নূর হোসেন বেসরকারি চাকরিজীবী। ছোট পোস্ট, বেতন খুব কম। সংসারে স্ত্রী আর দুই ছেলেমেয়ে। সংসার আর ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। সন্ধ্যায় তাই একটা টিউশনি করেন। মিরপুরের ঘুপচি গলিতে থাকেন ছোট্ট একটা বাসা নিয়ে। পানি ও গ্যাসের সংকট লেগেই আছে। তার ওপর নোংরা গন্ধময় এলাকা। তবুও চোখ-কান বুজে পড়ে থাকতে হয়। নইলে জীবন চলবে কীভাবে?
সেদিনও একটু সকাল-সকাল বেরিয়েছিলেন অফিসের উদ্দেশে। বাসা থেকে বেশ খানিকটা গলি রাস্তা। তারপর মূল সড়ক। কিন্তু সেদিন গলি পার হতে গিয়ে বাধে বিপত্তি। একটা কালো বিড়াল এসে পথ আগলে দাঁড়ায়। মূর্তির মতো জমে যান নূর হোসেন। বেরোনোর পথে কালো বিড়াল, না জানি কত দুঃখ আছে কপালে! বাড়ি ফিরে আসেন, তারপর এক গ্লাস পানি খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়েন অফিসের উদ্দেশে।
অফিসে ফিরে সত্যিই দুঃসংবাদ শুনতে হয় নূর হোসেনকে। কোম্পানি কয়েক মাস ধরে লোকসান গুনছে। তাই খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর সেই সিদ্ধান্তে কাটা পড়েছে নূর হোসেনের নাম। দুই মাসের বেতন অগ্রিম তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয় তাঁকে। ভেঙে পড়েন নূর হোসেন। কালো বিড়াল দেখেই না তাঁর কপালে শনি ভর করল!
তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেবেন, বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। তখুনি স্ত্রীর ফোন। মেয়েটা খাট থেকে পড়ে পা ভেঙে ফেলেছে! বিপদের ওপর বিপদ। সবই ওই কালো বিড়ালটার জন্য। বাড়ি ফিরে আসেন নূর হোসেন। মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যান।
মেয়ে না হয় সুস্থ হলো, অগ্রিম টাকায় না হয় দুই মাস সংসার চলল। কিন্তু এ বাজারে নতুন একটা চাকরি জোটানো কঠিন। কী করবেন তিনি? সবকিছুর আগে ওই বিড়ালটাকে শায়েস্তা করতে হবে। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বিড়ালটার আর সন্ধান পান না তিনি।
অফিসে ফিরে সত্যিই দুঃসংবাদ শুনতে হয় নূর হোসেনকে। কোম্পানি কয়েক মাস ধরে লোকসান গুনছে। তাই খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর সেই সিদ্ধান্তে কাটা পড়েছে নূর হোসেনের নাম।
২
বৈশাখী পূর্ণিমার রাত। রমিজ উদ্দিন মাঠে গিয়েছেন আমবাগান দেখতে। কয়েক দিন পর আম পাকবে। এ সময় বাগানে চোরের আনাগোনা বেড়ে যায়। তাই প্রতিদিন মাঝরাতে গিয়ে একবার ঘুরে আসেন। হাতে একটা টর্চ আছে। বেশ জোরালো। কিন্তু মাঠে গিয়ে সেটা বিগড়ে গেল। আলো জ্বলছে, তবে বেশি জোরালো নয়।
রমিজ উদ্দিন সাহসী মানুষ। রাতবিরাতে মাঠে ঘুরতে তাঁর আপত্তি নেই। কিন্তু সেদিন তিনি ভয় পেলেন। বলা ভালো, ভয় পেতে বাধ্য হলেন। একজোড়া আগুনের গোলা যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে বাগানে। কী ওদুটো? ছোট্ট ছোট্ট মার্বেলের মতো। ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে টর্চের আলো ফেললেন। ক্ষীণ আলোয় মার্বেল দুটোর উজ্জ্বলতাই কেবল বাড়ল। কিন্তু কোনো অবয়ব দেখতে পেলেন না। ভয় আরও বাড়ল। লাইট একটু ঝাঁকিয়ে নিলেন। আলোর জোর কিছুটা বাড়ল। জ্বলন্ত মার্বেল দুটোর দিকে আলো ফেললেন। ততক্ষণে বিদ্যুৎগতিতে পালিয়ে ঝোপের আড়ালে চলে গেল জন্তুটা। ঘন লোমে ঢাকা ছোট্ট একটা প্রাণী। রমিজ উদ্দিনের ভয় আরও বেড়ে গেল। কালো বিড়াল দেখেছেন তিনি!
কালো বিড়াল নিয়ে নানা ভয়ংকর কথা চালু আছে গ্রামে। কাপালিকেরা কালীসাধনা করে। এ জন্য দরকার হয় কালো বিড়ালের হাড়গোড়। এ কারণে তারা বিড়াল মারে। তবে মৃত বিড়াল আবার বেঁচে ওঠে। অশুভ ডাইনি হয়ে। অশরীরী বিড়াল। মাঝেমধ্যে দেখা দেয়। তারপর ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে যায়। পরে বিড়াল ফিরে আসে অশুভের বার্তা নিয়ে, কিংবা মৃত্যুদূত হয়ে। রমিজ উদ্দিন জানেন সে কথা। তাঁর অসুস্থ লাগে। নিশ্বাস আটকে আসতে চায় যেন। ঘামতে শুরু করে শরীর। তবুও কষ্টেসৃষ্টে বাড়ি ফেরেন।
রমিজ উদ্দিন বাড়ি ফিরে আসেন বটে, কিন্তু আর সুস্থ হন না। সারাক্ষণ বিড়ালের আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়ায় তাঁকে। তিনি ভুল বকতে শুরু করেন। বাড়ির লোকেরা ভূতে পেয়েছে ভেবে ঝাড়ফুঁক-তাবিজ-কবচ করে। কিন্তু দিন দিন তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে। চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয় তাঁকে। চিকিৎসকেরা বলেন, বড্ড দেরি করে ফেলেছেন। সপ্তম দিনে তিনি হাসপাতালেই মারা যান।
কাপালিকেরা কালীসাধনা করে। এ জন্য দরকার হয় কালো বিড়ালের হাড়গোড়। এ কারণে তারা বিড়াল মারে। তবে মৃত বিড়াল আবার বেঁচে ওঠে। অশুভ ডাইনি হয়ে। অশরীরী বিড়াল। মাঝেমধ্যে দেখা দেয়।
৩
এই দুই ঘটনার কথা শুনে কি আপনার মনে হচ্ছে কালো বিড়াল আসলেই অশুভ? যদি তাই হয়, তাহলে আমি আপনাকে নিশ্চিত করে বলছি, আর দশটা বিড়ালের মতোই কালো বিড়ালও নিরীহ ও আদুরে। এটা বনবিড়ালও নয়। আমাদের ঘরে পোষা সাধারণ বিড়াল। আর দশটা বিড়াল যেমন ভীষণ আদুরে, আপনার কাছে ভালোবাসা চায়, খাবার চায়; এরাও তেমনই। গায়ের রং কালো হওয়ার জন্য তার কোনো দায় নেই। মূলত জেনেটিক কারণেই কিছু বিড়ালের গায়ের রং কালো হয়।
তাহলে ওপরের যে দুটো ঘটনার কথা বললাম, ও দুটোর সঙ্গে কালো বিড়ালের কোনো সম্পর্ক নেই? প্রথম ঘটনাটা একদম কাকতালীয়। নূর হোসেন কালো বিড়াল দেখেছিলেন বলে তাঁর চাকরি যায়নি। চাকরি তাঁর এমনিও যেত। কোম্পানি বেশ কিছুদিন ধরেই কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছিল। ছাঁটাইয়ের লিস্টও তৈরি করেছিল। সেদিন যদি বিড়াল নাও দেখতেন, তবু অফিসে গেলে টার্মিনেশন লেটার তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো।
মেয়ের পা ভাঙার সঙ্গেও বিড়ালের কোনো সম্পর্ক নেই। ওটা নিতান্তই একটি দুর্ঘটনা। এখন হয়তো মনে হতে পারে, ওই বিড়াল তো আগে কোনো দিন দেখেননি, ওই দিনই কেন দেখলেন নূর হোসেন? আগে দেখেননি, কারণ বিড়ালটা ও পাড়ার নয়। আসলে কালো বিড়ালের কোনো পাড়া থাকে না। মানুষ এদের অশুভ মনে করে। যার সামনে পড়ে, সে-ই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। তাই কালো বিড়ালের জন্য কোনো পাড়ায় বা বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস করা মুশকিল হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি বিভাগের গবেষক মিকাইল স্মিথ। তিনি দীর্ঘদিন মানুষের ভয় ও সামাজিক প্রবৃত্তি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ নিজের পরিচিত জিনিসের সঙ্গে যেকোনো বস্তু বা ঘটনার ছক মেলাতে পছন্দ করে।’ অর্থাৎ রমিজ উদ্দিন বা নূর হোসেনের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে মানুষ কালো বিড়ালের সঙ্গে দুর্ঘটনার প্যাটার্ন মিলিয়ে ফেলে। যদি নূর হোসেনের সেদিন কিছুই না হতো, তাহলে কালো বিড়াল দেখার কথা তিনি ভুলেই যেতেন।
নূর হোসেন কালো বিড়াল দেখেছিলেন বলে তাঁর চাকরি যায়নি। চাকরি তাঁর এমনিও যেত। কোম্পানি বেশ কিছুদিন ধরেই কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছিল। ছাঁটাইয়ের লিস্টও তৈরি করেছিল।
এবার আসা যাক দ্বিতীয় ঘটনায়। রমিজ উদ্দিন অন্ধকারে জ্বলন্ত মার্বেল দেখে প্রথমেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। অন্ধকারে ভয় পাওয়া মানুষের জিনগত সমস্যা। এই সমস্যা মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে দূর অতীতকাল থেকে। তাই অন্ধকারে স্বাভাবিক কিছু দেখলেও ভয় পায়। এখানে একটা প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়। বিড়ালের চোখ তিনি অন্ধকারে দেখলেন কীভাবে? বিড়ালের চোখ থেকে কি আলো নির্গত হয়?
আসলে ব্যাপারটা অন্য রকম। রাতটা পুরোপুরি অন্ধকার ছিল না। বৈশাখী পূর্ণিমার রাত ছিল। চাঁদের আলো বিড়ালের চোখে পড়ে জ্বলজ্বল করছিল। রমিজ উদ্দিন তখন লাইট মারেন। লাইটের আলো তেমন জোরালো ছিল না। আলো ফেলে কালো বিড়ালটা দেখার আগেই তিনি আরও উজ্জ্বল চোখ দেখেছিলেন। তখনই তিনি ভয় পেয়ে যান। পরে নিশ্চিত হন, ওটা কালো বিড়ালের চোখ। তখন ভয় কমার বদলে আরও বেড়ে যায়। কারণ, কালো বিড়াল নিয়ে কুসংস্কারের গালগল্প তাঁর জানা ছিল। তিনি সেগুলো বিশ্বাসও করতেন। তাই ভয়ে সে সময় তাঁর একটি মাইল্ড হার্ট অ্যাটাক হয়।
ভয় আসলে জোঁকের মতো। রোগী যদি কোনোভাবে ভয় কাটানোর কোনো যুক্তি খুঁজে না পান, তাহলে সেটা নিয়ে আরও বেশি বেশি করে ভাবেন এবং ভয় আরও জেঁকে বসে। রমিজ উদ্দিনের বেলায়ও সেটাই হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভয় আরও বেড়েছিল। তিনি আরেকবার হার্ট অ্যাটাক করেন। কিন্তু তাঁর পরিবারের লোকেরা তাঁকে হাসপাতালে না নিয়ে কবিরাজ দিয়ে ঝাড়ফুঁক করিয়েছে। এতে তাঁর সুস্থ হওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
সুতরাং বিড়াল দেখে রমিজ উদ্দিনের মৃত্যু হয় বটে, তবে এর জন্য মোটেও ওই বিড়ালটা দায়ী নয়। দায়ী মনের মধ্যে পুষে রাখা কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস।
রাতটা পুরোপুরি অন্ধকার ছিল না। বৈশাখী পূর্ণিমার রাত ছিল। চাঁদের আলো বিড়ালের চোখে পড়ে জ্বলজ্বল করছিল। রমিজ উদ্দিন তখন লাইট মারেন। লাইটের আলো তেমন জোরালো ছিল না।
৪
কালো বিড়াল অশুভের প্রতীক হয়ে উঠল কবে থেকে?
এ প্রশ্নের শিকড় লুকিয়ে আছে আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে, প্রাচীন মিসরে। মিসরীয়রা বিড়ালকে আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখত। তারা মনে করত, বিড়ালের ভেতর অলৌকিক শক্তি আছে। তাই বিড়াল তাদের কাছে ছিল পূজনীয়। এ কারণেই তারা বিড়ালের মমি বানাত। এমনকি বিড়ালের মূর্তিও বানাত তারা। মিসরীয় সভ্যতার সমাধিগুলোতেই এর প্রমাণ মেলে। বিড়ালকে তারা এতটাই সম্মান করত যে বিড়াল হত্যার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড! তারা একে দেবী ডায়নার বাহন মনে করত। অন্যান্য বিড়ালের মতো কালো বিড়ালও ছিল তাদের কাছে সমান পূজনীয়।
তাহলে দেবতার আসন থেকে বিড়াল অশুভের প্রতীক কীভাবে হয়ে উঠল?
ঘটনার শুরু ১২৩৩ খ্রিষ্টাব্দে। খ্রিষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ নবম গ্রেগরি কালো বিড়ালকে শয়তানের দোসর আখ্যা দেন। কালো বিড়ালকে দেখামাত্র হত্যা করার নির্দেশও দেন তিনি। পোপ কেন এমন আখ্যা দিলেন?
মিসরীয়রা বিড়ালকে তারা এতটাই সম্মান করত যে বিড়াল হত্যার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড! তারা একে দেবী ডায়নার বাহন মনে করত। অন্যান্য বিড়ালের মতো কালো বিড়ালও ছিল তাদের কাছে সমান পূজনীয়।
এর পেছনে ছিল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ। তখনকার ইউরোপ ও এশিয়ায় পেগান ও ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে। পেগানরা প্রতিমাপূজা করত। কালোজাদু, তুকতাক ইত্যাদি ছিল তাদের জীবনাচরণের অন্যতম অনুষঙ্গ। তারা বিড়াল পছন্দ করত, বিশেষ করে কালো বিড়াল। অন্যদিকে ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ধর্মে প্রতিমাপূজা, কালোজাদুর চর্চা ছিল নিষিদ্ধ। পেগানদের প্রিয় কালো বিড়ালকেই তাই এর বলি হতে হলো। ইউরোপজুড়ে শুরু হয় কালো বিড়াল নিধন। সেই যে শুরু, এরপর কত গল্প, কত উপকথা লেখা হয়েছে কালো বিড়ালকে ভিলেন বানিয়ে!
মধ্যযুগে যারা কালোজাদুর চর্চা করত, তাদের ওপর খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে খ্রিষ্টান ধর্ম। বিশেষ করে যেসব নারী কালোজাদুর চর্চা করত, তাদের ডাইনি আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। শুধু ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে অনেক সাধারণ নিরীহ মানুষও ডাইনি অপবাদে মারা পড়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কালো বিড়ালকে ডাইনিদের দোসর ঘোষণা করা হয়। তখন কালো বিড়াল হত্যা করার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। মানুষও এদের ভয় পেতে শুরু করে। কালো বিড়াল হয়ে ওঠে অশুভের প্রতীক। তাই চলতি পথে কেউ কালো বিড়াল দেখলে মনে করে, কোনো ভয়ংকর বিপদ ধেয়ে আসছে।
এরপর কালো বিড়ালের গল্প গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সব দেশের মানুষ একে ভয় পেতে শুরু করে।
মধ্যযুগে যারা কালোজাদুর চর্চা করত, তাদের ওপর খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে খ্রিষ্টান ধর্ম। বিশেষ করে যেসব নারী কালোজাদুর চর্চা করত, তাদের ডাইনি আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো।
৫
রাতে বিড়ালের চোখের মণি জ্বলজ্বল করে। বিড়ালকে ভয় পাওয়ার এটাও অন্যতম কারণ। যেমনটা আমরা দেখেছি রমিজ উদ্দিনের গল্পে। কালো বিড়ালের দেহ অন্ধকারে একদম দেখা যায় না। আসলে একদম অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। এমনকি বিড়ালের জ্বলজ্বলে চোখ দুটোও নয়। চোখ দেখতে হলেও সামান্য আলো দরকার হয়। চাঁদের আলোয় বিড়ালের চোখ জ্বলজ্বল করে, কিন্তু দেহ নয়। কারণ কালো রং আসলে কোনো রং নয়। কালো মানে রঙের অভাব। অন্ধকারও কালো, কারণ অন্ধকারে কোনো আলো থাকে না। জ্যোৎস্না রাতে আলো থাকলেও বিড়ালের গায়ে সেই সামান্য আলো প্রতিফলিত হতে পারে না। কারণ, কালো বস্তু আলো শোষণ করে নেয়। আলো প্রতিফলিত না করতে পারলে সেই বস্তুকে দেখা যায় না, অথবা কালো দেখায়। দিনের বেলা সূর্যের আলোয় চারপাশ উদ্ভাসিত থাকে। এ সময় অন্য বস্তু স্পষ্ট দেখা যায়। কালো বস্তুও দেখা যায়। কারণ, খুব কম হলেও কালো জিনিস কিছুটা আলো প্রতিফলিত করে। তবে তার জন্য পর্যাপ্ত আলো থাকা চাই। অন্ধকারে বা জ্যোৎস্না রাতে কালো বিড়ালের গা থেকে পর্যাপ্ত আলো প্রতিফলিত হয় না। তাই বিড়ালের শরীর অনেকটা অদৃশ্যই রয়ে যায়। কিন্তু বিড়ালের চোখ শরীরের মতো কালো নয়। তাই অল্প আলোতেই তা দেখা যায়।
অন্ধকারে কেন বিড়ালের চোখ জ্বলে, এই ব্যাপারটা আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা দরকার। নিশাচর প্রাণীদের চোখের মণি বা রেটিনার পেছনে একটা বিশেষ প্রতিফলক পর্দা আছে। এর নাম ট্যাপেটাম লুসিডাম। এটি অনেকটা আয়নার মতো। চাঁদ কিংবা টর্চের আলো বিড়ালের চোখ ভেদ করে এই অংশে বাধা পায়। ফলে সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে আবার ফিরে আসে। তখন বিড়ালের চোখটাকে জ্বলন্ত মার্বেল বলে মনে হয়।
দিনের বেলা সূর্যের আলোয় চারপাশ উদ্ভাসিত থাকে। এ সময় অন্য বস্তু স্পষ্ট দেখা যায়। কালো বস্তুও দেখা যায়। কারণ, খুব কম হলেও কালো জিনিস কিছুটা আলো প্রতিফলিত করে।
এই জিনিসটা বিড়ালের কী কাজে লাগে? নিশাচর প্রাণীদের দেখার ক্ষমতা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। এরা এমনকি অন্ধকারেও দেখতে পায়। কোনো কোনো প্রাণী ইনফ্রারেড আলোও দেখতে পায়। তাই এরা রাতে স্বচ্ছন্দে চলতে পারে। কম আলোতে দেখার জন্য চোখের লেন্সের বিবর্ধন ক্ষমতা একটু বেশি হওয়া প্রয়োজন। অন্ধকারে সামান্য আলো বিড়ালের চোখের রেটিনায় পৌঁছায়। তারপর সেটা দ্রুত ট্যাপেটাম লুসিডামে প্রতিফলিত হয়ে আবার রেটিনায় চলে আসে। অর্থাৎ একই আলোর ডাবল এক্সপোজার হয়। ফলে বিড়াল তুলনামূলক কম আলোতেও ভালো দেখতে পায়। ট্যাপেটাম লুসিডাম থেকে প্রতিফলিত আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে। তখন আমরা চোখের সেই উজ্জ্বল পর্দাটাই দেখতে পাই। এ জন্য রাতের বেলা বিড়ালের চোখ দেখলে মনে হয় তা জ্বলজ্বল করছে।
একটা কথা বলে রাখা জরুরি। শুধু কালো বিড়ালের চোখই অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে না, অন্য বিড়ালের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্য। কিন্তু অন্য রঙের বিড়ালের দেহটা সহজেই কম আলোতে দেখা যায়। কিন্তু কালো বিড়াল অন্ধকারে মিশে যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। ভয়টা মানুষ এখানেই পায়।
অন্ধকার ও কালো জিনিসকে ভয় পাওয়া মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য। কালো বিড়ালকে ভয় পাওয়ার অন্যতম কারণ এটাও।
ট্যাপেটাম লুসিডাম থেকে প্রতিফলিত আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে। তখন আমরা চোখের সেই উজ্জ্বল পর্দাটাই দেখতে পাই। এ জন্য রাতের বেলা বিড়ালের চোখ দেখলে মনে হয় তা জ্বলজ্বল করছে।
৬
বিড়ালের কালো রং কি আসলেই ভয় দেখানোর জন্যই তৈরি হয়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?
বিড়ালের রং কালো হওয়ার পেছনে দায়ী জিনগত বৈশিষ্ট্য। বিড়ালের শরীরে মেলানিন পিগমেন্ট থাকে খুব বেশি। এই পিগমেন্ট কালো রঙের জন্য দায়ী। অতিরিক্ত মেলানিন বিড়ালকে মিশমিশে কালো রং দেয়। কালো রং আসলে অভিশাপ নয়। গভীর বনে বা অন্ধকারে কালো বিড়াল সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া অন্য রঙের বিড়ালের চেয়ে কালো বিড়ালের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক বেশি হয়। কালো রং তাই বিড়ালের জন্য একধরনের রক্ষাকবচ।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের গবেষক স্টিফেন ওব্রায়েন। তিনি একজন জিন গবেষক। এক গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, বিড়ালের কালো রঙের জন্য দায়ী জিনগুলো তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। অন্যান্য বিড়ালের তুলনায় কালো বিড়ালের সংক্রামক ব্যাধি কম হয়। কালো বিড়ালের এই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মানুষের জন্যও আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। ওব্রায়েন মনে করেন, কালো বিড়ালের এই জেনেটিক বৈশিষ্ট্য মানুষের এইচআইভি ও অন্যান্য প্রাণঘাতী ভাইরাসের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুতরাং নিশ্চিত করেই বলা যায়, কালো বিড়াল অশুভ নয়। বরং এরা প্রকৃতির আশীর্বাদ। এদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ধরন মানুষকে বরং ভবিষ্যতে বড় উপকার করতে পারে।