অদৃশ্য বিষ: বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার এক অনালোচিত কারণ

যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর আমি ও আমার স্ত্রী আনিকা একটা জিনিস খেয়াল করলাম। এখানকার বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট কমিউনিটিতে অনেক নতুন মা-বাবা আছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানেই তাঁদের ছোট ছোট বাচ্চারা আসে, সবার সঙ্গে মেশে, খেলে, আনন্দ করে। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, এই বাচ্চাগুলো বাংলাদেশের সমবয়সী বাচ্চাদের তুলনায় অদ্ভুতভাবে অনেক বেশি হাসিখুশি ও শান্ত। বাংলাদেশে আমার ছোট বোন ও চাচাতো ভাইবোনদের বড় হতে দেখেছি; তারা এদের তুলনায় অনেক বেশি খিটখিটে ছিল, সামান্যতেই কেঁদে উঠত। অপরিচিত ভিড়ের মধ্যে হলে তো কথাই নেই! অথচ এখানকার বাচ্চারা নতুন পরিবেশে সহজে মিশে যায়, কেঁদে উঠলেও দ্রুত শান্ত হয়। এর পেছনে অবশ্যই মা-বাবার প্রতিপালনের বড় ভূমিকা আছে, তবু প্যাটার্নটা স্পষ্ট। অনেকের সঙ্গেই এই আলাপটা করেছি; কমবেশি সবাই একমত হয়েছেন।

এই যে হঠাৎ কান্না বা আবেগের তীব্র বহিঃপ্রকাশ, এটি আসলে একটি জৈবিক ব্যাপার। কান্নার সংকেত তৈরি হয় মস্তিষ্কের গভীরে থাকা অ্যামিগডালা ও তার আশপাশের আবেগ সার্কিটে।

কিন্তু সেই সংকেতকে থামানোর ও শান্ত করার কাজটা করে মস্তিষ্কের সামনের অংশ, অর্থাৎ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। এটাই মূলত আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ কন্ট্রোলের কেন্দ্র।

আত্মনিয়ন্ত্রণের এই সংকট কিন্তু শুধু শিশুদের নয়, এ যেন আজ আমাদের গোটা জাতিরই সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের পর থেকে আমরা এমন এক জাতিকে দেখছি, যার আত্মনিয়ন্ত্রণ বলে যেন কিছুই অবশিষ্ট নেই।

আরও পড়ুন
এখানকার বাচ্চারা নতুন পরিবেশে সহজে মিশে যায়, কেঁদে উঠলেও দ্রুত শান্ত হয়। এর পেছনে অবশ্যই মা-বাবার প্রতিপালনের বড় ভূমিকা আছে, তবু প্যাটার্নটা স্পষ্ট।

এসব নিয়ে ভাবতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তোফাজ্জলের কথা মনে পড়ে। মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষটিকে আমাদের তথাকথিত সুস্থ ছাত্ররা পিটিয়ে আধমরা করল, তারপর খানিক বিরতি দিয়ে আবার মারল—এবার পিটিয়ে মেরেই ফেলল। মনে পড়ে দীপু চন্দ্র দাসের কথা—তাঁকে পিটিয়ে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো, আর চারপাশের মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ল; কারও একবারও মনে হলো না, এবার থামা উচিত। আবরার ফাহাদ থেকে লালচাঁদ সোহাগ—সবাই কি একইভাবে মারা যায়নি? এমন কিছু তরুণের হাতে, যারা কোনোভাবেই থামতে জানে না, নিজেদের থামাতে জানে না; মৃতদেহকেও আঘাত করতে থাকে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এই স্বল্প সময়ে অন্তত সাড়ে তিন শর বেশি মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলো নিশ্চয়ই খাটে—শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতা, নতুন নির্বাচিত সরকারের এখনো সবকিছু হাতে নিতে না পারা। কিন্তু এই কাঠামোগত ব্যাখ্যা মানুষের ভেতরকার মানুষ মারার এই আগ্রহকে ব্যাখ্যা করতে পারে না, ব্যাখ্যা করতে পারে না এর গতিকে। কোথাও কাউকে মারধর শুরু হলে চোখের পলকে বিশাল ভিড় জমে যায়। আফ্রিকার জঙ্গলে দলছুট হরিণ দেখা চিতার দৌড়ের মতো ক্ষিপ্রগতিতে পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হাসিমুখে ক্যামেরা বের করে দৃশ্যটা রেকর্ড করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। সহিংসতার এই তীব্রতা, ক্ষিপ্রতা ও হঠাৎ করে বহুগুণ বেড়ে যাওয়া—এসব কি কেবল রাজনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায়?

আমার মনে হয় না। তাই আমি নানা জায়গায় এর উত্তর খুঁজি। খুঁজতে খুঁজতেই একদিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণায় চোখ আটকে যায়।

গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশক ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের চরম সময়। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে হঠাৎ এই অপরাধের হার নামতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা একে নানাভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কোনো একক তত্ত্বে মিলছিল না। কারণ, পতন ছিল গোটা দেশজুড়ে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ও বড় শহরগুলোর পুলিশিং ও সামাজিক নীতি ছিল আলাদা আলাদা। কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা, গণকারাদণ্ড কিংবা গর্ভপাতের বৈধতা—এমন নানা তত্ত্ব হাজির করা হলেও সময়ের কাঠামোয় বা ভূগোলের কাঠামোয় কোথাও না কোথাও সেগুলো ব্যর্থ হচ্ছিল।

আরও পড়ুন
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এই স্বল্প সময়ে অন্তত সাড়ে তিন শর বেশি মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন।

এরপর একুশ শতকের শুরুতে অর্থনীতিবিদ রিক নেভিন একটি চমকপ্রদ গবেষণা সামনে আনেন। তিনি দেখান, যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের এই উত্থান-পতন গাড়ির জ্বালানিতে সিসা মেশানোর সময়ের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তবে ঠিক ২২ বছরের ব্যবধানে। জ্বালানিতে সিসার ব্যবহার বাড়ার ২২ বছর পর অপরাধ চূড়ায় পৌঁছায়, আর সিসা নিষিদ্ধ হওয়ার ২২ বছর পর অপরাধ নাটকীয়ভাবে কমে আসে। এই ২২ বছর হলো একটি শিশুর প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার সময়। নেভিন এই বিশ্লেষণ আরও আটটি দেশের তথ্যে প্রয়োগ করেও একই ফল পান। কোনো কোনো অপরাধে এই সম্পর্কের কো-রিলেশন ছিল ০.৯-এরও বেশি, যা সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় অত্যন্ত বিরল।

স্নায়ুবিজ্ঞান এর একটা পরিচ্ছন্ন ব্যাখ্যা দেয়। শরীরের কাছে সিসা যেন এক ছদ্মবেশী ক্যালসিয়াম। এর ক্যাটায়নিক চার্জ +২, আর আয়নিক ব্যাসার্ধও ক্যালসিয়ামের কাছাকাছি। ফলে বিকাশমান মস্তিষ্কে এটি অনায়াসে ক্যালসিয়ামের জায়গাগুলো দখল করে নেয় এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের ক্ষতি করে। এটা আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, দূরদর্শী চিন্তা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র। সিসার সংস্পর্শে আসা শিশুর শরীরে তাৎক্ষণিক কোনো তীব্র উপসর্গ দেখা যায় না। সে শুধু একটু বেশি আবেগতাড়িত হয়, তাৎক্ষণিক তৃপ্তির প্রতি একটু বেশি দুর্বল হয়। ব্যক্তিপর্যায়ে এই ক্ষতি ধরা কঠিন; অথচ জনসংখ্যার পর্যায়ে—ঠিক ২২ বছরের ব্যবধানে, অর্থনীতিবিদের পরিসংখ্যানে—এই ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই আলোচনা পড়ে আমার বারবার সেই যুক্তরাষ্ট্রে বড় হওয়া বাংলাদেশি বাচ্চাগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। তারা কি বাংলাদেশে বড় হলেও এত হাসিখুশি হতে পারত?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি ঢুকলাম তথ্য-উপাত্তের ভেতরে। আর পেলাম ভয়ংকর সব পরিসংখ্যান। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থের ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিপৎসীমার (৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার) ওপরে। আক্রান্ত শিশুর সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। ২০২৪ সালে আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর,বি এবং ইউনিসেফ মিলে চারটি জেলা ও ঢাকার পাঁচ শতাধিক শিশুর রক্ত পরীক্ষা করে দেখে। পরীক্ষিত প্রতিটি শিশুর রক্তেই সিসা আছে, আর ঢাকার ৮০ শতাংশ শিশুর রক্তে তা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে। মনে রাখা দরকার, সিসার কোনো মাত্রাই আসলে নিরাপদ নয়।

আরও পড়ুন
সিসার সংস্পর্শে আসা শিশুর শরীরে তাৎক্ষণিক কোনো তীব্র উপসর্গ দেখা যায় না। সে শুধু একটু বেশি আবেগতাড়িত হয়, তাৎক্ষণিক তৃপ্তির প্রতি একটু বেশি দুর্বল হয়।

এই বিষ আসছে কোথা থেকে? প্রধান উৎস তিনটি এবং তিনটিই চলমান। প্রথমটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং। দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছর আনুমানিক পাঁচ কোটি লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি অকেজো হয়, যার বড় অংশ সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা হাজারের বেশি অনিয়ন্ত্রিত খোলা চুল্লিতে গলানো হয়। এর সিংহভাগই ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার ভেতরে, যেখান থেকে সিসার সূক্ষ্ম গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের মাটি, পানি ও বাতাসে।

দ্বিতীয় উৎস রং। ২০১৮ সালে বিএসটিআই রঙে সর্বোচ্চ ৯০ পিপিএম সিসার সীমা নির্ধারণ করলেও পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার ২০২৫ সালের গবেষণায় বাজারের ৪২ শতাংশ রঙে এই সীমার বেশি সিসা মিলেছে। কোনো কোনো নমুনায় তা ১ লাখ ৯০ হাজার পিপিএম পর্যন্ত!

তৃতীয় উৎস আমাদের রান্নাঘর। দশকের পর দশক ধরে একশ্রেণির ব্যবসায়ী গুঁড়ো হলুদকে আরও উজ্জ্বল দেখাতে তাতে লেড ক্রোমেট নামে শিল্প-পিগমেন্ট মিশিয়ে এসেছেন। কারণ আমরা ক্রেতারা উজ্জ্বল হলুদকেই ভালো হলুদ বলে চিনি। অর্থাৎ সিসা আমাদের ডালে-ভাতে ঢুকে পড়েছে বাজারের সংকেতের পথ ধরে।

এই হলুদের ক্ষেত্রে অবশ্য একটা আশার খবর আছে। ২০১৯ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইসিডিডিআর,বি-র গবেষক দল প্রমাণ করে, গ্রামীণ মানুষের রক্তে সিসার অন্যতম প্রধান উৎস এই ভেজাল হলুদ। এরপর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কঠোর অভিযানে নামে—জনসচেতনতা, আকস্মিক বাজার পরীক্ষা, ব্যবসায়ীদের শাস্তি। ফল মিলল দ্রুত। বাজারে সিসাযুক্ত হলুদের নমুনা ৪৭ শতাংশ থেকে নেমে আসে শূন্যে। অর্থাৎ চাইলে হয়। কিন্তু চাইতে হয়।

আরও পড়ুন
দশকের পর দশক ধরে একশ্রেণির ব্যবসায়ী গুঁড়ো হলুদকে আরও উজ্জ্বল দেখাতে তাতে লেড ক্রোমেট নামে শিল্প-পিগমেন্ট মিশিয়ে এসেছেন। কারণ আমরা ক্রেতারা উজ্জ্বল হলুদকেই ভালো হলুদ বলে চিনি।

সিসাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা সবচেয়ে সহজ। কারণ সিসা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় মাপের গবেষণা আছে। কিন্তু সিসাই আমাদের পরিবেশের একমাত্র বিষ নয়। হাজারীবাগের ট্যানারি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ক্রোমিয়ামের বিষে ডুবিয়ে রেখেছে। ঢাকার বাতাস প্রতিবছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার বহুগুণ ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে দেশের গড় পিএম ২.৫ ছিল নির্দেশিকার ১৫ গুণেরও বেশি, যা বাংলাদেশকে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বাধিক দূষিত দেশে পরিণত করেছিল। গাড়ির ধোঁয়া, ইটভাটার কয়লা ও শিল্পবর্জ্যের এই রাসায়নিক ককটেল প্রতিদিন শ্বাসের সঙ্গে টানছে ঢাকার দুই কোটির বেশি মানুষ। আর গ্রামাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ দশকের পর দশক পান করছে নলকূপের আর্সেনিকযুক্ত পানি। একে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে ইতিহাসের বৃহত্তম গণবিষক্রিয়া। বিকাশমান মস্তিষ্ক এর একটির বিরুদ্ধেও খুব একটা প্রতিরোধ গড়তে পারে না। একই শৈশবে যখন কয়েকটি একসঙ্গে আসে, তখন আর কিছুই করার থাকে না।

সিসা তাই বাংলাদেশের দূষণ-সংগীতের একটিমাত্র বাদ্যযন্ত্র, কিন্তু এর পেছনে বাজছে গোটা একটি অর্কেস্ট্রা।

এবার যুক্তরাষ্ট্রের সেই ২২ বছরের হিসাবটা আমাদের প্রেক্ষাপটে মিলিয়ে দেখি। ২০২৪-২৬ সালের গণসহিংসতায় যারা যুক্ত হচ্ছে, তাদের বড় অংশের জন্ম দুই হাজার সালের দশকের শুরুতে। ঠিক সেই সময়েই বাংলাদেশে যানবাহনের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়ছিল, অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং ছড়িয়ে পড়ছিল, আর ঢাকার বাতাস-মাটি-পানি শুষে নিচ্ছিল সেই সব ভারী ধাতু, যেগুলোর উপস্থিতি আজ আমরা দুই বছর বয়সী শিশুদের রক্তে মাপছি। নেভিনের ২২ বছরের গাণিতিক হিসাব এই প্রজন্মের ওপর হুবহু মিলে যায়—কেবল জ্বালানির সিসা নয়, আরও অনেক কিছু সমেত।

এই অস্থির প্রজন্মের মস্তিষ্ক যেন বহু নিউরোটক্সিনে ভেজা এক বারুদের স্তূপ। সামান্য স্ফুলিঙ্গ পেলেই জ্বলে ওঠে, চারপাশ পুড়িয়ে দেয়। দাবানল যেমন থামানো যায় না, তেমনি থামানো যায় না এই ভিড়কে। দল-মত-বাম-ডান নির্বিশেষে সবাই এখানে একেকটি জীবন্ত টাইমবোমা। কারণ এই বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে, এই ভেজাল খাবার খেয়েই তো সবাই বড় হয়েছে।

আরও পড়ুন
২০২৪ সালে দেশের গড় পিএম ২.৫ ছিল নির্দেশিকার ১৫ গুণেরও বেশি, যা বাংলাদেশকে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বাধিক দূষিত দেশে পরিণত করেছিল।

মনে প্রশ্ন জাগে, আমাদের সংস্কৃতির কতটুকু আসলে আমাদের রসায়ন? রাজনীতি, শিক্ষা কিংবা মূল্যবোধ—যেগুলো দিয়ে আমরা সব ব্যাখ্যা খুঁজি—এর কতটুকু আসলে শৈশবে অলক্ষ্যে জমে ওঠা বিষের ছায়া? জনস্বাস্থ্যের গবেষণা বলছে, সিসা শিশুর বুদ্ধিমত্তা কমায় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল করে। একটি পুরো জনগোষ্ঠীর গড় আত্মনিয়ন্ত্রণের মেঝে যখন একটু একটু করে নেমে যায়, তখন তা ফুটে ওঠে নানা চেহারায়—ঘরে নারীর প্রতি সহিংসতায়, রাস্তায় গণপিটুনিতে কিংবা যৌন সহিংসতায়। ভাট্টির পাশের মাটি, ট্যানারির বাতাস, নলকূপের পানি, দেয়ালের রঙের গুঁড়ো—এসবের পরিণতি আমরা ব্যাখ্যা করি নৈতিকতার ভাষায়। যে মস্তিষ্ক থামতে পারে না, তাকে আমরা নাম দিই অশিক্ষা, অসভ্যতা, মৌলবাদ। অথচ স্নায়বিক স্তরে সাধিত হওয়া আসল ক্ষতির নাম আমরা মুখেও আনি না।

যুক্তরাষ্ট্রের গল্পে একটা মুক্তির বাঁক ছিল। তারা জ্বালানি থেকে সিসা সরাল, প্রজন্ম বড় হলো, অপরাধ নামল। বাংলাদেশের সামনে তেমন কোনো বাঁক চোখে পড়ে না। ভাট্টি কমছে না, ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। হলুদ নিয়ে কাজ হলেও রঙের আইন প্রয়োগ নেই। বাতাস বছর বছর খারাপ হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, নিউরোটক্সিনের কারণে মস্তিষ্কের এই ক্ষতি একবার হয়ে গেলে আর ফিরিয়ে আনা যায় না, কেবল ঘটার আগে প্রতিরোধ করা যায়। আর সেই প্রতিরোধ—হলুদের ব্যতিক্রমটি বাদ দিলে—হচ্ছে না।

কিন্তু রোগের নাম দিতে পারাটাই চিকিৎসার প্রথম ধাপ। হাত ভাঙলে আমরা প্লাস্টার পরাই; অতিমারি এলে লকডাউনে যাই। আমাদের সামনে যা আছে, সেটিও জাতীয় মাত্রার এক জনস্বাস্থ্য সংকট—একে ব্যক্তিগত পাপ ভাবা বন্ধ করে রোগ হিসেবে দেখা দরকার, আর রোগের চিকিৎসা যেভাবে হয়, সেভাবেই সমাধান শুরু করা দরকার।

ঢাকার বাতাস এক রাতে বদলাবে না, ভাট্টিও এক দিনে বন্ধ হবে না। তবু ছোট ছোট কিছু কাজ এখনই শুরু করা যায়। রঙে সিসার যে আইন আছে, তা মানতে বাধ্য করা যায়। আবাসিক এলাকার ভাট্টি চিহ্নিত করে উচ্ছেদ করা যায়। হলুদের বাজারকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা যায়। শিশুর উচ্চতা-ওজন মাপার মতো তার রক্তের সিসাও নিয়মিত মাপা যায়। হলুদের ক্ষেত্রে যে মডেল কাজ করেছে—জনসচেতনতা, আকস্মিক পরীক্ষা, ব্যবসায়ীর শাস্তি—তা প্রমাণিত। একটি মসলায় কাজ করেছে; বাকিগুলোতেও করবে।

আরও পড়ুন
ভাট্টির পাশের মাটি, নলকূপের পানি, দেয়ালের রঙের গুঁড়ো—এসবের পরিণতি আমরা ব্যাখ্যা করি নৈতিকতার ভাষায়। যে মস্তিষ্ক থামতে পারে না, তাকে আমরা নাম দিই অশিক্ষা, অসভ্যতা, মৌলবাদ।

শুধু পরিবেশ নয়, শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণও বদলাতে হবে। আমাদের প্রজন্ম যেভাবে বড় হয়েছে, সামান্যতেই চিৎকার, মারধর, ভয় দেখানো—এসবও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়। তা ছাড়া শিশু যখন দেখে তার মা-বাবা নিজেরাই আত্মনিয়ন্ত্রণ করেন না, তখন সে শিখবে কোথা থেকে? শিশুকে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানোটা এখনকার বাংলাদেশি প্যারেন্টিং সংস্কৃতিতে ঢোকানো জরুরি—এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে শিশু থামতে শেখে, থামতে বাধ্য না হয়।

একই সঙ্গে গণপিটুনির সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া বন্ধ করতে হবে। নৃশংসতার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি গণহত্যায় যে মানুষটি হাসিমুখে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, সে-ও যে অপরাধী—এ কথা সামাজিকভাবে বলা শুরু করতে হবে। কারণ, যত দিন গণসহিংসতা সামাজিক বৈধতা পাবে, তত দিন বিষ-আক্রান্ত মস্তিষ্কগুলো সেই বৈধতার দরজা দিয়েই বেরিয়ে আসবে।

যুক্তরাষ্ট্র তার সিসা সংকটকে চিনতে পেরেছিল প্রায় তিন দশক পর। আমাদের হাতে এত সময় নেই। আজ যে প্রজন্ম রাস্তায় মানুষ মারছে, তাদের মস্তিষ্ক শারীরিক ও সাংস্কৃতিক—উভয় অর্থেই ক্ষতিগ্রস্ত; তাদের আর পুরোপুরি সারিয়ে তোলা যাবে না। কিন্তু যে শিশুটি আজ ভাট্টির পাশে হামাগুড়ি দিচ্ছে, যে শিশুটি সিসামাখা হলুদের ডাল খাচ্ছে, যে শিশুটি ঢাকার দূষিত বাতাস টানছে; তাকে এখনো বাঁচানো যায়। ক্ষতিটা থামিয়ে, আর একটা সুস্থ সংস্কৃতি দিয়ে।

তবে তার জন্য আগে স্বীকার করতে হবে যে তারা বিষাক্ত হচ্ছে। আর সেই স্বীকৃতিটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন। কারণ, স্বীকার করা মানেই কাজ শুরু করা।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক অ্যাট বাফেলো, যুক্তরাষ্ট্র

সূত্র: ১. Nevin, R. (2000). How lead exposure relates to temporal changes in IQ, violent crime, and unwed pregnancy. Environmental Research, 83(1), 1–22.

২. Nevin, R. (2007). Understanding international crime trends: The legacy of preschool lead exposure. Environmental Research, 104(3), 315–336. (নয়টি দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, ইতালি, পশ্চিম জার্মানি ও নিউজিল্যান্ড।)

৩. UNICEF & Pure Earth (2020). The Toxic Truth: Children's Exposure to Lead Pollution. (বাংলাদেশের ~৩.৫ কোটি শিশু, বিশ্বে চতুর্থ।)

৪. UNICEF Bangladesh, IEDCR ও icddr,b রক্তে সিসার মাত্রা পরীক্ষা, ২০২৪; "An alarming rate of blood lead levels among children," UNICEF ROSA, ৫ নভেম্বর ২০২৪।

৫. Institute for Health Metrics and Evaluation (IHME) — সিসাজনিত মৃত্যুহারে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ।

৬. Forsyth, J. E., et al. (2019). Turmeric means "yellow" in Bengali: Lead chromate pigments added to turmeric threaten public health across Bangladesh. Environmental Research, 179, 108722.

৭. Forsyth, J. E., et al. (2023). Food safety policy enforcement and associated actions reduce lead chromate adulteration in turmeric across Bangladesh. Environmental Research, 232, 116328. (বাজারের নমুনায় সিসা ৪৭% → ০%, ২০১৯–২০২১।)

৮. Environment and Social Development Organization (ESDO) (2025). Assessing Lead in Paints in Bangladesh. (১৬১টি নমুনার ৪২% বিএসটিআই-র ৯০ পিপিএম সীমা অতিক্রম করেছে; সর্বোচ্চ ১,৯০,০০০ পিপিএম।)

৯. IQAir (2025). World Air Quality Report 2024. (বাংলাদেশ পিএম২.৫ ৭৮ µg/m³, WHO নির্দেশিকার ১৫ গুণের বেশি; বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বাধিক দূষিত দেশ।)

১০. World Health Organization—বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির আর্সেনিক দূষণ প্রসঙ্গে।

১১. গণপিটুনিতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সংকলিত তথ্য, ২০২৪–২০২৬।

আরও পড়ুন