ভবিষ্যদ্বাণী করা সব সময়ই কঠিন। তবুও বিজ্ঞানের বর্তমান গতিপথ দেখে আমরা আন্দাজ করতে পারি, আজ থেকে ২৫-৩০ বছর পর আমাদের প্রাত্যহিক জীবন কেমন হতে পারে। ২০৫০ সালে আমরা হয়তো চাঁদের কোনো ক্যাফেতে বসে অ্যান্টি-এজিং কফিতে চুমুক দেব! চলুন, আজ এমন ১০টি প্রযুক্তি নিয়ে জেনে নেওয়া যাক, যা আমাদের পৃথিবীকে চিরতরে বদলে দিতে পারে।
ভবিষ্যতে ওষুধ মানে কেবল বড়ি বা ইনজেকশন নয়, ব্যবহৃত হবে ন্যানোপ্রযুক্তি। এই ন্যানোপ্রযুক্তি কাজ করে মিটারের ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগ ক্ষুদ্র পরিসরে। আমাদের একটি চুলের প্রস্থই যেখানে ৮০ থেকে ১০০ হাজার ন্যানোমিটার, সেখানে এই প্রযুক্তি কতটা সূক্ষ্ম হতে পারে ভাবুন! ন্যানোমিটার স্কেলের ক্ষুদ্র রোবট সরাসরি শরীরের আক্রান্ত কোষে ওষুধ পৌঁছে দেবে। এমনকি মস্তিষ্কের ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার ভেদ করে আলঝেইমার বা ক্যানসারের চিকিৎসায় সরাসরি অংশ নেবে এই খুদে চিকিৎসকেরা।
একসময় গ্রহাণু বা চাঁদে খনি খননের কথা কেবল মুভিতে দেখা যেত। কিন্তু এখন এটি বড় ব্যবসার ক্ষেত্র। চাঁদে থাকা প্রচুর পরিমাণ হিলিয়াম-৩ আইসোটোপ পৃথিবীর ফিউশন রিঅ্যাক্টরের প্রধান জ্বালানি হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, চীন পরিকল্পনা করছে ২০৫০ সালের মধ্যে মহাকাশে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের, যা মাইক্রোওয়েভের মাধ্যমে পৃথিবীতে অফুরন্ত বিদ্যুৎ পাঠাবে।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিয়ে আমাদের ঝামেলার শেষ নেই। চার্জ হতে সময় লাগে, আবার স্থায়িত্বও কম। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আসবে সিলিকন অ্যানোড বা মেটাল-এয়ার ব্যাটারি। তবে সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটাবে সুপারক্যাপাসিটর। এটি সেকেন্ডের মধ্যে চার্জ হবে এবং লিথিয়াম ব্যাটারির তুলনায় কয়েক শ গুণ বেশি টেকসই হবে।
আয়রনম্যান মুভির টনি স্টার্কের মতো হাতের ইশারায় বাতাসে ভেসে থাকা কম্পিউটার স্ক্রিন ব্যবহার করতে চান? এত দিন শুধু মুভিতে দেখে থাকলেও স্পেশিয়াল কম্পিউটিংয়ের মাধ্যমে এটি সম্ভব হচ্ছে। ২০৫০ সাল নাগাদ স্মার্টফোন হয়তো জাদুঘরে চলে যাবে। তার বদলে আসবে হালকা চশমার মতো ডিভাইস, যা আপনার চোখের সামনে ভেসে থাকা ডিজিটাল জগতের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করতে দেবে। চোখের মণির নড়াচড়া ও গলার স্বরেই চলবে সব কাজ।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগেই আপনার স্মার্টওয়াচ ও সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে একটি ‘ভার্চ্যুয়াল আপনি’ তৈরি করা হবে। একে বলা হয় ডিজিটাল টুইন। আপনি কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ খেলে বা ডায়েট করলে শরীরের ওপর তার কী প্রভাব পড়বে, তা আগেভাগেই আপনার এই ডিজিটাল সংস্করণের ওপর পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া যাবে।
বংশগত রোগ কি চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব? ক্রিসপার প্রযুক্তি বলছে, হ্যাঁ। ২০৫০ সালের মধ্যে জিন সম্পাদনা এতই উন্নত হবে যে, জন্মের আগেই ভ্রূণ থেকে জটিল রোগের ডিএনএ সরিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। এমনকি ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি রোগ ডিএনএ পর্যায়ে সারিয়ে তোলা সম্ভব হবে।
মেটাম্যাটেরিয়ালস এমন এক অদ্ভুত জিনিস, যা আলোর গতিপথ বদলে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন এমন আবরণ নিয়ে, যা কোনো বস্তুর ওপর রাখলে সেটি অদৃশ্য হয়ে যাবে! এ ছাড়া আসবে সেলফ-হিলিং কংক্রিট। অর্থাৎ রাস্তা বা দালানে ফাটল ধরলে বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে তা নিজে নিজেই সেরে যাবে, মানুষের হাত দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
বর্তমান সুপার কম্পিউটারের চেয়ে কয়েক কোটি গুণ শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত হবে, তখন বিজ্ঞানের জটিল সব সমস্যার সমাধান হবে মুহূর্তেই। এই এআই হবে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য এবং স্বচ্ছ।
পৃথিবীর কক্ষপথ এখন আবর্জনায় ঠাসা। ঘণ্টায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার বেগে ছোটা একটি ছোট স্ক্রুও মহাকাশযানের জন্য মারণাস্ত্র হতে পারে। ২০৫০ সালের মধ্যে লেজার বা বিশাল জালের সাহায্যে এই আবর্জনা পরিষ্কার করার প্রযুক্তি নিয়মিত ব্যবহার করা হবে।
নিউক্লিয়ার ফিশন নয়, বরং নক্ষত্রের মতো পরমাণু জোড়া লাগিয়ে ভবিষ্যতে নিরাপদ ও প্রায় অফুরন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। এতে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম তৈরি হয় এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ফিশন প্রযুক্তির চেয়ে অনেক কম। ফলে এটি বেশি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব শক্তির সম্ভাবনাময় উৎস।