হাবীবুল্লাহ পাঠান ও এক হারানো নগরী
সম্প্রতি উয়ারী-বটেশ্বরের নিবেদিতপ্রাণ দীপশিখা হাবীবুল্লাহ পাঠান আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। কিন্তু প্রয়াণের আগে তিনি শিখিয়ে গেছেন, রিক্ত হাতেও কীভাবে একটি জাতির বিস্মৃত ইতিহাসকে তিল তিল করে পুনর্নির্মাণ করা যায়। কল্পনা ও বাস্তবের মেলবন্ধনে জীবনকে কীভাবে ছন্দময় ও অর্থবহ করে তোলা সম্ভব, তিনি ছিলেন তারই এক জীবন্ত কিংবদন্তি। এই ধূসর মাটি ও তার বুক চিরে জেগে ওঠা আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন রাজপথ যুগ যুগ ধরে তাঁর এবং তাঁর পিতার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করবে। এই প্রাচীন নগরের প্রতিটি ধূলিকণা ও ইটে মিশে আছে তাঁদের আজন্ম স্বপ্নের ঘ্রাণ।
উন্মোচিত রাস্তাটির বিন্যাস এতই আধুনিক যে, প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে একে পিচ উঠে যাওয়া কোনো সমকালীন রাস্তার মতোই মনে হয়েছে।
মাটির নিচে প্রাচীন রাজপথ
উয়ারী-বটেশ্বরকে নিয়ে দীর্ঘ ছয় দশকের জল্পনা-কল্পনা ও নিবিড় গবেষণার পর অবশেষে এমন এক অকাট্য প্রমাণ মিলেছে, যা এই জনপদের প্রাচীন নগরায়ণ ও বাণিজ্যিক গুরুত্বকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়ই নয়, বরং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দিলীপ কুমার চক্রবর্তীর মতে, ‘সিন্ধু সভ্যতার পর সমগ্র ভারত উপমহাদেশে গঙ্গা উপত্যকার প্রাচীনতম রাস্তা হিসেবে এটি এক অবিস্মরণীয় আবিষ্কার।’ প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন এই নিদর্শনের সূত্র ধরেই উয়ারী-বটেশ্বরকে দেশের প্রাচীনতম নগরীর মর্যাদা দেওয়া যায়।
এই যুগান্তকারী অর্জনের পেছনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিষ্ঠা ও নিরলস শ্রম জড়িয়ে আছে। ২০০৪ সালের ২২ মার্চ, ওই বিভাগের অষ্টম ও দশম ব্যাচের ৭৬ জন শিক্ষার্থীর মাসব্যাপী খননকার্যের ফলেই পৃথিবীর আলো দেখে ইতিহাসের সেই প্রাচীন রাজপথ। ১৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৬ মিটার প্রস্থের এই রাস্তার পাশাপাশি সেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে ইট-সুরকি ও চুনের মিশ্রণে তৈরি ১০ সেন্টিমিটার পুরু কক্ষের মেঝে, ছাদ তৈরির উপকরণ এবং টালি। উন্মোচিত রাস্তাটির বিন্যাস এতই আধুনিক যে, প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে একে পিচ উঠে যাওয়া কোনো সমকালীন রাস্তার মতোই মনে হয়েছে।
মহাস্থানগড় ছাড়াও গঙ্গা উপত্যকার কৌশাম্বী, চন্দ্রকেতুগড়, শ্রাবস্তী, বৈশালী ও বানগড়ের মতো প্রাচীন শহরগুলোতেও এ ধরনের মেঝের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, উয়ারী-বটেশ্বরে প্রাপ্ত দুর্গ-প্রাচীর, পরিখা, ইটের স্থাপত্য, পাথরের পুঁতি, ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা এবং উত্তর-ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের প্রাচুর্য এটিই প্রমাণ করে, আড়াই হাজার বছর আগেই এখানে এক সমৃদ্ধ ও পরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ে উঠেছিল।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দিলীপ কুমার চক্রবর্তীর মতে, ‘সিন্ধু সভ্যতার পর সমগ্র ভারত উপমহাদেশে গঙ্গা উপত্যকার প্রাচীনতম রাস্তা হিসেবে এটি এক অবিস্মরণীয় আবিষ্কার।’
এক অদৃশ্য সত্যের সন্ধানে
যখন মাটির ওপর কোনো অকাট্য প্রমাণের চিহ্নমাত্র ছিল না, তখন এই সাধারণ সমতলভূমির নিভৃত গ্রামটিতে কোন দিব্যদৃষ্টিতে এক প্রাচীন নগরীর অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন সেই স্বাপ্নিক মানুষেরা? উয়ারী-বটেশ্বরের সঙ্গে সুদূর রোম সাম্রাজ্যের সখ্য ও যোগাযোগের কথা কোন সাহসে ভেবেছিলেন তাঁরা? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে হানিফ পাঠান এবং হাবীবুল্লাহ পাঠানের দীর্ঘ ষাট বছরের ক্লান্তিহীন অভিযাত্রায়।
সভ্যতার বিশাল ক্যানভাসে এই সময়টুকু হয়তো অতি সামান্য, কিন্তু একটি মানবজীবনের জন্য তা আমূল এবং পূর্ণাঙ্গ। সীমাহীন আর্থিক দৈন্য ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বংশপরম্পরায় এই স্বাপ্নিকেরা তাঁদের সমস্ত মেধা, শ্রম ও প্রজ্ঞা ঢেলে দিয়েছেন এক অদৃশ্য সত্যের সন্ধানে। চলুন, সময়ের ধুলো সরিয়ে আমরা সেই সুদীর্ঘ ও বন্ধুর পথচলার গল্পটি একবার দেখে আসি; কীভাবে বছরের পর বছর কষ্ট আর সাধনার বিনিময়ে একটি ব্যক্তিগত স্বপ্ন ধাপে ধাপে এক কালজয়ী আবিষ্কারে রূপান্তরিত হলো।
২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারি। হাড়কাঁপানো এক শৈত্যপ্রবাহের রেশ কাটতে না কাটতেই ডিসকাশন প্রজেক্ট-এর একদল কর্মী নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। সেদিন সকালের আকাশ ঘন কুয়াশার চাদরে এমনভাবে ঢাকা ছিল যে হাত তিনেক দূরের পথও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে মনে ছিল সংশয় ও দুশ্চিন্তা। আমাদের যাত্রাপথ খুব একটা দীর্ঘ নয়, নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে মাত্র আড়াই ঘণ্টার দূরত্বে নরসিংদী জেলা।
২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারি। হাড়কাঁপানো এক শৈত্যপ্রবাহের রেশ কাটতে না কাটতেই ডিসকাশন প্রজেক্ট-এর একদল কর্মী নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
ইতিহাসের পাতায় ব্রিটিশ আমলে নরসিংদী ছিল নারায়ণগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত; স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে শিবপুর, রায়পুরা, মনোহরদী, পলাশ ও বেলাব—এই পাঁচটি থানা নিয়ে নরসিংদী পৃথক মহকুমা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৮৫ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয়। আমাদের গন্তব্য সেই বেলাব থানার নিভৃত অঞ্চল উয়ারী-বটেশ্বর। লোকমুখে শোনা যায়, এখানেই নাকি লুকিয়ে আছে মৌর্য-গুপ্ত আমলের বাংলাদেশের প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। একদল স্বপ্নচারী মানুষের দাবি, এই গ্রাম দুটি ছিল প্রাচীন ভারতবর্ষের এক সমৃদ্ধ বাণিজ্য নগরী। ডিসকাশন প্রজেক্ট বিজ্ঞান সংস্থার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সেই সম্ভাবনাকে পর্যবেক্ষণ করা, যা ছিল বাংলাদেশের প্রতিটি প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থান পরিদর্শনের একটি বিশেষ অংশ।
রাজধানী ঢাকা থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, পুরোনো ব্রহ্মপুত্র ও আড়িয়াল খাঁ নদের মিলনস্থলের ঠিক তিন কিলোমিটার পশ্চিমে কয়রা নামে এক মৃতপ্রায় নদীখাতের দক্ষিণ তীরেই রহস্যময় এই উয়ারী-বটেশ্বরের অবস্থান।
লোকমুখে শোনা যায়, নরসিংদীর বেলাব থানার নিভৃত অঞ্চল উয়ারী-বটেশ্বরেই নাকি লুকিয়ে আছে মৌর্য-গুপ্ত আমলের বাংলাদেশের প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
পথ দেখাল কিংবদন্তির নাম
যাত্রার লগ্ন নির্ধারিত ছিল সকাল আটটায়। কিন্তু নানা প্রস্তুতি শেষে যখন আমরা পথে নামলাম, ঘড়ির কাঁটা তখন পৌনে এগারোটা। বিলম্বের কারণে শুরুতে কিছুটা বিরক্তি থাকলেও গন্তব্যের টান ও গাড়ির গতি সবাইকে এক নতুন জগতের সন্ধানে উন্মুখ করে তুলল। অনেক দিন পর চারদিকে রোদের উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়েছে, যা আমাদের যাত্রায় বাড়তি প্রাণ জোগাল। কিছুটা পথ পেরোনোর পর আমরা স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম, বটেশ্বরের সেই প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জায়গাটা ঠিক কোথায়?
তারা মুহূর্তকাল ভেবেই পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘আপনারা কি হানিফ পাঠানের বাড়ি যাবেন?’ যতই আমরা গন্তব্যের কাছে পৌঁছাচ্ছি, উত্তরটা ততই দ্রুত আর নিশ্চিত হচ্ছিল। মনে তখন এক অদ্ভুত কৌতূহল, একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের সঙ্গে হানিফ পাঠান নামের মানুষটির সম্পর্ক কী? অন্তত সাত-আটবার জিজ্ঞাসাবাদের পর গাছপালাঘেরা এক নিবিড়, সরু রাস্তার পাশে এসে থামল আমাদের গাড়ি। দুপাশে সবুজের সমারোহ, তার মাঝে কয়েকটি ঘর লক্ষ করে আমরা এগিয়ে চললাম।
মাটির দেয়ালের সুন্দর কিছু ঘর আর পাশাপাশি কয়েকটা ইটের তৈরি বাড়ি। একটি ঘরের দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে এক ব্যক্তি বেরিয়ে এসে নিশ্চিত করলেন—হ্যাঁ, এটা হানিফ পাঠানেরই বাড়ি। তিনি আমাদের জন্য ইটের তৈরি সাদা দেয়ালের একটি ঘর খুলে দিলেন। ঢোকার মুখেই চোখে পড়ল একটি নামফলক: বটেশ্বর প্রত্নসংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার। স্থাপিত: ১৯৭৪। পোস্ট: বটেশ্বর, বেলাব, নরসিংদী।
অন্তত সাত-আটবার জিজ্ঞাসাবাদের পর গাছপালাঘেরা এক নিবিড়, সরু রাস্তার পাশে এসে থামল আমাদের গাড়ি। দুপাশে সবুজের সমারোহ, তার মাঝে কয়েকটি ঘর লক্ষ করে আমরা এগিয়ে চললাম।
ঘরে ঢুকেই চোখে পড়ল জ্ঞান ও ইতিহাসের এক অপূর্ব সমন্বয়। একপাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা ঠাসা বইয়ের আলমারি, তার পাশেই কয়েকটি ড্রয়ারসহ একটি ছোট্ট টেবিল। ঘরের অন্য পাশে কাচঘেরা আলমারিতে যত্ন করে কতগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সাজিয়ে রাখা হয়েছে; যার মধ্যে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে সেই প্রাচীন ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা।
সেদিন বুঝেছিলাম, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের চেয়েও সেই জনপদে একজন মানুষের নাম তখন কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে আছে। পথের বাঁকে বাঁকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল এক সাধারণ স্কুলশিক্ষকের নাম, যিনি সময়ের অতল গহ্বর দেখার দিব্যদৃষ্টি পেয়েছিলেন। ৫-৬ কিলোমিটার পথ আসতে আসতে উয়ারী-বটেশ্বরের নাম নিয়ে যতবারই জিজ্ঞাসা করেছি, স্থানীয় মানুষ একবাক্যে পথ দেখিয়েছেন ‘হানিফ পাঠানের বাড়ি’।
কে এই হানিফ পাঠান? তিনি এই বাংলার সমতলভূমিরই এক অতি সাধারণ মানুষ। পেশায় ছিলেন শিক্ষক, নেশা ছিল অবসরে গ্রামের পথে হেঁটে বেড়ানো। একদিন হাঁটার পথে কিছু বিচিত্র পাথরের গুটি খুঁজে পেলেন তিনি। সেই সামান্য গুটিগুলোই যেন তাঁকে সময়-পরিভ্রমণযানে চড়িয়ে হাজার হাজার বছর পেছনে নিয়ে গেল। এক অদম্য কৌতূহল থেকে তিনি তাঁর সেই ভাবনাগুলোকে কাগজে-কলমে রূপ দিতে শুরু করলেন। একজন পদার্থবিজ্ঞানী যেমন অতি সামান্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বের রহস্য অনুমান করেন, হানিফ পাঠানও ঠিক তেমনিভাবে অনুমান করেছিলেন এক সুপ্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্ব। তাঁর সেই স্বপ্নের বীজ তিনি বুনে দিয়েছিলেন নিজের পাঁচ বছরের শিশুপুত্রের অন্তরেও। এভাবেই রচিত হলো এক ঐতিহাসিক পরম্পরা।
৫-৬ কিলোমিটার পথ আসতে আসতে উয়ারী-বটেশ্বরের নাম নিয়ে যতবারই জিজ্ঞাসা করেছি, স্থানীয় মানুষ একবাক্যে পথ দেখিয়েছেন ‘হানিফ পাঠানের বাড়ি’।
বাবার মশাল ছেলের হাতে
পিতার সেই মশাল হাতে নিয়ে উত্তরসূরি হাবীবুল্লাহ পাঠান চষে বেড়ালেন শুধু উয়ারী-বটেশ্বর নয়, বরং পুরো বেলাব থানা। শুধু ভৌগোলিক সীমানাই নয়, বরং কল্পনার ডানায় ভর করে তিনি বিচরণ করলেন শতাব্দীর পর শতাব্দীতে। এই প্রাচীন নগরীর অস্তিত্বকে অকাট্য প্রমাণের ওপর দাঁড় করাতে তিনি জীবনের সুদীর্ঘ ৫০টি বছর উৎসর্গ করেছেন। তিনি নিজে নিশ্চিত হয়েছিলেন এবং চেয়েছেন বিশ্ববাসীও যেন এই সত্যকে বরণ করে নেয়। তিনি নিজে লিখেছেন, অন্যদের অনুপ্রাণিত করেছেন; তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ-বিদেশের বরেণ্য প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ছুটে এসেছেন।
তাঁরা হাবীবুল্লাহ পাঠানের পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করলেও স্থাপত্যের অকাট্য প্রমাণ খুঁজছিলেন। অবশেষে শুরু হলো সেই কাঙ্ক্ষিত খননকার্য। মাটির বুক চিরে বেরিয়ে এল সেই রাজপথ, যার সন্ধানে তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো নিবেদন করেছিলেন। হানিফ পাঠান যে হারিয়ে যাওয়া নগরীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তা আমাদের চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি যেন ইতিহাসের রুদ্ধদ্বার খুলে আমাদের সামনে হাজির করেছেন এক প্রাচীন সভ্যতার ধূলিমলিন ঠিকানা, হারিয়ে যাওয়া নগরীর পথ।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা হাবীবুল্লাহ পাঠানের পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করলেও স্থাপত্যের অকাট্য প্রমাণ খুঁজছিলেন। অবশেষে শুরু হলো সেই কাঙ্ক্ষিত খননকার্য। মাটির বুক চিরে বেরিয়ে এল সেই রাজপথ।
দুপুরের রোদে সবুজ ফসলের মাঠের বুক চিরে যখন হাবীবুল্লাহ পাঠান আমাদের পথ দেখাচ্ছিলেন, তাঁর প্রতিটি শব্দে ইতিহাসের ধূসর পাতাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল। আজ যে কয়রা নদী শীর্ণ ও মৃতপ্রায়, এককালে তা-ই ছিল প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল ধারা। সেই বিশাল জলপথেই দুলত বড় বড় বাণিজ্য তরী। এখান থেকেই ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে প্রাচীন বাংলার বণিকেরা পৌঁছে যেত সুদূর রোম কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। উয়ারী-বটেশ্বর তখন ছিল বিশ্ববাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত কেন্দ্র। হাবীবুল্লাহ পাঠানের সেই রোমাঞ্চকর বর্ণনার সঙ্গে ছুটতে ছুটতে আমরাও যেন বর্তমানকে ভুলে কয়েক হাজার বছর আগের সেই অতীত-পথের অভিযাত্রীতে পরিণত হয়েছিলাম।
কালের নিয়মে সম্প্রতি হাবীবুল্লাহ পাঠান আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন, চলে গেছেন উয়ারী-বটেশ্বরের সেই নিবেদিতপ্রাণ দীপশিখা। কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, কল্পনা ও বাস্তবের অপূর্ব মেলবন্ধনে কীভাবে জীবনকে ছন্দময় ও মহিমান্বিত করতে হয়। তিনি আমাদের দেখিয়ে গেছেন, নিষ্ঠা থাকলে একটি জাতির বিস্মৃত ইতিহাসকে তিল তিল করে পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব। তাঁর এই আজীবন সাধনা ও ত্যাগ আমাদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। এই স্বপ্নদ্রষ্টার প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, অসীম কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা।