মেয়েটার নাম কী বললেন?
পুলিশ অফিসার ভ্রু কুঁচকে বদরুলের দিকে তাকায়।
—নাসরীন আখতার।
—কী করে?
—স্থপতি।
—বাড়িঘর বানায়?
—না না, বাড়িঘরের নকশা করে। আর্কিটেক্ট।
—ওই হলো।
পুলিশ অফিসার চেয়ার থেকে উঠে বাসার ভেতরের লম্বা প্যাসেজটায় এসে দাঁড়ায়। ‘ডিটেকটিভ বলেছে, এই প্যাসেজ দিয়ে টেনে মেয়েটাকে ধরে নিয়ে গেছে?’
—জি।
—সে কেমনে বুঝল?
—তা জানি না। উনি বললেন, নাসরীনকে আঘাত করে অজ্ঞান করে তারপর এই প্যাসেজ দিয়ে টেনে বাইরে নিয়ে গেছে।
—ডিটেকটিভ এত কিছু বুঝল কীভাবে? সে কি পুলিশের চেয়ে বেশি বোঝে?
—জি মানে...।
—ওই ফালতু প্রাইভেট ডিটেকটিভকে ডেকেছেন, তাহলে আবার আমাদের ডেকেছেন কেন?
—না, মানে, মামা বললেন...।
—ও, কমিশনার স্যার তো আবার আপনাদের মামা...
পুলিশ অফিসার গলায় একটা অবজ্ঞার আওয়াজ করল। বোঝাই যাচ্ছে, সে কেসটা খুব বিরক্তিসহকারে গ্রহণ করেছে। একবারে না থাকতে পেরে বদরুলদের বাসায় এসেছে। ঝামেলাটা থানায়ই সেরে ফেলতে পারত। হঠাৎ কমিশনার সাহেবের ফোন আসায় একটু নড়েচড়ে বসে এখানে আসতে হলো; ওই শালা ফোপর দালাল প্রাইভেট ডিটেকটিভকে একটু টাইট দিতে হবে। মনে মনে ঠিক করে ফেললেন ওসি সাহেব।
—ওই ডিটেকটিভের নাম কী?
—কাইজার পাশা।
—খ্রিষ্টান নাকি? এই রকম নাম!
—জি না।
—ফোন নম্বর আছে?
—আছে।
—নামটা আর ফোনটা লেইখা দেন।
—এই যে ওনার একটা কার্ড।
পুলিশ অফিসার গলায় একটা অবজ্ঞার আওয়াজ করল। বোঝাই যাচ্ছে, সে কেসটা খুব বিরক্তিসহকারে গ্রহণ করেছে। একবারে না থাকতে পেরে বদরুলদের বাসায় এসেছে।
কার্ডটা অবহেলায় একনজর দেখে পকেটে ঢোকাল। বিড়বিড় করে বলল, ‘আবার কার্ডও বানাইছে!’ কেশে গলা পরিষ্কার করে বলল:
—সিসি ক্যামেরা চেক করছেন?
—জি, আমাদের বাসায় চারটা সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে, সব কটির মেমোরি চেক করেছি। কিন্তু নাসরীনকে যেভাবে নিয়েছে...এমনভাবে নিয়েছে যেন কোনো সিসি ক্যামেরায় তাকে দেখা না যায়, আসামিদেরও দেখা না যায়।
—ওই দিনের সিসি ক্যামেরার পুরো রেকর্ডটার একটা কপি দেন। এই মজিদ।
কনস্টেবল মজিদ ছুটে এল, ‘স্যার।’
—পেনড্রাইভে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পুরাটা নাও।
—স্যার, আগেই নিছি। দেখছি কিছু নাই, ফকফকা...
—সেটা থানায় গিয়ে বুঝব।
ওসি সাহেব খুব বিরক্তি নিয়ে বাসার লোকজনকে তৃতীয় দফায় নানা রকম প্রশ্ন করলেন। কিছু নোট করলেন, কিছু শুনেও না শোনার ভান করলেন। বোঝা গেল, ব্যাপারটায় তার একটা কেমন গা ছাড়া ভাব। যেন এটা কোনো ব্যাপার নয়। ঢাকা শহরে মেয়েরা কিডন্যাপ হতেই পারে। এখানে এত মাথা গরম করার কী আছে? একটু বাদেই জিপে চড়ে দুজন কনস্টেবলকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন কাল–পরশু থানায় দেখা করতে।
ওসি সাহেব বিরক্তি নিয়ে বাসার লোকজনকে তৃতীয় দফায় নানা রকম প্রশ্ন করলেন। কিছু নোট করলেন, কিছু শুনেও না শোনার ভান করলেন। বোঝা গেল, ব্যাপারটায় তার একটা কেমন গা ছাড়া ভাব।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কাইজার খান। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার টেবিলের ওপর চওড়া মনিটরটার দিকে। এই নিয়ে ছত্রিশবার নাসরীনদের বাসার সিসিটিভি ফুটেজের রেকর্ড দেখলেন তিনি। কিচ্ছু নেই। তবে তিন নম্বর ক্যামেরাটায় আবছামতো কিছু দেখা যাচ্ছে। চারটা ক্যামেরার মধ্যে তিনটা ক্যামেরাই ঘরের ভেতরে; একটা শুধু বাইরের বাগানে। গাছপালার মধ্যে। হঠাৎই চিন্তাটা এল কাইজারের মাথায়। ভ্রু কুঁচকে গেল তার। দরজায় একটা ছায়া পড়ল। তাকিয়ে দেখে মানিক দাঁড়িয়ে আছে, তার ছেলেবেলার বন্ধু। কাইজার বিড়বিড় করে বলল:
—পিএএক্স-সিক্স (pax6)।
—এটা কী? সামনের খালি চেয়াটায় বসতে বসতে বলল মানিক।
—এটা হচ্ছে সেই জিন, যেটার জন্য মানুষ দেখতে পায়।
—ও তাই, তাতে আমার কী?
—এই জিন গাছেরও আছে, সেম জিন—পিএএক্স-সিক্স (pax6)।
—তাই নাকি? তাতেই–বা আমার কী যায়–আসে?
—না, তোর কিছু যায়–আসে না। তবে গাছও কিন্তু এই কারণে দেখতে পায়।
—বুঝলাম, কিন্তু আমি তোর কাছে বোটানির বক্তৃতা শুনতে আসিনি।
—আমি বক্তৃতা দিচ্ছি না, তোকে একটা গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন জানালাম। জাংক ফুড খেয়ে খেয়ে আমরা যেমন শরীরটাকে নষ্ট করছি... সে রকম জাংক ইনফরমেশন মাথায় নিয়ে নিয়ে ব্রেনটাকেও নষ্ট করছি। কিন্তু এই ইনফরমেশনটা জেনুইন, এটা জানা জরুরি, হঠাৎ মনে পড়ল।
তীক্ষ্ণ চোখে তিন নম্বর মনিটরটার দিকে তাকিয়ে আছে কাইজার। সেই আবছা ছবিটা মাঝেমধ্যে স্পষ্ট হচ্ছে আবার নাই হয়ে যাচ্ছে...যেন কোনো সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ মানিকের দিকে তাকাল, ‘কফি খাবি?’
—সে জন্যই তো আসা। তোর এখানে এই কফি ছাড়া আছেটা কী?
জাংক ফুড খেয়ে খেয়ে আমরা যেমন শরীরটাকে নষ্ট করছি... সে রকম জাংক ইনফরমেশন মাথায় নিয়ে নিয়ে ব্রেনটাকেও নষ্ট করছি। কিন্তু এই ইনফরমেশনটা জেনুইন, এটা জানা জরুরি, হঠাৎ মনে পড়ল।
কাইজার উঠে গিয়ে দ্রুত হাতে দুই কাপ কফি বানাল। তার মাথায় দ্রুত চিন্তা চলছে। কফিতে চুমুক দিয়ে মানিকের দিকে তাকাল কাইজার।
—তোদের বাসার ছাদে একটা ছাদবাগান আছে না?
—আছে তো, আমার মায়ের শখের বাগান। এখন গিয়ে দেখিস কী অবস্থা করেছে মালি।
—মানে? কী করেছে?
—সব গাছ কেটে একদম ন্যাড়া করে দিয়েছে...এতে নাকি গাছ দ্রুত বাড়বে...।
‘সব গাছকে অন্ধ করে দিয়েছে...’ ঘোরের মধ্যে থেকে যেন কথাটা বলল কাইজার, তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
—মানে, কী বলছিস?
—তোদের মালি সব গাছ ছেঁটে দিয়ে অন্ধ করে দিয়েছে, গাছ এখন দেখার জন্য...তার চোখ ফিরে পাওয়ার জন্য দ্রুত বাড়তে থাকবে। এটাই গাছের নিয়ম।
—কী সব আগডুম–বাগডুম বলছিস তুই। কফি শেষ করে সিগারেট ধরাল মানিক, ‘শোন, আমি একটু ঘুমাব তোর ঘরে। ঠিক তিনটার সময় ডেকে দিবি।’
—ঠিক আছে। যা...
ওসি একরামুল্লাহ। বদরুলদের বাসায় আবার এসেছেন। খুবই বিরক্তি নিয়ে বদরুলদের ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। সঙ্গে ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের দুজন কনস্টেবল নিয়ে এসেছেন। কেন এনেছেন, ওসি একরামুল্লাহ নিজেও ঠিক মনে করতে পারছেন না। খুনখারাবির কিছু তো নেই এখানে। কনস্টেবল দুজন বাইরের বাগান তছনছ করে ফেলছে। বদরুল শুকনা মুখে ওসি সাহেবের সামনে বসে আছে।
—নাসরীন আপনার কে হয়?
—ছোট বোন।
—হুম। আপনার স্ত্রীর বয়স কত?
—ত্রিশ।
—আপনার বোন আর আপনার স্ত্রী তো একই বয়সী? ওনাদের মধ্যে মিলমিশ আছে তো?
খুবই বিরক্তি নিয়ে বদরুলদের ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। সঙ্গে ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের দুজন কনস্টেবল নিয়ে এসেছেন। কেন এনেছেন, ওসি একরামুল্লাহ নিজেও ঠিক মনে করতে পারছেন না।
বদরুল কী বলবে বুঝতে পারছে না। এই লোকটা উল্টোপাল্টা কথা বলতে শুরু করেছে। এ–জাতীয় প্রশ্ন সে আগেও অনেকবার করেছে।
—হ্যাঁ, তারা দুজন বান্ধবীর মতো।
—হুম। চায়ে চুমুক দিল ওসি সাহেব।
—আচ্ছা, ওই ডিটেকটিভের খবর কী? খাইবার পাস না কী যেন নাম?
—খাইবার পাস না, কাইজার। কাইজার পাশা।
—ওই হলো, সে কেসের কোনো কিনারা করতে পারছে?
—না, উনি তো এখনো কিছু বলেননি।
—হু...হাতি ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল। ওসি একরামুল্লাহ সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়েন। ‘ওই টিকটিকিকে বলবেন আমাকে যেন ফোন দেয়।’
—আপনাকে তো ওনার কার্ড দিয়েছি।
—আরে, আমার এত সময় কোথায়? তা ছাড়া ওই লোকটাকে এর মধ্যে ঢুকিয়েই তো সর্বনাশটা করছেন, নইলে এই কেস আরও আগেই...।
এই সময় ওসি সাহেবের ওয়াকিটকি বেজে উঠল। ওসি একরামুল্লাহ মোটামুটি লাফিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।
—স্যার স্যার...আমি স্যার স্পটেই আছি...আপনার আত্মীয় বদরুল সাহেবের বাসায়, জি জি...ওরা ইনভেস্টিগেশন করছে...জি স্যার। চিন্তা করবেন না...খুব শিগগির...জি জি...।
হু...হাতি ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল। ওসি একরামুল্লাহ সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়েন। ‘ওই টিকটিকিকে বলবেন আমাকে যেন ফোন দেয়।’
ওয়াকি–টকি অফ করে ধপ করে বসে পড়লেন ওসি একরামুল্লাহ। বিরক্তি নিয়ে তাকালেন বদরুলের দিকে।
—আপনার মামা ফোন করছিলেন।
—বুঝতে পারছি।
—আপনার কেমন মামা?
—আমার মায়ের কাজিন।
—ফার্স্ট কাজিন না তাহলে?
—না।
—দূরের সম্পর্ক।
এ সময় ফরেনসিকের কনস্টেবল দুজন ঢুকল।
—কিছু পাইছ?
—নাহ্...খালি গাছ আর গাছ, এত গাছের মধ্যে কিছু আইডেন্টিফাই করা...
কনস্টেবল দুজন হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।
—এত গাছের বাগান কে করছে?
—আমার বোন নাসরীন।
—হুম, চলো যাই...
তারা জিপে উঠে চলে গেল। কালো ধোঁয়া ছেড়ে ‘পুলিশ’ লেখা জিপ উধাও হয়ে গেল।
ঠিক তিনটার সময় মানিককে ডেকে তোলার কথা। কাইজার আড়াইটার সময় মানিককে ঘুম থেকে ডেকে তুলল।
—কী হলো, এত আগে ডাকলি কেন? চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসল মানিক।
—জলদি ওঠ। তোর গাড়ি এনেছিস?
—হু।
—জলদি ওঠ।
—কেন, কী হয়েছে?
—ওই মেয়েটার খোঁজ পেয়েছি।
—কোন মেয়েটা?
—আর্কিটেক্ট নাসরীন আখতার...।
মানিকের ১৫০ সিসির টয়োটা এক্সিওটা মগবাজারের কাছে বড় বাজারের ভেতর দুবার মোড় নিয়ে একটা গলির ভেতর ঢুকে গেল। দোতলা একটা লাল বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
—দেখ, এই ছবিটার সাথে এই বাড়িটা মেলে না?
মানিকের ১৫০ সিসির টয়োটা এক্সিওটা মগবাজারের কাছে বড় বাজারের ভেতর দুবার মোড় নিয়ে একটা গলির ভেতর ঢুকে গেল। দোতলা একটা লাল বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
মানিক তাকিয়ে দেখে, কাইজারের আইফোনের চওড়া স্ক্রিনে আবছা একটা লাল বাড়ির আবছামতো ছবি। ওপরে ক্যামেরা থ্রি লেখাটা টিকটিক করছে।
—হ্যাঁ, মিল আছে; কিন্তু তুই শিওর, এই বাসা?
—বাড়ির সামনে একটা গাছ খেয়াল করেছিস?
—এটা খেয়াল করার কী আছে? সব বাড়ির সামনেই গাছ আছে।
—এই কেসে এই গাছের বড় ভূমিকা আছে।
—তখন থেকে গাছ গাছ করছিস, কেসটা কী? এই বাড়ি, তুই শিওর?
—ওভার শিওর। কাইজার তার লাইসেন্স করা থার্টি টু ক্যালিবারের পিস্তলটা প্যান্টের পেছন থেকে হাতে নিল। হয়তো দরকার পড়বে না। তারপরও...সাবধানের মার নেই।
দোতলার কোনার ঘরটায় হাত–পা–মুখ বাঁধা অবস্থায় নাসরীন আখতারকে পাওয়া গেল। ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে নাসরীন কাইজারের দিকে। মুখের পট্টিটা খুলতেই ফ্যাসফেসে গলায় বলল, ‘আপনি কে?’
—ভয় নেই, আপনাকে উদ্ধার করতেই এসেছি। আমি কাইজার, একজন ডিটেকটিভ বলতে পারেন।
—ওরা কোথায়?
—পুরো বাড়িই খালি। শুধু গেটের দারোয়ানকে অজ্ঞান করে আপনার কাছে এলাম, সহজেই পাওয়া গেছে আপনাকে। চলুন।
‘আ–আমি হাঁটতে পারব না’ বলেই কাত হয়ে ঢলে পড়ল কাইজারের ওপর। চট করে ধরে না ফেললে বিপদ হতো। মানিককে সঙ্গে আনা দরকার ছিল মনে হচ্ছে। প্রায় অজ্ঞান নাসরীনকে পাঁজাকোলা করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। মেয়েটার গায়ে মিষ্টি একটা মেয়েলি গন্ধ।
দোতলার কোনার ঘরটায় হাত–পা–মুখ বাঁধা অবস্থায় নাসরীন আখতারকে পাওয়া গেল। ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে নাসরীন কাইজারের দিকে। মুখের পট্টিটা খুলতেই ফ্যাসফেসে গলায় বলল, ‘আপনি কে?’
ঘাড়ে পিস্তলের বাঁট দিয়ে বাড়ি দিয়ে অজ্ঞান করা দারোয়ানটা তখনো সিঁড়িঘরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। কাইজার নাসরীনকে পাঁজাকোলা করে ধরেই কোনোমতে বাইরে থেকে দরজাটা লক করে দিল।
—এই লোকটা কে? নাসরীনের প্রশ্নে বোঝা গেল, জ্ঞান এখনো আছে। ভয় বা ভরসার চোখে দেখছে যেন কাইজারকে।
—এ বাড়ির দারোয়ান মনে হয়।
—ও কি মারা গেছে?
—না। হেসে ফেলল কাইজার। ওকে পিস্তলের বাঁট দিয়ে অজ্ঞান করতে হয়েছে।
নাসরীন ভয় মাখানো চোখে কাইজারের থার্টি টু ক্যালিবারের পিস্তলটার দিকে তাকিয়ে আছে। সেটা এই মুহূর্তে প্রায় তার মুখের কাছে উঁচিয়ে আছে।
কাইজারের সঙ্গে নাসরীনকে ঢুকতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল ওসি একরামুল্লাহ আর বদরুল। বদরুল লাফিয়ে উঠে বোনকে জড়িয়ে ধরল।
—ও–ওনাকে কো-কোথায় পেয়েছেন? ওসি একরামুল্লাহ তোতলাতে শুরু করেছেন। সকাল থেকে এখানে বসে আছেন; কারণ, কমিশনার সাহেব আসবেন আজ।
—আপনি তো ওসি একরামুল্লাহ? এই কেসের
দায়িত্বে আছেন?
—জি জি। ওনাকে কীভাবে পেলেন?
—এসব পরে। এই যে এই ঠিকানায়। দ্রুত ফোর্স নিয়ে যান। একটা দারোয়ানকে আটকে রেখে এসেছি। ওকে ধরলে সব বেরোবে...ওই বাড়িতেই ওনাকে পেয়েছি। জলদি যান।
ওসি একরামুল্লাহ কী করবেন বুঝতে পারছেন না। এদিক-ওদিক তাকালেন, তারপর ছুটে বেরিয়ে গেলেন ঠিকানা লেখা কাগজটা নিয়ে।
এসব পরে। এই যে এই ঠিকানায়। দ্রুত ফোর্স নিয়ে যান। একটা দারোয়ানকে আটকে রেখে এসেছি। ওকে ধরলে সব বেরোবে...ওই বাড়িতেই ওনাকে পেয়েছি। জলদি যান।
সপ্তাহখানেক পর। আর্কিটেক্ট নাসরীন আখতারের বাসায় বাগানে ছোট্ট একটা মিটিংয়ে বসেছেন ডিটেকটিভ কাইজার পাশা, নাসরীন, বদরুল আর ওসি একরামুল্লাহ। ওসি সাহেব এখনো চার্জশিট দিতে পারেননি। কারণ, ভিকটিম ঠিক কীভাবে উদ্ধার পেয়েছেন, সেটা আগে বুঝতে হবে। নইলে চার্জশিট লেখা যাচ্ছে না।
কাইজার পাশা বাগানের গাছগুলোর দিকে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসিমুখে বলল—
—মিস নাসরীন আখতারকে আসলে ওনার গাছগুলোই উদ্ধার করেছে।
—কী রকম? নোটবুক খুলে প্রথম প্রশ্নটা করেন ওসি একরামুল্লাহ, ‘একটু খোলাসা করুন,’ ওসি সাহেব বেশ নরম গলায় বললেন। তার চোখে–মুখে আগ্রহ ফুটে উঠেছে।
—বলছি। আসলে হয়েছে কী, ওনাদের বাসার চারটা ক্যামেরায় কিছুই পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ তিন নম্বর ক্যামেরায় একটা কিছু পেলাম যেন...কিছু সংকেতের মতো। তখনই অপ্রাসঙ্গিকভাবে একটা চিন্তা আমার মাথায় এল। চিন্তাটা গাছ নিয়ে। গাছ কিন্তু দেখতে পায়। এই যে চারদিকে তাকিয়ে দেখুন, গাছের ছড়িয়ে দেওয়া ডালপালাগুলো আসলে একেকটা ক্যামেরার মতো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার সাবসিডিয়ারি ছিল বোটানি। দু–দুবার ফেল করলাম বোটানির সাবসিডিয়ারি পরীক্ষায়। তৃতীয়বার ফেল করলে কিন্তু অনার্স বাতিল হয়ে যাবে। কাজেই তৃতীয়বারে বোটানিতে আমাকে পাস করতেই হবে—এই নিয়ত নিয়ে ভয়াবহ পড়াশোনা শুরু করলাম। শেষ পর্যন্ত এমন রেজাল্ট করলাম যে বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ‘কালীনারায়ণ স্কলারশিপ’ দিতে বাধ্য হলো। জানেন তো, সাবসিডিয়ারিতে ভালো রেজাল্ট করলে ওই স্কলারশিপ পাওয়া যায়।
—জানতাম না তো, বলল নাসরীন আখতার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার সাবসিডিয়ারি ছিল বোটানি। দু–দুবার ফেল করলাম বোটানির সাবসিডিয়ারি পরীক্ষায়। তৃতীয়বার ফেল করলে কিন্তু অনার্স বাতিল হয়ে যাবে।
—তো সেই বোটানির জ্ঞান নিয়ে আমি জানতাম যে গাছের পাতার ক্লোরোফিল সূর্যের নীল আর লাল রং নিয়ে নিলেও সবুজটা সে রিফ্লেক্ট করে বলে আমরা সবুজ দেখতে পাই গাছকে। সবুজ রংটা রিফ্লেক্ট করছে একটা নির্দিষ্ট ওয়েভলেংথে...
—এসব জ্ঞানের কথার সঙ্গে ওনার কিডন্যাপ হওয়ার সম্পর্ক কী? ওসি সাহেবের গলায় একটু অসন্তোষ যেন। হয়তো তিনি বুঝতে পারছেন না বলেই।
—একটু ধৈর্য ধরে শুনুন, আমি বুঝিয়ে বলছি। সবুজ রংটা রিফ্লেক্ট করছে একটা নির্দিষ্ট ওয়েভলেংথের রেডিয়েশনে এবং আশ্চর্যজনকভাবে এই বাগানের তিন নম্বর ক্যামেরাটা ওই রেডিয়েশন রিসিভ করতে সক্ষম। বাকি তিনটা ক্যামেরা থেকে এই ৩ নম্বর ক্যামেরাটা একদমই আলাদা এবং পাওয়ারফুল।
—হ্যাঁ, আলাদা। নাসরীন আখতার সায় দিল। ‘এই বিশেষ ক্যামেরাটা আমার এক বান্ধবী গিফট করেছিল, ও শিকাগোতে থাকে; শিকাগো ভার্সিটিতে পিএইচডি করছে...এআয়ের ওপর।’
—আমি তাহলে ঠিকই ধরেছি। তারপর যেটা হলো, আমি সংকেতগুলো...।
—তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন...গাছেরা কিছু সংকেত পাঠিয়েছে ওই ক্যামেরায়? ওসি একরামুল্লাহর চোখে সন্দেহ ফুটে উঠেছে।
—সহজ করে বললে অনেকটা তা–ই।
—তারপর আপনি কী করলেন? নাসরীনের চোখে-মুখে তীব্র কৌতূহল।
—তারপর আমি ওই সংকেতগুলো এআইয়ের সহযোগিতা নিয়ে উদ্ধার করলাম। ...ওখানে স্পষ্ট কিছু এলোমেলো ছবিতে উঠে এসেছে ওনাকে কিডন্যাপ করার দৃশ্যটা, যদিও একটু লো-পলি ফর্মে, কিন্তু বেশ বোঝা যাচ্ছে।
—বলেন কী!
হ্যাঁ, আলাদা। নাসরীন আখতার সায় দিল। ‘এই বিশেষ ক্যামেরাটা আমার এক বান্ধবী গিফট করেছিল, ও শিকাগোতে থাকে; শিকাগো ভার্সিটিতে পিএইচডি করছে...এআয়ের ওপর।’
—মজার ব্যাপার হচ্ছে, গাছ যে শুধু তার দেখার প্রেজেন্ট স্মৃতিটুকু ধরে রাখে, তা–ই নয়, তারা সেটা রীতিমতো বিশ্লেষণ করে। জানেন তো, প্রতিটা গাছ কিন্তু তাদের শিকড়ে শিকড়ে একজনের সঙ্গে আরেকজন যুক্ত থেকে অনেক ইনফরমেশন প্রতিমুহূর্তে নিজেরা আদান–প্রদান করে। এই বিশ্লেষণ থেকেই আমি ওনার ওই বাড়িটার খোঁজ পেয়েছি, যেখানে কিডন্যাপাররা নাসরীনকে আটকে রেখেছিল।
—অসম্ভব! অসম্ভব! উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ে নাসরীন আখতার। আমি ওই ছবিগুলো দেখতে চাই।
—ছবিগুলোর প্রিন্টেড কপি ওসি সাহেবকে দিয়েছি।
—কিন্তু আমি চার্জশিটে কী লিখব? এসব কেউ বিশ্বাস করবে? হতাশ ভঙ্গিতে মাথা দোলায় ওসি একরামুল্লাহ।
এরপর এক বছর কেটে গেছে। এ বছর এই প্রথম বোটানিতে নোবেল দেওয়া হয়েছে। পেয়েছেন জাপানের হিরোশিমা ইউনিভার্সিটির বোটানির প্রফেসর ড. কেনজি ওয়া। তাঁর আবিষ্কারের বিষয়—বাংলায় সহজ করে বললে বলা যায় এভাবে—‘গাছের কোনো মস্তিষ্ক না থাকার পরও তাদের দেখার স্মৃতি তারা কোথায় মেমোরি হিসেবে জমা রাখে...কীভাবে রাখে।’
দিনটা সোমবার। বাসায় কেউ নেই, কাইজার পাশা পত্রিকায় কেনজি ওয়ার ছবিটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, লোকটা সত্যি কী একটা অসাধারণ আবিষ্কার করেছে! ব্রেন ছাড়াও তাহলে স্মৃতি স্টোর করা যায় এবং সে কাজটা গাছেরাই করতে পারে। ঠিক তখনই দরজায় টুক টুক করে শব্দ হলো।
—দরজা খোলা আছে। চিৎকার করল কাইজার। নাসরীন আখতারকে দেখে ভেতরে–ভেতরে চমকাল সে।
—আপনি হঠাৎ?
—ও, আপনি আমার অফিসে যান না দেখে আমিও আসতে পারব না?
—না না, অবশ্যই বসুন।
—আজকের পেপার দেখেছেন?
এরপর এক বছর কেটে গেছে। এ বছর এই প্রথম বোটানিতে নোবেল দেওয়া হয়েছে। পেয়েছেন জাপানের হিরোশিমা ইউনিভার্সিটির বোটানির প্রফেসর ড. কেনজি ওয়া।
—হ্যাঁ এই যে, প্রফেসর কেনজি ওয়া নোবেল পেয়েছেন। এই প্রথম বোটানিতে কেউ নোবেল পেল। আচ্ছা, আপনার কেসটার প্রায় এক বছর হতে চলল...ওই ওসি একরামুল্লাহ কিন্তু এখনো আমাকে জানায়নি ঠিক কী কারণে আপনাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল, ক্রিমিনালরা সব ধরা পড়েছে তো?
—আমি কিন্তু এসব নিয়ে কথা বলতে আসিনি। এই যে আমার বিয়ের কার্ড।
—ওয়াও...কনগ্র্যাচুলেশন! দারুণ ডিজাইন। কে করেছে ডিজাইনটা?
—আমি নিজেই।
—ওহ্, আর্কিটেক্টরা তো সব সময়ই ভালো ডিজাইনার। কিন্তু...কিন্তু পাত্রপাত্রীর নাম কোথায়?
—ওটা নতুন একটা টাইপোগ্রাফিতে বসাব বলে খালি রেখেছি...তা ছাড়া...নাসরীন মৃদু হেসে থেমে যায়।
—তা ছাড়া?
—তা ছাড়া পাত্রের নামটা বসানোর আগে তার অনুমতির প্রয়োজন আছে নিশ্চয়ই, কী বলেন?
—মানে?
—মানে, আপনি গাছের চোখের ভাষা বুঝে ফেলেন, আর আমার চোখের ভাষা বোঝেন না?
কাইজার মেরুদণ্ড সোজা করে বসে; স্পষ্টভাবে তাকায় নাসরীনের দিকে। নাসরীন তখনো স্থির চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ওর মুখে তখনো রহস্যময় মৃদু হাসিটা লেগেই আছে। পাশের জানালায় মানিপ্ল্যান্টের গাছের একটা ছোট্ট ডাল ছড়িয়ে আছে ওদের দিকে, ফ্যানের বাতাসে অল্প অল্প দুলছে। মানিপ্ল্যান্টের পাতাগুলো নিশ্চয়ই লাল আর নীল আলো গ্রহণ করে সবুজ রংটা নির্দিষ্ট ওয়েভ লেংথে রেডিয়েশন হিসেবে ছুড়ে দিচ্ছে ওদের দিকে...গাছেরা তো এভাবেই দেখে মানুষদের, কাইজার আর নাসরীনকেও নিশ্চয়ই দেখছে!
