ব্ল্যাকহোলের আশপাশে কি মহাকাশযান পাঠানো সম্ভব
মহাবিশ্বের সবচেয়ে চরম ও রহস্যময় জায়গাগুলোর কথা উঠলেই সবার আগে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের নাম আসে। এর অভিকর্ষ বল এতই প্রচণ্ড যে, এর সাহায্যে খোদ আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এমনভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব, যা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূর থেকে টেলিস্কোপ দিয়ে ব্ল্যাকহোল পর্যবেক্ষণের একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। আমরা এরই মধ্যে সেই সীমার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। তাই বিজ্ঞানীদের মাথায় এখন একটি দুঃসাহসী চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—কেমন হয় যদি আমরা সরাসরি একটি প্রোব বা মহাকাশযান পাঠিয়ে দিই ব্ল্যাকহোলের একদম কাছে?
চীনের সাংহাইয়ে অবস্থিত ফুদান ইউনিভার্সিটির গবেষক কাসিমো বাম্বি ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই কাজ করছেন। আর্কাইভ-এ প্রকাশিত তাঁর একটি প্রি-প্রিন্ট গবেষণাপত্রে তিনি দেখিয়েছেন, আমাদের কাছাকাছি থাকা কোনো ব্ল্যাকহোলে মাত্র এক গ্রাম ওজনের একটি মহাকাশযান পাঠাতে ঠিক কী কী কাঠখড় পোড়াতে হবে।
কৃষ্ণগহ্বরের অভিকর্ষ বল এতই প্রচণ্ড যে, এর সাহায্যে খোদ আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এমনভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব, যা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব।
কাছাকাছি ব্ল্যাকহোল পাব কোথায়
প্রথমেই যে বড় ধাক্কাটা খেতে হয়, তা হলো আমাদের জানামতে পৃথিবীর কাছাকাছি কোনো ব্ল্যাকহোল নেই। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে কাছের ব্ল্যাকহোলটির নাম হলো ‘গায়া বিএইচ১’। ওফিউকাস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এই ব্ল্যাকহোলটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ৫৬০ আলোকবর্ষ দূরে! তবে মজার ব্যাপার হলো, এই ব্ল্যাকহোলটিকে আমরা সরাসরি দেখতে পাইনি। এর পাশে থাকা একটি সঙ্গী নক্ষত্রের ওপর এটি যে মহাকর্ষীয় টান তৈরি করছিল, কেবল তা দেখেই আমরা এর অস্তিত্ব টের পেয়েছি।
বাম্বির গবেষণাপত্র অনুযায়ী, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০ কোটি নক্ষত্র-ভরের ব্ল্যাকহোল রয়েছে। সংখ্যাটা পড়ে চমকে ওঠারই কথা! গ্যালাক্সিতে ভেসে বেড়ানো এই বিপুলসংখ্যক ব্ল্যাকহোলের প্রায় ৯২ শতাংশই একেবারে একাকী। এদের কোনো সঙ্গী নক্ষত্র নেই, যারা আলো দিয়ে তাদের অস্তিত্ব জানান দেবে। এদের খুব কাছাকাছি চলে যাওয়া আলো আর ফিরে আসতে পারে না, তাই একা থাকা ব্ল্যাকহোল সরাসরি দেখা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১ হাজার ৫০০ কিউবিক পারসেক (প্রায় ৫২ হাজার কিউবিক আলোকবর্ষ) এলাকায় অন্তত একটি নক্ষত্র-ভরের ব্ল্যাকহোল থাকার কথা। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বিশাল আয়তনের তুলনায় এই হিসাব আমাদের দারুণ এক আশার আলো দেখায়।
এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে কাছের ব্ল্যাকহোলটির নাম হলো গায়া বিএইচ১। ওফিউকাস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এই ব্ল্যাকহোলটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ৫৬০ আলোকবর্ষ দূরে!
এই গাণিতিক হিসাব থেকেই সেই রোমাঞ্চকর সম্ভাবনার কথা উঠে আসে। পৃথিবী থেকে মাত্র ২০ থেকে ২৫ আলোকবর্ষ দূরত্বের মধ্যেই হয়তো এমন কোনো অদৃশ্য ব্ল্যাকহোল লুকিয়ে আছে! ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এত দূর থেকে এটি আমাদের সৌরজগতের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু এই দূরত্বে মানুষের এক জীবনের মধ্যেই একটি মহাকাশযান পাঠানোর সুযোগ করে দিতে পারে। তবে তার আগে আমাদের সেই লুকায়িত ব্ল্যাকহোলটিকে খুঁজে বের করতে হবে। বাম্বির মতে, আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ব্ল্যাকহোলটি যখন গ্যাস গিলতে শুরু করবে, তখন সেখান থেকে নির্গত বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করেই আমরা একে খুঁজে পেতে পারি।
বাম্বির মতে, আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ব্ল্যাকহোলটি যখন গ্যাস গিলতে শুরু করবে, তখন সেখান থেকে নির্গত বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করেই আমরা একে খুঁজে পেতে পারি।
রকেট নয়, ভরসা লেজার
ধরে নেওয়া যাক, আমরা কাছাকাছি একটি ব্ল্যাকহোল খুঁজে পেয়েছি। এখন সেখানে যাব কীভাবে? সাধারণ রকেটের কথা মাথা থেকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলাই ভালো। রকেট সায়েন্সের একটি বড় সমস্যার নাম হলো রকেট ইকুয়েশনের স্বৈরতন্ত্র। রকেটের জ্বালানি নিজেকেই বহন করতে হয়, তাই জ্বালানি বাড়ালে রকেটের ভরও বেড়ে যায়। সেই ভরকে টানতে আরও বেশি জ্বালানির দরকার পড়ে। এই অন্তহীন চক্রের কারণে প্রচলিত রকেটে করে কয়েক আলোকবর্ষ দূরের কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক হাজার বছর লেগে যাবে। তাত্ত্বিক দিক থেকে সবচেয়ে সেরা বিকল্প হলো, লেজারচালিত সোলার সেইল বা সৌর পাল।
যেহেতু লেজারের ধাক্কায় খুব বেশি বল প্রয়োগ করা যায় না, তাই এই মহাকাশযানের নকশা হতে হবে অবিশ্বাস্য রকমের হালকা। এর মূল অংশটি হবে মাত্র এক গ্রাম ওজনের একটি খুদে মাইক্রোচিপ। এই এক গ্রামের চিপের ভেতরেই নেভিগেশন সিস্টেম, বৈজ্ঞানিক সেন্সর এবং পৃথিবীতে যোগাযোগের জন্য ট্রান্সমিটার বসানো থাকবে। আর এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে ১০ বর্গমিটার আয়তনের একটি ডাইইলেকট্রিক মেটাম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি পাতলা পাল। পৃথিবী থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী লেজার রশ্মি ছুড়ে ওই পালে আঘাত করা হবে। হিসাব অনুযায়ী, এই লেজারের ধাক্কায় পুরো যানটি মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যে আলোর বেগের এক-তৃতীয়াংশ গতি অর্জন করতে পারবে!
যেহেতু লেজারের ধাক্কায় খুব বেশি বল প্রয়োগ করা যায় না, তাই এই মহাকাশযানের নকশা হতে হবে অবিশ্বাস্য রকমের হালকা। এর মূল অংশটি হবে মাত্র এক গ্রাম ওজনের একটি খুদে মাইক্রোচিপ।
এক শতাব্দীর মহাযাত্রা
এই প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চললেও ২৫ আলোকবর্ষ দূরের সেই ব্ল্যাকহোলে পৌঁছাতে যানটির সময় লাগবে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর যানটির গতি কমানোর কোনো উপায় থাকবে না। তাই প্রোবটিকে ব্ল্যাকহোলের খুব কাছ দিয়ে তীব্র বেগে উড়ে যাওয়ার সেই সামান্য সময়ের মধ্যেই সব ডেটা সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সেই ডেটা পৃথিবীতে পাঠাতে সময় লাগবে আরও ২০ থেকে ২৫ বছর। সব মিলিয়ে এই মিশনের মেয়াদ হবে ৮০ থেকে ১০০ বছর। অর্থাৎ, যে প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা এই মিশন শুরু করবেন, ফলাফল দেখার জন্য তাঁরা কেউই হয়তো বেঁচে থাকবেন না।
নিশানা করার মতো কোনো ব্ল্যাকহোলই এখনো আমাদের জানা নেই। এমনকি এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল প্রজেক্ট ‘ব্রেকথ্রু স্টারশট’ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে গেছে।
বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ
সত্যি কথা বলতে, এমন একটি মিশন সফল করার মতো প্রযুক্তি এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। কয়েক দশক ধরে আন্তঃনাক্ষত্রিক শূন্যতায় টিকে থেকে ২০ আলোকবর্ষ দূর থেকে পৃথিবীতে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ডেটা পাঠাতে পারবে, এমন এক গ্রাম ওজনের চিপ তৈরি করা আমাদের বর্তমান ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষমতার অনেক বাইরে। তাছাড়া এত বিপুল শক্তির লেজার সিস্টেমও আমাদের নেই। সবচেয়ে বড় কথা, নিশানা করার মতো কোনো ব্ল্যাকহোলই এখনো আমাদের জানা নেই। এমনকি এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল প্রজেক্ট ‘ব্রেকথ্রু স্টারশট’ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে তাত্ত্বিকভাবে এই বাধাগুলোর কোনোটিই একেবারে অলঙ্ঘনীয় নয়। এর জন্য আমাদের শুধু আরও উন্নত প্রকৌশলবিদ্যার প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞান, যন্ত্রপাতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করতে শুরু করেছেন। ২০২৭ সালের গ্রীষ্মে এ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনও হওয়ার কথা রয়েছে। হয়তো সেই দিনই আমাদের হাতে একটি পূর্ণাঙ্গ নকশা থাকবে না, কিন্তু প্রতিটি ছোট ছোট পদক্ষেপ আমাদের ব্ল্যাকহোলে মিশন পাঠানোর স্বপ্নের দিকে এক ধাপ করে এগিয়ে নেবে।