বৃষ্টিতে পাখিদের পৃথিবী

মানুষ যখন বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে আশ্রয় খোঁজে, তখন পাতার আড়ালে, ঝোপের ভেতরে, বিলের কিনারে কিংবা আকাশের নিচু স্তরে পাখিদের শুরু হয় এক নীরব কর্মযজ্ঞ। কোনো পাখি বাসা বোনে, কোনোটি ছানার জন্য পোকা খোঁজে, কোনো পাখি আবার বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় ডানা গুটিয়ে বসে থাকে।

বর্ষাকাল পাখিদের কাছে জীবনচক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়েই বহু আবাসিক পাখি ডিম পাড়ে, ছানা বড় করে, নতুন প্রজন্মকে উড়তে শেখায়।

প্রশ্ন হলো, কেন বছরের সবচেয়ে ভেজা, সবচেয়ে অনিশ্চিত ঋতুকেই প্রজননের জন্য বেছে নেয় পাখি?

উত্তরটি লুকিয়ে আছে বিবর্তন, জলবায়ু, প্রাণিবিজ্ঞান ও পরিবেশবিদ্যার গভীরে।

আরও পড়ুন
ব্যাঙ প্রজননে নামে আর তাদের ডিম, ব্যাঙাচিও হয়ে ওঠে বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ জলাভূমিনির্ভর অনেক পাখির খাদ্য; অর্থাৎ বৃষ্টি শুধু গাছকে সবুজ করে না, এটি পুরো খাদ্যজালকে সক্রিয় করে তোলে।

বর্ষা মানেই পাখিদের ভোজ

প্রথম বৃষ্টির পর আমরা লক্ষ করি, শুষ্ক মাটি জীবন্ত হয়ে ওঠে। রাতে ডেকে ওঠে ব্যাঙ। জানালার আলোয় ভিড় করে অসংখ্য পোকা। সকালে উঠেই দেখা যায়, ঘাসের ডগায় ফড়িং, মাটির ওপর কেঁচো, বাতাসে উড়ছে ডানাওয়ালা উইপোকা।

এটি কোনো কাকতাল নয়; বৃষ্টির পানি মাটির আর্দ্রতা বাড়ায়, তাপমাত্রা কিছুটা কমায় এবং বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বাড়িয়ে দেয়। এ পরিবর্তন অসংখ্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীর জীবনচক্রকে সক্রিয় করে। অনেক কীটপতঙ্গের ডিম দীর্ঘদিন সুপ্ত অবস্থায় থাকে; পর্যাপ্ত আর্দ্রতা পেলেই তা ফুটতে শুরু করে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে মাটির ভেতর অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে এবং মাটি জলসিক্ত হয়ে পড়লে কেঁচো ওপরে উঠে আসে। ব্যাঙ প্রজননে নামে আর তাদের ডিম, ব্যাঙাচিও হয়ে ওঠে বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ জলাভূমিনির্ভর অনেক পাখির খাদ্য; অর্থাৎ বৃষ্টি শুধু গাছকে সবুজ করে না, এটি পুরো খাদ্যজালকে সক্রিয় করে তোলে।

সকালে উঠেই দেখা যায়, ঘাসের ডগায় ফড়িং
ছবি: আরিফুল গণি

প্রকৃতিবিদেরা একে বলেন ‘রিসোর্স পালস’। অল্প সময়ের জন্য খাদ্যের হঠাৎ প্রাচুর্য। পৃথিবীর অনেক বাস্তুতন্ত্রে বৃষ্টি এমন একটি সংকেত, যা অসংখ্য প্রাণীর জীবনচক্র একসঙ্গে শুরু করে দেয়; অর্থাৎ যে পাখি শুষ্ক মৌসুমে ডিম পাড়ে, তাদের ছানারা কম খাবার পায় আর যে পাখি ডিম পাড়ে বর্ষার শুরুতে, তাদের ছানারা বেশি খাবার পায়। কারণ, তখন পোকামাকড়ে ভরে যায় প্রকৃতি। এতে পেটপুরে খেয়ে ছানা দ্রুত বড় হয়। এদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বাড়ে। এই পাখিরা বড় হয়ে একই বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন
বৃষ্টির পানি মাটির আর্দ্রতা বাড়ায়, তাপমাত্রা কিছুটা কমায় এবং বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বাড়িয়ে দেয়। এ পরিবর্তন অসংখ্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীর জীবনচক্রকে সক্রিয় করে।

