পারমাণবিক বিস্ফোরণে বাংকারে আশ্রয় নিয়ে কি বেঁচে থাকা যাবে

বিশ্বজুড়ে এখন স্বীকৃত ৯টি দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার হাতে আছে সবচেয়ে বেশি। মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ মজুদ আছে এই দুই দেশের কাছে। এই দুই দেশই বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে ২০২২ সাল থেকে। আবার ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ। 

২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি সংঘাত, যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ চলছে বিশ্বজুড়ে। এসব সংঘাত বা যুদ্ধে বেশ কিছু অঞ্চল পারমাণবিক বোমা হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 

ধরা যাক, বিশ্বের কোনো একটি শহরে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আলোর ঝলকানি। প্রচণ্ড তাপ আর বিস্ফোরণের আঘাতে ভেঙে পড়ছে ভবন, উড়ে যাচ্ছে জানালার কাচ, ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। আকাশে তৈরি হয়েছে বিশাল মাশরুমের মতো মেঘ। শহরের বহু মানুষ মারা গেছেন। কেউ কেউ আহত অবস্থায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন। এমন অবস্থায় যদি ওই শহরের কোথাও মাটির গভীরে তৈরি বাংকারে কেউ আশ্রয় নিয়ে থাকেন, তাহলে কি তিনি বেঁচে থাকবেন?

পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা এত ভয়াবহ যে অনেকের ধারণা, এমন বিস্ফোরণ হলে বেঁচে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। বাস্তবতা অবশ্য একটু ভিন্ন। বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরত্ব, বোমার শক্তি, বিস্ফোরণের ধরন এবং আশপাশের স্থাপনার ওপর নির্ভর করে মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। এমনকি বিস্ফোরণের কেন্দ্রের কাছাকাছি থেকেও কেউ কেউ বেঁচে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে শক্তপোক্ত ভবন কিংবা ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুন
প্রচণ্ড তাপ আর বিস্ফোরণের আঘাতে ভেঙে পড়ছে ভবন, উড়ে যাচ্ছে জানালার কাচ, ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। আকাশে তৈরি হয়েছে বিশাল মাশরুমের মতো মেঘ। শহরের বহু মানুষ মারা গেছেন।

বিস্ফোরণের কত কাছে থেকেও বেঁচে থাকা সম্ভব

পারমাণবিক বিস্ফোরণে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দূরত্ব। কয়েক শ মিটারের ব্যবধানও মাঝেমধ্যে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলাম্বিয়ার ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজাস্টার প্রিপেয়ার্ডনেসের পরিচালক চিকিৎসক আরউইন রেডলেনারের মতে, হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমার সমান শক্তির একটি পারমাণবিক বোমা বড় কোনো শহরে বিস্ফোরিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আহত হতে পারেন আরও কয়েক লাখ মানুষ। বিস্ফোরণের আঘাত, আগুন, তাপ, বিকিরণ ও ভাঙা কাচের টুকরার আঘাতে তাঁদের অনেকে আহত হবেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে শহরের সবাই মারা যাবেন। বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে যত দূরে থাকা যাবে, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তত বাড়বে। রেডলনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দুই থেকে পাঁচ মাইল দূরে থাকা মানুষ উড়ে আসা কাচের টুকরা কিংবা আগুনে মারা যেতে পারেন। তবে তাঁরা যে বিস্ফোরণের সরাসরি আঘাতেই মারা যাবেন, এমন নয়।

আরও পড়ুন
রেডলনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে দুই থেকে পাঁচ মাইল দূরে থাকা মানুষ উড়ে আসা কাচের টুকরা কিংবা আগুনে মারা যেতে পারেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির স্বাস্থ্যপদার্থবিদ ব্রুক বাডেমেয়ারের মতে, বিস্ফোরণের কেন্দ্রের কাছাকাছি থেকেও শক্তপোক্ত ভবনের ভেতরে থাকলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর এমন ঘটনা ঘটেছিল। কয়েকজন মানুষ শক্তপোক্ত ভবনের ভেতরে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

