কেমব্রিজের ইতিহাস বদলানো এক সকাল

বিজ্ঞানী জ্যাক মোনো এবং ফ্রাঁসোয়া জ্যাকবছবি: এএফপি/গেটি ইমেজ

১৯৫০-এর দশকের শেষ দিক। জীববিজ্ঞান তখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বড় বড় কিছু রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সমাধানগুলোই আবার জন্ম দিচ্ছে আরও জটিল সব প্রশ্ন। ১৯৪৪ সালে ওসওয়াল্ড এভেরি, কলিন ম্যাকলিওড এবং ম্যাকলিন ম্যাককার্টি প্রমাণ করেছিলেন, ডিএনএ বংশগতির বাহক। এরপর ১৯৫৩ সালে জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক উন্মোচন করেন ডিএনএর ডাবল হেলিক্স গঠন। ১৯৫৮ সালে ম্যাথিউ মেসেলসন এবং ফ্র্যাঙ্কলিন স্টাহল দেখিয়েছেন, ডিএনএ কীভাবে নিজের হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করে। সব জানা হলো, তবু একটি মৌলিক প্রশ্ন পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—ডিএনএর পাতায় লেখা সেই নির্দেশগুলো বাস্তবে কীভাবে রক্তে-মাংসে প্রোটিন হয়ে ধরা দেয়?

বিজ্ঞানীরা জানতেন, প্রোটিন তৈরির আসল কারখানা কোষের সাইটোপ্লাজমে থাকা ক্ষুদ্র কণা রাইবোজোম। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জর্জ প্যালাড ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এই কণাগুলো শনাক্ত করেন। আরও জানা ছিল, এই রাইবোজোমের ভেতরে আরএনএ এবং প্রোটিন উভয়ই থাকে। এই তথ্য থেকেই তখন বিজ্ঞানীদের মাথায় একটা সহজ কিন্তু ভুল ধারণা জেঁকে বসল। জর্জ গ্যামোর মতো তাত্ত্বিকেরা তখন ভাবতে শুরু করলেন, হয়তো জিন থেকে তৈরি হওয়া আরএনএ গিয়ে রাইবোজোমের স্থায়ী অংশ হয়ে যায়। তারপর সেই রাইবোজোমটি কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরির জন্য বিশেষায়িত হয়ে ওঠে। বিষয়টা অনেকটা এমন: প্রতিটি রাইবোজোম যেন একেকটি আলাদা কারখানা, যারা কেবল একটি নির্দিষ্ট নকশা নিয়েই আজীবন কাজ করে যাবে।

শুরুর দিকে এই ধারণাটা কিন্তু বেশ জুতসই মনে হয়েছিল। রাইবোজোম নিজেই এক জটিল কাঠামো; সেখানে যেহেতু আগে থেকেই আরএনএ আছে, তাই জিনের বার্তা সেখানে স্থায়ীভাবে যুক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু গোল বাধল পরীক্ষার ফলাফল মেলাতে গিয়ে।

আরও পড়ুন
১৯৪৪ সালে ওসওয়াল্ড এভেরি, কলিন ম্যাকলিওড এবং ম্যাকলিন ম্যাককার্টি প্রমাণ করেছিলেন, ডিএনএ বংশগতির বাহক।

পাস্তুর ইনস্টিটিউটের তিন দিকপাল বিজ্ঞানী জ্যাক মোনো, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব এবং আর্থার পার্ডি বাস্তবে দেখলেন অন্য চিত্র। কোষ অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে নতুন প্রোটিন তৈরি করতে পারে। পরিবেশ সামান্য বদলালেই প্রোটিন তৈরির ধুম পড়ে যায়। প্রতিটি নতুন জিনের জন্য যদি আলাদা করে রাইবোজোম কারখানা বানাতে হতো, তাহলে অনেক সময় লাগত! রাইবোজোম নিজে এত জটিল যে তাকে হুট করে বানিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। অথচ কোষের কাজ চলছিল বিদ্যুৎগতিতে।

আরেকটি মজার বিষয় বিজ্ঞানীদের নজরে এল। বিভিন্ন অবস্থায় তৈরি হওয়া রাইবোজোমগুলোর গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, তাদের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। অর্থাৎ, আলাদা আলাদা বিশেষায়িত রাইবোজোমের কোনো প্রমাণ মিলল না। বরং একই রাইবোজোম বিভিন্ন জিনের প্রোটিন তৈরি করতে পারছে। এর মানে দাঁড়াল, রাইবোজোম হয়তো নিজে কোনো নির্দেশ বহন করে না; সে কেবল একটি আজ্ঞাবহ যন্ত্র।

এই দ্বন্দ্ব বিজ্ঞানীদের মনে একধরনের অস্থিরতা তৈরি করল। রাইবোজোম যদি নির্দেশ না দেয়, তবে সেই নির্দেশ আসে কোথা থেকে? ডিএনএ তো থাকে নিউক্লিয়াসে, আর রাইবোজোম সাইটোপ্লাজমে। এই দুই ভিন্ন মেরুর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান হয় কীভাবে? মাঝখানে কি কোনো অস্থায়ী সেতু রয়েছে?

