গুগলের সবকিছু ফ্রি, তবু এক বছরে কীভাবে ৪০০ বিলিয়ন ডলার আয় করল

গুগলে সার্চ করতে, ইউটিউবে ভিডিও দেখতে কিংবা অফিসের জরুরি মেইলটা জিমেইলে পাঠাতে আপনি কত টাকা খরচ করেন? আমি খরচ করি শূন্য টাকা। অর্থাৎ, একটি পয়সাও খরচ না করে আমি-আপনি গুগলের দারুণ সব সেবা ব্যবহার করছি। অথচ গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে! সঠিক অঙ্কটা হলো ৪০২.৮৩৬ বিলিয়ন ডলার। একই বছরে তাদের নিট মুনাফা হয়েছে ১৩২.১৭ বিলিয়ন ডলার।

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, যে কোম্পানির এত জনপ্রিয় সব সেবার জন্য আমরা কোনো টাকাই দিই না, তাদের রাজকোষে এত এত টাকা ঢোকে কীভাবে?

আরও পড়ুন
গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে! সঠিক অঙ্কটা হলো ৪০২.৮৩৬ বিলিয়ন ডলার।

পণ্য যখন আপনি নিজেই

ডিজিটাল দুনিয়ায় একটি বহুল আলোচিত কথা আছে—যেখানে আপনি কোনো সেবার জন্য টাকা দিচ্ছেন না, সেখানে অনেক সময় আপনি নিজেই মূল পণ্য! গুগলের ব্যবসার দিকে তাকালে কথাটি বেশ পরিষ্কার হয়ে যায়।

একদিকে দাঁড়িয়ে আছি আমি, আপনি আর পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ। আমরা বিনা পয়সায় গুগলে সার্চ করছি, গুগল ম্যাপসে রাস্তা খুঁজছি, জিমেইলে মেইল পাঠাচ্ছি কিংবা ইউটিউবে ভিডিও দেখছি। অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে লাখ লাখ বিজ্ঞাপনদাতা। তারা তাদের পণ্য বা সেবা এমন মানুষের সামনে হাজির করতে চায়, যাদের কাছে ওই বিজ্ঞাপনের মূল্য আছে। এই দুই পক্ষের ঠিক মাঝখানে গুগল তৈরি করেছে বিশাল এক ডিজিটাল বাজার।

আরও পড়ুন
একদিকে দাঁড়িয়ে আছি আমি, আপনি আর পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ। আমরা বিনা পয়সায় গুগলে সার্চ করছি, গুগল ম্যাপসে রাস্তা খুঁজছি, জিমেইলে মেইল পাঠাচ্ছি কিংবা ইউটিউবে ভিডিও দেখছি।

আমরা গুগলের সেবা ব্যবহার করার সময় নিজেদের অজান্তেই গুগলকে নানা তথ্য দিই। আপনি কী খুঁজছেন, কী দেখছেন, কোন বিষয়ে আগ্রহী—এসব তথ্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করে গুগল। এরপর সেগুলো বিশ্লেষণ করে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে। অর্থাৎ, আমাদের কখন কোন জিনিস ভালো লাগবে, সেটা গুগল আগেই অনুমান করতে পারে। বিজ্ঞাপনের বাজারে এই তথ্যের মূল্য অনেক। এতটাই বেশি যে বলা হয় ডিজিটাল এই দুনিয়ায় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের নামই হলো তথ্য।

আপনি কী খুঁজছেন, কী দেখছেন, কোন বিষয়ে আগ্রহী—এসব তথ্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করে গুগল
ছবি: ডব্লিউএসি

আপনি যত বেশি সময় ধরে কোনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করবেন, তত বেশি তথ্য তৈরি হবে। আর সেই তথ্য থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার আচরণ ও আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা পাবে। ফলে একই বিজ্ঞাপন সবাইকে না দেখিয়ে, যার আগ্রহ আছে তাকেই শুধু দেখানো যায়। এতে বিজ্ঞাপনদাতার সময় যেমন সাশ্রয় হয়, তেমনি পণ্য বিক্রি বাড়ে বহুগুণ। এ কারণেই ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে মানুষ এখন আর খুব একটা ভাবে না। অর্থাৎ, আপনি টাকা না দিলেও গুগলের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা বিনিময়হীন নয়।

