এমন বিষয় বেছে নেওয়া উচিত, যা সত্যি আনন্দ দেয়— তানিয়া তাসনিম অনন্যা, জ্যোতিঃপদার্থবিদ

মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় মহাজাগতিক দানব ব্ল‍্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর। বিগ ব্যাংয়ের পর থেকে কীভাবে এরা আকারে ও ভরে বিশালাকার হয়ে উঠছে, সেই রহস্য উন্মোচন করে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন বাংলাদেশি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী ড. তনিমা তাসনিম অনন্যা।

সম্প্রতি প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর উদীয়মান তারকা বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন তিনি। ঢাকার মধ্য বাড্ডায় শৈশব কাটানো অনন্যার এই জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার গল্পটা রূপকথার চেয়ে কম নয়। মায়ের মুখে মঙ্গলের গল্প শুনে মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখা এই বিজ্ঞানী কথা বলেছেন তাঁর বৈপ্লবিক গবেষণা, ব্ল‍্যাকহোলের সহবিবর্তন, কত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল এবং ভবিষ্যৎ মহাকাশ মিশন নিয়ে।

তরুণদের বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন এবং অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে ড. অনন্যার সেই অনুপ্রেরণাদায়ক ও চমৎকার সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। ইমেইলে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আবুল বাসার

বিজ্ঞানচিন্তা:

সম্প্রতি আপনি সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর প্রথম ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের তালিকায় উঠতি তারকা বিজ্ঞানী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। আপনাকে অভিনন্দন। কোন গবেষণা বা কাজের জন্য আপনাকে এই সম্মাননা জানানো হলো? এই স্বীকৃতি পেয়ে আপনার কেমন লাগছে?

তনিমা তাসনিম অনন্যা: ধন্যবাদ। আমার বেশ কিছু প্রজেক্ট আছে, যেখানে আমি ব্যাখ্যা করছি যে বিগ ব্যাংয়ের পর থেকে ব্ল্যাকহোলের সংখ্যা ও ভর কীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কীভাবে তারা তাদের চারপাশের পদার্থের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে তা গ্রাস করে। এই কাজগুলোর জন্যই এই সম্মাননাটি আমাকে দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় যাঁরা আছেন, তাঁরা অত্যন্ত গুণী। তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে পেরে ও তাঁদের কাজ সম্পর্কে জানতে পেরে আমি খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে আমাকেও অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছিলেন?

অনন্যা: আমি বিজ্ঞানী ও নভোচারী হতে চেয়েছিলাম।

বিজ্ঞানচিন্তা:

কখন ঠিক করলেন যে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হবেন? কোন ঘটনা বা অভিজ্ঞতা আপনার এই পেশায় আসা নিশ্চিত করেছিল?

অনন্যা: আমাকে এই নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে দেওয়ার পুরো কৃতিত্ব আমার মায়ের, যদিও আমার বাবাও আমাকে প্রতিটা বিষয়ে সমর্থন দেন। মঙ্গলে যখন পাথফাইন্ডার অবতরণ করে, তখন আমি খুবই ছোট। মা আমাকে সেই লাল গ্রহটির গল্প শুনিয়েছিলেন পেপার পড়ে। বলেছিলেন, কীভাবে মানুষ সেখানে অনুসন্ধানযান পাঠিয়েছে, যা মঙ্গলের বুকে নেমে তার পৃষ্ঠদেশ নিয়ে গবেষণা করছে। মা ছিলেন গৃহিণী। নানামুখী আর্থিক ও সাংসারিক দুশ্চিন্তা ও ব্যস্ততা তাঁকে সব সময় ঘিরে রাখত। কিন্তু এত সব উদ্বেগের মধ্যেও তিনি যেভাবে এত বিস্ময় নিয়ে এই বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন যে এটা আমি মনোযোগ দিয়ে শুনি। আমি যখন বুঝতে পারি আমাদের পৃথিবীর বাইরে আরও কত শত পৃথিবী, নক্ষত্র ও তারায় ভরা ছায়াপথ রয়েছে, তখন মনে হয়েছিল, আমি এই বিষয় নিয়েই পড়তে চাই।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার জন্ম তো ঢাকায়। ঢাকায় কোন জায়গায় বড় হয়েছেন? সেই সময়ের মজার কোনো স্মৃতি বলুন।

অনন্যা: আমি ঢাকার মধ্য বাড্ডায় বড় হয়েছি। নব্বইয়ের দশকে আমার জন্ম। তখন এখানে অনেক পাকা রাস্তা ছিল না, সব বাড়ি ছিল টিনশেড। আমাদের টিনশেড বাসায় তখন অনেক ভাড়াটে ছিল। আমার মনে আছে, সবাই শুক্রবারে আমাদের বসার ঘরে ‘আলিফ লায়লা’, ‘সিন্দবাদ’ ইত্যাদি দেখত। বিদ্যুৎ চলে গেলে সবাই বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে যেত। তখন যদি আকাশে কোনো অদ্ভুত বা অস্বাভাবিক কিছু দেখা যেত, অথবা চাঁদের কোনো উজ্জ্বল পর্যায় দেখা যেত বা ফানুসও দেখা যেত—এটা নিয়ে সবাই একেক রকম মন্তব্য করত। তখন তো আবার ‘এক্স ফাইলস’ও ছিল, অনেক অদ্ভুত ইন্টারপ্রিটেশন বা ব্যাখ্যা উসকে দেওয়ার জন্য। ১৯৯৬ সালে একটা সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল ঢাকা থেকে। সবাই বালতিতে পানি নিয়ে সূর্যগ্রহণ দেখার বিশেষ প্লাস্টিক নিয়ে প্রস্তুত ছিল সেটা দেখার জন্য। আমার এক প্রতিবেশী আমাকে প্লাস্টিক দিয়েছিল সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য। তখন মনে হয় এ রকম সামাজিক বন্ধনটা আরেকটু মজবুত ছিল। এখন মানুষ হয়তো এতটা আকাশ দেখার সুযোগ পায় না।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

