সংখ্যায় লেখা এই পৃথিবী
ধরুন, আপনি ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। ওপাশ থেকে সে–ও আপনাকে বলল, ‘ভালোবাসি’।
তার ভোকাল কর্ড যে বাতাসটা নাড়াল, তার এক কণাও কোনো দিন আপনার কাছে পৌঁছাবে না। যে নিশ্বাস কথাটাকে বয়ে এনেছিল, সেটা তার ঘরেই থেকে যাবে। তার গলার কম্পন কয়েক ফুট গিয়ে বাতাসেই মিলিয়ে যাবে। আপনার কাছে আসবে শুধু কিছু সংখ্যা।
একটা মাইক্রোফোন প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার বার ওই কম্পনের ঢেউয়ের উচ্চতা মাপবে আর প্রতিটি মাপকে একটা সংখ্যায় রূপ দেবে। সংখ্যাগুলো ভোল্টেজ আর আলোর স্পন্দন হয়ে একটা শহর, একটা মহাদেশ, একটা মহাসাগরের নিচ দিয়ে পার হয়ে যাবে। আপনার ফোনের প্রসেসর আর স্পিকার মিলে সেই সংখ্যাগুলোকে আবার পরিণত করবে ঢেউয়ে, সেই ঢেউ আপনার ঘরে আগে থেকেই থাকা বাতাসকে ধাক্কা দেবে। সেই বাতাস আপনার কানের পর্দা নাড়াবে। আপনি তার কণ্ঠ শুনবেন। সংখ্যা পরিণত হবে ভালোবাসায়।
১৯৪৮ সালে ক্লড শ্যানন নামের এক গণিতবিদ তথ্যকে কীভাবে মাপতে হয়, তার একটা তত্ত্ব দাঁড় করালেন। কাজটা করতে গিয়ে তিনি শুরুতেই এমন একটা জিনিস বাদ দিলেন, যেটাকে সবাই ভাবত তথ্যের সর্বস্ব। তিনি বললেন, বার্তাটার অর্থ কী, সেটা আপাতত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমস্যার জন্য অর্থ অপ্রাসঙ্গিক।
যে নিশ্বাস কথাটাকে বয়ে এনেছিল, সেটা তার ঘরেই থেকে যাবে। তার গলার কম্পন কয়েক ফুট গিয়ে বাতাসেই মিলিয়ে যাবে। আপনার কাছে আসবে শুধু কিছু সংখ্যা।
শ্যানন দেখলেন, যেকোনো বার্তাকে শেষ পর্যন্ত ০ আর ১-এর ধারাবাহিকতায় লেখা যায়। সব সংখ্যাকে লেখা যায় বাইনারিতে। বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষরকে আমরা একেকটা সংখ্যা দিলে তাদের আলাদা করতে কয়েকটা ০ আর ১-এর ধারাই যথেষ্ট। কয়েকটা অক্ষর মিলে শব্দ। কয়েক হাজার শব্দ মিলে একটা বই। আপনার কণ্ঠকে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার বার মাপলে প্রতিটি মাপ একটা সংখ্যা হয়, আর প্রতিটি সংখ্যা আবার ছোট ছোট ০ আর ১-এ ভেঙে যায়। একটা ছবিও একই জিনিস, শুধু সেখানে লাখ লাখ ক্ষুদ্র রঙের মান লেখা থাকে।
যা কিছুকে সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায়, সেটাকে কোনো না কোনোভাবে এই ভাষায় লেখা যায়। আর এই যা কিছুর ভেতরে আছে সবকিছু।
একটা ০ বা ১ হলো এক বিট। শ্যাননের তথ্যের মাপ আসলে খুব সাধারণ একটা প্রশ্নের উত্তর—আপনার বার্তাকে প্রকাশ করতে ঠিক কতগুলো বিট লাগবে?
