কোয়ান্টাম জগৎ: যেখানে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের চাবিকাঠি

একটি বল ছুড়ে দিলে সেটি কোথায় গিয়ে পড়বে, সুইচ দিলে ঘর কীভাবে আলোকিত হবে কিংবা কোনো দেয়াল টপকাতে হলে কতটা শক্তি দরকার—এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা মোটামুটি জানি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চেনা জগৎ চলে খুব পরিচিত কিছু নিয়ম মেনেই। কিন্তু বস্তুকে যদি ক্রমাগত ছোট করতে করতে একদম পরমাণু ও ইলেকট্রনের জগতে পৌঁছে যাওয়া যায়, তখন?

সেখানে দেখা যায়, প্রকৃতি যেন তার চেনা নিয়মগুলোই নতুন করে লিখেছে! ক্ষুদ্র কণিকারা কখনো কণার মতো, আবার কখনো তরঙ্গের মতো আচরণ করে। তারা এমন সব বাধাও পেরিয়ে যেতে পারে, যা টপকানোর মতো যথেষ্ট শক্তি তাদের নেই। কখনো তাদের অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় না, আবার কখনো একটি কণার সঙ্গে বহুদূরে থাকা আরেকটি কণার এমন এক অদ্ভুত সম্পর্ক দেখা যায়, যা আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে ধরা সত্যিই কঠিন। এমনকি যে স্থানকে আমরা পুরোপুরি ফাঁকা বলে মনে করি, সেখানেও লুকিয়ে আছে বিচিত্র সব কোয়ান্টাম ঘটনা!

শুনতে যেন কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হচ্ছে, তাই না? অথচ এগুলো নিছক কল্পনা নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়া এগুলো একেকটি বাস্তব ঘটনা, যেগুলো বুঝতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের বদলে ফেলতে হয়েছে মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁদের বহু পুরোনো ধারণা।

আরও পড়ুন
ক্ষুদ্র কণিকারা কখনো কণার মতো, আবার কখনো তরঙ্গের মতো আচরণ করে। তারা এমন সব বাধাও পেরিয়ে যেতে পারে, যা টপকানোর মতো যথেষ্ট শক্তি তাদের নেই।

এই রহস্যময় জগতের নাম কোয়ান্টাম জগৎ। এর নিয়মগুলো বুঝতে পারলে শুধু প্রকৃতির গভীর রহস্যই উন্মোচিত হয় না, খুলে যায় ভবিষ্যতের প্রযুক্তির দরজাও। কোয়ান্টাম কম্পিউটার থেকে শুরু করে অতিপরিবাহী পদার্থ—আমাদের পরিচিত পৃথিবীর অনেক বিস্ময়কর প্রযুক্তির পেছনেও রয়েছে এই জগতের অদ্ভুত সব আচরণ।

তাহলে কোয়ান্টাম জগতের এমন কী কী বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাকে আমাদের চেনা জগৎ থেকে একেবারে আলাদা করে দেয়? একে একে পরিচিত হওয়া যাক সেই বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে। প্রতিটি পর্বে খুলবে নতুন একটি দরজা, আর তার ওপারে অপেক্ষা করবে প্রকৃতির এমন এক রহস্য, যা হয়তো তোমার চেনা বাস্তবতা সম্পর্কেই তোমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে!

আরও পড়ুন
চিরায়ত জগতে কোনো বস্তুর গতি বোঝাতে যেসব ভৌত রাশি ব্যবহার করা হয়—যেমন তার অবস্থান, ভরবেগ ও শক্তি—সেগুলো সাধারণত অবিচ্ছিন্নভাবে বা ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তিত হয়।

কোয়ান্টাম জগৎ কণিকাময়

কোয়ান্টাম নামের মধ্যেই-বা কী আছে? আসলে কোয়ান্টাম শব্দটি এসেছে লাতিন কোয়ান্টাস শব্দ থেকে। এর অর্থ কতটা বা কতটুকু। প্রাচীন রোমে এক টুকরো রুটির দাম জানতে শব্দটি কাজে লাগত—এমনটা ভাবতে মজাই লাগে! তবে কোয়ান্টাম শব্দটি আসলে আরও গভীর একটি বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, কিছু ভৌত রাশি আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট পরিমাণে বা খণ্ডে পাওয়া যায়। সেগুলোকে ইচ্ছেমতো ছোট করা যায় না। একটি কোয়ান্টাম মানে কোনো কিছুর ক্ষুদ্রতম পরিমাণ। এর চেয়ে আর ছোট অংশে তাকে ভাগ করা যায় না। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নামের পেছনে এই ধারণাটি কীভাবে এল, সে কথায় আমরা একটু পরেই ফিরে আসব।

এবার ‘পার্থক্য খোঁজার’ খেলায় নামার আগে একটু ভেবে দেখি, আমাদের পরিচিত জগতে জিনিসপত্র কীভাবে আচরণ করে। চিরায়ত জগতে কোনো বস্তুর গতি বোঝাতে যেসব ভৌত রাশি ব্যবহার করা হয়—যেমন তার অবস্থান, ভরবেগ ও শক্তি—সেগুলো সাধারণত অবিচ্ছিন্নভাবে বা ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তিত হয়। এ কথার মানে হলো, এক মান থেকে আরেক মানে যেতে হলে তাদের মাঝখানে আরও অসংখ্য মান থাকতে পারে।

ধরো, এক স্কেটবোর্ডার স্কেট পার্কের ঢেউখেলানো একটি বাটির মতো অংশে সামনে-পেছনে স্কেট করছে। বাটির একেবারে ওপরের কিনারায় যখন সে প্রায় ঝুলে থাকে, তখন তার গতি শূন্যের কাছাকাছি। সেখান থেকে সে নিচের দিকে নামতে থাকলে তার গতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একেবারে নিচে পৌঁছে সে সর্বোচ্চ গতিতে চলে। এখানে তার গতিকে কয়েকটি নির্দিষ্ট মানের মধ্যে আটকে রাখার মতো কোনো নিয়ম নেই। সে চাইলে ধীরে ধীরে, একটু দ্রুত কিংবা আরও দ্রুত—যেকোনো গতিতে চলতে পারে।

আরও পড়ুন
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, কিছু ভৌত রাশি আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট পরিমাণে বা খণ্ডে পাওয়া যায়। সেগুলোকে ইচ্ছেমতো ছোট করা যায় না।

তুমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে পারো, কারণ সে খুব স্বাভাবিকভাবে সামনে-পেছনে মসৃণভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার চলাফেরায় হঠাৎ কোনো অদ্ভুত ঝাঁকুনি নেই। নেই কোনো নির্দিষ্ট ধাপে আটকে যাওয়ার ব্যাপার। চিরায়ত জগতে এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা।

কোয়ান্টাম জগতে সবকিছুর আচরণ বেশ অন্য রকম। অতি ক্ষুদ্র পরিসরে জগৎ আর মসৃণ নয়, বরং খানাখন্দে ভরা। মানে হলো, সে জগৎ দানাদার বা কণিকাময়। কোয়ান্টাম কণার গতি বোঝাতে যেসব রাশি ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ইচ্ছেমতো যেকোনো মান নিতে পারে না। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম তাদের বাধ্য করে কেবল নির্দিষ্ট কিছু মান নিতে। অর্থাৎ, তারা একটানা নয়, আলাদা আলাদা খণ্ডে বা ধাপে ধাপে থাকে।

ছবি ৮: আমাদের চোখে পদার্থকে একটানা মনে হলেও, কোয়ান্টাম জগৎ গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন কণা দিয়ে। যেন প্রকৃতি সবকিছু তৈরি করেছে অতি ক্ষুদ্র দানা দিয়ে—এটাই কোয়ান্টাম জগতের দানাদার বৈশিষ্ট্যের এক ঝলক

বিষয়টা একটু অন্যভাবে ভাবা যাক। বিশাল মরুভূমিতে দূর থেকে তাকালে বালুর ঢিবিগুলোকে মনে হয় যেন একটানা ঢেউখেলানো বালুর সমুদ্র। অথচ কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, সেই ঢিবিগুলো আসলে অসংখ্য আলাদা বালুকণা দিয়ে তৈরি। আমাদের জগৎটাও অনেকটা তেমন। বড় পরিসরে সবকিছু মসৃণ ও ধারাবাহিক বলে মনে হলেও, একেবারে ক্ষুদ্রতম স্তরে গিয়ে দেখা যায়, প্রকৃতি আসলে আলাদা আলাদা ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত।

