ঢাকার জ্যামে দুই ঘণ্টা আটকে আছেন বাসের জানালার ধারে। হাতে ফোন, আঙুল সমানে স্ক্রল করছে। ইনফিনিটি স্ক্রল, যার কোনো শেষ নেই, সীমা নেই। একটা ভিডিও, তারপর আরেকটা, তারপর কার বিয়েতে কে কী পরেছে—হেনতেন নানা বিষয়। বাস থেকে নামার সময় টের পেলেন, দুই ঘণ্টা তো গেল, অথচ মাথায় কিছুই নেই।
এবার অন্য একটা দৃশ্য ভাবুন। একই জ্যাম, একই বাস, কিন্তু হাতে একটা পুরনো পেপারব্যাক। বাইরে হর্ন বাজছে আর ভেতরে আপনি তখন মিসির আলি কিংবা মাসুদ রানার সঙ্গে কোনো অদ্ভুত রহস্যের পিছু ছুটছেন। জ্যাম একই থাকল, বদলে গেল আপনার ভেতরটা। বিজ্ঞান বলছে, এই বদল শুধু মনের ভালো লাগার ব্যাপার নয়, বরং তার ছাপ পড়ে শরীর আর মস্তিষ্কেও।
সে কারণেই বোধহয় বিজ্ঞানী কার্ল সাগান বইকে বলেছিলেন জাদুর প্রমাণ। তাঁর যুক্তিটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর: একটা বই খুললে কয়েক হাজার বছর আগের কেউ যেন আপনার মাথার ভেতর কথা বলতে শুরু করে। অথচ তাকে কোনোদিন চোখেও দেখেননি। কালের ব্যবধান পেরিয়ে এমন যোগাযোগ জাদু ছাড়া আর কী! গেম অব থ্রোনস–এর লেখক জর্জ আর আর মার্টিনের এক চরিত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছে, বইয়ের পাঠক মরার আগে হাজারটা জীবন যাপন করে। আর যে কখনো বই পড়ে না, সে বাঁচে মাত্র একটা জীবন। ভাবুন, একই টিকিটে হাজার জীবন। এমন লোভনীয় অফার আর কোথায় পাবেন?
বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের যুক্তিটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর: একটা বই খুললে কয়েক হাজার বছর আগের কেউ যেন আপনার মাথার ভেতর কথা বলতে শুরু করে। অথচ তাকে কোনোদিন চোখেও দেখেননি।
অথচ বাইরে থেকে দেখলে বই-হাতে কোনো মানুষকে হয়তো মনে হয় আস্ত অকম্মার ধাড়ি! সে চুপচাপ বসে থাকে, স্রেফ চোখ দুটোই যা একটু এদিক-ওদিক চলে। কোথাও ছোটাছুটি নেই, খেলাধুলা নেই, ঠোঁটে একটি শব্দও নেই। কিন্তু এই শান্ত দৃশ্যের আড়ালে মস্তিষ্কে তখন চলছে তুমুল হইচই। নতুন শব্দের অর্থ খোঁজা হচ্ছে, বাক্যের মানে বোঝা হচ্ছে, চরিত্রের মুখ কল্পনা করা হচ্ছে, ঘটনার পরিণতি অনুমান চলছে—একসঙ্গে এতগুলো কাজ।
লেখক ফ্রানজ কাফকা তরুণ বয়সে বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন, বই হওয়া উচিত আমাদের ভেতরের জমাট বরফ-সাগর ভাঙার কুড়াল। বইয়ের কাজ যদি এমন কুড়ুলের মতো হয়, তাহলে পাঠকের মাথার ভেতর যে তোলপাড় করা শব্দ হবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাই বই পড়াকে স্রেফ জ্ঞান অর্জনের উপায় বললে একটু কমই বলা হয়।
বইপড়ার সবচেয়ে চটজলদি উপকারটা দিয়েই শুরু করা যাক—মন শান্ত হওয়া। এ ব্যাপারে ২০০৯ সালে ব্রিটেনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী ডেভিড লুইসের একটি পরীক্ষার ফল বেশ আলোড়ন তুলেছিল। তাঁর দাবি, মাত্র ছয় মিনিট নিঃশব্দে বই পড়লে হৃদস্পন্দন ধীর হয়, পেশির টান হয় শিথিল, আর মানসিক চাপ কমে প্রায় ৬৮ শতাংশ। সে তুলনায় গান শুনে কমেছিল ৬১ শতাংশ, চা বা কফিতে ৫৪ শতাংশ, আর হাঁটাহাঁটিতে ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ ক্লান্ত দিনের শেষে চা, গান আর হাঁটাকে হারিয়ে দিয়েছিল বই।
ব্রিটেনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী ডেভিড লুইসের দাবি, মাত্র ছয় মিনিট নিঃশব্দে বই পড়লে হৃদস্পন্দন ধীর হয়, পেশির টান হয় শিথিল, আর মানসিক চাপ কমে প্রায় ৬৮ শতাংশ।
অবশ্য সততার খাতিরে এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। গবেষণাটি অর্থায়নে করেছিল একটি চকলেট কোম্পানি। আর সেটা কোনো পিয়ার-রিভিউড জার্নালে ছাপাও হয়নি। কাজেই ওই শতাংশগুলো ধ্রুব সত্য নয়, বরং সেগুলোকে ইঙ্গিত হিসেবে নেওয়াই ভালো। তবে ইঙ্গিতটা কিন্তু বেশ মনে রাখার মতো। গল্পের ভেতর ডুবে গেলে বাস্তব জীবনের দুশ্চিন্তা থেকে মস্তিষ্ক সাময়িক ছুটি পায়। তাই হয়তো বইকে বলা হয় মানুষের ভালো বন্ধু।
এ বিষয়ে মার্কিন কমেডিয়ান গ্রুচো মার্ক্সের নামে একটা রসিকতা চালু আছে: কুকুরের বাইরে নাকি বইই মানুষের সেরা বন্ধু। তবে কুকুরের ভেতরে পড়া যায় না, কারণ সেখানে বড্ড অন্ধকার। রসিকতাটা সত্যিই তাঁর কি না, তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহ আছে। তবে গল্পটা চালু আছে, আর ব্যাপারটা সত্যি মনে হয়।
এবার ঢোকা যাক মস্তিষ্কের ভেতরে। যুক্তরাষ্ট্রের এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্রেগরি বার্নসের একটি গবেষক দল একবার ২১ জন শিক্ষার্থীকে টানা ১৯ দিন ধরে রবার্ট হ্যারিসের ঐতিহাসিক থ্রিলার ‘পম্পেই’ পড়তে দিয়েছিল। পুরোটা সময় এফএমআরআই স্ক্যানে পাঠকদের মস্তিষ্কের বিশ্রামকালীন কার্যকলাপ দেখা হয়েছিল। ফলাফলটা ছিল বেশ মজার।
যুক্তরাষ্ট্রের এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্রেগরি বার্নসের একটি গবেষক দল একবার ২১ জন শিক্ষার্থীকে টানা ১৯ দিন ধরে রবার্ট হ্যারিসের ঐতিহাসিক থ্রিলার পম্পেই পড়তে দিয়েছিল।
দেখা গেল, উপন্যাস পড়া যত এগিয়েছে, পাঠকদের ভাষা বোঝার সঙ্গে যুক্ত বাম টেম্পোরাল কর্টেক্সে স্নায়ুসংযোগ তত বেড়েছে। স্নায়ুসংযোগ বেড়েছে শরীরের নড়াচড়া আর অনুভূতির সঙ্গে জড়িত এলাকাতেও। গবেষকদের ধারণা, গল্পের চরিত্র যখন দৌড়ায় বা লাফায়, পাঠকের মস্তিষ্কও তখন নিজের ভেতরে অল্প করে সেই অভিজ্ঞতার মহড়া দেয়। অর্থাৎ আপনি বিছানায় শুয়ে, কিন্তু মগজ তখন পম্পেইয়ের ছাইয়ের মধ্য দিয়ে দৌড়াচ্ছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, বই শেষ করার পাঁচ দিন পরও এই বাড়তি সংযোগের কিছুটা টিকে ছিল। গবেষকেরা একে বলেছেন শ্যাডো অ্যাক্টিভিটি—মানে বই শেষ হলেও তার রেশ মাথায় রয়ে যায়। তবে এ গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ছিল মাত্র ২১ জন। তাই এই ফলাফল নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। তার জন্য দরকার বড় পরিসরে আরও গবেষণা।
মগজের ভেতরের এই কসরতের কারণেই গোয়েন্দা গল্প এত জমে। লেখক যেই বললেন—দরজার পাশে পড়ে আছে কাদামাখা জুতো, অমনি পাঠকের মস্তিষ্ক সক্রিয়। এর সঙ্গে রহস্যের সম্পর্ক কী? কারণ কয়েক পাতা পর জুতোটা ফিরে এলে পুরোনো তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্য মেলাতে হয়। গল্প বুঝতে আগের ঘটনা মনে রাখতে হয়, সামনে কী ঘটবে অনুমান করতে হয়। বইপড়া তাই শুধু অক্ষর দেখা নয়, তথ্য নিয়ে ক্রমাগত ভাবা।
২০১৬ সালে সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত ফলাফল বলছে, বই পড়ুয়াদের মৃত্যুঝুঁকি না-পড়াদের তুলনায় কম। হ্যাজার্ড রেশিও প্রায় ০.৮০, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ কম।
গোয়েন্দাদের গুরু শার্লক হোমস তাই আর্থার কোনান ডয়েলের প্রথম উপন্যাসেই মস্তিষ্ককে তুলনা করেছেন একটা ছোট চিলেকোঠার সঙ্গে। যা-তা জিনিস ঠেসে ভরলে দরকারি জিনিস খুঁজে পাওয়া যায় না, তাই বেছে সাজাতে হয়। হোমসের চিলেকোঠা-তত্ত্বের সঙ্গে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান পুরোপুরি মেলে না। কিন্তু নিউরোসায়েন্টিস্টরা একটা কথা ঠিকই বলেন, বই মস্তিষ্কের জন্য পুরোদস্তুর ব্যায়াম। ফ্রান্সিস বেকন সেই ষোলো-সতেরো শতকেই ঠিক ধরেছিলেন। তাঁর মতে, কিছু বই চেখে দেখার, কিছু গিলে ফেলার, আর অল্প কিছু চিবিয়ে হজম করার। ব্যায়ামের মেনুটাও দেখছি সেই তখন থেকেই তৈরি।
এই ব্যায়ামের একটা দীর্ঘমেয়াদি হিসাবও আছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ভ্রুনা বাভিশি ও তাঁর সহকর্মীরা ৫০ বছরের বেশি বয়সী ৩ হাজার ৬৩৫ জনকে প্রায় ১২ বছর অনুসরণ করেন। ২০১৬ সালে সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত ফলাফল বলছে, বই পড়ুয়াদের মৃত্যুঝুঁকি না-পড়াদের তুলনায় কম। হ্যাজার্ড রেশিও প্রায় ০.৮০, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ কম। আর যারা সপ্তাহে সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি বই পড়ত, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমেছিল প্রায় ২৩ শতাংশ। গড় হিসাবে বইপাঠকেরা বেঁচে ছিলেন প্রায় ২৩ মাস বেশি।
ফ্রান্সিস বেকন সেই ষোলো-সতেরো শতকেই ঠিক ধরেছিলেন। তাঁর মতে, কিছু বই চেখে দেখার, কিছু গিলে ফেলার, আর অল্প কিছু চিবিয়ে হজম করার। ব্যায়ামের মেনুটাও দেখছি সেই তখন থেকেই তৈরি।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সংবাদপত্র বা ম্যাগাজিন পড়ায় এমন সুবিধা মেলেনি। গবেষকদের ধারণা, বই গভীর মনোযোগ ও ধারাবাহিক চিন্তা দাবি করে। তাই তার প্রভাবও গভীর, আর জ্ঞানসংক্রান্ত সক্ষমতা এই সম্পর্কের একটি অংশ ব্যাখ্যা করতে পারে। তবে এটি স্রেফ পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। তাই বইপড়াই যে আয়ু বাড়ানোর সরাসরি কারণ, তা প্রমাণ করে না। ‘কোনো সম্পর্ক পাওয়া’ আর ‘কারণ প্রমাণ করা’ যে এক জিনিস নয়, তা বিজ্ঞানের পুরোনো সতর্কবাণী। তাই বই পড়লেই যে আয়ু বাড়বে—এমন কথা ভুলেও বিশ্বাস করে বসবেন না।
তবে আয়ু না হোক স্মৃতিবিভ্রমের সঙ্গে কিন্তু বইপড়ার কিন্তু জোরালো সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বয়স বাড়লে স্মৃতি ঝাপসা হওয়া আর আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ভয় প্রায় সবারই থাকে।
শিকাগোর রাশ ইউনিভার্সিটির রবার্ট উইলসনের দল ২৯৪ জন প্রবীণের জীবনের শেষ বছরগুলো অনুসরণ করে, মৃত্যুর পর তাঁদের মস্তিষ্ক ময়নাতদন্তে পরীক্ষা করে। ফল ছাপা হয় নিউরোলজি সাময়িকীতে। দেখা গেছে, যাঁরা শেষ বয়সেও নিয়মিত পড়তেন, লিখতেন বা মাথা খাটানোর কাজ করতেন, তাঁদের স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি ক্ষয়ের গতি গড়ের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ ধীর ছিল। আর যাঁরা এসব থেকে দূরে ছিলেন, তাঁদের ক্ষয় ছিল গড়ের চেয়ে প্রায় ৪৮ শতাংশ দ্রুত। কাজেই বুঝতেই পারছেন বইপড়ার সুবিধা।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা শেষ বয়সেও নিয়মিত পড়তেন, লিখতেন বা মাথা খাটানোর কাজ করতেন, তাঁদের স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি ক্ষয়ের গতি গড়ের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ ধীর ছিল।
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের জনক স্প্যানিশ চিকিৎসক সান্তিয়াগো রামোন ই কাহালের গল্পটা এখানে বেশ প্রাসঙ্গিক। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন দুরন্ত। এগারো বছর বয়সে নিজের বানানো কামান দেগে প্রতিবেশীর ফটক উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই অপরাধে জেলও খাটেন কিছুদিন। সেই ছেলেই পরে মস্তিষ্কের নিউরন আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার পান।
তাঁর লেখা বইয়ে তিনি লিখেছিলেন, ইচ্ছে করলে যেকোনো মানুষ হতে পারে নিজের মস্তিষ্কের ভাস্কর। কাহালের ধারণা ছিল, মাথা খাটালে নিউরনের শাখা-প্রশাখা বাড়ে। তিনি একে বলতেন মস্তিষ্কের জিমন্যাস্টিকস। অবশ্য তিনি তা সরাসরি প্রমাণ করে যেতে পারেননি। প্রায় একশো বছরের পর সেই অনুমান আজ নতুন ভাষায় আমরা কগনিটিভ রিজার্ভ বলি। শিকাগোর রাশ ইউনিভার্সিটির গবেষণা ঠিক সেই সুরেই কথা বলে। আসলে কামান বানানো ছেলেটির মতো মস্তিষ্কও ভেতরে ভেতরে সারাক্ষণ কিছু একটা গড়তে চায়। তাকে কাজ না দিলে সে হয়তো ঢিলে হয়ে আসে, আর কাজ দিলে ভাস্করের হাতে সে নিজেকেই গড়ে তোলে নতুন করে।
স্প্যানিশ চিকিৎসক সান্তিয়াগো রামোন ই কাহাল ছোটবেলায় ছিলেন দুরন্ত। এগারো বছর বয়সে নিজের বানানো কামান দেগে প্রতিবেশীর ফটক উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই অপরাধে জেলও খাটেন কিছুদিন।
মগজের এই খাটুনির আরেকটা ফল হলো মনোযোগ। টিকটক, রিলস আর নোটিফিকেশনের যুগে আমাদের অ্যাটেনশন স্প্যান মারাত্মকভাবে ছোট হয়ে যাচ্ছে—এমন আশঙ্কা অনেকের। কয়েক মিনিটে একের পর এক ভিডিও দেখতে দেখতে আমরা কোনো কিছুতেই বেশিক্ষণ থাকি না। কিন্তু বই দাবি করে ঠিক উল্টোটা। একটা দীর্ঘ বাক্যের অর্থ ধরতে হলে তার শুরুতে কী বলা হয়েছিল, মনে রাখতে হয়। গল্পের চরিত্র বা বৈজ্ঞানিক ধারণা বুঝতেও লাগে ধৈর্য। তাই স্নায়ুবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, নিয়মিত বইপড়ায় মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা মনোযোগ ধরে রাখা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত, শক্তিশালী হয়। সে কারণেই লেখক স্টিফেন কিং তো লেখকদের সোজা বলে দিয়েছেন, পড়ার সময় না থাকলে লেখার সময়ও তোমার নেই, ব্যাপারটা এত সহজ। বই তাঁর কাছে বহনযোগ্য জাদু। পকেটে ঢুকে যায়, অথচ খুললেই আলাদা এক জগৎ।
আবার রাতের ঘুমের সঙ্গেও বইয়ের একটা সম্পর্ক আছে। স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল আলো শরীরে মেলাটোনিন হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়। সেটাই ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমানোর আগে ছাপানো বই হাতে নিলে সেই ঝামেলা নেই। বইয়ের পাতা মস্তিষ্ককে বুঝিয়ে দেয়, এবার বিশ্রামের সময়। ফলে ঘুম গভীর ও প্রশান্ত হতে পারে। ফোনটা দূরে রেখে বই হাতে নেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো অজুহাত আর কী হতে পারে।
স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের নীল আলো শরীরে মেলাটোনিন হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়। সেটাই ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ঘুমানোর আগে ছাপানো বই হাতে নিলে সেই ঝামেলা নেই।
এবার আসা যাক মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে। একটি ভালো গল্প পড়ার সময় আমরা অন্য একজনের মাথার ভেতর ঢুকে পড়ি। সে কী ভাবছে, কেন এমন করল, আমি তার জায়গায় থাকলে কী করতাম—এই প্রশ্নগুলো আমাদের সামাজিক চিন্তাশক্তিকে ব্যস্ত রাখে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে থিওরি অব মাইন্ড। ২০১৩ সালে নিউইয়র্কের নিউ স্কুল ফর সোশ্যাল রিসার্চের ডেভিড কিড ও ইমানুয়েল কাস্তানোর একটি পরীক্ষা সায়েন্স জার্নালে ছাপা হয়। তাঁদের দাবি ছিল, সাহিত্যমানের গল্প–উপন্যাসের ছোট একটি অংশ পড়ার পর মানুষ অন্যের আবেগ ভালো পড়তে পারে।
তাঁদের এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু পরে বেশ কয়েকটি পুনরাবৃত্তি পরীক্ষায় একই ফল আসেনি। ২০১৮ সালে নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার–এ প্রকাশিত একটি বড় পুনর্মূল্যায়নেও এই ফলাফল টেকেনি।
কাজেই বিজ্ঞানের সৎ উত্তর হলো, উপন্যাস পড়লে সহমর্মিতা বা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বাড়ে কি না, তা এখনো বিতর্কিত। তবে এটুকু অন্তত বলা যায়, গল্প আমাদের অন্যের জুতোয় পা গলানোর অনুশীলনটা করায়। আর অনুশীলন কখনো বিফলে যায় না, তার ফল যত ছোটই হোক।
শব্দভান্ডারের ক্ষেত্রে অবশ্য বইপড়ার প্রমাণ অনেক মজবুত। যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী অ্যান কানিংহাম ও কিথ স্ট্যানোভিচের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের বেশির ভাগ নতুন শব্দ আসে আড্ডা বা টেলিভিশন থেকে নয়, ছাপা লেখা থেকে। কারণ কথ্য ভাষা তুলনায় সরল ও সীমিত শব্দে চলে, আর বইয়ে মেলে দুর্লভ, ঝকঝকে শব্দের ভান্ডার। শুধু শব্দের সংখ্যা নয়, ব্যবহারও শেখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী অ্যান কানিংহাম ও কিথ স্ট্যানোভিচের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের বেশির ভাগ নতুন শব্দ আসে আড্ডা বা টেলিভিশন থেকে নয়, ছাপা লেখা থেকে।
ধরুন, আপনি ‘অভিমান’ শব্দটা জানেন। গল্পে কোনো চরিত্রের আচরণের সঙ্গে শব্দটা বারবার দেখতে দেখতে বুঝে যান, অভিমান আর রাগ এক জিনিস নয়, আবার দুঃখের সঙ্গেও তার একটা যোগ আছে। বই শব্দ শেখায়, সঙ্গে শব্দের চারপাশের জগৎটাও শেখায়। বেশি পড়লে শব্দ বাড়ে, শব্দ বাড়লে আরও পড়া সহজ হয়, আর সেই সহজতা আবার আপনাকে পাতায় ফেরায়। এটা এক ধরনের সুখের চক্র, যেখানে ধনী আরও ধনী হয়। শিশুসাহিত্যের জাদুকর ডক্টর সিউসও ছড়ার ছলে কথাটা বলে গেছেন। যত বেশি পড়বে, তত বেশি জানবে। যত বেশি শিখবে, তত বেশি জায়গায় যেতে পারবে।
ছোটদের বেলায় এই চক্র শুরু হয় আরও আগে। যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে বই পড়ে কিংবা যাদের বাবা–মা গল্প পড়ে শোনান, তাদের শব্দভান্ডার অন্য শিশুদের চেয়ে দ্রুত বাড়ে। নতুন শব্দ আর বাক্যগঠনের কৌশল জানা থাকলে তারা সহজে নিজেদের প্রকাশ করতে পারে। সেটা একাডেমিক সাফল্য ও আত্মবিশ্বাস, দুটোই এগিয়ে দেয়।
এদিকে ২০১৮ সালের একটি মেটা-অ্যানালিসিসে ৩৮টি গবেষণা ও মোট ২ হাজার ৪৫৫ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিশুর সঙ্গে বই পড়ে গল্প নিয়ে কথা বলা এবং গল্পের শব্দ নিয়ে আলোচনা নতুন শব্দ শেখায় কার্যকর। শিশুকে শুধু গল্প শুনিয়ে গেলে হবে না, প্রশ্ন করতে হবে, কথোপকথনে টানতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে বই পড়ে কিংবা যাদের বাবা–মা গল্প পড়ে শোনান, তাদের শব্দভান্ডার অন্য শিশুদের চেয়ে দ্রুত বাড়ে।
আরও বড় একটি বিশ্লেষণে ১৯টি র্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় ২ হাজার ৫৯৪ শিশু অংশ নিয়েছিল। সেখানে অভিভাবক বা অন্য প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে একসঙ্গে বই পড়ার কর্মসূচি শিশুদের প্রকাশক্ষম ভাষা ও বোঝার ভাষা, দুই ক্ষেত্রেই ছোট কিন্তু পরিমাপযোগ্য উন্নতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাবা-মায়ের কোলে বসে বই পড়া শিশু শুধু ভাষা শেখে না। সে প্রশ্ন করতে শেখে, ছবি দেখে অনুমান করতে শেখে, গল্পের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখতে শেখে।
তাহলে করণীয় কী? প্রথম কথা, বইপড়াকে আত্মউন্নয়নের দুর্বহ কর্তব্য ভাববেন না। উপরের কোনো গবেষণাই বলে না যে কঠিন দর্শন গিলতেই হবে। বিজ্ঞানের কাছে দিনে কয়েক ঘণ্টা পড়ার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাও নেই। থ্রিলার, ভূতের গল্প, গোয়েন্দা কাহিনি, ভ্রমণ, জীবনী, ইতিহাস, বইয়ের ধরন যা-ই হোক, পড়ার সময় কৌতূহল জাগলেই কাজ হয়। দ্বিতীয়ত, ছয় মিনিট দিয়েই শুরু করা যায়। ঘুমোনোর আগে ফোনটা দূরে রেখে মাত্র দশ পাতা পড়ুন। তারপর পনেরো মিনিট, তারপর বিশ। সপ্তাহ শেষে দেখবেন, সাড়ে তিন ঘণ্টা কাছাকাছি চলে এসেছে।
মনে রাখবেন, একটি ভালো বই শুধু তথ্য দিয়ে যায় না, নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। ‘এরপর কী?’, ‘এমন হলো কেন?’, ‘আমি হলে কী করতাম?’—এসব প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় চিন্তার নতুন যাত্রা। বই শেষ হলে সেটা আর হাতে থাকে না, কিন্তু কোনো শব্দ, কোনো চরিত্র, কোনো দৃশ্য কিংবা একটি প্রশ্ন থেকে যায় মাথার ভেতর। হুট করে একদিন মনে পড়ে যায়। তখন বোঝা যায়, বইপড়া আসলে স্রেফ সময় কাটানো নয়, বরং মস্তিষ্কের সঙ্গে পৃথিবীর এক দীর্ঘ আলাপ।
বিজ্ঞানের কাছে দিনে কয়েক ঘণ্টা পড়ার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাও নেই। থ্রিলার, ভূতের গল্প, গোয়েন্দা কাহিনি, ভ্রমণ, জীবনী, ইতিহাস, বইয়ের ধরন যা-ই হোক, পড়ার সময় কৌতূহল জাগলেই কাজ হয়।
২০ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী আর্জেন্টাইন লেখক, কবি হোর্হে বোর্হেস জীবনের শেষ দিকে চোখের আলো হারিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের স্বর্গের কল্পনা করেছিলেন এক বিশাল গ্রন্থাগারের আদলে। তাঁর মতো একজন মানুষের এমন কল্পনার পর আমাদের আর কিছু বলার থাকে না। বই সবচেয়ে চমৎকার বাসস্থান, যেখানে ভাড়া লাগে না, আর ছাড়ার সময় ফিরে আসা যায় খানিকটা বড় হয়ে।