খেয়াল করুন, এই হিসাব করার জন্য তাকে কখনো জানতে হয়নি সংখ্যাটা কী বোঝাচ্ছে। ছয় মানে ছয় ডলার, ছয় বছর বয়স, নাকি ছয়টা ডেডবডি, তাতে হিসাব বদলায় না। এই ইনডিফারেন্সই ইনফরমেশন থিওরির শক্তি। যে তার প্রতি সেকেন্ডে নির্দিষ্টসংখ্যক ১ আর ০ বহন করতে পারে, সে পৃথিবীর যেকোনো তথ্য বহন করতে পারে। কণ্ঠ, ছবি, প্রেসক্রিপশন, প্রেমপত্র, ব্যাংক চেক কিংবা রেজিগনেশন লেটার—সবকিছুই আসলে ‘A Series of 0 and 1’।
০ আর ১। নেভা আর জ্বলা। সার্কিট অন কিংবা সার্কিট অফ।
সমুদ্রের নিচের ফাইবার অপটিক কেবল জানে না সে কারও ভালোবাসা বহন করছে। সে শুধু আলোর জ্বলা আর নেভা বহন করে। ভালোবাসাটা তবু পৌঁছে যায়।
আপনার মস্তিষ্কে কিন্তু শব্দ পৌঁছাল না; পৌঁছাল বৈদ্যুতিক স্পন্দনের একটা প্যাটার্ন। কোন স্নায়ু কখন ফায়ার করল, কতবার করল, কতটুকু বিরতিতে করল—এই পুরো প্যাটার্নকেই সংখ্যায় লেখা যায়।
সব তথ্যই ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে আসলে সংখ্যা। তাই তো এর নাম ‘ডিজিটাল’।
কিন্তু আরেকটু গভীরে চিন্তা করলে আমাদের ‘রিয়েল’ ওয়ার্ল্ড কি আসলে খুব আলাদা?
ধরুন, সেই একই মানুষটা আপনার ঘরে বসে আছে। এক হাত দূরে। আবার আপনাকে সে বলল সেই একই শব্দ।
তার গলার কম্পন বাতাসে একটা চাপের ঢেউ বানাল। ঢেউটা আপনার কানের পর্দায় পৌঁছাল, পর্দার নড়াচড়া তিনটা ছোট হাড় পেরিয়ে গেল ককলিয়ায় আর সেখানে হাজার হাজার চুলের মতো কোষ ওই নড়াচড়াকে বিদ্যুতের স্পন্দনে বদলে দিল।
আপনার মস্তিষ্কে কিন্তু শব্দ পৌঁছাল না; পৌঁছাল বৈদ্যুতিক স্পন্দনের একটা প্যাটার্ন। কোন স্নায়ু কখন ফায়ার করল, কতবার করল, কতটুকু বিরতিতে করল—এই পুরো প্যাটার্নকেই সংখ্যায় লেখা যায়। মস্তিষ্ক সেই সংখ্যার বিন্যাসকেই তার স্মৃতিতে থাকা সব সংখ্যার বিন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে চিনল কণ্ঠ, শব্দ, তারপর অর্থ হিসেবে।
চোখেও একই ব্যাপার। লাল রঙের স্ট্রবেরিটা আপনার চোখের ভেতরে ঢোকে না; ঢোকে তার গা থেকে প্রতিফলিত আলো। চোখের তিন ধরনের কোন সেল সেই আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে তিনটা আলাদা মাত্রায় সাড়া দেয় আর তাদের সক্রিয়তার নির্দিষ্ট অনুপাতকে আপনার মস্তিষ্ক নাম দেয় ‘লাল’। নাকও একই কাজ করে, শুধু আরও বেশি মাত্রায়।
ঢেউটা আপনার কানের পর্দায় পৌঁছাল, পর্দার নড়াচড়া তিনটা ছোট হাড় পেরিয়ে গেল ককলিয়ায় আর সেখানে হাজার হাজার চুলের মতো কোষ ওই নড়াচড়াকে বিদ্যুতের স্পন্দনে বদলে দিল।
চায়ের কাপ থেকে ভেসে আসা এলাচির অণুগুলো প্রায় ৪০০ ধরনের গন্ধ রিসেপ্টরের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন জ্বালায়; সেই সংখ্যার বিন্যাসকেই আপনি অনুভব করেন ‘এলাচির গন্ধ’ হিসেবে। কান আবার শব্দের ভেতর থেকেই অনুপাত বের করে। একই তারের দৈর্ঘ্য অর্ধেক হলে কম্পাঙ্ক দ্বিগুণ হয়, আমরা শুনি এক অকটেভ ওপরে; পারফেক্ট ফিফথের কম্পাঙ্কের অনুপাত তিনের বিপরীতে দুই। যে সুরটা শুনে আপনার গলা ধরে আসে, তার কম্পাঙ্ক, তীব্রতা আর সময়ের হিসাব আপনার কান ও মস্তিষ্ক মিলে করে ফেলে আপনি তাকে সুন্দর বলারও আগে।
