ম্যাডাম উ: ফিজিকসের ফার্স্ট লেডি

চিয়েন-শিউং উছবি: দ্য ম্যাটিল্ডা প্রজেক্ট

১৯৪২। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস সময়। ম্যানহাটান প্রজেক্টের পারমাণবিক বোমার মূল উপাদান ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম তৈরি হচ্ছে বেশ কয়েকটি গোপন রিঅ্যাক্টরে। কলম্বিয়া নদীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে হ্যানফোর্ড রিঅ্যাক্টর তৈরি হয়েছে প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু দেখা গেল, রিঅ্যাক্টর চালু করার পর চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হওয়ার একটু পরই রিঅ্যাক্টর নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বারবার ঘটছে এ ঘটনা।

চিন্তায় পড়ে গেলেন প্রকল্প পরিচালক এনরিকো ফার্মি। তিনি নিজে নিউট্রনের মিথস্ক্রিয়া আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মাত্র চার বছর আগে। নিউট্রনের নাড়ি-নক্ষত্র তাঁর জানা থাকার কথা। তিনি বুঝতে পারছিলেন, রিঅ্যাক্টরের ভেতর চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হওয়ার পর যেসব ফিশন প্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে, সেগুলোই কোনো না কোনোভাবে নিউট্রন শোষণ করে নিচ্ছে। ফলে চেইন রিঅ্যাকশন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোন ফিশন প্রোডাক্ট এর জন্য দায়ী, তা কিছুতেই তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। প্রজেক্টের অন্যান্য বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের কাছেও এ প্রশ্নের উত্তর নেই। তবে সবারই একই পরামর্শ, ‘মিস উ-কে জিজ্ঞেস করুন।’

এনরিকো ফার্মি নিউট্রনের মিথস্ক্রিয়া আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন
ছবি: সংগৃহীত

কে এই মিস উ? জানা গেল, মাত্র ৩০ বছর বয়সী এই চীনা তরুণীর নাম চিয়েন-শিউং উ। দুই বছর আগে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন সাইক্লোট্রনের উদ্ভাবক আর্নেস্ট লরেন্সের তত্ত্বাবধানে। ১৯৩৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট লরেন্স ছিলেন ম্যানহাটান প্রজেক্টের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী—রেডিয়েশন ল্যাবের তত্ত্বাবধায়ক। তাঁর ল্যাবেই আবিষ্কৃত হয়েছে প্লুটোনিয়াম।

আরও পড়ুন
চিন্তায় পড়ে গেলেন প্রকল্প পরিচালক এনরিকো ফার্মি। তিনি নিজে নিউট্রনের মিথস্ক্রিয়া আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মাত্র চার বছর আগে। নিউট্রনের নাড়ি-নক্ষত্র তাঁর জানা থাকার কথা।

এনরিকো ফার্মি যোগাযোগ করলেন মিস চিয়েন-শিউং উর সঙ্গে। ফার্মির পাঠানো ডেটা বিশ্লেষণ করে মিস উ হ্যানফোর্ড রিঅ্যাক্টরের সমস্যার কারণ বের করে ফেললেন। ফিশন প্রোডাক্টে জেনন-১৩৫ আইসোটোপ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত নিউট্রন শোষণ করতে থাকে। তখন রিঅ্যাক্টরে চেইন রিঅ্যাকশন ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় নিউট্রনের অভাব থেকে রিঅ্যাক্টর বন্ধ হয়ে যায়।

মিস উর প্রতিভা আর নিউক্লিয়ার ফিজিকসে গভীর ব্যবহারিক জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন এনরিকো ফার্মি। হ্যানফোর্ড রিঅ্যাক্টরের সমস্যার সমাধান করে ফেলা গেল চিয়েন-শিউং উর সহায়তায়। এনরিকো ফার্মি ম্যানহাটান প্রজেক্টের প্রধান বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহেইমারকে অনুরোধ করতেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন ম্যানহাটান প্রজেক্টের বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী হিসেবে চিয়েন-শিউং উ-কে নিয়োগ দিতে।

চিয়েন-শিউং উ
ছবি: ব্রিটানিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই সময়ে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের এমন সব পরীক্ষণ ঘটানো হয়েছে, যা অন্য স্বাভাবিক সময়ে হয়তো সম্ভব হতো না। পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্প ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’ এতই গোপনীয় ছিল যে এর গবেষণাগারগুলোতে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁদের বেশির ভাগই জানতেন না কোন বৃহত্তর প্রকল্পের অধীন তাঁরা কাজ করছেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ কাজ করেছেন ম্যানহাটান প্রজেক্টে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাত্র দেড় থেকে দুই হাজার ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানী। কিন্তু মূল বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের উদ্ভাবন ও গবেষণা প্রকল্পগুলো তত্ত্বাবধান করেছেন মাত্র শখানেক বিজ্ঞানী, যাঁদের অনেকেই ছিলেন সেই সময় ইউরোপ থেকে নির্বাসিত বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী।