তাঁদের একজন ছিলেন এক নারী। বিস্ফোরণের সময় তিনি বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে একটি ব্যাংক ভবনের ভেতরে ছিলেন। ভবনটি বিস্ফোরণের আঘাতে পুরোপুরি ধসে পড়েনি। ফলে তিনি বেঁচে যান। তবে ব্যাংক থেকে বের হয়ে বাইরে আসার পর ভয়াবহ আগুনে তাঁর পা ও কান পুড়ে যায়। একইভাবে আরেকটি ব্যাংকের বেসমেন্টে থাকা এক নারী ও তাঁর ছোট সন্তানও বেঁচে গিয়েছিলেন। তাঁদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাচের টুকরার আঘাত লেগেছিল।

অর্থাৎ পারমাণবিক বিস্ফোরণের কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকলেই যে নিশ্চিত মৃত্যু, তা নয়। আশ্রয় নেওয়ার জায়গাটিও অনেক সময় জীবন বাঁচাতে পারে।

আরও পড়ুন
বোমার শক্তি এবং সেটি মাটিতে নাকি আকাশে বিস্ফোরিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আকাশে বিস্ফোরণ ঘটলে বিস্ফোরণের আঘাতের তরঙ্গ মাটিতে প্রতিফলিত হয়ে আরও বেশি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে।

বিস্ফোরণের আঘাত কত দূর পর্যন্ত পৌঁছায়

একটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হলে শুধু বিস্ফোরণের কেন্দ্রের আশপাশই ধ্বংস হয় না। এর তাপ, আলো ও আঘাতের তরঙ্গ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিস্ফোরণের শক্তি যত বেশি, ধ্বংসের পরিধিও সাধারণত তত বড় হয়।

হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমার সমান শক্তির একটি পারমাণবিক বোমা কোনো শহরে বিস্ফোরিত হলে বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে আধা মাইলের মধ্যে থাকা স্থাপনাগুলোর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যেতে পারে অথবা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আধা মাইল থেকে এক মাইল দূরত্বের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে মাঝারি ধরনের। আর এক থেকে তিন মাইল দূরের এলাকাতে ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয়, ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ লস অ্যাঞ্জেলেসে একটি মহড়া আয়োজন করে। এর নাম ছিল অপারেশন গোল্ডেন ফিনিক্স। মহড়ায় হিরোশিমায় ব্যবহৃত বোমার সমান ধ্বংসক্ষমতার একটি কাল্পনিক পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তখন শহরটির জনসংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ। মহড়ার হিসাব অনুযায়ী, এমন বিস্ফোরণে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারত।

তবে বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি কেবল দূরত্বের ওপর নির্ভর করে না। বোমার শক্তি এবং সেটি মাটিতে নাকি আকাশে বিস্ফোরিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আকাশে বিস্ফোরণ ঘটলে বিস্ফোরণের আঘাতের তরঙ্গ মাটিতে প্রতিফলিত হয়ে আরও বেশি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। অন্যদিকে মাটিতে বিস্ফোরণ ঘটলে আশপাশের মাটি ও পাথর উড়ে গিয়ে বিশাল গর্ত তৈরি হয়। এতে স্থানীয়ভাবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে।

আরও পড়ুন
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয়, ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ লস অ্যাঞ্জেলেসে একটি মহড়া আয়োজন করে। এর নাম ছিল অপারেশন গোল্ডেন ফিনিক্স।

বাংকার কি সত্যিই জীবন বাঁচাতে পারবে

বাংকারের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া। পারমাণবিক বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিস্ফোরণের সরাসরি আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও পরবর্তী সময়ে তেজস্ক্রিয় পদার্থের কারণে বিপদ তৈরি হতে পারে।

বিস্ফোরণের পরপরই তীব্র তাপ ও আলো ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তৈরি হয় আঘাতের তরঙ্গ। এই তরঙ্গের চাপে আশপাশের ভবন ভেঙে পড়তে পারে। বাতাসের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে গেলে ঘরবাড়ি ধসে যায়। এমনকি শক্তপোক্ত ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৫ পিএসআই অতিরিক্ত বায়ুচাপ সাধারণ আবাসিক ভবন ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। ১০ পিএসআই চাপে অধিকাংশ কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবন ধসে পড়তে পারে। আর ২০ পিএসআই চাপে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে রিইনফোর্সড কংক্রিটের তৈরি স্থাপনাও।

বাংকারের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া
ছবি: গেটি ইমেজ

তাহলে বাংকার কতটা নিরাপদ? বিষয়টি নির্ভর করে সেটি কীভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে কত দূরে অবস্থিত তার ওপর। বিস্ফোরণের কেন্দ্রের খুব কাছে থাকলে বাংকারও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তবে তুলনামূলক দূরে অবস্থিত শক্তপোক্ত ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র মানুষকে বিস্ফোরণের আঘাত ও তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।

আরও পড়ুন
বাতাসের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে গেলে ঘরবাড়ি ধসে যায়। এমনকি শক্তপোক্ত ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৫ পিএসআই অতিরিক্ত বায়ুচাপ সাধারণ আবাসিক ভবন ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, বাংকারে আশ্রয় নেওয়া মানেই সব বিপদ কেটে যাওয়া নয়। বিস্ফোরণের কারণে বাংকারের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আশপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে কিংবা স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই আশ্রয়কেন্দ্রের কাঠামোগত শক্তি ও অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংকারে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে সেটি হতে হবে মজবুত। মাটির নিচে নির্মিত হতে হবে। বাইরের তেজস্ক্রিয় ধুলাবালি থেকে থাকতে হবে সুরক্ষিত। বাংকারের দেয়াল ও ছাদ এমন পুরু কংক্রিট বা মাটি দিয়ে তৈরি হওয়া দরকার, যাতে বিস্ফোরণের ধাক্কা, উড়ে আসা ধ্বংসাবশেষ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাব যতটা সম্ভব কমানো যায়। প্রবেশপথটি সরাসরি বাইরের দিকে না রেখে বাঁকানো বা একাধিক দরজাযুক্ত করা ভালো, যাতে বাইরে থেকে ধুলাবালি ও তেজস্ক্রিয় কণা সহজে ভেতরে ঢুকতে না পারে।

বাংকারে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে সেটি হতে হবে মজবুত। মাটির নিচে নির্মিত হতে হবে
ছবি: অ্যালামি

বাংকারে বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে; সেই সঙ্গে বাতাসের প্রবেশপথে উপযুক্ত ফিল্টার থাকা জরুরি, যাতে তেজস্ক্রিয় ধুলা ও অন্যান্য দূষিত কণা আটকে যায়। থাকতে হবে পর্যাপ্ত খাবার ও পানীয়, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চ, ব্যাটারি, রেডিও, স্যানিটেশন বা শৌচাগারের ব্যবস্থা এবং বর্জ্য রাখার জায়গা। বিদ্যুৎ না থাকলেও যেন আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা চালু রাখা যায়, সে জন্য বিকল্প বিদ্যুৎ বা ব্যাটারি রাখা দরকার।  

আরও পড়ুন
বিস্ফোরণের কারণে বাংকারের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আশপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে কিংবা স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই আশ্রয়কেন্দ্রের কাঠামোগত শক্তি ও অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিস্ফোরণের পর আরও বিপদ

পারমাণবিক বিস্ফোরণের ভয়াবহতা শুধু তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞেই শেষ হয় না। বিস্ফোরণের পর তৈরি হওয়া তেজস্ক্রিয় পদার্থও মানুষের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। একে বলা হয় রেডিওঅ্যাকটিভ ফলআউট বা তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ।

বিস্ফোরণের পর মাশরুমের মতো মেঘের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এসব পদার্থ ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে আসে। মাটি, ভবনের ছাদ ও আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় জমা হয় তেজস্ক্রিয় কণা। এগুলোর সংস্পর্শে এলে মানুষ ক্ষতিকর বিকিরণের শিকার হতে পারে।

তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ কতটা ছড়াবে, তা নির্ভর করে বোমার ধরন, বিস্ফোরণের শক্তি এবং বিস্ফোরণ কোথায় ঘটেছে তার ওপর। আকাশে বিস্ফোরণ ঘটলে আগুনের গোলা সাধারণত মাটি স্পর্শ করে না।

পারমাণবিক বিস্ফোরণের ভয়াবহতা শুধু তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞেই শেষ হয় না
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ফলে স্থানীয়ভাবে তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ তুলনামূলক কম তৈরি হয়। কিন্তু মাটিতে বিস্ফোরণ ঘটলে প্রচুর মাটি, পাথর ও অন্যান্য পদার্থ বিস্ফোরণের মেঘের সঙ্গে ওপরে উঠে যায়।

তেজস্ক্রিয় পদার্থ এসব কণার গায়ে লেগে থাকে। পরে ভারী কণাগুলো দ্রুত মাটিতে নেমে আসে। বাতাসের গতি ও দিকের ওপর নির্ভর করে এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ বিস্ফোরণের স্থান থেকে অনেক দূরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে কয়েক শ মাইল দূরেও বিপজ্জনক মাত্রার তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ পৌঁছাতে পারে।

এ কারণেই বিস্ফোরণের পর নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা জরুরি। শুধু বিস্ফোরণের সময় বেঁচে গেলেই হবে না, পরবর্তী সময়ে তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শ থেকেও নিজেকে রক্ষা করতে হবে।

আরও পড়ুন
তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ কতটা ছড়াবে, তা নির্ভর করে বোমার ধরন, বিস্ফোরণের শক্তি এবং বিস্ফোরণ কোথায় ঘটেছে তার ওপর। আকাশে বিস্ফোরণ ঘটলে আগুনের গোলা সাধারণত মাটি স্পর্শ করে না।

বিস্ফোরণের পর কতক্ষণ বাংকারে থাকতে হবে

পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর বেঁচে যাওয়া মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, কখন বাইরে বের হওয়া নিরাপদ? বাইরে তখন হয়তো আগুন জ্বলছে, ভবন ধসে পড়েছে, রাস্তাঘাট ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর ওপর রয়েছে তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপের ঝুঁকি।

এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়া বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ, বাইরে বের হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থাকে। আবার গাড়িতে করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার চেষ্টা করাও ঝুঁকিপূর্ণ। বিস্ফোরণের আঘাতে গাড়ি চলাচলের অযোগ্য হয়ে যেতে পারে। রাস্তায় ধ্বংসস্তূপ জমে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সময়ে অনেক মানুষ পালানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। ফলে তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ পড়তে থাকা কোনো এলাকায় গাড়ির ভেতরে আটকে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

রিচার্ড উলফসন ও ফেরেঙ্ক ডালনোকি-ভেরেসের নিউক্লিয়ার চয়েসেস ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি: আ সিটিজেন গাইড বইয়ে ‘দ্য ডিভাসটেটিং ইফেক্টস অব নিউক্লিয়ার উইপনস’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর অন্তত ৪৮ ঘণ্টা ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা প্রায় ১০০ গুণ কমে যেতে পারে। বিস্ফোরণের পর ভবনের ভেতরে গভীর জায়গায় অবস্থান করলে বাইরের তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব আরও কমানো সম্ভব।

আরও পড়ুন
বিস্ফোরণের আঘাতে গাড়ি চলাচলের অযোগ্য হয়ে যেতে পারে। রাস্তায় ধ্বংসস্তূপ জমে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সময়ে অনেক মানুষ পালানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্টের একটি নিবন্ধে বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়েছিল, বিস্ফোরণের পর প্রায় ২৪ ঘণ্টা আশ্রয়ে থাকার পরিকল্পনা করা উচিত। ওই নিবন্ধে লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ব্রুক বাডেমেয়ার জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপের বিকিরণশক্তি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে যেতে পারে।

এখানে দুটি সময়ের কথা বলা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা ও ৪৮ ঘণ্টা। এগুলোকে পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। তবে দুটি নিবন্ধেই মূল কথা হলো, বিস্ফোরণের পরপরই বাইরে বের হওয়া উচিত নয়। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সময়ের সঙ্গে কমলেও কখন বাইরে বের হওয়া নিরাপদ, তা নির্ভর করে আশপাশের পরিস্থিতি ও বিকিরণের মাত্রার ওপর। তাই শুধু সময় হিসাব করে আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়া ঠিক নয়।

আরও পড়ুন
ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্টে লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ব্রুক বাডেমেয়ার জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপের বিকিরণশক্তি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে যেতে পারে।

আগে থেকে প্রস্তুতি থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে

পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য শুধু একটি বাংকার থাকাই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করার প্রস্তুতিও থাকতে হবে। বিস্ফোরণের পর বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট কাজ না-ও করতে পারে। টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে বাইরে কী ঘটছে, কোথায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বেশি কিংবা কোথায় উদ্ধারকাজ চলছে, তা জানা কঠিন হয়ে পড়বে।

এ জন্য জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের উপযোগী রেডিও রাখা প্রয়োজন। ব্যাটারি, সৌরশক্তি কিংবা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে চালানো যায়, এমন রেডিও থাকলে বিদ্যুৎ না থাকলেও কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা শোনা সম্ভব হতে পারে।

বাড়ি ও কর্মস্থলে কয়েক দিনের জন্য পর্যাপ্ত পানি রাখা জরুরি
ছবি: উইকি হাউ

এ ছাড়া বাড়ি ও কর্মস্থলে কয়েক দিনের জন্য পর্যাপ্ত পানি ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার রাখা জরুরি। বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কমে এলেও পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে। দোকানপাট বন্ধ থাকতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে হাসপাতাল ও অন্যান্য জরুরি সেবাও। ফলে নিজের ও পরিবারের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোর মতো প্রস্তুতি থাকা দরকার।

আশ্রয়কেন্দ্রে কত দিন থাকতে হতে পারে, বাইরে বের হওয়ার একাধিক পথ আছে কি না, জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে যোগাযোগ করা হবে, এসব বিষয়ও আগে থেকে ভেবে রাখা প্রয়োজন। কোনো একটি রাস্তা ধ্বংস হয়ে গেলে বিকল্প পথ কাজে আসতে পারে।

আরও পড়ুন
বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কমে এলেও পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে। দোকানপাট বন্ধ থাকতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে হাসপাতাল ও অন্যান্য জরুরি সেবাও।

বেঁচে যাওয়ার পর কী হবে

ধরা যাক, কেউ পারমাণবিক বিস্ফোরণের তাৎক্ষণিক আঘাত থেকে বেঁচে গেলেন। নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপের ঝুঁকিও এড়িয়ে গেলেন। এরপর কি সব বিপদ শেষ?

বাস্তবে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। পারমাণবিক বিস্ফোরণে শহরের হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগব্যবস্থা, পানির সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আহত মানুষের চিকিৎসার সুযোগ থাকবে সীমিত। সাধারণ দুর্ঘটনায় যেসব মানুষকে চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানো সম্ভব হতো, তারাও চিকিৎসার অভাবে মারা যেতে পারেন।

একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণেই হাজার হাজার মানুষের গুরুতর দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। অথচ এমন পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়ার মতো হাসপাতাল ও চিকিৎসক পাওয়া কঠিন হবে। বিস্ফোরণের পর ছড়িয়ে পড়া আগুন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে বিশাল অগ্নিকাণ্ড তৈরি করতে পারে। এমন অগ্নিকাণ্ডের নিজস্ব বাতাসের প্রবাহ তৈরি হয়, যা আগুনকে আরও ছড়িয়ে দেয়। আগুনের তীব্রতায় আশপাশের অক্সিজেনও শেষ হয়ে যেতে পারে।

আর যদি একটি নয়, একাধিক পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হয়? তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। বড় ধরনের পারমাণবিক যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও কালি বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে পৌঁছে যেতে পারে। সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হলে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। একে বলা হয় নিউক্লিয়ার উইন্টার বা পারমাণবিক শীত। তাপমাত্রা কমে গেলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে, খাদ্যসংকট তৈরি হবে। ফলে বিস্ফোরণের তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষও দীর্ঘমেয়াদি বিপদের মুখে পড়বেন।

আরও পড়ুন
বিস্ফোরণের পর ছড়িয়ে পড়া আগুন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে বিশাল অগ্নিকাণ্ড তৈরি করতে পারে। এমন অগ্নিকাণ্ডের নিজস্ব বাতাসের প্রবাহ তৈরি হয়, যা আগুনকে আরও ছড়িয়ে দেয়।

তাহলে প্রশ্নের উত্তর কী? পারমাণবিক বিস্ফোরণ হলে বাংকারে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব? উত্তর হলো, হ্যাঁ, সম্ভব। হিরোশিমার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শক্তপোক্ত ভবনের ভেতরে থেকেও বিস্ফোরণের কেন্দ্রের কাছাকাছি কিছু মানুষ বেঁচে গিয়েছিলেন। আবার গবেষণায় দেখা গেছে, বিস্ফোরণের পর নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করলে তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়।

তবে কোনো বাংকারই সব ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ থেকে নিশ্চিত সুরক্ষা দিতে পারে না। বোমার শক্তি, বিস্ফোরণের স্থান, আশ্রয়কেন্দ্রের কাঠামো এবং পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যাওয়ার পরও বিপদ শেষ হয় না। তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ, আগুন, চিকিৎসার অভাব, খাদ্য ও পানির সংকট, সবকিছুর সঙ্গে লড়তে হতে পারে।

সূত্র: এমআইটি প্রেস রিডার ও ইউএস নিউজ

আরও পড়ুন