জীববিজ্ঞানে এ সময়গত সামঞ্জস্যকে বলা হয় ফেনোলজি; অর্থাৎ ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে জীবের জীবনচক্রের সম্পর্ক। কোন গাছে কখন ফুল ফুটবে, কোন প্রজাপতি কখন ডিম দেবে, কোন পাখি কখন বাসা বানাবে—এসবই ফেনোলজির অংশ।

একটি দোয়েলের বাসায় যদি চারটি ছানা থাকে, তবে মা–বাবাকে সূর্য ওঠা থেকে সূর্য ডোবা পর্যন্ত প্রায় অবিরাম খাবার এনে দিতে হয়। ছোট কীটভুক পাখির একটি ছানাকে দিনে শত শতবার খাবার খাওয়াতে হয়। প্রজাতি, বয়স ও খাবারের আকারভেদে এ সংখ্যা বদলে যায়। ছানাদের বিপাক হার এত বেশি যে কয়েক ঘণ্টা খাবার না পেলেই তারা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

সাদা বক পানিতে মাছ, ব্যাঙ ও জলজ প্রাণী খুঁজছে
ছবি: সাদ্দাম হোসেন

বৃষ্টির পর যদি আপনি কোনো মাঠে দাঁড়িয়ে থাকেন, দেখবেন ফিঙে বারবার উড়ে গিয়ে বাতাস থেকে পোকা ধরে আনছে। আবাবিল নিচু হয়ে উড়ছে। কারণ, আর্দ্র আবহাওয়ায় অনেক উড়ন্ত পোকামাকড়ও নিচু স্তরে চলে আসে। সাদা বক নতুন জলে ডুবে যাওয়া জমিতে মাছ, ব্যাঙ ও জলজ প্রাণী খুঁজছে। মাছরাঙা ফুলে ওঠা খাল বা ডোবায় শিকারের অপেক্ষায় ডালে নিশ্চুপ বসে আছে।

দেখতে আলাদা মনে হলেও এসব দৃশ্যের পেছনে কাজ করছে একই বৈজ্ঞানিক সূত্র—খাদ্যের প্রাচুর্য প্রজননকে সফল করে।

আরও পড়ুন
বক, কাক কিংবা শিকারি পাখিরা অনেক সময় শরীর নিচু করে, ঘাড় গুটিয়ে, ডানা শরীরের সঙ্গে চেপে ধরে বৃষ্টির তীব্রতা কমিয়ে আনে। বাইরে থেকে মনে হয়, তারা নিশ্চুপ বসে আছে।

ডানায় পানি লাগে, শরীরে নয়

বৃষ্টির দুপুর। হঠাৎ ঝম ঝম করে নেমেছে বর্ষণ। কয়েক মুহূর্ত আগেও মাঠের ওপর চক্কর দেওয়া ফিঙেটি আর দেখা যাচ্ছে না। দোয়েলের গানও থেমে গেছে। আমগাছের ডালে বসে থাকা শালিকগুলো যেন নিঃশব্দ।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, বৃষ্টি নামলেই পাখিদের জীবনও থেমে যায়। কিন্তু সত্যি হলো, পাখিরা বৃষ্টিকে এড়ায় না, তারা বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবন যাপন করে।

বৃষ্টি এলে তারা কোথায় যায়? মানুষের মতো ছাতা না থাকলেও পাখিদের আশ্রয় বেছে নেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, বৃষ্টি নামলেই পাখিদের জীবনও থেমে যায়
ছবি: হাসান মাহমুদ

