দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ১১

মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।

অধ্যায় এক

মন্দিরের স্নিগ্ধ ছায়ায়

৩. বাড়ি থেকে পালানো

ট্রেনের খোলা জানালা দিয়ে গরম বাতাস ঢুকছিল। রামানুজন বসে বসে দেখছিলেন দক্ষিণ ভারতের প্রকৃতি। ঘণ্টায় পঁচিশ মাইল বেগে তা পেছনে সরে যাচ্ছে। খড়ের চালের গ্রামগুলো রোদে পুড়ে ছাইরঙা হয়ে গেছে। ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে গাঢ় গোলাপি রঙের ফুল। আর দিগন্তজোড়া ধানের ক্ষেতের একঘেয়েমি ভাঙতে তালগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে বিস্ময়চিহ্নের মতো।

শ্রীনিবাস রামানুজন
ছবি: উইকিপিডিয়া

দূর থেকে ক্ষেতে কাজ করা পুরুষদের মনে হচ্ছিল বাদামি রঙের লাঠির মতো। তাদের পরনের সাদা ধুতি আর পাগড়িগুলো যেন তুলোর বল। নারীদের পরনের কমলা ও লাল রঙের শাড়িগুলো ধানের ক্ষেতের গাঢ় সবুজের মাঝে রঙের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছিল।

একটা স্থিরচিত্রে এই দৃশ্য হয়তো খুব শান্ত বা মনোরম মনে হতো। কিন্তু রামানুজন দেখছিলেন, সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। কেউ গবাদিপশু চড়াচ্ছে, কেউ নিচ্ছে ফসলের যত্ন। কখনো একা, কখনো দলবেঁধে নারীরা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে পানি আনতে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে কোনো শিশু মায়ের পাশ থেকে মুখ তুলে ট্রেনের দিকে হাত নাড়ছিল। সেই ট্রেন রামানুজনকে নিয়ে যাচ্ছিল উত্তরে, ভাইজাগাপত্তনমের দিকে।

দূর থেকে ক্ষেতে কাজ করা পুরুষদের মনে হচ্ছিল বাদামি রঙের লাঠির মতো। তাদের পরনের সাদা ধুতি আর পাগড়িগুলো যেন তুলোর বল। নারীদের পরনে ছিল কমলা ও লাল রঙের শাড়ি।

যুগের পর যুগ ভারতে যাতায়াতব্যবস্থা নির্ভরশীল ছিল গরুর গাড়ি বা ঘোড়ায় টানা জুটকার ওপর। রাস্তাঘাটও ছিল ভয়াবহ। রামানুজনের সময়েও তাঞ্জোর জেলার সতেরো শ মাইল রাস্তার মাত্র আট ভাগের এক ভাগ ছিল পাকা। এই পার্থক্যটা ছিল বিশাল। কাঁচা রাস্তায় ধুলো ও কাদার মধ্য দিয়ে যেতে হলে গাড়োয়ানেরা গাড়িতে মাল বোঝাই করত কম। আর গতিও কমে যেত। দিনে পঁচিশ মাইল যেতে পারলেই সেটাকে ভালো ভ্রমণ বলা হতো।

কিন্তু ভারতের জীবনযাত্রা বদলে দিল রেলগাড়ি আসার পর। সেটা ছিল ব্রিটিশ রাজের এক বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাফল্য। উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে পুরো দেশকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল। ১৮৯২ সালে কুম্বকোনম থেকে ভাইজাগাপত্তনম যেতে লাগত তিন সপ্তাহ। যেতে হতো ট্রেন, গরুর গাড়ি ও নৌকায় চড়ে। পরের বছর রেললাইন পুরোপুরি চালু হওয়ায় সময় কমে দাঁড়াল মাত্র এক দিনে!

রেলগাড়ি ছিল মহান সাম্যবাদী; এখানে জাতপাতের কোনো বালাই ছিল না। সেই সময়ের এক ইংরেজ লেখক লিখেছিলেন, ‘থার্ড ক্লাসের বগিতে উঠলে জাতপাতের দেয়ালও ভেঙে পড়ে। সেখানে ব্রাহ্মণ আর অচ্ছ্যুৎরা একই সিটে বসে, একে অপরের গা ঘেঁষে থাকে। রেলওয়ে যেন বলে—‘কম পয়সায় যেতে চাইলে জাতপাত স্টেশনের বাইরে রেখে এসো।’

১৮৯২ সালে কুম্বকোনম থেকে ভাইজাগাপত্তনম যেতে লাগত তিন সপ্তাহ। যেতে হতো ট্রেন, গরুর গাড়ি ও নৌকায় চড়ে। পরের বছর রেললাইন পুরোপুরি চালু হওয়ায় সময় কমে দাঁড়াল মাত্র এক দিনে!

রেলগাড়ির সঙ্গেই বড় হয়েছেন রামানুজন। কুম্বকোনম, কাঞ্চিপুরম আর মাদ্রাজে বিভিন্ন স্কুলে পড়ার সময় তিনি প্রচুর ট্রেনভ্রমণ করেছেন। আর এখন, ১৯০৫ সালে, গভর্নমেন্ট কলেজের স্কলারশিপ হারানোর পর, এই ট্রেনই তাঁকে পালাতে সাহায্য করল।

কুম্বকোনম থেকে মাদ্রাজ ছিল ১৯৪ মাইল দূরে। সেখান থেকে উপকূল ধরে আরও ৪৮৪ মাইল উত্তরে ছিল ভাইজাগাপত্তনম। বঙ্গোপসাগরের কোণে ডলফিনস নোজ নামে এক অন্তরীপের পাশে গড়ে ওঠা এই শহরে তখন প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষের বাস। এটি ছিল এক জমজমাট সমুদ্রবন্দর। এই বন্দর দিয়ে সুতা আসত ভারতে এবং ম্যাঙ্গানিজ ও চিনি রপ্তানি হতো বিদেশে। শহরটি তখন উন্নতির পথে।

কাউকে কিছু না জানিয়ে এই তেলেগুভাষী শহরেই পাড়ি জমালেন রামানুজন। কেন তিনি পালালেন? কেউ বলে বন্ধুর পাল্লায় পড়ে, কেউ বলে স্কলারশিপ বা কোনো পৃষ্ঠপোষকের খোঁজে। আবার কেউ বলে বাবার চাপে চাকরি খুঁজতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সবকিছুর মূলে ছিল হতাশা আর অভিমান। ব্যাপারটা পরিষ্কার যে তিনি কোনো কিছুর খোঁজে যেমন যাচ্ছিলেন, তেমনি একটা কিছু থেকে পালাচ্ছিলেন।

শোনা যায়, ছেলের নিখোঁজ হওয়ার খবরে তাঁর পরিবার পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছিল খবরের কাগজে। তাঁর বাবা মাদ্রাজ আর ত্রিচিনোপলির বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছেলেকে খুঁজেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরের দিকে বাবা-মা তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারেন কুম্বকোনমে।

কুম্বকোনম থেকে মাদ্রাজ ছিল ১৯৪ মাইল দূরে। সেখান থেকে উপকূল ধরে আরও ৪৮৪ মাইল উত্তরে ছিল ভাইজাগাপত্তনম। বঙ্গোপসাগরের কোণে ডলফিনস নোজ নামে এক অন্তরীপের পাশে এই শহর।

এটি ছিল রামানুজনের প্রথম বড় ধরনের অন্তর্ধান। এরপর জীবনে আরও অনেকবার তিনি হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছেন। কিন্তু আত্মসম্মানে আঘাত লাগলে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়।

১৮৯৭ সাল। তাঁর বয়স তখন মাত্র নয়। কুম্বকোনম টাউন হলে প্রাইমারি পরীক্ষার গণিতে তিনি ৪৫-এর মধ্যে ৪২ পেয়েছিলেন। অথচ তাঁর বন্ধু কে. সারঙ্গপাণি আয়েঙ্গার পেয়েছিলেন ৪৩। এতে রামানুজন এতই অপমানিত বোধ করলেন যে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দিলেন! সারঙ্গপাণি অবাক হয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, অন্য সব বিষয়ে তো রামানুজনই বেশি নম্বর পেয়েছেন। কিন্তু রামানুজন মানতে নারাজ। অঙ্কে তিনি সব সময় সবার সেরা হন, এবার হতে পারেননি—এটাই ছিল তাঁর কাছে অসহ্য। তিনি কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে নালিশ জানাতে ছুটে গেলেন।

টাউন হাই স্কুল

হাইস্কুলে পড়ার সময় ত্রিকোণমিতির এক যুগান্তকারী সূত্র আবিষ্কার করেন তিনি। কিন্তু পরে জানতে পারলেন, সুইস গণিতবিদ লিওনার্ড অয়লার ১৫০ বছর আগেই সেটা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। তখন তিনি লজ্জায় এতই কুঁকড়ে গেলেন যে নিজের সেই গবেষণাপত্রগুলো বাড়ির চালের ভেতর লুকিয়ে ফেললেন!

এগুলো কি শুধুই কিশোর বয়সের খামখেয়ালিপনা? হয়তো। কিন্তু এগুলো প্রমাণ করে যে রামানুজন লোকলজ্জা বা অপমানের ব্যাপারে কতটা সংবেদনশীল ছিলেন। অনেক বছর পর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাঁকে চিঠি লেখা বন্ধ করে দেন। তখন তিনি সেই বন্ধুর ভাইকে লিখেছিলেন, ‘হয়তো পরীক্ষায় খারাপ করার লজ্জায় সে আমাকে চিঠি লিখছে না।’ অর্থাৎ, ব্যর্থতার লজ্জা ব্যাপারটা তাঁর মাথায় সব সময়ই ঘুরত।

১৮৯৭ সাল। রামানুজনের বয়স তখন মাত্র নয়। কুম্বকোনম টাউন হলে প্রাইমারি পরীক্ষার গণিতে তিনি ৪৫-এর মধ্যে ৪২ পেয়েছিলেন। অথচ তাঁর বন্ধু কে. সারঙ্গপাণি আয়েঙ্গার পেয়েছিলেন ৪৩।

মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন শেম বা লজ্জা। ব্যাপারটা অপরাধবোধ থেকে আলাদা। অপরাধবোধ আসে খারাপ কাজ করলে। আর লজ্জা আসে ব্যর্থতা বা কোনো দোষ সবার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়লে। মনে হয় যেন নিজের আসল রূপটা সবার সামনে বেরিয়ে পড়েছে। যেন কালি মেখে দেওয়া হয়েছে মুখে।

মনোবিদ লিওন ওরমসার তাঁর দ্য মাস্ক অব শেম বইয়ে লিখেছেন, ‘লজ্জা থেকে বাঁচার প্রধান লক্ষণ হলো পালানো। মানুষ তখন নিজের মুখ লুকাতে চায়, মিশে যেতে চায় মাটির সঙ্গে।’

রামানুজন ঠিক সেটাই করেছিলেন। অঙ্কে সেকেন্ড হওয়ার লজ্জায় বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করা, অয়লারের আবিষ্কারের কথা জেনে নিজের লেখা লুকিয়ে ফেলা, আর এখন স্কলারশিপ হারিয়ে ভাইজাগাপত্তনমে পালিয়ে যাওয়া। কেউ কেউ বলেন, এই সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। যা-ই হোক, তীব্র লজ্জাবোধই ছিল এর মূল কারণ।

অনেক বছর পরও স্কুলের সেই ব্যর্থতার স্মৃতি তাঁকে তাড়া করে ফিরত। একবার একটা স্কলারশিপ পাওয়ার আগে তিনি বারবার নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, এর জন্য আবার কোনো পরীক্ষা দিতে হবে না তো? গভর্নমেন্ট কলেজের সেই ব্যর্থতা তাঁকে মানসিকভাবে এতই বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল যে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পালানো। আর ভাইজাগাপত্তনমে পালিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ওই তাগিদটার কাছেই আত্মসমর্পণ করলেন।

মনোবিদ লিওন ওরমসার তাঁর দ্য মাস্ক অব শেম বইয়ে লিখেছেন, ‘লজ্জা থেকে বাঁচার প্রধান লক্ষণ হলো পালানো। মানুষ তখন নিজের মুখ লুকাতে চায়, মিশে যেতে চায় মাটির সঙ্গে।’

ব্যাপারটা অদ্ভুত মনে হতে পারে যে গণিতের জগতে যিনি ছিলেন সব প্রথা ভাঙার কারিগর, সামাজিক জীবনে সেই তিনিই ছিলেন পুরোপুরি প্রথাগত বা কনফর্মিস্ট। তিনি গণিতের রাস্তায় একলা চলতে ভয় পেতেন না। কিন্তু সেই রাস্তায় চলার জন্য মানুষ তাঁকে সম্মান করছে কি না, সেটা নিয়ে তিনি ভীষণ চিন্তিত থাকতেন।

পরবর্তী জীবনে তিনি ইংল্যান্ডে থাকার সময় একটা গণিত পুরস্কারের কথা শুনে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি সেটার জন্য আবেদন করতে পারবেন কি না। ব্রিটিশরা যখন তাঁকে বড় সম্মান দিল, তখন তাঁর চিঠি জুড়ে ছিল সেই উচ্ছ্বাস।

তিনি কি একজন ভালো গণিতবিদ হিসেবে সম্মান পাচ্ছেন? তিনি কি একজন বাধ্য সন্তান বা ভালো ব্রাহ্মণ হিসেবে গণ্য হচ্ছেন? তাঁর কি বড় কোনো স্কলারশিপ আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে কিশোর বয়সে—এই সময়েই মানুষ অন্যের মতামতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

রামানুজনের ছেলেবেলার গল্পে আমরা দেখি, তিনি বারান্দায় বসে একা একা অঙ্ক করছেন। বাইরের হইহুল্লোড়ের দিকে তাঁর কোনো খেয়াল নেই। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, তিনি আসলে ওই জগতের অংশ হতে চাইতেন। তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, না পেলে যে কষ্ট এবং সামান্য অনাদরেও যে তীব্র অভিমান—তা বলে দেয়, মনের গহিনে তিনি মানুষের স্বীকৃতি বা ভালোবাসাকে কত গুরুত্ব দিতেন।

চলবে…