মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে যেসব কোষ

মৃত্যুর পর মানুষের শরীরে ঠিক কী ঘটে? প্রশ্নটা শুনলে মনে হতে পারে, উত্তরটা বুঝি খুব সহজ। হৃৎপিণ্ড থেমে যায়, মস্তিষ্কের কাজ বন্ধ হয়ে যায় আর নিথর শরীরটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে পচনের দিকে। বহুকাল ধরে মৃত্যুর এই ছবিটিই চূড়ান্ত সত্যি বলে মেনে নিয়েছি আমরা। কিন্তু এই চেনা পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য এক অজানা গল্প।

ধরুন, একজন মানুষের মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর গবেষকেরা তাঁর শরীর থেকে কিছু কোষ সংগ্রহ করলেন। তারপর সেগুলোকে রাখলেন ল্যাবরেটরির বিশেষ এক নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে সেই কোষগুলো শুধু টিকে থাকল তা-ই নয়, বরং নতুন করে বিভাজিত হয়ে জন্ম দিল আরও নতুন কোষের!

ঘটনাটা শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে। কারণ, আমরা ভাবি মৃত্যুই বুঝি জীবনের শেষ স্টেশন। কিন্তু ক্ষুদ্র কোষের জগতে গল্পটা মোটেও এত সরল নয়। একজন মানুষের জীবনের সমাপ্তি আর তাঁর শরীরের প্রতিটি কোষের চিরবিদায় ঠিক একই মুহূর্তে ঘটে না।

আরও পড়ুন
আমাদের শরীরের কোষগুলোর গল্পটাও ঠিক ওই শহরের মতোই। হৃৎযন্ত্র থেমে গেলে, শরীরের মূল সাম্রাজ্যটা ভেঙে পড়লেও ক্ষুদ্র কোষগুলো নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন গতিতে বাঁচার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যায়।

বিষয়টা থমকে যাওয়া এক বিশাল শহরের গল্প হিসেবে কল্পনা করা যাক। কোনো এক রাতে যদি পুরো শহরের প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, মুহূর্তেই নিভে যাবে সব আলো, থমকে দাঁড়াবে বিশালাকার যন্ত্রগুলো। কিন্তু শহরের কোনো এক কোণে ব্যাটারির শক্তিতে হয়তো তখনো মিটমিট করে জ্বলবে কিছু বাতি, কোথাও হয়তো সচল থাকবে জরুরি জেনারেটর। অর্থাৎ পুরো শহর এক নিমেষে কিন্তু পুরোপুরি নিভে যায় না।

আমাদের শরীরের কোষগুলোর গল্পটাও ঠিক ওই শহরের মতোই। হৃৎযন্ত্র থেমে গেলে, শরীরের মূল সাম্রাজ্যটা ভেঙে পড়লেও ক্ষুদ্র কোষগুলো নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন গতিতে বাঁচার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যায়।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বিভিন্ন গবেষণা আমাদের এনে দাঁড় করিয়েছে নতুন এক দরজায়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মানুষের মৃত্যু ঘটার পরও কোষের ভেতরে অনবরত চলতে থাকে বিস্ময়কর সব পরিবর্তন।

আরও পড়ুন
কোনো মানুষের মৃত্যু হওয়া মানেই তাঁর শরীরের প্রতিটি ক্ষুদ্র কোষের তৎক্ষণাৎ মৃত্যু নয়। আবার শরীরের কোনো এক কোণে কয়েকটি কোষ বেঁচে আছে বলেই পুরো মানুষটিকে জীবিত বলা চলে না।

মৃত্যু কি সবার জন্য একই মুহূর্তে আসে

হৃৎপিণ্ড থমকে দাঁড়ালে মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায় পুরো শরীরের রক্ত সঞ্চালন। থামতে শুরু করে কোষে কোষে অক্সিজেন আর পুষ্টির চালান, স্তব্ধ হয়ে যায় শক্তির উৎপাদন। বিশাল এক সাম্রাজ্যের মতো শরীরের চেনা ও স্বাভাবিক কার্যক্রমগুলো একে একে ভেঙে পড়তে থাকে। তবে এই তীব্র সংকটে শরীরের সব কোষ কিন্তু একভাবে সাড়া দেয় না। মস্তিষ্কের কোষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মুহূর্তের মধ্যেই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। অন্যদিকে ত্বকের কোষ, কিছু পেশিকোষ এবং স্টেম সেল দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের সহনশীলতা বজায় রাখে।

এখানেই ফুটে ওঠে সূক্ষ্ম এক সত্য। কোনো মানুষের মৃত্যু হওয়া মানেই তাঁর শরীরের প্রতিটি ক্ষুদ্র কোষের তৎক্ষণাৎ মৃত্যু নয়। আবার শরীরের কোনো এক কোণে কয়েকটি কোষ বেঁচে আছে বলেই পুরো মানুষটিকে জীবিত বলা চলে না। কারণ, মানুষের জীবন মূলত মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড আর শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো বিশাল সব অঙ্গের এক সমন্বিত ছন্দ।

কোষের এই অদ্ভুত সহনশীলতার পার্থক্যই বিজ্ঞানীদের সামনে ছুড়ে দেয় বড় এক রহস্য। একজন মানুষের মৃত্যুর পরও কি এমন কিছু কোষ থেকে যায়, যাদের আবার নতুন করে প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই গবেষকেরা থমকে দাঁড়ান শরীরের বিশেষ একধরনের কোষের সামনে। এই কোষের নাম স্টেম সেল।

আরও পড়ুন
মস্তিষ্কের কোষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মুহূর্তের মধ্যেই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। অন্যদিকে ত্বকের কোষ, কিছু পেশিকোষ এবং স্টেম সেল দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের সহনশীলতা বজায় রাখে।

মৃত্যুর ১৭ দিন পরও কার্যক্ষম স্টেম সেল!

বিজ্ঞানের ইতিহাসে ২০১২ সালে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা ঘুরিয়ে দেয় এই রহস্যের মোড়। নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত পাস্তুর ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ফ্যাব্রিস শ্রেতিয়াঁ ও তাঁর দল কাজ করছিলেন মানুষের কঙ্কালপেশির স্টেম সেল নিয়ে। গবেষণাগারে তাঁরা যে সত্যটি উন্মোচন করেছিলেন, তা ছিল রীতিমতো কল্পনাতীত! দেখা যায়, মানুষের মৃত্যুর ১৭ দিন পরও মৃতদেহ থেকে সেই স্টেম সেলগুলো উদ্ধার করা সম্ভব! আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, ল্যাবরেটরির কৃত্রিম ও উপযুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে নেওয়ার পর সেই কোষগুলো আবার নতুন করে বিভাজিত হতে শুরু করে এবং জন্ম দেয় একদম নতুন পেশিকোষ।

তবে ‘উদ্ধার করা’ কথাটির পেছনে লুকিয়ে আছে সূক্ষ্ম এক হিসাব। এর মানে কিন্তু এই নয় যে মৃতদেহের সব পেশিকোষ ১৭ দিন ধরে স্বাভাবিকভাবে জীবিত ছিল। আসল সত্যটা হলো, মৃত্যুর এত দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও কিছু স্টেম সেল তাদের ভেতরের প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেনি। সুবিধাজনক পরিবেশ পেলেই নিজেদের পুনর্গঠন করার এবং নতুন কোষ তৈরির অদ্ভুত সেই ক্ষমতা তারা টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল।

আসলে স্টেম সেল হলো শরীরের সেই জাদুকরী কোষ, যা প্রয়োজনে বিভাজিত হয়ে হুবহু নিজের মতো নতুন কোষ বানাতে পারে, এমনকি রূপ নিতে পারে বিশেষ কিছু অঙ্গের কোষেও। পেশির ক্ষত মেটাতে বা পেশিকোষ পুনর্গঠনে এসব স্টেম সেলের কোনো জুড়ি নেই।

আরও পড়ুন
পেশির কিছু স্টেম সেল বিপাকক্রিয়ার গতি কমিয়ে একধরনের সুপ্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় চলে যেতে পারে। এতে তাদের শক্তির চাহিদাও কমে আসে। সেই সঙ্গে বাড়ে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সুযোগ।

শুধু মানুষের ওপরই থেমে থাকেননি বিজ্ঞানীরা। ইঁদুরের কঙ্কালপেশির স্টেম সেল নিয়েও তাঁরা চালিয়েছিলেন একই পরীক্ষা। সেখানে ১৭ দিনের দীর্ঘ সময়সীমা না পাওয়া গেলেও মূল সত্যটা কিন্তু বদলায়নি। মৃত্যুর পরও কিছু স্টেম সেল আমাদের ধারণার চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে তাদের পুনর্গঠনক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারে। এমনকি ইঁদুরের অস্থিমজ্জা থেকেও মৃত্যুর বেশ কয়েক দিন পর কার্যকর স্টেম সেল উদ্ধারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কিন্তু এই অদ্ভুত আবিষ্কারের সামনে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানীদের মনে জন্ম নেয় আরও বড় এক রহস্য। রক্ত সঞ্চালন বন্ধ, অক্সিজেনের অভাব আর শক্তির চরম সংকটের মাঝেও এই ক্ষুদ্র কোষগুলো মৃত্যুর পর এত দিন ধরে টিকে থাকে কীভাবে?

এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর লুকিয়ে আছে কোষের বিপাকক্রিয়ায়। কোষের বেঁচে থাকা ও কাজ করার জন্য নিরন্তর শক্তি দরকার। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সব কোষ একইভাবে শক্তি খরচ করে না। পেশির কিছু স্টেম সেল বিপাকক্রিয়ার গতি কমিয়ে একধরনের সুপ্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় চলে যেতে পারে। এতে তাদের শক্তির চাহিদাও কমে আসে। সেই সঙ্গে বাড়ে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সুযোগ।

আরও পড়ুন
ধারণা করা হয়, কোষের আশপাশের পরিবেশে রাসায়নিক পরিবর্তন, অক্সিজেনের স্বল্পতা ও বিপাকক্রিয়ার পরিবর্তন হয়তো কোনো না কোনো ভূমিকা থাকতে পারে।

বিষয়টা সহজে বোঝার জন্য ভালুকের শীতনিদ্রার কথা ভাবা যেতে পারে। শীতনিদ্রার সময় ভালুকের শরীরে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের গতি কমে যায়। ফলে শক্তির খরচও অনেক কমে আসে। পেশির স্টেম সেলের সুপ্ত অবস্থার সঙ্গে এই তুলনার বেশ মিল আছে। তবে দুটি প্রক্রিয়া কিন্তু হুবহু এক নয়। এটি শুধু মূল ধারণাটা বোঝানোর একটি চমৎকার উপমা মাত্র।

মৃত্যুর পর কোষের সুপ্ত অবস্থায় যাওয়ার পেছনে ঠিক কোন প্রক্রিয়াগুলো কাজ করে, তার সব উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের জানা নেই। ধারণা করা হয়, কোষের আশপাশের পরিবেশে রাসায়নিক পরিবর্তন, অক্সিজেনের স্বল্পতা ও বিপাকক্রিয়ার পরিবর্তন হয়তো কোনো না কোনো ভূমিকা থাকতে পারে।

তবে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোষের এই টিকে থাকার ক্ষমতা মানে কিন্তু পুরো মৃতদেহ জীবিত থাকা নয়। একটি কোষকে ল্যাবরেটরিতে উদ্ধার করে বংশবৃদ্ধি করানো আর মৃতদেহের ভেতরে তার স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আর এখানেই এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। মৃত্যুর পর কিছু কোষ শুধু টিকেই থাকে না, বরং কোষের ভেতরে জিনের কার্যকলাপসংশ্লিষ্ট দারুণ কিছু পরিবর্তনও ঘটাতে পারে।

আরও পড়ুন
ডিএনএতে লুকিয়ে থাকে জীবনের সব জটিল সংকেত ও জিনগত তথ্য। প্রোটিন তৈরি করার সময় ডিএনএ থেকে সেই তথ্যের একটি বিশেষ কপি তৈরি হয়। এই কপিই হলো এমআরএনএ।

মৃত্যুর পরও বদলে যায় জিনের কার্যকলাপ

কোষের এই অদ্ভুত বেঁচে থাকার রহস্য ভেদ করতে বিজ্ঞানীরা শুধু তাদের টিকে থাকার দৃশ্য দেখেই থমকে যাননি। তাঁরা দেখতে চেয়েছেন আরও গভীরে। মৃত্যুর এই আলো-আঁধারির মাঝে কোষের আণবিক বা পারমাণবিক পর্যায়ে, বিশেষ করে জিনের জগতে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলেছে, তাঁরা সেটাই জানতে চেয়েছেন।

২০১৭ সালের কথা। ওপেন বায়োলজি জার্নালে প্রকাশিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের বিজ্ঞানী পিটার নোবল ও তাঁর সহকর্মীদের এক যুগান্তকারী গবেষণা। ইঁদুর ও জেব্রাফিশের মৃত্যুর পর তাদের শরীরে থাকা জিনের বার্তাবাহক, অর্থাৎ ট্রান্সক্রিপ্টের পরিবর্তনগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন তাঁরা। ইঁদুরের ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর ৪৮ ঘণ্টা এবং জেব্রাফিশের ক্ষেত্রে ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল।

সেই পরীক্ষাগারে এক অভাবনীয় দৃশ্যের মুখোমুখি হলেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গেল, মৃত্যুর পরও ১ হাজার ৬৩টি জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত এমআরএনএ ট্রান্সক্রিপ্টের পরিমাণ আগের চেয়ে লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে গেছে!

গল্পের এই মোড়ে এমআরএনএর ভূমিকা একটু বুঝে নেওয়া দরকার। ডিএনএতে লুকিয়ে থাকে জীবনের সব জটিল সংকেত ও জিনগত তথ্য। প্রোটিন তৈরি করার সময় ডিএনএ থেকে সেই তথ্যের একটি বিশেষ কপি তৈরি হয়। এই কপিই হলো এমআরএনএ। সহজ কথায়, এমআরএনএর পরিমাণ বাড়া বা কমার মানে কোষের ভেতরে নির্দিষ্ট কিছু জিনের কার্যকলাপে বড় ধরনের নড়াচড়া শুরু হওয়া।

আরও পড়ুন
ইঁদুর ও জেব্রাফিশের মৃত্যুর পর তাদের শরীরে থাকা জিনের বার্তাবাহক অর্থাৎ ট্রান্সক্রিপ্টের পরিবর্তনগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন পিটার নোবল ও তাঁর সহকর্মীরা।

তবে মৃত্যুর পর এমআরএনএর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অর্থ কিন্তু এই নয় যে, জিনগুলো শুধুই নতুন উৎসাহে জেগে উঠে ঝড়ের বেগে এমআরএনএ বানিয়ে চলেছে। এখানে কাজ করে অন্য আরেকটি বিষয়। কত দ্রুত নতুন এমআরএনএ তৈরি হচ্ছে আর কত দ্রুত পুরোনো এমআরএনএ ভেঙে যাচ্ছে—এই দুই ব্যবস্থার ওঠানামার ওপরই নির্ভর করে মূল হিসাবটা।

দেখা গেল, মৃত্যুর পর যেসব জিনের কার্যকলাপে এই পরিবর্তনগুলো ঘটছে, সেগুলো সাধারণ কোনো জিন নয়। এর মধ্যে রয়েছে চাপের বিরুদ্ধে শরীরের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, প্রদাহ, কোষের নিয়মতান্ত্রিক মৃত্যু বা অ্যাপোপটোসিস, কোষের ভেতরে জরুরি পদার্থ পরিবহন আর ভ্রূণের বিকাশের সঙ্গে জড়িত জিনগুলোও!

এই পরিবর্তনগুলোর সময়কালও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কিছু পরিবর্তন ঘটে মৃত্যুর মাত্র আধঘণ্টার মধ্যেই, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আণবিক এই রূপান্তর ধরা পড়ে আরও অনেক পরে।

আরও পড়ুন
জীবনের শেষ সীমানা পেরিয়ে মৃত্যুর ঠিক পরের অদ্ভুত এই অবস্থাকে বিজ্ঞানীরা চমৎকার এক নামে ডেকেছেন, তা হলো টোয়ালাইট অব ডেথ বা মৃত্যুর গোধূলি।

বিষয়টা সত্যিই দারুণ ভাবনার খোরাক জোগায়। মৃত্যু মানেই তো সবকিছুর চিরতরে নিভে যাওয়া! কিন্তু মৃত্যুর পরও কোষের ভেতরে জিনের আণবিক কার্যকলাপে এই সক্রিয়তা দেখা যায় কেন? এর কোনো চূড়ান্ত উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো খুঁজে পাননি। তবে তাঁদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, জীবিত অবস্থায় কোনো আঘাত, চরম চাপ বা সংক্রমণের মুখে শরীর যে প্রতিরক্ষামূলক প্রক্রিয়াগুলো চালু করেছিল, মৃত্যুর পরও হয়তো তার প্রভাব কিছু সময় ধরে বজায় থাকে। এ ছাড়া কোষের ভেতরে বিভিন্ন অণুর স্থায়িত্ব ও ভেঙে যাওয়ার গতির তারতম্যের কারণেও এমনটা ঘটতে পারে।

জীবনের শেষ সীমানা পেরিয়ে মৃত্যুর ঠিক পরের অদ্ভুত এই অবস্থাকে বিজ্ঞানীরা চমৎকার এক নামে ডেকেছেন, তা হলো টোয়ালাইট অব ডেথ বা মৃত্যুর গোধূলি। ঠিক যেমন গোধূলিলগ্নে আলো ও অন্ধকারের এক অদ্ভুত মায়াবী সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়, তেমনি মৃত্যুর পরও শরীরের ভেতরের জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো একবারে নিভে না গিয়ে এক ঝাপসা আলোয় যেন তাদের শেষ অধ্যায়টি লিখে চলে।

 এখানে অবশ্য একটি জরুরি সতর্কতাও জড়িয়ে আছে। এই গবেষণার মূল পরীক্ষাগুলো চালানো হয়েছিল ইঁদুর ও জেব্রাফিশের ওপর। মানুষের টিস্যুতেও মৃত্যুর পর জিনগত পরিবর্তনের কিছু প্রমাণ মিললেও প্রাণীদের ওপর করা এই পরীক্ষার ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে হুবহু প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। এই জটিল রহস্যের পুরো জট খুলতে বিজ্ঞানীদের এখনো পাড়ি দিতে হবে আরও অনেক দূর।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, জীবিত অবস্থায় কোনো আঘাত, চাপ বা সংক্রমণের মুখে শরীর যে প্রতিরক্ষামূলক প্রক্রিয়াগুলো চালু করেছিল, মৃত্যুর পরও হয়তো তার প্রভাব কিছু সময় ধরে বজায় থাকে।

হাজারো জটিল গবেষণার পর শেষ পর্যন্ত এসে যে প্রশ্নটা মনকে দোলা দেয় তা হলো, এই অবিশ্বাস্য আবিষ্কারগুলো আসলে আমাদের কী কাজে আসবে?

অঙ্গ প্রতিস্থাপনে: একজন দাতার দেহ থেকে অঙ্গ সংগ্রহের পর সেই অঙ্গের কোষগুলোতে ঠিক কী পরিবর্তন ঘটে, তা গভীরভাবে বুঝতে পারলে অঙ্গ সংরক্ষণের পুরো চিত্রটাই বদলে যেতে পারে। এর ফলে প্রতিস্থাপিত অঙ্গগুলোকে আরও দীর্ঘ সময় সুস্থ রাখা এবং পরবর্তী সময়ে গ্রহণকারীর দেহে তা কতটা নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

স্টেম সেল থেরাপিতে: মৃত্যুর দীর্ঘ সময় পরও বেঁচে থাকা এই ক্ষুরধার স্টেম সেলগুলো ভবিষ্যতে পুনর্গঠনমূলক চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। তবে এই কোষগুলো সত্যিই অন্য কোনো জীবিত মানুষের দেহে নিরাপদে ব্যবহার করা যাবে কি না, তা নির্ভর করবে কোষের মান ধরে রাখা, সঠিক সংগ্রহপদ্ধতি এবং সেই সঙ্গে বিস্তর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সাফল্যের ওপর।

ফরেনসিক বিজ্ঞানে: মৃত্যুর পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিনের ক্ষণস্থায়ী এই রূপান্তরগুলো মেপে নিখুঁতভাবে মৃত্যুর সময় নির্ধারণের একেবারেই নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। যদিও প্রাণীদের শরীরে পাওয়া ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে কতটা নির্ভরযোগ্য, তা জানতে আরও কিছু পথ হাঁটা বাকি।

আরও পড়ুন
জীবন ও মৃত্যুর সীমানাটা আমরা যতটা সরল ভাবি, প্রকৃতি আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। মানুষের প্রাণস্পন্দন থমকে যাওয়া মানেই সবকিছুর চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

তাই এই আবিষ্কারগুলোই যে আগামীকাল থেকে মৃতদেহের কোষ দিয়ে বড় ধরনের চিকিৎসা শুরু করার মন্ত্র দিয়ে দিচ্ছে, ব্যাপারটা মোটেও সে রকম নয়। এটা আসলে আমাদের শেখাচ্ছে যে মৃত্যুর ঠিক পরমুহূর্তে শরীরের ভেতর ঠিক কী ঘটে। সেটা অনুধাবন করতে পারলে ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফরেনসিক গবেষণায় উন্মোচিত হবে নতুন নতুন পথ।

জীবন ও মৃত্যুর সীমানাটা আমরা যতটা সরল ভাবি, প্রকৃতি আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। মানুষের প্রাণস্পন্দন থমকে যাওয়া মানেই সবকিছুর চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অণুবীক্ষণিক কোষের জগতে তখনো নিঃশব্দে চলতে থাকে জীবনের অন্য এক লড়াই। প্রদীপ নিভে গেলেও যেমন তার উত্তাপ কিছু সময় থেকে যায়, মৃত্যুর পরের সময়টাও ঠিক তেমনি এক গোধূলিলগ্ন। মৃত্যুর এই অচেনা রাজ্য থেকেই হয়তো বিজ্ঞান একদিন খুঁজে নেবে আমাদের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর!

লেখক: প্রভাষক, রসায়ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, নাসিরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

সূত্র: ১. Latil M. et al. (2012). Skeletal muscle stem cells adopt a dormant cell state post mortem and retain regenerative capacity. Nature Communications.

২. Pozhitkov A.E. et al. (2017). Tracing the dynamics of gene transcripts after organismal death. Open Biology.

৩. Live Science, FierceBiotech & BioSpectrum Asia

৪. Testing cellular life after death

৫. Human Postmortem Life project

আরও পড়ুন