যে মস্তিষ্কে আপনার চেতনা থাকে, সেই মস্তিষ্ক কখনো পৃথিবীটাকে সরাসরি ছুঁয়ে দেখেনি। চোখ, কান আর নাক পৃথিবীর বিভিন্ন দিক মেপে তার কাছে পাঠিয়েছে বৈদ্যুতিক স্পন্দনের বিন্যাস। সেই বিন্যাস থেকেই মস্তিষ্ক বানিয়েছে আপনার দেখা, শোনা, ঘ্রাণ পাওয়া—আপনার পুরো সচেতন পৃথিবী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ এই পৃথিবীও একটা বিন্যাস—অসংখ্য মাপের একটা কম্বিনেশন। সুতরাং তাকেও সংখ্যায় লেখা সম্ভব। হয়তো তার জন্য লাগবে অকল্পনীয় সংখ্যক বিট, কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে তা সম্ভব।
তাই আপনার চেতনার পৃথিবীও বাইরের পৃথিবীর একটা সংখ্যায় লেখা প্রতিরূপ—ঠিক যেভাবে ফোনে আপনি যে ‘ভালোবাসি’ শুনলেন, সেটা আপনার ভালোবাসার মানুষটির মুখে উচ্চারিত ‘ভালোবাসি’র সংখ্যায় লেখা প্রতিরূপ।
যে মস্তিষ্কে আপনার চেতনা থাকে, সেই মস্তিষ্ক কখনো পৃথিবীটাকে সরাসরি ছুঁয়ে দেখেনি। চোখ, কান আর নাক পৃথিবীর বিভিন্ন দিক মেপে তার কাছে পাঠিয়েছে বৈদ্যুতিক স্পন্দনের বিন্যাস।
এভাবে ভাবলে ভাষা আসলে কী?
ভাষা হলো আমাদের মাথার ভেতরে তৈরি পৃথিবীর প্রতিরূপকে আরেকটা মাথায় পাঠানোর পদ্ধতি। আমি যদি বলি, ‘বৃষ্টির মধ্যে একটা লাল ছাতা রাস্তার পাশে উল্টে পড়ে আছে’, ছাতাটা আপনার সামনে আসে না। বৃষ্টিও আসে না। আসে কয়েকটা শব্দ। কিন্তু সেই শব্দগুলো আপনার স্মৃতির সঙ্গে মিলে আপনার মাথার ভেতর একটা দৃশ্য বানিয়ে ফেলে।
শব্দ দিয়ে আমরা শুধু দেখা জিনিস লিখি না। আমরা সম্পর্ক লিখি, নিয়ম লিখি, কারণ আর ফলাফল লিখি। আগুনে হাত দিলে পুড়ে যায়। ছেড়ে দিলে পাথর নিচে পড়ে। রোগের জীবাণু একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে যেতে পারে। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বল দিলে একটা বস্তু কত দ্রুত নড়বে, সেটাও আমরা ভাষা আর গাণিতিক চিহ্নে লিখে রাখি।
বিজ্ঞান আসলে পৃথিবীকে ভাষায় এনকোড করার দীর্ঘ চেষ্টারই অংশ। সেই ভাষা কখনো সমীকরণ, কখনো রাসায়নিক সূত্র, কখনো গ্রাফ। নিউটনের সূত্র কয়েকটা অক্ষর আর চিহ্নের বিন্যাস, কিন্তু তার ভেতরে পড়ে যাওয়া আপেল থেকে শুরু করে চাঁদের কক্ষপথ পর্যন্ত একই সম্পর্ক লেখা আছে। একটা বৈজ্ঞানিক পেপার কাগজে ছাপিয়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পাঠানো যায় আর সেখানে বসে আরেকজন মানুষ সেই চিহ্নগুলো পড়ে একই পরীক্ষাটা আবার ঘটাতে পারে।
বিজ্ঞান আসলে পৃথিবীকে ভাষায় এনকোড করার দীর্ঘ চেষ্টারই অংশ। সেই ভাষা কখনো সমীকরণ, কখনো রাসায়নিক সূত্র, কখনো গ্রাফ।
পৃথিবীর একটা অংশকে আমরা পৃথিবীর আরেকটা অংশের মধ্যে লিখে রাখি।
এ কারণেই ক্লড বা জিপিটির মতো ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের কাজ করার কথা শুনলে যতটা জাদুকরি মনে হয়, আসলে হয়তো ততটা না।
আমরা তাকে বিপুল পরিমাণ ভাষা পড়িয়েছি। তবে মেশিনের কাছে সেই ভাষা কখনো শব্দ হিসেবে পৌঁছায়নি। প্রতিটি শব্দ প্রথমে ভেঙেছে ছোট ছোট টোকেনে, প্রতিটি টোকেন পেয়েছে একটা সংখ্যা, তারপর সেই সংখ্যা বদলে গেছে আরও বড় সংখ্যার বিন্যাসে। আর প্রসেসরের একদম নিচের স্তরে সেই সমস্ত সংখ্যাও শেষ পর্যন্ত ০ আর ১—সার্কিট অন কিংবা সার্কিট অফ। অর্থাৎ মানুষের লেখা পৃথিবীটা মেশিনের কাছে পৌঁছেছে বিট হয়ে।
আর সেই ভাষার মধ্যে শুধু শব্দ ছিল না। ছিল মানুষের দেখা পৃথিবী, মানুষের করা বিজ্ঞান, অঙ্ক, ইতিহাস, ভুল, আবিষ্কার, ঝগড়া, প্রেম, ভয়, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান। কোটি কোটি মানুষ যতবার পৃথিবী নিয়ে কিছু বলেছে, ততবার পৃথিবীর গঠনের সামান্য একটা ছাপ ভাষার মধ্যে রেখে গেছে।
ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল সেই বিটগুলোর মধ্যে সরাসরি আমাদের পৃথিবীকে দেখে না। সে শেখে কোন সংখ্যার বিন্যাস কোন বিন্যাসের পাশে আসে, কোনটার পরে কোনটা আসার সম্ভাবনা, একটা সম্পর্ক বদলালে আরেকটা কীভাবে বদলায়। কিন্তু ভাষা যেহেতু পৃথিবীর সম্পর্ককে বহন করে, শব্দের সম্পর্ক শিখতে শিখতে সে শব্দের আড়ালে থাকা পৃথিবীর সম্পর্কও কিছুটা শিখে ফেলে।
প্রসেসরের একদম নিচের স্তরে সেই সমস্ত সংখ্যাও শেষ পর্যন্ত ০ আর ১—সার্কিট অন কিংবা সার্কিট অফ। অর্থাৎ মানুষের লেখা পৃথিবীটা মেশিনের কাছে পৌঁছেছে বিট হয়ে।
সমুদ্রের নিচের কেবল যেমন ০ আর ১ বহন করে আপনার কাছে ভালোবাসা পৌঁছে দিয়েছিল, ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলও সেই ০ আর ১-এর মধ্যেই মানুষের লেখা পৃথিবীর একটা প্রতিরূপ খুঁজে পায়।
‘বরফ’ শব্দটা ‘ঠান্ডা’র পাশে আসে। ‘আগুন’ আসে ‘তাপ’, ‘ধোঁয়া’ আর ‘পোড়া’র পাশে। ‘ঋণ’ আসে ‘সুদ’, ‘কিস্তি’ আর ‘পরিশোধ’-এর কাছে। ‘সংক্রমণ’ আসে শরীর, জীবাণু, প্রতিরোধ আর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে। শব্দগুলো পৃথিবীর মধ্যে যেভাবে সম্পর্কিত, ভাষার মধ্যেও ধীরে ধীরে সেভাবেই সাজে।
তাই মডেলটা শুধু পরের শব্দ অনুমান করতে গিয়ে একসময় অঙ্ক করতে শেখে, কোড লিখতে শেখে, বৈজ্ঞানিক ধারণার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পায়। অন্তত আমাদের চেতনার মধ্যে পৃথিবীটা যতটুকু ভাষায় ধরা পড়েছে, তার কিছুটা তো তার পাওয়ারই কথা।
পৃথিবীকে আমরা ভাষার মধ্যে লিখেছি। মেশিন সেই লেখা পড়ে পৃথিবীর একটা মডেল বানাতে শুরু করেছে।
সমুদ্রের নিচের কেবল যেমন ০ আর ১ বহন করে আপনার কাছে ভালোবাসা পৌঁছে দিয়েছিল, ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলও সেই ০ আর ১-এর মধ্যেই মানুষের লেখা পৃথিবীর একটা প্রতিরূপ খুঁজে পায়।
জীববিজ্ঞানেরও নিজের ভাষা আছে। একটা প্রোটিন প্রথমে অ্যামিনো অ্যাসিডের একটা সিকোয়েন্স। ২০ ধরনের অক্ষর দিয়ে লেখা একটা বাক্য। কিন্তু বাক্যটার অর্থ কোনো অভিধানে থাকে না। অক্ষরগুলো যে অ্যামিনো অ্যাসিডদের রিপ্রেজেন্ট করে—তাদের চার্জ, আকার আর একে অন্যের প্রতি আকর্ষণ-বিকর্ষণ ঠিক করে দেয় সিকোয়েন্সটা কীভাবে ভাঁজ হবে। সেই ভাঁজ থেকে তৈরি হয় একটা ত্রিমাত্রিক আকার আর সেই আকারই ঠিক করে প্রোটিনটা শরীরে কী কাজ করবে।
কোনো প্রোটিন একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাবে। কোনোটা কোষের বাইরে দাঁড়িয়ে সংকেত গ্রহণ করবে। কোনোটা ভাইরাসকে চিনবে। কোনোটা ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে রোগ তৈরি করবে। অর্থাৎ প্রোটিনের কাজটাও তার অক্ষরের ধারার মধ্যে কোনোভাবে লেখা আছে। ষাটের দশকে ক্রিশ্চিয়ান আনফিনসেন পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন, একটা প্রোটিনকে খুলে ফেললেও উপযুক্ত পরিবেশে সে নিজে নিজেই আবার তার আসল আকারে ফিরে যায়—আকারের তথ্যটুকু সিকোয়েন্সের ভেতরেই আছে।
লেখাটা আমাদের হাতে বহু বছর ছিল। আমরা সিকোয়েন্স পড়তে পারতাম, কিন্তু তার অর্থ বুঝতে পারতাম না, ব্যাকরণকে ধরতে পারতাম না। একটা প্রোটিনের অক্ষরগুলো জানা থাকলেও সে কী আকার নেবে, সেটা বের করা ছিল ভয়াবহ কঠিন। সাইরাস লেভিনথাল একটা হিসাব করে দেখিয়েছিলেন, একটা মাঝারি প্রোটিনের সম্ভাব্য সব ভাঁজ এক এক করে পরখ করতে গেলে মহাবিশ্বের বয়সের চেয়েও বেশি সময় লেগে যাবে। অথচ আসল প্রোটিনটা কাজটা সারে কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডে।
কোনো প্রোটিন একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাবে। কোনোটা কোষের বাইরে দাঁড়িয়ে সংকেত গ্রহণ করবে। কোনোটা ভাইরাসকে চিনবে। কোনোটা ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে রোগ তৈরি করবে।
তারপর আলফাফোল্ডের মতো একটা প্রোটিন মডেল সেই ভাষার ভেতরের সম্পর্ক পড়তে শুরু করল।
সে প্রোটিনকে জীবন্ত কিছু হিসেবে জানে না। তার শরীর নেই। সে কোনো এনজাইমের কাজ চোখে দেখেনি। সে শুধু অসংখ্য সিকোয়েন্স, পরিচিত গঠন আর তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে সংখ্যায় সাজিয়েছে। ২০ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড প্রথমে একেকটা সংখ্যা হয়েছে আর মেশিনের একদম নিচের স্তরে সেই সংখ্যাগুলোও শেষ পর্যন্ত ০ আর ১—সার্কিট অন কিংবা সার্কিট অফ। তারপর সেই বিটের বিন্যাসে লুকিয়ে থাকা সম্পর্ক থেকে সে এমন সব প্রোটিনের আকার অনুমান করেছে, যেগুলো বের করতে মানুষের বছরের পর বছর লেগে যেত।
জীববিজ্ঞানের একটা ভাষা ছিল। আমরা অক্ষরগুলো লিখে ফেলেছিলাম। মেশিন সেই অক্ষরকে বিটে বদলে ধীরে ধীরে ব্যাকরণটা ধরতে শুরু করল। ২০২৪ সালে রসায়নের নোবেল পুরস্কারের অর্ধেকটা গেল আলফাফোল্ডের দুই নির্মাতা ডেমিস হাসাবিস আর জন জাম্পারের হাতে বাকি অর্ধেক পেলেন প্রোটিন ডিজাইনের কাজের জন্য ডেভিড বেকার।
২০২৪ সালে রসায়নের নোবেল পুরস্কারের অর্ধেকটা গেল আলফাফোল্ডের দুই নির্মাতা ডেমিস হাসাবিস আর জন জাম্পারের হাতে বাকি অর্ধেক পেলেন প্রোটিন ডিজাইনের কাজের জন্য ডেভিড বেকার।
হয়তো সামনে এটাই আরও বড় আকারে ঘটবে।
আজকের মডেল ভাষা পড়ে। পরের মডেল ভাষার সঙ্গে ছবি, ভিডিও, শব্দ, শরীরের সংকেত, কোষের অবস্থা, রাসায়নিক বিক্রিয়া, মানুষের আচরণ—সবকিছুকে একই সঙ্গে পড়বে। পৃথিবীর প্রতিটি অংশকে আলাদা ডেটা হিসেবে না দেখে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন মাপ হিসেবে দেখবে।
একটা ওয়ার্ল্ড মডেল শুধু পৃথিবীতে কী আছে তা জানবে না। একটা জিনিস বদলালে অন্যগুলো কীভাবে বদলায়, সেটাও শিখবে। একটা মিউটেশন দিলে প্রোটিন কীভাবে ভাঁজ হবে। প্রোটিনের আকার বদলালে কোষ কী করবে। কোষ বদলালে রোগের গতি কী হবে। একটা ওষুধ দিলে পুরো ব্যবস্থাটা কোন দিকে যাবে। বাস্তবে পরীক্ষা করার আগেই মডেল নিজের ভেতরে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎগুলো চালিয়ে দেখবে।
আমরাও তো তা–ই করি। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাথার মধ্যে তার ফলাফল কল্পনা করি। কাউকে কিছু বলার আগে সে কী উত্তর দিতে পারে, সেটা চালিয়ে দেখি। রাস্তা পার হওয়ার আগে গাড়িটা কয়েক সেকেন্ড পরে কোথায় থাকবে, তার একটা ছোট মডেল বানাই।
আজকের মডেল ভাষা পড়ে। পরের মডেল ভাষার সঙ্গে ছবি, ভিডিও, শব্দ, শরীরের সংকেত, কোষের অবস্থা, রাসায়নিক বিক্রিয়া, মানুষের আচরণ—সবকিছুকে একই সঙ্গে পড়বে।
চিন্তা মূলত বর্তমানের তথ্য দিয়ে ভবিষ্যতের একটা ক্ষুদ্র সিমুলেশন চালানো। ভবিষ্যতের মেশিন এই কাজটাই করবে, শুধু আমাদের চেয়ে অনেক বেশি মাপ নিয়ে, অনেক বেশি সম্ভাবনা একসঙ্গে চালিয়ে। বাস্তব পৃথিবীতে কিছু বানানোর আগে তার সংখ্যার পৃথিবীতে হাজারটা সংস্করণ বানাবে। সেখানে ওষুধ ব্যর্থ হবে, সেতু ভেঙে পড়বে, নতুন উপাদান তৈরি হবে, কোষ সুস্থ হবে, শহর বদলাবে—তারপর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সংস্করণটা বাস্তবে আসবে।
পৃথিবী প্রথমে আমাদের ইন্দ্রিয়ে এসে বৈদ্যুতিক স্পন্দনের বিন্যাস হয়েছে। তারপর সেই বিন্যাস থেকে ভাষা হয়েছে। ভাষা থেকে বই, সূত্র, জিনোম আর ডেটাবেজ হয়েছে। এখন সেই ডেটা থেকে মেশিন আবার পৃথিবীর প্রতিরূপ বানাচ্ছে।
মহাবিশ্বের একটা অংশ ধীরে ধীরে বাকি মহাবিশ্বকে নিজের ভেতরে লিখে ফেলছে।
পৃথিবী প্রথমে আমাদের ইন্দ্রিয়ে এসে বৈদ্যুতিক স্পন্দনের বিন্যাস হয়েছে। তারপর সেই বিন্যাস থেকে ভাষা হয়েছে। ভাষা থেকে বই, সূত্র, জিনোম আর ডেটাবেজ হয়েছে।
আপনার মানুষটার নিশ্বাস কোনো দিন আপনার ঘরে ঢোকেনি। ঢুকেছিল কিছু সংখ্যা। আপনি ভালোবাসা শুনেছিলেন।
পৃথিবীও কোনো দিন কোনো মেশিনের ভেতরে ঢুকবে না। ঢুকতে থাকবে তার সংখ্যাগুলো। সংখ্যা তৈরি করবে আরেক পৃথিবী। এখন পর্যন্ত আমরা সংখ্যায় লিখেছি যা ঘটে গেছে। এরপর হয়তো সংখ্যার ভেতরেই ঘটবে, যা এখনো ঘটেনি। বর্তমান পৃথিবী সিমুলেশন হোক বা না হোক, পরবর্তী পৃথিবী নিশ্চিত হবে একটা সিমুলেশন।