দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্ব কি একটি ১০০ ওয়াটের বাল্বের সমান আলো দেয়
আপনার ঘরের ছাদে একটি ১০০ ওয়াটের বাল্ব ঝুলছে। হঠাৎ সেটি নষ্ট হয়ে গেল। এখন ঘরে পড়ে আছে দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্ব। আপনি হয়তো ভাববেন, ৫০ আর ৫০ মিলে তো ১০০ হয়। তাহলে দুটি বাল্ব লাগালেই নিশ্চয়ই আগের মতোই আলো হবে। আসলেই কি তাই?
ব্যাপারটা এত সহজ নয়। বিদ্যুৎ খরচের হিসাবে দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্ব আর একটি ১০০ ওয়াটের বাল্ব সমান। দুটো ক্ষেত্রেই মোট ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হবে। কিন্তু আলো দেওয়ার ক্ষেত্রে হিসেবটা সমান নয়। পুরোনো ধরনের ফিলামেন্টের বাল্ব হলে দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্ব থেকে পাওয়া মোট আলো একটি ১০০ ওয়াটের বাল্বের চেয়ে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কম হতে পারে। কিন্তু কেন এমন হয়? এই প্রশ্নের উত্তরটা লুকিয়ে আছে বাল্বের ভেতরের ছোট্ট একটি তারে।
ইনক্যান্ডেসেন্টবাল্বের ভেতরে থাকে টাংস্টেনের তৈরি সরু একটি তার। একে বলা হয় ফিলামেন্ট। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে তারটির বৈদ্যুতিক রোধের কারণে সেটি প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে। একসময় তাপমাত্রা এত বেশি হয় যে ফিলামেন্ট জ্বলজ্বল করতে শুরু করে। তখনই আমরা বাল্ব থেকে আলো পাই।
ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের ভেতরে থাকে টাংস্টেনের তৈরি সরু একটি তার। একে বলা হয় ফিলামেন্ট। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে তারটির বৈদ্যুতিক রোধের কারণে সেটি প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে।
কোনো বস্তু খুব বেশি গরম হলে সেটি আলো ছড়াতে শুরু করে। পদার্থবিদ্যার ভাষায় একে বলে কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ বা ব্ল্যাকবডি রেডিয়েশন। বস্তুর তাপমাত্রার সঙ্গে আলোর রংও বদলে যায়। যেমন পুরোনো ধরনের বৈদ্যুতিক বাল্বের ভোল্টেজ কমিয়ে দিলে আলো তুলনামূলক হলদে দেখায়। কারণ, তখন বাল্বের ভেতরের তার বা ফিলামেন্ট কিছুটা ঠান্ডা হয়ে যায়।
তবে এই জ্বলন্ত ফিলামেন্ট থেকে বের হওয়া শক্তির বেশির ভাগই আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। এটি মূলত অবলোহিত বিকিরণ বা ইনফ্রারেড রশ্মি, যা আমরা তাপ হিসেবে অনুভব করি। এমনকি একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক বাল্বে সরবরাহ করা মোট শক্তির প্রায় ৯০ শতাংশই আলো না হয়ে তাপ হিসেবে বেরিয়ে যায়।
অর্থাৎ বাল্বটি যতটা উজ্জ্বল দেখায়, তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি আসলে তাপ উৎপন্ন করতেই খরচ হয়। অর্থাৎ এই বাল্বকে এক অর্থে এমন একটি হিটারও বলা যায়, যেটা একই সঙ্গে একটু আলোও দেয়! ফিলামেন্ট যত গরম হয়, তার শক্তির তত বেশি অংশ দৃশ্যমান আলো হিসেবে বেরিয়ে আসে। তাই বড় ক্ষমতার বাল্বের ফিলামেন্ট বেশি গরম হলে সেটি প্রতি ওয়াট বিদ্যুৎ থেকে তুলনামূলক বেশি আলো দিতে পারে।
এবার আসা যাক ওয়াটের কথায়। আমরা সাধারণত ভাবি, বাল্বের গায়ে যত বেশি ওয়াট লেখা থাকবে, সেটি তত বেশি আলো দেবে। কিন্তু ওয়াট আসলে আলোর পরিমাণের একক নয়। ওয়াট দিয়ে বোঝানো হয়, একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র প্রতি সেকেন্ডে কী হারে শক্তি ব্যবহার করছে।
বাল্বটি যতটা উজ্জ্বল দেখায়, তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি আসলে তাপ উৎপন্ন করতেই খরচ হয়। অর্থাৎ এই বাল্বকে এক অর্থে এমন একটি হিটারও বলা যায়, যেটা একই সঙ্গে একটু আলোও দেয়!
বাল্ব কতটা আলো দিচ্ছে, তা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয় লুমেন। আলোর নিজস্ব একক আছে, যাকে লুমেন বলা হয়। এটি পরিমাপ করে যে কোনো উৎস থেকে কী পরিমাণ দৃশ্যমান আলো নির্গত হয় এবং এই পরিমাপে মানুষের চোখ প্রতিটি রং কতটা ভালোভাবে দেখতে পায়, তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তাই বাল্বের উজ্জ্বলতা জানতে শুধু ওয়াট দেখলে হবে না, দেখতে হবে সেটি কত লুমেন আলো দিচ্ছে।
একটি গাড়ির কথা ভাবুন। ওয়াট হলো ট্যাংকে ভরা গ্যাস বা জ্বালানি আর লুমেন হলো সেই জ্বালানি দিয়ে আপনি কত মাইল যেতে পারবেন। যে সংখ্যাটি এদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে, সেটিই হলো বাল্বের মাইলেজ। আলোক প্রকৌশলীরা একে বলেন লুমিনাস এফিশিয়েন্সি বা আলোর কার্যকারিতা। এর সমীকরণটি হলো: আলোক কার্যকারিতা = লুমেন ÷ ওয়াট।
পুরোনো ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের ক্ষেত্রে ৪০ ওয়াটের একটি বাল্ব প্রায় ৪৫০ লুমেন, ৬০ ওয়াটের বাল্ব প্রায় ৮০০ লুমেন, ৭৫ ওয়াটের বাল্ব প্রায় ১ হাজার ১০০ লুমেন এবং ১০০ ওয়াটের বাল্ব প্রায় ১ হাজার ৬০০ লুমেন আলো দিতে পারে। ১৫০ ওয়াটের বাল্বে এই সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৬০০ লুমেন। অর্থাৎ বাল্বের ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু আলোই বাড়ে না, প্রতি ওয়াট বিদ্যুৎ থেকে পাওয়া আলোর পরিমাণও বাড়ে।
ওয়াট হলো ট্যাংকে ভরা গ্যাস বা জ্বালানি আর লুমেন হলো সেই জ্বালানি দিয়ে আপনি কত মাইল যেতে পারবেন। যে সংখ্যাটি এদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে, সেটিই হলো বাল্বের মাইলেজ।
এখন তাহলে দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্বের হিসাবটা করা যাক। প্রচলিত বাল্বের তালিকায় ৫০ ওয়াটের মডেল ছিল না। তাই ৪০ ওয়াটের বাল্বে প্রায় ৪৫০ লুমেন এবং ৬০ ওয়াটের বাল্বে প্রায় ৮০০ লুমেন আলো ধরে ৫০ ওয়াটের বাল্বের আলো আনুমানিক ৬২৫ লুমেন ধরা যায়।
তাহলে দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্বে মোট আলো হবে প্রায় ১ হাজার ২৫০ লুমেন। অন্যদিকে একটি ১০০ ওয়াটের বাল্ব প্রায় ১ হাজার ৬০০ লুমেন আলো দিতে পারে। অর্থাৎ একই ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করেও দুটি ছোট বাল্ব থেকে পাওয়া আলো প্রায় ৩৫০ লুমেন কম! শতাংশের হিসাবে পার্থক্য প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
১৯৯৬ সালে আমেরিকান জার্নাল অব ফিজিকস-এ প্রকাশিত একটি গবেষণার তথ্যেও প্রায় একই ধরনের ফল পাওয়া যায়। সেখানে ৪০ ওয়াটের বাল্বের আলো ছিল ৪৯০ লুমেন এবং ৬০ ওয়াটের বাল্বের আলো ৮৫৫ লুমেন। এই দুই মানের মাঝামাঝি ধরে দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্বের আলো হয় প্রায় ১ হাজার ৩৫০ লুমেন। একই গবেষণায় ১০০ ওয়াটের বাল্বের আলো ছিল ১ হাজার ৭১০ লুমেন। অর্থাৎ এখানেও দেখা যাচ্ছে, দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্ব প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কম আলো দেয়।
একটি ১০০ ওয়াটের বাল্ব প্রায় ১ হাজার ৬০০ লুমেন আলো দিতে পারে। অর্থাৎ একই ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করেও দুটি ছোট বাল্ব থেকে পাওয়া আলো প্রায় ৩৫০ লুমেন কম!
বড় বাল্ব বেশি আলো দেয় কেন
আবারও সেই ফিলামেন্টের কথায় ফিরতে হবে। ১৯৯৬ সালের গবেষণায় দেখা যায়, ৪০ ওয়াটের বাল্বের ফিলামেন্টের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৯৫ কেলভিন। ১০০ ওয়াটের বাল্বের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২ হাজার ৮৭৮ কেলভিন। অর্থাৎ ১০০ ওয়াটের বাল্বের ফিলামেন্ট প্রায় ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম হতে পারে। বেশি তাপমাত্রায় ফিলামেন্টের শক্তির তুলনামূলক বেশি অংশ দৃশ্যমান আলোয় পরিণত হয়। তাই বড় বাল্ব প্রতি ওয়াট বিদ্যুৎ থেকে বেশি আলো দিতে পারে।
তবে বেশি গরম হওয়ার একটা অসুবিধাও আছে। ফিলামেন্ট যত বেশি গরম হয়, সেটি তত দ্রুত ক্ষয় হয়। ফলে বাল্বের আয়ু কমে যায়। ওই গবেষণায় ৪০ ওয়াটের বাল্বের আয়ু ছিল প্রায় ১ হাজার ঘণ্টা, যেখানে ১০০ ওয়াটের বাল্বের আয়ু ছিল মাত্র ৭৫০ ঘণ্টা। অর্থাৎ বেশি আলো পাওয়ার বিনিময়ে বড় বাল্বের আয়ু কিছুটা কম হয়।
১৯৯৬ সালের গবেষণায় দেখা যায়, ৪০ ওয়াটের বাল্বের ফিলামেন্টের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৯৫ কেলভিন। ১০০ ওয়াটের বাল্বের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২ হাজার ৮৭৮ কেলভিন।
তাহলে কি দুটি ছোট বাল্ব ব্যবহার করা বোকামি
দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্বের কি কোনো সুবিধাই নেই? অবশ্যই আছে। বরং ঘর আলোকিত করার ক্ষেত্রে কিছু পরিস্থিতিতে দুটি বাল্বই বেশি সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ, ঘর কতটা উজ্জ্বল, তা শুধু মোট আলো কতটা আছে তার ওপর নির্ভর করে না। আলো কোথায় গিয়ে পড়ছে, সেটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
ধরুন, একটি বাল্ব ঘরের ঠিক মাঝখানে ঝুলছে। বাল্বের নিচের জায়গাটা বেশ উজ্জ্বল হবে, কিন্তু ঘরের কোনাগুলো তুলনামূলক অন্ধকার থাকতে পারে। অন্যদিকে দুটি বাল্ব ঘরের দুই পাশে রাখলে আলো আরও সমানভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর পেছনে কাজ করে বিপরীত-বর্গ সূত্র বা ইনভার্স স্কয়ার ল। কোনো আলোর উৎস থেকে দূরত্ব দ্বিগুণ হলে একই আলো চার গুণ বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নির্দিষ্ট জায়গায় আলোর পরিমাণ এক-চতুর্থাংশ হয়ে যায়।
তাই একটি কম ক্ষমতার বাল্ব যদি আপনার পড়ার টেবিলের কাছে থাকে, সেটি দূরে থাকা বেশি ক্ষমতার বাল্বের চেয়েও আপনার বইয়ের ওপর বেশি আলো ফেলতে পারে। অর্থাৎ শুধু বাল্বের ওয়াট দেখলেই হবে না, বাল্বটি কোথায় রাখা হয়েছে, সেটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো আলোর উৎস থেকে দূরত্ব দ্বিগুণ হলে একই আলো চার গুণ বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নির্দিষ্ট জায়গায় আলোর পরিমাণ এক-চতুর্থাংশ হয়ে যায়।
বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে অবশ্য দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্ব আর একটি ১০০ ওয়াটের বাল্বের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ, দুটো ক্ষেত্রেই মোট বিদ্যুৎ খরচ ১০০ ওয়াট। ২৪ ঘণ্টা জ্বালালে একটিতে যেমন ২.৪ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ লাগবে, দুটি ৫০ ওয়াটের বাল্বেও ঠিক একই পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগবে।
তবে এখনকার দিনে ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের বদলে এলইডি ব্যবহার করলে হিসাবটা একেবারেই বদলে যায়। একই পরিমাণ আলো দিতে এলইডি বাল্ব অনেক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ১ হাজার ৬০০ লুমেনের মতো আলো দিতে একটি এলইডি বাল্ব ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের তুলনায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম শক্তি ব্যবহার করতে পারে।
আরেকটা বিষয় মনে রাখা দরকার। কোনো ল্যাম্পে যদি সর্বোচ্চ ৬০ ওয়াটের বাল্ব ব্যবহারের কথা লেখা থাকে, তাহলে সেখানে ১০০ ওয়াটের ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্ব লাগানো ঠিক নয়। কারণ, এই বাল্বের বেশির ভাগ শক্তিই তাপে পরিণত হয়। বেশি ক্ষমতার বাল্ব বেশি তাপ তৈরি করবে। অতিরিক্ত তাপে বাতির ভেতরের তার বা অন্যান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং আগুন লাগার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
কোনো ল্যাম্পে যদি সর্বোচ্চ ৬০ ওয়াটের বাল্ব ব্যবহারের কথা লেখা থাকে, তবে সেখানে ১০০ ওয়াটের ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্ব লাগানো ঠিক নয়। কারণ, এই বাল্বের বেশির ভাগ শক্তিই তাপে পরিণত হয়।
তাহলে শুরুতে যে প্রশ্নটা করেছিলাম, তার উত্তর কী হবে? ওপরের ব্যাখ্যা থেকে এ কথা বলা যায় যে দুটি ৫০ ওয়াটের ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্ব একটি ১০০ ওয়াটের ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের সমান আলো দেয় না। উভয় ক্ষেত্রে একই ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হলেও দুটি ছোট বাল্ব থেকে মোট আলো প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কম হতে পারে। কারণ, বড় বাল্বের ফিলামেন্ট বেশি গরম হয় এবং প্রতি ওয়াট বিদ্যুৎ থেকে তুলনামূলক বেশি আলো তৈরি করে।
তবে ঘরের আলো সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে দুটি বাল্ব সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ, আলো যত দূরে যায়, তত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই বাল্ব কিনতে গেলে শুধু ওয়াট দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে লুমেন দেখে নিতে হবে। কারণ, ওয়াট বলছে বাল্ব কত বিদ্যুৎ খরচ করবে, আর লুমেন বলছে বাল্ব কতটা আলো দেবে।