পারমাণবিক শক্তি কেন প্রয়োজন

তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি দিয়ে প্রতিনিয়ত শত শত টন ধূলিকণা, সালফার ও নাইট্রোজেনের মিশ্রণ বায়ুমণ্ডলে মিশছেছবি: ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি

এখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি তুলনামূলক চিত্র পর্যালোচনা করা যাক। আধুনিক একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ব্লক থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, একটি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ পেতে হলে প্রয়োজন হবে ৫০ লাখ টন কয়লার। প্রতিটি ওয়াগনে যদি ৬০ টন করে কয়লা থাকে তবে হিসাব করলে দেখা যাবে যে প্রতি ৫/৬ ঘণ্টায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ৫০টি করে রেল ওয়াগন ঢুকছে এবং বেরিয়ে যাচ্ছে।

এক বছরে যতগুলো ওয়াগন বিদ্যুৎকেন্দ্রে এলো এবং বেরিয়ে গেল সেগুলোকে যদি একসঙ্গে জোড়া দেয়া হয় তবে তা বাংলাদেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্বের তিনগুনের বেশি হবে। কয়লা সরবরাহের পেছনে যে বিশাল আয়োজন ও পরিশ্রম তার কথা না হয় বাদই দিলাম।

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের পর এই ৫০ লাখ টন কয়লার একটি বড় অংশ বর্জ্য হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। ভেবে দেখ, পাহাড় পরিমাণ এই বর্জ্যের স্তূপ খোলা আকাশের নিচে জমা পড়ে আছে। এই বর্জ্য কিন্তু মোটেও নিরাপদ নয়। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত শত শত টন ধূলিকণা এবং সালফার ও নাইট্রোজেনের মিশ্রণ চিমনি দিয়ে বের হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশছে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই অত্যন্ত ক্ষতিকারক এসিড বৃষ্টি।

আরও পড়ুন
এক বছরে যতগুলো ওয়াগন বিদ্যুৎকেন্দ্রে এলো এবং বেরিয়ে গেল সেগুলোকে যদি একসঙ্গে জোড়া দেয়া হয় তবে তা বাংলাদেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্বের তিনগুনের বেশি হবে।

এটাই শেষ নয়, তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি দিয়ে বিপুল পরিমাণ কার্বন-ডাইঅক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। কয়লা, গ্যাস বা তেলের দহনের ফলে উৎপন্ন হয় এই গ্যাস। বিজ্ঞানিদের মতে এই গ্যাসের কারণেই সৃষ্ট হয় 'গ্রিনহাউস ইফেক্ট'। এর প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে আগের তুলনায় বন্যা, জলচ্ছ্বাস, খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যদি ২-৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পায় তবে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করবে। সমুদ্র, মহাসাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকার একাংশ এবং অনেক দ্বীপ হয়তো পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

এই বিপদ ঠেকাতে হলে আমাদের এখনই আমাদের বিকল্প বা অল্টারনেটিভ শক্তির উৎস ব্যবহার শুরু করতে হবে, যাতে কয়লা বা গ্যাস পোড়ানোর প্রয়োজন না হয়। এই উৎসগুলো হতে পারে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র, বায়ুকল ইত্যাদি, যেগুলো থেকে গ্রিনহাউস ইফেক্টের কোন সম্ভাবনা নেই।

একারণেই সারা বিশ্বে পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশেও একই কারণে তৈরি হচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনা জেলায় নির্মিয়মান কেন্দ্রটি সারাদেশের মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে আগের তুলনায় বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যদি ২-৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পায় তবে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করবে।

পারমাণবিক বিদ্যুতের উৎসকে বর্তমানে নির্ভরযোগ্য ও বিপদমুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক শতাধিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ ইউনিট চালু রয়েছে, নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে এবং বিভিন্ন দেশ এ লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন করছে।

নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে মানুষ আরো বেশি এনার্জি পাবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এমন নতুন কিছু অবশ্যই আবিষ্কার হবে, যার কথা আমরা আজকে হয়তো কল্পনাও করতে পারছি না।

প্রিয় বন্ধু! তুমি যদি মানবকল্যাণে এনার্জির নতুন উৎস সন্ধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হও তবে তোমার জন্য খোলা রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনার দ্বার। নিজের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা প্রমাণের অনেক সুযোগ রয়েছে তোমার সামনে।

তোমার জন্য রইল অনেক শুভকামনা!

কৃতজ্ঞতা: রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন- রোসাটম

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন

এনআইএইপি- এএসই, রাশিয়া এবং

পরমাণু শক্তি তথ্য কেন্দ্র, ঢাকা

আরও পড়ুন