নিজেদের নাক সব সময় দেখতে পাই না কেন
আপনি কি এই মুহূর্তে আপনার নাক দেখতে পাচ্ছেন? হয়তো আমি জিজ্ঞেস করার পর নাকের দিকে তাকিয়েছেন, তারপর দেখেছেন। কিংবা এই শিরোনাম দেখেও নিজের নাকের দিকে একবার তাকিয়ে দেখতে পারেন। তবে আপনার উত্তর যা-ই হোক না কেন, আপনি কিন্তু সব সময়ই আপনার নাক দেখতে পান! আমাদের নাক আমাদের দৃষ্টিসীমার ঠিক মাঝখানেই আছে। আপনি যদি একটু মনোযোগ দেন বা চোখ দুটিকে একটু ভেতরের দিকে বাঁকিয়ে ট্যারা করার চেষ্টা করেন, তাহলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে নাকটি ঠিক জায়গাতেই আছে। কিন্তু দিনের বেশিরভাগ সময় আমাদের মস্তিষ্ক এই নাককে দেখার বিষয়টি মেনে নিতে চায় না। তাই সে দৃশ্যপট থেকে নাকটিকে মুছে ফেলে!
সাধারণ যুক্তিতে মনে হতে পারে, আমাদের চোখ তো ঠিক সেটাই দেখাবে, যা আমাদের সামনে আছে। তাহলে মস্তিষ্ক কেন এমন একটা ফিল্টার করা দৃশ্য আমাদের দেখাবে? এর পেছনে চোখের বায়োফিজিকস থেকে শুরু করে আমাদের বেঁচে থাকার এক দারুণ কৌশল লুকিয়ে আছে। চলুন জেনে নিই, কেন আমাদের মস্তিষ্ক আমাদেরই নাককে আমাদের চোখের আড়াল করে রাখে।
আপনি যদি একটু মনোযোগ দেন বা চোখ দুটিকে একটু ভেতরের দিকে বাঁকিয়ে ট্যারা করার চেষ্টা করেন, তাহলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে নাকটি ঠিক জায়গাতেই আছে।
চোখের খুব কাছের ঝাপসা বস্তু
আপনার যেকোনো এক চোখ বন্ধ করুন, দেখবেন আপনি খুব সহজেই আপনার নাক দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন, নাকের এই দৃশ্যটি মোটেও পরিষ্কার নয়। আপনার নাক আপনার প্রান্তিক দৃষ্টির সীমানায় থাকে এবং এটি চোখের এতই কাছাকাছি যে, চোখ কখনোই এর ওপর ঠিকমতো ফোকাস করতে পারে না।
স্পেনের ইউনিভার্সিদাদ দেল আতলান্তিকো মেডিওর অধ্যাপক এবং গবেষক এলিও কুইরোগা রদ্রিগেজ তাঁর একটি নতুন রিভিউ আর্টিকেলে বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের চোখের লেন্স খুব কাছের কোনো বস্তুর ওপর ফোকাস করতে পারে না। আর আমাদের নাক চোখের সেই ন্যূনতম ফোকাসিং দূরত্বের অনেক ভেতরে অবস্থান করে। ফোকাস করতে না পারার কারণে নাক কখনোই আমাদের দৃষ্টিসীমায় স্পষ্ট বস্তু হিসেবে ধরা দেয় না, বরং এটি একটি ঝাপসা ও অস্পষ্ট আকার নিয়ে থাকে।’
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, ‘এই ঝাপসা হওয়ার কারণেই আমাদের মস্তিষ্ক ধরে নেয়, নাক আসলে পরিবেশের কোনো আসল বস্তু নয়। তাই মস্তিষ্ক একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের দৃষ্টিব্যবস্থা সাধারণত তীক্ষ্ণ ও স্পষ্ট বৈশিষ্ট্যযুক্ত বস্তুগুলোকেই অগ্রাধিকার দেয়, কারণ সেগুলোই আমাদের চারপাশের পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বস্তু বা ঘটনা হওয়ার আশঙ্কা বেশি।’
আপনার নাক আপনার প্রান্তিক দৃষ্টির সীমানায় থাকে এবং এটি চোখের এতই কাছাকাছি যে, চোখ কখনোই এর ওপর ঠিকমতো ফোকাস করতে পারে না।
দুই চোখের যৌথ কাজ
নাক শুধু চোখের খুব কাছেই থাকে না, এটি একেবারে মাঝখানেও থাকে। এর মানে হলো, আমাদের প্রতিটি চোখের দৃষ্টিসীমার প্রায় ১৫ শতাংশ জায়গা এই নাক একাই আটকে দেয়! কিন্তু আমাদের দুটি চোখ যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন এই বাধা আর কোনো সমস্যাই তৈরি করতে পারে না।
অধ্যাপক রদ্রিগেজ এটিকে বাইনোকুলার ট্রান্সপারেন্সি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, যখন কোনো বস্তু কেবল একটি চোখের দৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করে, কিন্তু অন্য চোখটি সেই বস্তুর পেছনের পটভূমি খুব পরিষ্কারভাবে দেখতে পায়, তখন মস্তিষ্ক ওই বাধাগ্রস্ত করা বস্তুটিকে অস্বচ্ছ না ভেবে স্বচ্ছ হিসেবে ধরে নেয়। নাকের ক্ষেত্রেও ঠিক এটাই ঘটে। প্রতিটি চোখের দৃষ্টিসীমায় নাকের বিশাল উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, মস্তিষ্ক নাকটিকে একটি অস্বচ্ছ বাধার বদলে একটি স্বচ্ছ জানালা হিসেবে ধরে নেয়, যার ভেতর দিয়ে আমরা বাইরের পৃথিবী দেখতে পাই।
আমাদের প্রতিটি চোখের দৃষ্টিসীমার প্রায় ১৫ শতাংশ জায়গা এই নাক একাই আটকে দেয়! কিন্তু আমাদের দুটি চোখ যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন এই বাধা কোনো সমস্যাই তৈরি করতে পারে না।
মস্তিষ্ক যখন একঘেয়েমি এড়িয়ে চলে
আমাদের নাক দেখতে না পাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো, নাক দেখার আসলে কোনো দরকারও নেই! আমাদের দুই চোখ একসঙ্গে নাকের উপস্থিতি ছাড়াই বাইরের পৃথিবীর একটি পরিপূর্ণ ছবি তৈরি করতে পারে। তবে এর চেয়েও বড় বৈজ্ঞানিক কারণ হলো, আমাদের মস্তিষ্ক তার শক্তি বাঁচাতে চায়।
আমাদের মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে সব সময় এড়িয়ে চলে, আর এই প্রবণতাই আমাদের সুস্থ রাখে এবং বাঁচিয়ে রাখে। আপনার স্নায়ু থেকে আসা সব তথ্যকে যদি মস্তিষ্ক সমান গুরুত্ব দিত, তবে আপনি কোনো কাজই করতে পারতেন না। আপনি তখন সব সময় আপনার নিজের চোখের পলক ফেলা, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া এমনকি হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানিও অনুভব করতেন!
আপনি যদি চশমা পরেন, তবে খেয়াল করে দেখবেন, চশমার ফ্রেমটি চোখের সামনে থাকলেও আপনি সেটি খেয়াল করেন না। কারণ চশমা বা নাক আপনার কোনো ক্ষতি করবে না, এগুলো বারবার পরিবর্তনও হয় না। তাই মস্তিষ্ক এগুলোকে গুরুত্বহীন তালিকায় ফেলে দেয়।
আমাদের দুই চোখ একসঙ্গে নাকের উপস্থিতি ছাড়াই বাইরের পৃথিবীর একটি পরিপূর্ণ ছবি তৈরি করতে পারে। তবে এর চেয়েও বড় বৈজ্ঞানিক কারণ হলো, আমাদের মস্তিষ্ক তার শক্তি বাঁচাতে চায়।
দৃষ্টিভঙ্গি আসলে মস্তিষ্কের অনুমান
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নেভাডা, রেনোর নিউরোসায়েন্স প্রোগ্রামের কো-ডিরেক্টর এবং ভিশন সায়েন্টিস্ট মাইকেল ওয়েবস্টার চলতি বছরের শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মস্তিষ্ক সব সময় চারপাশের পরিবেশের পরিবর্তন, চমক বা ভুলগুলো খুঁজতে ব্যস্ত থাকে। নিজের নাকের দিকে তাকিয়ে মস্তিষ্কের মূল্যবান জায়গা নষ্ট করাটা মানুষের জন্য বড় অসুবিধার কারণ হতে পারে।’
মস্তিষ্ক যে শুধু নাক বা চশমাকেই অদৃশ্য করে দেয় তা নয়। আমাদের চোখের ভেতর রেটিনার ফটোরিসেপ্টর কোষগুলোর ঠিক সামনেই অসংখ্য রক্তনালির একটি বিশাল জাল বিছানো আছে! আমরা যদি সত্যিই কোনো ফিল্টার ছাড়া পৃথিবীকে দেখতাম, তবে মাইকেল ওয়েবস্টারের মতে, চারপাশের সবকিছুকে মরা গাছের ডালপালার আড়াল থেকে দেখার মতো মনে হতো। কারণ ওই রক্তনালিগুলো সব সময়ই আমাদের চোখের সামনে থাকে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক জাদুকরী ক্ষমতায় সেই রক্তনালিগুলোকে আমাদের দৃষ্টি থেকে পুরোপুরি মুছে দেয়।
এটা অনেকটা আমাদের চোখের ব্লাইন্ড স্পটের উল্টো ঘটনা। ব্লাইন্ড স্পটের ক্ষেত্রে চোখ কোনো তথ্য না পেলেও মস্তিষ্ক আশপাশের পরিবেশ বুঝে ফাঁকা জায়গাটা পূরণ করে নেয়। আর নাকের ক্ষেত্রে চোখের কাছে তথ্য থাকলেও মস্তিষ্ক তা মুছে ফেলে।
মস্তিষ্ক যে শুধু নাক বা চশমাকেই অদৃশ্য করে দেয় তা নয়। আমাদের চোখের ভেতর রেটিনার ফটোরিসেপ্টর কোষগুলোর ঠিক সামনেই অসংখ্য রক্তনালির একটি বিশাল জাল বিছানো আছে!
এখান থেকে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়। মাইকেল ওয়েবস্টার চমৎকারভাবে বলেছেন, ‘দৃষ্টি হলো পৃথিবী সম্পর্কে আপনার মস্তিষ্কের একটি অনুমান মাত্র। এটি কখনোই পৃথিবীর আসল বা নিখুঁত বাস্তবতা আপনাকে দেখায় না।’
বাস্তবতা হলো, আপনার চোখের ঠিক মাঝখানেই একটি বেশ বড়সড় নাক বসে আছে। চোখ সেটা সব সময় দেখছেও, কিন্তু মস্তিষ্ক বলছে, ‘ওটা দেখার দরকার নেই!’ আর সত্যি বলতে কী, সারা দিন চোখের সামনে নিজের নাক ঝুলে থাকতে দেখতে কারই বা ভালো লাগবে!