বাঁ থেকে জ্যাক মোনো, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব এবং আন্দ্রে লেভো। পাস্তুর ইনস্টিটিউটের এই বিজ্ঞানীরা জিন নিয়ন্ত্রণ ও অপেরন ধারণার ভিত্তি নির্মাণ করেন

ধীরে ধীরে এক নতুন বৈপ্লবিক চিন্তার উদয় হলো। সিডনি ব্রেনার এবং ফ্রান্সিস ক্রিক উপলব্ধি করলেন, রাইবোজোম একটি সাধারণ অনুবাদক যন্ত্র, যা যেকোনো বার্তা পড়তে সক্ষম। নির্দেশের নির্দিষ্টতা আসে বার্তার উৎস থেকে, যন্ত্র থেকে নয়। অর্থাৎ জিন থেকে কোনো এক ক্ষণস্থায়ী অণু তৈরি হয়, যা ডিএনএর তথ্য নিয়ে রাইবোজোমে পৌঁছে দেয় এবং কাজ শেষ হওয়ামাত্রই ভেঙে যায়। সে স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রাণের স্পন্দন টিকিয়ে রাখতে সে অপরিহার্য।

এই ধারণাটি তখনো পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হয়নি ঠিকই, কিন্তু এটি বিজ্ঞানীদের চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিল। রাইবোজোমকে বিশেষায়িত কারখানা ভাবার ভুলটা ভাঙতেই জীবনের তথ্যপ্রবাহের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। এই ক্ষণস্থায়ী বার্তাবাহকের খোঁজই শেষ পর্যন্ত আমাদের নিয়ে গেল সেই বহুল প্রতীক্ষিত মেসেঞ্জার আরএনএ আবিষ্কারের দিকে।

আরও পড়ুন
সিডনি ব্রেনার এবং ফ্রান্সিস ক্রিক উপলব্ধি করলেন, রাইবোজোম একটি সাধারণ অনুবাদক যন্ত্র, যা যেকোনো বার্তা পড়তে সক্ষম। নির্দেশের নির্দিষ্টতা আসে বার্তার উৎস থেকে, যন্ত্র থেকে নয়।

ফ্যাক্টর এক্স: জিনের অদৃশ্য ছায়া

জিন কীভাবে কোষে এনজাইম বা প্রোটিন তৈরির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, সেই পরীক্ষা থেকে আমরা এক গভীর রহস্যের ইঙ্গিত পাই। যখন একটি জিন এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্যটিতে প্রবেশ করল, তখন দেখা গেল ল্যাকটোজ ভাঙার এনজাইম তৈরির প্রক্রিয়া প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গেছে। কোষের কোনো বাড়তি প্রস্তুতিরই দরকার পড়ল না। যেন জিন এল, নির্দেশ দিল, আর ওদিকে কাজ শুরু হয়ে গেল!

এই ‘সঙ্গে সঙ্গেই’ শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বিজ্ঞানের এক বিশাল ধাঁধা। প্রতিটি নতুন জিনের জন্য যদি কোষে আলাদা করে বিশেষায়িত রাইবোজোম (প্রোটিন তৈরির কারখানা) তৈরি করতে হতো, তাহলে অনেক সময় লাগত। কারণ রাইবোজোম কোনো মামুলি জিনিস নয়; এটি অত্যন্ত জটিল কাঠামো। জিন আসার পর যদি নতুন রাইবোজোম তৈরির জন্য বসে থাকতে হতো, তাহলে প্রোটিন উৎপাদনে একটা লম্বা বিরতি দেখা যেত। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটল না।

এই পর্যবেক্ষণটি ফ্রাঁসোয়া জ্যাকবকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল। তিনি বুঝতে পারলেন, আমরা হয়তো রাইবোজোমের ভূমিকা এত দিন ভুল বুঝেছি। রাইবোজোম কোনো নির্দিষ্ট প্রোটিনের জন্য তৈরি আলাদা কোনো কারখানা নয়। বরং এটি হতে পারে একটি সাধারণ অনুবাদক যন্ত্র, যা আগে থেকেই কোষে তৈরি থাকে এবং যেকোনো নির্দেশ এলেই তা পড়তে পারে। তাহলে আসল প্রশ্ন দাঁড়াল, সেই নির্দেশটি আসলে কোথা থেকে আসে?

ডিএনএ তো নিউক্লিয়াসে বন্দী থাকে, আর প্রোটিন তৈরি হয় সাইটোপ্লাজমে। মাঝখানে কোনো সেতু না থাকলে এই যোগাযোগ তো অসম্ভব!

