একজন খামখেয়ালি বিজ্ঞানী!
গোটা পৃথিবীর ওজন কত? নিউটনের মহাকর্ষ সমীকরণের গোলকধাঁধায় আটকে থাকা এই প্রশ্নের উত্তর একাকী অন্ধকার ঘরে বসে খুঁজে পান এক খামখেয়ালি বিজ্ঞানী। হেনরি ক্যাভেন্ডিশের সেই অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর পরীক্ষার কাহিনি।
মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি আমাদের একেবারে চোখের সামনে কিংবা বলা ভালো পায়ের নিচেই ছড়িয়ে আছে।
ধরুন, আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ হাত ফসকে আপনার সাধের স্মার্টফোনটা মাটিতে পড়ে গেল। মুহূর্তেই স্ক্রিন চৌচির! আপনার বুকটাও ফেটে চৌচির হওয়ার উপক্রম। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ফোনটা নিচেই–বা পড়ল কেন? ওটা তো শূন্যে ভাসতে ভাসতে আকাশে মিলিয়ে যেতে পারত। কিংবা সোজা ছুটে আসতে পারত আপনার নাক বরাবর! তা না হয়ে ওটা সোজা মাটিতেই আছড়ে পড়ল।
ঠিক একই রকম একটা প্রশ্ন নিয়ে আপনার অনেক আগেই আরেকজন ভেবেছিলেন। তিনি আইজ্যাক নিউটন। তবে তাঁর সময়ে স্মার্টফোন বলে কিছু ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন একটা আপেলের কথা। তাঁর মতো সেই আপেলও আজ বিখ্যাত।
ঘটনার শুরুটা হয়েছিল ১৬৬৫ সালে। ইংল্যান্ডে তখন প্লেগ মহামারির ভয়াবহ প্রকোপ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। সেখানকার তরুণ এক ছাত্র বাধ্য হয়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেলেন। কথিত আছে, একদিন নিজের বাড়ির বাগানে বসে ছিলেন। এমন সময় তিনি দেখলেন, গাছ থেকে একটি আপেল টুপ করে মাটিতে পড়ে গেল। অনেকেই হয়তো আপেলটা কুড়িয়ে খেয়ে ফেলত। কিন্তু এই তরুণের মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তিনি ভাবলেন, আপেলটা মাটিতেই পড়ল কেন? ওটা তো ওপরের দিকেও পড়তে পারত? এই তরুণের নাম আইজ্যাক নিউটন।
ঘটনার শুরুটা হয়েছিল ১৬৬৫ সালে। ইংল্যান্ডে তখন প্লেগ মহামারির ভয়াবহ প্রকোপ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। সেখানকার তরুণ এক ছাত্র বাধ্য হয়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেলেন।
আপেল পড়ার ওই ঘটনা থেকেই তাঁর মাথায় খেলল এক অসাধারণ আইডিয়া। অনেক চিন্তাভাবনা আর হিসাব কষার পর তিনি একদিন বুঝতে পারলেন, পৃথিবী আপেলটাকে নিজের দিকে টানছে। তিনি বললেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করছে। অর্থাৎ শুধু পৃথিবী আপেলকে টানছে না, আপেলও পৃথিবীকে টানছে। শুধু আপেল কেন, চাঁদকেও সে টানছে, আর চাঁদও পৃথিবীকে সমানতালে টানছে। নিউটন সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, মহাবিশ্বের ছোট-বড় সব বস্তুরই এই গুণ আছে। ভর থাকলেই সে অন্য ভরের বস্তুকে কাছে টানবে। বস্তুর ভর যত বেশি হবে, তার টান বা দাদাগিরিও তত জোরালো হবে।
আবার বস্তু দুটো যত দূরে সরে যাবে, তাদের মধ্যকার সেই টান তত দ্রুত কমতে থাকবে। এটাই মহাকর্ষের মূল কথা। এই টানের কারণেই আমরা মহাশূন্যে ভেসে না গিয়ে পৃথিবীর বুকে সুন্দর করে হেঁটে বেড়াই আর সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী লাটিমের মতো ঘুরতে থাকে।
এটাই ‘সর্বজনীন’ মহাকর্ষের মূল কথা—মহাবিশ্বের সবকিছুই এক অদৃশ্য সুতায় সবার সঙ্গে বাঁধা। নিউটন তাঁর এই যুগান্তকারী ধারণাকে একটা গাণিতিক সমীকরণে বেঁধে ফেললেন: F = G. (m1 . m2)/r2।
এখানে F হলো মহাকর্ষ বল, m1 আর m2 হলো দুটো বস্তুর ভর। r হলো তাদের মধ্যকার দূরত্ব। কিন্তু এই সমীকরণের সবচেয়ে রহস্যময় অংশটা হলো ওই G অক্ষরটি। একে বলা হয় সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক বা ইউনিভার্সাল গ্র্যাভিটেশনাল কনস্ট্যান্ট। বিজ্ঞানীরা একেই আদর করে ডাকেন ক্যাপিটাল G বা বিগ জি। সহজ কথায় এই জি হলো মহাবিশ্বের মহাকর্ষ শক্তির ভলিউম নব।
নিউটন সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, মহাবিশ্বের ছোট-বড় সব বস্তুরই এই গুণ আছে। ভর থাকলেই সে অন্য ভরের বস্তুকে কাছে টানবে। বস্তুর ভর যত বেশি হবে, তার টান বা দাদাগিরিও তত জোরালো হবে।
এই ধ্রুবকের মান আমাদের মহাবিশ্বের জন্য একদম নির্দিষ্ট। আধুনিক বিজ্ঞানীরা চুলচেরা হিসাব করে দেখেছেন, এই মানটা যদি একটু বেশি হতো, তাহলে মহাবিশ্বের সবকিছু একে অপরের সঙ্গে প্রবল বেগে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়ে যেত। আর যদি একটু কম হতো, তাহলে কোনো গ্রহ-নক্ষত্রই তৈরি হতো না। সবকিছু মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যেত।
সমস্যা হলো, নিউটন তাঁর সমীকরণটা আবিষ্কার করলেও এই জি-এর মান কত, তা বের করতে পারেননি। আর জি-এর মান না জানলে পৃথিবীর ভর বা ঘনত্ব মাপা অসম্ভব। তবে নিউটন অনুমান করেছিলেন যে পৃথিবীর ঘনত্ব সম্ভবত পানির চেয়ে ৫-৬ গুণ বেশি। কিন্তু প্রমাণ করবেন কীভাবে? এর জন্য দুটো জানা ভরের বস্তুর মধ্যকার মহাকর্ষ বল মাপতে হবে। কিন্তু মহাকর্ষ বল অবিশ্বাস্য রকম দুর্বল! বিশ্বাস হচ্ছে না?
ভেবে দেখুন তো, গোটা পৃথিবীর বিশাল ভর আপনাকে নিচের দিকে টেনে রেখেছে, কিন্তু আপনি চাইলেই একলাফে কিছুটা ওপরে উঠে সেই টানকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারেন। একটা ছোট্ট ফ্রিজ ম্যাগনেট গোটা পৃথিবীর মহাকর্ষকে হারিয়ে একটা লোহার টুকরাকে আটকে রাখতে পারে। তাই ল্যাবরেটরিতে দুটো ছোট বস্তুর মধ্যকার এই অতি ক্ষীণ মহাকর্ষ বল মাপাটা সে যুগে আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব মনে করা হতো। নিউটন নিজেও হতাশ হয়ে বলেছিলেন, আস্ত পর্বতও বোধ হয় পরিমাপযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।
জি-এর মান না জানলে পৃথিবীর ভর বা ঘনত্ব মাপা অসম্ভব। তবে নিউটন অনুমান করেছিলেন যে পৃথিবীর ঘনত্ব সম্ভবত পানির চেয়ে ৫-৬ গুণ বেশি।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন! ১৭৭০-এর দশকে রয়্যাল সোসাইটির বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, ল্যাবে যখন মাপা যাবে না, তখন কোনো বড় পাহাড় দিয়েই চেষ্টা করে দেখা যাক। ১৭৭৫ সালে নেভিল মাস্কেলিনের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী স্কটল্যান্ডের শিহালিয়ন নামের এক বিশাল পাহাড়ে চলে গেলেন। তাঁদের বুদ্ধিটা ছিল সোজা—পাহাড়ের পাশে একটা ওলন দড়ি ঝুলিয়ে দিলে পাহাড়ের মহাকর্ষীয় টানে দড়িটা সামান্য একটু পাহাড়ের দিকে হেলে যাবে। সেই হেলে থাকাটা মেপেই পৃথিবীর ঘনত্ব বের করা হবে।
প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে মাস্কেলিন তাঁর কাজ শেষ করলেন। পরীক্ষা সফল হওয়ার খুশিতে তিনি স্থানীয় স্কটিশ কৃষকদের জন্য এক বিশাল ভোজের আয়োজন করলেন। সেই ভোজে আস্ত এক পিপা হুইস্কি সাবাড় করা হলো। মাতাল কৃষকেরা আনন্দে নাচানাচি করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগিয়ে সেই কুঁড়েঘরটাই পুড়িয়ে ছাই করে দিল! সে এক এলাহি কাণ্ড।
যা–ই হোক, সেই পাহাড়-টানা পরীক্ষার ফল এল—পৃথিবীর ঘনত্ব পানির সাড়ে চার গুণ। কিন্তু সমস্যা হলো, পাহাড়ের ভেতরের পাথর আর মাটির ঘনত্ব নিয়ে অনেক অনুমান করতে হয়েছিল। তাই এই হিসাবটা ঠিক নিখুঁত ছিল না। ঠিক এখানেই গল্পে প্রবেশ করলেন বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত, খামখেয়ালি আর রহস্যময় এক চরিত্র—হেনরি ক্যাভেন্ডিশ।
হেনরি ক্যাভেন্ডিশের প্রথম জীবনীকার এবং রয়্যাল সোসাইটির বিজ্ঞানী জর্জ উইলসনের মতে, সহকর্মীরা বলাবলি করতেন যে ক্যাভেন্ডিশ তাঁর দাদাদের আমলের পোশাক পরে ঘোরেন!
২.
হেনরি ক্যাভেন্ডিশের জন্ম এক অভিজাত পরিবারে, ১৭৩১ সালের ১০ অক্টোবর। তাঁর বাবা লর্ড চার্লস ক্যাভেন্ডিশ ছিলেন ডেভনশায়ারের দ্বিতীয় ডিউকের তৃতীয় পুত্র। আর মা অ্যানি গ্রে ছিলেন কেন্টের ডিউক হেনরি গ্রের চতুর্থ কন্যা। হেনরি ক্যাভেন্ডিশের জন্মের সময় তাঁর মা-বাবা ছিলেন ফ্রান্সের নিস শহরে। জন্মসূত্রেই তিনি ছিলেন বিপুল ধনসম্পদের মালিক। সেটা তাঁর জন্য একদিক দিয়ে আশীর্বাদই ছিল। কারণ, এর ফলে জীবনধারণের জন্য তাঁকে কারোর তোয়াক্কা করতে হয়নি। তিনি নিজের মতো করে, নিজের খেয়ালে বিজ্ঞান গবেষণায় ডুবে থাকার সুযোগ পান। এই অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ নিয়েই তিনি এমন এক যুগান্তকারী পরীক্ষা করেন, যার নিখুঁত ফলাফল পরের এক শতাব্দী কেউ বিন্দুমাত্র উন্নত করতে পারেনি!
মানুষ হিসেবে ক্যাভেন্ডিশ কেমন ছিলেন, তা শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। তাঁর গলাটা ছিল অস্বাভাবিক রকমের সরু আর তীক্ষ্ণ। কথা বললে মনে হতো কেউ যেন চিকচিক করে উঠছে। ফ্যাশনজ্ঞান বলে তাঁর কিছু ছিল না। তিনি এমন সব অদ্ভুত পোশাক পরতেন, যা সেই যুগের চেয়ে অন্তত ৫০ বছর পুরোনো। মাথায় থাকত তিন কোনাবিশিষ্ট এক অদ্ভুত টুপি। তাঁর প্রথম জীবনীকার এবং রয়্যাল সোসাইটির বিজ্ঞানী জর্জ উইলসনের মতে, সহকর্মীরা বলাবলি করতেন যে ক্যাভেন্ডিশ তাঁর দাদাদের আমলের পোশাক পরে ঘোরেন!
মানুষ হিসেবে ক্যাভেন্ডিশ কেমন ছিলেন, তা শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। তাঁর গলাটা ছিল অস্বাভাবিক রকমের সরু আর তীক্ষ্ণ। কথা বললে মনে হতো কেউ যেন চিকচিক করে উঠছে।
ক্যাভেন্ডিশের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তাঁর মা মারা যান। বড় হয়ে তিনি নারীদের এতই ভয় পেতেন যে তাঁর বাড়ির নারী পরিচারিকাদের সঙ্গে যেন ভুল করেও দেখা না হয়, সে জন্য তিনি বাড়িতে আলাদা একটা পেছনের সিঁড়িই বানিয়ে ফেলেছিলেন! রাতের বেলা ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি পরের দিনের কাজের নির্দেশ আর খাবারের মেনু একটা কাগজে লিখে টেবিলে রেখে যেতেন, যাতে কাউকে মুখ ফুটে কিছু বলতে না হয়।
তিনি মানুষের সামনে পড়লেই বরফের মতো জমে যেতেন। রয়্যাল সোসাইটির কোনো মিটিংয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়াটা ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ। ঘোড়ার গাড়িতে উঠলে তিনি এক কোনায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকতেন। প্রতিদিন নিয়ম করে একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট রাস্তায় হাঁটতে বের হতেন তিনি। কিন্তু এলাকার মানুষ তাঁর এই রুটিন বুঝে ফেলল। সেই মতো এই ‘পাগলাটে’ লোকটাকে দেখার জন্য ভিড় করতে লাগল। ব্যাপারটা টের পেয়ে বাধ্য হয়ে হাঁটার সময় পাল্টে গভীর রাতে করে ফেললেন তিনি। অন্ধকারে একা একা হাঁটতে লাগলেন।
এই মানুষটাকে নিয়ে তাঁর পরিচিতরা এতই তটস্থ থাকতেন যে ক্যাভেন্ডিশের জীবনে মাত্র একটিই পোর্ট্রেট বা ছবি আঁকা সম্ভব হয়েছিল। আর সেটাও করতে হয়েছিল চরম গোপনীয়ভাবে। তাঁর পরিচিতরা জানতেন, ছবি আঁকার কথা বললে তিনি লজ্জায় কুঁকড়ে যাবেন। কখনোই রাজি হবেন না। তাই তাঁরা রয়্যাল সোসাইটির এক নৈশভোজে চুপি চুপি একজন চিত্রকরকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এলেন। চিত্রকরকে টেবিলের এক প্রান্তে এমনভাবে বসানো হলো, যেন সেখান থেকে ক্যাভেন্ডিশের মুখটা খুব ভালোভাবে দেখা যায়। এভাবেই লুকিয়ে আঁকা হয়েছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ছবিটি।
বড় হয়ে ক্যাভেন্ডিশ নারীদের এতই ভয় পেতেন যে তাঁর বাড়ির নারী পরিচারিকাদের সঙ্গে যেন ভুল করেও দেখা না হয়, সে জন্য তিনি বাড়িতে আলাদা একটা পেছনের সিঁড়িই বানিয়ে ফেলেছিলেন!
তাঁর জীবনে কোনো আবেগ ছিল না, প্রেম ছিল না, হাসি-কান্না ছিল না। তাঁর প্রথম জীবনীকার জর্জ উইলসন তাঁকে বর্ণনা করেছেন এভাবে: তাঁর মস্তিষ্কটা কেবলই একটা ক্যালকুলেটিং মেশিন, আর হৃদয়টা নেহাতই রক্ত চলাচলের একটা পাম্প!
কিন্তু এই চূড়ান্ত অসামাজিক মানুষটার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক অসামান্য বৈজ্ঞানিক সত্তা। মানুষের সঙ্গে তাঁর বনিবনা না হলেও যন্ত্রপাতি আর অঙ্কের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর প্রেম। তিনি তাঁর বিশাল বাড়ির একটা ছোট ঘর শুধু শোবার জন্য রেখেছিলেন। বাকি পুরো বাড়িকে বানিয়ে ফেলেছিলেন ল্যাবরেটরি। তাঁর নান্দনিকতা শিল্প বা সাহিত্যে ছিল না, সেটা ছিল নিখুঁত পরিমাপের মধ্যে। তিনি যেকোনো জিনিসের ত্রুটি খুঁজে বের করতে এবং তা দূর করতে পারতেন জাদুকরের মতো।
ইতিহাসবিদেরা অনেক সময় বলেন, একজন বিজ্ঞানীর চরিত্র তাঁর কাজের ধরনকে প্রভাবিত করে। ক্যাভেন্ডিশের বেলায় কথাটা যেমন সত্যি, এর উল্টোটাও তেমনি সত্যি। বিজ্ঞানও তাঁর চরিত্রকে আক্ষরিক অর্থেই বাঁচিয়ে রেখেছিল। এই যে পাগলের মতো রাত-দিন এক করে নিখুঁত মাপজোখের পেছনে তিনি পড়ে থাকতেন, এটাই আসলে তাঁকে মানসিকভাবে সুস্থ রেখেছিল। এই কাজগুলোই তাঁর যাবতীয় মনোযোগ ধরে রাখত।
ক্যাভেন্ডিশের প্রথম জীবনীকার জর্জ উইলসন তাঁকে বর্ণনা করেছেন এভাবে: তাঁর মস্তিষ্কটা কেবলই একটা ক্যালকুলেটিং মেশিন, আর হৃদয়টা নেহাতই রক্ত চলাচলের একটা পাম্প!
রয়্যাল সোসাইটিতে তাঁর এই কাজের জন্যই সবাই তাঁকে সমীহ করত আর ওইটুকু সামাজিক যোগাযোগই তাঁর জীবনে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল। ক্যাভেন্ডিশের আবিষ্কারগুলো ছিল রীতিমতো যুগান্তকারী। তবে মজার বা আক্ষেপের বিষয় হলো, তাঁর অনেক আবিষ্কারের কথাই সমসাময়িক মানুষ জানতে পারেনি। তিনি তাঁর আবিষ্কারগুলোকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করতেন। একে তো ছিলেন চরম ঘরকুনো, তার ওপর তিনি সব সময় ভাবতেন, ‘নাহ্, কাজটা এখনো নিখুঁত হয়নি, আরেকটু মাপজোখ করা দরকার।’
এই খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্য ৫০ বছরের বৈজ্ঞানিক জীবনে তিনি ২০টির কম প্রবন্ধ ছাপিয়েছিলেন। আর বই তো লেখেনইনি! তাতে কী হলো জানেন? বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ, রেজিস্ট্যান্স আর অ্যাম্পিয়ারের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে যে ‘ওহমের সূত্র’ আমরা পড়ি কিংবা দুটো বৈদ্যুতিক চার্জের মধ্যকার আকর্ষণ বল নিয়ে যে ‘কুলম্বের সূত্র’ পড়ি—এই দুটো সূত্রই সবার আগে ক্যাভেন্ডিশ আবিষ্কার করেছিলেন! কিন্তু তিনি সেগুলো ছাপাননি বলে তাঁর নামে সূত্রগুলোর নামকরণ হয়নি। কোনো এক চির-অসন্তুষ্ট শিল্পীর বাতিল করা মাস্টারপিসের মতো দশকের পর দশক ধরে ক্যাভেন্ডিশের খাতায় ধুলা খাচ্ছিল এসব যুগান্তকারী আবিষ্কার। অনেক বছর পর সেগুলো খুঁজে পেয়ে রীতিমতো হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা।
ক্যাভেন্ডিশের আবিষ্কারগুলো ছিল রীতিমতো যুগান্তকারী। তবে মজার বা আক্ষেপের বিষয় হলো, তাঁর অনেক আবিষ্কারের কথাই সমসাময়িক মানুষ জানতে পারেনি।
৩.
ক্যাভেন্ডিশের হাতে একদিন এসে পড়ল জন মিশেল নামের এক বিজ্ঞানীর তৈরি করা একটি অদ্ভুত যন্ত্র। মিশেল ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল ক্যাভেন্ডিশের। মিশেল চেয়েছিলেন ল্যাবে বসেই পৃথিবীর ভর মাপতে। কিন্তু যন্ত্রটা বানিয়ে পরীক্ষা শুরু করার আগেই তিনি মারা যান। যন্ত্রটার নাম টর্শন ব্যালান্স। বাংলায় বলা যায় মোচড় দাঁড়িপাল্লা।
ক্যাভেন্ডিশ যন্ত্রটা নেড়েচেড়ে দেখলেন। তাঁর মনে হলো, এটা দিয়ে কাজ হবে না। কারণ, এর নির্ভুলতা তাঁর মনমতো হয়নি। ব্যস, প্রায় ৬৭ বছর বয়সী ক্যাভেন্ডিশ এক অবিশ্বাস্য উদ্যমে পুরো যন্ত্রটা নতুন করে বানানোর কাজে লেগে পড়লেন।
যন্ত্রটার মূল কাঠামো ছিল বেশ সহজ। ৬ ফুট লম্বা একটা কাঠের দণ্ডের দুই প্রান্তে দুটো ছোট সিসার বল ঝোলানো। এই পুরো দণ্ডকে মাঝখান বরাবর একটা ৪০ ইঞ্চি লম্বা সরু তার দিয়ে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। অনেকটা দাঁড়িপাল্লার মতো। বাতাস থেকে বাঁচাতে দণ্ডটিকে চারপাশ থেকে কাঠ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো।
মিশেলের মূল পরিকল্পনা ছিল, এই দুই ইঞ্চি বলগুলোর ঠিক কাছেই আট ইঞ্চি মাপের আরও দুটো বড় বল এনে রাখা হবে। ধরা যাক, ছাদের ওপর থেকে নিচের দণ্ডটার দিকে তাকালে ছোট বল দুটোকে ঘড়ির কাঁটার ১২টা আর ৬টার পজিশনে দেখা যাচ্ছে। এখন যদি বড় বল দুটোকে বাইরে থেকে এনে ১টা আর ৭টার পজিশনে রাখা হয়, তাহলে মহাকর্ষের নিয়মে বড় বলগুলো ছোট বলগুলোকে নিজের দিকে টানবে।
মিশেল চেয়েছিলেন ল্যাবে বসেই পৃথিবীর ভর মাপতে। কিন্তু যন্ত্রটা বানিয়ে পরীক্ষা শুরু করার আগেই তিনি মারা যান। যন্ত্রটার নাম টর্শন ব্যালান্স। বাংলায় বলা যায় মোচড় দাঁড়িপাল্লা।
পুরো দণ্ডটা একটা নমনীয় তার দিয়ে ঝোলানো। তাই এই সূক্ষ্ম টানের ফলে দণ্ডটা সামান্য একটু ঘুরে যাবে। আর তাতে তারের মধ্যে একটা মোচড় বা প্যাঁচ খাবে। এই অতি সামান্য মোচড়ের পরিমাণ মাপতে পারলেই বল দুটোর মধ্যকার আকর্ষণ বল মাপা যাবে। আর এই বলের হিসাবের সঙ্গে পৃথিবীর আকর্ষণ বলের তুলনা করলেই পৃথিবীর ঘনত্ব বা ওজন বেরিয়ে আসবে!
শুনতে খুব সোজা মনে হলেও কাজটা ছিল রীতিমতো পাগলামি। আগেই বলেছি, মহাকর্ষ বল খুব দুর্বল। ক্যাভেন্ডিশ হিসাব করে দেখলেন, বড় বলগুলো ছোট বলগুলোকে যে বলে টানবে, তা ছোট বলগুলোর ওজনের পাঁচ কোটি ভাগের এক ভাগ! এই সামান্য টানে দণ্ডটা এতই সূক্ষ্মভাবে ঘুরবে যে একটা মশার পাখা ঝাপটানোর বাতাস বা ঘরের সামান্য তাপমাত্রাও এই পরীক্ষাকে সম্পূর্ণ পণ্ড করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এমনকি চৌম্বকক্ষেত্রের সূক্ষ্ম প্রভাব—যেকোনো কিছুই এই পরীক্ষাকে পণ্ড করে দিতে পারে। আবার আলো দেখার জন্য একটা সাধারণ বাতি জ্বালালেও তার তাপে বাতাস নড়ে উঠবে।
তাই মিশেলের যন্ত্রটাকে ক্যাভেন্ডিশ আক্ষরিক অর্থেই খোলনলচে বদলে ফেললেন। প্রথম যে কাজটা তিনি করলেন, তা হলো বলের সাইজ বড় করা। তিনি ৮ ইঞ্চির বদলে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের বিশাল দুটি সিসার গোলক আনলেন, যার প্রতিটির ওজন ছিল ৩৫০ পাউন্ড (প্রায় ১৫৮ কেজি)! কিন্তু বল বড় করলেই তো হবে না, বাইরের ডিস্টার্বেন্স আটকাতে হবে। এখানেই ক্যাভেন্ডিশের সেই খুঁতখুঁতে স্বভাবটা সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিল।
আগেই বলেছি, মহাকর্ষ বল খুব দুর্বল। ক্যাভেন্ডিশ হিসাব করে দেখলেন, বড় বলগুলো ছোট বলগুলোকে যে বলে টানবে, তা ছোট বলগুলোর ওজনের পাঁচ কোটি ভাগের এক ভাগ!
এখানেই ক্যাভেন্ডিশ প্রমাণ করলেন, কেন তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানী। তিনি বুঝতে পারলেন, যন্ত্রের কাছে কোনো মানুষের থাকা চলবে না। তাই তিনি পুরো যন্ত্রটাকে তাঁর বাগানের একটা ছোট ঘরে ঢুকিয়ে ঘরটা পুরোপুরি সিল করে দিলেন। বড় বলগুলোকে বাইরে থেকে পুলি বা কপিকলের সাহায্যে ঘোরানোর ব্যবস্থা করলেন। দণ্ডটা কতটুকু ঘুরছে, তা মাপার জন্য লাগালেন কাঠের বাক্সের গায়ে ভার্নিয়ার স্কেলযুক্ত নির্দেশক। আর ঘরের বাইরে দেয়ালের ফুটো দিয়ে টেলিস্কোপ লাগিয়ে দিলেন, যাতে দূর থেকে অন্ধকারে সেই নির্দেশকের রিডিং নেওয়া যায়! আলোর জন্য ছোট একটা বাতি আর লেন্স ব্যবহার করলেন। সেটা কেবল স্কেলের ওপরই আলো ফেলবে, ঘরের তাপমাত্রায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
ক্যাভেন্ডিশ শুধু বাতাস বা তাপমাত্রার কথাই ভাবেননি, সেই সঙ্গে ভেবেছিলেন, বলগুলোকে ঝোলানোর লোহার রডগুলোর কারণে কোনো চৌম্বকীয় আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে না তো? এই সন্দেহ থেকে তিনি লোহার বদলে তামার রড লাগিয়ে পরীক্ষা করলেন। তিনি দেখলেন, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে সিসার বলগুলো সামান্য চুম্বক হয়ে যাচ্ছে কি না। এমনকি কাঠের বাক্সের মহাকর্ষীয় টান কতটুকু হতে পারে, সেটাও তিনি হিসাব করে বাদ দিলেন। এভাবে তিনি যেন ত্রুটি খুঁজে বের করার এক মেশিনে পরিণত হয়েছিলেন।
পরীক্ষা করার সময় তিনি বাইরে থেকে পুলি টেনে বড় বল দুটোকে বাক্সের কাছে আনতেন। এরপর মহাকর্ষের সেই অতি ক্ষীণ টানে দণ্ডটা যখন কাঁপতে কাঁপতে এদিক-ওদিক দুলতে শুরু করত, ক্যাভেন্ডিশ তখন টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে টানা আড়াই ঘণ্টা ধরে মূর্তির মতো বসে থেকে সেই দোলন পর্যবেক্ষণ করতেন!
ক্যাভেন্ডিশ দেখলেন, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে সিসার বলগুলো সামান্য চুম্বক হয়ে যাচ্ছে কি না। এমনকি কাঠের বাক্সের মহাকর্ষীয় টান কতটুকু হতে পারে, সেটাও তিনি হিসাব করে বাদ দিলেন।
১৭৯৭ সাল থেকে শুরু করে মাসের পর মাস অন্ধকারের মধ্যে এই একঘেয়ে পরীক্ষাটি চালিয়ে গেলেন তিনি। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। হিসাব-নিকাশ কষে, নিজের আবিষ্কৃত সব ভুলত্রুটি বাদ দিয়ে একটা নিখুঁত মান পেলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, পৃথিবীর ঘনত্ব পানির ঘনত্বের ৫.৪৮ গুণ!
তাঁর এই হিসাবটা কতটা নিখুঁত ছিল, জানেন? বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর যে ঘনত্ব বের করেছেন ৫.৫১, তার সঙ্গে ক্যাভেন্ডিশের হিসাবের পার্থক্য ১ শতাংশের কম! ১৭৯৮ সালে বসে একটা কাঠের বাক্সে সিসার বল ঝুলিয়ে একজন মানুষ গোটা পৃথিবীর ওজন এত নিখুঁতভাবে মেপে ফেলেছিলেন। ওই বছরই রয়্যাল সোসাইটিতে তার ফলাফল জমা দিলেন। তাঁর ৫৫ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রটি এতই নিখুঁতভাবে লেখা ছিল যে সেখানে শুধু ত্রুটিগুলো কীভাবে দূর করা হয়েছে, তার বর্ণনাই ছিল অর্ধেকের বেশি।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে দারুণ বাঁকটা এল ক্যাভেন্ডিশের মৃত্যুর অনেক পরে। ক্যাভেন্ডিশ মূলত পৃথিবীর ঘনত্বই মাপতে চেয়েছিলেন, তাঁর গবেষণাপত্রে কোথাও মহাকর্ষীয় ধ্রুবক জি-এর কথা বলা ছিল না। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী পর আধুনিক বিজ্ঞানীরা যখন নিউটনের সূত্রকে তার বর্তমান রূপ F = G. m1.m2/r2 দিচ্ছিলেন, তখন তাঁরা চমকে উঠে দেখলেন যে ক্যাভেন্ডিশ আসলে নিজের অজান্তেই একটা দারুণ কাজ করে গেছেন।
বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর যে ঘনত্ব বের করেছেন ৫.৫১, তার সঙ্গে ক্যাভেন্ডিশের হিসাবের পার্থক্য ১ শতাংশের কম!
বিজ্ঞানীরা দেখলেন, ক্যাভেন্ডিশের ল্যাবরেটরির ওই ছোট আর বড় সিসার বলের ভর তাঁদের জানা। বলগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্বও জানা। বলগুলোর মধ্যকার আকর্ষণ বল (যেটা ওই তারের মোচড় থেকে পাওয়া গেছে), সেটাও ক্যাভেন্ডিশ নিখুঁতভাবে মেপে রেখে গেছেন। অর্থাৎ নিউটনের মহাকর্ষ সমীকরণের G ছাড়া বাকি সব মানই ক্যাভেন্ডিশের পরীক্ষায় উপস্থিত! বিজ্ঞানীরা ক্যাভেন্ডিশের ডেটা ব্যবহার করে খুব সহজেই মহাবিশ্বের সেই পরম কাঙ্ক্ষিত ‘ভলিউম নব’ বা সর্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক জি-এর মান বের করে ফেললেন। আধুনিক বিজ্ঞানে এর মান হলো ৬.৬৭৪ ×১০-১১ মি৩ কেজি-১ সে-২।
পরে ক্যাভেন্ডিশের এই পরীক্ষাকে আর পৃথিবীর ঘনত্ব মাপার পরীক্ষা বলা হতো না; বরং একে বলা হতো মহাকর্ষীয় ধ্রুবক জি মাপার পরীক্ষা। ১৮৯২ সালে এক বিজ্ঞানী তো মজা করে বলেই ফেলেছিলেন, ‘যেখানে এই ধ্রুবকটা পুরো মহাবিশ্বের চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করছে, সেখানে এই পরীক্ষাকে শুধু পৃথিবীর ওজন মাপার পরীক্ষা বলাটা তো রীতিমতো অপমানজনক!’
আজকের দিনে মহাকাশযানগুলো যে নিখুঁত হিসাবে মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করছে, স্যাটেলাইটগুলো আমাদের মাথার ওপর ঘুরছে কিংবা বিগ ব্যাংয়ের পর ছায়াপথগুলো কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তার যেসব হিসাব-নিকাশ হচ্ছে—এই সবকিছুর মূলেই রয়েছে ওই জি-এর মান। আর এই মানটি জানা সম্ভব হয়েছিল হেনরি ক্যাভেন্ডিশ নামের সেই অদ্ভুত মানুষটার জন্য।