ছোট পাখিরা সাধারণত গাছের বাইরের ডালে বসে না। তারা চলে যায় পাতার ঘন স্তরের ভেতরে। কারণ, সেখানে বৃষ্টির ফোঁটা অনেকটাই আটকে যায়, বাতাসও কম লাগে। বাঁশঝাড়, ঝোপ কিংবা লতাপাতায় ঢাকা গাছও তাদের নিরাপদ আশ্রয়।

বড় পাখিদের কৌশল আবার আলাদা। বক, কাক কিংবা শিকারি পাখিরা অনেক সময় শরীর নিচু করে, ঘাড় গুটিয়ে, ডানা শরীরের সঙ্গে চেপে ধরে বৃষ্টির তীব্রতা কমিয়ে আনে। বাইরে থেকে মনে হয়, তারা নিশ্চুপ বসে আছে, কিন্তু আসলে তারা শক্তি সঞ্চয় করছে।

কারণ, বৃষ্টির মধ্যে উড়তে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি লাগে।

আরও পড়ুন
ছোট পাখিরা চলে যায় পাতার ঘন স্তরের ভেতরে। কারণ, সেখানে বৃষ্টির ফোঁটা অনেকটাই আটকে যায়, বাতাসও কম লাগে। বাঁশঝাড়, ঝোপ কিংবা লতাপাতায় ঢাকা গাছও তাদের নিরাপদ আশ্রয়।

পালক ভিজলেও পাখি ভেজে না

এটি বর্ষার সবচেয়ে বিস্ময়কর বিজ্ঞানগুলোর একটি। পাখির শরীরের লেজের গোড়ায় একটি ছোট গ্রন্থি থাকে। একে বলা হয় ইউরোপাইজিয়াল গ্রন্থি।

এই গ্রন্থি থেকে একধরনের তৈলাক্ত পদার্থ বের হয়। পাখি ঠোঁট দিয়ে সেই তেল শরীরের পালকে ছড়িয়ে দেয়। তাই পালকের বাইরের স্তরে পানি সহজে জমে থাকে না; অনেকটা পদ্মপাতার ওপর পানির ফোঁটার মতো গড়িয়ে পড়ে।

পাখির প্রতিটি পালকে অসংখ্য ক্ষুদ্র বার্ব ও বার্বিউল থাকে
ছবি: সংগৃহীত

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। অনেকেই মনে করেন, এই তেলই পুরো পালককে জলরোধী করে। আসলে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, জল প্রতিরোধের পেছনে পালকের সূক্ষ্ম গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিটি পালকে অসংখ্য ক্ষুদ্র বার্ব ও বার্বিউল থাকে। এগুলো হুকের মতো একে অপরের সঙ্গে আটকে একটি ঘন স্তর তৈরি করে। ফলে পানি ভেতরে ঢুকতে পারে না, আবার পালকের ভেতরে বাতাসের একটি স্তরও আটকে থাকে। এই বাতাসই পাখির শরীরকে উষ্ণ রাখে।

এক অর্থে, প্রতিটি পাখি নিজের গায়ে একটি প্রাকৃতিক রেইনকোট আর থার্মোস ফ্লাস্ক—দুটিই বহন করে।

আরও পড়ুন
প্রবল বৃষ্টির শব্দে পাখির ডাক দূরে পৌঁছায় না। শব্দতরঙ্গ বৃষ্টির আওয়াজে চাপা পড়ে যায়। অকারণে ডাকতে থাকলে শক্তি নষ্ট হয়, লাভ হয় না। তাই অনেক প্রজাতির পাখি বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করে।

কেন বৃষ্টিতে গান কমে যায়

বর্ষার সকালে পাখির ডাক শোনা গেলেও প্রবল বর্ষণে চারপাশ হঠাৎ নীরব হয়ে যায়।

এরও বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। পাখির গান মূলত তিনটি কাজে লাগে—নিজের এলাকা জানানো, সঙ্গীকে আকর্ষণ করা এবং যোগাযোগ বজায় রাখা।

ভারী বর্ষণের পরপরই চারপাশে আবার একসঙ্গে পাখির ডাক শুরু হয়
ছবি: সোয়েল রানা

কিন্তু প্রবল বৃষ্টির শব্দে সেই ডাক দূরে পৌঁছায় না। শব্দতরঙ্গ বৃষ্টির আওয়াজে চাপা পড়ে যায়। অকারণে ডাকতে থাকলে শক্তি নষ্ট হয়, লাভ হয় না। তাই অনেক প্রজাতির পাখি বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করে।

আপনি যদি খেয়াল করেন, ভারী বর্ষণের পরপরই চারপাশে আবার একসঙ্গে পাখির ডাক শুরু হয়। যেন কেউ অদৃশ্য অর্কেস্ট্রার পরিচালক হয়ে সবাইকে একসঙ্গে গান শুরু করার সংকেত দিয়েছে।

আরও পড়ুন
বৃষ্টি পাখিদের বন্ধু, কিন্তু অতিবৃষ্টি নয়। টানা কয়েক দিনের বর্ষণে বাসা পানিতে ডুবে যেতে পারে। গাছ ভেঙে পড়ে ডিম ও ছানা নষ্ট হতে পারে। উড়ন্ত পোকামাকড় কমে গেলে খাদ্য সংগ্রহ কঠিন হয়।

প্রকৃতির পরীক্ষা: প্রাচুর্যের আড়ালে বিপদ

বর্ষার প্রাচুর্যের একটি অন্ধকার দিকও আছে। টানা বৃষ্টিতে যদি কয়েক দিন ধরে পোকামাকড় কম ওড়ে, তবে ছানাদের খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। ঝড়ে বাসা ভেঙে যেতে পারে। নিচু গাছের বাসা পানিতে ডুবে যায়। অনেক ছানা ঠান্ডায় মারা যায়। প্রকৃতির এই মৌসুম আসলে একধরনের পরীক্ষা।

যে পাখি ভালো বাসা বানাতে পারে, দ্রুত খাবার জোগাড় করতে পারে এবং ছানাদের নিরাপদে বড় করতে পারে, তারাই পরবর্তী প্রজন্ম রেখে যেতে পারে।

বৃষ্টি পাখিদের বন্ধু, কিন্তু অতিবৃষ্টি নয়। টানা কয়েক দিনের বর্ষণে বাসা পানিতে ডুবে যেতে পারে। গাছ ভেঙে পড়ে ডিম ও ছানা নষ্ট হতে পারে। উড়ন্ত পোকামাকড় কমে গেলে খাদ্য সংগ্রহ কঠিন হয়। ভেজা পালকে শরীরের তাপ ধরে রাখতে বেশি শক্তি ব্যয় হয়।

বৃষ্টি পাখিদের বন্ধু, কিন্তু অতিবৃষ্টি নয়
ছবি: এম সাদেক

বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে আমরা হয়তো শুধু মেঘ দেখি। কিন্তু সেই একই সময়ে একটি বাবুই হয়তো বাসার শেষ সুতাটি বুনছে। একটি দোয়েল হয়তো ৫০তমবারের মতো ছানার মুখে পোকা তুলে দিচ্ছে। একটি আবাবিল হয়তো বাতাসের ভেতর অদৃশ্য পোকামাকড়ের পথ অনুসরণ করছে।

বর্ষা পাখিদের কাছে কাজের মৌসুম। বিজ্ঞান আমাদের বলে, এই দৃশ্যগুলো কোনো কাকতাল নয়। প্রতিটি উড়ান, প্রতিটি বাসা, প্রতিটি ডিম, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি বছরের বিবর্তন, সূক্ষ্ম পরিবেশগত সম্পর্ক এবং এক বিস্ময়কর অভিযোজনের ইতিহাস।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন