ওপেন অফিস: একটি স্বপ্নের উত্থান ও ভাঙন

১৯৩০ সালে মার্কিন স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট এস. সি. জনসন ওপেন অফিসের নকশা করেছিলেনছবি: ক্যারল এম. হাইস্মিথ / বাইএনলার্জ/ গেটি ইমেজ

অফিসে নিজের ডেস্কে বসে একটি জরুরি কাজ করছেন। ঠিক সেই সময় পাশের ডেস্কে সহকর্মী হঠাৎ ফোনে কথা বলা শুরু করলেন উচ্চস্বরে। কিংবা উল্টো দিকের তিন–চারজন মিলে জুড়ে দিলেন অট্টহাসি। মুহূর্তের মধ্যেই আপনার মনোযোগ ভেঙে চুরমার। বিরক্তি জমে ওঠে মাথার ভেতর। কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই। কারণ এটাই ওপেন–প্ল্যান, বা খোলামেলা অফিসের অলিখিত ধর্ম।

আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়ায় কাঁচঘেরা দেয়ালহীন এই অফিসগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে প্রগতি, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে—এখানে কোনো দেয়াল নেই, কোনো দূরত্ব নেই, সবাই সমান। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই নকশা কি সত্যিই কাজের গতি বাড়ায়? নাকি এটি ধীরে ধীরে কর্মীদের ঠেলে দেয় এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর মানসিক চাপে?

আজকের দিনে ওপেন অফিস যতই জনপ্রিয় হোক না কেন, ধারণাটি মোটেও নতুন নয়। এ নিয়ে চিন্তাভাবনার বয়স প্রায় একশ বছর ছুঁইছুঁই। ১৯৩০-এর দশকে মার্কিন স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট এস. সি. জনসন কোম্পানির জন্য এমন এক অফিস নকশা করেছিলেন, যেখানে দেয়ালের বদলে গুরুত্ব পেয়েছিল খোলা পরিসর। তবে সেই ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে আরও পরে—গত শতকের ষাটের দশকে।

আধুনিক ওপেন অফিসের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যারে রাসায়নিক কোম্পানি ডুপন্ট তখন বড় পরিসরে এই ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। নিজেদের একটি অফিস ফ্লোর পুরোপুরি ভেঙে নতুনভাবে সাজানো হয়। দেয়াল সরিয়ে ফেলা হয় একেবারে। বিশাল এক কক্ষে সারি সারি ডেস্ক বসানো হয় কোনো রাখঢাক ছাড়াই। কেবল নিচু পার্টিশনের সাহায্যে সামান্য ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করা হয়েছিল। কোণার দিকে রাখা হয় কর্মীদের বিশ্রামকক্ষ, আধুনিক চেয়ার, আর নামী ডিজাইনারের তৈরি আসবাবপত্র।

এটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ওপেন অফিসের প্রথম বড় কর্পোরেট প্রয়োগ।

আরও পড়ুন
১৯৩০-এর দশকে মার্কিন স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট এস. সি. জনসন কোম্পানির জন্য এমন এক অফিস নকশা করেছিলেন, যেখানে দেয়ালের বদলে গুরুত্ব পেয়েছিল খোলা পরিসর।

জার্মান ডিজাইনারদের চিন্তাধারা থেকে অনুপ্রাণিত এই নকশার পেছনের যুক্তিটা ছিল স্পষ্ট। এর মূল লক্ষ্য ছিল কর্মক্ষেত্রে শ্রেণিবৈষম্য কমানো। কোম্পানিগুলো তখন বুঝতে শুরু করেছে—তাদের শুধু আদেশ পালনকারী কর্মী নয়, দরকার চিন্তাশীল মানুষ। যাদের বলা হয় নলেজ ওয়ার্কার। অর্থাৎ যারা কায়িক শ্রমের বদলে মেধা, বিশ্লেষণ ও সৃজনশীলতা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

সে সময় ধারণা করা হয়েছিল, কর্মীদের টেবিলের মাঝখানে দেয়াল না থাকলে পদমর্যাদার বাধা ভেঙে যাবে। ম্যানেজার ও জুনিয়র কর্মীর দূরত্ব কমবে। মানুষ সহজে একে অপরের কাছে যেতে পারবে, কথা বলতে পারবে, আইডিয়া ভাগ করে নিতে পারবে। ফলে তৈরি হবে পারস্পরিক সহযোগিতার এক প্রাণবন্ত পরিবেশ, যেখানে আলাপ থেকেই জন্ম নেবে নতুন চিন্তা, নতুন উদ্ভাবন, আর শেষ পর্যন্ত কোম্পানিরই লাভ হবে সবচেয়ে বেশি।

ডুপন্টের সেই পরীক্ষার পর কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অসংখ্য দেশে ওপেন অফিসই হয়ে উঠেছে কর্পোরেট নকশার মানদণ্ড। নতুন অফিস মানেই খোলা জায়গা, কাচের দেয়াল আর সারিবদ্ধ ডেস্ক। কিন্তু এত বছরের অভিজ্ঞতার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই নকশার জন্ম হয়েছিল, সেই স্বপ্ন কি সত্যিই পূরণ হয়েছে? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওপেন অফিস কর্মীদের জন্য পরিণত হয়েছে এক নীরব যন্ত্রণার স্থাপত্যে?

আরও পড়ুন
কোম্পানিগুলো তখন বুঝতে শুরু করেছে—তাদের শুধু আদেশ পালনকারী কর্মী নয়, দরকার চিন্তাশীল মানুষ। যাদের বলা হয় নলেজ ওয়ার্কার।

২.

ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো ধারণা কাগজে যতটা সুন্দর দেখায়, বাস্তবে তার রূপ ততটাই জটিল হয়ে ওঠে। ওপেন অফিসের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাবনা আর বাস্তবতার মাঝখানের ফারাক ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ওপেন অফিস নিয়ে প্রথম বড় ধরনের সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৭০ সালে। তত দিনে এই কর্মপরিবেশে কাজ করা মানুষের অভিজ্ঞতা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। সে সময় ১৮টি কোম্পানির ৩৫৮ জন কর্মীর মতামত নেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগগুলো ছিল প্রায় একই সুরে বাঁধা—অতিরিক্ত শব্দদূষণ, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, কাজের ছন্দ বারবার ভেঙে যাওয়া।

এরপর উঠে আসে আরও গভীর অসন্তোষ। অনেকেই জানান, সারাক্ষণ নিজেকে অন্যের নজরদারির ভেতরে আটকে থাকা মানুষের মতো মনে হয়। ব্যক্তিগত পরিসর বলতে কিছু নেই। কাজের শেষে ক্লান্তিও আগের চেয়ে অনেক বেশি। এক কর্মী তখন লিখেছিলেন,

‘এটা যেন পুরোপুরি উদোম একটা পরিবেশ—যেখানে গোপনীয়তা বলতে কিছুই নেই।’

আসলে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত অফিসে সামান্য গোপনীয়তাও খুব দুর্লভ। অথচ সেই সামান্যটুকুই মানুষের মানসিক স্বস্তির জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। এই অভাবই ওপেন অফিসের প্রতি কর্মীদের অস্বস্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তবু এসব অভিযোগ ওপেন অফিসের বিস্তার থামাতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নকশা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে। ২০২০ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ নলেজ ওয়ার্কার এখন ওপেন–প্ল্যান অফিসে কাজ করেন। কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে এর সুবিধাগুলো ছিল স্পষ্ট—কম জায়গায় বেশি মানুষ বসানো যায়, দেয়াল কম লাগে, খরচ কমে, আর তদারকিও সহজ হয়।

আরও পড়ুন
ওপেন অফিস নিয়ে প্রথম বড় ধরনের সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৭০ সালে। সে সময় ১৮টি কোম্পানির ৩৫৮ জন কর্মীর মতামত নেওয়া হয়।

কিন্তু যে প্রশ্নটি খুব কমই গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো—এই পরিবেশে মানুষ আসলে কেমন কাজ করছে? কর্মীদের কাছ থেকে কি সত্যিই আগের চেয়ে ভালো কাজ পাওয়া যাচ্ছে?

আশ্চর্যের বিষয়, কর্মীদের অভিযোগগুলো আজও প্রায় অবিকল রয়ে গেছে—ঠিক ১৯৭০ সালের মতোই। আধুনিক গবেষণাগুলো বলছে, অধিকাংশ কর্মীই এমন খোলামেলা অফিস পছন্দ করেন না। আরও বিস্ময়কর হলো—ওপেন অফিস কর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের আরও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা এখন একে অপরের সঙ্গে সরাসরি কথা কম বলেন; তার চেয়ে অনেক বেশি যোগাযোগ করেন ই–মেইল বা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে।

অধিকাংশ কর্মীই এমন খোলামেলা অফিস পছন্দ করেন না
ছবি: হাফটন / ক্রো / ভিউ পিকচার্স / ইউনিভার্সাল ইমেজ / গেটি ইমেজ

অফিস মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণার ফল একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে। প্রথমত, ওপেন অফিস বাস্তবে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ায় না, বরং অনেক সময় তার বিপরীত ফল তৈরি করে।

এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল আরও আগেই। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বলা হয়, ওপেন–প্ল্যান অফিসে কাজ করলে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কমে যায়। ছয় হাজারের বেশি কর্মীর ওপর করা সেই সমীক্ষায় দেখা যায়, খোলামেলা অফিসে থাকা কর্মীরা অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন—এই ভয়ে যে পাশের কেউ গোপন আলাপ শুনে ফেলতে পারে। এই অনুভূতির কথা কর্মীরাই সরাসরি জানিয়েছেন। চার দশক পেরিয়ে গেলেও সেই মানসিকতায় খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি।

আরও পড়ুন
১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বলা হয়, ওপেন–প্ল্যান অফিসে কাজ করলে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কমে যায়।

এই পর্যবেক্ষণকে আরও শক্ত ভিত দেয় ২০১৮ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষণা। গবেষক ইথান বার্নস্টিন ও স্টিফেন টারবান বিশেষ সেন্সর ব্যবহার করে ওপেন অফিসে কর্মীদের আচরণ বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো। ব্যক্তিগত কক্ষ থেকে ওপেন ফ্লোরে স্থানান্তরের পর কর্মীদের সামনাসামনি কথা বলার পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যায়—অর্থাৎ তা নেমে আসে প্রায় এক–তৃতীয়াংশে। বিপরীতে বেড়ে যায় ই–মেইল ও ডিজিটাল বার্তার ব্যবহার।

কিন্তু এমন কেন হলো?

গবেষণায় দেখা যায়, গোপনীয়তার অভাবই এর মূল কারণ। খোলামেলা পরিবেশে কর্মীরা জনসমক্ষে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। পাশের মানুষটি বিরক্ত হতে পারেন, কিংবা ব্যক্তিগত কথা শুনে ফেলতে পারেন—এই আশঙ্কায় তারা মুখোমুখি আলাপের বদলে নিরাপদ ডিজিটাল মাধ্যম বেছে নেন। অর্থাৎ, কর্মীদের মাঝখানের দৃশ্যমান দেয়াল তুলে দেওয়া হলেও তাদের মাঝখানে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য মানসিক দেয়াল। ফলাফল—নিকটতা নয়, বরং আরও বেশি দূরত্ব।

এদিকে ওপেন অফিস নারীদের জন্য তৈরি করেছে ভিন্নমাত্রার মানসিক চাপ। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, খোলামেলা পরিবেশে নারীরা ‘ফিশবোল ইফেক্ট’-এ ভোগেন—নিজেকে যেন কাঁচের অ্যাকুরিয়ামের ভেতর থাকা মাছের মতো মনে হয়। ২০১৮ সালের একটি কেস স্টাডিতে নারীরা জানান, তাঁদের মনে হয় সারাক্ষণ কেউ না কেউ তাকিয়ে আছে বা বিচার করছে। ফলে কাজের চেয়ে অনেক সময়ই তাঁদের মনোযোগ চলে যায় নিজের পোশাক, আচরণ কিংবা বাহ্যিক উপস্থিতির দিকে।

পুরুষ সহকর্মীদের মধ্যে এ ধরনের উদ্বেগ প্রায় অনুপস্থিত। তাঁরা তুলনামূলকভাবে কম অভিযোগ করেছেন। অথচ বাস্তবতা হলো—অফিসের নকশা ও ডিজাইনের সিদ্ধান্ত যাঁরা নেন, তাঁদের বড় অংশই পুরুষ। গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, ডিজাইনের সময় লিঙ্গভিত্তিক অভিজ্ঞতা বা মানসিক চাপের বিষয়টি প্রায় কখনোই বিবেচনায় আনা হয়নি।

এই অসম অভিজ্ঞতা ওপেন অফিসের আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য উন্মোচন করে—এই নকশা কেবল কাজের পরিবেশ নয়, কর্পোরেট ক্ষমতার কাঠামোকেও আরও দৃশ্যমান করে তোলে।

আরও পড়ুন
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, খোলামেলা পরিবেশে নারীরা ফিশবোল ইফেক্টে ভোগেন—নিজেকে যেন কাঁচের অ্যাকুরিয়ামের ভেতর থাকা মাছের মতো মনে হয়।

৩.

নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বহু দেশে ওপেন অফিসের আরও একটি নতুন রূপ চালু হয়। এর নাম দেওয়া হয় নন–টেরিটোরিয়াল অফিস—যা বেশি পরিচিত ‘হট ডেস্কিং’ নামে। অনেকের চোখে এটি ছিল আধুনিকতার প্রতীক, কিন্তু বাস্তবে এটি হয়ে ওঠে ওপেন অফিসের সবচেয়ে চরম সংস্করণ। যেন কর্পোরেট দুনিয়ার মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা। খরচ কমানোর তাগিদে কোম্পানিগুলো এমন এক ব্যবস্থার জন্ম দেয়, যেখানে কর্মীদের আর কোনো ব্যক্তিগত সিটই থাকে না।

এই পদ্ধতিতে অফিসে কারও নির্দিষ্ট ডেস্ক নেই। প্রতিদিন সকালে কর্মীরা অফিসে এসে স্কুলের ক্যান্টিনের মতো ফাঁকা সিট দখলের লড়াইয়ে নামেন। যে ডেস্ক খালি পাওয়া যায়, সেখানেই বসতে হয়। আজ এখানে, কাল অন্য কোথাও। পরিচিত কোনো জায়গা নেই, স্থায়িত্ব নেই, নিজের বলে কিছু নেই। ২০২০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দশজন কর্মীর একজন এই ব্যবস্থার ভেতরে পড়েছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের অফিসে কর্মীদের স্বাস্থ্য ও চাকরি–সন্তুষ্টি থাকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। নিজের নির্দিষ্ট জায়গা না থাকাটা মানুষের মনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে—যার সবটা কাগজে–কলমে ধরা পড়ে না। ডেস্ক শুধু কাজের টেবিল নয়; সেটি মানুষের পরিচয়ের অংশ, নিরাপত্তাবোধের একটি ছোট আশ্রয়। সেই আশ্রয় হারিয়ে গেলে কর্মীদের মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।

এই পর্যবেক্ষণকে আরও স্পষ্ট করে তোলে ২০১৮ সালে স্টকহোমে পরিচালিত একটি বড় গবেষণা। সুইডিশ গবেষক ক্রিস্টিনা বডিন ড্যানিয়েলসন ৪৬৯ জন কর্মীর ওপর করা সমীক্ষায় দেখান, যেসব কর্মীর নিজস্ব কক্ষ আছে, তাদের স্বাস্থ্য ও চাকরি–সন্তুষ্টি সবচেয়ে ভালো। তার পরেই অবস্থান ফ্লেক্স অফিসের—যেখানে খোলামেলা জায়গার পাশাপাশি নির্দিষ্ট নীরব কক্ষ থাকে। আর সবচেয়ে খারাপ ফল দেখা যায় সেসব অফিসে, যেখানে কারও জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নেই।

আরও পড়ুন
অনেকের চোখে নন–টেরিটোরিয়াল অফিস ছিল আধুনিকতার প্রতীক, কিন্তু বাস্তবে এটি হয়ে ওঠে ওপেন অফিসের সবচেয়ে চরম সংস্করণ। যেন কর্পোরেট দুনিয়ার মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা।

ড্যানিয়েলসনের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ফ্লেক্স অফিস ঐতিহ্যবাহী ওপেন অফিসের চেয়েও ভালো কাজ করে। কারণ এখানে কর্মীরা পরিস্থিতি অনুযায়ী স্থান বেছে নিতে পারেন—কখনো একা বসে গভীর মনোযোগে কাজ, আবার কখনো দলগত আলোচনা। একই জায়গা সবার জন্য চাপিয়ে দেওয়ার বদলে এখানে থাকে বিকল্পের স্বাধীনতা।

ইদানীং কর্পোরেট ম্যানেজাররাও এই বাস্তবতা স্বীকার করতে শুরু করেছেন। তাঁদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে বলছেন, মূলত ভাড়া ও ইউটিলিটি খরচ কমানোর জন্যই হট ডেস্কিং বা অতিরিক্ত খোলামেলা অফিস চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ফল হয়েছে উল্টো। কর্মীদের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, অসুস্থতার কারণে ছুটি নেওয়ার হার বেড়ে যাওয়া—এই গুপ্ত খরচগুলো দীর্ঘদিন হিসাবের বাইরে থেকে গেছে।

তবে গবেষণাগুলো একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—সমস্যা খোলামেলা জায়গা নয়, সমস্যা হলো বিকল্পের অভাব। অফিসে যদি পর্যাপ্ত নীরব কক্ষ, ছোট কাজের ঘর কিংবা ব্রেকআউট রুম থাকে, তাহলে কর্মীরা তুলনামূলকভাবে সন্তুষ্ট থাকেন। সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন পর্যাপ্ত জায়গা না রেখেই গাদাগাদি করে কর্মী বসানো হয়।

ওপেন অফিসের দুর্বলতাগুলো সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কোভিড–১৯ মহামারির সময়। হঠাৎ করেই কোটি কোটি মানুষ অফিস ছেড়ে বাড়িতে বসে কাজ শুরু করেন। যাদের নিয়ে আশঙ্কা ছিল—তারা হয়তো ঠিকমতো কাজ করবেন না—তাদের অনেকেই প্রমাণ করে দেন ঠিক উল্টোটা। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, কর্মীরা আরও মনোযোগী হয়েছেন, আরও কার্যকর হয়েছেন।

খোলামেলা পরিবেশে কর্মীরা জনসমক্ষে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন
ছবি: পেজ সাউদারল্যান্ড পেজ

এই অভিজ্ঞতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—অফিসে বসে থাকা আর কাজ করা এক বিষয় নয়।

মহামারী আরও একটি বাস্তবতা সামনে এনে দেয়। খোলা অফিস মানেই জীবাণু ছড়ানোর স্বর্গ। বহু আগেই গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছিল যে ভাগাভাগি করা কর্মপরিবেশে সংক্রমণের ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। যেমন ১৯৯৫ সালে ফিনল্যান্ডে করা এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, রুম শেয়ার করলে বা খোলামেলা জায়গায় বসলে সর্দি–কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় এক–তৃতীয়াংশ বেড়ে যায়।

কোভিড মহামারীতে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেয়।

একই সঙ্গে এই সময় প্রমাণ করে দেয়, আধুনিক অফিসের বড় একটি অংশ বাসা থেকে বা রিমোটভাবে করা সম্ভব—এবং তাতে কাজের মান কমে না। এর ফলেই এখন ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে হাইব্রিড মডেল—সপ্তাহে দু–একদিন অফিস, বাকি সময় দূর থেকে কাজ।

এই অভিজ্ঞতাগুলো মিলিয়ে একটাই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসে দাঁড়ায়—যদি অফিস ছাড়া কাজ সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যতের অফিস আসলে কেমন হওয়া উচিত?

আরও পড়ুন
১৯৯৫ সালে ফিনল্যান্ডে করা এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, রুম শেয়ার করলে বা খোলামেলা জায়গায় বসলে সর্দি–কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় এক–তৃতীয়াংশ বেড়ে যায়।

৪.

তাহলে এই দীর্ঘ অচলাবস্থার সমাধান কী?

এই প্রশ্নের মাঝেই নতুন এক দিক থেকে আলো আসতে শুরু করে। স্থপতি ও ডিজাইনাররা ধীরে ধীরে একটি বিষয়ে একমত হচ্ছেন—একই মাপের বা একই ধরনের পরিবেশ একটি অফিসের সব কর্মীর জন্য কখনোই সমানভাবে কার্যকর হতে পারে না। মানুষের কাজের ধরন আলাদা, মানসিক চাহিদা আলাদা, সামাজিক অভ্যাসও একে অপরের থেকে ভিন্ন। ফলে যে জায়গায় একজন নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন, সেই একই পরিবেশ অন্য কারও জন্য হয়ে উঠতে পারে চরম বিরক্তিকর।

এই উপলব্ধি থেকেই নব্বইয়ের দশক থেকে অফিস নকশায় একক কাঠামোর বদলে বৈচিত্র্যের কথা ভাবতে শুরু করেন ডিজাইনাররা।

এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় অফিসকে ভাগ করার ধারণা—অনেকটা শহরের পাড়ার মতো করে। প্রতিটি বিভাগ যেন নিজের কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী সাজানো একটি আলাদা ‘পাড়া’ পায়। যেমন হিসাবরক্ষকদের জন্য শান্ত, নিয়মতান্ত্রিক ওয়ার্কস্টেশন; আবার মার্কেটিং বা সৃজনশীল দলের জন্য সোফা, হোয়াইটবোর্ড আর খোলামেলা আলোচনার জায়গায় ভরা প্রাণবন্ত অঞ্চল। একই ছাদের নিচেই তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন কাজের পরিবেশ।

এই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বৈচিত্র্য—যাকে ডিজাইনের ভাষায় বলা হয় ‘স্পেকট্রাম অব স্পেস’। অর্থাৎ অফিসে এমন পরিসর থাকতে হবে যেখানে কর্মীরা চাইলে গভীর একাগ্রতায় নিঃশব্দে কাজ করতে পারবেন, আবার প্রয়োজন হলে সহকর্মীদের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারবেন। এত দিন অফিস তৈরি হয়েছে মূলত ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কিংবা খরচ কমানোর অঙ্ক কষে। কিন্তু যারা প্রতিদিন আট ঘণ্টা সেই জায়গায় বসে কাজ করেন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা খুব কমই নকশার কেন্দ্রে এসেছে।

ভবিষ্যতের অফিস তাই কোনো একক ছাঁচে বাঁধা থাকবে না। তা হবে নমনীয়, বহুরূপী এবং সর্বোপরি মানবিক।

আরও পড়ুন
হিসাবরক্ষকদের জন্য শান্ত, নিয়মতান্ত্রিক ওয়ার্কস্টেশন; আবার মার্কেটিং বা সৃজনশীল দলের জন্য সোফা, হোয়াইটবোর্ড আর খোলামেলা আলোচনার জায়গায় ভরা প্রাণবন্ত অঞ্চল।

এই চিন্তাধারা থেকেই জন্ম নেয় ‘ইনক্লুসিভ ডিজাইন’-এর ধারণা—এমন নকশা, যা কোনো নির্দিষ্ট ধরনের মানুষের জন্য নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে একসঙ্গে বিবেচনায় আনে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তৈরি করেছেন ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ডিজাইনার হ্যানসেল বাউমান। গ্যালাউডেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যে নকশা বাস্তবায়ন করেন, তার নাম দেওয়া হয় ‘ডেফস্পেস’।

এই নকশায় খোলা জায়গা রয়েছে, কিন্তু সেখানে অযাচিত খোলামেলা ভাব নেই। মানুষ একে অপরকে দেখতে পারে, যোগাযোগ রাখতে পারে—কিন্তু সারাক্ষণ অন্যের দৃষ্টির ভেতরে বন্দি হয়ে থাকে না। প্রয়োজন অনুযায়ী রয়েছে আধা–বন্ধ জায়গা—যেখানে মানুষ একদিকে অন্যদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে, আবার একই সঙ্গে নিজেকে নিরাপদ ও স্বস্তিতে রাখতে পারে।

ডেফস্পেসের লক্ষ্য একটাই—কর্মীরা যেন নিজের শরীর ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। কেউ চাইলে সবার সঙ্গে বসে কাজ করবে, আবার কেউ চাইলে কয়েক ঘণ্টার জন্য নিঃশব্দে নিজের জগতে ডুবে যাবে। এই স্বাধীনতাটুকুই ছিল ওপেন অফিসের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি।

ডেফস্পেসের মূল বক্তব্য খুব পরিষ্কার—একই পরিবেশ সবার জন্য কাজ করে না। অফিস হওয়া উচিত এমন জায়গা, যেখানে মানুষ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী স্থান বেছে নিতে পারে। কেউ খোলা জায়গায় বসে কাজ করবে, কেউ নীরব কক্ষে ঢুকে যাবে, কেউ আধা–বন্ধ এলাকায় আলোচনা করবে। আলো, শব্দ, দৃষ্টিসীমা—সব কিছুর মধ্যেই থাকতে হবে বিকল্প ও বৈচিত্র্য।

আরও পড়ুন
ডেফস্পেসের লক্ষ্য একটাই—কর্মীরা যেন নিজের শরীর ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। কেউ চাইলে সবার সঙ্গে বসে কাজ করবে, আবার কেউ চাইলে কয়েক ঘণ্টার জন্য নিঃশব্দে নিজের জগতে ডুবে যাবে।

গবেষকেরাও বলছেন, এই পরিবর্তন এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি জরুরি। কর্মীদের শুধু মতামত জানতে চাইলেই হবে না; তাদের বলা কথাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তব নকশায় প্রয়োগ করতে হবে। কোন জায়গায় তারা শব্দে বিরক্ত হন, কোথায় আলো চোখে লাগে, কোন পরিবেশে তারা সবচেয়ে মনোযোগী হয়ে কাজ করতে পারেন—এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলোই আসলে একটি অফিসকে কার্যকর কিংবা ব্যর্থ করে তোলে।

ডেফস্পেসের মতো ধারণা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের অফিস আর সারি সারি একঘেয়ে ডেস্কের সমষ্টি হয়ে থাকবে না। তা হবে নানা ধরনের জায়গার সমন্বয়ে গড়া একটি জীবন্ত কর্মপরিবেশ—একটি পূর্ণাঙ্গ ‘স্পেকট্রাম অব স্পেস’।

গবেষকেরা বলেন, আধুনিক ডিজাইনারদের মাথায় রাখতে হবে দেয়াল তুলে দেওয়াটাই আধুনিকতা নয়। বরং মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং মানসিক প্রশান্তিকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মক্ষেত্র সাজানোই হলো আগামীর সত্যিকারের পথ।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন