গাছপালা কীভাবে এত দক্ষভাবে সূর্যের আলো থেকে খাবার তৈরি করে
শুধু রোদ পোহালেই যদি মানুষের ক্ষুধা মিটে যেত, তাহলে কেমন হতো? আমাদের জন্য এটা কাল্পনিক দৃশ্য হলেও গাছপালা, শৈবাল এবং ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার জন্য এটি প্রতিদিনের ঘটনা। তাদের এমন এক অসাধারণ ক্ষমতা আছে, যা মানুষের থাকলে তাকে প্রায় অতিমানব বলা যেত। তারা সূর্যের আলোকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে! ভাবো তো, সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার আর রাতের খাবার—সবকিছুর বদলে শুধু রোদ পোহালেই যদি বেঁচে থাকা যেত, তাহলে কেমন হতো? তাহলে আর থামায় কে!
প্রকৃতির এই স্বনির্ভর জীবেরা সূর্যের আলো থেকে ফোটন বা আলোর কণা শোষণ করে। সেই আলোর শক্তি কাজে লাগিয়ে তারা কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি থেকে তৈরি করে গ্লুকোজ বা শর্করা। এই গ্লুকোজ থেকেই গাছাপালা পায় বেড়ে ওঠার শক্তি। আর এই প্রক্রিয়ার উপজাত হিসেবে বাতাসে ছেড়ে দেয় অক্সিজেন।
এই পুরো প্রক্রিয়ার নাম সালোকসংশ্লেষণ বা ফটোসিন্থেসিস। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া। সালোকসংশ্লেষণ না থাকলে গাছপালা নিজেদের দেহের ভর বা বায়োমাস বাড়াতে পারত না কিংবা বাতাসে অক্সিজেনও ছাড়তে পারত না। ফলে প্রাণীদের খাবার ও শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন—দুটোরই অভাব হতো। সালোকসংশ্লেষণ না থাকলে আমাদের চেনা এই নীল-সবুজ পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ ঘটাই অসম্ভব হয়ে পড়ত।
পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই সালোকসংশ্লেষণ ঘটে। বিশাল বিশাল সিকোয়া গাছের ভেতরেও এই প্রক্রিয়া চলে। এসব গাছ অন্য সব গাছকে ছাড়িয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার সমুদ্র, হ্রদ ও নদীর ওপরের পানিতে ভেসে বেড়ানো অণুবীক্ষণিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের মধ্যেও ঘটে সালোকসংশ্লেষণ।
প্রকৃতির এই স্বনির্ভর জীবেরা সূর্যের আলো থেকে ফোটন বা আলোর কণা শোষণ করে। সেই আলোর শক্তি কাজে লাগিয়ে তারা কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি থেকে তৈরি করে গ্লুকোজ বা শর্করা।
এই প্রক্রিয়ায় সূর্যের শক্তি ধরে রাখা হয় এবং তা গাছপালা ও অন্যান্য জীবের দেহে জৈব পদার্থ হিসেবে জমা হয়। স্থলভাগে এভাবে সূর্য থেকে শক্তি সঞ্চয়ের হার প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০ টেরাওয়াট। মানুষের সারা পৃথিবীর মোট বিদ্যুৎ ও অন্যান্য শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতার প্রায় ছয় গুণ এটি! স্থলভাগ ও সমুদ্রের সব সালোকসংশ্লেষণকারী জীব মিলে প্রতি বছর বায়ুমণ্ডল থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টন কার্বন গ্রহণ করে। এরপর নিজেদের দেহের জৈব পদার্থ তৈরিতে সেই কার্বন কাজে লাগায়। সত্যিই বিস্ময়কর ব্যাপার! সূর্যের আলো বা সৌর শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে বদলে ফেলার এক চমৎকার কৌশল কাজে লাগিয়েই তারা এমনটা করতে পারে।
সালোকসংশ্লেষণকারী সব জীবের মধ্যেই আলো শোষণের জন্য বিশেষ পিগমেন্ট বা রঞ্জক পদার্থ থাকে। এগুলো এমন কিছু অংশের মধ্যে সাজানো থাকে, যেগুলোকে বলা হয় অ্যান্টেনা।
এই অ্যান্টেনাগুলো সূর্যের আলো ক্যাপচার করে। গাছপালা ও শৈবালের ক্ষেত্রে এসব রঞ্জক থাকে ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরে। ক্লোরোপ্লাস্ট হলো কোষের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা অতি ক্ষুদ্র অঙ্গাণু।
গাছপালায় আলো শোষণের প্রধান রঞ্জক পদার্থের নাম ক্লোরোফিল১। দৃশ্যমান আলোর প্রায় সব রংই শোষণ করে ক্লোরোফিল, শুধু সবুজ রংটি বাদে। তাই সবুজ আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে ফিরে আসে। এ কারণেই গাছপালাকে সবুজ দেখায়। এই সবুজ রংই গাছপালার পরিচিত, স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের বড় একটি অংশ।
স্থলভাগ ও সমুদ্রের সব সালোকসংশ্লেষণকারী জীব মিলে প্রতি বছর বায়ুমণ্ডল থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টন কার্বন গ্রহণ করে। এরপর নিজেদের দেহের জৈব পদার্থ তৈরিতে সেই কার্বন কাজে লাগায়।
অন্যদিকে, শৈবালের ক্লোরোপ্লাস্টে থাকে নানা ধরনের আলোক-শোষণকারী রঞ্জক পদার্থ। এ কারণেই বিভিন্ন প্রজাতির শৈবালের রংও বিভিন্ন হয়। যেমন, লাল শৈবাল সমুদ্রের অনেক গভীরেও বেঁচে থাকার উপযোগী হয়ে উঠেছে। আবার বড় বড় বাদামি শৈবাল মিলে সমুদ্রের তলদেশে তৈরি করে বিশাল কেল্প বন। এসব শৈবালের রং ও বেঁচে থাকার কৌশল তাদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
গাছপালা ও শৈবালের সঙ্গে সালোকসংশ্লেষণকারী ব্যাকটেরিয়ার একটি পার্থক্য আছে। ব্যাকটেরিয়ার কোষে কোনো ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে না। তাদের আলো শোষণকারী রঞ্জক পদার্থ ছড়িয়ে থাকে কোষের বাইরের আবরণ বা ঝিল্লিজুড়ে।
অর্থাৎ, সূর্যের আলো ধরে শক্তি তৈরির ব্যবস্থা গাছপালা, শৈবাল ও ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে কিছুটা আলাদা হলেও লক্ষ্য একটাই—আলোর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি তৈরি করা।
আলোক-শোষণকারী রঞ্জক পদার্থ যখন সূর্যের আলোর একটি ফোটন শোষণ করে, তখন তার অণুর ভেতরের একটি ইলেকট্রন শক্তি পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উচ্চতর শক্তিস্তরে উঠে যায়। এভাবেই সূর্যের শক্তি ধরা পড়ে। ইলেকট্রনটি আগের অবস্থান ছেড়ে চলে যাওয়ায় সেখানে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। ফোটন এসে ইলেকট্রনটিকে উত্তেজিত করার আগে সে ওই জায়গাতেই ছিল।
সূর্যের আলো ধরে শক্তি তৈরির ব্যবস্থা গাছপালা, শৈবাল ও ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে কিছুটা আলাদা হলেও লক্ষ্য একটাই—আলোর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি তৈরি করা।
এই ফাঁকা জায়গাটি আসলে ধনাত্মক আধানযুক্ত কণার মতো আচরণ করে। আর ইলেকট্রোস্ট্যাটিক বা বৈদ্যুতিক আকর্ষণ বলের কারণে তা উচ্চতর শক্তিস্তরে উঠে যাওয়া ইলেকট্রনকে নিজের সঙ্গে বেঁধে রাখে। এই বাঁধা অবস্থাটির নাম এক্সাইটন। ব্যাপারটা অনেকটা হাইড্রোজেন পরমাণুর মতো। সেখানে ঋণাত্মক চার্জের ইলেকট্রন ধনাত্মক চার্জের প্রোটনের সঙ্গে বাঁধা থাকে। এক্সাইটন তৈরি হওয়ার পর থেকে উত্তেজিত ইলেকট্রনটি আবার আগের শক্তিস্তরে ফিরে এসে ফাঁকা জায়গাটি পূরণ করা পর্যন্ত সেটা অনেকটা একটি কণার মতো আচরণ করে।
এক্সাইটনের বহন করা শক্তি এরপর পৌঁছে যায় কাছাকাছি একটি বিশেষ স্থানে। এর নাম বিক্রিয়াকেন্দ্র বা রিঅ্যাকশন সেন্টার। সেখানে পৌঁছানোর আগে শক্তিটি আশপাশের একাধিক রঞ্জক অণুর মধ্য দিয়ে একের পর এক ইলেকট্রনের উত্তেজনার মাধ্যমে এগিয়ে যায়।
রিঅ্যাকশন সেন্টারটিও আলো-শোষণকারী পিগমেন্ট দিয়েই তৈরি। তবে এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একে আশেপাশের অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে।
বিক্রিয়াকেন্দ্র শক্তি পেলে এটি একটি উত্তেজিত ইলেকট্রন অন্য একটি অণুকে দিয়ে দিতে পারে। মানে উত্তেজিত ইলেকট্রন দান করতে পারে।
এই বিশেষ ক্ষমতার কারণেই সালোকসংশ্লেষণের সময় যে রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো ঘটে, সেগুলো শুরু করাতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে বিক্রিয়াকেন্দ্রই।
সালোকসংশ্লেষণের কাজ হলো সূর্যের আলোয় ইলেকট্রনের মধ্যে তৈরি হওয়া শক্তিকে ধাপে ধাপে আরও স্থিতিশীল রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
ইলেকট্রন এক অণু থেকে অন্য অণুতে যাওয়ার ফলে বৈদ্যুতিক চার্জ আলাদা হয়ে যায়। এর ফলে তৈরি হয় এক ধরনের ইলেকট্রোকেমিক্যাল পোটেনশিয়াল বা বৈদ্যুতিক-রাসায়নিক বিভব। এই বিভব কাজে লাগিয়ে একটি কোষ তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ একটি অণু। এই অণুর নাম অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট বা সংক্ষেপে এটিপি২ (ATP)। এটিপিকে ভাবা যায় রাসায়নিক শক্তি জমিয়ে রাখার ছোট্ট এক ভান্ডার হিসেবে। কোষের ভেতরে যত ধরনের জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, সেগুলো চালানোর জন্য শক্তি জোগায় এই অণু। বলা যায়, কোষের ভেতরের সব কাজকর্ম সচল রাখার পেছনে এটিপির বড় ভূমিকা রয়েছে।
প্রাণীদের খাবার ভেঙে এটিপি তৈরি করতে হয়। কিন্তু গাছপালা সূর্যের আলো কাজে লাগিয়েই নিজেরা এটিপি তৈরি করতে পারে। ব্যাপারটা যেন এমন—প্রাণীদের টাকা জোগাড় করতে হলে কিছু একটা বিক্রি করতে হয়, আর গাছপালার হাতে আছে নিজেদের টাকা ছাপানোর যন্ত্র!
গাছপালা এই এটিপি কাজে লাগিয়ে বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে গ্লুকোজ তৈরি করে। গ্লুকোজ হলো একধরনের শর্করা, যা শক্তির জোগান দেয় এবং তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। মোটকথা, সালোকসংশ্লেষণের কাজ হলো সূর্যের আলোয় ইলেকট্রনের মধ্যে তৈরি হওয়া শক্তিকে ধাপে ধাপে আরও স্থিতিশীল রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
সূর্যের আলোকে রাসায়নিক শক্তিতে বদলে ফেলার কাজে সালোকসংশ্লেষণকারী জীবেরা অবিশ্বাস্য রকম দক্ষ। আলোক-শোষণকারী রঞ্জক পদার্থ যে প্রায় সব ফোটন শোষণ করে, কোষ সেগুলোর শক্তিই কাজে লাগাতে পারে। অথচ এই প্রক্রিয়ার মাঝখানে তৈরি হওয়া এক্সাইটন টিকে থাকে মাত্র প্রায় একশ কোটি ভাগের এক ভাগ সেকেন্ড! অর্থাৎ, এর আয়ু প্রায় এক ন্যানোসেকেন্ড।
এটিপিকে ভাবা যায় রাসায়নিক শক্তি জমিয়ে রাখার ছোট্ট এক ভান্ডার হিসেবে। কোষের ভেতরে যত ধরনের জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, সেগুলো চালানোর জন্য শক্তি জোগায় এই অণু।
প্রশ্ন হলো, এত অল্প সময়ের মধ্যেও কাজটি এত দক্ষতার সঙ্গে কীভাবে ঘটে? এর জন্য শোষিত সৌরশক্তিকে খুবই দ্রুত রিঅ্যাকশন সেন্টার বা বিক্রিয়াকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। সেখানে শক্তিটি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তা না হলে শক্তি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সালোকসংশ্লেষণের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, গাছপালা ও অন্যান্য সালোকসংশ্লেষণকারী জীব কীভাবে এত দক্ষতার সঙ্গে এক্সাইটনকে বিক্রিয়াকেন্দ্রে পৌঁছে দেয়। প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, এক্সাইটন এক অণু থেকে পাশের অণুতে এগিয়ে যায় লাফিয়ে লাফিয়ে। এভাবে ক্লোরোফিলের একের পর এক রঞ্জক অণু পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বিক্রিয়াকেন্দ্রে। কিন্তু এখানে একটি কিন্তু আছে। আলো শোষণকারী অ্যান্টেনার মধ্যে রঞ্জক অণুগুলো এত ঘনভাবে সাজানো থাকে যে এক্সাইটনের সামনে চলার জন্য অনেকগুলো পথ খোলা থাকে। তাহলে সে বুঝবে কীভাবে, কোন পথ ধরে গেলে বিক্রিয়াকেন্দ্রে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যাবে?
চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এক্সাইটন এলোমেলোভাবে এক অণু থেকে অন্য অণুতে লাফাতে থাকে। ব্যাপারটা অনেকটা মাতাল মানুষের মতো, যে টলতে টলতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামছে। সে কোন দিকে যাচ্ছে, নিজেও জানে না। এভাবে চলতে থাকলে বিক্রিয়াকেন্দ্র খুঁজে পাওয়ার চেয়ে পথ হারানোর আশঙ্কাই বেশি। কারণ, এক্সাইটনের হাতে সময় খুব কম। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিক্রিয়াকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারলে এটি ক্ষয় হয়ে যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এক্সাইটনের বহন করা শক্তি সালোকসংশ্লেষণে কাজে লাগার বদলে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। অর্থাৎ, প্রকৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি যদি কেবল এলোমেলোভাবে এক অণু থেকে অন্য অণুতে লাফ দেওয়ার ওপর নির্ভর করত, তাহলে শক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এত বেশি হওয়ার কথা নয়।
চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এক্সাইটন এলোমেলোভাবে এক অণু থেকে অন্য অণুতে লাফাতে থাকে। ব্যাপারটা অনেকটা মাতাল মানুষের মতো, যে টলতে টলতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামছে।
চিরায়ত তত্ত্বে এক্সাইটনকে এমন একটি কণা হিসেবে দেখা হয়, যা এক অণু থেকে অন্য অণুতে লাফিয়ে বেড়ায়। কিন্তু এক্সাইটন যদি সাধারণ কণার মতো আচরণ না করে, বরং কোয়ান্টাম কণার মতো তরঙ্গধর্মী বৈশিষ্ট্যও দেখায়, তাহলে কী হবে?
আমরা জানি, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে একটি কণা একই সময়ে একাধিক অবস্থার সম্ভাবনায় থাকতে পারে। এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় কোয়ান্টাম সুপারপজিশন। এক্সাইটনও যদি এমন আচরণ করে, তাহলে তাকে একই মুহূর্তে কেবল একটি জায়গায় আটকে থাকতে হবে না। বরং একই সময়ে একাধিক ক্লোরোফিল অণুতে তাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। এর মানে, এক্সাইটন একই সঙ্গে একাধিক পথ ধরে এগোতে পারে! তার শুরুর অবস্থান থেকে তরঙ্গের মতো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে বিক্রিয়াকেন্দ্রে পৌঁছানোর সম্ভাব্য পথগুলো যেন একসঙ্গেই খুঁজে দেখা সম্ভব হয়।
এভাবে চলতে পারলে এক্সাইটনের পক্ষে বিক্রিয়াকেন্দ্রে পৌঁছানো অনেক বেশি দক্ষ হতে পারে। প্রতিবারই যেন সে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথটি খুঁজে পায় এবং সময়মতো নিজের শক্তি সেখানে পৌঁছে দিতে পারে। প্রকৃতি যদি সত্যিই এই কোয়ান্টাম কৌশল কাজে লাগিয়ে থাকে, তাহলে সূর্যের আলো থেকে শক্তি সংগ্রহের ক্ষেত্রে গাছপালার অসাধারণ দক্ষতার একটি ব্যাখ্যা মিলতে পারে।
এই অভিনব কৌশলটি কাজে লাগাতে হলে এক্সাইটনকে হতে হবে একটি ‘সুসংগত’ বা কোহেরেন্ট কোয়ান্টাম কণা। কোয়ান্টাম সুসংগতি বজায় থাকলে এক্সাইটন আচরণ করতে পারে তরঙ্গের মতো। সেই তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে পারে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে। কোথায় তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা, তা বোঝানো হয় একটি সম্ভাবনার মেঘ দিয়ে। এরই নাম ওয়েভ ফাংশন বা তরঙ্গ ফাংশন।
আমরা জানি, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে একটি কণা একই সময়ে একাধিক অবস্থার সম্ভাবনায় থাকতে পারে। এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় কোয়ান্টাম সুপারপজিশন।
কিন্তু এক্সাইটনকে পর্যবেক্ষণ করা হলে কী হবে? তখন তার তরঙ্গ ফাংশন ভেঙে পড়বে। ফলে নির্দিষ্ট একটি বিন্দুতে তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা হয়ে যাবে ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ, কোয়ান্টাম সুসংগতি নষ্ট হয়ে যাবে। এই সুসংগতি হারানোর প্রক্রিয়াকে বলে ‘ডিকোহেরেন্স’ বা কোয়ান্টাম অসংগতি। এমনটা ঘটলে এক্সাইটন আর তরঙ্গের মতো আচরণ করতে পারবে না। তখন সে হয়ে উঠবে সাধারণ, চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে চলা একটি কণার মতো। তরঙ্গের সেই অদ্ভুত ইন্টারফারেন্স কিংবা ব্যতিচারের খেলাও তখন শেষ!
কোয়ান্টাম জগতে ‘পর্যবেক্ষণ’ বলতে শুধু মানুষের চোখে দেখা কিংবা যন্ত্র দিয়ে মাপা বোঝায় না। অন্য কোনো কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া হলেও কোয়ান্টাম সুসংগতি নষ্ট হতে পারে। আশপাশের পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা লাগা কিংবা পরিবেশ থেকে শক্তি পাওয়া—এমন যেকোনো ঘটনাই ডিকোহেরেন্স ঘটাতে পারে। এই কারণেই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানীরা যখন কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির মতো কাজে কোয়ান্টাম জগতের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো কাজে লাগাতে চান, তখন খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তাঁরা চেষ্টা করেন, যে কোয়ান্টাম ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন, সেটি যেন বাইরের পরিবেশের সঙ্গে কোনোভাবেই মিথস্ক্রিয়ায় না জড়ায়।
এ জন্য নানা কৌশল ব্যবহার করা হয়। যেমন, ব্যবস্থাটিকে ঠান্ডা করে পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়। কখনো এমন পদার্থ দিয়ে একে ঘিরে রাখা হয়, যাতে নির্দিষ্ট একটি ধরনের পারমাণবিক ঘূর্ণন বা স্পিন নেই। আবার অত্যাধুনিক পরিষ্কার কক্ষের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ন্যানোমিটার মাপের অতি ক্ষুদ্র পরিসরেও পরিবেশকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়।
কোয়ান্টাম জগতে পর্যবেক্ষণ বলতে শুধু মানুষের চোখে দেখা কিংবা যন্ত্র দিয়ে মাপা বোঝায় না। অন্য কোনো কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া হলেও কোয়ান্টাম সুসংগতি নষ্ট হতে পারে।
এত সব আয়োজনের পরও বিজ্ঞানীদের স্বস্তি মেলে না। অনেক পরিশ্রম, ঘাম আর চোখের জল ফেলেও তাঁরা হয়তো কোয়ান্টাম কণার তরঙ্গধর্মী বৈশিষ্ট্য মাত্র এক সেকেন্ড ধরে রাখতে পারেন—তাও ভাগ্য যদি ভালো হয়! এরপরই সেই কণার কোয়ান্টাম সুসংগতি ভেঙে যেতে পারে। তরঙ্গের মতো আচরণ বন্ধ করে সে আবার হয়ে ওঠে সাদামাটা চিরাচরিত কণা।
কৃত্রিমভাবে তৈরি, অতি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেও যেখানে কোয়ান্টাম সুসংগতি বজায় রাখা এত কঠিন, সেখানে জীবদেহের মতো উষ্ণ ও জটিল পরিবেশে এমন ঘটনা ঘটবে—এ কথা শুনে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানীদের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রশ্ন, জীবন্ত কোষের ভেতরে যেখানে অণু-পরমাণুর অবিরাম নড়াচড়া চলছে, সেখানে কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য আদৌ কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে?
তবে কোয়ান্টাম জীববিজ্ঞানীদের দাবি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বিভিন্ন গবেষণাগার থেকে এমন কিছু ইঙ্গিত মিলছে, যা বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এসব গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, সালোকসংশ্লেষণের সময় গাছপালা হয়তো সত্যিই কোয়ান্টাম জগতের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য কাজে লাগায়। অন্তত আংশিকভাবে হলেও, এই বৈশিষ্ট্যগুলো সালোকসংশ্লেষণকে আরও দক্ষ করে তুলতে পারে।
তিন বছর পর, ২০১০ সালে, সূর্যের আলো থেকে শক্তি সংগ্রহকারী সেই একই ধরনের ব্যাকটেরিয়ার ওপর আবার পরীক্ষা চালানো হলো। এবার তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির একদল বিজ্ঞানী পরীক্ষা চালিয়ে সালোকসংশ্লেষণকারী একটি জীবের মধ্যে কোয়ান্টাম সুসংগতির প্রমাণ পান। তাঁরা একটি ব্যাকটেরিয়ার সালোকসংশ্লেষণে অংশ নেওয়া বিশেষ অণুগুচ্ছের ওপর অল্প সময়ের জন্য লেজার রশ্মি ফেলেন। এর ফলে একটি আলোকসংকেত তৈরি হয়। সেটা যন্ত্রের সাহায্যে শনাক্ত করা সম্ভব। পরীক্ষায় দেখা গেল, এক্সাইটন শক্তি বহন করে যাওয়ার সময় বিভিন্ন পথ ধরে এগোতে পারে। সেই পথগুলোর মধ্যে তরঙ্গের ইন্টারফারেন্সের মতো ঘটনা ঘটছে। এ ছিল এক্সাইটনের কোয়ান্টাম প্রকৃতির জোরালো ইঙ্গিত। মনে হচ্ছিল, এক্সাইটন যেন তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বিক্রিয়াকেন্দ্রগুলোকে খুঁজছে। সেখানে পৌঁছে নিজের শক্তি জমা দেওয়ার জন্য সে যেন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে!
এই গবেষণার পর কোয়ান্টাম জীববিজ্ঞানের নতুন ক্ষেত্রটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু পরীক্ষাটি চালানো হয়েছিল তরল নাইট্রোজেনের তাপমাত্রায়। তাপমাত্রা ছিল মাত্র ৭৭ কেলভিন। মানে পরম শূন্য তাপমাত্রার৩ চেয়ে ৭৭ ডিগ্রি বেশি। এত কম তাপমাত্রায় জীবদেহে কোয়ান্টাম সুসংগতি টিকে থাকলেও স্বাভাবিক পরিবেশে তা সম্ভব কি না, এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুললেন।
তিন বছর পর, ২০১০ সালে, সূর্যের আলো থেকে শক্তি সংগ্রহকারী সেই একই ধরনের ব্যাকটেরিয়ার ওপর আবার পরীক্ষা চালানো হলো। এবার তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেটা জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। পরীক্ষার ফল থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেল, তাপমাত্রা বেড়ে গেলেও এক্সাইটনের কোয়ান্টাম সুসংগতি যথেষ্ট সময় ধরে টিকে থাকতে পারে। আর এই সময়টুকু সালোকসংশ্লেষণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট।
২০১৮ সালে একটি নতুন গবেষণায় সালোকসংশ্লেষণে অংশ নেওয়া অণুগুচ্ছের মধ্যে ইন্টারফারেন্সের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এরপর থেকে সালোকসংশ্লেষণে অংশ নেওয়া বিভিন্ন অণুগুচ্ছের ওপর অসংখ্য পরীক্ষা চালানো হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মূল প্রশ্ন একটাই: প্রকৃতি কি সত্যিই এক্সাইটনের তরঙ্গধর্মী বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানোর কোনো উপায় খুঁজে পেয়েছে? সেই উপায় কি সালোকসংশ্লেষণকে আরও দক্ষ করে তুলতে সাহায্য করে?
২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আগের পরীক্ষাগুলোর ফল নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। গবেষকদের দাবি ছিল, আগের পরীক্ষায় যে ইন্টারফারেন্সের ঘটনা দেখা গিয়েছিল, সেগুলোকে ভুল করে দীর্ঘস্থায়ী কোয়ান্টাম সুসংগতির ফল বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মতে, ওই ঘটনাগুলোর আসল কারণ ছিল অণুর কম্পন। তাই তাঁরা মনে করেন, এক্সাইটনের কোয়ান্টাম সুসংগতি সালোকসংশ্লেষণের দক্ষতা বাড়াতে কোনো ভূমিকা রাখে না।
সালোকসংশ্লেষণে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্কও বেশ জোরালো। ২০১৮ সালে একটি নতুন গবেষণায় সালোকসংশ্লেষণে অংশ নেওয়া অণুগুচ্ছের মধ্যে ইন্টারফারেন্সের প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষকেরা দেখান, এর পেছনে রয়েছে ইলেকট্রনের অবস্থা ও অণুর কম্পনের অবস্থার মধ্যে যুক্ত দীর্ঘস্থায়ী কোয়ান্টাম সুসংগতি।
এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সালোকসংশ্লেষণে অংশ নেওয়া অণুগুচ্ছের ভেতরে ইলেকট্রনের নড়াচড়া ও অণুর কম্পন একে অন্যের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত। এই দুইয়ের পারস্পরিক প্রভাব এক্সাইটন কত দ্রুত নিজের শক্তি বিক্রিয়াকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে পারবে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের দাবি ছিল, আগের পরীক্ষায় যে ইন্টারফারেন্সের ঘটনা দেখা গিয়েছিল, সেগুলোকে ভুল করে দীর্ঘস্থায়ী কোয়ান্টাম সুসংগতির ফল বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।
কণার তরঙ্গের মতো সুসংগত আচরণই হয়তো শেষ পর্যন্ত সালোকসংশ্লেষণের অসাধারণ দক্ষতার রহস্য বুঝতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতের গবেষণায় হয়তো প্রমাণিত হবে, গাছপালা ও সালোকসংশ্লেষণকারী অন্য জীবেরা সাড়ে তিনশ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে বিবর্তিত হতে হতে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কিছু বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানোর কৌশল রপ্ত করেছে। এর ফলে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে।
এই রহস্যের সমাধান হলে আমরাও প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারব। গাছপালার কোয়ান্টাম কৌশল বুঝতে পারলে হয়তো আরও দক্ষ সৌরকোষ তৈরি করা সম্ভব হবে। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরির কাজে সেগুলো হবে আজকের প্রযুক্তির চেয়েও কার্যকর। প্রকৃতির বুদ্ধিমত্তাকে আমরা হয়তো এত দিন কমই গুরুত্ব দিয়েছি। গাছপালা যে আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কৌশলী, সেই সম্ভাবনাই এখন বিজ্ঞানীদের রোমাঞ্চিত করছে।
