বিপরীতমুখী জ্যামিতি
প্রাচীন মিশরের আকাশছোঁয়া পিরামিডগুলোর দিকে তাকালে এখনো অবাক হতে হয়—এত নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা সেকালে তারা বানাল কীভাবে?
শুধু তাই নয়, আরও আছে। সেকালে নীল নদের দু'কূল ছাপিয়ে বন্যা হতো। তাতে কৃষকদের ফসলি জমির সব সীমানা কাদাপানিতে একাকার হয়ে যেত। পানি নেমে যাওয়ার পর কার জমি কতটুকু, তা নিয়ে বাধত গোলমাল। কারণ তখন আর কারও জমি আলাদা করে চেনার জো নেই। এই জমি তাই নতুন করে নিখুঁতভাবে মাপতে হতো।
পিরামিড বানানো থেকে শুরু করে জমির সীমানা ঠিক করার এই বিশাল মাপজোকের পেছনে ছিল একদল মানুষ। ইতিহাসে তাদের একটা গালভরা নামও আছে—হারপেডোনাপ্টাই (Harpedonaptae)। এর সহজ অর্থ হলো দড়ি বা রশি-টানা দল!
অনেকেই দাবি করে, মাঠে নিখুঁত সমকোণ বা ৯০ ডিগ্রি কোণ বানানোর জন্য তারা নাকি পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সেই বিখ্যাত ৩-৪-৫ অনুপাতটি ব্যবহার করত। (দড়িতে সমান দূরত্বে গিট দিয়ে ৩, ৪ ও ৫ এককের ত্রিভুজ বানালেই তো সমকোণ তৈরি হয়ে যায়!) কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গাণিতিক যুক্তিতে এই লোকগুলো আসলে তা করত না! ভাবছো, কেন করত না?
তার কারণ পিথাগোরাসের উপপাদ্যের মূল শর্তটা হলো: একটি ত্রিভুজে যদি আগে থেকেই একটি সমকোণ থাকে, তাহলেই তার তিনটি বাহুর দৈর্ঘ্যের মধ্যে সম্পর্ক নির্দিষ্ট থাকবে। যেমন: a2 + b2 = c2।
পিরামিড বানানো থেকে শুরু করে জমির সীমানা ঠিক করার এই বিশাল মাপজোকের পেছনে ছিল একদল মানুষ। ইতিহাসে তাদের একটা গালভরা নামও আছে—হারপেডোনাপ্টাই।
কিন্তু সেই রশি-টানা মানুষগুলোর দরকার ছিল ঠিক এর উল্টোটা। মাঠে তাদের আগে থেকে কোনো সমকোণ দেওয়া থাকত না, বরং সমকোণটা তাদের তৈরি করতে হতো! অর্থাৎ তাদের যুক্তি হলো: দড়ির বাহুগুলোর দৈর্ঘ্য যদি ৩, ৪ আর ৫ অনুপাতে মাপা যায়, তাহলে সেখানে একটি সমকোণ তৈরি হবে। গণিতের ভাষায়, সেকালের মিশরীয়রা পিথাগোরাসের উপপাদ্যের নয়, বরং এর বিপরীত উপপাদ্যের (Converse) প্রয়োগ করছিল! (চিত্র ৫২)।
গণিতের ক্ষেত্রে আরও সাধারণভাবে বললে, সবসময় দুটি বিষয়ের মধ্যে সাবধানে পার্থক্য করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: যেমন P সত্য হলে Q সত্য হবে। আবার এর বিপরীত বক্তব্য—Q সত্য হলে P সত্য হবে।
প্রথম বক্তব্যটা সত্যি হলেই যে দ্বিতীয়টাও (বিপরীত বক্তব্য) সত্যি হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই! চলো, একটা পরিচিত উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার করি। ধরো, P মানে হলো তুমি ফুচকা খাচ্ছো। আর Q মানে তোমার মন খুব ভালো। এখন, তুমি ফুচকা খেলে তোমার মন খুব ভালো হয়ে যায় (অর্থাৎ P সত্য হলে Q সত্য)। ধরে নিলাম এই কথাটা ১০০ ভাগ সত্যি।
কিন্তু এর উল্টোটা কি সবসময় সত্যি? ধরা যাক, তোমার মন খুব ভালো। তার মানেই কি তুমি ফুচকা খাচ্ছো (Q সত্য হলে P সত্য)?
একদমই না! তোমার মন তো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ম্যাচ জিতলেও ভালো হতে পারে, কিংবা কাল স্কুল ছুটি থাকলেও ভালো হতে পারে! তেমনি, প্রাচীন মিশরের সেই রশি-টানা দল আসলে পিথাগোরাসের মূল সূত্র নয়, বরং তার এই উল্টো লজিক বা বিপরীত উপপাদ্য কাজে লাগিয়েই যুগের পর যুগ চমৎকার সব নির্মাণকাজ করে গিয়েছিল।
গণিতের ক্ষেত্রে আরও সাধারণভাবে বললে, সবসময় দুটি বিষয়ের মধ্যে সাবধানে পার্থক্য করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: যেমন P সত্য হলে Q সত্য হবে। আবার এর বিপরীত বক্তব্য—Q সত্য হলে P সত্য হবে।
পিথাগোরাসের বিপরীত উপপাদ্য
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রাচীন মিশরের সেই রশি-টানা দল কি আসলে সঠিক ছিল? ৩, ৪ আর ৫ দৈর্ঘ্যের বাহু দিয়ে ত্রিভুজ বানালেই কি তার দীর্ঘতম বাহুর বিপরীত কোণটি নিশ্চিতভাবে ৯০ ডিগ্রি বা সমকোণ হবে?
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এর প্রমাণ এতই সহজ যে জানলে অবাক হয়ে যাবে! চলো, একটা ছোট্ট ট্রিক ব্যবহার করে প্রমাণটা বুঝে নেওয়া যাক। আমাদের শুধু ৩ ও ৪ দৈর্ঘ্যের দুটি বাহু এবং তাদের মধ্যবর্তী ৯০ ডিগ্রি কোণ নিয়ে দ্বিতীয় আরেকটি ত্রিভুজ এঁকে ফেলতে হবে (চিত্র ৫৩b)। মনে মনে বা কাগজে ৩ ও ৪ দৈর্ঘ্যের দুটি বাহু নাও এবং তাদের মাঝখানের কোণটি চাঁদা দিয়ে মেপে নিখুঁত ৯০ ডিগ্রি বানিয়ে একটি নতুন ত্রিভুজ এঁকে ফেলো। এবার আমাদের সেই মূল পিথাগোরাসের উপপাদ্য কাজে লাগাই। যেহেতু এই নতুন ত্রিভুজে আমরা আগেই একটি ৯০ ডিগ্রি কোণ ধরে নিয়েছি, তাই এর ৩য় বাহুটির (অতিভুজ) দৈর্ঘ্য হবে:
√(32 + 42) = √(9 + 16) = 25 = 5
অর্থাৎ, নতুন ত্রিভুজটির বাহু তিনটিও দাঁড়াল যথাক্রমে—৩, ৪ এবং ৫!
এবার রশি-টানা দলের তৈরি ত্রিভুজ আর আমাদের মাত্র আঁকা ত্রিভুজটি পাশাপাশি রাখো। দুটো ত্রিভুজেরই তিনটি বাহুর দৈর্ঘ্য হুবহু এক (৩, ৪ এবং ৫)। জ্যামিতির বাহু-বাহু-বাহু (SSS) শর্ত অনুযায়ী, দুটি ত্রিভুজের তিনটি বাহু পরস্পর সমান হলে তারা একদম হুবহু এক বা সর্বসম হয়।
যেহেতু আমাদের বানানো ত্রিভুজটির ৩ ও ৪ দৈর্ঘ্যের বাহুর মাঝের কোণটি আমরা ৯০ ডিগ্রি মেপে এঁকেছিলাম, আর রশি-টানা দলের ত্রিভুজটি এটার হুবহু জুড়ি বা সর্বসম। কাজেই চিত্র ৫৩b-এর ড্যাশ দেওয়া রেখাটির দৈর্ঘ্য হবে ৫। তাই চিত্র ৫৩a-এর ত্রিভুজের দীর্ঘতম (৫ একক) বাহুর বিপরীত কোণটিও অবশ্যই ৯০ ডিগ্রি হতে বাধ্য!
অর্থাৎ, পিথাগোরাসের মূল উপপাদ্যটি ব্যবহার করেই খুব চালাকির সঙ্গে এর বিপরীত উপপাদ্যটি প্রমাণ করে ফেলা যায়।
যেহেতু আমাদের বানানো ত্রিভুজটির ৩ ও ৪ দৈর্ঘ্যের বাহুর মাঝের কোণটি আমরা ৯০ ডিগ্রি মেপে এঁকেছিলাম, আর রশি-টানা দলের ত্রিভুজটি এটার হুবহু জুড়ি বা সর্বসম।
ভুল ধরে প্রমাণ
কোনো উপপাদ্যের উল্টো বা বিপরীত রূপ প্রমাণ করা কিন্তু সবসময় পিথাগোরাসের মতো এত সহজ হয় না। প্রবাদ আছে, মাঝে মাঝে সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না, তখন আঙুল বাঁকা করতে হয়! আর জ্যামিতিতে আঙুল বাঁকানোর এই বুদ্ধিমান কৌশলটির নাম—ভুল ধরে প্রমাণ বা প্রুফ বাই কন্ট্রাডিকশন (Proof by Contradiction)।
এই কৌশলের মূল মন্ত্রটা বেশ মজার। তুমি যা প্রমাণ করতে চাও, শুরুতেই ধরে নাও সেটা একদম ভুল! এরপর সেই ভুল ধারণাটা নিয়েই সোজা যুক্তির পথে হাঁটতে থাকো। হাঁটতে হাঁটতে এমন এক সময় দেখবে এমন এক মহাউদ্ভট বা অসম্ভব পরিস্থিতিতে এসে হাজির হয়েছ। আর সেটা বাস্তবে ঘটা একেবারেই অসম্ভব! ব্যস, তখন বুঝতে পারবে তোমার শুরুর ধারণাটা আসলে ভুল ছিল। সেই সঙ্গে আরও বুঝতে পারবে, তুমি যা প্রমাণ করতে চেয়েছিলে সেটাই আসলে সত্যি!
এক্ষেত্রে সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ একটি ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে। আমরা আগেই দেখেছি, একটি ত্রিভুজ সমদ্বিবাহু হলে তার ভূমি সংলগ্ন কোণ দুটি সমান হয়। কিন্তু এর বিপরীত কথাটির ক্ষেত্রে কী ঘটবে (চিত্র ৫৪ দেখো)? মানে, কোনো ত্রিভুজের দুটি কোণ যদি সমান হয়, তাহলে তার বিপরীত বাহু দুটিও কি সমান হবে?
এ কথাটিও বাস্তবে সত্যি। ইউক্লিড তাঁর এলিমেন্টস গ্রন্থে ‘ভুল ধরে নেওয়ার পদ্ধতি’র মাধ্যমেই প্রমাণ করেছেন।
BC বাহুটি দুটি ত্রিভুজের জন্যই এক। কাজেই জ্যামিতির বাহু-কোণ-বাহু শর্ত অনুযায়ী, ছোট ত্রিভুজ DBC আর বড় ত্রিভুজ ACB দুটি একদম হুবহু এক বা সর্বসম!
ধরো, ABC একটি ত্রিভুজ (চিত্র ৫৫ দেখো)। ধরে নিচ্ছি, এ ত্রিভুজের দুটি কোণ ABC = ACB পরস্পর সমান। আমাদের প্রমাণ এখন করতে হবে যে AB এবং AC বাহু দুটি সমান।
সেটা প্রমাণ করতে ইউক্লিড নাটকটা সাজালেন এভাবে: তিনি শুরুতেই ধরে নিলেন, AB এবং AC বাহু দুটি সমান নয়! কাজেই যুক্তি অনুযায়ী, বাহু দুটো যদি সমান না-ই হয়, তাহলে নিশ্চয়ই যেকোনো একটা বড় আর অন্যটা ছোট হবে? ধরে নিলাম, AB বাহুটা AC-এর চেয়ে বড়। এবার AB বাহুর ওপর এমন একটি বিন্দু D নেওয়া হলো, যেন DB অংশটুকু ঠিক AC বাহুর সমান হয়। এরপর D আর C যোগ করে দেওয়া হলো।
এবার ছোট ত্রিভুজ DBC আর মূল ত্রিভুজ ACB-এর দিকে তাকাও। এখানে DB = AC (আমরা মেপে কেটে নিয়েছি)। ত্রিভুজ DBC = ACB (শুরুতেই দেওয়া ছিল)। BC বাহুটি দুটি ত্রিভুজের জন্যই এক (সাধারণ বাহু)। কাজেই জ্যামিতির বাহু-কোণ-বাহু (SAS) শর্ত অনুযায়ী, ছোট ত্রিভুজ DBC আর বড় ত্রিভুজ ACB দুটি একদম হুবহু এক বা সর্বসম!
কিন্তু একটু থামো! ভালো করে তাকিয়ে দেখো তো—ত্রিভুজ DBC তো আসলে পুরো ACB ত্রিভুজটার ভেতরের একটা ছোট টুকরো মাত্র! একটা কেকের এক টুকরো স্লাইস কি কখনো পুরো কেকটার সমান হতে পারে? ব্যাপারটা তো অসম্ভব! কোনো কিছুর অংশ কখনো পুরোটার সমান হতে পারে না!এই ব্যাপারটাকেই বাংলা প্রবাদে বলা হয়, বারো হাত কাঁকুরের তেরো হাত বিচি।
এই যে এমন একটা হাস্যকর অসঙ্গতি তৈরি হলো, এর দায় কার? আমাদের ওই শুরুর ভুল অনুমানের! তার মানে, AB আর AC বাহু সমান নয়—আমাদের এই ধারণাটাই ভুল ছিল। সুতরাং, বাহু দুটিকে অবশ্যই পরস্পর সমান হতে হবে, যা বিপরীত উপপাদ্যটি প্রমাণ করে।
এটা পিথাগোরাসের মতো সোজাসাপ্টা প্রমাণ না হলেও, ভুলকে ভুল প্রমাণ করে সত্যকে বের করে আনার এই বুদ্ধিটা আসলেই বেশ মাথা খাটানো। তাই না?
আমাদের ওই শুরুর ভুল অনুমানের! তার মানে, AB আর AC বাহু সমান নয়—আমাদের এই ধারণাটাই ভুল ছিল। সুতরাং, বাহু দুটিকে অবশ্যই পরস্পর সমান হতে হবে, যা বিপরীত উপপাদ্যটি প্রমাণ করে।
থ্যালিসের উপপাদ্য
কোনো একটি গাণিতিক উপপাদ্যকে দেখলে কখনো কখনো মনে হতে পারে—এ তো চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে! এর জন্য আবার প্রমাণের দরকার কী?
থ্যালিসের উপপাদ্যও তেমনই একটি উপপাদ্য। একটি বৃত্ত, তার একটি ব্যাস এবং ব্যাসের দুই প্রান্ত থেকে বৃত্তের ওপর আরেকটি বিন্দুকে যোগ করা হলো। ব্যাসের দুই প্রান্তের সঙ্গে ওই বিন্দুটিকে যুক্ত করলে যে কোণ তৈরি হয়, সেটি সব সময়ই সমকোণ। দেখতে এতটাই স্বাভাবিক যে, এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগার কথাই নয়। কিন্তু গণিতের মজাটাই এখানেই—চোখে যা স্পষ্ট বলে মনে হয়, প্রমাণ করতে গেলে দেখা যায় তার ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন।
একবার একটি গণিত সম্মেলনে থ্যালিসের উপপাদ্য (চিত্র ৫৬) নিয়ে দারুণ হইচই আর উত্তেজনা চলছিল। অনুষ্ঠান শেষ হতেই দর্শকসারি থেকে দুজন এসে একেবারে হাত-পা নেড়ে দাবি করে বসলেন—এই উপপাদ্য নিয়ে এত মাতামাতি করার নাকি বিন্দুমাত্র দরকার নেই! কারণ তাঁদের মতে, বিষয়টা পানির মতোই সহজ আর স্পষ্ট!
একটি বৃত্ত, তার একটি ব্যাস এবং ব্যাসের দুই প্রান্ত থেকে বৃত্তের ওপর আরেকটি বিন্দুকে যোগ করা হলো। ব্যাসের দুই প্রান্তের সঙ্গে ওই বিন্দুটিকে যুক্ত করলে যে কোণ তৈরি হয়, তা সব সময়ই সমকোণ।
তাঁদের সেই ‘সহজ’ যুক্তিটি ছিল এইরকম: সিমেট্রি বা প্রতিসাম্যের কারণে এটা তো পানির মতো পরিষ্কার যে, যেকোনো আয়তক্ষেত্রকে এমন এক মাপের বৃত্তের ভেতর একদম ফিট করে বসিয়ে দেওয়া যায়, যাতে তার চারকোনা চারটা মাথায় বৃত্ত গিয়ে ঠেকে (চিত্র ৫৭a)!
আবার একই প্রতিসাম্যের কারণে এটাও স্পষ্ট যে, আয়তক্ষেত্রটির দুটি কর্ণ বৃত্তের কেন্দ্রে গিয়ে পরস্পরকে ছেদ করবে (চিত্র ৫৭b)। এখন ছবিটির অর্ধেক অংশ মুছে ফেললে, ডট দেওয়া রেখাটিকে ব্যাস ধরে চিত্র ৫৭c-এর মতো একটি চিত্র পাওয়া যায়। দেখা যাচ্ছে, ওই রেখাটিকে ব্যাস বানিয়ে চমৎকার একটি অর্ধেক বৃত্ত পাওয়া গেল। ব্যস! হাত তুলে তাঁরা বললেন, ‘এই তো হয়ে গেল থ্যালিসের উপপাদ্য!’
কিন্তু... একটু দাঁড়াও! আসলেও কি তাই?একটু মন দিয়ে খেয়াল করলেই গোলমালটা চোখে পড়বে। আসল থ্যালিসের উপপাদ্যে যাত্রা শুরু হয় ব্যাস দিয়ে, আর গিয়ে পৌঁছানো হয় সমকোণে। অর্থাৎ গাড়ি সোজা পথ ছেড়ে উল্টোপথে হেঁটেছে!
চল, পুরো ব্যাপারটা পানির মতো পরিষ্কার করতে একটি খেলা খেলা যাক। ধরা যাক, একটা সমতলে A ও B দুটি বিন্দু। এই দুটি বিন্দু দিয়ে একটা দাগ টানা হলো। আর দূরে বসে আছে P নামের আরেকটা বিন্দু। P হলো সমতলের এমন একটি বিন্দু, যা A বা B—কোনোটির সঙ্গেই মিলে যায় না। এবার তিনটি বক্তব্য বিবেচনা করা যাক—
১. P বিন্দুটি বৃত্তের ওপর অবস্থিত।
২. AB হলো বৃত্তটির একটি ব্যাস।
৩. ত্রিভুজ∠APB একটি সমকোণ বা ৯০ ডিগ্রি।
একটু মন দিয়ে খেয়াল করলেই গোলমালটা চোখে পড়বে। আসল থ্যালিসের উপপাদ্যে যাত্রা শুরু হয় ব্যাস দিয়ে, আর গিয়ে পৌঁছানো হয় সমকোণে। অর্থাৎ গাড়ি সোজা পথ ছেড়ে উল্টোপথে হেঁটেছে!
আসল থ্যালিসের উপপাদ্য কিন্তু বলে: যদি ১ আর ২ সত্যি হয়, তবেই ৩ সত্যি হতে বাধ্য! অর্থাৎ, ব্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে বৃত্তের মাথায় যেকোনো কোণ বানালে তা সমকোণই হবে। এর মানে হলো, P যদি বৃত্তের ওপর থাকে এবং AB যদি ব্যাস হয়, তাহলে P থেকে A ও B-কে যোগ করলে উৎপন্ন কোণটি অবশ্যই সমকোণ হবে।
কিন্তু ওই যে সম্মেলনে যাঁরা যুক্তি দিয়েছিলেন? তাঁরা আসলে মূল উপপাদ্য নয়, বরং উপপাদ্যের ‘উল্টো’ বা বিপরীত রূপ নিয়ে কাজ করছিলেন!
ঘটনা তিনটি থেকে দুটি চমৎকার ‘বিপরীত উপপাদ্য বানিয়ে ফেলা সম্ভব। প্রথম বিপরীত কথা হলো, যদি ১ আর ৩ সত্যি হয়, তাহলে ২ সত্যি হবে। অর্থাৎ, P যদি বৃত্তের ওপর থাকে এবং ∠APB যদি সমকোণ হয়, তাহলে AB কি অবশ্যই ব্যাস হবে? আগের সেই ‘সহজ ও স্পষ্ট’ যুক্তিটি আসলে এই উল্টো বক্তব্যটিরই একটি অনানুষ্ঠানিক প্রমাণ বলে মনে হয়।
আর দ্বিতীয় বিপরীত কথা হলো, যদি ২ আর ৩ সত্যি হয়, তাহলে ১ সত্যি হবে। অর্থাৎ, AB যদি একটি বৃত্তের ব্যাস হয় এবং ∠APB যদি সমকোণ হয়, তাহলে কি P বিন্দুটি অবশ্যই সেই বৃত্তের পরিধির ওপর থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর প্রমাণ করা হবে একটি শক্তিশালী কৌশলের সাহায্যে। কৌশলটির নাম ভুল ধরে নিয়ে প্রমাণ। এ সম্পর্কে আমরা একটু আগেই আলোচনা করেছি। আর এই প্রমাণের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে থ্যালিসের মূল উপপাদ্যকে। এখানেই দেখা যাবে, একটি উপপাদ্যকে শুধু এক দিক থেকে দেখলেই তার আসল শক্তি বোঝা যায় না; কখনো কখনো তার উল্টো দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
P যদি বৃত্তের ওপর থাকে এবং AB যদি ব্যাস হয়, তাহলে P থেকে A ও B-কে যোগ করলে উৎপন্ন কোণটি অবশ্যই সমকোণ হবে।
থ্যালিসের বিপরীত উপপাদ্য
এবার থ্যালিসের সেই বিখ্যাত বিপরীত উপপাদ্যটি অঙ্কের গোয়েন্দা কৌশল অর্থাৎ ‘ভুল ধরে নিয়ে প্রমাণ’ পদ্ধতির মাধ্যমে খতিয়ে দেখা যাক! প্রথমে AB-কে ব্যাস ধরে একটি সুন্দর বৃত্ত এঁকে নেওয়া যাক। আর বৃত্তের পুরো কাঠামোর বাইরে বা ভেতরে যেকোনো এক জায়গায় P নামের একটি বিন্দু নেওয়া যাক।
এখানে আমাদের উদ্দেশ্য হলো এটি দেখানো: যদি APB = 90 ডিগ্রি হয়, তাহলে P বিন্দুটি একদম কাঁটায় কাঁটায় বৃত্তের পরিধির ওপরই বসে থাকবে (চিত্র ৫৮)। অর্থাৎ আমাদের প্রমাণ করতে হবে—যদি ∠APB = 90° হয়, তবে P বিন্দুটি অবশ্যই বৃত্তের পরিধির ওপর থাকবে।
সেটা প্রমাণ করার জন্য উল্টো একটা গল্প ধরে নেওয়া যাক। ধরা যাক, APB = 90 ডিগ্রি ঠিকই, কিন্তু P বিন্দুটি বৃত্তের পরিধির ওপর নেই! তাহলে P-এর অবস্থান নিয়ে দুটি সম্ভাবনা তৈরি হয়—হয় এটি বৃত্তের পেটের ভেতরে আছে, না হয় বৃত্তের বাইরে আছে।
প্রথম ক্ষেত্রে ধরে নিচ্ছি P বিন্দুটি বৃত্তের ভেতরে অবস্থিত। এবার ধরা যাক, P বিন্দুটি বৃত্তের ভেতরে লুকিয়ে আছে (চিত্র ৫৮)।
এখন A থেকে P পর্যন্ত একটা দাগ টেনে সেটিকে সামনের দিকে একটু বাড়িয়ে দেওয়া যাক, যাতে রেখাটি বৃত্তের পরিধিকে একটি নতুন বিন্দু P' (পি-ডট)-এ গিয়ে ছেদ করে। এবার P' থেকে B বিন্দুটি সোজা যোগ করে দেওয়া যাক।
এবার চোখ মেলে দেখলে দুটি অদ্ভুত বিষয় ধরা পড়বে: প্রথমত শুরুতেই ধরে নেওয়া শর্ত অনুযায়ী, APB = 90 ডিগ্রি। অর্থাৎ PB রেখাটি AP' রেখাংশের ওপর লম্ব।
ধরা যাক, APB = 90 ডিগ্রি ঠিকই, কিন্তু P বিন্দুটি বৃত্তের পরিধির ওপর নেই! তাহলে P-এর অবস্থান নিয়ে দুটি সম্ভাবনা তৈরি হয়—হয় এটি বৃত্তের পেটের ভেতরে আছে, না হয় বৃত্তের বাইরে আছে।
অন্যদিকে, আসল থ্যালিসের উপপাদ্য তো বলেই দিয়েছে যে—বৃত্তের পরিধির ওপর অবস্থিত যেকোনো বিন্দুর সাথে ব্যাস যুক্ত করলে তা সমকোণ তৈরি করবে। যেহেতু P' বিন্দুটি বৃত্তের পরিধির ওপর আছে, তাই AP'B = 90 ডিগ্রি হতেই হবে! এর অর্থ, P'B রেখাটিও একই AP' রেখার ওপর লম্ব!
এখন মজার গোলমালটা এখানেই! একই রেখা AP'-এর ওপর দুটি ভিন্ন রেখা (PB এবং P'B) কীভাবে লম্ব হতে পারে? জ্যামিতির নিয়ম অনুযায়ী, একটি রেখার ওপর লম্ব তৈরি করলে রেখা দুটিকে অবশ্যই একে অপরের সমান্তরাল হতে হয়।
কিন্তু ছবিতে তো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে PB আর P'B রেখা দুটি B বিন্দুতে গিয়ে একে অপরের সাথে মিলে গেছে! সমান্তরাল দুটি রেখা আবার একটি বিন্দুতে মিলিবে কীভাবে? এটি তো একেবারে অসম্ভব ও চরম অসঙ্গতিপূর্ণ এক ঘটনা!
সুতরাং, P বিন্দুটি বৃত্তের ভেতরে অবস্থিত—এই ধারণাটি যে সম্পূর্ণ ভুল, তা পানির মতো স্পষ্ট হয়ে গেল।
জ্যামিতির নিয়ম অনুযায়ী, একটি রেখার ওপর লম্ব তৈরি করলে রেখা দুটিকে অবশ্যই একে অপরের সমান্তরাল হতে হয়।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ধরে নিচ্ছি P বিন্দুটি বৃত্তের বাইরে অবস্থিত। তাহলে ঠিক একই রকম যুক্তি আর সামান্য ভিন্ন একটি ছবি ব্যবহার করে খুব সহজেই দেখানো সম্ভব যে, P বিন্দুটি বৃত্তের পেটের বাইরেও কোনোভাবে অবস্থান করতে পারে না। কারণ তখন দেখানো যায়, P যদি বৃত্তের বাইরে থাকে, তাহলেও একটি অসঙ্গতি তৈরি হবে।
অর্থাৎ P বৃত্তের ভেতরে থাকতে পারে না, আবার বাইরেও থাকতে পারে না। তাহলে আর বাকি থাকে কী?
একটিই সম্ভাবনা। P-কে অবশ্যই বৃত্তের পরিধির ওপর থাকতে হবে।
এইভাবেই প্রমাণিত হলো থ্যালিসের বিপরীত উপপাদ্য: কোনো বৃত্তের ব্যাসের দুই প্রান্তকে বৃত্তের বাইরের একটি বিন্দুর সঙ্গে যুক্ত করে যদি সমকোণ পাওয়া যায়, তবে সেই বিন্দুটি অবশ্যই বৃত্তের পরিধির ওপর অবস্থিত।
এই প্রমাণের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো—কোনো নতুন জটিল সূত্রের প্রয়োজন হয়নি। শুধু একটি অনুমানকে ভুল ধরে নিয়ে, সেই অনুমান থেকে তৈরি হওয়া অসম্ভব পরিস্থিতিটিকে কাজে লাগিয়েই সত্যটিকে বের করে আনা হয়েছে। এই কৌশলটা বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয় জ্যামিতিক নির্মাণ, জরিপবিদ্যা ও অবস্থান নির্ণয়ের কাজে।
থ্যালিসের বিপরীত উপপাদ্য: কোনো বৃত্তের ব্যাসের দুই প্রান্তকে বৃত্তের বাইরের একটি বিন্দুর সঙ্গে যুক্ত করে যদি সমকোণ পাওয়া যায়, তবে সেই বিন্দুটি অবশ্যই বৃত্তের পরিধির ওপর অবস্থিত।
বিকল্প একটি উপায়
আমরা মাত্র যে পদ্ধতিটি শিখলাম তা বেশ শক্তিশালী কৌশল। শুধু জ্যামিতি নয়, গণিতের নানা শাখায়ই এর ব্যবহার দেখা যায়। সৌভাগ্যবশত, থ্যালিসের বিপরীত উপপাদ্যের জন্য এর চেয়েও সহজ একটি সরাসরি বিকল্প পথ রয়েছে। ছবিতে কোনো প্যাঁচ না রেখে খুব সহজে এটি প্রমাণ করা যায়।
চিত্র ৫৯-এর দিকে তাকানো যাক। ধরে নেওয়া হয়েছে, ∠APB = 90°। এবার O বিন্দু দিয়ে BP-এর সমান্তরাল একটি সরলরেখা আঁকা হলো, যা AP-কে D বিন্দুতে ছেদ করল।
এখন তৈরি হলো দুটি ত্রিভুজ—△AOD এবং △ABP। এদের মধ্যে দুটি কোণ সমান। একটি কোণ O এবং B-তে, কারণ OD ও BP পরস্পর সমান্তরাল। আরেকটি কোণ A—দুটি ত্রিভুজেই একই। তাই কোণ-কোণ (AA) শর্তে ত্রিভুজ দুটি সদৃশ। কিন্তু এখানে আরও একটি মজার তথ্য আছে। AB হলো বৃত্তের ব্যাস, আর O হলো বৃত্তের কেন্দ্র। তাই, AB = 2 × AO। অর্থাৎ, সদৃশ ত্রিভুজ দুটির অনুপাত ২।
ফলে AP-এর মাঝখানে ঠিক যে বিন্দুটি থাকার কথা, D-কে সেখানেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ, D হলো AP-এর মধ্যবিন্দু।
একটি কোণ O এবং B-তে, কারণ OD ও BP পরস্পর সমান্তরাল। আরেকটি কোণ A—দুটি ত্রিভুজেই একই। তাই কোণ-কোণ শর্তে ত্রিভুজ দুটি সদৃশ। কিন্তু এখানে আরও একটি মজার তথ্য আছে।
এবার D থেকে O-তে নয়, P থেকে O-তে একটি রেখা টানা যাক।
তখন △ODA এবং △ODP—এই দুটি ত্রিভুজের দিকে তাকানো যাক। এদের একটি বাহু সমান, একটি কোণ সমান এবং আরেকটি বাহুও সমান। তাই বাহু-কোণ-বাহু (SAS) শর্তে ত্রিভুজ দুটি সর্বসম।
ফলে তাদের সমান অনুরূপ বাহু থেকে পাওয়া যায়, OP = OA।
কিন্তু OA হলো বৃত্তের ব্যাসার্ধ। আর OP-ও যদি সেই একই দৈর্ঘ্যের হয়, তাহলে O কেন্দ্র থেকে P-এর দূরত্ব বৃত্তের ব্যাসার্ধের সমান।
অর্থাৎ, P বিন্দুটি বৃত্তের পরিধির ওপরই রয়েছে।
এইভাবে ‘ভুল ধরে নিয়ে প্রমাণ’-এর সাহায্য না নিয়েও থ্যালিসের বিপরীত উপপাদ্য প্রমাণ করা গেল। একই সত্যে পৌঁছানো গেল দুটি একেবারে ভিন্ন পথে—একটিতে অসঙ্গতিকে হাতিয়ার করে, অন্যটিতে ত্রিভুজের সদৃশতা ও সর্বসমতাকে কাজে লাগিয়ে।
আর এখানেই জ্যামিতির সৌন্দর্য।
