আমি এক মহাবিশ্ব, যে কথা বলে
শুক্রবারের অলস বিকেল। গবেষণাগারের নিস্তব্ধতায় উল্টানো অণুবীক্ষণযন্ত্রে চোখ রেখে তাকিয়ে আছি এক ডিশভর্তি HEK 293 কোষের দিকে। আজ ওদের দেখে একটু খটকা লাগছে। সেই খটকার কথা পরে বলছি; আগে বলি, এই কোষগুলো আসলে কারা।
আণবিক জীববিজ্ঞানে ‘অমর কোষসারি’ বলে একটা ধারণা আছে। আমরা বড় হই আমাদের কোষের বিভাজনের মধ্য দিয়ে—একটি কোষ ভাগ হয়ে হয় দুটি, দুটি থেকে চারটি। কিন্তু সবকিছু দ্বিগুণ হলেও আমাদের ক্রোমোজোমের প্রান্তে টেলোমিয়ার নামে একটি অংশ আছে, যা দ্বিগুণ হতে পারে না। তাই প্রতিটি বিভাজনে সে একটু একটু করে ছোট হয়। আমরা যত বড় হই, সে তত ছোট হতে থাকে। ছোট হতে হতে যখন আর কিছু বাকি থাকে না, কোষ তখন আর বিভাজিত হয় না। কোষগুলো মারা যায়। আমরাও মারা যাই।
আমাদের নানা অঙ্গের কোষ নানা কাজ করতে পারে। তাই জীববিজ্ঞানীরা বহু আগে থেকেই এই কোষগুলোকে দেহ থেকে আলাদা করে গবেষণাগারে আবাদ করার চেষ্টা করছেন, ভালোভাবে বোঝার জন্য। কিন্তু আলাদা করে আবাদ করতে গেলেই বিভাজনের পর বিভাজনে টেলোমিয়ার ক্ষয়ে গিয়ে কোষগুলো দ্রুত মারা যায়। কোনোভাবে যদি এই টেলোমিয়ারের ক্ষয় থামানো যেত, তবে এই কোষের ওপর আমরা বছরের পর বছর পরীক্ষা চালাতে পারতাম। শুধু পুষ্টি ও বেঁচে থাকার পরিবেশটুকু দেব, ওরা বিভাজিত হতে থাকবে, আমরা ওদের পর্যবেক্ষণ করব—বুঝব নিজেদের দেহকে, জানব নানা অসুখের স্বরূপ।
১৯৭৩ সাল। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন গবেষণাগারে ফ্রাঙ্ক গ্রাহাম নামে এক তরুণ গবেষক মানুষের কিডনির কোষ আবাদ করার চেষ্টায় মগ্ন। তিনি মানুষের কিডনিকে বুঝতে চান। কোষের উৎস ছিল একটি অজ্ঞাতনামা গর্ভস্থ ভ্রূণ—গর্ভপাত নাকি স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভস্রাব, আজও কেউ নিশ্চিত নয়; কে ছিল সেই শিশু, তা-ও কেউ জানে না। পৃথিবীর আলো যে কোনো দিন দেখেনি, কেউ যার নাম রাখেনি।
১৯৭৩ সাল। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন গবেষণাগারে ফ্রাঙ্ক গ্রাহাম নামে এক তরুণ গবেষক মানুষের কিডনির কোষ আবাদ করার চেষ্টায় মগ্ন। তিনি মানুষের কিডনিকে বুঝতে চান।
গ্রাহাম তাঁর প্রতিটি পরীক্ষা ক্রমিক নম্বরে সাজিয়ে রাখতেন। সেই নামহীন শিশুটির কিডনি কোষে তিনি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন অ্যাডিনোভাইরাসের ডিএনএর টুকরো। এই ভাইরাল ডিএনএ কোষের ভেতরকার থেমে যাওয়ার সংকেতগুলোকে অকেজো করে দেয়—যে প্রহরী প্রোটিনগুলো (যেমন Rb আর p53) কোষকে বলে, ‘আর বিভাজিত হয়ো না, এবার বিশ্রাম নাও’, সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।
এই পরীক্ষাটি ছিল গ্রাহামের সেই ক্রমিক তালিকার ২৯৩তম। বেশিরভাগ চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল, কোষগুলো মরে গিয়েছিল। কিন্তু একঝাঁক কোষ একটি মরণাপন্ন সংকটকাল পেরিয়ে টিকে গেল। আর টিকে যাওয়া সেই কোষগুলো নিজেরাই চালু করে ফেলল টেলোমিয়ার-মেরামতকারী এনজাইম টেলোমারেজ। ফলে তাদের টেলোমিয়ার আর ক্ষয়ে গেল না।
কোষগুলো মরল না। তারা বিভাজিত হতে শুরু করল। হতেই থাকল, হতেই থাকল। তারা হয়ে গেল অমর। জন্ম নিল ইতিহাসের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত কৃত্রিম ও মানব-কোষসারি—HEK 293। হিউম্যান এমব্রায়োনিক কিডনি, ক্রমিক তালিকার ২৯৩তম পরীক্ষা থেকে উঠে আসা কোষ।
আজও তারা অমর। পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও পৃথিবীর মুখ না-দেখা সেই শিশুটির কোষ আমার ডিশে বেঁচে আছে। আমি তার মধ্যে নানা ডিএনএ অনুক্রম ঢুকিয়ে মানুষের প্রদাহজনিত রোগ বোঝার চেষ্টা করছি। কিন্তু আজ কেন যেন অণুবীক্ষণে ওদের রুগ্ন দেখাচ্ছে। ঠিকমতো বাড়ছে না। কেন? ভুলটা আমারই। আবাদ করতে গিয়ে ওদের আমি বড় বেশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসিয়ে ফেলেছি—একটি আনাড়ি ভুল। তাই ওরা একে অপরের থেকে অনেক দূরে। পুষ্টিভরা উষ্ণ একটি দ্রবণে যথেষ্ট খাবার ও তাপমাত্রা নিয়ে ওরা বেঁচে আছে ঠিকই—কিন্তু ওরা একা। বড় একা। সে কারণেই ওরা বিভাজিত হচ্ছে না।
কোষগুলো মরল না। তারা বিভাজিত হতে শুরু করল। হতেই থাকল, হতেই থাকল। তারা হয়ে গেল অমর। জন্ম নিল ইতিহাসের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত কৃত্রিম ও মানব-কোষসারি—HEK 293।
আমি কোনো কাব্যিক রূপক বানাচ্ছি না; এটাই আসল কৌশল। জীববিজ্ঞানের কঠিন সত্য হলো, একা থাকলে একটি কোষ বাঁচে না। কোষের বিভাজনকে চালু করে দেয় তার আশপাশের কোষের পাঠানো সংকেত। জীববিজ্ঞানীরা একে বলেন প্যারাক্রাইন সংকেত। প্রতিটি কোষ বিভাজিত হওয়ার সময় চারপাশে ছোট ছোট অণু ছড়িয়ে সংকেত পাঠায়—‘পরিবেশটা নিরাপদ মনে হচ্ছে। ভয় নেই। আমরা আছি। তুমি বিভাজিত হতে পারো।’ কোনো কোষ যখন চারপাশ থেকে আর কোনো সংকেত পায় না, তখন সে আর বিভাজিত হয় না।
খাবারের অভাব নেই, ইনকিউবেটরের ৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রাও ঠিক আছে। তবু ওরা গুটিয়ে যায়, পাত্রের তল থেকে খসে পড়ে, মারা যায়। আক্ষরিক অর্থেই একাকিত্বে মৃত্যু।
গবেষণাগারে আমরা এদের বাঁচাই কন্ডিশনড মিডিয়া দিয়ে। অন্য কোনো সুস্থ, ভরাট কলোনি থেকে সেখানকার আবাদ-দ্রবণটুকু এনে এই একা কোষগুলোর মধ্যে ঢেলে দিই। সেই দ্রবণে মিশে থাকে সঙ্গীদের স্মৃতি—সেই সংকেত-অণুগুলো। একা কোষগুলোকে আমরা আসলে ভিড়ের একটি রাসায়নিক আশ্বাস দিই। আর তাতেই কাজ হয়। ওরা প্লাস্টিকের ওপর ছড়িয়ে পড়ে, আবার নিজেদের নকল করতে শুরু করে।
অমরত্বের ক্ষমতা রাখা একটি কোষকে কেবল একাকিত্বের কারণে চোখের সামনে মরে যেতে দেখে আমাকে কেমন এক বোধোদয় স্পর্শ করে যায়। বেঁচে থাকার জন্য শুধু খাবারেই হয় না, ‘আমি একা নই’—এই আশ্বাসটুকুও লাগে; জীববিজ্ঞানের কত গভীর স্তরের এক সত্য এটি। আমি অবাক হয়ে যাই।
খাবারের অভাব নেই, ইনকিউবেটরের ৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রাও ঠিক আছে। তবু ওরা গুটিয়ে যায়, পাত্রের তল থেকে খসে পড়ে, মারা যায়। আক্ষরিক অর্থেই একাকিত্বে মৃত্যু।
আর ভাবি, এরাও তো একটি জনপদের মতো—একে অপরের নিরাপত্তার জন্য যোগাযোগ করছে। মানুষের কিডনিতে থাকার সময়েই বহিরাগত বিপদের মুখে দ্রুত সাড়া দেওয়ার তাগিদে এই প্যারাক্রাইন সংকেতের বিবর্তন হয়েছিল। কারণ, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কের নির্দেশের জন্য বসে থাকা মানে অনেক দেরি হয়ে যাওয়া। কিডনির ছাঁকনির কাজটা এত দ্রুত ও এত সূক্ষ্ম যে প্রতিটি অণু-মুহূর্তের বিপদে মস্তিষ্কের অনুমতির অপেক্ষায় থাকলে চলে না। তাই তারা শিখেছিল স্থানীয় গণতন্ত্র। কোনো একটি কোষ যখন বিপদ টের পায়—লবণের ঘনত্ব বেড়ে যায়, কিংবা চাপ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে—সে একা আতঙ্কিত হয় না; পাশের কোষকে ফিসফিস করে বলে, ‘সংকুচিত হও, এখনই।’
এভাবেই একদল বিশৃঙ্খল কোষ একটি সুশৃঙ্খল সভ্যতায় পরিণত হয়েছিল। তারা বুঝে নিয়েছিল, দিন শেষে টিকে থাকা ‘আমি’র ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে ‘আমরা’র ওপর। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই তারা শিখেছিল—একা নই, আমরা সবাই একসঙ্গে আছি।
অণুবীক্ষণ থেকে চোখ সরাই। নিজের হাতের দিকে তাকাই, যে হাতটা পিপেট ধরে আছে। পাঁচটা আঙুল। নীল শিরা। চামড়ার নিচে নড়ছে টেন্ডন। হঠাৎ মনে হয়—এই হাতের ভেতরেই তো আছে একই রকম লক্ষকোটি কোষ। একই রকম সভ্যতা।
কয়েক ট্রিলিয়ন কোষ একমত হয়েছে এই একটিমাত্র হাত বানাতে। এদের প্রত্যেকেরই হয়তো নিজস্ব একটি আলাদা জীবন হতে পারত কোনো আবাদ-দ্রবণে, কিন্তু হয়নি। কেউ হয়েছে হাড়ের গাঁট, কেউ নখের নিচের চামড়া, কেউ রক্তনালির দেয়াল। ওরা নিজেদের এমন নিখুঁতভাবে সাজিয়েছে যে আমি ভুলেই গেছি ওরা ওখানে আছে।
কোনো একটি কোষ যখন বিপদ টের পায়—লবণের ঘনত্ব বেড়ে যায়, কিংবা চাপ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে—সে একা আতঙ্কিত হয় না; পাশের কোষকে ফিসফিস করে বলে, সংকুচিত হও, এখনই।
আমি নিজেকে ‘আমি’ বলি, যেন আমি কেবল একটিমাত্র সত্তা। আসলে আমি অজস্র সভ্যতার মিলেমিশে গড়ে ওঠা একটা গোটা মহাবিশ্ব। দেয়ার আর মোর সেলস ইন দ্য হিউম্যান বডি দ্যান দেয়ার আর স্টারস ইন দ্য মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। আই অ্যাম আ ইউনিভার্স হু টকস।
আর মহাবিশ্বের মতোই এখানে আছে অসংখ্য তন্ত্র।
এর একটি সৈন্যবাহিনী আছে। এই মুহূর্তে আমার সাইনাসের অন্ধকারে শ্বেত রক্তকণিকারা পদাতিক সৈনিকের মতো যুদ্ধ করে যাচ্ছে। কোনো ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করলে এরা দরকষাকষি করে না—শত্রুকে গিলে ফেলে, তারপর নিজেদের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেরাই মরে যায়। আমি যাতে নিশ্চিন্তে শ্বাস নিতে পারি, তার জন্য প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার নিউট্রোফিল আত্মাহুতি দিচ্ছে। আমি টেরও পাচ্ছি না। নোবডি ইজ গ্রেভিং দেম, এভার।
এর একটি সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ-শৃঙ্খল আছে। আমার ২৫ ট্রিলিয়ন লাল রক্তকণিকা। পৃথিবীর যেকোনো পরিবহন কোম্পানির চেয়ে এরা দক্ষ। জন্মের সময়েই এরা এক অকল্পনীয় আত্মত্যাগ করেছে—নিজেদের নিউক্লিয়াস, অর্থাৎ নিজেদের মস্তিষ্ক, নিজেদের ডিএনএ, দেহ থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে। কেন? হিমোগ্লোবিনকে জায়গা করে দিতে। দেহের প্রতিটি কোণে একটুকু বেশি অক্সিজেন বয়ে নিতে। পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ মালবাহী গাড়ি, যে আরও বেশি মাল বইতে পারবে বলে নিজের শরীরের অংশটুকুই ফেলে দিয়েছে।
এর একটি সরকার আছে। আমার মস্তিষ্ক। প্রায় ৮ হাজার ৬০০ কোটি নিউরন একসঙ্গে বোনা এক জাল। এই মুহূর্তে সেই জাল মেরুদণ্ড বেয়ে ঘণ্টায় কয়েক শ কিলোমিটার বেগে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাচ্ছে—মেরুরজ্জু দিয়ে জারি করছে বৈদ্যুতিক ফরমান। আমার শিরদাঁড়া সোজা রাখছে, চোখের তারা ছোট-বড় করে অণুবীক্ষণের ক্ষীণ আলোয় আমার দৃষ্টি মানিয়ে নিচ্ছে, আমার অজান্তেই ফুসফুসকে শ্বাস নেওয়াচ্ছে এক অবিচ্ছিন্ন ছন্দে।
কোনো ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করলে শ্বেত রক্তকণিকারা দরকষাকষি করে না—শত্রুকে গিলে ফেলে, তারপর নিজেদের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেরাই মরে যায়।
এর একটি সম্প্রচারব্যবস্থা আছে। হরমোন। মস্তিষ্ক যখন সবাইকে একসঙ্গে কোনো জরুরি বার্তা দিতে চায়, তখন সে আলাদা করে ট্রিলিয়নটা কোষকে ডাকে না—একটি গণবিজ্ঞপ্তি পাঠায়। যেমন অ্যাড্রেনালিন। ধরুন, আপনি হঠাৎ ভয় পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক রক্তে ছেড়ে দিল একটি জরুরি সতর্কবার্তা। চোখের পলকে সেই রাসায়নিক বার্তা পৌঁছে গেল প্রতিটি কোণে—‘লড়ো, নয়তো পালাও!’ হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল, পেশি প্রস্তুত হলো, পরিপাক থেমে গেল। সবাই একসঙ্গে তৈরি।
এর একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আছে। যকৃৎ ও কিডনি। দিনরাত এরা রক্ত ছেঁকে চলেছে, বিপাকীয় আবর্জনা ও বিষ বের করে দিচ্ছে। পৃথিবীর কোনো পৌর কর্তৃপক্ষ এত নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে না। এরা এক দিনের জন্য ধর্মঘটে গেলে পুরো শরীর বিষিয়ে অচল হয়ে পড়বে, অথচ এদের কথা আমরা মনেও রাখি না।
৩০ ট্রিলিয়ন কোষ। সৈন্যবাহিনী, সরবরাহ-শৃঙ্খল, সরকার, সম্প্রচার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে যেন একটা গোটা পৃথিবী। আমার মনে হয়, মানুষ পৃথিবীতে যা কিছু বানিয়েছে—প্রতিটি গাড়ি, প্রতিটি আকাশছোঁয়া ইমারত, প্রতিটি প্রশাসন—সবই আমাদের ভেতরে ইতিমধ্যেই যা ঘটছে, তার এক শিশুসুলভ অনুকরণ মাত্র। দেহের নানা কোষ মিলে যেভাবে গড়ে ওঠে টিস্যু, আর টিস্যু মিলে অঙ্গ—সেভাবেই আমরা মানুষ মিলে গড়ি সমাজ, সমাজ মিলে দেশ। প্রতিটি কোষের আলাদা কাজের মতো আমরা নিজেদের ভাগ করে নিই নানা পেশায়, নানা ভূমিকায়। শ্বেত রক্তকণিকার মতোই আমরা অচেনা কিছুকে ভয় পাই। তথ্য আদান-প্রদানের জন্য আমরা গোটা পৃথিবীজুড়ে বর্তনী বানাই—যা আমাদের নিউরনের বর্তনীর কাছে নেহাতই তুচ্ছ। আমাদের পণ্যবহর, আমাদের নর্দমার জাল, আমাদের গণমাধ্যম—সবকিছুই যেন এই শরীরেরই অনুরূপ। আণুবীক্ষণিক স্কেলে আমাদের শরীরের ভেতরে যা ঘটছে, স্থূল স্কেলে আমরা যেন তারই এক অন্ধ পুনরাবৃত্তি করে চলেছি। কেউ কি কখনো নিজের প্রতিচ্ছবির চেয়ে বেশি কিছু বানাতে পারে?
কন্ডিশনড মিডিয়া বানাতে বানাতে এই উপমাটা মাথায় আরও বাড়িয়ে নিতে থাকি। কোষদের মধ্যেও কিন্তু স্তরবিন্যাস আছে। ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ সমান নয়। ১৮৮৫ সালের দিকে আউগুস্ট ভাইসমান নামের এক জার্মান জীববিজ্ঞানী এই স্তরবিন্যাসের কথা বলেছিলেন, যা জীববিজ্ঞানীরা আজও মানেন। তিনি কোষদের দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন—জননকোষ-ধারা ও দেহকোষ।
যকৃৎ ও কিডনি। দিনরাত এরা রক্ত ছেঁকে চলেছে, বিপাকীয় আবর্জনা ও বিষ বের করে দিচ্ছে। পৃথিবীর কোনো পৌর কর্তৃপক্ষ এত নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে না।
জননকোষ-ধারা একেবারে আলাদা। এরা শুক্রাণু আর ডিম্বাণু—জননকোষ। এদের টেলোমিয়ার ছোট হয় না। এরাই সেই কোষ, যারা অন্য কারও কোষের সঙ্গে মিলিত হয়ে নতুন একটি জীবনে ঢুকে পড়তে পারে। শরীরের একমাত্র অংশ, পরবর্তী প্রজন্মে যাওয়ার টিকিট যাদের হাতে। আপনার শুক্রাণু বা ডিম্বাণুই কেবল পরের প্রজন্মে যেতে পারবে—অর্ধেক ক্রোমোজোম সঙ্গে নিয়ে—আর যাপন করবে আরেকটা জীবন, নতুন গোটা টেলোমিয়ার নিয়ে; যে জীবন সে যাপন করে আসছে প্রায় ৪০০ কোটি বছর ধরে। জীবের পর জীব তাকে বয়ে নিয়ে চলেছে, পার করে দিচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে। জননকোষ-ধারাই গোটা পৃথিবীর আদি অমর কোষসারি।
আর দেহকোষ? দেহকোষ হলো বাকি সবকিছু। আমার মস্তিষ্ক, আমার হৃৎপিণ্ড, আমার চোখ, পিপেট-ধরা এই হাত, আমার গোটা শরীর।
এই দেহকোষ এক অলিখিত চুক্তিতে সই করেছে—জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে নিঃস্বার্থ চুক্তি। তুমি কাজ করবে। তুমি বুড়ো হবে। তোমার ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তের টেলোমিয়ার ছোট হতে থাকবে। তুমি জীর্ণ হবে। সময় হলে মরে যাবে। তোমার কোনো বংশধর থাকবে না। তুমি কখনো অন্য কোষের সঙ্গে মিলে নতুন প্রাণ গড়বে না। তোমার গোটা অস্তিত্ব—তোমার জন্ম, জীবন, মৃত্যু—সবই জননকোষ-ধারার সেবায়। সেই বীজের সেবায়। শরীরের সেই একমাত্র অংশের সেবায়, যে কোনো অর্থপূর্ণ অর্থে অমর।
আমার হৃৎপিণ্ড নিজের জন্য স্পন্দিত হয় না। সে স্পন্দিত হয় যাতে জননকোষগুলো উষ্ণ আর পুষ্ট থাকে। আমার রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়ে আমার চিন্তা বা স্মৃতি বা ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে নয়—লড়ে যাতে জননকোষ-ধারা যথেষ্ট দিন বেঁচে থেকে পরের প্রজন্মে পৌঁছাতে পারে। আমার মস্তিষ্ক—এই অপূর্ব অঙ্গ, যার ভেতরের বৈদ্যুতিক সংকেতের খেলায় এই লেখাটা তৈরি হচ্ছে—তার মূল উদ্দেশ্যও সেই জননকোষ-ধারাকে সম্ভাব্য সেরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া।
এই দেহকোষ এক অলিখিত চুক্তিতে সই করেছে—জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে নিঃস্বার্থ চুক্তি। তুমি কাজ করবে। তুমি বুড়ো হবে। তোমার ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তের টেলোমিয়ার ছোট হতে থাকবে।
জননকোষ-ধারা যেন একটি নদী—অবিচ্ছিন্ন, ধারাবাহিক; ৪০০ কোটি বছর আগে যে প্রথম কোষ বিভাজিত হয়েছিল, সেখান থেকে শেষ যে শিশু কোনো দিন জন্মাবে, তার দিকে বয়ে চলা। দেহকোষ সেই নদীর বুকে ভাসা একের পর এক নৌকা। প্রতিটি নৌকা জটিল। অনন্য। প্রতিটি নদীকে আরেকটু এগিয়ে দেয়। আর প্রতিটি নৌকাই শেষ পর্যন্ত—ডুবে যায়।
কন্ডিশনড মিডিয়া দেওয়ার পর HEK কোষগুলোকে একটু সতেজ মনে হচ্ছে। ওদের দেখতে দেখতে মনে হয়—আমরা প্রতিটি মানুষও কি আসলে দেহকোষগুলোর মতোই নই? আমরাও মারা যাই। সারা জীবন পৃথিবীতে গড়া নানা জটিল তন্ত্রের সেবা করতে করতে মারা যাই। আমরা যা কিছু বানাই, তা কেবল আমাদের দেহের প্রতিচ্ছবি তা-ই নয়—আমরা নিজেরাও আসলে আমাদের একেকটা কোষের প্রতিচ্ছবি।
হয়তো আমাদের সভ্যতা, আমাদের কান্না, আমাদের ভালোবাসা—এসবই বিশাল কোনো কিছুর ‘দেহকোষ-যন্ত্র’।
অবধারিত মৃত্যু একসময় আমাকে খুব বিষণ্ণ করত। জীবনটাকে অর্থহীন লাগত। কিন্তু আজ আমি আমার হৃৎপিণ্ডের কথা ভাবি। কার্ডিওমায়োসাইট নামে হৃৎপেশিকোষ ভ্রূণের চতুর্থ সপ্তাহেই স্পন্দন শুরু করে, তারপর আর থামে না। কপাল ভালো হলে এই কোষ জীবনে প্রায় ৩০০ কোটি বার স্পন্দিত হবে। আর এতবার স্পন্দনের পরও সে একবারের জন্যও বংশবৃদ্ধি করবে না। সে মারা যাবে। তার জীবন ওটুকুই।
সারা জীবন পৃথিবীতে গড়া নানা জটিল তন্ত্রের সেবা করতে করতে মারা যাই। আমরা যা কিছু বানাই, তা কেবল আমাদের দেহের প্রতিচ্ছবি তা-ই নয়—আমরা নিজেরাও আমাদের একেকটা কোষের প্রতিচ্ছবি।
হৃৎপেশিকোষ যদি ভাবত—‘ধুর, আমি তো মরেই যাব, ভবিষ্যতে তো যাব না, তবে এত খেটে লাভ কী?’—তাহলে কী হতো? তাহলে আমি জন্মাতাম না। ভালোবাসতে পারতাম না। বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে পারতাম না। এই বিকেলের বরফের ওপর পড়া সুন্দর রোদটুকু দেখতে পেতাম না।
আমার এই ৩০ ট্রিলিয়ন দেহকোষের নিজস্ব কোনো চেতনা আমার কাছে নেই, কিন্তু তারা সবাই মিলে জন্ম দিয়েছে আমার এই চেতনার। আমাকে দিয়েছে একটি ‘আমি’ সত্তা। তাহলে আমরা সবাই মিলে কী গড়ছি? আমরাও কি এই মহাবিশ্বের বিশাল কোনো সমষ্টিগত চেতনার একেকটা কোষ? আমার শরীরের কোষগুলো যেমন আমার চেতনাকে চেনে না, জানেই না আমি কে—আমরাও কি তেমনি এমন কোনো মহাজাগতিক সত্তার অংশ, যার সঙ্গে আমাদের কোনো দিন কথা হবে না?
রকেট যখন ওড়ে, তার মাথায় থাকে ছোট্ট একটি ক্যাপসুল বা ‘পেলোড’—যেটা মহাকাশে যায়। আর নিচে থাকে বিশাল সব বুস্টার, জ্বালানিট্যাংক। ওড়া শুরু হলে নিচের সেই বিশাল বুস্টারগুলো প্রচণ্ড শক্তিতে জ্বলে ওঠে। নিজেদের সবটুকু জ্বালানি পুড়িয়ে, ধ্বংস হয়ে যায়—কেবল একটা কারণে: ওপরের ছোট্ট ক্যাপসুলটাকে মাধ্যাকর্ষণের বাইরে ঠেলে দিতে। কাজ ফুরোলেই সেই বিশাল বুস্টারগুলো খসে পড়ে সাগরে। তারা মহাকাশ দেখে না। কিন্তু তাদের এই আত্মাহুতির জন্যই ক্যাপসুলটা তার গন্তব্যে পৌঁছায়।
আমি জানি না এই মহাবিশ্বের গন্তব্য কোথায়, কিন্তু নিজেকে আমার মনে হয় কোনো এক মহাজাগতিক রকেটের ক্ষুদ্র একটা বুস্টার। দেহকোষদের মতোই নিজেদের ধ্বংস অনিবার্য জেনেও আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। পাশের কোষদের জানিয়ে যাচ্ছি, ‘ভয় নেই। আমরা আছি, তুমি বিভাজিত হতে পারো।’
আমার হৃৎপিণ্ড, কিডনি, রক্তের সেই কোষগুলোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। এটুকুই অর্থবহ।