আরও পড়ুন
কোয়ান্টাম কণার গতি বোঝাতে যেসব রাশি ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ইচ্ছেমতো যেকোনো মান নিতে পারে না। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম তাদের বাধ্য করে কেবল নির্দিষ্ট কিছু মান নিতে।

বাস্তবতার এই বৈশিষ্ট্যটি প্রথম আবিষ্কার করেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। আগেই বলেছি, ১৯০০ সালে কৃষ্ণবস্তুর তাপীয় বিকিরণ নিয়ে বহুল আলোচিত একটি অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে তিনি এই ধারণার মুখোমুখি হন।

গরম কোনো বস্তু—যেমন আমাদের সূর্য—কেন আলো বা বিকিরণ ছড়ায়, তা ব্যাখ্যা করতে তখনকার চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান বেশ বিপদে পড়েছিল। এই বিকিরণকে বলা হয় কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ বা ব্ল্যাকবডি রেডিয়েশন। তখন ধারণা করা হতো, কোনো গরম বস্তু বিদ্যুৎচুম্বকীয় বর্ণালির সব তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা সব রঙেই বিকিরণ ছড়ায়। সেই বিকিরণ ছড়ানোর ধরন হওয়ার কথা ছিল একেবারে মসৃণ ও ধারাবাহিক। অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন।

কিন্তু চিরায়ত তত্ত্বে পাওয়া ব্যাখ্যায় একটা বিশাল সমস্যা ছিল। সমস্যাটা এতই বড় যে পরে এর নামই হয়ে গেল ‘অতিবেগুনি বিপর্যয়’ বা আলট্রাভায়োলেট ক্যাটাস্ট্রফি। পদার্থবিজ্ঞানীরা অবশ্য নাটকীয় নাম দিতে বেশ পছন্দ করেন! সে জন্য পদার্থবিদদের দোষও দেওয়া যায় না। কারণ চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের হিসাব বলছিল, তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকা একটি আদর্শ কৃষ্ণবস্তু থেকে নিঃসৃত শক্তির বর্ণালির অতিবেগুনি প্রান্তে যেতে যেতে অবিশ্বাস্যভাবে বাড়তে থাকবে। শেষ পর্যন্ত সেইশক্তির পরিমাণ অসীমে গিয়ে ঠেকবে!

আরও পড়ুন
তখন ধারণা করা হতো, কোনো গরম বস্তু বিদ্যুৎচুম্বকীয় বর্ণালির সব তরঙ্গদৈর্ঘ্য বা সব রঙেই বিকিরণ ছড়ায়। সেই বিকিরণ ছড়ানোর ধরন হওয়ার কথা ছিল একেবারে মসৃণ ও ধারাবাহিক। অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন।

কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের সূর্য অতিবেগুনি রশ্মি হিসেবে অসীম পরিমাণ শক্তি ছড়াচ্ছে না। তাই-ই যদি হতো, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যেত সবকিছু। তোমাকে কোনো সানস্ক্রিনই বাঁচাতে পারত না! আবার চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মমতো তোমার ঘরের উনুন বা একটা গরম লোহার টুকরো থেকে যদি অসীম পরিমাণ শক্তি বা আলো বের হতে শুরু করে, তাহলে তো মুহূর্তের মধ্যে পুরো পৃথিবী জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়ার উচিত! তুমি-আমি তো দূরের কথা, আস্ত মহাবিশ্বটাই এক পলকে উবে যাওয়ার কথা।

কিন্তু বাস্তবে কি তা হয়? কখনোই না! একটা গরম চুল্লি থেকে ঠিক যতটুকু তাপ বা আলো বের হওয়ার কথা, ঠিক ততটুকুই বের হয়—পৃথিবীও দিব্যি টিকে আছে। তাহলে রহস্যটা কী?

ছবি ৯: কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণসংক্রান্ত একটি অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ১৯০০ সালে নতুন এক পদার্থবিজ্ঞান—কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্ম দেন জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক
ছবি: স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন লাইব্রেরিজ

বিজ্ঞানীদের খাতার কলমের সুন্দর হিসাব আর বাস্তব জগতের এই বিশাল অমিল দেখে পদার্থবিদদের মাথায় হাত পড়ে গেল। তাই তাত্ত্বিক হিসাব আর বাস্তবতার এই চরম সংঘাত বা বিপর্যয়কেই বিজ্ঞানীরা নাম দিলেন অতিবেগুনি বিপর্যয়!

এই বিপর্যয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান বাঁচাতে এগিয়ে এলেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। তিনি একটা সমাধান নিয়ে হাজির হলেন। তাঁর সমাধানটা ছিল চমৎকার এবং বেশ সাহসী। তিনি ধরে নিলেন, বিদ্যুৎচুম্বকীয় বিকিরণ ইচ্ছেমতো যেকোনো পরিমাণে শোষিত বা নিঃসৃত হতে পারে না। তা কেবল শোষিত বা নিঃসৃত হতে পারে নির্দিষ্ট আকারের ছোট ছোট প্যাকেট বা কোয়ান্টা হিসেবে। আর প্রতিটি প্যাকেটের শক্তি নির্ভর করবে নিঃসৃত আলোর কম্পাঙ্কের ওপর। প্ল্যাঙ্কের হিসাবে, কম্পাঙ্ক যত বেশি, প্রতিটি প্যাকেটের শক্তিও তত বেশি

আরও পড়ুন
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক একটা সমাধান নিয়ে হাজির হলেন। তাঁর সমাধানটা ছিল চমৎকার এবং বেশ সাহসী। তিনি ধরে নিলেন, বিদ্যুৎচুম্বকীয় বিকিরণ ইচ্ছেমতো যেকোনো পরিমাণে শোষিত বা নিঃসৃত হতে পারে না।

সেই সময় আলোর এই খণ্ডিত বা কোয়ান্টায়িত হওয়ার ধারণাটি ছিল ভীষণ বিতর্কিত। কারণ, কোনো ভৌত রাশি যে কেবল নির্দিষ্ট কিছু খণ্ডে থাকতে পারে—এমন ধারণার পক্ষে তখন কোনো যুক্তিই ছিল না। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, যেন কেউ বলছে—একটি কল খুললে তা দিয়ে শুধু পুরো গ্লাস পানি ভরা যাবে, তার চেয়ে কম পানি নয়! কিন্তু এই অদ্ভুত ধারণাটিই প্ল্যাঙ্ককে কৃষ্ণবস্তু থেকে নির্গত বিকিরণের সঠিক বণ্টন বের করতে সাহায্য করল। মানে, কোনো গরম বস্তু কোন রঙে কতটা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে, তার সঠিক হিসাব তিনি করতে পারলেন।

শক্তি বা আলোকে গুচ্ছ গুচ্ছ কোয়ান্টায় ভাগ করার ধারণার মাধ্যমে অতিবেগুনি বিপর্যয়ের সমাধান করলেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। সেই সঙ্গে ঘটল এর চেয়েও বড় কিছু ব্যাপার। কারণ, এর মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য এত দিনের চিরায়ত সূত্রগুলো পুরো ছবিটা তুলে ধরতে পারছে না। এত দিন পর্যন্ত মহাবিশ্বকে বেশ যুক্তিসংগত ও নিয়মমাফিক বলেই মনে হচ্ছিল। হঠাৎ তার ভেতরের প্রথম আভাস পাওয়া গেল একেবারেই অন্য রকম প্রকৃতির। এভাবে কোয়ান্টাম জগতের আসল চেহারাটা প্রথমবারের মতো একটু একটু করে প্রকাশ পেতে শুরু করল। আর বিজ্ঞানের জগৎও এরপর আর কখনো আগের মতো রইল না।

আরও পড়ুন
কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াস ঘিরে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রনও ইচ্ছেমতো যেকোনো শক্তি নিয়ে থাকতে পারে না। তাদের শক্তি কেবল নির্দিষ্ট কিছু স্তরেই থাকতে পারে।

১৯০৫ সালে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি দেখালেন, কোয়ান্টায়িত হওয়া শুধু একটি সুন্দর গাণিতিক কৌশল নয়, বরং আলো সত্যিসত্যিই নির্দিষ্ট ছোট ছোট প্যাকেট হিসেবে শোষিত ও নিঃসৃত হয়। তিনি আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া বা ফটোইলেকট্রিক ইফেক্টের মাধ্যমে তা প্রমাণ করেন। এই ঘটনায় আলো কোনো ধাতুর পৃষ্ঠে পড়লে সেখান থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে আসে। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে এই ঘটনা কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। কিন্তু আইনস্টাইন দেখালেন, এই ঘটনা ঘটতে হলে আলোকে অবশ্যই আলাদা আলাদা শক্তির কোয়ান্টা হিসেবে ধাতুর ওপর এসে পড়তে হবে। আলোর এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তির প্যাকেটগুলোকে এখন বলা হয় ফোটন।

ছবি ১০: আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া বা ফটোইলেকট্রিক ইফেক্টের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করেন আইনস্টাইন

পরমাণুর গোটা জগৎজুড়েই ছড়িয়ে আছে এই কণিকাময় বা দানাদার কোয়ান্টাম রূপ। শুধু আলোই যে নির্দিষ্ট প্যাকেট বা ফোটন হিসেবে নিঃসৃত ও শোষিত হয়, তা নয়; বরং পদার্থ ও বৈদ্যুতিক চার্জও কোয়ান্টায়িত। পদার্থ তৈরি হয়েছে অবিভাজ্য কণা দিয়ে। যেমন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকা প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে কোয়ার্ক রয়েছে। সেই কোয়ার্কগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে গ্লুয়ন।

বৈদ্যুতিক চার্জ বা আধানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। আধান কেবল ইলেকট্রনের আধানের পূর্ণসংখ্যা গুণ হিসেবে থাকতে পারে। তুমি একটি ইলেকট্রনকে টুকরো টুকরো করে এমন ছোট ছোট অংশে ভাগ করতে পারবে না, যেগুলোর প্রতিটির চার্জ হবে ইলেকট্রনের আধানের ভগ্নাংশ।

শুধু তা-ই নয়, কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াস ঘিরে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রনও ইচ্ছেমতো যেকোনো শক্তি নিয়ে থাকতে পারে না। তাদের শক্তি কেবল নির্দিষ্ট কিছু স্তরেই থাকতে পারে।

আরও পড়ুন
পদার্থ তৈরি হয়েছে অবিভাজ্য কণা দিয়ে। যেমন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকা প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে কোয়ার্ক রয়েছে। সেই কোয়ার্কগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে গ্লুয়ন।

এই বিষয়টি প্রথম জানা যায় ১৯১৩ সালে। সে বছর ডেনমার্কের পদার্থবিদ ও দার্শনিক নীলস বোর পরমাণুর জন্য তাঁর বিখ্যাত সৌর মডেল বা প্ল্যানেটারি মডেল প্রকাশ করেন। বোরের এই মডেলে নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ইলেকট্রন কেবল নির্দিষ্ট কিছু কক্ষপথ বা কোয়ান্টাম শক্তিস্তরে থাকতে পারে। ব্যাপারটা অনেকটা অদ্ভুত এক সৌরজগতের মতো। সেখানে গ্রহগুলো কেন্দ্রীয় নক্ষত্রকে ঘিরে যেকোনো দূরত্বে ঘুরতে পারে না। তাদের জন্য শুধু নির্দিষ্ট কিছু দূরত্বই অনুমোদিত। বোরের মডেল সেই সময়ের পরমাণু সম্পর্কে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণাকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেল। সেই ধারণাটি ছিল রাদারফোর্ডের মডেল।

১৯১১ সালে এই মডেল প্রস্তাব করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত পদার্থবিদ ও রসায়নবিদ আর্নেস্ট রাদারফোর্ড। তাঁর মডেলে পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াসকে ঘিরে যেকোনো কক্ষপথে ঘুরতে পারত। অনেকটা আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলোর মতো। কিন্তু রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলে বেশ বড়সড় এক সমস্যা ছিল। সেটি উপেক্ষা করা কঠিন। এই মডেল অনুযায়ী সব পরমাণু খুবই অস্থিতিশীল হওয়ার কথা। এমনকি তাদের অস্তিত্বই থাকার কথা নয়! কারণ চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো চার্জিত কণা যদি বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে, তাহলে তাকে বিদ্যুৎচুম্বকীয় বিকিরণ ছড়াতেই হবে। আর বিকিরণ ছড়াতে ছড়াতে সে শক্তি হারাতে থাকবে। তাহলে রাদারফোর্ডের চিরায়ত পরমাণু মডেল অনুযায়ী কী হওয়ার কথা।

আরও পড়ুন
রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলে বেশ বড়সড় এক সমস্যা ছিল। সেটি উপেক্ষা করা কঠিন। এই মডেল অনুযায়ী সব পরমাণু খুবই অস্থিতিশীল হওয়ার কথা। এমনকি তাদের অস্তিত্বই থাকার কথা নয়!

নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ঘুরতে থাকা ইলেকট্রনগুলো অবিরাম ফোটন হিসেবে বিকিরণ ছড়াবে। ফলে ক্রমাগত শক্তি হারাতে থাকবে ইলেকট্রনগুলো। আর শক্তি হারাতে হারাতে সেগুলো সর্পিল পথে নিউক্লিয়াসের দিকে এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে ইলেকট্রনগুলো কমতে থাকা শক্তির ফোটনের একটি ধারাবাহিক বর্ণালিও ছড়াবে। কিন্তু আমরা চারপাশে যা দেখি, তার সঙ্গে এই ছবির কোনো মিল নেই। ইলেকট্রন নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো চিরায়ত কক্ষপথ বেছে নিতে পারে না। যদি পারত, তাহলে মহাবিশ্বের সব পরমাণু ধসে পড়ত চোখের পলকে! আর পরমাণুই যদি না থাকে, তাহলে আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর কিংবা আমি-তুমিসহ এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব থাকে কীভাবে!

পরমাণু সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জানা ছিল। কোনো পরমাণু ইচ্ছেমতো যেকোনো শক্তির আলো শোষণ বা নিঃসরণ করতে পারে না। তারা কেবল নির্দিষ্ট কিছু শক্তির ফোটন শোষণ বা নির্গত করতে পারে। এ কারণেই তাদের শোষণ ও নিঃসরণ বর্ণালিতে আলোর নির্দিষ্ট কিছু রেখা বা ব্যান্ড দেখা যায়। সেখানে আলো নির্দিষ্ট কিছু কম্পাঙ্কে থাকে। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের পূর্বাভাস অনুযায়ী যে একটানা বর্ণালি থাকার কথা, তা দেখা যায় না।

বোরের মডেল পদার্থবিজ্ঞানের জন্য ছিল এক বড় সাফল্য। কারণ, এটি এমন একটি রহস্যের সমাধান করেছিল, যা কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছিল। হাইড্রোজেন গ্যাসের মধ্য দিয়ে যখন বৈদ্যুতিক প্রবাহ চালানো হতো, তখন তা দৃশ্যমান আলোর বর্ণালিতে মাত্র চারটি নির্দিষ্ট রঙে জ্বলত। আমাদের মনে থাকা রংধনুর মতো একটানা সাত রঙের বর্ণালি সেখানে দেখা যেত না। রংধনুর রংগুলো একটির পর একটি মসৃণভাবে বদলে যায়, হাইড্রোজেনের আলো তেমন ছিল না।

আরও পড়ুন
কোনো পরমাণু ইচ্ছেমতো যেকোনো শক্তির আলো শোষণ বা নিঃসরণ করতে পারে না। তারা কেবল নির্দিষ্ট কিছু শক্তির ফোটন শোষণ বা নির্গত করতে পারে।

বোরের মডেল বলছে, হাইড্রোজেন পরমাণুর প্রোটনকে ঘিরে থাকা ইলেকট্রন কেবল নির্দিষ্ট কিছু কক্ষপথেই থাকতে পারে। একটি কক্ষপথ বা শক্তিস্তর থেকে আরেকটিতে যাওয়ার সময় ইলেকট্রন একটি ‘কোয়ান্টাম লাফ’ দেয়। আর সেই লাফের সময় সে কেবল নির্দিষ্ট শক্তির আলোই নিঃসরণ করতে পারে। আর তার ফলেই দেখা যায় স্রেফ নির্দিষ্ট কিছু রঙের আলো।

কোনো পরমাণুর ইলেকট্রনের সবচেয়ে কম শক্তির অবস্থা হলো তার ভূমি অবস্থা বা গ্রাউন্ড স্টেট। এই অবস্থায় ইলেকট্রন থাকে নিউক্লিয়াসের সবচেয়ে কাছের অনুমোদিত কক্ষপথে। তবে সেই কক্ষপথের ব্যাসার্ধ শূন্য নয়; বরং এর একটি নির্দিষ্ট, ক্ষুদ্র কিন্তু সসীম আকার রয়েছে। তাই ইলেকট্রনটি এর চেয়ে আর নিউক্লিয়াসের কাছে যেতে পারে না।

ছবি ১১: নীলস বোরের প্রস্তাবিত পরমাণু মডেল। এর সঙ্গে সৌরজগতের বেশ মিল ছিল। মডেলটি পরমাণুসংক্রান্ত বেশ কিছু সমস্যার সমাধান দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অনেক কিছু ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছিল

এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো, বোরের এই কোয়ান্টায়িত পরমাণু মডেল একই সঙ্গে দুটি রহস্যের সমাধান করে ফেলল। প্রথমত, ইলেকট্রন কেন তার নিউক্লিয়াসের দিকে ক্রমাগত পড়ে গিয়ে পরমাণুকে ধ্বংস করে না, তার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। দ্বিতীয়ত, হাইড্রোজেন কেন কেবল নির্দিষ্ট কিছু রঙের আলো শোষণ ও নিঃসরণ করে, উত্তর মিলল তারও।

আরও পড়ুন
কোনো পরমাণুর ইলেকট্রনের সবচেয়ে কম শক্তির অবস্থা হলো তার ভূমি অবস্থা বা গ্রাউন্ড স্টেট। এই অবস্থায় ইলেকট্রন থাকে নিউক্লিয়াসের সবচেয়ে কাছের অনুমোদিত কক্ষপথে।

এবার আমাদের সেই স্কেটবোর্ডারের কথায় ফিরে আসা যাক। ধরো, স্কেটবোর্ডারকে এতই ছোট করে ফেলা হলো যে তার আকার হয়ে গেল একটি ইলেকট্রনের সমান। সে স্কেট করছে একটি পরমাণুর সমান বড় বাটির ভেতর। তাহলে সে আর ইচ্ছেমতো যেকোনো শক্তি নিয়ে চলাফেরা করতে পারবে না। তার শক্তির জন্য কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানই বরাদ্দ থাকবে। তার জন্য বাটির এক পাশ থেকে অন্য পাশে ইচ্ছেমতো সামনে-পেছনে ঘুরে বেড়ানোর দিন শেষ। তার বদলে তার চলাফেরা সীমাবদ্ধ থাকবে স্রেফ নির্দিষ্ট কিছু শক্তিস্তরের মধ্যে। তুমি বরং এমনটা কল্পনা করতে পারো—বাটির তলার ওপর বিভিন্ন উচ্চতায় কয়েকটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত আঁকা আছে। স্কেটবোর্ডারটির কেবল ওই বৃত্তগুলোর ওপর দিয়েই তার স্কেটিং করার অনুমতি আছে।

এখন ধরো, সে নিচের একটি বৃত্ত থেকে এক লাফে ওপরের আরেকটি বৃত্তে যেতে চায়। তার জন্য তাকে ঠিক নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি শোষণ করতে হবে। ধরো, তার এক বন্ধু এমন একটি বল ছুড়ে দিল, যার মধ্যে ঠিক সেই পরিমাণ শক্তি রয়েছে। বলটি স্কেটবোর্ডারের গায়ে লাগল। তাতে সে এক লাফে নিচের শক্তিস্তর থেকে উঠে গেল ওপরের শক্তিস্তরে। এমন কাণ্ড করতে পারলে সেটি সত্যিই দারুণ এক স্কেটবোর্ডিং কৌশল হতো, তাই না!

আরও পড়ুন

ড্যানি হোমসের ওয়ান্ডার অব কোয়ান্টাম ওয়ার্ল্ডস অবলম্বনে