আরও পড়ুন
আপনি যত বেশি সময় ধরে কোনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করবেন, তত বেশি তথ্য তৈরি হবে। আর সেই তথ্য থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো আপনার আচরণ ও আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা পাবে।

সংখ্যায় অ্যালফাবেট

নিচের ছকটা একনজর দেখুন।

কোথা থেকে এল ৪০০ বিলিয়ন

অ্যালফাবেটের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, তাদের মোট রাজস্বের প্রায় ৭৩ শতাংশই এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে, যার পরিমাণ ২৯৪.৬৯১ বিলিয়ন ডলার! এর মধ্যে শুধু গুগল সার্চ ও অন্যান্য থেকেই এসেছে ২২৪.৫৩২ বিলিয়ন ডলার।

ধরুন, আপনি গুগলে লিখলেন—‘ঢাকা টু কক্সবাজার বিমান টিকিট’ কিংবা ‘সেরা বাজেট ল্যাপটপ’। খেয়াল করলে দেখবেন, সার্চ ফলাফলের ওপরে 'Sponsored' বা 'Ad' লেখা কয়েকটি লিংক দেখা যায়? এগুলো এমনি এমনি সেখানে আসে না। বিজ্ঞাপনদাতারা নির্দিষ্ট সার্চের সামনে নিজেদের বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য অর্থ দিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আপনি বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলে সেই ক্লিকের জন্যও বিজ্ঞাপনদাতার কাছ থেকে গুগল রাজস্ব পায়। ২০২৫ সালে ‘গুগল সার্চ ও অন্যান্য’ বিভাগের পেইড ক্লিক বেড়েছে ৬ শতাংশ, আর কস্ট-পার-ক্লিক বেড়েছে ৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন
অ্যালফাবেটের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, তাদের মোট রাজস্বের প্রায় ৭৩ শতাংশই এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে, যার পরিমাণ ২৯৪.৬৯১ বিলিয়ন ডলার!

ইউটিউবও কম যায় না!

ভিডিও শুরু হওয়ার আগে বা মাঝখানে যেসব বিজ্ঞাপন আমাদের বিরক্তির কারণ হয়, সেগুলোই কিন্তু গুগলের বড় আয়ের উৎস! ২০২৫ সালে শুধু ইউটিউব অ্যাডস থেকেই এসেছে ৪০.৩৬৭ বিলিয়ন ডলার। আর গুগল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্য ওয়েবসাইট ও অ্যাপে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে এসেছে আরও ২৯.৭৯২ বিলিয়ন ডলার।

ফ্রি থেকে পেইড

গুগলের ব্যবসা অবশ্য শুধু বিজ্ঞাপনেই আটকে নেই। ‘সাবস্ক্রিপশন, প্ল্যাটফর্ম এবং ডিভাইসেস’ বিভাগ থেকে ২০২৫ সালে গুগলের আয় হয়েছে ৪৮.০৩০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে গুগল ওয়ান, ইউটিউব প্রিমিয়াম, গুগল প্লে ও পিক্সেল স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন সেবা ও পণ্যের আয় রয়েছে।

সাবস্ক্রিপশন, প্ল্যাটফর্ম এবং ডিভাইসেস বিভাগ থেকে ২০২৫ সালে গুগলের আয় হয়েছে ৪৮.০৩০ বিলিয়ন ডলার
ছবি: ভোকাল মিডিয়া

আপনি হয়তো গুগলের কোনো ফ্রি স্টোরেজ ব্যবহার করছেন। বছরের পর বছর ছবি, ভিডিও আর ফাইল জমতে জমতে একসময় সেই জায়গা ফুরিয়ে যাবে। তখন ঠিকই আপনার সামনে আসবে আরও বেশি স্টোরেজ কেনার পেইড প্ল্যান। অর্থাৎ, ফ্রি সেবা অনেক সময় শেষ গন্তব্য নয়; বরং এটি বড় একটি ব্যবসায়িক ব্যবস্থার প্রবেশদ্বার মাত্র।

