উনিশ শতকে গণিতের যত পুরস্কার
সমস্যাই গণিতের প্রাণ। একটি ভালো সমস্যা দেখিয়ে দেয়, গণিতে এখনো কী জানা বাকি। তাই যুগে যুগে কঠিন সব গাণিতিক সমস্যাকে ঘিরে ছিল প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতে নানা সময়ে ঘোষণা করা হয়েছে নানা লোভনীয় পুরস্কার। এসব পুরস্কারকে ঘিরেই জন্ম নিয়েছে গণিতের ইতিহাসের অনেক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। আজ ১৮ শতকের পুরস্কারের ইতিহাস জানা যাক।
১৮০৩ সাল থেকে প্যারিসের নতুন করে সাজানো একাডেমি অব সায়েন্সেস দুটি নতুন পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। একটি গ্র্যান্ড প্রি ডেস সায়েন্সেস ম্যাথমেটিকস এবং অন্যটি গ্র্যান্ড প্রি ডেস সায়েন্সেস ফিজিকস। এই পুরস্কার দুটির অর্থমূল্য ছিল ৩ হাজার ফরাসি ফ্র্যাঙ্ক। তখন একজন অধ্যাপকের বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ৪ হাজার ফ্র্যাঙ্ক। তাই এই পুরস্কারটি ছিল বিজ্ঞানীদের জন্য বড় অঙ্কের উপহার। নিয়ম ছিল, এক বছর গণিতে পুরস্কার দেওয়া হলে পরের বছর দেওয়া হবে পদার্থবিজ্ঞানে।
তবে মাঝেমধ্যে কিছু চমকপ্রদ ও অনিয়মিত প্রতিযোগিতাও দেখা যেত। যেমন ১৮০৯ সালে স্বয়ং সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট একটি প্রতিযোগিতার প্রস্তাব করেন। এর বিষয় ছিল, ‘স্থিতিস্থাপক পাতের কম্পন’।
আর্নস্ট ক্লাডনি নামে এক পদার্থবিজ্ঞানী প্যারিসে এসে এই সম্পূর্ণ নতুন ও অচেনা বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা দেখানোর পরই নেপোলিয়নের মাথায় এই ধারণা আসে।
এই প্রতিযোগিতার বিচারকদের প্রধান ছিলেন পিয়ের-সিমোঁ ল্যাপলাস। তাঁর মনে একটা ইচ্ছা ছিল, এই সুযোগে তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্র সিমিওন ডেনিস পয়সনকে সামনে এগিয়ে দেবেন। ১৮১১ সালের জন্য যখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা হলো, তখন মাত্র একটিই প্রবন্ধ জমা পড়েছিল! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেটি পয়সনের ছিল না। সেটি লিখেছিলেন সোফি জার্মেইন নামে অপরিচিত এক নারী!
১৮১১ সালের জন্য যখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা হলো, তখন মাত্র একটিই প্রবন্ধ জমা পড়েছিল! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেটি পয়সনের ছিল না।
বিচারকেরা জানালেন, সোফির সমাধানে কিছুটা ঘাটতি আছে। তাই প্রতিযোগিতার সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়া হলো ১৮১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। নিজের কাজ আরও নিখুঁত করতে উঠে পড়ে লাগলেন সোফি। এবারও তিনি একাই প্রবন্ধ জমা দিলেন। তত দিনে বিচারকদের একজন আদ্রিয়েন-মারি লেজেন্ডারের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান শুরু হয়েছে। লেজেন্ডার সোফির কাজে কিছুটা হতাশ হলেও, এবার একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি পেলেন সোফি।
প্রতিযোগিতার সময় আরও দুই বছর পিছিয়ে ১৮১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নেওয়া হলো। ঠিক তখনই হঠাৎ করে পয়সন তাঁর নিজের প্রবন্ধ জমা দিলেন! কিন্তু পয়সন নিজেই তো ১৮১৩ সালে এই প্রতিযোগিতার একজন বিচারক ছিলেন! একজন বিচারক হয়ে নিজে একই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটা ছিল চরম নিয়মভাঙা একটা কাজ। লেজেন্ডার এই কাজের কড়া প্রতিবাদও করেছিলেন। তবুও পয়সনের লেখাটি ইনস্টিটিউট ডি ফ্রান্সে পড়া হয় এবং সেটি ছাপাও হয়। বলা হয়েছিল, এই লেখাটি নাকি অন্য প্রতিযোগীদের সাহায্য করবে!
আসলে পয়সনের উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর এই লেখার মাধ্যমে সমস্যাটিকে চিরতরে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া, যাতে ল্যাপলাসের নজরে তিনি আরও বড় হতে পারেন। কিন্তু তাঁর এই চালাকি এতই কেলেঙ্কারির জন্ম দেয় যে, শেষমেশ প্রশ্নটি প্রতিযোগিতায় রেখেই দেওয়া হয়। হয়তো পর্দার আড়ালে এমন একটা চুক্তিও হয়েছিল যে, সোফি যদি তাঁর কাজ আরেকটু উন্নত করতে পারেন, তবে তাঁকেই পুরস্কারটি দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত সোফি গাণিতিকভাবে না পারলেও পরীক্ষামূলকভাবে তাঁর কাজ উন্নত করে দেখান। ১৮১৫ সালে তিনিই এই পুরস্কারটি জিতে নেন।
আসলে পয়সনের উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর এই লেখার মাধ্যমে সমস্যাটিকে চিরতরে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া, যাতে ল্যাপলাসের নজরে তিনি আরও বড় হতে পারেন।
সোফি জার্মেইনের এই গল্প প্রমাণ করে, সে যুগে প্যারিসের ছোট্ট ও অভিজাত বিজ্ঞানী মহলে পুরস্কার দেওয়া নিয়ে পর্দার আড়ালে কত রকমের রাজনীতি চলত! হয়তো এই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই ১৮১৫ সালে যখন ফার্মার শেষ উপপাদ্যের ওপর পুরস্কার ঘোষণা করা হলো, তখন সোফি আর অংশ নেননি। আসলে কেউই অংশ নেননি! চার বছর পর বাধ্য হয়ে প্রশ্নটি তুলে নেওয়া হয়।
তবে ফার্মার শেষ উপপাদ্য নিয়ে সোফি নিজের মতো করে যে গবেষণা চালিয়েছিলেন, তা অয়লারের পরে এবং জার্মান বিজ্ঞানী আর্নস্ট এডুয়ার্ড কুমারের আগের এক শতাব্দীর মধ্যে সেরা কাজ হিসেবে স্বীকৃত।
১৮৩০ সালে লেজেন্ডার তাঁর থিওরি ডেস নমব্রেস বইয়ে সোফির এই কাজগুলো প্রকাশ করেন। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান সোফি।
১৮১৫ সালের গণিত পুরস্কারের ঘটনাটিও বেশ মজার। তরঙ্গের বিস্তার নিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তরে একটি চমৎকার প্রবন্ধ লেখেন অগাস্টিন-লুই কশি। সেখানে তিনি একটি ফাংশন এবং তার ফুরিয়ার ট্রান্সফর্মের মধ্যকার সম্পর্ক আবিষ্কার করে দেখান। যদিও তিনি জোসেফ ফুরিয়ারের আগের কাজগুলোর কথা একদমই জানতেন না! কশি এই প্রতিযোগিতায় জিতলেও, তাঁর লেখাটি ১৮২৭ সালের আগে প্রকাশিত হয়নি। তত দিনে পয়সন স্বাধীনভাবে একই জিনিস আবিষ্কার করে তা দ্রুত প্রকাশ করে ফেলেন। ফলে কশির কাজ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
তরঙ্গের বিস্তার নিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তরে অগাস্টিন-লুই কশি একটি চমৎকার প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি একটি ফাংশন এবং তার ফোরিয়ার ট্রান্সফর্মের মধ্যকার সম্পর্ক আবিষ্কার করে দেখান।
১৮১৯ সালের গণিত পুরস্কারটি ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী অগাস্টিন-জ্যঁ ফ্রেসনেল জিতে নেন। সেটি ছিল আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের জন্য এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
তবে ১৮৩০ সালে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে, যা ভবিষ্যতের একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। সে বছর নিলস হেনরিক আবেল এবং কার্ল গুস্তাভ জ্যাকোবিকে যৌথভাবে উপবৃত্তাকার ফাংশন আবিষ্কারের জন্য পুরস্কৃত করা হয়। দুজনেই স্বাধীনভাবে সেটা আবিষ্কার করেছিলেন।
অবাক করা বিষয় হলো, পুরস্কারটি আগে থেকে ঘোষণা করা কোনো বিষয়ের ওপর দেওয়া হয়নি! লেজেন্ডার যখন দেখলেন এই দুজন অসাধারণ একটা বিষয় আবিষ্কার করে ফেলেছেন, তখন তিনি অ্যাকাডেমিকে রাজি করিয়ে এই যুগান্তকারী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কারের ব্যবস্থা করেন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে আগে থেকে শিরোনাম ও ডেডলাইন ঠিক করে দেওয়া পুরস্কারগুলোর রেওয়াজ একটু কমতে শুরু করে। এর বদলে কোনো নির্দিষ্ট শাখায় ইতিমধ্যে করা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য স্বীকৃতিমূলক পুরস্কারের চল শুরু হয়। এমনকি নির্দিষ্ট শিরোনাম থাকলেও, বিচারকেরা নতুন গবেষণার জন্য দুই বছর অপেক্ষা না করে আগের কোনো ভালো কাজকেই পুরস্কার দেওয়া শুরু করেন।
১৮৩০ সালে নিলস হেনরিক আবেল এবং কার্ল গুস্তাভ জ্যাকোবিকে যৌথভাবে উপবৃত্তাকার ফাংশন আবিষ্কারের জন্য পুরস্কৃত করা হয়। দুইজনেই স্বাধীনভাবে এটা আবিষ্কার করেছিলেন।
কোনো প্রশ্নের ভালো উত্তর না এলে অ্যাকাডেমিগুলো পড়ত মহাবিপদে! এটা যেমন সম্মানহানিকর ছিল, তেমনি আর্থিক ক্ষতিরও একটা ব্যাপার ছিল। ১৮১০ সালে ল্যাগ্রাঞ্জ এবং ল্যাপলাস আলোর দ্বি-প্রতিসরণকে গ্র্যান্ড প্রির বিষয় হিসেবে প্রস্তাব করেন। তখন তাঁরা খুব ভালো করেই জানতেন যে ৩৫ বছর বয়সী ইটিয়েন মালাস ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই দারুণ কাজ করছেন। শেষ পর্যন্ত মালাসই এই পুরস্কার জেতেন। এই চ্যালেঞ্জ তাঁকে এতই অনুপ্রাণিত করেছিল যে, গবেষণার একপর্যায়ে তিনি আলোর সমবর্তন আবিষ্কার করে ফেলেন!
১৮১২ সালেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। সেবারের বিষয় ছিল তাপের বিস্তার। সবাই জানতেন ফুরিয়ার এই বিষয় নিয়েই কাজ করছেন। পুরস্কারও জেতেন ফুরিয়ারই। তাঁর সেই কাজ গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অমর কীর্তি হয়ে আছে।
কিন্তু উনিশ শতক যত এগোতে থাকে, গ্র্যান্ড প্রির ভাগ্য যেন তত খারাপ হতে থাকে! ১৮৪০ সালে ‘উপবৃত্তাকার কক্ষপথের বিচ্যুতি’ নিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হলে, সেটির সফল উত্তর পেতে লেগে যায় ১৮৪৬ সাল। সেই উত্তর দিয়েছিলেন হ্যানসেন। ১৮৫০ সালে কশির নেতৃত্বে ফার্মার শেষ উপপাদ্য নিয়ে আবার প্রশ্ন দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো ভালো উত্তর না পেয়ে ১৮৫৩ সালে এটি বাতিল করা হয়। গ্যাব্রিয়েল ল্যামে ১৮৪৭ সালে ভুলবশত ভেবেছিলেন, তিনি সাইক্লোটমিক সংখ্যা দিয়ে এটি প্রমাণ করে ফেলেছেন। কিন্তু তাঁর সেই ভুল ধরিয়ে দেন জোসেফ লিউভিল। কশি জেদ ধরেছিলেন, তিনি এর সমাধান করতে পারবেন। কিন্তু শেষমেশ লিউভিল যখন জার্মান গণিতবিদ আর্নস্ট কুমারের অনেক বেশি গভীর ধারণাগুলো ফ্রান্সে নিয়ে আসেন, তখন সবাই বুঝতে পারে যে সমস্যাটি কত কঠিন!
গ্যাব্রিয়েল ল্যামে ১৮৪৭ সালে ভুলবশত ভেবেছিলেন, তিনি সাইক্লোটমিক সংখ্যা দিয়ে এটি প্রমাণ করে ফেলেছেন। কিন্তু জোসেফ লিউভিল তাঁর সেই ভুল ধরিয়ে দেন।
১৮৫৮ সালে ‘অসীম বস্তুতে তাপের বিস্তার’ নিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হলেও কোনো উত্তর না পেয়ে ১৮৬৮ সালে এটি বাতিল করা হয়। বার্নহার্ড রিম্যান একটি সমাধান জমা দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু বিচারকেরা রায় দেন, তাঁর সমাধানের পদ্ধতি যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। এ জন্য তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি!
১৮৬৫, ১৮৬৭, ১৮৭২, ১৮৭৪ এবং ১৮৭৮ সালেও অ্যাকাডেমি পর পর বেশ কয়েকটি জটিল প্রশ্ন দেয়, কিন্তু কোনোটিরই উত্তর আসেনি! অবশ্য এর মাঝে কিছু সাফল্যও ছিল। ১৮৮০ সালে ‘লিনিয়ার অর্ডিনারি ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশনের তত্ত্বের উন্নতি’ নিয়ে চমৎকার প্রবন্ধ লিখে জর্জেস-অঁরি হ্যালফেন পুরস্কার জেতেন।
তবে প্রতিযোগিতাটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী অঁরি পোয়াঁকারের কাজের জন্য। তিনি অটোমরফিক ফাংশন এবং নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির সঙ্গে রিম্যান সারফেসের সম্পর্ক নিয়ে যে অসাধারণ কাজ করেছিলেন, তা আজও গণিতবিদদের মুগ্ধ করে।
১৮৮২ সালে প্যারিস অ্যাকাডেমি এক চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। ক্যামিল জর্ডানের নেতৃত্বে তারা প্রশ্ন দিয়েছিল, একটি সংখ্যাকে পাঁচটি বর্গের যোগফল হিসেবে কতভাবে লেখা যায়? ১৮ বছর বয়সী তরুণ জার্মান গণিতবিদ হারম্যান মিনকভস্কি এবং ইংরেজ গণিতবিদ এইচ. জে. এস. স্মিথ যৌথভাবে এই পুরস্কার জেতেন। কিন্তু গোল বাধে অন্য জায়গায়!
স্মিথ তাঁর প্রবন্ধে শুধু প্রমাণ করেছিলেন, তিনি অনেক আগেই এই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন! আর সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপার হলো, পুরস্কার ঘোষণার আগেই স্মিথ মারা যান।
১৮৯০ সালে তরুণ জ্যাক হ্যাডামার্ড যখন তাঁর পিএইচডি থিসিস জমা দেন, তখন হারমাইট তাঁকে বলেন, এই থিসিসের কোনো বাস্তব প্রয়োগ খুঁজে বের করতে।
এই সুযোগে সমালোচকেরা লাফিয়ে উঠে বলেন, মিনকভস্কি নিশ্চয়ই স্মিথের কাজ চুরি করেছেন। কারণ এত অল্প বয়সে কারও পক্ষে এত বড় কাজ করা সম্ভব নয়! পরিস্থিতি এতই খারাপ হয় যে, এই বিতর্কের মধ্যে জাতিবিদ্বেষের সুরও শোনা যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অ্যাকাডেমি ভালোভাবে তদন্ত করে ঘোষণা দেয়, মিনকভস্কি কারও সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাঁর কাজ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা।
এই মিনকোভস্কিই পরে আলবার্ট আইনস্টাইনের শিক্ষক হয়েছিলেন। জুরিখ পলিটেকনিকে আইনস্টাইনের গণিতের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। পরে স্থান ও সময়কে একত্র করে স্থান-কালের ধারণা দিয়ে আপেক্ষিকতার তত্ত্বের গাণিতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করেন।
১৮৯২ সালের একটি গল্প না বললেই নয়। সে বছর চার্লস হারমাইট অ্যাকাডেমিকে রাজি করান মৌলিক সংখ্যার উপপাদ্য নিয়ে একটি প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর বন্ধু থমাস স্টিলজেসকে দিয়ে ১৮৮৫ সালে করা রিম্যান হাইপোথিসিস সমাধানের দাবিটির বিস্তারিত লেখানো। হারমাইট বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও স্টিলজেস কোনো প্রবন্ধ জমা দিতে পারেননি। কারণ, তিনি আসলে প্রমাণটি করতে পারেননি, শুধু দাবি করেছিলেন!
এর বদলে ১৮৯০ সালে তরুণ জ্যাক হ্যাডামার্ড যখন তাঁর পিএইচডি থিসিস জমা দেন, তখন হারমাইট তাঁকে বলেন, এই থিসিসের কোনো বাস্তব প্রয়োগ খুঁজে বের করতে।
হ্যাডামার্ড প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে খেয়াল করেন, তাঁর নতুন তত্ত্বটিই মৌলিক সংখ্যার উপপাদ্য প্রমাণের মূল চাবিকাঠি! তিনি একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ জমা দেন এবং ১৮৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি পুরস্কারটি জিতে নেন।
চার্লস হারমাইটের মূল উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর বন্ধু থমাস স্টিলজেসকে দিয়ে ১৮৮৫ সালে করা রিম্যান হাইপোথিসিস সমাধানের দাবিটির বিস্তারিত লেখানো।
এভাবেই উনিশ শতকে ফরাসি পুরস্কারগুলো একের পর এক ইতিহাস গড়তে থাকে। ১৮৫০ সাল নাগাদ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ফ্রান্সের মোট ১৩টি পুরস্কার ছিল। ১৮৭০-৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয়ের পর এই পুরস্কারের সংখ্যা আরও বাড়ে। ফরাসিরা বিশ্বাস করতে শুরু করে, বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ার কারণেই তাদের এই হার দেখতে হয়েছে। তাই বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দিতে নতুন পুরস্কারগুলো মেডালের বদলে নগদ অর্থে দেওয়ার নিয়ম করা হয়। সেটা বিজ্ঞানীদের গবেষণার কাজে দারুণ সাহায্য করেছিল।
গণিতের নির্দিষ্ট পুরস্কারগুলোর মধ্যে প্রিক্স পনসেলেট এবং প্রিক্স বর্ডিন ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। ১৮৬৮ সালে জেনারেল জ্যঁ-ভিক্টর পনসেলেটের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর দেওয়া অর্থে ১৮৭৬ সালে প্রিক্স পনসেলেট চালু হয়। আর ১৮৩৫ সালে চার্লস-লরেন বর্ডিনের রেখে যাওয়া ১২ হাজার ফ্রাঙ্ক দিয়ে ১৮৫৪ সালে শুরু হয় প্রিক্স বর্ডিন।
১৮৮৮ সালের প্রিক্স বর্ডিনের গল্পটি একটু অন্য রকম। সেবার বিষয় ছিল, একটি কঠিন বস্তুর গতির তত্ত্বকে উন্নত করা। চিঠি চালাচালি থেকে পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়, বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছিল মূলত রাশিয়ান গণিতবিদ সোফিয়া কোভালেভস্কির গবেষণার কথা মাথায় রেখে! কোভালেভস্কি তাঁর এক চিঠিতে লিখেছিলেন, হারমাইট, পিকার্ড, হ্যালফেন এবং ডারবক্সের মতো রথী-মহারথীরা তাঁকে ডিনারে ডেকে বলেছেন, তিনিই এই পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন!
কোভালেভস্কি যাতে প্রবন্ধ জমা দিতে পারেন, সে জন্য বিচারকেরা ডেডলাইনও পিছিয়ে দেন! শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরে পুরস্কারটি জেতেন কোভালেভস্কিই।
তবে তিনি সত্যিই অসাধারণ একটি কাজ করেছিলেন। কারণ তিনি দেখান কীভাবে অ্যাবেলিয়ান ফাংশনকে কাজে লাগিয়ে কঠিন বস্তুর গতির কঠিন সমস্যাগুলো মেটানো যায়।
১৮৫০ সাল নাগাদ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ফ্রান্সের মোট ১৩টি পুরস্কার ছিল। ১৮৭০-৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয়ের পর এই পুরস্কারের সংখ্যা আরও বাড়ে।
আবার বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেইনার প্রাইজের গল্প শুনলে বোঝা যায়, পুরস্কার দেওয়া মাঝেমধ্যে কতটা যন্ত্রণার হতে পারে! ১৮৬৩ সালে বিখ্যাত জ্যামিতিবিদ জ্যাকব স্টেইনার মারা যাওয়ার পর তাঁর দেওয়া অর্থে এই পুরস্কার চালু হয়। শর্ত ছিল, প্রতি দুই বছর অন্তর সিনথেটিক জ্যামিতির ওপর ৮ হাজার থ্যালার পুরস্কার দেওয়া হবে। থ্যালার হলো তৎকালীন জার্মান মুদ্রা।
১৮৬৪ এবং ১৮৬৮ সালে পুরস্কারটি সুন্দরভাবে দেওয়া গেলেও, তারপর থেকে শুরু হয় খরা! ১৮৭০ সালে ‘সারফেসের লাইন্স অব কার্ভেচার’ নিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হলে কোনো উত্তরই আসেনি! এরপর ১৮৭৪, ১৮৭৬, ১৮৮০ সালে একের পর এক প্রশ্ন দেওয়া হলেও কোনো সন্তোষজনক প্রবন্ধ জমা পড়েনি।
বিচারকেরা বাধ্য হয়ে ডেডলাইন পিছিয়েছেন এবং আগের কোনো ভালো কাজের জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার দিয়েছেন।
অবশেষে ১৮৮২ সালে ম্যাক্স নোয়েদার এবং হেনরি হ্যালফেন একটি প্রশ্নের চমৎকার উত্তর দিয়ে পুরস্কার জেতেন। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে ১৮৮৯ সালে স্টেইনার প্রাইজের নিয়ম শিথিল করা হয়। বলা হয়, এটি এখন থেকে ৫ বছর পর পর দেওয়া হবে এবং ভালো উত্তর না পেলে জ্যামিতির ক্ষেত্রে গত ১০ বছরে করা কোনো দারুণ কাজকে পুরস্কৃত করা হবে। এভাবেই ১৯০০ সালে ডেভিড হিলবার্ট তাঁর বিখ্যাত বই গ্রুন্ডল্যাগেন ডের জিওমেট্রি বা বাংলায় জ্যামিতির ভিত্তির জন্য এই পুরস্কারের এক-তৃতীয়াংশ জিতেছিলেন।
১৮৮২ সালে ম্যাক্স নোয়েদার এবং হেনরি হ্যালফেন একটি প্রশ্নের চমৎকার উত্তর দিয়ে পুরস্কার জেতেন। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে ১৮৮৯ সালে স্টেইনার প্রাইজের নিয়ম শিথিল করা হয়।
বার্লিন অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের পুরস্কারগুলোর অবস্থাও ছিল তথৈবচ! ১৮৩৬ সাল থেকে শুরু করে ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত একের পর এক কঠিন সব প্রশ্ন দেওয়া হলেও কোনো উত্তর আসেনি। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর অ্যাকাডেমি বাধ্য হয়ে ১৮৬৪ সাল থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়াই বন্ধ করে দেয়! ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের এই দুর্দশা চলতেই থাকে।
অন্যদিকে লিপজিগের জাবলোনোস্কি সোসাইটি বেশ সফলভাবে তাদের পুরস্কার পরিচালনা করেছিল। ১৭৭৪ সালে পোলিশ রাজপুত্র জাবলোনোস্কি এটি প্রতিষ্ঠা করেন। লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা এটি পরিচালনা করতেন।
১৮৪৬ সালে গটিংগেন সেভেন নামে পরিচিত সাতজন অধ্যাপককে রাজনৈতিক কারণে গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁরা সবাই লিপজিগে চলে আসেন এবং সেখানকার বিজ্ঞানচর্চার মান অনেক বাড়িয়ে দেন। এই সোসাইটি বেশ কিছু দারুণ গাণিতিক সমস্যার সফল সমাধান বের করে আনতে পেরেছিল।
ডেনিশ একাডেমি অব সায়েন্সেসও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেশ কিছু পুরস্কার দেয়। ১৮২৩ সালে ‘একটি সারফেসের ওপর আরেকটির কনফর্মাল রিপ্রেজেন্টেশন’ নিয়ে প্রবন্ধ লিখে পুরস্কার জেতেন বিখ্যাত গণিতবিদ কার্ল ফ্রেডরিক গাউস। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই প্রতিযোগিতার প্রশ্নটি স্বয়ং গাউসই তৈরি করেছিলেন! প্রশ্ন তৈরি করার পর তিনি দুই বছর চুপচাপ বসে ছিলেন, তারপর নিজের প্রবন্ধ জমা দিয়ে পুরস্কারটি জিতে নেন!
বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর অ্যাকাডেমি বাধ্য হয়ে ১৮৬৪ সাল থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়াই বন্ধ করে দেয়! ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের এই দুর্দশা চলতেই থাকে।
পুরস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটেছিল সুইডেনে। রাজা দ্বিতীয় অস্কারের ৬০তম জন্মদিন উপলক্ষে সুইডিশ গণিতবিদ মিটাগ-লেফলার একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। বিচারক হিসেবে ছিলেন ওয়ায়ারস্ট্রাস এবং হারমাইট। থ্রি-বডি প্রবলেমের ওপর দুর্দান্ত এক প্রবন্ধ জমা দিয়ে বিজয়ী হন অঁরি পোয়াঁকারে।
কিন্তু সমস্যা বাঁধে যখন পোয়াঁকারের প্রবন্ধটি ছাপানোর জন্য প্রেসে পাঠানো হয়। মিটাগ-লেফলারের সহকারী ফার্গমেন প্রবন্ধটি পড়তে গিয়ে কিছু ভুল দেখতে পান। পোয়াঁকারে বুঝতে পারেন, তাঁর প্রবন্ধে আসলেই বড়সড় একটা ভুল আছে!
সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে মিটাগ-লেফলার দ্রুত ছাপানো বন্ধ করেন। এমনকি প্রবন্ধের ছাপানো সব কপিও পুড়িয়ে ফেলেন! এরপর পোয়াঁকারে তাঁর ভুল শুধরে নেন। সেই ভুল শুধরাতে গিয়েই তিনি এমন কিছু আবিষ্কার করে বসেন, যা বর্তমানে ক্যাওস থিওরি বা বিশৃঙ্খলা তত্ত্বের গাণিতিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত!
মিটাগ-লেফলার নতুন প্রবন্ধটি ছাপান ঠিকই, কিন্তু আগের কপিগুলো পুড়িয়ে ফেলার পুরো খরচ আদায় করেন পোয়াঁকারের কাছ থেকে। সেই ক্ষতিপূরণ ছিল তাঁর পুরস্কারের মূল টাকার চেয়েও বেশি! এই ঝামেলার পর রাজা অস্কার আর কোনো দিন গণিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করেননি।
সবশেষ যে পুরস্কারটির কথা না বললেই নয়, সেটি হলো ভলফস্কেল প্রাইজ। পল ভলফস্কেল ছিলেন ধনী ইহুদি ব্যাংকার পরিবারের সন্তান এবং পেশায় চিকিৎসক। কিন্তু মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস নামে এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে আর চিকিৎসাবিদ্যা চালিয়ে যেতে পারবেন না, তখন গণিতের প্রেমে পড়েন।
মিটাগ-লেফলার নতুন প্রবন্ধটি ছাপান ঠিকই, কিন্তু আগের কপিগুলো পুড়িয়ে ফেলার পুরো খরচ পোয়াঁকারের কাছ থেকেই আদায় করেন। সেই ক্ষতিপূরণ ছিল তাঁর পুরস্কারের মূল টাকার চেয়েও বেশি!
বলা হয়, ১৯০৬ সালে মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর উইলে ১ লাখ গোল্ড মার্ক (জার্মান মুদ্রা) রেখে যান। শর্ত ছিল, ২০৭৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যিনি ফার্মার শেষ উপপাদ্যের নিখুঁত সমাধান দিতে পারবেন, তাঁকে এই টাকা দেওয়া হবে।
পুরস্কারটি চালুর প্রথম বছরেই ৬২১টি সমাধান জমা পড়ে! কিন্তু সেগুলো ছিল ভুল সমাধান। এরপর তা বাড়তে বাড়তে প্রায় ৫ হাজার গিয়ে পৌঁছায়। গটিংগেন রয়্যাল সোসাইটির মানুষদের এই প্রবন্ধগুলোর ভুল ধরতে ধরতে জীবন জেরবার হয়ে যেত! বার্লিন অ্যাকাডেমির হয়ে আলবার্ট ফ্লেক নামে এক চিকিৎসক এতগুলো প্রবন্ধের ভুল ধরেছিলেন যে, তাঁকে ১৯১৫ সালে লিবনিজ মেডেল দিয়ে সম্মানিত করা হয়। গণিতবিদেরা ফ্লেকের এই বিশাল কাজকে মজা করে বলতেন ফার্মা ক্লিনিক!
দীর্ঘ ৯১ বছর পর, ১৯৯৭ সালে সত্যি সত্যিই ফার্মার শেষ উপপাদ্যের সমাধান করেন পুরস্কারটি জেতেন অ্যান্ড্রু ওয়াইলস। তবে তত দিনে জার্মান মুদ্রাস্ফীতির কারণে ১ লাখ গোল্ড মার্কের আসল মূল্য কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৭৫ হাজার ডয়েচ মার্কে; যা তখন প্রায় ৩৭ হাজার মার্কিন ডলারের সমান ছিল। যদি ১ লাখ গোল্ড মার্ক দিয়ে সোনা কিনে রাখা হতো, তবে এর দাম হতো প্রায় ১৪ লাখ ডলার!
আগে থেকে বিষয় ঠিক করে দিয়ে পুরস্কার ঘোষণার এই প্রথা যখন ধীরে ধীরে ব্যর্থ হতে শুরু করল, তখন এর মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে সফল চেষ্টাটি করেছিলেন জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট। ১৯০০ সালে প্যারিসে বসেছিল গণিতবিদদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেস। সেখানেই হিলবার্ট তাঁর বিখ্যাত ২৩টি সমস্যার তালিকা তুলে ধরেন, যা পুরো বিংশ শতাব্দীর গণিতের গতিপথ ঠিক করে দিয়েছিল।
বার্লিন অ্যাকাডেমির হয়ে আলবার্ট ফ্লেক নামে এক চিকিৎসক এতগুলো প্রবন্ধের ভুল ধরেছিলেন যে, তাঁকে ১৯১৫ সালে লিবনিজ মেডেল দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
হিলবার্টকে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হারম্যান মিনকভস্কি! তিনি হিলবার্টকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ভবিষ্যতের দিকে উঁকি দেওয়ার এই চেষ্টা দারুণ আকর্ষণীয় হবে। তুমি এমন কিছু সমস্যার কথা বলো, যেগুলো নিয়ে ভবিষ্যতের গণিতবিদেরা কাজ করবেন। এটা করতে পারলে, মানুষ হয়তো আজ থেকে কয়েক দশক পরও তোমার এই সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করবে। যদিও ভবিষ্যৎবাণী করা সত্যিই খুব কঠিন কাজ!’
হিলবার্টের সমস্যাগুলো যখন লিখিত আকারে প্রকাশিত হলো, তখন তা গণিতবিদদের ওপর রীতিমতো জাদুর মতো কাজ করল। হিলবার্টের লেখার ছত্রে ছত্রে ছিল অটুট আত্মবিশ্বাস।
তিনি বিশ্বাস করতেন, যেকোনো সমস্যারই সমাধান সম্ভব। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘গণিতে কখনো জানা যাবে না বলে কিছু নেই!’ অর্থাৎ, আমরা সবই জানতে পারব, শুধু চেষ্টাটা চালিয়ে যেতে হবে।
হিলবার্ট মনে করতেন, গাণিতিক জ্ঞানের বিকাশের জন্য বড় বড় সমস্যা থাকা ভীষণ জরুরি। তিনি তাঁর ২৩টি সমস্যাকে মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছিলেন। প্রথম ৬টি ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি নিয়ে। পরের ৬টি ছিল সংখ্যাতত্ত্বের ওপর, যেখানে রিম্যান হাইপোথিসিসও ছিল। এর পরের ৬টি জ্যামিতির এবং শেষের ৫টি ছিল গাণিতিক বিশ্লেষণের ওপর।
হিলবার্ট বিশ্বাস করতেন, যেকোনো সমস্যারই সমাধান সম্ভব। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘গণিতে কখনো জানা যাবে না বলে কিছু নেই!’ অর্থাৎ, আমরা সবই জানতে পারব, শুধু চেষ্টাটা চালিয়ে যেতে হবে।
মজার ব্যাপার হলো, হিলবার্টের অনুমানও মাঝে মাঝে ভুল হতো! তিনি ভেবেছিলেন রিম্যান হাইপোথিসিসের সমাধান হয়তো খুব দ্রুতই হয়ে যাবে। অথচ এক শতাব্দীর বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এটি আজও অমীমাংসিত। অন্যদিকে, তিনি যেসব সমস্যাকে সবচেয়ে কঠিন ভেবেছিলেন, সেগুলোর কয়েকটি মাত্র ৩০ বছরের মধ্যেই সমাধান হয়ে গিয়েছিল!
হিলবার্টের এই সমস্যাগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, এগুলোর কোনো ডেডলাইন ছিল না। আগের অ্যাকাডেমিগুলোর মতো তিনি দুই বছরের সময়সীমা বেঁধে দেননি। তিনি শুধু পথটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তা ছাড়া তিনি আরেকটি দারুণ ব্যাপার মেনে নিয়েছিলেন—কোনো কিছু ‘করা সম্ভব নয়’, গাণিতিকভাবে এটা প্রমাণ করতে পারলেও তা একটি সফল সমাধান হিসেবেই ধরা হবে। যেমন, আবেল ও গ্যালয়েস প্রমাণ করেছিলেন, পঞ্চম ঘাতের সমীকরণ সাধারণ বীজগণিতের সূত্র দিয়ে সমাধান করা যায় না। এটিও ছিল গণিতের একটি বিশাল অর্জন।
হিলবার্টের এই সমস্যাগুলোর পাশাপাশি উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে কিছু নতুন পুরস্কার চালু হতে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল রাশিয়ার কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের লোবাচেভস্কি প্রাইজ। নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির অন্যতম আবিষ্কারক নিকোলাই লোবাচেভস্কির সম্মানে এটি চালু হয়। এই পুরস্কার দেওয়া নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দারুণ সৌহার্দ্য দেখা যেত।
১৯০৪ সালে বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ অঁরি পোয়াঁকারের জোরালো সুপারিশে লোবাচেভস্কি প্রাইজ জেতেন ডেভিড হিলবার্ট। আবার ১৯০৫ সালে হিলবার্টের সুপারিশে পোয়াঁকারে জেতেন হাঙ্গেরিয়ান অ্যাকাডেমির বোলিয়াই প্রাইজ। ১৯১০ সালে পোয়াঁকারে আবার পাল্টা সুপারিশ করে হিলবার্টকে দ্বিতীয় বোলিয়াই প্রাইজটি জিতিয়ে দেন! বিজ্ঞানীদের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সত্যিই চমৎকার ছিল।
নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির অন্যতম আবিষ্কারক নিকোলাই লোবাচেভস্কির সম্মানে লোবাচেভস্কি প্রাইজ চালু হয়। এই পুরস্কার দেওয়া নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দারুণ সৌহার্দ্য দেখা যেত।
কিন্তু এত কিছুর পরও একটি বড় আক্ষেপ রয়েই যায়। বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সম্মান নোবেল পুরস্কারে গণিতের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি। এর পেছনে অনেক গুঞ্জন শোনা যায়। অনেকেই বলেন, সুইডিশ গণিতবিদ মিটাগ-লেফলারের সঙ্গে আলফ্রেড নোবেলের ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণেই নাকি নোবেল তাঁর উইলে গণিতকে রাখেননি। গণিতবিদেরা এতে বেশ হতাশ হয়েছিলেন। বিশেষ করে সুইডেনের অ্যাকাডেমির মানুষেরা আশা করেছিলেন, নোবেল হয়তো তাদের জন্য বিশাল কোনো তহবিল রেখে যাবেন। কিন্তু তা না হওয়ায় তারা একে ‘নোবেল ফ্লপ’ বলে আক্ষেপ করেছিলেন।
নোবেলের এই অভাব পূরণের জন্যই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চালু হয় গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল।
কানাডিয়ান গণিতবিদ জন চার্লস ফিল্ডসের স্মৃতিতে এটি প্রবর্তন করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক কারণে ১৯২৪ সালে টরেন্টোতে হওয়া আন্তর্জাতিক গণিত কংগ্রেসে জার্মান গণিতবিদদের আসতে দেওয়া হয়নি।
ফিল্ডস নিজে জার্মানিতে পড়াশোনা করেছিলেন বলে এই ঘটনায় খুব কষ্ট পান। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি পুরস্কার চালু করতে, যা সব দেশের গণিতবিদদের এক সুতোয় বাঁধবে।
তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর, ১৯৩৬ সালে অসলোতে প্রথমবারের মতো ফিল্ডস মেডেল দেওয়া হয়। প্রতি চার বছর পর পর দেওয়া হয় এই মেডেল। উইলে সরাসরি লেখা না থাকলেও প্রথা অনুযায়ী এই মেডেল শুধু ৪০ বছরের কম বয়সী গণিতবিদদেরই দেওয়া হয়।
অনেকেই বলেন, সুইডিশ গণিতবিদ মিটাগ-লেফলারের সঙ্গে আলফ্রেড নোবেলের ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণেই নাকি নোবেল তাঁর উইলে গণিতকে রাখেননি। গণিতবিদেরা এতে বেশ হতাশ হয়েছিলেন।
ফিল্ডস মেডেল গণিতের নোবেল হতে পারে, কিন্তু মিলেনিয়াম প্রাইজ হলো হিলবার্টের সেই ২৩টি সমস্যারই আধুনিক ও চূড়ান্ত রূপ! ফিল্ডস মেডেলের সম্মান ও নোবেলের বিশাল অর্থমূল্যের এক দারুণ সংমিশ্রণ হলো মিলেনিয়াম প্রাইজ। এখানে বয়সের কোনো বাধাও নেই! এই সাতটি সমস্যা শুধু গণিতের পাতায় আটকে থাকা কিছু সমীকরণ নয়; এগুলো মানব মস্তিষ্কের চূড়ান্ত সীমানা ছোঁয়ার একেকটি রোমাঞ্চকর অভিযান। ধীরে ধীরে আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব; বোঝার চেষ্টা করব, কেন বিশ্বের সেরা মস্তিষ্কেরাও এগুলোর সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছেন!
