দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে সরে যায়। প্রশান্ত মহাসাগর এত বিশাল যে সেখানে পানির পরিমাণের পরিবর্তনের প্রভাব অন্য মহাসাগরগুলোর পানি কমা-বাড়ার প্রভাবকে ছাড়িয়ে যায়। তবে ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর, উত্তর সাগর, বাল্টিক সাগর ও বারেন্টস সাগরের ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনও ভরকেন্দ্রের নড়াচড়ায় কিছুটা ভূমিকা রাখে।

আরও পড়ুন
উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ায় শীতের তুষার মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি জমে। এর ফলে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র প্রায় ৩ মিলিমিটার উত্তর মেরুর দিকে সরে যায়।

বাতাসের ওজনও গুরুত্বপূর্ণ

পৃথিবীর ভরকেন্দ্রের অবস্থান বদলাতে পানি বা বরফের পাশাপাশি বাতাসের ওজনেরও ভূমিকা আছে। গবেষকেরা ইউরোপীয় সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের তৈরি একটি মডেল ব্যবহার করে বিভিন্ন ঋতুতে বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের প্রভাব হিসাব করেছেন।

তাঁরা দেখেছেন, শীতের ঠান্ডা ও ঘন বাতাস প্রতিবছর প্রায় ২১ ডিসেম্বর আরব উপদ্বীপ, এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার ওপর ভরকেন্দ্রকে সামান্য পরিমাণে একদিকে সরিয়ে দেয়। আবার প্রায় ২১ জুন দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর থাকা ঘন বাতাস ভরকেন্দ্রকে অন্যদিকে সরাতে ভূমিকা রাখে।

আরও পড়ুন
সামনে থাকা উপগ্রহটি যখন কোনো ভারী বা বেশি পানিযুক্ত এলাকার ওপর দিয়ে যায়, যেমন পানি বেড়ে যাওয়া কোনো নদীর অববাহিকা দিয়ে গেলে অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় টানে সেটি সামান্য এগিয়ে যায়।

মহাকর্ষের পরিবর্তনও তথ্য দেয়

গবেষণায় করা হিসাবের সঙ্গে নাসার গ্রেস-এফও মিশনের পর্যবেক্ষণেরও মিল পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে উৎক্ষেপণ করা এই মিশনে দুটি উপগ্রহ রয়েছে। পৃথিবীর মহাকর্ষের টান মাসে মাসে কীভাবে বদলায়, মূলত তার মানচিত্র তৈরি করে এরা। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ হলো পৃথিবীর ওপর ও নিচে থাকা পানির ভর স্থানান্তর।

দুটি উপগ্রহ নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি উড়ে চলে। সামনে থাকা উপগ্রহটি যখন কোনো ভারী বা বেশি পানিযুক্ত এলাকার ওপর দিয়ে যায়, যেমন পানি বেড়ে যাওয়া কোনো নদীর অববাহিকা দিয়ে গেলে অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় টানে সেটি সামান্য এগিয়ে যায়। ফলে দুই উপগ্রহের মধ্যকার দূরত্বেও খুব সামান্য পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তন মেপেই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর পানির ভর কোথায় বাড়ছে বা কমছে, তা বুঝতে পারেন।

গ্রেস-এফও মিশনটি নাসা ও জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেসের যৌথ উদ্যোগ। এই মিশনের পরবর্তী ধাপ গ্রেস-সি। প্রায় ২৫ বছরের গ্রেস সিরিজের তথ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নতুন মিশনটি ২০২৮ সালের শেষ দিকে উৎক্ষেপণের লক্ষ্য রয়েছে।

পৃথিবীতে ঋতু বদলের সঙ্গে কোথাও তুষার জমছে, কোথাও বরফ গলছে, কোথাও বৃষ্টি ও বন্যার পানি বাড়ছে, আবার কোথাও বাতাস ঘন হয়ে উঠছে। এসব বিশাল ভর যখন পৃথিবীর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যায়, তখন পৃথিবীর ভরকেন্দ্রও সামান্য নড়ে ওঠে। এই ক্ষুদ্র নড়াচড়াই এখন মহাকাশে থাকা উপগ্রহ আর পৃথিবীর ভূমিতে থাকা যন্ত্রের সাহায্যে মিলিমিটার পর্যন্ত মাপার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুন