সাক্ষাৎকার
হোয়াইট হোলকে বলা যায় ব্ল্যাকহোলের ছোট ভাই—কার্লো রোভেল্লি, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ
বর্তমানে আলোচিত তাত্ত্বিক পদার্থবিদের মধ্যে অন্যতম কার্লো রোভেল্লি। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি। সতীর্থ কয়েকজন বিজ্ঞানীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তিনি গড়ে তুলেছেন লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি নামের জটিল এক তত্ত্ব। এতে তিনি চেষ্টা করছেন আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে একসূত্রে গাঁথতে। তাঁর মতে, স্থান শূন্য নয়; বরং এর গঠন অতি ক্ষুদ্র, কোয়ান্টাম স্তরের জালের মতো, যেন স্থানকাল নিজেই সূক্ষ্ম বুননের এক কাপড়।
রোভেল্লি শুধু পদার্থবিদই নন, জনপ্রিয় লেখকও বটে। স্থান, কাল ও বাস্তবতার গভীরতম প্রশ্নগুলো তুলে ধরেন নিখাদ কৌতূহল ও মানবিক স্পর্শে। তাঁর লেখায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ধাঁধা মিশে যায় দার্শনিক ভাবনায়। বিজ্ঞানের যুক্তি হয়ে ওঠে জীবনের এক গভীর কবিতা। সে কারণেই তাঁকে অনেকে বলেন ‘পদার্থবিজ্ঞানের কবি’।
রোভেল্লির লেখা জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে রয়েছে সেভেন ব্রিফ লেসনস অব ফিজিকস, দ্য অর্ডার অব টাইম, রিয়েলিটি ইজ নট হোয়াট ইট সিমস ও হোয়াইট হোলস। সেগুলো অনূদিত হয়েছে বহু ভাষায় এবং পাঠকদের হাতে হাতে ঘুরেছে যেন দার্শনিক প্রবন্ধের মতো। এর মধ্যে সেভেন ব্রিফ লেসনস অব ফিজিকস প্রায় ৫২টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বিক্রি হয়েছে ১০ লাখের বেশি কপি।
১৯৫৬ সালে ইতালির ভারোনা শহরে জন্ম নেওয়া রোভেল্লি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন কৌতূহলী। গণিত ও দর্শনের টানে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাঁর ভাবনার পরিধি কখনোই শুধু ল্যাবরেটরি বা সমীকরণের মধ্যে আটকে থাকেনি। তিনি প্রশ্ন করেছেন—সময় কীভাবে বয়ে যায়, স্থান আসলে কেমন আর আমাদের দেখার ওপর গঠন কতটা নির্ভর করে।
বর্তমানে ফ্রান্সের সেন্টার ডি ফিজিক থিওরিক অব মার্সেলিতে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এই বিজ্ঞানী গবেষণা করছেন হোয়াইট হোল বা শ্বেতগহ্বর নিয়ে। বছরখানেক আগে এ বিষয়ে একটি বইও প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের গবেষণাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ওয়ারড ডট সিজেডের সহযোগী সম্পাদক মাইকেল সেংক।
মাইকেল সেংক: একটি ফটোগ্রাফ কি অতীতের কোনো মুহূর্তকে ধরে রাখে? এটা কি আমাদের মনে একই স্মৃতি বা অনুভূতি জাগায়? অন্যদিকে সময় ধরে রাখার হাতিয়ার কী হতে পারে? আর ভবিষ্যৎ দেখতে কেমন?
কার্লো রোভেল্লি: একটি ছবি আমাদের অতীত সম্পর্কে কিছু একটা দেয়। এটা অবশ্যই অনুভূতি জাগায়। কখনো কখনো সেটা হয়ে ওঠে খুব তীব্র কোনো অনুভূতি। তার কারণ, ছবিতে অতীতের ছাপ থাকে। আবার আমাদের মস্তিষ্কে ও স্মৃতিতেও ওই অতীতের ছাপ থাকে। তাই ছবিটি এগুলোর সঙ্গে একধরনের অনুরণন তৈরি করে। আমাদের কাছে যদি ভবিষ্যতের কোনো ছবি থাকত, কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো স্মৃতি না থাকত, তাহলে আমরা একই অনুরণন পেতাম না। কিন্তু যদি আমাদের কাছে ভবিষ্যতের ছবি ও স্মৃতি দুটিই থাকত, তাহলে তা একই রকম হতো।
মাইকেল সেংক: কালের প্রকৃতি নিয়ে আপনি অনেক লিখেছেন। আপনি ব্যক্তিগতভাবে সময়কে কীভাবে অনুভব করেন? আপনি কি কখনো ‘আমার সময় আছে’ বা ‘আমার সময় নেই’, এই বাক্যগুলো ব্যবহার করেন?
কার্লো রোভেল্লি: হ্যাঁ! আমি এই বাক্যগুলো খুব ঘন ঘন ব্যবহার করি! আমার জন্য সময় অন্য সবার মতোই। সময় যে বিভিন্ন পরিসরে ও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্নভাবে কাজ করে, সেটা জেনেও আমাদের দৈনন্দিন জীবন খুব একটা বদলায় না। পৃথিবী গোল জেনেও শহরে আমাদের কারও হাঁটার পদ্ধতি যেমন বদলায় না, ব্যাপারটা অনেকটা সে রকম।
একটি ছবি আমাদের অতীত সম্পর্কে কিছু একটা দেয়। এটা অবশ্যই অনুভূতি জাগায়। কখনো কখনো সেটা হয়ে ওঠে খুব তীব্র কোনো অনুভূতি। তার কারণ, ছবিতে অতীতের ছাপ থাকে।
মাইকেল সেংক: আপনার কাছে বাস্তবতা মানে কী? আপনার কি কোনো ‘অবৈজ্ঞানিক’ বিশ্বাস বা কুসংস্কার আছে?
কার্লো রোভেল্লি: আমার এমন সব বিশ্বাস আছে, যার সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমি যদি বুঝতে পারি যে আমার কোনো বিশ্বাস বিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ, তখন সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলি। কিন্তু বিষয়গুলো সূক্ষ্ম ও জটিল…আমরা কুসংস্কার ধরে রাখতে পছন্দ করি। সেগুলো আক্ষরিক অর্থে হয়তো সত্য নয়, কিন্তু এদের একটা ভূমিকা আছে। যেমন আমাদের ছোট ছোট কিছু রীতিনীতি আছে এবং আমরা বলি যে কিছু ঘটার জন্য এগুলো করা দরকার। অবশ্যই আমাদের রীতিনীতির বাইরের জগতের ওপর কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু আমাদের ওপর সেগুলোর প্রভাব আছে। এটাই আসলে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেগুলো বিজ্ঞানবিরোধী বলে মনে হলেও বৈজ্ঞানিক বিশ্বদৃষ্টিকে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বুঝতে পারলে সেগুলোরও একটা অর্থ আছে।
মাইকেল সেংক: সময় ও পদার্থ বিষয়ে আমরা নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞান, আইনস্টাইনের তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব পেয়েছি। আর কী প্রয়োজন? বিশ্বজগৎকে আরও ভালোভাবে বুঝতে হলে পদার্থবিজ্ঞানের কি আধুনিক কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে?
কার্লো রোভেল্লি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটা প্রয়োজন, সেটা হলো আইনস্টাইনের তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের মধ্যে দৃশ্যমান বিরোধগুলোর সমাধান করা। এ ছাড়া আরও কিছু জিনিস আছে, যা আমরা বুঝতে পারি না। যেমন কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে কী ঘটে। আর আমাদের কাছে একটা অদ্ভুত খণ্ড বিশ্বচিত্র আছে। আমাদের যে আরও কিছু বোঝার আছে, সেটা বেশ স্পষ্ট।
আমার এমন সব বিশ্বাস আছে, যার সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমি যদি বুঝতে পারি যে আমার কোনো বিশ্বাস বিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ, তখন সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলি।
মাইকেল সেংক: নিউটনীয় ও আইনস্টাইনীয় পদার্থবিজ্ঞান একই প্রশ্ন ও ঘটনা নিয়ে কাজ করে, কিন্তু তাদের বর্ণনা ও ব্যাখ্যায় ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পদার্থবিজ্ঞানের কি কোনো সাধারণ ভাষার প্রয়োজন?
কার্লো রোভেল্লি: একই ঘটনার ওপর বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা স্বাভাবিক। অনেক দূর থেকে দেখা একটি বন খুব কাছ থেকে দেখা বনের চেয়ে একেবারেই আলাদা। নিউটনীয় ও আইনস্টাইনীয় পদার্থবিজ্ঞানও একই। প্রথমটি সবকিছু দূর থেকে দেখে। তাই খুঁটিনাটি ও অনেক বিশেষ ঘটনা এড়িয়ে যায়। আমরা যখন আরও পরিমার্জিত দৃষ্টিভঙ্গি পাই, তখন আমরা আমাদের ভাষা নতুন করে সাজাই, আরও শক্তিশালী ভাষা তৈরি করি। পুরোনো ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই ভালো। আপনি যখন কোনো উপত্যকায় গাড়ি চালান, আপনার কাছে বনটি তখনো একটি সমতল মখমলি সবুজ ছাড়া আর কিছুই নয়।
মাইকেল সেংক: আপনার বক্তৃতা ও একাডেমিক গবেষণায় আপনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। সাহসী তত্ত্ব নিয়েও কাজ করেন। এগুলো নিয়ে কেন সবার আগ্রহী হওয়া উচিত?
কার্লো রোভেল্লি: এ বিষয়ে কারও আগ্রহী হওয়া উচিত নয়। একই কারণে কারও সংগীত শোনা, সিনেমা দেখা, পাহাড়ে হাইকিং করা, ছুটিতে যাওয়া বা বই পড়ায় আগ্রহী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। যে কেউ চাইলে নিজের জীবনের সুন্দর অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার স্বাধীনতা আছে।
আমরা যখন আরও পরিমার্জিত দৃষ্টিভঙ্গি পাই, তখন আমরা আমাদের ভাষা নতুন করে সাজাই, আরও শক্তিশালী ভাষা তৈরি করি। পুরোনো ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই ভালো।
মাইকেল সেংক: আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যাকে বলা হচ্ছে প্রযুক্তির যুগ। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কি মানবজাতির গভীর জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, নাকি প্রযুক্তি একধরনের বাধাও?
কার্লো রোভেল্লি: প্রযুক্তি এখন এতই বড় বিষয় যে একে এককথায় ভালো বা খারাপ বলা যায় না। যেমন ভালো প্রযুক্তি হলো, যেটা বহুদূরে থাকা সত্ত্বেও আমাদের দুজনকে এত সহজে যোগাযোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। এ ছাড়া ভালো প্রযুক্তি চিকিৎসায় অগ্রগতি সম্ভব করেছে। এর কারণে গত শতকের মানুষের গড় আয়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই প্রযুক্তি না থাকলে আমাদের অনেকেই হয়তো এখন আর বেঁচেই থাকত না। আমি প্রযুক্তির প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, আমি এত দীর্ঘ জীবন পাচ্ছি, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। অন্যদিকে পারমাণবিক বোমা একেবারেই নির্বোধ একটা প্রযুক্তি।
মাইকেল সেংক: দর্শন ছাড়া আপনি কেমন পদার্থবিজ্ঞানী হতেন? কিংবা পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া কেমন দার্শনিকই হতেন?
কার্লো রোভেল্লি: বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞানী আছেন। কেউ কেউ টেকনিক্যাল। তাঁরা হিসাব করেন বা পরীক্ষা করেন বা উপপাদ্য প্রমাণ করেন। আবার অন্য ধরনের বিজ্ঞানী আছেন, যাঁরা অজানাকে অনুসন্ধান করেন। আমি মনে করি, এর জন্য দর্শন খুব উপযোগী। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের দার্শনিকও আছেন। আমি মনে করি, যাঁরা আধুনিক বিজ্ঞানের অর্জিত জ্ঞান উপেক্ষা করেন, তাঁরা অপরিহার্য কিছু বিষয় থেকে বঞ্চিত হন।
আর আমি নিজে? আমার নিজের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দার্শনিকতা বোঝার ক্ষমতা দিয়েছে যে স্থান ও কাল সম্পর্কে আমরা সাধারণত যেভাবে ভাবি, তা গভীরতর ভুলও হতে পারে। এ উপলব্ধিই কোয়ান্টাম স্থান ও কোয়ান্টাম কালের মতো ধারণা বোঝার ও গড়ে তোলার পথ খুলে দিয়েছে।
প্রযুক্তি এখন এতই বড় বিষয় যে একে এককথায় ভালো বা খারাপ বলা যায় না। যেমন ভালো প্রযুক্তি হলো, যেটা বহুদূরে থাকা সত্ত্বেও আমাদের দুজনকে এত সহজে যোগাযোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে।
মাইকেল সেংক: আপনি সুপরিচিত বিজ্ঞানী ও লেখক। আপনি কী ধরনের প্রভাব ফেলতে চান? সেটা কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
কার্লো রোভেল্লি: আমি আমার প্রভাব নিয়ে আগ্রহী, কিন্তু সেটা আমার জন্য অপরিহার্য কিছু নয়। মানুষ যদি আমাকে ভুলে যায়, তাতে খুব একটা আফসোসের কিছু নেই। কারণ, শেষ পর্যন্ত সবকিছুই বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু অবশ্যই খুশি হব, যদি কোনোভাবে এই পৃথিবী বা মানুষের চিন্তাভাবনা বোঝার ক্ষেত্রে সামান্য অবদান রাখতে পারি। আরও ভালো লাগবে, যদি আমার প্রভাবের কণা অংশও মানুষকে একটু কম নির্বোধ এবং একে অপরের বিরুদ্ধে কম যুদ্ধংদেহী হতে প্রেরণা দেয়।
মাইকেল সেংক: আপনার কাছে বিজ্ঞানের তারকা কে? আপনি কাকে শ্রদ্ধা ও অনুসরণ করেন? কাকে পড়ার, শোনার বা দেখার যোগ্য মনে করেন?
কার্লো রোভেল্লি: এ রকম অনেকে আছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় নামটি, যদিও উত্তরটা সহজেই অনুমান করা যায়—তিনি হলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্য, তাঁর রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার জন্য এবং কোনো আপস না করে সব সময় নিজের মতো থাকার জন্য।
আমি আমার প্রভাব নিয়ে আগ্রহী, কিন্তু সেটা আমার জন্য অপরিহার্য কিছু নয়। মানুষ যদি আমাকে ভুলে যায়, তাতে খুব একটা আফসোসের কিছু নেই। কারণ, শেষ পর্যন্ত সবকিছুই বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়।
মাইকেল সেংক: আজকের সভ্যতা বিজ্ঞানকে খুবই গুরুত্ব দেয়। আপনার কি মনে হয়, চিরকাল এমনই থাকবে না? আপনি কি মনে করেন, কখনো ধর্ম, দর্শন, শক্তির প্রবাহ, মনোভাব বা অনুভূতির মতো বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে?
কার্লো রোভেল্লি: আমার ধারণা, এটা ভুলভাবে বিভাজন করা হচ্ছে। অনুভূতি, মনোভাব, শক্তির প্রবাহ ও দর্শনের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই। এমনকি ধর্মকে, যা আসলে একটি জটিল ও বহু স্তরবিশিষ্ট ঘটনা, বিজ্ঞানের আলোয় বোঝা সম্ভব। এর মানেও বের করা সম্ভব। এগুলো সবই বাস্তব ঘটনা। বিজ্ঞান সেগুলো অস্বীকারও করে না। তাই আশা করি, একদিন আমরা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারব, যেখানে একে আর বিজ্ঞানের সঙ্গে বিরোধিতা হিসেবে দেখানো হবে না।
বিজ্ঞান তাদের অস্বীকার করে, এ ধারণা আসলে ভুল; বরং বিজ্ঞান আমাদের সেই ভুলগুলোর বিরুদ্ধে সতর্ক করতে পারে, যেগুলোর মধ্যে আমরা ধর্ম, দর্শন বা অনুভূতির টানে প্রায়ই পড়ে যাই। আশা করি আমরা সেই ভুলগুলো এড়াতে পারব।
মাইকেল সেংক: আপনি বর্তমানে কী নিয়ে আগ্রহী? সম্প্রতি কোন প্রশ্নগুলো আপনার মনে সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খায়? সেটা কাজ–সম্পর্কিত হোক বা অন্য কিছু, যদি শেয়ার করতেন।
কার্লো রোভেল্লি: যে প্রশ্নটি আমাকে রাতে জাগিয়ে রাখে, সেটা হলো ভবিষ্যৎ ঠিক কী কারণে অতীত থেকে আলাদা? এই পার্থক্যের শিকড় কোথায়? আমরা কেন অতীত মনে রাখি, কিন্তু ভবিষ্যৎ মনে রাখতে পারি না?
এগুলো নিয়ে আমার আগ্রহের আরেকটি কারণ হলো, আমি সারা জীবন যে তত্ত্বটি নিয়ে কাজ করেছি, সেই লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি তত্ত্ব পরীক্ষা করার একটা উপায় হতে পারে এই হোয়াইট হোল।
মাইকেল সেংক: আপনি কি আদৌ কল্পনা করতে পারেন যে আমরা ভবিষ্যৎ মনে রাখতে পারব?
কার্লো রোভেল্লি: অবশ্যই পারি। কেন নয়? আপনি যেমন নিজের তরুণ বয়সের স্মৃতি মনে রাখতে পারেন, তেমনি নিজের বার্ধক্যের স্মৃতিও থাকতে পারে। যদি তা–ই হতো, আমাদের সময়বোধ একেবারেই অন্য রকম হতো।
মাইকেল সেংক: এটা নিয়ে কি এ মুহূর্তে গবেষণা করছেন?
কার্লো রোভেল্লি: একভাবে তা–ই বলা যায়। আমি এখন হোয়াইট হোল বা শ্বেতগহ্বর নিয়ে কাজ করছি। এগুলোকে বলা যায়, ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের ছোট ভাই। কৃষ্ণগহ্বর খুবই রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তু। আমরা সেগুলো আকাশে দেখি। আমরা দেখি, পদার্থ কীভাবে তাদের ভেতরে পড়ে যাচ্ছে। এর ভেতরে পড়া পদার্থের ভাগ্যে কী ঘটে, তা নিয়ে বলতে গেলে আমরা কিছুই জানি না।
কিন্তু এগুলো নিয়ে আমার আগ্রহের আরেকটি কারণ হলো, আমি সারা জীবন যে তত্ত্বটি নিয়ে কাজ করেছি, সেই লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি তত্ত্ব পরীক্ষা করার একটা উপায় হতে পারে এই হোয়াইট হোল। এই তত্ত্ব স্থান ও সময়ের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করে। তবে সেটা এখন পর্যন্ত পরীক্ষিত নয়। এ তত্ত্ব ভবিষ্যদ্বাণী করে যে দূর ভবিষ্যতে প্রতিটি কৃষ্ণগহ্বর একটি শ্বেতগহ্বরে পরিণত হয়। এর সেখান থেকে কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে পড়া সবকিছু শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারে।
আমি এখন হোয়াইট হোল বা শ্বেতগহ্বর নিয়ে কাজ করছি। এগুলোকে বলা যায়, ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের ছোট ভাই। কৃষ্ণগহ্বর খুবই রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তু। আমরা সেগুলো আকাশে দেখি।
মাইকেল সেংক: আপনি কি মনে করেন যে কোনো একটি হোয়াইট হোলই বিগ ব্যাংয়ের জন্য দায়ী হতে পারে?
কার্লো রোভেল্লি: বিগ ব্যাংয়ের পদার্থবিজ্ঞান ও কৃষ্ণগহ্বরের পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে কিছু মিল আছে। বিগ ব্যাং হয়তো একটি ধসে পড়া মহাবিশ্ব থেকে একটি বিগ বাউন্স ছিল। একইভাবে একটি কৃষ্ণগহ্বরও শেষ পর্যন্ত বাউন্স করে একটি শ্বেতগহ্বরে পরিণত হয়। কিন্তু এগুলো শুধু সাদৃশ্য। কারণ, দুটি ঘটনার প্রকৃতি আসলে বেশ আলাদা।
মাইকেল সেংক: আমাদের মহাবিশ্ব যেভাবে শুরু হয়েছিল, সেটা কি কোনো দিন একইভাবে বা একই প্রক্রিয়ায় শেষ হতে পারে?
কার্লো রোভেল্লি: দূর ভবিষ্যতে আমাদের সামনে কী আছে, কে জানে? শুধু ঈশ্বরই জানেন অথবা হয়তো তিনিও নন...