জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন কি সম্ভব
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে জোহান বেসলার নামে এক জার্মান উদ্যোক্তা দাবি করেছিলেন, তিনি এমন কিছু যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো অবিরাম চলতে পারে। পারপেচুয়াল মোশন মেশিন বা চিরস্থায়ী গতিসম্পন্ন যন্ত্রগুলো এমন একধরনের যন্ত্র, যেগুলো একবার চালু করে দিলে কোনো বাধা ছাড়াই অবিরাম চলতে থাকে। বেসলার একটি চাকা নির্মাণ করেছিলেন, যেটি একবার ঘুরিয়ে দিলে নাকি চিরকাল চলতে থাকে। তৎকালীন অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিও তাঁর এই যন্ত্র প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সমসাময়িক অনেকেই বেসলারকে ঠক বললেও তাঁর নির্মিত যন্ত্রের ভুল ধরতে পারেননি।
বেসলারের যন্ত্রের গোমর ফাঁস হয়, যখন তাঁর বাড়ি থেকে অ্যানি রোসাইন নামে এক নারী পালিয়ে যান। অ্যানি রোসাইন ছিলেন বেসলারের ভৃত্য। তিনি পালিয়ে আসার পর স্বীকারোক্তি দেন যে তিনিই বেসলারের পারপেচুয়াল চাকাটিকে পাশের একটি কক্ষ থেকে চালনা করতেন। কখনো কখনো বেসলারের ভাই, আবার কখনো বেসলারের স্ত্রী যন্ত্রটি পরিচালনার দায়িত্ব নিতেন। ধীরে ধীরে বেসলার ও তাঁর চাকার গল্প সময় গিলে ফেলে।
দার্শনিক থেলিসের সময় থেকে শুরু করে একদম বিজ্ঞানের আধুনিক যুগ পর্যন্ত যেমন শক্তির নিত্যতা নিয়ে চিন্তা এগিয়েছে, তেমনি নিত্যতার পরিপন্থী ধারণারও প্রসারণ ঘটেছে। মানুষ এমন সব যন্ত্র বানানোর কথা ভেবেছে, যেগুলো কোনো ইনপুট ছাড়াই আউটপুট দিতে পারে! নিরীক্ষামূলক বিজ্ঞান তথা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো এমন যন্ত্র নির্মাণের ধারণা বরাবরই নাকচ করে এসেছে।
সমসাময়িক অনেকেই বেসলারকে ঠক বললেও তাঁর নির্মিত যন্ত্রের ভুল ধরতে পারেননি। বেসলারের যন্ত্রের গোমর ফাঁস হয়, যখন তাঁর বাড়ি থেকে অ্যানি রোসাইন নামে এক নারী পালিয়ে যান।
যদিও তাপগতিবিদ্যায় ফ্রি এনার্জি বলে একটি পরিভাষা প্রচলিত আছে। যেমন, হেলমহোল্টজ ফ্রি এনার্জি, গিবস এনার্জি। এখানে ‘ফ্রি’ কথাটার অর্থ বিনামূল্যে নয়, বরং সহজলভ্য বা প্রাপ্তিসাধ্য। দশার পরিবর্তন কিংবা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সিস্টেম ও পরিপার্শ্বের মধ্যে শক্তির আদান-প্রদান ইত্যাদি বিষয় ব্যাখ্যা করার জন্য এই ফ্রি এনার্জি বিষয়টির অবতারণা করা হয়। তবে আপনি নিশ্চয়ই এই ফ্রি এনার্জি সম্পর্কে জানার জন্য এখানে আসেননি। আপনি যে ফ্রি এনার্জির ব্যাপারে আগ্রহী, সেটার সংজ্ঞা হলো: এমন শক্তি বা কাজ, যা বিনামূল্যে পাওয়া যায়; যেটার জন্য জ্বালানির দহন আবশ্যিক নয়।
অতীতে তথা অতিসাম্প্রতিক কালেও বারে বারে উঠে এসেছে জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ বা শক্তি উৎপাদনের দাবি। কিছুদিন এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, যুক্তি-তর্ক চলে; এরপর আস্তে আস্তে এসব দাবি হারিয়ে যায়। বাস্তবে এসব যন্ত্র কখনো তৈরি করা হয়েছে বলে শোনা যায় না। প্রায়শই অভিযোগ করা হয়, পৃষ্ঠপোষকতা বা রিসোর্সের অভাবেই থেমে যায় এসব প্রকল্পের কাজ। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান বলে অন্য কথা। ঠিক কোন সমস্যার জন্য পারপেচুয়াল মোশন মেশিন বানানো যায় না বা কীভাবে জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, সেসব নিয়ে একটি আলোচনা হওয়া দরকার, যেন আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের আগ্রহ, চেষ্টা, পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা ঠিক কোন দিকে থাকা উচিত।