ওই সময়ে পড়ালেখার বাইরে আর কী করতেন? যেমন গল্পের বই পড়তেন? কিংবা অন্য কিছু?

অনন্যা: আমি সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, হুমায়ূন আহমেদ, নারায়ণ দেবনাথের নন্টে ফন্টে, রকিব হাসান, চাচা চৌধুরীর কমিকস—বাচ্চাদের যত বই হাতে পেয়েছি, সব পড়েছি। পত্রিকার সঙ্গে যে ফান ম্যাগাজিন দিত, যেমন প্রথম আলোর আলপিন ছিল, রাইজিং স্টারস ছিল—এগুলো সব পড়তাম, বুঝে অথবা না বুঝে। আমাদের বাসায়, কোনো আত্মীয়ের বাসায়, কোথাও দাওয়াতে গেলে যদি তাদের কোনো বই ইন্টারেস্টিং লাগত, সব পড়ে ফেলতাম। আরেকটু বড় হওয়ার পর ‘হ্যারি পটার’, ‘লর্ড অব দ্য রিংস’, ‘ক্রনিকলস অব নার্নিয়া’—এসব ইংলিশ সিরিজগুলো যুক্ত হলো। আমি সবকিছু পড়তাম। কারণ, সব ব্যাপারেই আমার কিছু আগ্রহ আছে। এখনো আমি ঘুমানোর আগে সব সময় কিছু না কিছু পড়ি। এখন আমি দ্য উইজার্ড অব আর্থসি নামে একটা নভেল পড়ছি। ওয়াটার ও অয়েল পেইন্টিং শিখেছি। রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলসংগীতও শিখিয়েছিলেন আমার আম্মু। যদিও গানের চর্চাটি আমি রাখিনি।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার স্কুল ছিল মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। ও-লেভেল/এ-লেভেল শেষ করে আপনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিন মর কলেজে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে গিয়েছেন। সেই সময়ের কথা আপনার মনে আছে কি? কী প্রক্রিয়ায় আপনি এই কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন?

বাংলাদেশি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী ড. তনিমা তাসনিম অনন্যা
ফাইল ছবি

অনন্যা: আমার জন্য তখন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল। কারণ, বাইরে অ্যাপ্লাই করতে ট্রান্সক্রিপ্ট লাগে, টিচারদের রিকমেন্ডেশন লাগে। আমাদের দেশে মূলত ও-লেভেল/এ-লেভেলের রেজাল্টটাই মুখ্য। কিন্তু এই অন্য ব্যাপারগুলো আমাদের স্কুলকে কীভাবে বোঝাব এবং এই রিকমেন্ডেশন নেওয়া—এসব খুবই কঠিন ছিল। আমি ও-লেভেল/এ-লেভেলে বেশ কয়েকটি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম, কিন্তু যখন এই সাহায্য দরকার ছিল, এসব বের করা বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু নিচের ক্লাসে মানারাতে আমাদের যে শিক্ষকেরা ছিলেন, তাঁরা আসলেই খুবই আন্তরিক ছিলেন। মানারাতের যে কম্পিউটার ল্যাব ও লাইব্রেরি ছিল, তা খুবই ভালো মানের। তাই আমি অনেক ধরনের বই পড়তে পেরেছি ও কোডিং নিজের মতো এক্সপ্লোর করতে পেরেছি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে কাদের ভূমিকা বেশি? তাঁরা আপনাকে কীভাবে এগোতে সহায়তা করেছেন?

অনন্যা: ছোট থাকতে আমার মামা মাহবুবুল হক আমাকে অঙ্ক ও বিজ্ঞান পড়াতেন। উনি সব সময় বিজ্ঞানবিষয়ক কোনো বই, মুভি ও গেমস পেলে নিয়ে আসতেন। সেটা আমার আগ্রহ বজায় রাখতে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। আবার বাংলাদেশে যেসব ফিজিকস, ম্যাথ ও কোডিংয়ের শিক্ষক ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা ছিল। যেমন মোহাম্মদপুরের জীবন স্যার, গুলশানের বিশ্বাস স্যার ও আমাদের কম্পিউটিংয়ের শিক্ষক নাজিবুল ফারুক আহসান স্যার।

দেশের বাইরে যাওয়ার পর আমি সরাসরি সহযোগিতা পেয়েছি অনেক বেশি, এ রকম সাহায্য করার চল আমাদের দেশে নেই। যেমন আমার প্রফেসররা বসে, সময় নিয়ে আমার কিসে আগ্রহ, কীভাবে এগোতে চাই—এগুলো শুনতেন। এর মধ্যে অন্যতম ব্রিন মরের প্রফেসররা এবং ইয়েলের ক্লডিয়া মেগান উরি ও ডার্টমাউথের রায়ান হিকক্স। তাঁরা তাঁদের নিজেদের অ্যাডভাইস দিতেন। এরপর সেটা নিয়ে নিজেরাও কাজ করতেন। যেমন কার সঙ্গে কাজ করলে ভালো হবে, এমন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন বা এমন কনফারেন্সে পাঠাতেন। এভাবেই ছাত্রছাত্রীদের সমর্থন দেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনি পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক ক্লডিয়া মেগান উরির অধীন। তিনি আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সভাপতি, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান এবং হাবল স্পেস টেলিস্কোপ অনুষদেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আপনাকে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে তুলতে কতটা ভূমিকা রেখেছেন?

অনন্যা: যেটা আগের উত্তরে বললাম, এতটা বড় পদে থেকেও তাঁর ব্যবহার খুবই নমনীয় ছিল। তিনি যখন বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলেন, তিনি পরোয়া করেন না, সেটা একটা কলেজের ছাত্রীর সঙ্গে বলছেন, নাকি একজন বড়মাপের প্রফেসরের সঙ্গে। একই রকম প্যাশন নিয়ে কথা বলেন। তাঁর সঙ্গে মিটিং করার সময় আমি দেখেছি অনেক ছাত্রছাত্রী এসে তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে যাচ্ছে। তারা ভালো কিছুতে চান্স পেয়েছে এবং প্রফেসর উরি তাদের কোনো সময় অনেক সাহস জুগিয়েছিলেন বা কোনো কিছুতে সাহায্য করেছিলেন। ওরা চলে গেলে উনি অনেক সময় মনেও করতে পারতেন না কখন সাহায্য করেছিলেন।

কারণ, উনি সবাইকেই এভাবে সাহায্য করেন। উনি আমার পাশে বসে পেপার লিখতে শিখিয়েছিলেন, অনেক অনেক ঘণ্টা সময় নিয়ে। কারণ, আমার অ্যানালাইসিস আমি ভালোমতো করতে পারতাম, কিন্তু আমি লিখতাম খুবই সংক্ষেপে। আমি রিসার্চ প্রেজেন্ট করার সময়ও কথা বলতাম অতি দ্রুত। আমি এ বছরের (২০২৬) শুরুর দিকেও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্লেনারি টক দিয়েছি এএএস মিটিংয়ে। এর আগে দুই ঘণ্টা বসে উনি আমার প্র্যাকটিস দেখেছেন, যদিও তাঁর অ্যাডভাইসে আমি পিএইচডি শেষ করেছি সাত বছর আগে। তিনি আমার রিসার্চ ক্যারিয়ারে সব সময় আমাকে সাপোর্ট দিয়েছেন।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

২০২০ সালে সায়েন্স নিউজ-এর দৃষ্টিতে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ১০ তরুণ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন আপনি। ক্যারিয়ারের শুরুতেই প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ বিজ্ঞানী হিসেবে এই স্বীকৃতি আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল?

অনন্যা: তখন আমি মাত্র পিএইচডি শেষ করেছি। একাডেমিক ক্যারিয়ারের ওই শুরুর সময়টায় নিজের কাজ বা গবেষণার গুরুত্ব নিয়ে মনে কিছুটা সংশয় ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সায়েন্স নিউজ-এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়াটা আমার মনে বিশাল সাহস জুগিয়েছিল। এটি আমাকে এই বিশ্বাস দিয়েছিল যে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে আমার করা কাজগুলো সত্যিই অর্থপূর্ণ এবং আমি সঠিক পথেই এগোচ্ছি।

বিজ্ঞানচিন্তা:

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আপনার নেতৃত্বে একটি গবেষণা দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে আপনারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর একটি মডেল তৈরি করেছিলেন, যার মাধ্যমে ব্ল্যাকহোলের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও ছায়াপথের ওপর তার প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। গবেষণাটি প্রকাশের পর আপনারা কী জানতে পারলেন? এরপরের গবেষণাগুলো আপনাদের কোথায় নিয়ে গেছে?

আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির (এএএস) আন্তর্জাতিক সেমিনারে অ্যাক্টিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস এবং ব্ল্যাকহোল নিয়ে নিজের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছেন বাংলাদেশি জ্যোতিঃপদার্থবিদ ড. তনিমা তাসনিম অনন্যা
ফাইল ছবি

অনন্যা: সেই গবেষণায় মূলত ব্ল্যাকহোলের চারপাশ থেকে নির্গত আলোর পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, যাতে কেবল ফোটন কণার সাহায্যে একটি সুনির্দিষ্ট হিসাবের মাধ্যমে বের করা যায় যে সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিক কতগুলো ব্ল্যাকহোল ছিল। পরবর্তী কাজগুলোতে আমরা শুধু আলোর পরিমাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিনি, বরং ব্ল্যাকহোলের পদার্থ গ্রাসের হার ও তাদের ভরের পরিমাপের মতো বিষয়গুলোর আরও গভীরে গিয়েছি। এর উদ্দেশ্য ছিল সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্ল্যাকহোলগুলো কতটা বিশালাকার বা ভারী ছিল, তা হিসাব করা, যা আমাদের ব্ল্যাকহোলের নিকটবর্তী অঞ্চলের ভৌত বাস্তবতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও গভীর ধারণা দিয়েছে। বর্তমানে আমার কাজের পরিধিতে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ধরনের প্রকল্প রয়েছে। যেমন চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরির পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে অত্যন্ত ক্ষীণ বা আবছা ব্ল্যাকহোলের সমষ্টি নিয়ে গবেষণা করা, লিটল রেড ডটস নামে একটি নতুন মহাজাগতিক ঘটনা নিয়ে কাজ করা এবং একই সঙ্গে আগে বর্ণিত গবেষণাগুলো এগিয়ে নেওয়া।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

ব্ল্যাকহোল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কোন প্রশ্নটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়?

অনন্যা: সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলগুলো যে গ্যালাক্সিতে অবস্থান করে, তার সঙ্গে কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করে ও কীভাবে তাদের সহবিবর্তন ঘটে, তা এখনো অনেক অস্পষ্ট। এই সংযোগ বা সম্পর্কগুলোকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারাটা অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? স্যাজিটেরিয়াস এ* নিয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বড় রহস্য কী?

অনন্যা: মূলত দুটি কারণে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল অনেক কৌতূহলের বিষয়বস্তু। প্রথমত হলো—প্রায় প্রতিটি বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই একটি করে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল থাকে। এরা কেবল মহাজাগতিক দানব হিসেবে নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকে না, বরং এদের থেকে নির্গত শক্তি চারপাশের পুরো গ্যালাক্সির নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক গঠনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ব্ল্যাকহোল ও তার মাতৃ-গ্যালাক্সির এই একসঙ্গে বেড়ে ওঠাকে আমরা সহবিবর্তন বলি, যা গ্যালাক্সির ইতিহাস বুঝতে অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত হলো—এই ব্ল্যাকহোলগুলোর প্রচণ্ড কার্ভেচার।

অত্যন্ত তীব্র মহাকর্ষীয় টানের কারণে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ও চরম পারিপার্শ্বিকতায় পদার্থের ভৌত আচরণ পরীক্ষা করার জন্য এই ব্ল্যাকহোলগুলো প্রকৃতির তৈরি সবচেয়ে বড় ল্যাবরেটরি। স্যাজিটেরিয়াস এ* হচ্ছে আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। এটার আশপাশে যত তারা ও গ্যাস ক্লাউড আছে, এগুলোর খুবই নিখুঁতভাবে ম্যাপ করা হয় অবজারভেশন থেকে। আমাদের গ্যালাক্সির এক্স–রে ও গামা–রে ম্যাপ দেখলেই বোঝা যায়, অতীতে এটা থেকে অনেক আলো নির্গত হতো, মানে এটা অ্যাকটিভ ছিল, এখন এটা ঘুমিয়ে আছে। এটা আবার কখন অ্যাকটিভ হবে, কীভাবে আশপাশের তারাগুলোকে খাচ্ছে—এসব ব্যাপারে এখন অনেক গবেষণা চলছে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার গবেষণার এমন কোনো ফলাফল আছে কি, যা পাওয়ার পর আপনি ও আপনার গবেষণা দল চমকে গিয়েছিলেন?

অনন্যা: এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও বর্তমানে চলমান একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়—জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এমন এক বিশাল সমষ্টির সন্ধান পেয়েছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানে লিটল রেড ডটস নামে পরিচিত। এগুলো মূলত ব্ল্যাকহোলই হওয়ার কথা। কারণ, এত ক্ষুদ্র একটি পরিসরের মধ্যে এগুলো অত্যন্ত ভারী বস্তু। তাই এদের ব্ল্যাকহোল হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সাধারণ ব্ল্যাকহোল কিংবা সক্রিয় গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াইয়ের মতো এরা খুব একটা এক্স–রে নির্গমন করে না। সাধারণত এক্স–রে তরঙ্গের নির্গমনকেই ব্ল্যাকহোলের উপস্থিতির প্রধান সুনির্দিষ্ট লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই এক্স–রে তরঙ্গে যখন আমরা এই লিটল রেড ডটস বস্তুগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলাম, তখন সেই ফলাফলটি আমাদের পুরো গবেষণা দলের জন্য ভীষণ চমকপ্রদ ছিল।

বিজ্ঞানচিন্তা:

অ্যাকটিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস নিয়ে গবেষণা আমাদের মহাবিশ্বকে বুঝতে কীভাবে সাহায্য করছে?

আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির আন্তর্জাতিক সেমিনারে অ্যাক্টিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস এবং ব্ল্যাকহোল নিয়ে নিজের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছেন বাংলাদেশি জ্যোতিঃপদার্থবিদ ড. তনিমা তাসনিম অনন্যা
ছবি: করপোরেট ইভেন্ট ইমেজ/ফিল ম্যাককার্টেন ২০২৬

অনন্যা: ছায়াপথ ও ব্ল্যাকহোলের সহবিবর্তন নিয়ে আগের প্রশ্নগুলোতে বলেছি। আরও একটি ব্যাপার হচ্ছে কীভাবে প্রথম ব্ল্যাকহোলগুলোর উৎপত্তি হলো। এ বিষয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি অন্যতম বড় ধাঁধা। যেমন সাম্প্রতিক জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণগুলো এটি আরও স্পষ্ট করেছে। আদিমতম দূরবর্তী অ্যাকটিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াসগুলো পর্যবেক্ষণ করে আমরা মূলত ব্ল্যাকহোলের আদি উৎস জানার চেষ্টা করছি। এই সিডিং প্রক্রিয়াটি কীভাবে শুরু হয়েছিল—প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্রগুলোর মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া ছোট বীজ থেকে, নাকি বিশাল গ্যাস মেঘের সরাসরি পতনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ভারী বীজ থেকে? সুদূর অতীতের অ্যাকটিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াসগুলোর ভর ও উজ্জ্বলতা মেপে আমরা এই আদি বীজের মডেলগুলোকে সংকুচিত ও নিখুঁত করতে পারি, যা মহাবিশ্বের প্রথম দিকের কাঠামোগত গঠনের ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে।

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে এপক অব রিআয়নাইজেশন। বিগ ব্যাংয়ের প্রায় ৪০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন বছর পরের এই সময়ে মহাবিশ্বের প্রথম নক্ষত্র ও গ্যালাক্সিগুলো থেকে নির্গত তীব্র বিকিরণ চারপাশের আদিম নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন গ্যাসকে আয়নিত করতে শুরু করে। ফলে মহাবিশ্ব প্রথম আলোকময় ও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় আদি যুগের তীব্র উজ্জ্বল অ্যাকটিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াসগুলোর ভূমিকা কী ছিল, তা বুঝতে এদের নিয়ে গবেষণা অপরিহার্য। অ্যাকটিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত অতিবেগুনি ও এক্স–রে ফোটন কণা চারপাশের ইন্টারগ্যালাকটিক মিডিয়ামকে কতটা আয়নিত ও উত্তপ্ত করেছিল, তার নিখুঁত হিসাব আমাদের এই কসমিক টাইমলাইনের একটি স্পষ্ট চিত্র দেয়।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল-এ ইয়ার ইন রিভিউতে আপনার গবেষণাপত্র অন্যতম জনপ্রিয় ও সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া গবেষণাপত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এমন প্রভাবশালী গবেষণা করতে হলে আসলে কী দরকার হয়?

অনন্যা: আসলে কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, তা আমরা সব সময় আগে থেকে বলতে পারি না, আর কোনো ক্যারিয়ারের পথ বেছে নেওয়ার জন্য হয়তো এটা সেরা উপায়ও নয়। এটা অনেকটা হিট গান কিংবা বেস্টসেলার বই কীভাবে লিখতে হয়, তা আগে থেকে জেনে লেখার মতো। আমি মনে করি, আপনার এমন একটা বিষয় বেছে নেওয়া উচিত, যা আপনাকে সত্যি আনন্দ দেয় বা টানে এবং এমন একটা পদ্ধতি তৈরি করা দরকার, যা আপনার মনকে ধরে রাখতে পারে, যেন আপনি গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজটি করতে পারেন। এর পরের কাজটা হলো শুধু নিজের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করে যাওয়া।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার গবেষণা বলছে, ব্ল্যাকহোলকে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধুলার আড়াল শুধু একটি পর্দা নয়, বরং ব্ল্যাকহোলের প্রকৃতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। এই ধারণা কীভাবে আমাদের ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিতে পারে?

অনন্যা: আমাদের নতুন আবিষ্কারটি হলো একটি ব্ল্যাকহোলের পদার্থ গ্রাসের হারই নির্ধারণ করে যে তার চারপাশে ঠিক কতটা পরিমাণ পদার্থ জমা বা পুঞ্জীভূত হতে পারবে। এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যাখ্যা। কারণ, অতীতে ধারণা করা হতো যে ব্ল্যাকহোলের চারপাশে পদার্থ কীভাবে বিন্যস্ত হবে, তা নির্গত আলোর মোট বা পরম পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয়। আমাদের গবেষণাটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেছে, আসল নিয়ন্ত্রক শক্তিটি মূলত ব্ল্যাকহোলের পদার্থ গ্রাসের হার। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, যার ফলে প্রচলিত তাত্ত্বিক মডেল ও সিমুলেশনগুলোকে নতুন করে সংশোধন করতে হবে, যেন সেখানে পদার্থ গ্রাসের হারকে আরও বেশি মৌলিক চলক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তা ছাড়া ব্ল্যাকহোলের একদম কাছাকাছি অঞ্চলে পদার্থ কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে পুরো গ্যালাক্সির সঙ্গে ওই ব্ল্যাকহোলের মিথস্ক্রিয়া বা পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আগামী ১০ বছরে ব্ল্যাকহোল গবেষণায় সবচেয়ে বড় অগ্রগতি কোথায় হতে পারে বলে মনে করেন?

অনন্যা: ২০২৫-এর আগের ধারাবাহিকতা যদি বজায় রাখা যায়, তাহলে আগামী ১০ বছর ব্ল্যাকহোল গবেষণার জন্য একটি প্রকৃত স্বর্ণযুগ হতে পারে। আমরা এখন একক কোনো ব্ল্যাকহোল পর্যবেক্ষণের গণ্ডি পেরিয়ে মহাজাগতিক পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণার যুগে প্রবেশ করছি। বেশ কিছু অনুমোদিত ও আসন্ন ফ্ল্যাগশিপ মহাকাশ মিশন এই অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি হবে। আগামী বছরগুলোতে নাসার অনুমোদিত ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ যখন পুরোদমে কাজ শুরু করবে, তখন এর ওয়াইড ফিল্ড ইনফ্রারেড ইমেজিং ক্ষমতার সাহায্যে আমরা আদি মহাবিশ্বের এক বিশাল অঞ্চলের ম্যাপ তৈরি করতে পারব।

আসন্ন ভেরা সি রুবিন অবজারভেটরির লার্জ সিনোপটিক সার্ভে টেলিস্কোপও আগামী দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পুরো দৃশ্যপট বদলে দেবে। প্রতি কয়েক রাত পরপর পুরো দক্ষিণের আকাশ স্ক্যান করে এটি কোটি কোটি মহাজাগতিক বস্তুর পরিবর্তনশীলতা ট্র্যাক করবে। এই বিপুল পরিমাণ ডেটা থেকে আমরা লাখ লাখ সক্রিয় ব্ল্যাকহোলের একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান পাব। এর মাধ্যমে ব্ল্যাকহোলগুলো কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ফিডিং রেট পরিবর্তন করে, কীভাবে তাদের চারপাশের গ্যাস ও ধুলার আস্তরণ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তা কীভাবে মাতৃ–গ্যালাক্সির বিবর্তনকে প্রভাবিত করে, তার একটি নিখুঁত বৈজ্ঞানিক রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার মতে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্য কোনটি?

বাংলাদেশি জ্যোতিঃপদার্থবিদ ড. তনিমা তাসনিম অনন্যা
ছবি: করপোরেট ইভেন্ট ইমেজ/ফিল ম্যাককার্টেন ২০২৬

অনন্যা: এমন অসংখ্য রহস্য আছে! একদম প্রথম নক্ষত্রগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল? তারা কি সত্যিই অত্যন্ত বিশালকায় ছিল? প্রথম ব্ল্যাকহোলগুলো কীভাবে গঠিত হয়েছিল? পৃথিবীর বাইরে কি প্রাণের অস্তিত্ব আছে? তারা কি আমাদের মানবপ্রজাতির জীবদ্দশার মধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমান, নাকি তারা কেবল সুদূর অতীতেই কোনো একসময়ে অস্তিত্বশীল ছিল? আমরা কি আমাদের যাতায়াতযোগ্য দূরত্বের মধ্যে কোনো বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে পাব?

বিজ্ঞানচিন্তা:

জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে আপনার চিন্তায় কি সারাক্ষণ গবেষণার বিষয়গুলোই ঘুরতে থাকে, নাকি গবেষণার জন্য আপনাকে খাতা-কলম বা কম্পিউটারের সামনে বসতে হয়?

অনন্যা: আমি যে বিষয়টিতেই গভীরভাবে মনোযোগ দিই, সেটি আমার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরপাক খেতে থাকে। এমনকি মনোযোগের মাত্রা যখন অনেক বেশি থাকে, তখন আমি সেসব নিয়ে স্বপ্নও দেখি। কোনো প্রজেক্টের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ও মগ্ন থাকার মতো অংশে যখন আমি থাকি, সাধারণত তখনই এমনটা ঘটে। আর যখন তেমন পরিস্থিতি থাকে না, তখন আমি আমার গবেষণার বাইরেও প্রচুর পড়াশোনা করার চেষ্টা করি, যেন আমি কেবল অন প্রোগ্রাম রেডিওর মতো একঘেয়ে চিন্তাভাবনা না করি। তাই তখন সেই বাইরের বিষয়গুলোও আমার চিন্তাভাবনায় সমানভাবে ঘুরে বেড়ায়। অন্য বিষয় নিয়ে পড়াশোনা আসলে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গবেষণাতেই কাজে দেয়, অন্যভাবে একটা সমস্যা ভাবতে সাহায্য করে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার গবেষণার সহযোগী কারা? কোন কোন বিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করেছেন? তাঁদের সঙ্গে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

অনন্যা: যাঁদের নিয়ে ওপরে বলেছি, তাঁদের ছাড়াও ইয়েলের প্রিয়া নটরাজন, স্মিথসোনিয়ানের আকোশ বগদান, মায়ামির নিকু ক্যাপেলুতি, চিলির এজেকিয়েল ত্রাইস্তার—এ রকম অনেকের সঙ্গেই কাজ করি। তাঁরা সবাই খুবই শ্রদ্ধাশীল ও সাহায্যপরায়ণ।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে কী করা উচিত বলে মনে করেন?

অনন্যা: আমার মনে হয় তরুণদের মধ্যে অনেক উৎসাহ ও আগ্রহ রয়েছে। এখন যা প্রয়োজন, তা হলো একটি উপযুক্ত অবকাঠামো, যাতে তাঁরা প্রয়োজনীয় উপাত্ত সহজে পেয়ে মৌলিক গবেষণা করতে পারেন। এলএসএসটির মতো আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত বড় বড় টেলিস্কোপ প্রকল্পে আমাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন অথবা অন্তত এমন ফান্ডের ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ডেটা সংগ্রহ এবং তা বিশ্লেষণ করার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত কম্পিউটার ক্লাস্টার থাকে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার মতে, সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী কে? কেন?

অনন্যা: খুবই কঠিন প্রশ্ন। যাঁদের সবাই চেনেন, যেমন আইনস্টাইন, নিউটন, গ্যালিলিও—তাঁরা তো আছেনই, সেই সঙ্গে পুরোনো অনেকেই আছেন, যাঁরা সঠিক মূল্যায়ন পান না, যেমন আল-খাওয়ারিজমি, যিনি বীজগণিত আবিষ্কার করেছিলেন। পাউলি ও ডিরাক—তাঁরাও ছিলেন, কিন্তু তাঁরা আইনস্টাইনের মতো এতটা পাবলিক ফিগার ছিলেন না। আরও আছেন সিসিলিয়া পেইন গাপোশকিন, যিনি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন যে সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে গঠিত। অ্যানি জাম্প ক্যানন, যিনি তারকাদের বর্ণালি শ্রেণিবিন্যাসের আধুনিক পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। জেসিলিন বেল বার্নেল, যিনি প্রথম রেডিও পালসার আবিষ্কার করেছিলেন। ভেরা রুবিন আবিষ্কার করেছিলেন গ্যালাক্সির ঘূর্ণন গতি পর্যবেক্ষণ করে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তুর অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ। রিচার্ড ফাইনম্যানের বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর নিখাদ ভালোবাসার ওপর লেখা বইগুলো, যেমন শিউরলি ইউ আর জোকিং, মিস্টার ফাইনম্যান! এটা আমার একটা পড়ার রিকমেন্ডেশন। এ ছাড়া ইউটিউবে তাঁর অনেক লেকচারের ভিডিও আছে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার কি মনে হয় মানুষ ভবিষ্যতে থিওরি অব এভরিথিং আবিষ্কার করতে পারবে?

অনন্যা: এমন কিছু তত্ত্ব আছে, যেমন স্ট্রিং থিওরি, যা ঠিক এই কাজটিই করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্যা হলো এই তত্ত্বগুলো পরীক্ষা করা মারাত্মক কঠিন বা প্রায় অসম্ভব। আপনি যদি পরীক্ষা করে প্রমাণই করতে না পারেন যে একটি চমৎকার তত্ত্ব সত্যি কি না, তবে সেটি বাস্তব কি না, তা বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে আমাদের পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা যদি কখনো আমাদের তাত্ত্বিক কাঠামোর সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তখন হয়তো আমরা সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারব, তবে আমার মনে হয় এতে আরও বেশ কিছু সময় লাগবে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আমাদের এসব জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চার কি কোনো গন্তব্য আছে? হাজার হাজার বছর ধরে আমরা আসলে কী খুঁজছি?

অনন্যা: এটি খুবই চমৎকার একটি প্রশ্ন। দেখুন, ২০১২ সালে যখন হিগস বোসন আবিষ্কৃত হয়, তখন আমি সার্নে ছিলাম। একজন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী হিসেবে আমি তখন খুবই অনুপ্রাণিত। কিন্তু তখন বাংলাদেশের অনেকেই প্রশ্ন করছিলেন, ‘আচ্ছা, হিগস বোসন নামের কণাটির অস্তিত্ব আছে কি নেই, তা জেনে আমার বাস্তব জীবনে কী লাভ? কিংবা এতে আমার কী প্রভাব পড়বে?’ মহাকাশ নিয়ে পড়ার কারণে আমি এ রকম প্রশ্ন অনেক পেয়েছি। বাস্তবতা হলো দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সাবান প্রয়োজন হলেও আমরা তো আর মহাবিশ্বের সবকিছু দিয়ে সাবান বানাতে পারি না এবং হয়তো প্রতিটা জিনিস দিয়ে সাবান বানানোর চেষ্টাও ঠিক নয়। চিন্তার পরিধি বাড়িয়ে সাবানের বাইরেও যে কিছু আছে, সেটা উপলব্ধি করতে চেষ্টা করা উচিত।

মাইকেল ফ্যারাডে যখন প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন যে বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় ইন্ডাকশন কীভাবে কাজ করে, তিনি কিন্তু তৎক্ষণাৎ এয়ারকন্ডিশনারের কথা ভাবেননি। অথচ আজ এসি চালাতে আমাদের সেই বিদ্যুতেরই প্রয়োজন হয়। প্রকৃতি কীভাবে কাজ করছে, সেটাই ছিল তাঁর মূল আগ্রহ। আমরা যখন কোনো কিছুর কার্যপদ্ধতি একবার জেনে যাই, তখন পরবর্তী সময় সেটাকে আমাদের নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে পারি। আমরা কেন বিজ্ঞান চর্চা করি, তা নিয়ে রিচার্ড ফাইনম্যানের একটি বেশ মজার উক্তি আছে, যদিও সেটি হয়তো এখানে ছাপার অক্ষরে হুবহু প্রকাশ করার মতো নয়। চন্দ্রাভিযানের মহাকাশযান তৈরির উদ্দেশ্যে একসময় নাসা জয়স্টিক ও এলইডি লাইটের মতো জিনিস উদ্ভাবণ করেছিল, যা পরবর্তী সময় আমাদের জীবনে কত ভিন্ন ও বহুমুখী উপায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। আসলে মনে নতুন প্রশ্ন জাগা ও চারপাশের রহস্যগুলোর জট খোলার চেষ্টা করাটাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি আর ঠিক এ কারণেই আমরা জ্ঞানবিজ্ঞানের পেছনে ছুটে চলি।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

বিজ্ঞান জার্নালের বাইরে ফিকশন পড়ার সময় পান? আপনার প্রিয় লেখক কারা এবং প্রিয় বই কোনগুলো?

ড. তনিমা তাসনিম অনন্যা
ফাইল ছবি

অনন্যা: আমি অনেক ফিকশন পড়ি। যেগুলো ওপরে বলেছি, তা ছাড়া হুইল অব টাইম, অ্যানভিল অব দ্য ওয়ার্ল্ড, কিং কিলার ক্রনিকলস—এই সিরিজগুলো আমি পছন্দ করি। ড্যাফনি ডু মরিয়ার, রোয়াল্ড ডাহল—এঁদের ছোটগল্পগুলোও অনেক ভালো লাগে। আমি প্রায় প্রতিবছর লর্ড অব দ্য রিংস পুরোটা একবার দেখি। জুরাসিক পার্ক, ইটি, মাইনরিটি রিপোর্ট, দ্য প্রেস্টিজ—এ রকম সায়েন্স ফিকশনগুলো অনেকবার দেখেছি। আমি জানি না কেন, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এ রকম ফিকশন অনেক জনপ্রিয়। পিএইচডি করার মুহূর্তে এমনও সময় গেছে, যখন আমার ক্লাসমেটদের সঙ্গে এগুলোর ডায়ালগ দিয়েই কথা বলতাম অনবরত।

বিজ্ঞানচিন্তা:

এমন একটি বইয়ের নাম বলুন, যে বইটা সবার পড়া উচিত?

অনন্যা: আমি তা-নেহিসি কোটসের দ্য মেসেজ বইটি পড়ার পরামর্শ দেব। কারণ, এটি একটি ছোট বই, যা অত্যন্ত সংক্ষেপে ও একাধিক প্রেক্ষাপটে নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে। পাশাপাশি সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ঘটনাবলির একটি দ্রুত ঐতিহাসিক সারসংক্ষেপও দেয়। এটি কোনো বিজ্ঞানের বই নয়। তবে আমি তো ইতিমধ্যেই ফাইনম্যানের বিজ্ঞানবিষয়ক বইগুলোর কথা বলেছি, যেগুলো হয়তো আমার ডিসকাশনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।

বিজ্ঞানচিন্তা:

যাঁরা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী হতে চান, তাঁদের জন্য আপনার পরামর্শ কী? তাঁদের কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?

অনন্যা: অঙ্ক ও কোডিং প্র্যাকটিস করবে। যে সাবজেক্ট নিয়ে আগ্রহী, সেটা নিয়ে অনেক পড়াশোনা করবে। এর বাইরের অনেক টপিক নিয়েও পড়াশোনা করবে। এআই ব্যবহার করবে শিক্ষার উদ্দেশ্যে, হোমওয়ার্ক করিয়ে নিতে নয়।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

বাংলাদেশের কোনো শিক্ষার্থী যদি আপনার সঙ্গে গবেষণা করতে চান, তাহলে সেটা কি সম্ভব? তাঁকে কী করতে হবে?

অনন্যা: আমি যে প্রথম পিএইচডি স্টুডেন্ট নিয়েছি, একজন বাংলাদেশি স্টুডেন্টই নিয়েছি এবং অনেক বছর ধরে বাংলাদেশি কলেজ স্টুডেন্টদের সঙ্গে Wi-STEM-এর মাধ্যমে কাজ করেছি। যদি কেউ সত্যি খুব আগ্রহী থাকে ও স্কিলড হয়, আমি তাদের গবেষণার প্রজেক্ট দিতে চেষ্টা করি। কিন্তু আমি অনেক ই–মেইল পাই এবং যারা বারবার চেষ্টা করে, দেখা যায় শুধু তাদের সঙ্গেই কাজ করা হয়ে ওঠে। আমার যে স্টুডেন্ট আছে, তারাও বাংলাদেশি স্টুডেন্টদের সঙ্গে কাজ করে, তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।

বিজ্ঞানচিন্তা:

বিজ্ঞানচিন্তার বেশির ভাগ পাঠক কিশোর-তরুণ। তাঁদের জন্য কিছু বলুন।

অনন্যা: পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এমন কিছু করার চেষ্টা করো, যা তোমাকে গভীরভাবে টানে। বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা মাথায় রেখে হয়তো এমন একটি ক্ষেত্র বেছে নেওয়া যায়, যেটিতে প্রচুর ট্রান্সফারেবল স্কিল আছে এবং যার প্রতি তোমার সত্যিকারের ভালোবাসা রয়েছে।

তোমাদের অভিভাবকদের উদ্দেশে বলছি; কারণ, অনেক মা–বাবা এটি সব সময় উপলব্ধি করতে পারেন না। তাঁদের বুঝিয়ে বলো যে সমাজের অনেক মানুষ হয়তো তোমার কোনো সিদ্ধান্ত বুঝবে না বা সমর্থন করবে না, কিন্তু শুধু নিজের পরিবারের সমর্থন একজন মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। ছেলেমেয়ে, অভিভাবকসহ সবারই ফোন রেখে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো উচিত। সবশেষে নিজের কাছের বন্ধুদের সার্কেলটি এমন রাখতে চেষ্টা করবে, যেটা শ্রদ্ধাশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ হয়।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: আহমাদ মুদ্দাসসের

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন