বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। গণিতের দুনিয়ায় তখন রীতিমতো উৎসবের আমেজ। ডেভিড হিলবার্ট১, বার্ট্রান্ড রাসেলের২ মতো মহারথীরা তখন অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে আছেন। তাঁদের বুকভরা বিশ্বাস, গণিত হলো এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত ও ত্রুটিহীন ভাষা। এই ভাষায় এমন কোনো সত্য নেই, যা কোনোদিন প্রমাণ করা যাবে না। সে যুগের গণিতবিদদের ডিকশনারিতে অসম্ভব বলে কোনো শব্দই ছিল না!
কিন্তু ১৯৩১ সালে হঠাৎ করেই যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত! ২৫ বছর বয়সী এক ছিপছিপে, লাজুক তরুণ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন। চুপচাপ স্বভাবের সেই তরুণ খুব শান্ত গলায় পুরো পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন, ‘আপনারা ভুল ভাবছেন। গণিতে এমন অনেক সত্য লুকিয়ে আছে, যা চিরকাল সত্য হলেও আপনারা কোনোদিন তা প্রমাণ করতে পারবেন না!’
একটা শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা ফাটলেও হয়তো গণিতবিদদের মনে এত বড় ধাক্কা লাগত না! শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা গণিতের নিখুঁত অহংকার এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। কে এই তরুণ, যিনি চোখের পলকে পাল্টে দিলেন পুরো বিজ্ঞান ও দর্শনের ইতিহাস?
তাঁর নাম কুর্ট গোডেল। তাঁকে বলা হয় ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুক্তিবিদ। অ্যারিস্টটল৩ বা গটফ্রিড লিবনিজের৪ মতো দিকপালদের পাশেই উচ্চারিত হয় তাঁর নাম। আধুনিক কম্পিউটারের জন্ম থেকে শুরু করে দর্শনের অনেক গভীর প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর কাজের মাঝে। কিন্তু সর্বকালের অন্যতম সেরা এই প্রতিভাবান মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম বিষণ্ণতা, মানসিক টানাপোড়েন এবং ট্র্যাজেডিতে ভরা। চলুন, গণিতের এই বিষণ্ণ জাদুকরের জীবনের গভীরে ঢুঁ মারা যাক।
কুর্ট গোডেলকে বলা হয় ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুক্তিবিদ। অ্যারিস্টটল বা গটফ্রিড লিবনিজের মতো দিকপালদের পাশেই উচ্চারিত হয় তাঁর নাম।
দুই
কুর্ট গোডেলের জন্ম ১৯০৬ সালের ২৮ এপ্রিল, ব্রনো শহরে। শহরটি বর্তমানে চেক প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হলেও, সে যুগে এটি ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অংশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ব্রনোর বেশির ভাগ মানুষই জার্মান ভাষায় কথা বলতেন। গোডেলের পরিবার ছিল বেশ অবস্থাসম্পন্ন। বাবা রুডলফ গোডেল ছিলেন ব্রনোর একটি বিশাল টেক্সটাইল কারখানার ম্যানেজিং ডিরেক্টর। রুডলফ ছিলেন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান, মা মারিয়ানে ছিলেন প্রোটেস্ট্যান্ট৫। বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর বড় ভাইয়ের নাম রাখা হয় রুডলফ। দুই ভাইকেই প্রোটেস্ট্যান্ট রীতিতে বড় করা হয়। যদিও ওই অঞ্চলে ক্যাথলিকদেরই আধিপত্য ছিল।
ছোটবেলা থেকেই গোডেল ছিলেন অসম্ভব কৌতূহলী। যেকোনো কিছু দেখলেই তাঁর মনে হাজারো প্রশ্ন জাগত। এই অন্তহীন কৌতূহলের কারণে পরিবারের লোকজন তাঁর ডাকনামই দিয়ে ফেলেছিল হের ভারুম। এই নামের ইংরেজি অর্থ মিস্টার হোয়াই।
তবে তাঁর শৈশব খুব একটা মসৃণ ছিল না। শারীরিকভাবে তিনি বেশ দুর্বল ছিলেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি বাতজ্বরে আক্রান্ত৬ হন। সেবার ভালোয় ভালোয় সুস্থ হয়ে উঠলেও, এই রোগ তাঁর মনে গভীর দাগ কেটে যায়। আট বছর বয়সে তিনি যখন বড়দের মেডিকেল বইপত্র পড়া শুরু করেন, তখন তাঁর মনে এক অদ্ভুত ধারণা জন্ম নেয়। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, ওই জ্বরের কারণে তাঁর হৃৎপিণ্ড চিরস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই অমূলক ভয় তাঁর পিছু ছাড়েনি কোনোদিন। এখান থেকেই তাঁর মনে হাইপোকনড্রিয়ার বীজ রোপিত হয়, যা তাঁকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। অকারণে নিজের অসুস্থতা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার মানসিক রোগের নাম হাইপোকনড্রিয়া।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান৭ সাম্রাজ্য ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে চেকোস্লোভাকিয়া। ফলে গোডেলের পরিবার হঠাৎ করেই নিজেদের দেশে জার্মানভাষী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। নতুন প্রতিষ্ঠিত এই চেকোস্লোভাকিয়ায় গোডেল নিজেকে বহিরাগত মনে করতেন। তিনি চেক ভাষা খুব একটা ভালো বলতে পারতেন না। তাঁর মতো অনেক জার্মানভাষী অধিবাসী তখনো নিজেদের অস্ট্রিয়ান বলেই মনে করতেন।
স্কুলের ছাত্র হিসেবে গোডেল ছিলেন এককথায় অসাধারণ। ব্রনোতে স্কুলজীবন শেষ করার আগেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমানের গণিত আয়ত্ত্ব করে ফেলেছিলেন। গণিতের পাশাপাশি ভাষা শেখার প্রতিও তাঁর দারুণ ঝোঁক ছিল। তাঁর বড় ভাই পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, পুরো হাইস্কুল জীবনে গোডেল ল্যাটিন ভাষায় একটিও ব্যাকরণগত ভুল করেননি! বলাই বাহুল্য, স্কুলের সব পরীক্ষায় তিনি সব সময় সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন।
গোডেলের পরিবার হঠাৎ করেই নিজেদের দেশে জার্মানভাষী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। নতুন প্রতিষ্ঠিত এই চেকোস্লোভাকিয়ায় গোডেল নিজেকে বহিরাগত মনে করতেন।
তিন
১৯২৩ সালে গোডেল অস্ট্রিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং ভিয়েনায় চলে যান। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে। সেখানে তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত পদার্থবিদ ও দার্শনিক মরিৎজ শ্লিক, গণিতবিদ হ্যান্স হান, কার্ল মেঙ্গার এবং ফিলিপ ফুর্তওয়াংলার।
অধ্যাপক ফুর্তওয়াংলার ছিলেন অসাধারণ গণিতবিদ। কিন্তু ঘাড়ের নিচ থেকে তাঁর পুরো শরীর ছিল অবশ। তিনি হুইলচেয়ারে বসে লেকচার দিতেন। তাঁর এক সহকারী সমীকরণগুলো লিখে দিতেন বোর্ডে। শারীরিক এই চরম অক্ষমতা সত্ত্বেও গণিতের প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা ও প্রতিভা ছিল, তা তরুণ গোডেলকে প্রবলভাবে মুগ্ধ করে। এই ফুর্তওয়াংলারের লেকচার শুনেই গোডেল পদার্থবিজ্ঞান ছেড়ে গণিতের দিকে ঝোঁকেন। পদার্থবিজ্ঞান বদলে মেইন সাবজেক্ট করেন গণিত। এরপর মরিৎজ শ্লিকের পরিচালনায় বার্ট্রান্ড রাসেলের ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ফিলোসফি বইটির ওপর একটি সেমিনারে অংশ নেওয়ার পর গাণিতিক যুক্তিশাস্ত্রের প্রতি গোডেলের গভীর আগ্রহ জন্মায়।
ছাত্রাবস্থাতেই গোডেল ভিয়েনা সার্কেলের সদস্য হন। এটি ছিল দার্শনিক, বিজ্ঞানী, যুক্তিবিদ ও গণিতবিদদের একটি বিখ্যাত সম্মেলন। ১৯২৪ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতো। মরিৎজ শ্লিক ছিলেন এর প্রধান। এই ভিয়েনা সার্কেলেই গোডেল সে যুগের গণিতের সবচেয়ে বড় সংকট সম্পর্কে জানতে পারেন।
উনিশ শতকের শেষের দিকে জর্জ ক্যান্টর সেট থিওরি৮ আবিষ্কার করেছিলেন। এই থিওরিই গণিতের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু সেট থিওরিতে কিছু অদ্ভুত প্যারাডক্স ধরা পড়ে। যেমন, বার্ট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত রাসেলস প্যারাডক্স৯ একটি। ফলে গণিতের ভিত নড়ে যায়। গণিতবিদেরা তখন মরিয়া হয়ে এমন একটি নিখুঁত ভিত্তি বা স্বতঃসিদ্ধ খুঁজতে শুরু করেন, যা দিয়ে গণিতের সবকিছু কোনো রকম প্যারাডক্স ছাড়াই প্রমাণ করা যাবে।
এই স্বপ্নের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট। হিলবার্টের স্বপ্ন বা হিলবার্টস প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল কয়েকটি। সেগুলো হলো:
১. সম্পূর্ণতা: প্রমাণ করতে হবে, গণিতের সব সত্যকে নির্দিষ্ট নিয়মের সাহায্যে প্রমাণ করা সম্ভব।
২. ধারাবাহিকতা: প্রমাণ করতে হবে, গণিতের ভেতরে কোনো প্যারাডক্স নেই।
৩. মীমাংসযোগ্যতা: এমন একটি অ্যালগরিদম বা পদ্ধতি থাকতে হবে, যা দিয়ে যেকোনো গাণিতিক বাক্যের সত্য বা মিথ্যা হওয়া নির্ধারণ করা যায়।
আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড১০ এবং বার্ট্রান্ড রাসেল এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই ১৯১০ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে তিন খণ্ডে তাঁদের বিখ্যাত বই প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা১১ প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা এমন এক জটিল যৌক্তিক কাঠামো দাঁড় করান, যেখানে শুধু ১ + ১ = ২ প্রমাণ করতেই তাঁদের ৩৬০ পৃষ্ঠার মতো লিখতে হয়েছিল!
১৯২৮ সালে ইতালির বোলোগনায় ডেভিড হিলবার্ট গণিতের সম্পূর্ণতা ও ধারাবাহিকতার ওপর একটি বিখ্যাত লেকচার দেন। গোডেল সেই লেকচার শুনে মুগ্ধ হন এবং নিজের পিএইচডি গবেষণার জন্য এই বিষয়টিকেই বেছে নেন। ১৯২৯ সালে, মাত্র ২৩ বছর বয়সে, হ্যান্স হানের তত্ত্বাবধানে তিনি তাঁর ডক্টরেট থিসিস জমা দেন।
অধ্যাপক ফুর্তওয়াংলার ছিলেন অসাধারণ গণিতবিদ। কিন্তু ঘাড়ের নিচ থেকে তাঁর পুরো শরীর ছিল অবশ। তিনি হুইলচেয়ারে বসে লেকচার দিতেন। তাঁর এক সহকারী সমীকরণগুলো লিখে দিতেন বোর্ডে।
চার
১৯৩১ সাল। গোডেল জার্মানির বিখ্যাত মোনাট্শেফটে ফ্যুর ম্যাথেমাটিক জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। নাম ‘উবার ফরমাল উনএন্টশেইডবারা স্যাটজে ডের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা উন্ড ভেরওয়ান্দ্টার সিস্টেম’। এর বাংলা করলে বাক্যটি দাঁড়ায় এমন: প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত সিস্টেমগুলোর আনুষ্ঠানিকভাবে অমীমাংসযোগ্য বাক্যগুলোর প্রসঙ্গে।
এই একটি গবেষণাপত্র চিরকালের জন্য গণিতের চেহারা বদলে দিল। গোডেল প্রমাণ করে দেখালেন, ডেভিড হিলবার্ট যে নিখুঁত গণিতের স্বপ্ন দেখছেন, তা আসলে একটি মরীচিকা। হিলবার্টের লক্ষ্য অর্জন করা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব। এটিই বিখ্যাত গোডেলের অসম্পূর্ণতা উপপাদ্য।
সহজ ভাষায় তাঁর দুটি উপপাদ্যের প্রথমটি ছিল এরকম, ‘যদি কোনো গাণিতিক সিস্টেম ধারাবাহিক হয়, তবে তা কখনোই সম্পূর্ণ হতে পারে না। এখানে ধারাবাহিক বলতে বোঝানো হয়েছে, গাণিতিক সিস্টেমে কোনো স্ববিরোধিতা বা প্যারাডক্স নেই। অর্থাৎ, গণিতে এমন কিছু সত্য বাক্য সব সময় থাকবে, যা ওই সিস্টেমের ভেতর থেকে প্রমাণ করা অসম্ভব। আর দ্বিতীয় অসম্পূর্ণতা উপপাদ্যটি হলো, ‘কোনো গাণিতিক সিস্টেম তার নিজের ধারাবাহিকতা নিজে নিজে প্রমাণ করতে পারে না।’
কীভাবে তিনি এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন? গোডেল ‘গোডেল নাম্বারিং’ নামে এক অসাধারণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি গণিতের প্রতিটি প্রতীক, সংখ্যা এবং সমীকরণকে একটি নির্দিষ্ট মৌলিক সংখ্যার কোডে পরিণত করেন। এরপর সেই পুরোনো লায়ার প্যারাডক্সের গাণিতিক রূপ দেন।
কিন্তু লায়ার প্যারাডক্স কী? ধরুন কেউ বলল, আমি এখন যে বাক্যটি বলছি, তা মিথ্যা বাক্য। একটু ভাবুন তো, লোকটা কি সত্য বলছে নাকি মিথ্যা? যদি সে সত্যি বলে, তাহলে তার বলা কথাটাও সত্যি। অর্থাৎ সে আসলেই মিথ্যা বলছে! আবার সে যদি মিথ্যা বলে থাকে, তার মানে সে যা বলছে তার উল্টোটা সত্যি। অর্থাৎ সে সত্যি বলছে! বুঝতে পারছেন, বারবার প্যারাডক্স হয়ে যাচ্ছে!
গোডেল গণিতের ভাষায় ঠিক এমনই একটি সমীকরণ তৈরি করলেন, যার অর্থ দাঁড়ায়: এই গাণিতিক বিবৃতিটি প্রমাণ করা অসম্ভব। এখন গণিত পড়ল মহা বিপদে! যদি সমীকরণটি প্রমাণ করা যায়, তার মানে সমীকরণটি ভুল; কারণ সমীকরণ নিজেই বলছে তাকে প্রমাণ করা যাবে না। আর যদি প্রমাণ করা না যায়, তার মানে সমীকরণটি সত্য! অর্থাৎ, গণিতে এমন সত্য আছে, যা প্রমাণ করা যায় না।
গোডেলের এই কাজ হিলবার্টসহ বিশ্বের বাঘা বাঘা গণিতবিদদের হতবাক করে দেয়। জন ফন নিউম্যানের মতো জিনিয়াস এই উপপাদ্য সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আধুনিক যুক্তিশাস্ত্রে কুর্ট গোডেলের অর্জন একক এবং স্মৃতিস্তম্ভের মতো অটল। এটি শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, এটি এমন এক ল্যান্ডমার্ক, যা স্থান ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত দৃশ্যমান থাকবে। গোডেলের এই কাজের পর যুক্তিশাস্ত্রের প্রকৃতি চিরকালের জন্য বদলে গেছে।’
যদি সমীকরণটি প্রমাণ করা যায়, তার মানে সমীকরণটি ভুল; কারণ সমীকরণ নিজেই বলছে তাকে প্রমাণ করা যাবে না। আর যদি প্রমাণ করা না যায়, তার মানে সমীকরণটি সত্য!
পাঁচ
১৯৩৩ সালে গোডেল প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে তিনি আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করেন। ওই বছরই জার্মানিতে হিটলার ক্ষমতায় আসেন এবং অস্ট্রিয়াতেও নাৎসিদের প্রভাব বাড়তে থাকে।
১৯৩৬ সালে ভিয়েনা সার্কেলের প্রতিষ্ঠাতা এবং গোডেলের প্রিয় শিক্ষক মরিৎজ শ্লিককে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিঁড়িতে তাঁরই এক উগ্রপন্থী প্রাক্তন ছাত্র গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনা গোডেলের মানসিক অবস্থার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। তিনি নার্ভাস ব্রেকডাউনের শিকার হন এবং তাঁকে কয়েক মাস একটি মানসিক হাসপাতালে কাটাতে হয়। তাঁর ছোটবেলার সেই হাইপোকনড্রিয়া এবার চরম সন্দেহবাতিকতায় রূপ নেয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন, কেউ হয়তো খাবারে বিষ মিশিয়ে তাঁকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে।
এর মধ্যেই তাঁর জীবনে আসে প্রেম। তিনি অ্যাডেল পোর্কার্ট নামে এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। তবে গোডেলের পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নিতে চায়নি। কারণ, অ্যাডেল ছিলেন গোডেলের চেয়ে ছয় বছরের বড়। আগে অ্যাডেলের একবার বিয়ে হয়েছিল।
তিনি খুব বেশি শিক্ষিতও ছিলেন না। সবচেয়ে বড় কথা, গোডেল ছিলেন প্রোটেস্ট্যান্ট, আর অ্যাডেল ছিলেন ক্যাথলিক। কিন্তু কথায় আছে, প্রেমে যুক্তি চলে না, চলে শুধু মন। তাই গোডেল তাঁর সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। ১৯৩৮ সালের শরতে তাঁরা বিয়ে করেন।
ওই বছরই নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। গোডেল তখন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা বেতনের লেকচারার হিসেবে কাজ করতেন। নতুন নাৎসি সরকারের নিয়মে তাঁকে নতুন করে চাকরির আবেদন করতে হয়। কিন্তু ভিয়েনা সার্কেলের ইহুদি সদস্যদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর আবেদন বাতিল করে দেয়।
১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। গোডেল ভয় পাচ্ছিলেন, যেকোনো সময় তাঁকে জোর করে জার্মান সেনাবাহিনীতে ভর্তি করানো হতে পারে। তাই অ্যাডেলকে নিয়ে তিনি ভিয়েনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়া তখন নিরাপদ ছিল না। তাই তাঁরা চরম ঝুঁকিপূর্ণ এক পথ বেছে নেন। তাঁরা বিখ্যাত ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে ধরে পুরো রাশিয়া পাড়ি দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে পৌঁছান। সেখান থেকে জাহাজে করে জাপান হয়ে নামেন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে। এরপর চলে যান নিউ জার্সির প্রিন্সটনে। সেখানে গোডেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে যোগ দেন।
১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। গোডেল ভয় পাচ্ছিলেন, যেকোনো সময় তাঁকে জোর করে জার্মান সেনাবাহিনীতে ভর্তি করানো হতে পারে।
প্রিন্সটনে আসার পর আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে গোডেলের গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। দুজনের চরিত্র ছিল একদম বিপরীত। আইনস্টাইন ছিলেন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং আড্ডাপ্রিয়। অন্যদিকে গোডেল ছিলেন অন্তর্মুখী, গম্ভীর এবং সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মানুষ। কিন্তু তাঁদের মেধার উচ্চতা তাঁদের এক সুতোয় বেঁধেছিল।
আইনস্টাইন তাঁর জীবনের শেষ দিকে একবার বলেছিলেন, ‘আমি এখন আর নিজের কাজের জন্য ইনস্টিটিউটে আসি না; বিকেলে গোডেলের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে যেন বাড়ি ফিরতে পারি, তাই ইনস্টিটিউটে আসি।’ প্রতিদিন এই দুই মহারথী ইনস্টিটিউট থেকে একসঙ্গে হেঁটে বাড়ি ফিরতেন। তখন পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক চলত।
১৯৪৭ সালে গোডেল মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য পরীক্ষা দিতে যান। তাঁর সঙ্গে সাক্ষী হিসেবে গিয়েছিলেন আইনস্টাইন এবং বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান অর্থনীতিবিদ অস্কার মরগেনস্টার্ন। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় গোডেল মার্কিন সংবিধান তন্নতন্ন করে পড়েন। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, তিনি সংবিধানে এমন একটি যৌক্তিক অসংগতি খুঁজে পান, যা আইনিভাবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব!
আইনস্টাইন এবং মরগেনস্টার্ন ভয়ে ছিলেন, গোডেল হয়তো বিচারকের সামনে এই সংবিধানের ভুল ধরতে গিয়ে নিজের নাগরিকত্বই বাতিল করে বসবেন! যেদিন পরীক্ষা, সেদিন বিচারক ফিলিপ ফোরম্যান গোডেলকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি তো অস্ট্রিয়া থেকে এসেছেন। সেখানে কেমন সরকার ছিল?’ গোডেল বললেন, ‘সেখানকার সরকার আগে প্রজাতন্ত্র ছিল, কিন্তু পরে তা স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়।’ বিচারক বললেন, ‘ভাগ্যিস, আমাদের দেশে এমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই!’ গোডেল তখনই উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘অবশ্যই সুযোগ আছে! আমি প্রমাণ করতে পারি যে সংবিধানে এমন ব্যবস্থা আছে যা দিয়ে...’ আইনস্টাইন এবং মরগেনস্টার্ন তড়িঘড়ি করে গোডেলকে থামিয়ে দেন। বিচারক ফোরম্যানও পরিস্থিতি বুঝতে পেরে হেসে কথা ঘুরিয়ে দেন। গোডেল সফলভাবেই মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়ে যান। এই বিচারক আইনস্টাইনের পূর্বপরিচিত ছিলেন। কিন্তু বিচারক যদি আইনস্টাইনের পূর্বপরিচিত না থাকতেন, তবে কি গোডেল মার্কিন নাগরিকত্ব পেতেন?
আইনস্টাইন এবং মরগেনস্টার্ন ভয়ে ছিলেন, গোডেল হয়তো বিচারকের সামনে এই সংবিধানের ভুল ধরতে গিয়ে নিজের নাগরিকত্বই বাতিল করে বসবেন!
ছয়
গোডেল শুধু গণিত ও লজিক নিয়েই পড়ে থাকেননি, পদার্থবিজ্ঞানেও তাঁর অসাধারণ অবদান রয়েছে। ১৯৪৯ সালে আইনস্টাইনের ৭০তম জন্মদিনে গোডেল তাঁকে একটি উপহার দেন। সেটি ছিল আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সমীকরণের একটি নিখুঁত ও নতুন সমাধান!
বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি গোডেল ইউনিভার্স নামে পরিচিত। গোডেল গাণিতিকভাবে দেখান, মহাবিশ্ব যদি প্রসারিত না হয়ে নিজের অক্ষের ওপর লাটিমের মতো ঘোরে, তবে স্থান-কালের বুনন এমনভাবে বেঁকে যাবে যে ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ তৈরি হবে। মানে, কেউ চাইলে মহাকাশযানে চড়ে স্থান-কালের এই বাঁকানো পথ ধরে সোজা নিজের অতীতে ফিরে যেতে পারবে!
যদিও এটি একটি তাত্ত্বিক মডেল ছিল এবং এর জন্য কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টের মান খুব নিখুঁতভাবে মেলাতে হতো, তবুও এটি পদার্থবিজ্ঞানীদের চিন্তার জগৎকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। গোডেল এতই খুঁতখুঁতে ছিলেন যে, এরপর আমৃত্যু তিনি জ্যোতির্বিদদের দেখা পেলেই জিজ্ঞেস করতেন, ‘আপনারা কি এখনো মহাবিশ্বের ঘূর্ণন খুঁজে পেয়েছেন?’ প্রতিবারই উত্তর আসত, ‘না, এখনো পাওয়া যায়নি।’
পদার্থবিজ্ঞানে এই অভাবনীয় অবদানের জন্য ১৯৫১ সালে গোডেল এবং পদার্থবিদ জুলিয়ান শুইঙ্গারকে১২ প্রথমবারের মতো আলবার্ট আইনস্টাইন অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন।
গোডেল গাণিতিকভাবে দেখান, মহাবিশ্ব যদি প্রসারিত না হয়ে নিজের অক্ষের ওপর লাটিমের মতো ঘোরে, তবে স্থান-কালের বুনন এমনভাবে বেঁকে যাবে যে ক্লোজড টাইমলাইক কার্ভ তৈরি হবে।
সাত
জীবনের শেষ দিকে গোডেল গণিতের চেয়ে দর্শনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। তিনি গটফ্রিড লিবনিজের লেখার বড় ভক্ত ছিলেন। এমনকি তিনি যুক্তিবিদ্যার সাহায্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য একটি তত্ত্বও দাঁড় করিয়েছিলেন, যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রকাশ করেননি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মানসিক রোগ ও প্যারানয়া১৩ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, রেফ্রিজারেটর বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায়। তাই তিনি ফ্রিজ থেকে দূরে থাকতেন। শীতকালেও তিনি ঘরের জানালা খুলে রাখতেন এই ভয়ে যে, কেউ হয়তো ঘরে বিষাক্ত বাতাস ঢুকিয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপারটি ঘটে তাঁর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, কেউ তাঁর খাবারে বিষ মিশিয়ে তাঁকে হত্যা করতে চায়। এই ভয়ে তিনি স্ত্রী অ্যাডেলের রান্না করা খাবার ছাড়া আর কারও হাতের এক দানা খাবারও মুখে তুলতেন না। খাবার পরিবেশনের আগে অ্যাডেলকে নিজের মুখে সেই খাবার খেয়ে প্রমাণ করতে হতো, তাতে বিষ নেই।
১৯৭৭ সালের শেষ দিকে অ্যাডেল ব্রেন স্ট্রোক করেন এবং তাঁকে কয়েক মাসের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। গোডেলের জন্য এটি ছিল মৃত্যুর সমতুল্য। স্ত্রী হাসপাতালে থাকায় তাঁর জন্য রান্না করার বা খাবার টেস্ট করার কেউ ছিল না। বিষের ভয়ে তিনি খাওয়া-দাওয়া প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেন।
কয়েক মাস পর অ্যাডেল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি বাড়ি এসে দেখেন, তাঁর স্বামী না খেয়ে খেয়ে রীতিমতো একটি কঙ্কালে পরিণত হয়েছেন। গোডেলের ওজন কমে তখন মাত্র ৩০ কেজিতে নেমে এসেছিল! অ্যাডেল তৎক্ষণাৎ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
কয়েক সপ্তাহ পর, ১৯৭৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রিন্সটনের হাসপাতালে এই মহান বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়। তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা ছিল: ‘পার্সোনালিটি ডিস্টার্বেন্সের কারণে অপুষ্টি এবং অনাহার।’ অর্থাৎ, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যৌক্তিক মস্তিষ্কটি শেষ পর্যন্ত চরম অযৌক্তিক এক ভয়ের কাছে হার মেনে না খেয়ে মারা গেলেন! তাঁর মৃত্যুর তিন বছর পর, ১৯৮১ সালে স্ত্রী অ্যাডেলও মারা যান।
১৯৭৭ সালের শেষ দিকে অ্যাডেল ব্রেন স্ট্রোক করেন এবং তাঁকে কয়েক মাসের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। গোডেলের জন্য এটি ছিল মৃত্যুর সমতুল্য।
আট
কুর্ট গোডেলের অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধিক অর্জন হিসেবে স্বীকৃত। তিনি কেবল গণিত নয়, দর্শন, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং ভাষাতত্ত্বকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। অ্যালান টুরিং১৪ যখন কম্পিউটারের প্রাথমিক ধারণা নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন গোডেলের কাজ তাঁকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।
১৯৭৯ সালে ডগলাস হফস্টাটার গোডেল, এশার, বাখ: অ্যান ইটারনাল গোল্ডেন ব্রেইড নামে একটি বই লেখেন। বইটিতে গোডেলের গণিত, এশারের চিত্রশিল্প এবং জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের সংগীতের মধ্যে এক অপূর্ব সমান্তরাল সম্পর্ক দেখানো হয়। বইটি সাধারণ মানুষের কাছে গোডেলের নামকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। এই বইয়ের জন্য হফস্টাটার পুলিৎজার পুরস্কারও১৫ জেতেন।
কুর্ট গোডেল এমন এক মানুষ ছিলেন, যিনি মানুষের চিন্তার সীমানাকে মেপে দেখিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, মানুষের তৈরি কোনো লজিক্যাল সিস্টেমই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। অজানাকে জানার মানুষের যে চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, তা কখনোই শেষ হওয়ার নয়। মহাবিশ্বের গভীরে যেমন রহস্য লুকিয়ে আছে, গণিতের জগতেও তেমনি এমন কিছু রহস্য আছে যা চিরকালই রহস্য থেকে যাবে। আর এই সত্যটি যিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সেই বিষণ্ণ জাদুকর কুর্ট গোডেল বিজ্ঞান ও দর্শনের আকাশে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়েই বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল!