আরও পড়ুন
মিস উর প্রতিভা আর নিউক্লিয়ার ফিজিকসে গভীর ব্যবহারিক জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন এনরিকো ফার্মি। হ্যানফোর্ড রিঅ্যাক্টরের সমস্যার সমাধান করে ফেলা গেল চিয়েন-শিউং উর সহায়তায়।

চিয়েন-শিউং উ ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র চীনা বিজ্ঞানী, যিনি ম্যানহাটান প্রজেক্টে কাজ করেছেন। ইউরেনিয়াম-২৩৮ থেকে ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপ চিয়েন-শিউং উ শুধু সেখানেই যে প্রথম ছিলেন তা নয়, পরবর্তী সময়ে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি এমন অনেক মাইলফলক স্থাপন করেছেন। সেগুলো থেকে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ফার্স্ট লেডি অব ফিজিকস, কুইন অব নিউক্লিয়ার রিসার্চ হিসেবে। মেরি কুরির সঙ্গে তুলনা করে তাঁকে চায়নিজ মেরি কুরি বলে ডাকা হয়।

চীনের সাংহাইয়ের কাছে লিউহি নামে ছোট্ট একটি গ্রামে চিয়েন-শিউং উর জন্ম ১৯১২ সালের ৩১ মে। তাঁর বাবা জং-ই উ ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও স্বাধীন জ্ঞান অর্জনের প্রতি তিনি ছিলেন বিশেষ যত্নবান। মেয়েদের শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর জন্য তিনি নিজেই একটি স্কুল স্থাপন করেছিলেন এবং নিজের মেয়ের পড়াশোনা শুরু হলো সেই স্কুলে। ১৯২৩ সালে এই স্কুলের প্রাথমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পর চিয়েন-শিউং ভর্তি হলেন সুচাউ স্কুল ফর গার্লসে।

চীনের সাংহাইয়ের কাছে লিউহি নামে ছোট্ট একটি গ্রামে চিয়েন-শিউং উর জন্ম
ছবি: গেটি ইমেজ

মেয়েদের এই বোর্ডিং স্কুল থেকে চিয়েন-শিউং ‘নরমাল স্কুল প্রোগ্রাম’-এ স্নাতক হলেন ১৯২৯ সালে। এই প্রোগ্রাম হলো শিক্ষক তৈরির প্রকল্প। চীনে শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে আদর্শ শিক্ষক তৈরি করার জন্য একেবারে স্কুল থেকেই এ প্রকল্প শুরু করা হয়েছিল। নরমাল স্কুল প্রোগ্রামের বিশেষ লেখাপড়া শেষ করার পর এক বছর সাংহাই গং সু পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করেন চিয়েন-শিউং।

১৯৩০ সালে ন্যানজিংয়ের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন চিয়েন-শিউং। শুরুতে গণিতে ভর্তি হলেও দ্বিতীয় বর্ষে পদার্থবিজ্ঞানে চলে আসেন তিনি। কোয়ান্টাম মেকানিকসের বিপ্লব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউক্লিয়ার ফিজিকসসহ পদার্থবিজ্ঞানের জগতে যে আলোড়ন চলছিল, তাতে ভীষণভাবে আকৃষ্ট হলেন চিয়েন-শিউং। ১৯৩৪ সালে অনার্সসহ রেকর্ড মার্কস নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের স্নাতক ডিগ্রি লাভ করলেন চিয়েন-শিউং।

আরও পড়ুন
১৯৩০ সালে ন্যানজিংয়ের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন চিয়েন-শিউং। শুরুতে গণিতে ভর্তি হলেও দ্বিতীয় বর্ষে পদার্থবিজ্ঞানে চলে আসেন তিনি।

১৯৩৫-৩৬ সালে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির গবেষণা শুরু করেন চিয়েন-শিউং। পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাই ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠছে তাঁর। ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা শুরু হয়ে গেছে। আইনস্টাইনসহ ইউরোপের বিজ্ঞানীদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। চিয়েন-শিউংও তাঁর চাচার আর্থিক সহায়তায় ১৯৩৬ সালে চলে এলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ঠিক করে রেখেছিলেন, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তি হবেন। সেখানে ভর্তি হওয়ার আগে তিনি গেলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে ক্যাম্পাসে। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় আরেকজন চীনা ছাত্র লুক চিয়া ইউয়ানের সঙ্গে। ফিজিকস ডিপার্টমেন্ট ঘুরিয়ে দেখানোর সময় লুক চিয়া ইউয়ান চিয়েন-শিউংকে নিয়ে গেলেন প্রফেসর আর্নেস্ট লরেন্সের অফিসে। চিয়েন-শিউংয়ের সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা নিয়ে সামান্য কথাবার্তা বলেই লরেন্স তাঁর প্রতিভার পরিচয় পেলেন। কিন্তু যখন শুনলেন, চিয়েন-শিউং মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে ইচ্ছুক, বেশ অবাক হয়ে তিনি বললেন, মিশিগান তো এখনো ফিমেল স্টুডেন্ট ভর্তি করাচ্ছে না।

আর্নেস্ট লরেন্স
ছবি: লরেন্স বার্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি

চিয়েন-শিউং এ তথ্য জানতেন না। মিশিগানে যাওয়ার আর কোনো অর্থ হয় না। আর্নেস্ট লরেন্সের তত্ত্বাবধানেই পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হয়ে গেলেন চিয়েন-শিউং। আর্নেস্ট লরেন্সের ল্যাবে প্রফেসর এমিলিও সেগ্রের সঙ্গে গবেষণা করতে করতে নিউক্লিয়ার ফিশনে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছেন চিয়েন-শিউং। ১৯৪০ সালে তিনি পিএইচডি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ইউরেনিয়ামের ফিশন প্রোডাক্ট। তাঁর দক্ষতাই কাজে লেগে গিয়েছিল ম্যানহাটান প্রজেক্টে।

আরও পড়ুন
আর্নেস্ট লরেন্সের ল্যাবে প্রফেসর এমিলিও সেগ্রের সঙ্গে গবেষণা করতে করতে নিউক্লিয়ার ফিশনে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছেন চিয়েন-শিউং। ১৯৪০ সালে তিনি পিএইচডি অর্জন করেন।

পিএইচডি অর্জনের পর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে গবেষণার কাজে যোগ দিতে ইচ্ছুক ছিলেন চিয়েন-শিউং। কিন্তু তখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যাপনা বা স্থায়ী গবেষকের পদে মেয়েদের কিংবা এশিয়ান বা আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়োগ দিতে চাইত না। কিন্তু ১৯৪২ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময় পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রায় সবাই যুদ্ধের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যস্ত। পড়ানোর কাজে তখন আন্তর্জাতিক প্রতিভার কাউকে কাউকে নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়েছে। চিয়েন-শিউং চাকরি পেলেন মেয়েদের কলেজ—স্মিথ কলেজে। ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে ম্যাসাচুসেটসে যেতে হলো তাঁকে। তাতে বেশ সুবিধাই হলো। যুক্তরাষ্ট্রে এসে যে চীনা ছেলের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়েছিল, সেই লুক চিয়া ইউয়ানের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ১৯৩৭ সালে ক্যালটেক থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি প্রিন্সটনে চাকরি পেয়েছেন রাডার প্রকল্পে। ১৯৪২ সালে চিয়েন-শিউং বিয়ে করেন লুক চিয়া ইউয়ানকে।

১৯৪২ সালে চিয়েন-শিউং বিয়ে করেন লুক চিয়া ইউয়ানকে
ছবি: উইকিপিডিয়া

স্মিথ কলেজে পড়ানোর কাজে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না চিয়েন-শিউংয়ের। কিন্তু সেখানে গবেষণার তেমন কোনো সুবিধা ছিল না। তাই ১৯৪৩ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে একটি গবেষণা পদে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেতেই তিনি স্মিথ কলেজের চাকরি ছেড়ে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন। চিয়েন-শিউং ছিলেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী অধ্যাপক। তাঁর আগে আর কোনো নারীকে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়নি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়।

চিয়েন-শিউংয়ের প্রতিভার পরিচয় পেয়ে এনরিকো ফার্মি এবং রবার্ট ওপেনহেইমার তাঁকে ম্যানহাটান প্রজেক্টে সিনিয়র সায়েন্টিস্ট পদে নিয়োগ দেন ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রজেক্টে তিনি ইউরেনিয়াম আলাদা করার জন্য গ্যাস ডিফিউশন প্রসেস এবং নিউট্রনের মিথস্ক্রিয়া কাজ তদারক করেন। পাশাপাশি তিনি নিউক্লিয়ার বিকিরণ পরিমাপের জন্য উন্নত গাইগার কাউন্টার তৈরিতেও কাজ করেন।

আরও পড়ুন
চিয়েন-শিউংয়ের প্রতিভার পরিচয় পেয়ে এনরিকো ফার্মি এবং রবার্ট ওপেনহেইমার তাঁকে ম্যানহাটান প্রজেক্টে সিনিয়র সায়েন্টিস্ট পদে নিয়োগ দেন ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৬ সালে চিয়েন-শিউং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে। ১৯৫২ সালে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং ১৯৫৮ সালে ফুল প্রফেসর হন। এরপর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েই কাটে তাঁর পুরো কর্মজীবন।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী সুং-দাও লির সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল উর। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে লি ও আরেক চীনা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী চেন-নিং ইয়াং মৌলিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের একটি কাল্পনিক সূত্র—প্যারিটি সংরক্ষণ সূত্র (Law of Conservation of Parity) নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরীক্ষামূলক ফলাফল বিশ্লেষণ করে তাঁরা নিশ্চিত হন যে এই সূত্র বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় পারস্পরিক ক্রিয়া এবং শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

বাঁ থেকে চীনা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী সুং-দাও লি এবং চেন-নিং
ছবি: শেলবি হোয়াইট অ্যান্ড লিওন লেভি আর্কাইভস সেন্টার

কিন্তু দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে এটি কখনো পরীক্ষা করা হয়নি এবং তাঁদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দেখায় যে এ ক্ষেত্রে সূত্রটি সম্ভবত সত্য না–ও হতে পারে, অর্থাৎ প্যারিটির বিচ্যুতি ঘটতে পারে। কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত না হলে তাঁদের আবিষ্কার মূল্যহীন। লি ও ইয়াং কাগজে-কলমে একাধিক পরীক্ষার নকশা তৈরি করেন, যা ল্যাবরেটরিতে প্যারিটির সংরক্ষণ পরীক্ষা করতে পারে। এরপর লি পরীক্ষাটি বাস্তবায়নের জন্য যন্ত্রপাতি নির্বাচন, নির্মাণ, স্থাপন এবং পরীক্ষণ-পদ্ধতি নির্ধারণে প্রফেসর উর সহযোগিতা কামনা করেন।

আরও পড়ুন
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে লি ও আরেক চীনা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী চেন-নিং ইয়াং মৌলিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের একটি কাল্পনিক সূত্র—প্যারিটি সংরক্ষণ সূত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

উ একটি পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন, যেখানে তেজস্ক্রিয় কোবাল্ট-৬০-এর একটি নমুনা তরল গ্যাস ব্যবহার করে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় (ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রা) ঠান্ডা করা হয়। কোবাল্ট-৬০ আইসোটোপ বিটা কণার নির্গমনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা প্রয়োজন ছিল কোবাল্ট পরমাণুগুলোর তাপীয় কম্পন প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য। পাশাপাশি তিনি কোবাল্ট-৬০ নমুনার ওপর একটি নিরবচ্ছিন্ন চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করেন, যাতে পরমাণুর নিউক্লিয়াসগুলোর স্পিন একই দিকে সারিবদ্ধ হয়। এই ক্রায়োজেনিক পরীক্ষার জন্য তরল গ্যাস–সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ সুবিধা দরকার হয়, যা ছিল ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যান্ডার্ডসে (এনবিএস)। তাই তিনি তাঁর যন্ত্রপাতি নিয়ে মেরিল্যান্ডে অবস্থিত এনবিএসের সদর দপ্তরে গিয়ে পরীক্ষাটি সম্পন্ন করেন।

প্যারিটির সূত্র ভেঙে দেওয়া উ-র ঐতিহাসিক পরীক্ষার চিত্র
ছবি: দ্য ম্যাটিল্ডা প্রজেক্ট

লি ও ইয়াংয়ের তাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, যদি প্যারিটির সংরক্ষণ সূত্র সত্য না হয়, তবে কোবাল্ট-৬০ থেকে নির্গত বিটা কণাগুলো অসমমিতভাবে নির্গত হবে। উর পরীক্ষার ফলাফল দেখায় যে বাস্তবেই তা-ই ঘটে—দুর্বল নিউক্লিয়ার পারস্পরিক ক্রিয়ায় প্যারিটি সংরক্ষিত হয় না। পরবর্তী সময়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মীরাও ভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এই ফলাফল নিশ্চিত করেন। ফিজিক্যাল রিভিউ-এর একই সংখ্যায় দুটি গবেষণাপত্রের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারেও তা নিশ্চিত করা হয়। প্যারিটি ভঙ্গের এই আবিষ্কার হাই এনার্জি ফিজিকস এবং স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বিকাশে এক যুগান্তকারী অবদান রাখে। তাঁদের তাত্ত্বিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ লি ও ইয়াং ১৯৫৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

আরও পড়ুন
লি ও ইয়াংয়ের তাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, যদি প্যারিটির সংরক্ষণ সূত্র সত্য না হয়, তবে কোবাল্ট-৬০ থেকে নির্গত বিটা কণাগুলো অসমমিতভাবে নির্গত হবে।

কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে উ–কে নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হয়, অথচ উ-ই লি ও ইয়াংয়ের তত্ত্ব পরীক্ষাগারে প্রমাণ করেন। ২৩ বার মনোনয়ন পাওয়ার পরও চিয়েন-শিউং উ নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এটি নোবেল পুরস্কার কমিটির কলঙ্ক হিসেবে ইতিহাসে রয়ে গেছে। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সব শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও যাঁরা নোবেল বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের যোগ্য সম্মান দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৭৮ সাল থেকে চালু হয়েছে উল্‌ফ পুরস্কার। পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম উল্‌ফ পুরস্কার অর্জন করেছিলেন প্রফেসর উ।

এনরিকো ফার্মির বিটা-ক্ষয় তত্ত্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষণ প্রমাণ দেন প্রফেসর উ। তাঁর রচিত বিটা ডিকে বইকে এখনো নিউক্লিয়ার ফিজিকসের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য রেফারেন্স বই হিসেবে ধরা হয়।

এনরিকো ফার্মির বিটা-ক্ষয় তত্ত্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষণ প্রমাণ দেন প্রফেসর উ
ছবি: দ্য ম্যাটিল্ডা প্রজেক্ট

কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্টের বিখ্যাত আইনস্টাইন-পোডলস্কি-রোজেন (ইপিআর) গবেষণাপত্রের সূত্র ধরে বিপরীতমুখী দুটি ফোটনের কোয়ান্টাম পোলারাইজেশনের পারস্পরিক সম্পর্ক পরীক্ষামূলকভাবে নিশ্চিত করেন প্রফেসর উ। এটিই ছিল কোয়ান্টাম পূর্বাভাসের প্রথম পরীক্ষামূলক প্রমাণ।

পদার্থবিজ্ঞানের জগতে প্রফেসর উ ম্যাডাম উ নামে খ্যাতি লাভ করেছেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের ফেলোশিপ পেয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের প্রথম নারী ডিএসসি ডিগ্রি অর্জনকারী। ১৯৭৫ সালে তিনি আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির তিনিই ছিলেন প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। ওই বছরই তিনি অর্জন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স।

আরও পড়ুন
এনরিকো ফার্মির বিটা-ক্ষয় তত্ত্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষণ প্রমাণ দেন প্রফেসর উ। তাঁর রচিত বিটা ডিকে বইকে এখনো নিউক্লিয়ার ফিজিকসের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য রেফারেন্স বই হিসেবে ধরা হয়।

১৯৯৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চিয়েন-শিউং উর মৃত্যু হয়। আমৃত্যু তিনি একাডেমিক এবং অন্য সব প্রতিষ্ঠানে নারীদের সমান অধিকারের পক্ষে কাজ করে গেছেন।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগ তাঁর সম্মানে ‘ফরএভার ইউএসএ’ সিরিজের ডাকটিকেট চালু করে। মার্কিন ডাক বিভাগের ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র আটজন পদার্থবিজ্ঞানী এই সম্মান পেয়েছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন, এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যান, রবার্ট মিলিক্যান, জন বারডিন, মারিয়া গোয়েপার্ট মেয়ারদের সারিতে তাঁর নাম লেখা হলো আরও একবার।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, আরএমআইটি, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

সূত্র:১. ফিজিকস টুডে, ভলিউম ৭৭, সংখ্যা ১২, ডিসেম্বর ২০২৪।

২. রুথ হাউইজ, দ্যায়ার ডে ইন দ্য সান: ওম্যান অব দ্য ম্যানহাটান প্রজেক্ট, টেম্পল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ফিলাডেলফিয়া, ১৯৯৯।

৩. সাই-চিয়েন চিয়াং, ‘ম্যাডাম উ চিয়েন-শিউং: দ্য ফার্স্ট লেডি অব ফিজিকস’, ওয়ার্ল্ড সায়েন্টিফিক, ২০১৩।

৪. বায়োগ্রাফিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব সায়েন্টিস্ট, ওয়ার্ল্ড বুকস, শিকাগো ২০০৩

৫. আনা রেজার ও লেইলা ম্যাকনিল, ‘ফোর্সেস অব ন্যাচার দ্য ওম্যান হু চেইঞ্জড সায়েন্স’, ফ্রান্সিস লিংকন, লন্ডন, ২০২১।

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন