বিজ্ঞানের চোখে পাখিদের গান
‘প্রায় এক বছর হয়ে গেল ওর দেখা নেই
ওহ, গত গ্রীষ্মে সবুজ, সবকিছু ছিল আরও সবুজ,
কাঁটাবন কম, আকাশটা ছিল আরও নীল।
নিশ্চয়ই এখন গ্রীষ্মই, কারণ এক পাখি এসেছে—
এসো এক পাখি, তার সঙ্গী আসবে পরে,
পাখি দৌড়ায়, ওড়ে ঘোরে, আরও ঘন হয়।
ওহ, সুখী সেই পাখি, যার সঙ্গী আসবে,
উচ্চতায়, খাঁড়ে—আমি যদি হতাম সেই পাখি,
একসঙ্গে এই আবহাওয়ায় বাসা বানাতাম।’
আ বার্ড সং, ক্রিস্টিনা রোসেত্তি (১৮৩০-১৮৯৪)
পাখির ডাক কিংবা গান শুনে আমাদের মন ভরে যায়। ভোরের আলো ফোটার আগে যেসব পাখি একটানা গেয়ে যায়, তাদের সুরে প্রকৃতি যেন জেগে ওঠে। কিন্তু পাখিরা কেন গান গায়? তারা কি কেবল সৌন্দর্য ছড়ায়, নাকি এই গানের পেছনে আছে জটিল জৈবিক বা স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কোনো উদ্দেশ্য? এই গানের সঙ্গে কি তাদের টিকে থাকার সংগ্রামের কোনো সম্পর্ক আছে?
বিজ্ঞান বলছে, অধিকাংশ পুরুষ পাখির গান হলো একধরনের প্রেম নিবেদন। প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখিরা গান গেয়ে মেয়ে পাখিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। শব্দের বৈচিত্র্য আর সুরের শক্তি দিয়ে তারা যেন নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চায়।
তবে গান শুধু প্রেমের বার্তা নয়, এটি একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা ‘টেরিটরি’ রক্ষা করার অস্ত্রও। অনেক পাখি সকালে গেয়ে জানিয়ে দেয়, ‘এই এলাকা আমার।’
প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখিরা গান গেয়ে মেয়ে পাখিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। শব্দের বৈচিত্র্য আর সুরের শক্তি দিয়ে তারা যেন নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক গায়ক পাখি ছোটবেলায় বড়দের কাছ থেকে গান শেখে, ঠিক যেমন মানুষ ভাষা শেখে। এই শেখার জন্য পাখিদের মস্তিষ্কে বিশেষ নিউরাল নেটওয়ার্ক গঠিত হয়। যেমন জেব্রা ফিঞ্চ বা সোনালিকা নামের পাখি একধরনের অডিটরি-মোটর লুপ ব্যবহার করে গান শেখে ও মনে রাখে।
মানুষ যেমন স্বরযন্ত্র (Larynx) ব্যবহার করে কথা বলে, পাখিরা ব্যবহার করে কণ্ঠ–অঙ্গ বা সিরিনক্স (Syrinx)। এটি পাখির শ্বাসনালির নিচের দিকে থাকে এবং এখানে বাতাস প্রবাহিত হলে তা শব্দে রূপ নেয়। সিরিনক্সের জটিল কাঠামোর জন্য পাখিরা একই সঙ্গে দুটি আলাদা সুর তুলতে পারে, যা মানুষ পারে না!
পাখির কোলাহল ও গান শুনলে মানুষের মন শান্ত হয়, চাপ কমে যায়। এটি এক প্রাকৃতিক মেডিটেশন, যা উদ্বেগ কমিয়ে মানসিক প্রশান্তি আনতে সাহায্য করে। পাখির কোলাহল শুনে মানুষের মধ্যে জীবনধারার গতিশীলতা অনুভূত হয়। এই গান আমাদের সক্রিয় ও প্রাণবন্ত থাকার উদ্দীপনা দেয়। সুতরাং পাখিদের গান মানুষের মনের জন্য একধরনের প্রাকৃতিক ওষুধ, যা মানসিক ও আত্মিক কল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
সিরিনক্স পাখির শ্বাসনালির নিচের দিকে থাকে এবং এখানে বাতাস প্রবাহিত হলে তা শব্দে রূপ নেয়। সিরিনক্সের জটিল কাঠামোর জন্য পাখিরা একই সঙ্গে দুটি আলাদা সুর তুলতে পারে, যা মানুষ পারে না!
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিচিকিৎসা অনুষদের সাবেক ডিন ও গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমান বলেন, পুরুষ পাখির যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন হলো গান নিয়ন্ত্রণের জন্য সাহায্যকারী প্রাথমিক হরমোন। গানের বিকাশ, গঠন ও গান গাওয়ার প্রেরণাকে প্রভাবিত করে এই হরমোন। পুরুষ গায়ক পাখিদের ক্ষেত্রে প্রজনন ঋতুতে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সাধারণত বৃদ্ধি পায়, যা গান গাওয়ার কার্যকলাপ বৃদ্ধির সঙ্গে মিলে যায়। এটি গান তৈরির জন্য দায়ী মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোকে প্রভাবিত করে, যার মধ্যে রয়েছে গান নিয়ন্ত্রণকারী নিউক্লিয়াস ও পাখির কণ্ঠ–অঙ্গ বা সিরিনক্স। টেস্টোস্টেরন ইস্ট্রোজেনে রূপান্তরিত হতে পারে, যা গান নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে গানের গঠনের বিকাশ ও সংগঠনে।
তবে টেস্টোস্টেরন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক হলেও সামাজিক পরিবেশ ও স্নায়ুতন্ত্রের মতো অন্য উৎপাদকগুলোও গানকে প্রভাবিত করে। কোনো কোনো প্রজাতির স্ত্রী পাখিও গান গাইতে পারে এবং তাদের গান গাওয়ার আচরণও হরমোনের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়, বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা এবং গানের ওপর তাদের প্রভাব ঋতুভেদে পরিবর্তিত হতে পারে, প্রজনন ঋতুতে প্রায়ই উচ্চমাত্রা এবং গান গাওয়ার কার্যকলাপ বৃদ্ধি লক্ষ করা যায়।
বুলবুল নানা রকম ছন্দ ও স্বরে গান গায়, অনেক সময় শব্দ নকলও করতে পারে। এরা শহরাঞ্চলে সহজেই মানিয়ে নেয়। দ্রুত সুর পাল্টাতে পারে।
কোন পাখি কীভাবে গান করে
নাইটিঙ্গেল: নাইটিঙ্গেল একটানা কয়েক ঘণ্টা গান গাইতে পারে এবং তার গান বেশ জটিল ও সুরেলা। নাইটিঙ্গেলের গলায় প্রায় ২০০ প্রকার সুর থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা গান গাওয়ার সময় শ্বাস নেওয়ার মাঝখানে দ্রুত ও নিখুঁতভাবে শব্দ পরিবর্তন করে। সঙ্গী আকর্ষণ ও এলাকা ঘোষণার জন্যই এরা গান করে।
কোকিল বা এশিয়ান কোয়েল (Koel): পুরুষ কোকিল ‘কু-উ কু-উ’, এই বিখ্যাত ডাক দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে। এটা অনেক দূর থেকে শোনা যায়। স্ত্রী কোকিলকে আকর্ষণ করার জন্যই এরা গান করে। গ্রীষ্মকালে এই গান বেশি শোনা যায়। কারণ, এটি প্রজনন মৌসুম। গান শুনেই আমরা বুঝি কোকিল এসেছে।
বুলবুল: বুলবুল নানা রকম ছন্দ ও স্বরে গান গায়, অনেক সময় শব্দ নকলও করতে পারে। এরা শহরাঞ্চলে সহজেই মানিয়ে নেয়। দ্রুত সুর পাল্টাতে পারে।
ময়না: এরা কণ্ঠ অনুকরণের মাস্টার। মানুষের ভাষা বা অন্য পাখির শব্দ অনুকরণে দারুণ পারদর্শী। কণ্ঠে দুটি সাউন্ড সোর্স থাকে। ফলে একসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সুর তুলতে পারে। এদের গানের উদ্দেশ্য যোগাযোগ, সতর্কতা ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা।
পুরুষ কোকিল ‘কু-উ কু-উ’, এই বিখ্যাত ডাক দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে। এটা অনেক দূর থেকে শোনা যায়। স্ত্রী কোকিলকে আকর্ষণ করার জন্যই এরা গান করে। গ্রীষ্মকালে এই গান বেশি শোনা যায়।
জেব্রা ফিঞ্চ: শেখা ও অনুশীলনের মাধ্যমে গান করে। মানুষের ভাষা শেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর অনেকটা মিল রয়েছে। এই পাখি সঙ্গী আকর্ষণ ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করতে চায়।
শ্যামা: উচ্চ স্বরে ও বৈচিত্র্যময় সুরে গান গায়। দিনের শুরুতে এবং কখনো কখনো সন্ধ্যায়ও এদের গান শোনা যায়। গান অনেকটা কথোপকথনের মতো, একেকটি টোন মানে একেকটি বার্তা। পুরুষ শ্যামা অন্য শ্যামার গান অনুকরণ করতে পারে। সঙ্গীকে আকর্ষণ ও প্রতিযোগীদের হুঁশিয়ারি দেওয়ার জন্য এরা গান করে।
টিয়া: সরাসরি গান গায় না, তবে অসাধারণ শব্দ অনুকরণের ক্ষমতা রাখে। মানুষের কথা, ঘণ্টা, কোকিলের ডাক—সব অনুকরণ করতে পারে। মানুষের ভাষার স্বর-ছন্দ ধরে ফেলে। পাখিটি সিরিনক্স ও জিব নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত দক্ষ।
চড়ুই: ছোট ছোট ‘চিপ চিরিক’ ধরনের শব্দে গান গায়। গান তেমন জটিল নয়, তবে নির্বিচার ও সামাজিকভাবে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করে। দলীয় যোগাযোগ, সতর্কসংকেত, বাসার অবস্থান জানানোর জন্যই তাদের এই ডাকাডাকি।
গান অনেকটা কথোপকথনের মতো, একেকটি টোন মানে একেকটি বার্তা। পুরুষ শ্যামা অন্য শ্যামার গান অনুকরণ করতে পারে। সঙ্গীকে আকর্ষণ ও প্রতিযোগীদের হুঁশিয়ারি দেওয়ার জন্য এরা গান করে।
লাইরবার্ড: পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ অনুকরণকারী পাখি হিসেবে পরিচিত। ক্যামেরার ক্লিক, অন্য পাখির ডাক—সব অনুকরণ করতে পারে। জটিল ও দীর্ঘ সুরের মাধ্যমে এরা নিজের প্রতিভা দেখায়। মূলত সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতেই এই ‘নাটকীয়’ গান গায় পাখিটি।
মকিংবার্ড: শতাধিক পাখির গান নকল করতে পারে। একটানা মিনিট দশেক গাইতেও পারে, প্রতিটি প্যাটার্ন আলাদা। অন্যদের গান অনুকরণ করে সুরের বৈচিত্র্য বাড়ায়। সঙ্গীকে প্রভাবিত করতে এবং প্রতিযোগীদের ভয় দেখাতেই মূলত এরা গান করে।
কাঠঠোকরা: শব্দ তৈরি করে গাছের গায়ে ঠোকর দিয়ে গান করে, যা একধরনের ড্রামিং। তবে এটা গান না হলেও সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি এলাকা চিহ্নিত করার ও সঙ্গীকে জানানোর একরকম ভাষা।
মকিংবার্ড একটানা মিনিট দশেক গাইতেও পারে, প্রতিটি প্যাটার্ন আলাদা। অন্যদের গান অনুকরণ করে সুরের বৈচিত্র্য বাড়ায়। সঙ্গীকে প্রভাবিত করতে এবং প্রতিযোগীদের ভয় দেখাতেই মূলত এরা গান করে।
ইদানীং পাখিদের গান কম শোনা যায়
বড় শহর বা শিল্পাঞ্চলে এখন এত বেশি কোলাহল—গাড়ি, কলকারখানা, হর্ন, নির্মাণকাজ; যার ফলে পাখির গান চাপা পড়ে যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের শব্দমাত্রা প্রতি ১০ ডেসিবেল বাড়লে পাখিরা তাদের গানের সময়সীমা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে ফেলে। ফলে পাখি গান গাইলেও আমরা শুনতে পাই না। অনেক পাখি গান গাওয়াই বন্ধ করে দেয়। কারণ, তারা নিজেদের সঙ্গীর কাছেও পৌঁছাতে পারে না।
পাখিদের বাসা বাঁধা ও গান গাওয়ার জন্য গাছ, ঝোপঝাড় ও শান্ত পরিবেশ দরকার; কিন্তু নগরায়ণের কারণে গাছ কাটা পড়ছে, বন কমছে। যেসব পাখি জায়গা পাচ্ছে না, তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ প্রজনন ঋতুতেও ফিরে আসে না। কারণ, বাসা বাঁধার জায়গা নেই।
বায়ুদূষণ ও কীটনাশক শুধু মানুষের ক্ষতি করে না, পাখিদের স্নায়ুতন্ত্রেও প্রভাব ফেলে। এ কারণে তাদের গানের স্বাভাবিক ছন্দ বদলে যায়, অনেক সময় তারা নিঃশব্দ হয়। বিশেষত কীটনাশক পাখিদের খাদ্যচক্রে হস্তক্ষেপ করে, যার ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে তাদের গান গাওয়ার ক্ষমতা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতুর স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়েছে, পাখির প্রজননের সময় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে গানের সময়ের ওপর। যে পাখি আগে মার্চ-এপ্রিলে গাইত, এখন হয়তো গাইছে ফেব্রুয়ারিতে—যখন আমরা হয়তো শুনতেই পাই না।