বিশ্বজুড়ে গণিতবিদেরা কেন কাঁদছেন

গণিতের বিভিন্ন তত্ত্বকে কিছু মৌলিক স্বীকার্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্টছবি: দ্য অবজার্ভার

গণিতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের কৌতূহল, আবিষ্কারের আনন্দ, বছরের পর বছর সাধনা আর তীব্র আবেগ। এটি কেবল সংখ্যা, সূত্র বা খটমটে সমীকরণ নয়। একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান ঠিক হলো কি না, তা হয়তো মানুষের কান্না বা হাসি দিয়ে বোঝার কোনো উপায় নেই। অথচ সম্প্রতি বিশ্বের নামকরা গণিতবিদেরা কেউ কেউ হতাশায় কেঁদেছেন, কেউ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ বুঝেই উঠতে পারছেন না যে এত দিনের চেনা জগতে তাঁদের আসল জায়গাটা এখন কোথায়! গণিতের জগতে এমন আবেগঘন ও হতাশাজনক পরিস্থিতির কারণ মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর ওপেনএআই এমন এক এআই মডেল থেকে পাওয়া শত শত গাণিতিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে, যা গণিতের জগতে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এসব গবেষণাপত্রে ছিল ৩৭২টি জটিল গাণিতিক সমস্যার প্রমাণ। এসব সমস্যার কোনোটি সমাধানের চেষ্টা চলেছে কয়েক দশক ধরে, আবার কোনোটি কয়েক শতাব্দী ধরে গণিতবিদদের চিন্তায় ফেলেছে। প্রকাশিত ৭২২টি পাণ্ডুলিপির মধ্যে পরে তিনটি প্রত্যাহার করা হয়। এত দিন যেসব সমস্যার সমাধান খুঁজতে গবেষকেরা তাঁদের জীবনের একটা বড় সময় ব্যয় করেছেন, তার অনেকগুলোরই নির্ভুল সমাধান হাজির করেছে এই এআই। কোথাও সময় লেগেছে কয়েক ঘণ্টা, কোথাও-বা কয়েক দিন।

এ ঘটনায় ভীষণ বিস্মিত হয়েছেন বিশ্বের তাবড় গণিতবিদেরা। তবে এই বিস্ময়ের সঙ্গে মিশেছে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা আর গভীর এক শূন্যতার অনুভূতি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, যন্ত্র যদি এত দ্রুত কঠিন সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে, তাহলে গণিতবিদদের এত দিনের সাধনা, তাঁদের গবেষণা আর ভবিষ্যতই-বা কী হবে?

আরও পড়ুন
গবেষণাপত্রে ছিল ৩৭২টি জটিল গাণিতিক সমস্যার প্রমাণ। এসব সমস্যার কোনোটি সমাধানের চেষ্টা চলেছে কয়েক দশক ধরে, আবার কোনোটি কয়েক শতাব্দী ধরে গণিতবিদদের চিন্তায় ফেলেছে।

যে হতাশা সামনে আনল বড় প্রশ্ন

২০২২ সালে গণিতের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল পেয়েছিলেন ফরাসি গণিতবিদ হুগো দুমিনিল-কোপাঁ। ওপেনএআইয়ের এই সাফল্যের খবর শুনে তিনি এতই হতাশ হয়ে ডুকরে কেঁদেছিলেন যে তাঁর কান্নার শব্দে মেয়ের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল! নিজের গবেষণাক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মন্তব্য ছিল, ‘তারা আমার গবেষণাক্ষেত্রটাই ধ্বংস করে দিয়েছে।’

কথাটা শুনে মনে হতে পারে, একজন গণিতবিদের আত্মমর্যাদায় বুঝি বড় কোনো আঘাত লেগেছে। এত বছর ধরে যে সমস্যার সমাধান নিজে খুঁজছেন, অন্য কেউ এসে তা করে ফেললে মন খারাপ হতেই পারে। কিন্তু বিষয়টা কি কেবল নিজের কাজের স্বীকৃতি হারানোর ভয়?

আরও পড়ুন
নিজের গবেষণাক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ফরাসি গণিতবিদ হুগো দুমিনিল-কোপাঁর মন্তব্য ছিল, ‘তারা আমার গবেষণাক্ষেত্রটাকেই ধ্বংস করে দিয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ স্টিভেন স্ট্রোগাটজের কথায় পাওয়া যায় আরও গভীর কিছুর ইঙ্গিত। গণিত নিয়ে একাধিক চমৎকার বই লিখেছেন তিনি। এআইয়ের সাম্প্রতিক সাফল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনিও কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তাঁর মনে হয়েছে, গণিতবিদেরা এত দিন নিজেদের এমন মানুষ হিসেবে ভাবতে পেরেছেন, যাঁরা নতুন কিছু আবিষ্কার করেন, কঠিন সমস্যার সমাধান বের করেন এবং সেই আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবীকে নতুন কিছু উপহার দেন। এখন তাঁদের সেই পরিচিতিটাই যেন বদলে যাচ্ছে।

স্ট্রোগাটজের কাছে এই পরিবর্তনটি একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর ও ভীতিকর। কখনো তিনি নতুন সম্ভাবনা দেখে উত্তেজিত হন, কখনো আবার দিশাহারা বোধ করেন। আবার কখনো অনুভব করেন গভীর শোক। কারণ, গণিতবিদদের কাছে একটি সমস্যার সমাধান কেবল সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের চেষ্টা, ব্যর্থতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং অন্য গবেষকদের সঙ্গে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার অমূল্য অভিজ্ঞতা।

আরও পড়ুন
শুরুতে এই নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের সমাধান উপস্থাপন নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল। অনেকের কাছে প্রমাণটি দুর্বোধ্য মনে হয়েছিল। কেউ কেউ একে এআই স্লপ বলেও আখ্যা দেন।

কয়েক ঘণ্টায় সমাধান, কয়েক দশকের সাধনা

গণিতের কঠিন সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো নেভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ। তরল ও গ্যাসের প্রবাহ বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত সমীকরণের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রায় এক শতাব্দী ধরে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক প্রশ্নের সমাধান খুঁজছিলেন গবেষকেরা।

গত মাসে ওপেনএআই দাবি করে, তাদের অভ্যন্তরীণ এআই মডেলটি এই সমীকরণের সমাধান করেছে মাত্র ৮৮ ঘণ্টায়! নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যা মূলত ২০০০ সালে ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউট ঘোষিত সাতটি ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ’ সমস্যার একটি। প্রতিটি সমস্যার সমাধানের জন্য এক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার নির্ধারিত রয়েছে। ওপেনএআইয়ের দেওয়া সমাধান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছিল। ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউটও স্বীকার করেছে, মডেলটি সমস্যাটির সমাধান করে থাকতে পারে।

শুরুতে এই সমাধানের উপস্থাপন নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল। অনেকের কাছে প্রমাণটি দুর্বোধ্য মনে হয়েছিল। কেউ কেউ একে ‘এআই স্লপ’ বলেও আখ্যা দেন। কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে যখন শত শত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো, তখন বিষয়টি আর শুধু সমস্যার সমাধানে সীমাবদ্ধ থাকল না। বিপুলসংখ্যক সমস্যার সমাধান সামনে আসায় গণিতবিদেরা বুঝতে পারলেন, তাঁদের কাজের জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন
নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যা মূলত ২০০০ সালে ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউট ঘোষিত সাতটি মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যার একটি। প্রতিটি সমস্যার সমাধানের জন্য এক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার নির্ধারিত রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গণিতের অধ্যাপক কেভিন বাজার্ডের কথায়, ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটিকে পাঁচ অঙ্কের দুটি সংখ্যা গুণ করতে বললেও সেটি ভুল করে বসত। সেই প্রযুক্তিই এত অল্প সময়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যে বহু বছরের গবেষণার সমস্যার সমাধান চোখের পলকে হাজির করছে! এআইয়ের কাজ করার পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন, এমন গবেষকদের কাছেও এর উন্নতির গতি রীতিমতো বিস্ময়কর। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের প্রধান লেসলি অ্যান গোল্ডবার্গও বলেছেন, এআইয়ের আগের দুর্বলতা দেখে তিনি বুঝতে পারেননি যে প্রযুক্তিটি এত দ্রুত উন্নতি করতে পারে।

এই পরিবর্তন গণিতবিদদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ভবিষ্যতে গবেষকেরা কি নিজেরা সমস্যার সমাধান খোঁজার বদলে শুধু এআইয়ের দেওয়া প্রমাণ যাচাই করবেন? নতুন গণিতবিদেরা কী শিখবেন? যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে বছরের পর বছর কাজ করতেন একজন গবেষক, সেটি যদি যন্ত্র কয়েক ঘণ্টায় সমাধান করে দেয়, তাহলে তাঁর কাজের ধরন কীভাবে বদলাবে?

আরও পড়ুন
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের প্রধান লেসলি অ্যান গোল্ডবার্গও বলেছেন, এআইয়ের আগের দুর্বলতা দেখে তিনি বুঝতে পারেননি যে প্রযুক্তিটি এত দ্রুত উন্নতি করতে পারে।

গণিত কি শুধু সমস্যার সমাধান

এআইয়ের সাফল্য নিয়ে অবশ্য সব গণিতবিদের প্রতিক্রিয়া এক রকম নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্কাস দু সতোয় এআই নিয়ে একই সঙ্গে রোমাঞ্চিত ও কিছুটা শঙ্কিত। সম্প্রতি এআইয়ের সাহায্যে তিনি এমন একটি অনুমান ভুল প্রমাণ করেছেন, যা তাঁর পিএইচডি তত্ত্বাবধায়ক ১৯৮৬ সালে করেছিলেন। তাঁর মতে, এআই তাঁর গবেষণাকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে।

এআইয়ের বড় সুবিধা হলো, এটি মানুষের বিপুলসংখ্যক গবেষণার ফল একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারে এবং বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া ধারণার মধ্যে সংযোগ খুঁজে বের করতে পারে। তবে মানুষের তৈরি ধারণাগুলোকে একত্র করে কাজে লাগানো আর যন্ত্রের নিজস্ব নতুন ধারণা তৈরি করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

অক্সফোর্ডের গণিতবিদ জেমস মেনার্ড মনে করেন, অদূরভবিষ্যতে এআই নিজেই বড় গাণিতিক তত্ত্ব তৈরি করতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। এই সম্ভাবনা যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, তেমনি বেশ উদ্বেগেরও। তাঁর মতে, এআই গণিতের অগ্রগতি দ্রুততর করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তিটি যেসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তৈরি হচ্ছে, তাদের স্বার্থের সঙ্গে গণিতচর্চার দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যের বড় অমিল রয়েছে।

এখানে গণিতের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। গণিতের কাজ কি শুধু সমস্যার সমাধান করা, নাকি সেই সমাধানের মধ্য দিয়ে মানুষকে কোনো বিষয় আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করা?

আরও পড়ুন
এআইয়ের বড় সুবিধা হলো, এটি মানুষের বিপুলসংখ্যক গবেষণার ফল একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারে এবং বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া ধারণার মধ্যে সংযোগ খুঁজে বের করতে পারে।

লেসলি অ্যান গোল্ডবার্গ মনে করেন, গণিতের মূল উদ্দেশ্য মানুষের বোঝাপড়া বাড়ানো। তাই তিনি নিজে এআইকে দিয়ে সমস্যার সমাধান করিয়ে সেই ফল প্রকাশ করার কাজে যুক্ত হতে চান না। তাঁর বক্তব্য, তিনি টাইপিস্ট নন; শুধু এআইকে প্রশ্ন করে তার দেওয়া উত্তর জানিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করার কোনো অর্থ দেখেন না তিনি।

একটি সমস্যার সঠিক উত্তর পাওয়া আর উত্তরটি কেন সঠিক, তা গভীরভাবে বুঝতে পারা কি একই ব্যাপার? এআই কোনো সমাধান হাজির করলে সেটি যাচাই করা, তার যুক্তি বোঝা এবং অন্য গাণিতিক ধারণার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে বের করার প্রয়োজন থেকেই যায়। তবে যন্ত্র যদি ক্রমান্বয়ে আরও বেশি সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে গবেষকদের দক্ষতা অর্জনের পথও বদলে যেতে পারে।

এই পরিবর্তন বিশেষ করে গবেষণার শুরুতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য চরম উদ্বেগের। গণিতে পিএইচডি করতে আসা অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর ধরে এমন সব সমস্যার সমাধান খোঁজেন, যেগুলো নিয়ে কাজ করেই তাঁরা নিজেদের গবেষক হিসেবে গড়ে তুলতে চান। এআই যদি আগেই সেই সমস্যাগুলোর সমাধান করে ফেলে, তাহলে তাঁদের গবেষণার লক্ষ্য কী হবে? পড়াশোনা শেষে তাঁদের জন্য কেমন কাজ অপেক্ষা করবে? গোল্ডবার্গের মতে, এটাই সবচেয়ে বড় সংকট।

আরও পড়ুন
লেসলি অ্যান গোল্ডবার্গের বক্তব্য, তিনি টাইপিস্ট নন; শুধু এআইকে প্রশ্ন করে তার দেওয়া উত্তর জানিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করার কোনো অর্থ দেখেন না তিনি।

গণিতবিদেরা কেন হতাশ হচ্ছেন

গণিতবিদদের কান্নার ঘটনাকে শুধু আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগা হিসেবে দেখলে তাঁদের অনুভূতির বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যাবে। বহু বছরের পরিশ্রমের পর অন্য কেউ দ্রুত সাফল্য পেলে হতাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক। নিজের কাজের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে বলে মনে হওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ও তাঁদের কষ্টের অংশ।

কিন্তু এর পাশাপাশি আছে আরও গভীর এক অনুভূতি। তাঁরা এমন একটি জগতে কাজ করেছেন, যেখানে আবিষ্কারের আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। একজন গবেষক আগের গবেষকের কাজ পড়েছেন, তার সীমাবদ্ধতা খুঁজেছেন, নতুন প্রশ্ন তুলেছেন, সহকর্মীদের সঙ্গে তর্ক করেছেন। কখনো ব্যর্থ হয়েছেন, আবার কখনো বহুদিনের চেষ্টায় ছোট্ট একটি অগ্রগতি পেয়েছেন। সেই অগ্রগতিই তাঁকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এই অমূল্য অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়েছে তাঁর দক্ষতা, নতুন প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং গবেষক হিসেবে নিজের পরিচয়।

এআইয়ের দ্রুত সাফল্য এই প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। একটি যন্ত্র যদি কয়েক ঘণ্টায় এমন সমস্যার সমাধান হাজির করে, যা সমাধান করতে একজন মানুষের কয়েক দশক লেগে যেতে পারত, তাহলে সেই গবেষকের ভূমিকা কী হবে? তাঁর দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়ের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে? ভবিষ্যতের গবেষকেরা কোন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজেদের তৈরি করবেন?

আরও পড়ুন
নিজের কাজের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে বলে মনে হওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ও গণিতবিদদের কষ্টের অংশ।

এসব প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। তবে গণিতবিদদের উদ্বেগ কেবল পেশা হারানোর ভয় নয়। তাঁরা এমন এক পরিবর্তনের মুখোমুখি, যা তাঁদের কাজের পদ্ধতি, পরিচয় এবং বিজ্ঞানের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

এআই হয়তো একসময় এমন অনেক সমস্যার সমাধান করে দেবে, যেগুলোকে আগে মানুষের বুদ্ধিমত্তার বড় পরীক্ষা বলে মনে করা হতো। এতে বিজ্ঞানের অগ্রগতির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই অগ্রগতির মধ্যে মানুষের জায়গাটা কী হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

গণিতবিদদের কান্নার পেছনে হয়তো এই প্রশ্নগুলোরই বড় ভূমিকা আছে। তাঁরা শুধু কিছু সমস্যার সমাধান হারানোর শোক করছেন না; তাঁরা ভাবছেন, মানুষের কৌতূহল, অধ্যবসায় আর পারস্পরিক সহযোগিতায় গড়ে ওঠা বিজ্ঞানের পৃথিবী কতটা বদলে যেতে চলেছে।

সূত্র: ডেরেক থম্পসন ও দ্য অবজার্ভার

আরও পড়ুন