আছে গুগল ক্লাউড

সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য গুগলের অনেক সেবা ফ্রি হলেও করপোরেট দুনিয়ায় গল্পটা আলাদা। বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান নিজেদের সফটওয়্যার, ডেটাবেস ও এআই অবকাঠামো চালাতে গুগল ক্লাউড ব্যবহার করে। ২০২৫ সালে গুগল ক্লাউডের রাজস্ব বেড়ে হয়েছে ৫৮.৭০৫ বিলিয়ন ডলার, আর অপারেটিং ইনকাম দাঁড়িয়েছে ১৩.৯১০ বিলিয়ন ডলার।

আরও পড়ুন
২০২৫ সালে অ্যালফাবেটের মূলধনি ব্যয় ছিল প্রায় ৯১.৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জন্য তারা ১৭৫ থেকে ১৮৫ বিলিয়ন ডলার মূলধনি ব্যয়ের বিশাল এক পরিকল্পনা জানিয়েছে।

এবার খেলায় এআই

চ্যাটজিপিটি আসার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের সাম্রাজ্য হয়তো বিপদে পড়বে। কিন্তু গুগল সহজে মাঠ ছেড়ে দেয়নি। বরং জেমিনির মতো এআই মডেলকে তারা সার্চ, ক্লাউড এবং অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। ফলে গ্রাহকেরা একই প্ল্যাটফর্মে এআইসহ পুরোনো সেবাগুলো উপভোগ করতে পারছেন। ২০২৫ সালের শেষ দিকে জেমিনি অ্যাপের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ছিল ৭৫০ মিলিয়নেরও বেশি। একই সময়ে অ্যালফাবেট জানায়, তাদের বিভিন্ন ভোক্তা সেবায় মোট পেইড সাবস্ক্রিপশন ৩২৫ মিলিয়নের বেশি।

চমৎকার এই অগ্রযাত্রার জন্য গুগল খরচও করছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ২০২৫ সালে অ্যালফাবেটের মূলধনি ব্যয় ছিল প্রায় ৯১.৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জন্য তারা ১৭৫ থেকে ১৮৫ বিলিয়ন ডলার মূলধনি ব্যয়ের বিশাল এক পরিকল্পনা জানিয়েছে।

২০২৫ সালের শেষ দিকে জেমিনি অ্যাপের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ছিল ৭৫০ মিলিয়নেরও বেশি
ছবি: রয়টার্স

আমরা টাকা না দিলেই কোনো কিছুকে ‘ফ্রি’ বলে ধরে নিই। কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়ায় বিষয়টা এত সহজ নয়। গুগল আপনাকে সার্চ করতে টাকা নিচ্ছে না, ইউটিউব দেখতে টাকা নিচ্ছে না, জিমেইল ব্যবহার করতেও টাকা নিচ্ছে না। কিন্তু এসব সেবা ব্যবহার করার সময় আপনি আপনার মনোযোগ, সময় এবং তথ্য দিয়ে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সাহায্য করছেন, যেখান থেকে বিজ্ঞাপনদাতা টাকা দিচ্ছে, গ্রাহক সাবস্ক্রিপশন কিনছে আর বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্লাউড ও এআই সেবার জন্য অর্থ খরচ করছে।

ডিজিটাল এই দুনিয়ায় তথ্য তাই শুধু ‘তথ্য’ নয়, এটি মহামূল্যবান সম্পদ। আর গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান সেই সম্পদ ও ব্যবহারকারীর আচরণ থেকে তৈরি হওয়া মূল্যকে বিভিন্ন ব্যবসায়িক মডেলের মাধ্যমে অর্থে রূপান্তর করছে।

লেখক: সফটওয়্যার ডেভেলপার, নেক্সালাইজ

সূত্র: অ্যালফাবেট, গুগল ব্লগ, ইউএস সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন

আরও পড়ুন