যদিও এমন কিছু যুক্তি আছে, যেখানে দাবি করা হয় যে কোনো যন্ত্র থেকে ঘর্ষণের মতো বাধাদানকারী বল যদি সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হয়, তাহলে ওই যন্ত্রটি দ্বারা চিরস্থায়ী গতি অর্জন করা সম্ভব।
পারপেচুয়াল মেশিন: সামথিং ফর নাথিং
পারপেচুয়াল কথাটির অর্থ হচ্ছে চিরস্থায়ী। পারপেচুয়াল মোশন হচ্ছে এমন গতি, যা একবার শুরু করে দিলে অবিরাম চলতে থাকবে। যে যন্ত্র বা যে যন্ত্রের মধ্যকার কোনো অংশ এমন চিরস্থায়ী গতিতে থাকে, সেই যন্ত্রকেই পারপেচুয়াল মেশিন বলা হয়। যেহেতু আলোচ্য যন্ত্রটি বা যন্ত্রাংশটি চিরকাল গতিতে থাকবে, সেহেতু এমন যন্ত্র থেকে অবিরাম শক্তি উৎপাদন করা যাবে। অর্থাৎ কোনো জ্বালানি খরচ না করলেও যন্ত্রটি কাজ করবে বা শক্তি উৎপাদন করবে। অন্যভাবে বললে, ইনপুট শূন্য হলেও আউটপুট অশূন্য হবে। গাণিতিক বিচারে এমন যন্ত্রের দক্ষতা অসীম। আশা করছি, প্রথম অসংগতিটি ইতিমধ্যেই সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র বা শক্তির নিত্যতা সূত্র কিন্তু এমন যন্ত্রকে সমর্থন করে না। শক্তির শুধু রূপান্তরই সম্ভব, শক্তির সৃষ্টি কিংবা ধ্বংস সম্ভব নয়। যেহেতু একবার চালু করে দিলেই পারপেচুয়াল মেশিন বাইরের কোনো শক্তি বা সরবরাহ ছাড়া অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে, সেহেতু স্পষ্টতই এটি তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র তথা শক্তির নিত্যতা সূত্রকে অমান্য করছে। বাস্তবে কোনো গতিই চিরস্থায়ী হয় না। কারণ কী? কারণ হচ্ছে ঘর্ষণের মতো বিভিন্ন বাধাদানকারী বল। এসব কারণে শক্তির অপচয় ঘটে এবং আস্তে আস্তে গতি নিঃশেষ হয়ে যায়।
যদিও এমন কিছু যুক্তি আছে, যেখানে দাবি করা হয় যে কোনো যন্ত্র থেকে ঘর্ষণের মতো বাধাদানকারী বল যদি সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হয়, তাহলে ওই যন্ত্রটি দ্বারা চিরস্থায়ী গতি অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র এমন যুক্তি সমর্থন করে না। প্রথমত, শক্তির পরিপূর্ণ রূপান্তর সম্ভব নয়; দ্বিতীয়ত, বাহ্যিক কাজ ব্যতীত শক্তির অবিরাম প্রবাহও সম্ভব নয়। সুতরাং বলা যেতে পারে, চিরস্থায়ী গতিসম্পন্ন যন্ত্র পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত, বাস্তবে এটি নির্মাণ করা অসম্ভব।
পারপেচুয়াল মোশন হচ্ছে এমন গতি, যা একবার শুরু করে দিলে অবিরাম চলতে থাকবে। যে যন্ত্র বা যে যন্ত্রের মধ্যকার কোনো অংশ এমন চিরস্থায়ী গতিতে থাকে, সেই যন্ত্রকেই পারপেচুয়াল মেশিন বলা হয়।
মহাকর্ষ ইঞ্জিন
প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলের মধ্যে একটি হচ্ছে মহাকর্ষ বল। যেকোনো উচ্চতা থেকে একটি বস্তুকে ছেড়ে দিলে বস্তুটি নিচে পড়তে থাকে। এই যে বস্তুটি নিচের দিকে পড়ছে, এখানে মূলত বস্তুটির অভিকর্ষজ বিভবশক্তিই গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। পড়ন্ত বস্তুর এই গতিশক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। কিন্তু একটি বস্তুর মধ্যে তো নিজে থেকে অভিকর্ষজ বিভবশক্তির সঞ্চার হয় না। এর জন্য অবশ্যই বস্তুকে ভিন্ন অবস্থানে বা উঁচু স্থানে রাখতে হয়।
আর একটি বস্তু এমনি এমনি ওপরে যায় না, সেটিকে ওপরে তুলতে হয়। মহাকর্ষ বল একটি রক্ষণশীল বল। অর্থাৎ এই বলের দ্বারা কৃত মোট কাজ শূন্য হবে, যদি যে বিন্দু থেকে কাজ আরম্ভ হয়েছিল, সেই বিন্দুতেই এসে কাজ শেষ হয়। এই কথাগুলোর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, একটি বস্তুকে মাটি থেকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় তুলে যদি আবার মাটিতেই ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে মোট কাজ শূন্য হবে।
এখন আমরা আলোচিত একটি নকশার ওপর আলোকপাত করব। যদি দুটি বস্তুকে একটি বেল্টের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হয় যেন একটি বস্তু যখন নিচের দিকে পড়বে, তখন অন্য বস্তুটি বেল্টের টানে ওপরের দিকে উঠবে। মোটা দাগে এমন একটি যন্ত্রকেই মহাকর্ষ ইঞ্জিন বলা হয়। ওপর থেকে যে বস্তুটি অভিকর্ষের টানে নিচে পড়বে, সেটির বিভবশক্তি আস্তে আস্তে গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হবে। এই গতিশক্তিই বেল্টের মাধ্যমে অন্য বস্তুতে স্থানান্তরিত হবে এবং সেটি আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠে বিভবশক্তি সঞ্চয় করবে। এটাই এর মূল কার্যনীতি।
যদি দুটি বস্তুকে একটি বেল্টের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হয় যেন একটি বস্তু যখন নিচের দিকে পড়বে, তখন অন্য বস্তুটি বেল্টের টানে ওপরের দিকে উঠবে। এমন একটি যন্ত্রকেই মহাকর্ষ ইঞ্জিন বলা হয়।
কিন্তু এখানে একটি বস্তু ওপরের দিকে উঠছে এবং অন্য বস্তুটি নিচের দিকে নামছে; অর্থাৎ সম্পূর্ণ সিস্টেমটির মোট কাজ শূন্য। মোট কাজ শূন্য কথাটির অর্থ দাঁড়াচ্ছে, কোনো শক্তি কাজে রূপান্তরিত হচ্ছে না। অর্থাৎ একটি বস্তু নিচে নামতে গিয়ে যে শক্তি দিচ্ছে, সেটা খরচ হয়ে যাচ্ছে অন্য বস্তুটিকে ওপরে তুলতে। যা-ই হোক, এতক্ষণের আলোচনায় আমরা ঘর্ষণকে বা শক্তির অপচয়কে বিবেচনা করিনি। যদি এই কাল্পনিক সিস্টেমের মধ্যে আমরা ঘর্ষণকে বিবেচনা করি, তাহলে এই যন্ত্রের গতি দ্রুতই থেমে যাবে।
আচ্ছা, এবার তর্কের খাতিরে আমরা ঘর্ষণ তথা সব ধরনের বাধাদানকারী বলসমূহকে শূন্য ধরে নিলাম। এখন যন্ত্রটিকে ঘুরিয়ে দিলেই কি এটি অনবরত ঘুরতে থাকবে? মোটেও না! এটি সত্যি যে প্রাথমিক কয়েকটা চক্র যন্ত্রটি সম্পূর্ণ করবে, কিন্তু এর কিছুটা সময় পরে বস্তু দুটি সামনে-পেছনে দুলবে এবং সবশেষে একটি সাম্যাবস্থায় গিয়ে থেমে যাবে। এভাবে থেমে যাওয়ার পেছনে কারণ একটাই—মোট কাজ শূন্য তথা মোট শক্তির রূপান্তর শূন্য। যন্ত্রটিকে প্রথমবার ঘোরানোর সময় যে শক্তি দিয়ে ঘোরানো হয়, সেটাই এর একমাত্র ইনপুট। সেটি নিঃশেষ হয়ে গেলে সিস্টেমটি গতিজড়তার কারণে আরেকটু নড়াচড়া করবে ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যন্ত্রটি থেমেই যাবে। মহাকর্ষকে শক্তির আধার হিসেবে বিবেচনা করে এটি থেকে অবিরাম কাজ পাওয়া সম্ভব নয়।
কিছু বিশেষ ডাই-ইলেকট্রিক স্ফটিক বা ক্রিস্টাল আছে, যাদের ওপর চাপ দেওয়া হলে তারা সেই চাপকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তর করে। এই ঘটনাকে পাইজো-ইলেকট্রিক প্রভাব বলে।
যেভাবে জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়
জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি খুব স্থূল দৃষ্টিতে সত্য। বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশল আছে, যেগুলোতে জ্বালানির প্রয়োজন হয় না। তবে সব পদ্ধতিই পদার্থবিজ্ঞানের সমস্ত সূত্র মেনে চলে। এমন কিছু পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো।
পাইজো-ইলেকট্রিসিটি
কিছু বিশেষ ডাই-ইলেকট্রিক স্ফটিক বা ক্রিস্টাল আছে, যাদের ওপর চাপ দেওয়া হলে তারা সেই চাপকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তর করে। এই ঘটনাকে পাইজো-ইলেকট্রিক প্রভাব বলে। সব ডাই-ইলেকট্রিক স্ফটিকে এই ঘটনা ঘটে না। যেসব ডাই-ইলেকট্রিক স্ফটিকে সেন্ট্রোসিমেট্রি বা কেন্দ্র প্রতিসাম্য নেই, তারাই মূলত পাইজো-ইলেকট্রিক প্রভাব প্রদর্শন করে।
সেন্ট্রোসিমেট্রি বা কেন্দ্র প্রতিসাম্য মানে হলো স্ফটিকের ভেতরের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু, যেটার সাপেক্ষে পুরো স্ফটিকের গঠন প্রতিসম। অর্থাৎ ওই বিন্দুকে কেন্দ্র করে স্ফটিকটিকে সোজা করে রাখলে বা উল্টে রাখলে বোঝার কোনো উপায় নেই। যে স্ফটিকগুলোতে এমন প্রতিসাম্য নেই, অর্থাৎ সোজা বা উল্টো করে রাখলে সহজেই বোঝা যায়, তারাই মূলত পাইজো-ইলেকট্রিসিটি প্রদর্শন করে।
সব ডাই-ইলেকট্রিক স্ফটিকে পাইজো-ইলেকট্রিক প্রভাব ঘটে না। যেসব ডাই-ইলেকট্রিক স্ফটিকে সেন্ট্রোসিমেট্রি বা কেন্দ্র প্রতিসাম্য নেই, তারাই মূলত পাইজো-ইলেকট্রিক প্রভাব প্রদর্শন করে।
যখন এ রকম স্ফটিকের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়, তখন এর গঠনে বিকৃতি আসে। এই বিকৃতির কারণে স্ফটিকের ইলেকট্রিক পোলারাইজেশনে পরিবর্তন আসে। তখন এর একদিকে ধনাত্মক চার্জের ঘনত্ব বেশি হয় এবং অন্যদিকে ঋণাত্মক চার্জের ঘনত্ব বেশি হয়। অর্থাৎ চাপ প্রয়োগের ফলে স্ফটিকের দুটি প্রান্তের মধ্যে বিভব পার্থক্য বা ভোল্টেজ তৈরি হয়। ঠিক যেমন একটি শুষ্ক কোষের ভেতরে রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ফলে ড্রাই সেলের দুই প্রান্তের মধ্যে তৈরি হয় বিভব পার্থক্য।
পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে, এখানে কোনো জ্বালানির আবশ্যকতা নেই। পাইজো-ইলেকট্রিক স্ফটিকের ওপর প্রযুক্ত যান্ত্রিক শক্তি বা পীড়ন তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। অর্থাৎ এখানেও শক্তির নিত্যতা মেনেই তড়িৎ শক্তি উৎপাদিত হচ্ছে।
চাপ প্রয়োগের ফলে স্ফটিকের দুটি প্রান্তের মধ্যে বিভব পার্থক্য বা ভোল্টেজ তৈরি হয়। ঠিক যেমন একটি শুষ্ক কোষের ভেতরে রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
সৌরবিদ্যুৎ
যখন সূর্যের আলো সোলার প্যানেলের ওপর আপতিত হয়, তখন তড়িৎ শক্তি উৎপাদিত হয়। কীভাবে সোলার প্যানেল সূর্যের আলো থেকে তড়িৎ শক্তি উৎপাদন করে? সোলার প্যানেলে যে সোলার সেলগুলো থাকে, সেগুলোকে ফটোভোলটাইক সেল বলা হয়। সেলগুলো মূলত সিলিকন অর্ধপরিবাহী দ্বারা তৈরি পি-এন ডায়োড। যখন সূর্যরশ্মি এতে আপতিত হয়, তখন তা সেখানে শোষিত হয়। সূর্যরশ্মি থেকে শোষিত শক্তি দিয়ে অর্ধপরিবাহীর ভেতরে ‘ইলেকট্রন-হোল’ জোড় তৈরি হয়।
এই সদ্যোজাত ইলেকট্রন-হোল ডায়োডের বিপরীত প্রান্তে বিভব পার্থক্য তৈরি করে। এখানেও আপাতদৃষ্টিতে কোনো জ্বালানির প্রয়োজন হচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃত চিত্র হচ্ছে, সূর্যের ভেতরে হাইড্রোজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটছে এবং সেই ফিউশনের ফলে যে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে, সেটার কিছুটা অংশ সূর্যরশ্মি বহন করে পৃথিবীপৃষ্ঠে আনছে। সোলার প্যানেল দিয়ে তড়িৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও শক্তির নিত্যতা সূত্রের কোনো ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে না।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি শুধু যে নকশা করেছেন এমন নয়, নকশাগুলো নিয়ে গভীর পড়াশোনা করেছেন; এমনকি নিজেই যন্ত্র নির্মাণের চেষ্টাও করেছেন। তবে সফলতার মুখ দেখেননি।
জলবিদ্যুৎ
স্রোতস্বিনী নদীর যাত্রাপথে প্রথমে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে বাঁধের একপাশে নদীর পানি জমা হয়ে পানির স্তর উঁচু হতে থাকে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, পানির স্তরের বিভবশক্তি বাড়তে থাকে। এরপর পানির স্তর একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে স্লুইসগেটের মাধ্যমে পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহের সময় পানির স্তরের সঞ্চিত বিভবশক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। পানির এই তীব্র প্রবাহ দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
আলোচিত এসব পদ্ধতি ছাড়াও বায়ুকল বা উইন্ডমিল ব্যবহার করেও তড়িৎ উৎপাদন করা যায় এবং সেখানেও কোনো জ্বালানির প্রয়োজন হয় না। এখন পর্যন্ত তড়িৎ উৎপাদনের বাস্তব যে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, তার কোনোটিতেই আপাতদৃষ্টিতে জ্বালানির দহনের আবশ্যিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না এবং সেই সঙ্গে শক্তির নিত্যতা সূত্রের যথার্থ মান্যতাও দেখা যাচ্ছে। চিরস্থায়ী গতিযন্ত্র বা পারপেচুয়াল মেশিনের ক্ষেত্রে যা একেবারেই অনুপস্থিত।
চিরস্থায়ী গতি নিয়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বেশ আগ্রহী ছিলেন। তিনি এমন কিছু যন্ত্রের নকশাও করেছিলেন। শুধু যে নকশা করেছেন এমন নয়, নকশাগুলো নিয়ে গভীর পড়াশোনা করেছেন; এমনকি নিজেই যন্ত্র নির্মাণের চেষ্টাও করেছেন। তবে সফলতার মুখ দেখেননি। পরিশেষে তিনিও বুঝেছিলেন, চিরস্থায়ী গতি বা পারপেচুয়াল মোশন সম্ভব নয়।
পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, পানির স্তরের বিভবশক্তি বাড়তে থাকে। এরপর পানির স্তর একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে স্লুইসগেটের মাধ্যমে পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়।
ঐতিহাসিকভাবে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও কেন বারবার এমন যন্ত্র নির্মাণের দাবি করা হয়? এর পেছনের সম্ভাব্য কারণগুলো হচ্ছে—আমাদের দৈনন্দিন শক্তির চাহিদা এবং চাহিদা অনুযায়ী শক্তি উৎপাদনের অপ্রতুলতা। একটি জাতি কতটা উন্নত, সেটার একটি সূচক হতে পারে সে জাতি কতটা বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নব্বইয়ের দশকে সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরে সচরাচর রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ থাকত না।
একটা সময় চাহিদা থেকেই রেফ্রিজারেটর কেনা হয়, পরিবারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা একটু বাড়ে। এরপর আস্তে আস্তে পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি ঘরে আসে, বিদ্যুতের ব্যবহার আরেকটু বাড়ে। রান্নাঘরে ব্লেন্ডার মেশিন আসে, আরেকটু বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হতে থাকে। আস্তে আস্তে সাউন্ড সিস্টেম, মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক চুলা, ওয়াশিং মেশিন, শীতাতপনিয়ন্ত্রক যন্ত্র, ওয়াই-ফাই রাউটার পরিবারগুলোর নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে এবং বিদ্যুতের ব্যবহারও বাড়তে থাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা উন্নত হয়েছি, আমাদের চাহিদা বেড়েছে, আমাদের বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে এবং তাল মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনে সব সময়ই ঘাটতি ছিল। যে কারণে আগেও কমবেশি লোডশেডিং ছিল, এখনো আছে। আবার বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামও প্রায়শই ওঠানামা করে। হয়তো এসব কারণেই মানুষ সব সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে জ্বালানির বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা উন্নত হয়েছি, আমাদের চাহিদা বেড়েছে, আমাদের বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে এবং তাল মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বেড়েছে; কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনে সব সময়ই ঘাটতি ছিল।
একদল চিন্তাশীল মানুষ সৌরশক্তি, বায়ুকলের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির প্রযুক্তি নিয়ে যেমন ভেবেছে, তেমনি কিছু মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল চিরস্থায়ী গতিযন্ত্রের মতো কল্পনাপ্রসূত প্রযুক্তি। দেশ ও দেশের বাইরের চিত্র এ ক্ষেত্রে বেশ কাছাকাছি।
সামনের দিনগুলোতে জাতি হিসেবে আমরা আরও উন্নত হব, বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে এবং জীবাশ্ম জ্বালানিও আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাবে। তাই আমাদের চেষ্টা থাকা উচিত নবায়নযোগ্য শক্তি ও নিউক্লিয়ার শক্তির দক্ষ ব্যবহার নিয়ে। কীভাবে আরও কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করা যায় বা কীভাবে নকশা করলে আরও ছোট আয়তনের বায়ুকল থেকে আরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় অথবা স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর, ফিউশন রিঅ্যাক্টর কিংবা নতুন প্রযুক্তির নিউক্লিয়ার জ্বালানি নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণাই এনে দিতে পারে আসন্ন বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলা করার সম্ভাব্য সমাধানের রূপরেখা।