কতটা জোরে শব্দ হলে কেঁপে উঠবে পৃথিবী

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সবচেয়ে জোরালো শব্দ সর্বোচ্চ কত হতে পারে?ছবি: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সবচেয়ে জোরালো শব্দ হতে পারে সর্বোচ্চ ১৯৪ ডেসিবল। এর চেয়ে এক বিন্দুও বেশি নয়। ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ‘জার বোম্বা’ পারমাণবিক বোমার ২২৪ ডেসিবল কিংবা ব্ল্যাকহোল তৈরি করতে পারা ১,০০০ ডেসিবল শব্দের দাবিগুলো ডাহা গুজব। এসব সংখ্যা দিয়ে বড়জোর বিস্ফোরণের চাপ বোঝানো যেতে পারে, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এগুলো আদৌ কোনো শব্দ নয়।

কল্পনা করুন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্পিকারটা আপনার সামনে রাখা আছে। আপনি এর ভলিউমের নব ঘোরাতে শুরু করলেন। শব্দ বাড়ছে, আরও বাড়ছে। নব ঘোরানো শেষ হওয়ার অনেক আগেই আপনার কানের পর্দা হয়তো জবাব দিয়ে দেবে। কিন্তু আপনি যদি নব ঘোরাতেই থাকেন, শব্দ কি অনন্তকাল ধরে বাড়তেই থাকবে?

উত্তর, না। ওই নবের একটা নির্দিষ্ট পয়েন্টে যাওয়ার পর শব্দ আর শব্দই থাকবে না। স্পিকার গলে যাবে বলে নয়, কিংবা আপনি বধির হয়ে যাবেন বলেও নয়; বরং শব্দের বাহন যে বাতাস, সেটাই ফুরিয়ে যাবে! শুনতে অন্যরকম লাগলেও এটি পদার্থবিজ্ঞানের দুনিয়ায় নিখাদ সত্য। চলুন, ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা সবচেয়ে জোরালো শব্দের রহস্যগুলো একটু তলিয়ে দেখা যাক।

আরও পড়ুন
ধাক্কা দিলে বাতাসের অণুগুলো এক জায়গায় জড়ো হয়ে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে। একে আপনি ঠেসাঠেসি অবস্থা বলতে পারেন। আবার পরমুহূর্তেই সেখানে অণুগুলো পাতলা হয়ে নিম্নচাপ তৈরি করে।

শব্দ কী, কীভাবে তৈরি হয়

একবার জোরে হাততালি দিন। আপনি এইমাত্র একটি শব্দ তৈরি করলেন। বাস্তবে ঠিক কী ঘটল? আপনার দুই হাতের তালু যখন সজোরে একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেল, তখন মাঝখানের বাতাস ছিটকে বেরিয়ে গেল। এই বেরিয়ে যাওয়া বাতাস তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না। বাতাস গিয়ে ধাক্কা মারল তার পাশের বাতাসকে। ধাক্কা খেয়ে সেই বাতাস আবার ধাক্কা দিল তার পাশের বাতাসকে। এভাবে ঢেউয়ের মতো চারদিকে ধাক্কাটা ছড়িয়ে পড়ল।

বুঝতে কষ্ট হলে একটি স্প্রিংয়ের খেলনার কথা ভাবুন। স্প্রিংটিকে টেবিলের ওপর টেনে ধরে এক প্রান্তে ধাক্কা দিন। দেখবেন, স্প্রিংয়ের কুণ্ডলীগুলোর একটা সংকুচিত ঢেউ লাফিয়ে লাফিয়ে অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখবেন, স্প্রিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট কুণ্ডলী তার জায়গা ছেড়ে কোথাও যাচ্ছে না; ওটা শুধু একটু সামনে এগিয়ে পাশের জনকে ধাক্কা দিয়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসছে।

বাতাস ঠিক এই কাজটাই করে। ধাক্কা দিলে বাতাসের অণুগুলো এক জায়গায় জড়ো হয়ে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে। একে আপনি ঠেসাঠেসি অবস্থা বলতে পারেন। আবার পরমুহূর্তেই সেখানে অণুগুলো পাতলা হয়ে নিম্নচাপ তৈরি করে। মানে ফাঁকা স্থান হয়ে যায়। এই ঠেসাঠেসি আর ফাঁকা অবস্থার ঢেউই হলো শব্দ।

আরও পড়ুন
বাতাস গিয়ে ধাক্কা মারল তার পাশের বাতাসকে। ধাক্কা খেয়ে সেই বাতাস আবার ধাক্কা দিল তার পাশের বাতাসকে। এভাবে ঢেউয়ের মতো চারদিকে ধাক্কাটা ছড়িয়ে পড়ল।

কত জোরে মানে কী, ডেসিবল বলতে কী বোঝায়

শব্দের জোর মাপার একক ডেসিবল জিনিসটা বেশ গোলমেলে। মিটার দিয়ে যেমন দৈর্ঘ্য মাপা যায়, ডেসিবল কিন্তু কোনো কিছুর পরিমাণ নয়। এটি একটি তুলনামূলক মাপকাঠি। একটি সুস্থ কান সবচেয়ে মৃদু যে শব্দ শুনতে পায়, তার সঙ্গে আপনার তৈরি করা শব্দের চাপের তুলনাই হলো ডেসিবল।

ডেসিবল স্কেল সাধারণ স্কেলের মতো কাজ করে না। প্রতি ২০ ডেসিবল বাড়ার অর্থ শব্দের চাপ দ্বিগুণ নয়, বরং পাক্কা ১০ গুণ বেড়ে যাওয়া! অর্থাৎ, ৪০ ডেসিবলের চেয়ে ৬০ ডেসিবল একটু বেশি নয়, বরং ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী। আর ৮০ ডেসিবল হলো ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এ কারণেই বিশাল সব চাপ বোঝাতে ডেসিবলের সংখ্যাগুলো ছোট আর গোছানো থাকে। ঠিক এই সুযোগটাই নেয় নেটিজেনরা, তারা ইচ্ছামতো ডেসিবল বসিয়ে দেয়!

আরও পড়ুন
প্রতি ২০ ডেসিবল বাড়ার অর্থ শব্দের চাপ দ্বিগুণ নয়, বরং পাক্কা ১০ গুণ বেড়ে যাওয়া! অর্থাৎ, ৪০ ডেসিবলের চেয়ে ৬০ ডেসিবল একটু বেশি নয়, বরং ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী।

শব্দের জোরের কি কোনো শেষ সীমা আছে

ভলিউম বাড়িয়ে দিলে বাতাসের কী অবস্থা হয় খেয়াল করুন। ঠেসাঠেসি করা জায়গাগুলোতে চাপ স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপের (১ অ্যাটমোস্ফিয়ার) চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। আর ফাঁকা জায়গাগুলোর চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যায়।

মজার ব্যাপার হলো, এই দুই দিকের কাজটা সমান সহজ নয়। চাপ বাড়ানোর কোনো শেষ নেই; আপনি চাইলে অণুগুলোকে আরও বেশি, আরও শক্তভাবে ঠেসাঠেসি করে রাখতে পারেন। কিন্তু চাপ কমানোর ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা আছে। আপনি যখন অণু সরিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি করছেন, তখন একসময় সেখানে আর কোনো অণুই অবশিষ্ট থাকবে না!

সব অণু সরিয়ে নিলে সেখানে তৈরি হবে শূন্যস্থান। সেখানে চাপ হবে শূন্য। আর এটাই হলো সেই দেয়াল। এর নিচে নামার কোনো উপায় নেই। কারণ ‘বাতাস না থাকার’ চেয়ে কম বাতাস বলে কিছু হয় না! অর্থাৎ, স্বাভাবিক ১ অ্যাটমোস্ফিয়ার চাপ থেকে কমতে কমতে আপনি বড়জোর শূন্যতে নামতে পারবেন। আপনার কমানোর জায়গা ওই ১ অ্যাটমোস্ফিয়ারই, এর বেশি এক বিন্দুও নয়।

তাই শব্দের জোরের একটি সুনির্দিষ্ট সীমা আছে। এর সঙ্গে আপনার স্পিকারের ক্ষমতা বা বোমার সাইজের কোনো সম্পর্ক নেই। সীমা তৈরি হয়েছে কারণ বাতাসের নিজেরই একটা নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা আছে।

আরও পড়ুন
স্বাভাবিক ১ অ্যাটমোস্ফিয়ার চাপ থেকে কমতে কমতে আপনি বড়জোর শূন্যতে নামতে পারবেন। আপনার কমানোর জায়গা ওই ১ অ্যাটমোস্ফিয়ারই, এর বেশি এক বিন্দুও নয়।

সীমাটা ঠিক ১৯৪ ডেসিবল কেন

অঙ্কটা খুব সহজ। স্প্রিংয়ের সেই ঢেউয়ের কথা ভাবুন। ঢেউটি স্বাভাবিক চাপের চেয়ে নিচে নামতে পারে সর্বোচ্চ ১ অ্যাটমোস্ফিয়ার। যেহেতু ঢেউয়ের ওঠানামা সমান হয়, তাই এটি ওপরেও উঠতে পারবে সর্বোচ্চ ১ অ্যাটমোস্ফিয়ার। অর্থাৎ, পৃথিবীর বাতাসে সবচেয়ে জোরালো শব্দ হতে পারে এমন একটি শব্দ, যা স্বাভাবিক চাপের চেয়ে ১ অ্যাটমোস্ফিয়ার নিচে নামে এবং ১ অ্যাটমোস্ফিয়ার ওপরে ওঠে।

১ অ্যাটমোস্ফিয়ার চাপ মানে ১ লাখ ১ হাজার ৩২৫ প্যাসকেল। শব্দের চাপের সাধারণ সূত্রে এই মানটি বসালে উত্তর আসে ঠিক ১৯৪ ডেসিবল! এখানে স্পিকার, শক্তি বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো কারসাজি নেই; পুরোটাই নির্ভর করছে আপনার মাথার ওপর থাকা বাতাসের ওজনের ওপর। এটি শব্দের কোনো বৈশিষ্ট্য নয়, এটি খোদ আমাদের বায়ুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য।

১৯৪ ডেসিবল পার হয়ে গেলে কী হবে

অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করলে তা আর শব্দ থাকবে না। যেহেতু বাতাসের চাপ শূন্যের নিচে নামতে পারে না, তাই অতিরিক্ত শক্তিটা ঢেউয়ের সংকুচিত অংশে গিয়ে জমা হতে থাকে। তখন শব্দের সেই সুন্দর ঢেউয়ের কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং জন্ম নেয় শক ওয়েভ। এটি তখন শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিতে ছুটতে থাকা একটি চলন্ত দেয়ালে পরিণত হয়, যার পেছনে থাকে চরম শূন্যস্থান।

শব্দের কারণে আপনার কানের পর্দা কাঁপে, কিন্তু শক ওয়েভ হলো একটি সলিড ধাক্কা। ফাইটার জেট যখন শব্দের বেগ পার হয় বা বজ্রপাত যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন আমরা এই শক ওয়েভই অনুভব করি।

আরও পড়ুন
পৃথিবীর বাতাসে সবচেয়ে জোরালো শব্দ হতে পারে এমন একটি শব্দ, যা স্বাভাবিক চাপের চেয়ে ১ অ্যাটমোস্ফিয়ার নিচে নামে এবং ১ অ্যাটমোস্ফিয়ার ওপরে ওঠে।

১০০০ ডেসিবল কি আদৌ সম্ভব

আগেই বলেছি, প্রতি ২০ ডেসিবল বাড়লে চাপ ১০ গুণ বাড়ে। সেই হিসাবে ৩০০ ডেসিবল মানে হলো আপনার চারপাশের বাতাসের চাপের ২ লাখ গুণ বেশি চাপ! ১০০০ ডেসিবল লিখলে ১-এর পর ৪৫টি শূন্য বসাতে হবে।

তুলনা করার জন্য বলি, আমাদের সূর্যের একেবারে ভেতরের কোর বা কেন্দ্রের চাপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ২৩ হাজার কোটি গুণ। ডেসিবল স্কেলে ফেললে সূর্যের ওই ভয়ংকর কেন্দ্রের চাপ দাঁড়ায় মাত্র ৪২১ ডেসিবল!

একটু ভেবে দেখুন, যেখানে খোদ সূর্যের পেটের ভেতরের চাপ ৪২১ ডেসিবল, সেখানে ১০০০ ডেসিবল মানে হলো সূর্যের কেন্দ্রের চাপের চেয়েও কয়েক হাজার কোটি গুণ বেশি কিছু! আমাদের চেনা মহাবিশ্বে এমন কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। তাই ১০০০ ডেসিবল শব্দ হলে কী হবে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এটি অনেকটা ‘মঙ্গলবারের রং কী’ প্রশ্নের মতো অর্থহীন একটি প্রশ্ন।

জার বোম্বারের ২২৪ ডেসিবলের গল্প

রুশ পারমাণবিক বোমা জার বোম্বার ‘২২৪ ডেসিবল’ শব্দের দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোনো যন্ত্র দিয়ে এটি মাপা হয়নি, বরং বিস্ফোরণের চাপ হিসাব করে কেউ হয়তো উল্টোপথে এই সংখ্যাটি বের করেছে। ধরে নিলাম কোনো যন্ত্র সত্যিই ২২৪ ডেসিবল মেপেছিল; কিন্তু সেটি ছিল একটি বিশাল শক ওয়েভ বা বিস্ফোরণের ধাক্কা, কোনো শব্দ নয়। শব্দবিজ্ঞানের একক ধার করে বিস্ফোরণের চাপ মাপাটাই এই গুজবের সবচেয়ে বড় ভুল।

আরও পড়ুন
আমাদের সূর্যের একেবারে ভেতরের কোর বা কেন্দ্রের চাপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ২৩ হাজার কোটি গুণ। ডেসিবল স্কেলে ফেললে সূর্যের ওই ভয়ংকর কেন্দ্রের চাপ দাঁড়ায় মাত্র ৪২১ ডেসিবল!

মানুষ কি ২০০ ডেসিবল শব্দে বেঁচে থাকতে পারবে

প্রশ্নটা হওয়া উচিত, মানুষ কি এত বিশাল চাপ সহ্য করতে পারবে? মানুষের কান অনেক আগেই হার মানে। ৮৫ ডেসিবলের বেশি শব্দ টানা শুনলে মানুষ বধির হয়ে যেতে পারে। আর ২০০ ডেসিবল মানে হলো প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৫ অ্যাটমোস্ফিয়ার চাপ। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই বিশাল চাপ মানুষের কান নয়, বরং সরাসরি ফুসফুসকে ছিন্নভিন্ন করে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই ২০০ ডেসিবল মাত্রার কোনো শক ওয়েভ আপনার দিকে ধেয়ে এলে, কানের পর্দা ফাটাটা হবে আপনার সবচেয়ে ছোট সমস্যা!

ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির শব্দ কতটা ভয়ংকর ছিল

১৮৮৩ সালের ২৭ আগস্ট ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরি যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন ১০০ মাইল দূরে থাকা একটি ব্যারোমিটারের কাঁটা লাফিয়ে উঠেছিল। হিসাব করে দেখা যায়, ১০০ মাইল দূরে বসেও ওই বিস্ফোরণের শব্দ ছিল প্রায় ১৭২ ডেসিবল! ৩ হাজার মাইল দূর থেকেও সেই শব্দ শোনা গিয়েছিল। আর ৪০ মাইল দূরে থাকা একটি জাহাজের অর্ধেকের বেশি নাবিকের কানের পর্দা ফেটে গিয়েছিল।

ভেবে দেখুন, ১০০ মাইল দূরেই যদি ১৭২ ডেসিবল হয় (যা সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে মাত্র ২২ ডেসিবল কম), তবে খোদ আগ্নেয়গিরির মুখে শব্দের অবস্থা কেমন ছিল! সেখানে শব্দ নিশ্চিতভাবেই ১৯৪ ডেসিবলের দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছিল এবং শব্দ থেকে শক ওয়েভে পরিণত হয়েছিল। ইতিহাসে এটিই ছিল শব্দের সর্বোচ্চ সীমার সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার ঘটনা।

আরও পড়ুন
২০০ ডেসিবল মানে হলো প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৫ অ্যাটমোস্ফিয়ার চাপ। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই বিশাল চাপ মানুষের কান নয়, বরং সরাসরি ফুসফুসকে ছিন্নভিন্ন করে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

স্যাটার্ন ফাইভ রকেটের শব্দ কি সত্যিই ২০৪ ডেসিবল ছিল

অ্যাপোলো মিশনের সেই বিখ্যাত রকেটের শব্দ ২০৪ ডেসিবল ছিল বলে প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু এখানেও একটি ভুল আছে। ২০৪ হলো সাউন্ড পাওয়ার, সাউন্ড প্রেশার নয়। বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। সাউন্ড পাওয়ার হলো লাইটবাল্বের ওয়াট, আর সাউন্ড প্রেশার হলো বাল্বের আলোটা আপনার চোখে কতটা উজ্জ্বল লাগছে।

অ্যাপোলো ৮ উৎক্ষেপণের সময় ৮১.৫ মিটার দূর থেকে মাপা শব্দের আসল চাপ ছিল ১৬৩.৫ ডেসিবল। অর্থাৎ, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটটিও শব্দের সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে পাক্কা ৩০ ডেসিবল নিচে ছিল!

অ্যাপোলো ৮ উৎক্ষেপণের সময় ৮১.৫ মিটার দূর থেকে মাপা শব্দের আসল চাপ ছিল ১৬৩.৫ ডেসিবল
ছবি: এপি

আর টেলর সুইফটের কনসার্টে ৭২ হাজার দর্শকের সেই বিখ্যাত ‘ভূমিকম্প’ তৈরি করা আওয়াজ? ওটাও কোনো শব্দের রেকর্ড ছিল না, বরং হাজার হাজার মানুষের একসঙ্গে লাফানোর কারণে মাটি কেঁপে উঠেছিল। যেমনটা সম্প্রতি ফিফা বিশ্বকাপে দেখা গেছে। নরওয়ের যেদিন যেদিন খেলা ছিল, সেদিন নরওয়ে গোল করলেই দেশটির একটি শহর কেঁপে উঠত। আর্লিং হালান্ড গোল করলে কাঁপুনির মাত্রা আরও বেড়ে যেত। বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন এটা ভূমিকম্প। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা যায়, এটা নরওয়ের মানুষের উল্লাসের কারণে তৈরি মাটির কাঁপুনি। 

আরও পড়ুন
শুক্র গ্রহে যদি ক্রাকাতোয়ার মতো বিস্ফোরণ হয়, তবে সেটি পৃথিবীর যেকোনো শব্দের চেয়ে আক্ষরিক অর্থেই বহুগুণ জোরালো হবে। আবার মঙ্গলে গেলে এই সীমা অনেক কমে যাবে।

অন্য কোনো গ্রহে কি শব্দ আরও জোরালো হতে পারে

শব্দের সীমা যেহেতু বাতাসের চাপের ওপর নির্ভর করে, তাই বায়ুমণ্ডল বদলালে সীমানাও বদলে যাবে। নাসার মতে, শুক্র গ্রহের পৃষ্ঠের চাপ পৃথিবীর চেয়ে ৯৩ গুণ বেশি! সেখানে শব্দের ঢেউ শূন্যে পৌঁছানোর আগে ৯৩ অ্যাটমোস্ফিয়ার নিচে নামার জায়গা পাবে। অর্থাৎ, শুক্র গ্রহে শব্দের সর্বোচ্চ সীমা হবে প্রায় ২৩৩ ডেসিবল! শুক্র গ্রহে যদি ক্রাকাতোয়ার মতো বিস্ফোরণ হয়, তবে সেটি পৃথিবীর যেকোনো শব্দের চেয়ে আক্ষরিক অর্থেই বহুগুণ জোরালো হবে। আবার মঙ্গলে গেলে এই সীমা অনেক কমে যাবে। তবে মহাকাশের শূন্যতায় কোনো বাতাস নেই বলে সেখানে কোনো শব্দও নেই।

আরও পড়ুন
পৃথিবীর বুকে ১৯৪ ডেসিবলের এই সীমা মানবসৃষ্ট কোনো প্রযুক্তি বা বিশাল কোনো বোমার ওপর নির্ভর করে না। এটি কেবলই আপনার মাথার ওপর থাকা বাতাসের ওজনের একটি গাণিতিক হিসাব মাত্র।

মহাবিশ্বের সবচেয়ে জোরালো শব্দ কোনটি

পৃথিবী থেকে ২৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে পার্সিউস গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে প্রচুর উত্তপ্ত গ্যাস রয়েছে, যা শব্দ পরিবহনে সক্ষম। ২০০২ সালে নাসার চন্দ্র এক্স-রে টেলিস্কোপ সেখানকার একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা বিশাল সব চাপের ঢেউ বা শব্দ শনাক্ত করে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, এই শব্দের মাত্রা হলো মিডেল সি-এর চেয়ে ৫৭ অক্টেভ নিচের একটি ‘বি-ফ্ল্যাট’ নোট।

এটি মানুষের শোনার সীমার চেয়ে কয়েক কোটি গুণ বেশি নিচু স্বরের একটি শব্দ, যা গত আড়াই শ কোটি বছর ধরে একটানা বেজে চলেছে। নাসা শব্দটিকে আমাদের শোনার উপযোগী করতে ৫৭ থেকে ৫৮ অক্টেভ ওপরে তুলেছিল। তবে এখানে ডেসিবলের কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ সেখানকার গ্যাস এতই পাতলা যে তা পৃথিবীর হিসেবে চরম শূন্যস্থান। এমন ফাঁকা জায়গায় শব্দের চাপ একেবারেই নগণ্য হয়। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত এই শব্দটির বিশেষত্ব এর জোরালো আওয়াজে নয়, বরং এর অবিশ্বাস্য স্থায়িত্ব এবং গভীরতায়।

পৃথিবীর বুকে ১৯৪ ডেসিবলের এই সীমা মানবসৃষ্ট কোনো প্রযুক্তি বা বিশাল কোনো বোমার ওপর নির্ভর করে না। এটি কেবলই আপনার মাথার ওপর থাকা বাতাসের ওজনের একটি গাণিতিক হিসাব মাত্র। ১৮৮৩ সালে ক্রাকাতোয়া বিস্ফোরণের সময় প্রকৃতি একবারই এই সীমা ছুঁয়েছিল। যারা সেই ভয়ংকর শব্দের সবচেয়ে কাছাকাছি ছিল, তাদের কাছে তা শুধু শব্দ মনে হয়নি; তাদের মনে হয়েছিল পৃথিবী বুঝি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তারপর তারা চিরকালের জন্য বধির হয়ে গিয়েছিল।

সূত্র: সায়েন্স এবিসি

আরও পড়ুন