আরও পড়ুন
রাইবোজোম কোনো মামুলি জিনিস নয়; এটি অত্যন্ত জটিল কাঠামো। জিন আসার পর যদি নতুন রাইবোজোম তৈরির জন্য বসে থাকতে হতো, তাহলে প্রোটিন উৎপাদনে একটা লম্বা বিরতি দেখা যেত।

জ্যাকব কল্পনা করলেন, জিন ও প্রোটিনের মাঝখানে নিশ্চয়ই একটি মধ্যবর্তী অণু আছে। এটি ডিএনএ থেকে তথ্য নকল করে রাইবোজোমে পৌঁছে দেয়। তবে এই অণুটি কোষে স্থায়ীভাবে পড়ে থাকতে পারে না। কারণ এটি যদি স্থায়ী হতো, তবে কোষের প্রতিক্রিয়া এত দ্রুত বদলাতে পারত না। অর্থাৎ এটি এমন এক অণু, যাকে দ্রুত তৈরি হতে হবে, দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে এবং কাজ শেষে দ্রুত ভেঙেও যেতে হবে।

এই রহস্যময় অণুটির কোনো হদিস তখনো মেলেনি। তাই জ্যাকব এর নাম দিলেন ফ্যাক্টর এক্স। এই নামের ভেতরেই ছিল এক অনিশ্চয়তা। এটি কোনো দৃশ্যমান অণু নয়, বরং ঘটনার যুক্তি মেলাতে গিয়ে তৈরি করা এক কাল্পনিক সেতু। কিন্তু বিজ্ঞান তো কেবল কল্পনায় থেমে থাকে না; কল্পনাকে প্রমাণে রূপ দিতে হয়।

পাজামো পরীক্ষা (জ্যাক মোনো, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব ও আর্থার পার্ডির পরীক্ষাকে সংক্ষেপে বলে পাজামো) তাই কেবল জিনের অন-অফ সুইচের গল্প ছিল না; এটি এমন এক প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুরো জীববিজ্ঞানের কাঠামোই বদলে যাওয়ার উপক্রম হলো। যদি ফ্যাক্টর এক্স সত্যিই থেকে থাকে, তবে তাকে খুঁজে বের করতে হবে। তার রাসায়নিক গঠন কী? সে কোথায় তৈরি হয়? কতক্ষণ টিকে থাকে? রাইবোজোমের সঙ্গেই তার সম্পর্ক কী?

আরও পড়ুন
জ্যাকব রহস্যময় অণুটির নাম দিলেন ফ্যাক্টর এক্স। এই নামের ভেতরেই ছিল এক অনিশ্চয়তা। এটি কোনো দৃশ্যমান অণু নয়, বরং ঘটনার যুক্তি মেলাতে গিয়ে তৈরি করা এক কাল্পনিক সেতু।

এই প্রশ্নগুলোই বিজ্ঞানীদের নতুন এক দিগন্তের দিকে ঠেলে দিল। ফ্যাক্টর এক্স তখনো কোষে এক অদৃশ্য বাতাসের মতো; তার প্রভাব বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু তাকে দেখা যাচ্ছে না। ঠিক যেন কোনো ঘরে বাতাস বইছে, কিন্তু জানালাটা কোথায়, কেউ জানে না। বিজ্ঞানীরা তখন সেই জানালাটিরই সন্ধান শুরু করলেন। আর সেই অনুসন্ধানই তাঁদের নিয়ে গেল ভাইরাস বা ফেজ সংক্রমণের গবেষণায়, যেখানে প্রথমবারের মতো দেখা মিলল এক ক্ষণস্থায়ী আরএনএর, যা হুট করে তৈরি হয় এবং কাজ শেষে নিভে যায়।

পাজামো পরীক্ষা সরাসরি মেসেঞ্জার আরএনএ আবিষ্কার করেনি ঠিকই, কিন্তু এটি সেই প্রশ্নটি তৈরি করে দিয়েছিল, যা ছাড়া ১৯৬০ সালের কেমব্রিজের সেই ঐতিহাসিক আলোচনা কখনোই সম্ভব হতো না। জিনের সেই অদৃশ্য বার্তাবাহক এমআরএনএর ধারণা এভাবেই ধীরে ধীরে ডানা মেলতে শুরু করল।

আরও পড়ুন
সংক্রমণের পর ভাইরাসের ডিএনএ যখন কোষের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়, তখন ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব কাজকর্ম সব লাটে ওঠে। কোষটি তখন হয়ে যায় ভাইরাসের আজ্ঞাবহ দাস।

ফেজ সংক্রমণ ও অস্থায়ী আরএনএ

পাজামো পরীক্ষার পর যখন জিন ও প্রোটিনের মাঝখানে একটি অস্থায়ী সেতুর সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছেন, ঠিক তখনই ১৯৫৬ সালের একটি পুরোনো গবেষণার কথা তাঁদের মনে পড়ে যায়। এলিয়ট ভোলকিন এবং লাজারাস অ্যাস্ট্রাচান তখন ব্যাকটেরিওফেজ টি-টু নামক ভাইরাস নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁদের সেই কাজ সরাসরি মেসেঞ্জার শব্দটি উচ্চারণ না করলেও পরবর্তীকালে দেখা যায়, তাঁরা আসলে আধুনিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্যটিরই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

ভোলকিন ও অ্যাস্ট্রাচান দেখছিলেন, যখন একটি ভাইরাস ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে, তখন কোষের ভেতরে ঠিক কী ঘটে। সংক্রমণের পর ভাইরাসের ডিএনএ যখন কোষের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়, তখন ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব কাজকর্ম সব লাটে ওঠে। কোষটি তখন হয়ে যায় ভাইরাসের আজ্ঞাবহ দাস।

তাঁরা লক্ষ করলেন, সংক্রমণের ঠিক পরপরই কোষে একধরনের নতুন আরএনএ তৈরি হচ্ছে। এই আরএনএর মধ্যে দুটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল:

১. এর রাসায়নিক গঠন ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএর সঙ্গে মেলে না, বরং হুবহু ভাইরাল ডিএনএর মতো।

২. এই আরএনএ অণুটি কোষের অন্যান্য উপাদানের মতো স্থায়ী নয়। এটি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে তৈরি হয় এবং কাজ শেষে খুব দ্রুত ভেঙে যায়।

তৎকালীন বিজ্ঞানীরা রাইবোজোম নিয়ে এত বেশি মগ্ন ছিলেন যে, এই ক্ষণস্থায়ী আরএনএর গুরুত্ব তখন কেউ সেভাবে বুঝতেই পারেননি। সবার ধারণা ছিল, রাইবোজোমাল আরএনএই বোধ হয় জিনের স্থায়ী নির্দেশ। ফলে ভোলকিন-অ্যাস্ট্রাচানের এই পর্যবেক্ষণটি তখন শুধু একটি বায়ো-কেমিক্যাল তথ্য হিসেবেই ধামাচাপা পড়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন
ভোলকিন ও অ্যাস্ট্রাচান লক্ষ করলেন, সংক্রমণের ঠিক পরপরই কোষে একধরনের নতুন আরএনএ তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু ১৯৬০ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ব্রেনার ও ক্রিক যখন জ্যাকবের ফ্যাক্টর এক্স নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ তাঁদের মাথায় বজ্রপাতের মতো এক চিন্তা খেলল। একটি অণু, যা ডিএনএর নির্দেশ অনুযায়ী তৈরি হয়, যা স্থায়ী নয়, যা দ্রুত জন্মায় এবং কাজ শেষে অদৃশ্য হয়ে যায়—এই সব বৈশিষ্ট্যই তো হুবহু জ্যাকবের সেই কল্পিত ফ্যাক্টর এক্সের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে!

এই মুহূর্তটি ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অনন্য বাঁক। এখানে কোনো নতুন ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয়নি, ব্যবহৃত হয়নি কোনো আধুনিক যন্ত্র। বরং বিচ্ছিন্ন দুটি তথ্যকে একত্রে গেঁথে একটি বিশাল তত্ত্বের জন্ম দেওয়া হলো। তাঁরা বুঝতে পারলেন, রাইবোজোম আসলে একটি সাধারণ অনুবাদক যন্ত্র মাত্র। আর সেই যন্ত্রে যে নির্দেশপত্রটি আসে, সেটিই হলো এই অস্থায়ী আরএনএ।

ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যাচ্ছে ব্যাকটেরিওফেজ T2-এর গঠন

এখন আর প্রশ্ন এটি নয় যে ফ্যাক্টর এক্স বলে কিছু আছে কি না। বরং এখনকার চ্যালেঞ্জ হলো প্রমাণ করা যে, এই অস্থায়ী আরএনএই সেই অধরা ফ্যাক্টর এক্স। প্রশ্ন জাগল, ভাইরাস কি সংক্রমণের সময় পুরোনো রাইবোজোমগুলোকেই ব্যবহার করে, নাকি নিজের জন্য নতুন কারখানা বানায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হলো সেই মহাকাব্যিক পরীক্ষা, যা ১৯৬১ সালে জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘অ্যান আনস্টেবল ইন্টারমিডিয়েট’ নামে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয়।

আরও পড়ুন
একটি অণু, যা ডিএনএর নির্দেশ অনুযায়ী তৈরি হয়, যা স্থায়ী নয়, যা দ্রুত জন্মায় এবং কাজ শেষে অদৃশ্য হয়ে যায়—এই সব বৈশিষ্ট্যই তো হুবহু জ্যাকবের সেই কল্পিত ফ্যাক্টর এক্সের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে!

প্রমাণের কষ্টিপাথরে ফ্যাক্টর এক্স

ধারণা যতই শক্তিশালী হোক, বিজ্ঞান কেবল অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। জ্যাকবের সেই ফ্যাক্টর এক্স বা ভোলকিন-অ্যাস্ট্রাচানের সেই অস্থায়ী আরএনএ নিয়ে যত আলোচনাই হোক, ল্যাবরেটরির কষ্টিপাথরে তাকে প্রমাণ করতেই হবে। ব্রেনার, জ্যাকব এবং ক্রিক এবার কোমর বেঁধে নামলেন। তাঁদের লক্ষ্য একটাই—এই অস্থায়ী আরএনএই জিনের সেই অধরা বার্তাবাহক, তা প্রমাণ করা। এটি কি কেবল ভাইরাস সংক্রমণের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, নাকি প্রাণের তথ্যের আসল বাহক?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাঁরা এমন এক পরীক্ষার ছক আঁকলেন, যা একদিকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম, অন্যদিকে দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত। এখানে ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে এলেন ম্যাথিউ মেসেলসন। কয়েক বছর আগেই তিনি ভারী নাইট্রোজেন ব্যবহার করে ডিএনএ প্রতিলিপির রহস্য ভেদ করেছিলেন। তিনি ভাবলেন, সেই একই টেকনিক এবারও কাজে লাগানো যাক।

পরীক্ষার পরিকল্পনাটি ছিল তিনটি ধাপে সাজানো এক নিখুঁত গাণিতিক ছক:

প্রথম ধাপ: রাইবোজোমকে ভারী করা

শুরুতে ব্যাকটেরিয়াগুলোকে বড় করা হলো এক বিশেষ মাধ্যমে, যেখানে নাইট্রোজেন ও কার্বন ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ভারী আইসোটোপ আকারে। কয়েক প্রজন্ম পর দেখা গেল, ব্যাকটেরিয়ার শরীরের প্রায় সব অণু, বিশেষ করে তাদের প্রোটিন তৈরির কারখানা বা রাইবোজোমগুলো ওজনে বেশ ভারী হয়ে গেছে। অর্থাৎ এদের ঘনত্ব এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।

দ্বিতীয় ধাপ: পরিবেশ বদল ও সংক্রমণ

এরপর হঠাৎ এই ভারী কোষগুলোকে সরিয়ে আনা হলো এক স্বাভাবিক মাধ্যমে, যেখানে সব আইসোটোপ হালকা। ঠিক এই মুহূর্তেই কোষগুলোকে আক্রমণ করানো হলো সেই বিধ্বংসী ফেজ ভাইরাস দিয়ে। ভাইরাস কোষের ভেতরে ঢুকে তার নিজস্ব জিনের নির্দেশে কাজ শুরু করে দিল।

আরও পড়ুন
কয়েক প্রজন্ম পর দেখা গেল, ব্যাকটেরিয়ার শরীরের প্রায় সব অণু, বিশেষ করে তাদের প্রোটিন তৈরির কারখানা বা রাইবোজোমগুলো ওজনে বেশ ভারী হয়ে গেছে।

তৃতীয় ধাপ: তেজস্ক্রিয় সংকেত ও সেন্ট্রিফিউজেশন

নতুন যে আরএনএ তৈরি হবে, তাকে চিনে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হলো তেজস্ক্রিয় ফসফরাস। ফলে সংক্রমণের পর কোষের ভেতরে যা-ই তৈরি হবে, তা থেকে তেজস্ক্রিয় সংকেত পাওয়া যাবে। এবার এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

কোষগুলোকে ভেঙে তাদের উপাদানগুলোকে সিজিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণে দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরানো হলো। এই পদ্ধতিতে ভারী ও হালকা অণুগুলো ওজনের ভারে আলাদা আলাদা স্তরে থিতু হয়। এখন প্রশ্ন হলো, সেই তেজস্ক্রিয় আরএনএ সিগন্যাল কোথায় পাওয়া যাবে?

ফলাফলের হিসাব ছিল খুব সোজা। যদি রেডিওঅ্যাকটিভ আরএনএর সংকেত সেই পুরোনো ভারী রাইবোজোমের স্তরে পাওয়া যায়, তবে বুঝতে হবে রাইবোজোম একটা সাধারণ যন্ত্র; সে পুরোনো ফ্যাক্টরিতেই নতুন জিনের নির্দেশ পড়ছে। আর যদি সংকেত হালকা অংশে পাওয়া যায়, তবে বোঝা যাবে নতুন জিনের জন্য কোষ নতুন করে রাইবোজোম কারখানা তৈরি করছে।

১৯৬০ সালের কেমব্রিজের সেই ঐতিহাসিক সময়, যখন ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানীরা জিন থেকে প্রোটিনে তথ্য কীভাবে পৌঁছে যায়, সেই রহস্য উদ্‌ঘাটনের পরীক্ষা চালাচ্ছেন

এই পরীক্ষাটি ছিল এক অকাট্য যুক্তি। এখানে কোনো মাঝপথ ছিল না। হয় রাইবোজোম স্থায়ী, নয়তো বার্তাবাহক অস্থায়ী। কাগজে-কলমে এই পরিকল্পনা সহজ মনে হলেও ল্যাবরেটরিতে তাঁদের বারবার ব্যর্থ হতে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন তাঁরা সফল হলেন, তখন দেখা গেল সেই তেজস্ক্রিয় আরএনএর সংকেত পাওয়া যাচ্ছে পুরোনো ভারী রাইবোজোমগুলোর সঙ্গেই!

অর্থাৎ প্রমাণিত হলো, রাইবোজোম বদলায় না, বদলায় শুধু বার্তা। জিন থেকে তথ্য বহন করার জন্য সত্যিই একটি ক্ষণস্থায়ী মধ্যবর্তী অণু আছে। সেই অণুই বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে মেসেঞ্জার আরএনএ নামে।

আরও পড়ুন
যদি রেডিওঅ্যাকটিভ আরএনএর সংকেত সেই পুরোনো ভারী রাইবোজোমের স্তরে পাওয়া যায়, তবে বুঝতে হবে রাইবোজোম একটা সাধারণ যন্ত্র; সে পুরোনো ফ্যাক্টরিতেই নতুন জিনের নির্দেশ পড়ছে।

ব্যর্থতার প্রান্তে: একটি ছোট ভুল ও একসমুদ্র সমান সাফল্য

কাগজে-কলমে ছকটা ছিল নিখুঁত, পরিকল্পনা ছিল একদম পরিষ্কার। কিন্তু ল্যাবরেটরির চার দেয়ালের ভেতরে কাজ শুরু হতেই বোঝা গেল, বাস্তব বড় কঠিন! সিডনি ব্রেনার, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব ও ম্যাথিউ মেসেলসন যতবারই পরীক্ষা চালাচ্ছেন, ততবারই কাঙ্ক্ষিত ফল হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল সেই সেন্ট্রিফিউজেশন পদ্ধতি। ঘনত্ব-গ্রেডিয়েন্টে রাইবোজোমগুলো আলাদা হয়ে স্পষ্ট ব্যান্ড তৈরি করার কথা ছিল, যাতে বোঝা যায় রেডিওঅ্যাকটিভ আরএনএগুলো ঠিক কোথায় আছে। কিন্তু দেখা গেল, রাইবোজোমগুলো ঠিকমতো বসছেই না। কখনো তারা ভেঙে যাচ্ছে, কখনো আবার ধোঁয়াটে হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

একবার নয়, বারবার একই ধাক্কা। নতুন করে নমুনা তৈরি করা হচ্ছে, আবার মেশিন চালানো হচ্ছে, আবার মাপ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ফল সেই শূন্য! ব্রেনার আর জ্যাকব ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে এসেছিলেন খুব অল্প সময়ের জন্য। সেই সময়ের মধ্যেই এই অসাধ্য সাধন করতে হবে। দিন পার হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সাফল্যের দেখা নেই। বিজ্ঞানীদের মনে তখন হতাশা ও ক্লান্তি বাসা বাঁধতে শুরু করেছে।

ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব পরে তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, একসময় তাঁরা প্রায় ধরেই নিয়েছিলেন যে এই পরীক্ষা সফল হবে না। বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক বড় বড় আবিষ্কার ঠিক এমন মুহূর্তেই থমকে গেছে। আবার অনেক যুগান্তকারী জয় জন্ম নিয়েছে ঠিক এই খাদের কিনারা থেকেই। ব্রেনার ও জ্যাকব তখন সেই সীমারেখায় দাঁড়িয়ে—সামনে হয় বিশ্বজয়ী সাফল্য, নয়তো একরাশ ব্যর্থতা নিয়ে ফিরে যাওয়া। তাঁরা তখনো জানতেন না, সমাধানের চাবিকাঠিটা তাঁদের হাতের নাগালেই আছে।

আরও পড়ুন
ব্রেনার আর জ্যাকব ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে এসেছিলেন খুব অল্প সময়ের জন্য। সেই সময়ের মধ্যেই এই অসাধ্য সাধন করতে হবে। দিন পার হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সাফল্যের দেখা নেই।

মালিবু সমুদ্রতট ও সেই ইউরেকা মুহূর্ত

কয়েক সপ্তাহের হাড়ভাঙা খাটুনি ও ব্যর্থতার পর একদিন তাঁরা একটু বিরতি নিলেন। মাথা ঠান্ডা করার জন্য সবাই মিলে গেলেন মালিবুর সমুদ্রতটে। সমুদ্রের নীল জলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ সিডনি ব্রেনারের মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো একটি চিন্তা খেলল। এত দিন তাঁরা সবকিছু নিয়ে ভাবলেও একটি ছোট রাসায়নিক উপাদানের কথা একদম ভুলে গিয়েছিলেন—ম্যাগনেসিয়াম!

ব্রেনার জানতেন, রাইবোজোম তার গঠন ঠিক রাখতে ম্যাগনেসিয়াম আয়নের ওপর গভীরভাবে নির্ভর করে। যদি ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ কম হয়, তবে রাইবোজোমের সেই সূক্ষ্ম কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। তাঁরা ল্যাবে যে দ্রবণটি ব্যবহার করছিলেন, সেখানে কি ম্যাগনেসিয়াম যথেষ্ট ছিল? সম্ভবত না! আর সে কারণেই সেন্ট্রিফিউজ করার সময় প্রচণ্ড চাপে রাইবোজোমগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। ব্রেনার চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘সমস্যাটা আসলে ম্যাগনেসিয়ামে!’

তাঁরা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত ল্যাবে ফিরে এলেন। এবার দ্রবণে পর্যাপ্ত ম্যাগনেসিয়াম যোগ করা হলো। আবার নমুনা প্রস্তুত হলো, আবার চালু হলো সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্র। কয়েক ঘণ্টা পর যখন ফলাফল এল, তখন সবার চোখ ছানাবড়া! এবার ঘনত্ব-গ্রেডিয়েন্টে একদম ঝকঝকে স্পষ্ট ব্যান্ড দেখা গেল। আর যখন রেডিওঅ্যাকটিভ সিগন্যাল মাপা হলো, দেখা গেল সেই নতুন তৈরি হওয়া আরএনএগুলো হুবহু পুরোনো সেই ভারী রাইবোজোমের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে আছে। নতুন কোনো রাইবোজোম তৈরি হয়নি!

এর মানে কী? এর মানে হলো—রাইবোজোম কোনো বিশেষায়িত কারখানা নয়, সে আগে থেকেই কোষে উপস্থিত এক সাধারণ শ্রমিক। সেই রহস্যময় ফ্যাক্টর এক্স আসলে এক অস্থায়ী আরএনএ, যা জিনের গোপন বার্তা নিয়ে এসে পুরোনো রাইবোজোমে বসে এবং প্রোটিন তৈরির কাজ শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের অন্ধকার আর ব্যর্থতা পেরিয়ে অবশেষে আলোর দেখা মিলল। প্রমাণিত হলো, জিনের সেই বার্তাবাহক আর কোনো কল্পনা নয়, এটি এক পরম বাস্তব। আর এভাবেই জন্ম নিল আধুনিক জীববিজ্ঞানের অন্যতম নায়ক মেসেঞ্জার আরএনএ।

আরও পড়ুন
যখন রেডিওঅ্যাকটিভ সিগন্যাল মাপা হলো, দেখা গেল সেই নতুন তৈরি হওয়া আরএনএগুলো হুবহু পুরোনো সেই ভারী রাইবোজোমের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে আছে। নতুন কোনো রাইবোজোম তৈরি হয়নি!

অস্থায়ী বার্তাবাহকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা: আধুনিক জীববিজ্ঞানের নতুন ব্যাকরণ

১৯৬১ সাল ছিল জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় বছর। ঠিক সেই বছরই বিখ্যাত নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হলো সেই কালজয়ী পরীক্ষার ফলাফল। সেখানে বিজ্ঞানীদের সেই ফ্যাক্টর এক্স বা রহস্যময় অণুটির পরিচয় দেওয়া হলো এক অসামান্য বর্ণনায়, ‘এটি একটি অস্থায়ী মধ্যবর্তী অণু, যা জিন থেকে প্রোটিন তৈরির কারখানায় তথ্য বয়ে নিয়ে যায়।’ এই অস্থায়ী বার্তাবাহক অণুটিই হলো আমাদের আজকের পরিচিত মেসেঞ্জার আরএনএ।

এই ঘোষণাটি কেবল একটি নতুন জৈব-অণুর আবিষ্কার ছিল না; এটি ছিল জীবনের ভাষা পড়ার এক নতুন ব্যাকরণ। এই আবিষ্কারের পর ডিএনএর রহস্যময় জগৎটি বিজ্ঞানীদের সামনে আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। এখন এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ডিএনএ নিজে সরাসরি প্রোটিন তৈরি করে না। প্রোটিন তৈরির আগে ডিএনএর তথ্য হুবহু কপি করা হয় আরএনএর পাতায়। আর সেই আরএনএ অণুটি হয় অত্যন্ত চঞ্চল এবং ক্ষণস্থায়ী।সে রাইবোজোমে গিয়ে বসে, কমান্ড দেয়, প্রোটিন তৈরি করায় এবং কাজ শেষ হওয়ামাত্রই নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়।

এত দিনের সেই ভুল ধারণাটিও এক নিমেষে ভেঙে গেল। রাইবোজোম কোনো বিশেষায়িত কারখানা নয়। এটি আসলে একটি সাধারণ অনুবাদক যন্ত্র, যা যেকোনো বার্তা পড়তে সক্ষম। একটি কোষ কখন কোন প্রোটিন বানাবে, তার পুরো নির্দিষ্টতা আসে এই এমআরএনএর হাত ধরেই।

এই ধারণাই পরবর্তীকালে আধুনিক জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়: ডিএনএ→আরএনএ →প্রোটিন। একটি ধূসর সকালে কিংস কলেজের লবিতে শুরু হওয়া সেই অস্থিরতা এভাবেই পূর্ণতা পেল এক যুগান্তকারী তত্ত্বে। জীবনের এই অদ্ভুত ছন্দ আর শৃঙ্খলার গল্প আমাদের শিখিয়ে দিল, প্রকৃতি তার সবচেয়ে বড় রহস্যগুলো কতই না নিপুণভাবে এক ক্ষণস্থায়ী বার্তাবাহকের আড়ালে লুকিয়ে রাখে!

আরও পড়ুন
ডিএনএ নিজে সরাসরি প্রোটিন তৈরি করে না। প্রোটিন তৈরির আগে ডিএনএর তথ্য হুবহু কপি করা হয় আরএনএর পাতায়। আর সেই আরএনএ অণুটি হয় অত্যন্ত চঞ্চল এবং ক্ষণস্থায়ী।

আধুনিক জীববিজ্ঞানে প্রতিধ্বনি: এক ক্ষণস্থায়ী অণুর দীর্ঘস্থায়ী বিজয়

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন জিন এক্সপ্রেশন বিশ্লেষণ করি, ট্রান্সক্রিপটোমিক্স নিয়ে চুলচেরা গবেষণা করি কিংবা আরএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে রোগের রহস্য খুঁজি, তখন আমরা আসলে ১৯৬০ সালের সেই বৈপ্লবিক ধারণার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকি। mRNA এখন আর কেবল একটি তাত্ত্বিক সেতু বা ফ্যাক্টর এক্স নয়; এটি আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির প্রধানতম হাতিয়ার।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির সেই কঠিন দিনগুলোতে mRNA ভ্যাকসিন প্রযুক্তি বিশ্বকে এক নতুন পথ দেখিয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, ল্যাবরেটরিতে তৈরি একটি অস্থায়ী আরএনএ কোষে প্রবেশ করিয়ে আমাদের শরীরকে দিয়েই নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করানো সম্ভব। আমাদের শরীর সেই প্রোটিনকে চিনে নিয়ে আগেভাগেই গড়ে তোলে এক অভেদ্য রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা।

এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি কোভিড-১৯-এর টিকা

ভেবে দেখলে অবাক হতে হয়, ১৯৬০ সালে কেমব্রিজের সেই ধূসর সকালে যে ধারণার জন্ম হয়েছিল, সেটিই একুশ শতকে এসে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। যে অণুটি কোষে মাত্র কয়েক মিনিট বেঁচে থাকে, সেই অণুই আজ বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে। মালিবুর সমুদ্রতটে কাটানো সেই বিষণ্ণ বিকেল, ম্যাগনেসিয়ামের সেই ছোট্ট কিন্তু অমূল্য ইউরেকা মুহূর্ত—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক মহাকাব্যিক জয়যাত্রা।

সেই মেসেঞ্জার আরএনএ আজ কেবল একটি জৈব-অণু নয়। এটি জীবনের রহস্যময় ভাষা বোঝার এক জাদুকরী চাবিকাঠি। আমাদের ডিএনএতে লেখা সেই প্রাচীন পাণ্ডুলিপিকে জীবনের ছন্দে অনুবাদ করে চলেছে এই ক্ষণস্থায়ী বার্তাবাহক, আজ অব্দি প্রতিটি কোষে, প্রতিটি স্পন্দনে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, ল্যাবরেটরিতে তৈরি একটি অস্থায়ী আরএনএ কোষে প্রবেশ করিয়ে আমাদের শরীরকে দিয়েই নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করানো সম্ভব।

একটি ক্ষণস্থায়ী অণুর চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার

মেসেঞ্জার আরএনএর জীবনকাল অদ্ভুত রকমের সংক্ষিপ্ত। কোষের ভেতরে সে বড়জোর কয়েক মিনিট বেঁচে থাকে, কখনোবা তারও কম। কাজ শেষ হওয়ামাত্রই সে ভেঙে যায়, মিলিয়ে যায় নিঃশব্দে; নিজের কোনো চিহ্ন আর অবশিষ্ট রাখে না। কিন্তু তার এই নশ্বর অস্তিত্ব বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন এক স্থায়ী চিহ্ন এঁকে দিয়েছে, যা মানবসভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে। ১৯৬০ সালের সেই ঐতিহাসিক আলোচনায় বিজ্ঞানীরা যা বুঝেছিলেন, তা ছিল পরম এক সত্য—জীবনের ভাষা সরাসরি পড়া যায় না, তাকে অনুবাদ করতে হয়। ডিএনএ যদি হয় তথ্যের এক বিশাল ভান্ডার, তবে সেই তথ্যকে সচল করতে একজন বার্তাবাহকের প্রয়োজন অপরিহার্য।

ল্যাবরেটরির চার দেয়াল ছাপিয়ে এই আবিষ্কারের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে জেনেটিক কোড নির্ধারণ, জিন ক্লোনিং থেকে শুরু করে আজকের অত্যাধুনিক আরএনএ সিকোয়েন্সিং পর্যন্ত। বর্তমানে কোন কোষে কোন জিনটি সক্রিয় আর কোনটি নিষ্ক্রিয়, তা বুঝতে আমরা আসলে ওই বার্তাবাহক ম্যাসেঞ্জার আরএনএর পদচিহ্নই খুঁজি।

আরও পড়ুন
১৯৬০ সালের সেই ঐতিহাসিক আলোচনায় বিজ্ঞানীরা যা বুঝেছিলেন, তা ছিল পরম এক সত্য—জীবনের ভাষা সরাসরি পড়া যায় না, তাকে অনুবাদ করতে হয়।

তবে এর সবচেয়ে বড় সার্থকতা ধরা দিয়েছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে। একসময়ের সেই তাত্ত্বিক ফ্যাক্টর এক্স আজ ম্যাসেঞ্জার আরএনএ ভ্যাকসিন হয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করছে। একটি ক্ষণস্থায়ী বার্তা শরীরে পাঠিয়ে নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করা এবং তার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলা—এই যে জাদুকরী প্রযুক্তি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল সেই ষাটের দশকেই।

যে অণুটি মাত্র কয়েক মিনিট বেঁচে থাকে, সে-ই আজ মানবজাতিকে দীর্ঘায়ু করার স্বপ্নে বিভোর করে রেখেছে। মালিবুর সেই বিষণ্ণ বিকেল আর ম্যাগনেসিয়ামের সেই ছোট্ট সমাধান থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। মেসেঞ্জার আরএনএ কেবল একটি অণু নয়; এটি জীবনের অমর কাব্য অনুবাদের এক অবিস্মরণীয় মাধ্যম।

লেখক: শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: নেচার, প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস, ভাইরোলজি, কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরি প্রেস এবং জার্নাল অব মলিকুলার বায়োলজি

আরও পড়ুন