গণিতবিদদের চোখে গণিতের সবচেয়ে কঠিন ৫০টি সমস্যা
কিছু গাণিতিক সমস্যার উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর চেষ্টা করেন। মাঝেমধ্যে শতাব্দীও পেরিয়ে যায়। এবার এমন ৫০টি কঠিন সমস্যা বেছে নিয়েছেন গণিতবিদেরা, যেগুলোর সমাধান কম্পিউটার দিয়ে যাচাই করা সম্ভব। এর মধ্যে কয়েকটি সমস্যার সমাধান হয়েছে, বাকিগুলোর উত্তর এখনো খোঁজা হচ্ছে…
জুন মাসের এক সকাল। বিশ্বের বিখ্যাত সব গণিতবিদেরা এক হয়েছেন লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেসের এক কক্ষে। চারদিকে স্ন্যাকস, ধোঁয়া উড়ছে কফির মগে। সেসব ঘিরে বসে আছেন একদল গণিত-পাগল মানুষ। তাঁদের মাঝখানে বসে আপন মনে কেক খাচ্ছে একটা ছোট্ট ছেলে। ছেলেটির বাবা ইয়াং-হুই হে একজন বিখ্যাত গণিতবিদ। তিনিও আছেন এই সভায়। ছেলের স্কুল ছুটি, তাই সঙ্গে নিয়ে এসেছে তাকেও।
ছেলে কেক খেতে খেতে বাবার কাজ দেখছিল। আর ইয়াং-হুই অন্য গণিতবিদদের সঙ্গে মিলে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জমা দিলেন তিনটি গাণিতিক সমস্যা। সেগুলো গণিতের বেশ কয়েকটি শাখার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে আছে বীজগণিত, টপোলজি ও সংখ্যাতত্ত্ব।
এই সম্মেলন শুধু লন্ডনেই হচ্ছিল না। টরন্টো, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক, বার্কলি ও কেমব্রিজের মতো আরও পাঁচটি শহরে বসেছিল এমন আসর। উদ্দেশ্য একটাই, গণিতের সবচেয়ে কঠিন, রোমাঞ্চকর ও গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি সমস্যার একটি নতুন তালিকা তৈরি করা। তবে শর্ত হলো, এই সমস্যাগুলোর সমাধান এমন হতে হবে, যেন কম্পিউটার বা এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা যাচাই করতে পারে।
কিন্তু কেন এই আয়োজন? আসলে গণিতে এমন কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো দেখতে খুব সহজ। স্কুলের শিক্ষার্থীরাও হয়তো প্রশ্নগুলো বুঝতে পারবে। কিন্তু উত্তর বের করতে গিয়ে হিমশিম খেতে পারেন পৃথিবীর সেরা গণিতবিদেরাও। কেউ কেউ দশকের পর দশক ধরে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। কোনো কোনো সমস্যার বয়স তো কয়েক শ বছর!
ইয়াং-হুই অন্য গণিতবিদদের সঙ্গে মিলে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জমা দিলেন তিনটি গাণিতিক সমস্যা। সেগুলো গণিতের বেশ কয়েকটি শাখার সঙ্গে সম্পর্কিত।
গণিতবিদদের কাছে এ ধরনের সমস্যার আলাদা কদর আছে। তাঁরা এমন প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে ভালোবাসেন, যেগুলোর উত্তর এখনো কেউ দিতে পারেননি। একটি সমস্যার সমাধান করতে পারলে গণিতের নতুন কোনো দিক খুলে যেতে পারে। এমন সাফল্যের জন্য গণিতবিদেরা বড় বড় পুরস্কারও পান। গণিতবিদদের কাছে এমন অমীমাংসিত ধাঁধার সমাধান করা অনেকটা অলিম্পিকে মেডেল জেতার মতো। ইয়াং-হুই হে বলছিলেন, ‘গণিতে অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান খোঁজার একটি বড় সংস্কৃতি আছে। অনেক গণিতবিদ এমন সমস্যার সমাধান করেই ফিল্ডস মেডেলের মতো পুরস্কার পেয়েছেন।’
এই আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছিল ইপক এআই নামে একটি প্রতিষ্ঠান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন ব্যবস্থা কতটা এগোচ্ছে, তা পরিমাপ করার কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। এমন আয়োজনের পেছনে এআইয়ের অগ্রগতিও একটি বড় কারণ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এআই মডেল এখন গণিতের কঠিন কিছু সমস্যার সমাধান করতে পারছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমের নেভিয়ার-স্টোকস সমস্যা সমাধানের দাবিও করেছিল ওপেনএআই। তবে এ ধরনের দাবি আর গাণিতিকভাবে যাচাই করা প্রমাণ এক বিষয় নয়।
গণিতবিদেরা জুন মাসের শুরুর দিকে যে ৫০টি সমস্যা বাঁচাই করেছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তার কিছু সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যাও রয়েছে। তবে তালিকার বেশির ভাগ সমস্যাই তখনো অমীমাংসিত ছিল। ওপেনএআই সম্প্রতি আরও জানিয়েছে, তাদের এমন একটি এআই মডেল ১০০টির বেশি অমীমাংসিত প্রশ্নের সমাধান করেছে। যদিও সেই মডেল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বার্নহামের ধারণা, সেই সমাধানগুলোর মধ্যে নতুন তালিকার কয়েকটি সমস্যাও থাকতে পারে।
কেমন সেই সমস্যাগুলো? চলুন, কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক।
ইয়াং-হুই হে বলছিলেন, ‘গণিতে অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান খোঁজার একটি বড় সংস্কৃতি আছে। অনেক গণিতবিদ এমন সমস্যার সমাধান করেই ফিল্ডস মেডেলের মতো পুরস্কার পেয়েছেন।’
তিনটি ঘনের যোগফল
প্রথম সমস্যাটির নাম দ্য সাম অব থ্রি কিউবস। বাংলায় বললে, তিনটি ঘনসংখ্যার যোগফল। ঘনসংখ্যা কী, তা নিশ্চয়ই জানেন। কোনো সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে তিনবার গুণ করলে যে ফল পাওয়া যায়, সেটিই ওই সংখ্যার ঘন। যেমন, ২ × ২ × ২ = ৮। তাই ৮ হলো ২-এর ঘন। অর্থাৎ, ৮ = ২৩।
এবার তিনটি ঘনসংখ্যা যোগ করে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়ার চেষ্টা করুন। যেমন, ১, ৮ ও ২৭ যোগ করলে হয় ৩৬। কিন্তু গণিতবিদদের আগ্রহ শুধু সহজ কয়েকটি সংখ্যায় নয়। তাঁরা জানতে চান, যেকোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাকে কি তিনটি পূর্ণসংখ্যার ঘনের যোগফল হিসেবে লেখা সম্ভব?
এই প্রশ্নের একটি উদাহরণ দেখুন: x3 + y3 + z3 =114।
এখানে x, y ও z হলো পূর্ণসংখ্যা। অর্থাৎ, এদের মান ধনাত্মক, ঋণাত্মক কিংবা শূন্য হতে পারে। গণিতবিদেরা এমন তিনটি পূর্ণসংখ্যা খুঁজছেন, যাদের ঘন যোগ করলে পাওয়া যাবে ১১৪।
দেখতে খুব কঠিন কিছু মনে হচ্ছে না, তাই না? কয়েকটি সংখ্যা বসিয়ে পরীক্ষা করলেই তো হয়! সমস্যা হলো, সংখ্যা তিনটি কত বড় হতে পারে, তার কোনো সহজ সীমা জানা নেই। ছোট ছোট সংখ্যা দিয়ে চেষ্টা করে উত্তর না পেলে আরও বড় সংখ্যা পরীক্ষা করতে হবে। আর এভাবে চেষ্টা করতে করতে কম্পিউটারের বিপুল সময়ও লেগে যেতে পারে।
কোনো সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে তিনবার গুণ করলে যে ফল পাওয়া যায়, সেটিই ওই সংখ্যার ঘন। যেমন, ২ × ২ × ২ = ৮। তাই ৮ হলো ২-এর ঘন। অর্থাৎ, ৮ = ২৩।
গণিতবিদ গ্রেগ বার্নহামের ধারণা, ১১৪-এর জন্য সবচেয়ে ছোট সমাধানগুলোর সংখ্যাগুলোতেও প্রায় ৩০টি করে অঙ্ক থাকতে পারে। অর্থাৎ, একটি সংখ্যার অঙ্ক গুনতে গেলেই অনেক সময় লাগবে। এত বড় সংখ্যা নিয়ে হিসাব করা হাতে-কলমে প্রায় অসম্ভব।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অ্যান্ড্রু সাদারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ড্রু বুকার একটি কাছাকাছি সমস্যার সমাধান করেছিলেন। তাঁরা দেখিয়েছিলেন, তিনটি পূর্ণসংখ্যার ঘন যোগ করে ৪২ পাওয়া যায়। এই উত্তর খুঁজতে তাঁদের কম্পিউটারে মোট ১৩ লাখ ঘণ্টা হিসাব চালাতে হয়েছিল। একটিমাত্র কম্পিউটারে নয়, স্বেচ্ছাসেবীদের বাড়ির কম্পিউটারগুলোতেও কাজটি ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল।
এবারের লক্ষ্য ১১৪। কিন্তু আগের মতো একই পদ্ধতিতে চেষ্টা করলে বার্নহামের অনুমান, খরচ ১০ কোটি ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে শুধু সম্ভাব্য সংখ্যাগুলো পরীক্ষা করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণেই সমস্যাটির সমাধান খুঁজতে আরও ভালো পদ্ধতি দরকার। তবে কেউ যদি সঠিক তিনটি সংখ্যা খুঁজে পান, তাহলে উত্তর যাচাই করা তুলনামূলক সহজ হবে। সংখ্যাগুলোকে ঘন করে যোগ করলেই দেখা যাবে, ফল ১১৪ হয় কি না। এখানে মজার বিষয় হলো, উত্তরটি যাচাই করা সহজ হতে পারে, কিন্তু উত্তরটি খুঁজে বের করাই অত্যন্ত কঠিন!
গণিতবিদ গ্রেগ বার্নহামের ধারণা, ১১৪-এর জন্য সবচেয়ে ছোট সমাধানগুলোর সংখ্যাগুলোতেও প্রায় ৩০টি করে অঙ্ক থাকতে পারে। অর্থাৎ, একটি সংখ্যার অঙ্ক গুনতে গেলেই অনেক সময় লাগবে।
অমূলদ সংখ্যার প্রমাণ
কিছু সংখ্যা আছে, যেগুলোকে দুটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ হিসেবে প্রকাশ করা যায় না। যেমন, ২ বা ২-এর বর্গমূল। আবার পাইয়ের মানও এভাবে প্রকাশ করা যায় না। এ ধরনের সংখ্যাকে বলা হয় অমূলদ সংখ্যা। বিষয়টা বুঝতে একটি উদাহরণ দেখা যাক। ১/২ বা অর্ধেককে দশমিক আকারে লিখলে পাওয়া যায় ০.৫। একে দুটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাত হিসেবেও লেখা যায়। কিন্তু পাইয়ের দশমিক মান ৩.১৪১৫৯২৬...এভাবে চলতেই থাকে। একে দুটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাত দিয়ে ঠিকঠাক প্রকাশ করা যায় না।
কোনো সংখ্যা অমূলদ কিনা, তা প্রমাণ করা কিন্তু সহজ নয়। দেখতে খুব সাধারণ একটি সংখ্যার জন্যও দীর্ঘদিন গবেষণা করতে হতে পারে। যেমন, পাই যে অমূলদ সংখ্যা, তা প্রমাণ করতে গণিতবিদদের প্রায় দুই হাজার বছর লেগেছিল।
১৯৭৮ সালে ফরাসি গণিতবিদ রজার আপেরি প্রমাণ করেন, জিটা(৩) অমূলদ সংখ্যা। এই সংখ্যা রিম্যান জিটা ফাংশনের সঙ্গে সম্পর্কিত। জার্মান গণিতবিদ বার্নহার্ড রিম্যানের নামানুসারে এই সংখ্যার নাম রাখা হয়েছে রিম্যান জিটা ফাংশন। মৌলিক সংখ্যার বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক বিষয় বুঝতে এই ফাংশন কাজে লাগে।
দেখতে খুব সাধারণ একটি সংখ্যার জন্যও দীর্ঘদিন গবেষণা করতে হতে পারে। যেমন, পাই যে অমূলদ সংখ্যা, তা প্রমাণ করতে গণিতবিদদের প্রায় দুই হাজার বছর লেগেছিল।
জিটা ফাংশনের মান বের করার একটি উপায় হলো নিচের অসীম ধারাটির যোগফল বের করা: 1⁄n3: 13 + 1⁄23 + 1⁄33 + 1⁄43+ ...
অর্থাৎ, প্রথমে ১, তারপর ৮-এর এক ভাগ, এরপর ২৭-এর এক ভাগ, তারপর ৬৪-এর এক ভাগ, এভাবে চলতে থাকবে। পদগুলো যোগ করতে থাকলে যোগফল একটি নির্দিষ্ট মানের দিকে এগোয়। সেই মানটিই হলো জিটা(৩)। এবার প্রশ্ন হলো, এই যোগফলটি কি দুটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ হিসেবে প্রকাশ করা যায়? আপেরি প্রমাণ করেছিলেন, যায় না। অর্থাৎ, জিটা(৩) একটি অমূলদ সংখ্যা।
এই সমস্যার পেছনে আরও একটি ইতিহাস আছে। গণিতবিদেরা আগে থেকেই জানতেন, রিম্যান জিটা ফাংশনের জোড় সংখ্যায় মান বসালে পাওয়া ফলের সঙ্গে পাইয়ের ঘন, পঞ্চম ঘাত কিংবা আরও উচ্চ ঘাতের সম্পর্ক রয়েছে। অয়লার দেখিয়েছিলেন, জিটা ফাংশনের ধনাত্মক জোড় পূর্ণসংখ্যায় মান বসালে পাওয়া মানগুলোকে পাইয়ের ঘাতের সাহায্যে প্রকাশ করা যায়। ফলে ওই মানগুলোকে অমূলদ সংখ্যা হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়।
প্রথমে ১, তারপর ৮-এর এক ভাগ, এরপর ২৭-এর এক ভাগ, তারপর ৬৪-এর এক ভাগ, এভাবে চলতে থাকবে। পদগুলো যোগ করতে থাকলে যোগফল একটি নির্দিষ্ট মানের দিকে এগোয়।
তাই গণিতবিদেরা ধারণা করেছিলেন, বিজোড় সংখ্যায় মান বসালেও হয়তো একই ধরনের ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু জিটা ফাংশনের বিজোড় মানগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সহজ নয়। আপেরি যখন জিটা ফাংশনের অমূলদতা প্রমাণ করলেন, তখন গণিতবিদেরা অবাক হয়ে গেলেন। তিনি এমন দুটি অসীম ধারা খুঁজে পেয়েছিলেন, যেগুলোর সাহায্যে সংখ্যাটির মানকে এমনভাবে সীমাবদ্ধ করা যায় যে এর অমূলদতা প্রমাণিত হয়। কিন্তু তিনি কীভাবে ওই দুটি ধারা খুঁজে পেয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। আপেরি নাকি মজা করে বলেছিলেন, ফুলের টবের মধ্যে সেগুলো খুঁজে পেয়েছেন! তাঁর কথার আড়ালে আসল পদ্ধতিটি কী ছিল, তা আজও রহস্য হয়ে আছে।
এখন গণিতবিদেরা জানতে চান, আপেরির মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্য বিজোড় মানগুলোর অমূলদতাও কি প্রমাণ করা সম্ভব? বিশেষ করে, জিটা(৫)-এর অমূলদতা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।
এখন গুজব শোনা যাচ্ছে, আপেরির জিটা(৫)-এর একটি সমাধান নাকি বের হয়ে গেছে। কেউ যদি আপেরির সেই অদ্ভুত যুক্তির ধরণটা ধরতে পারে, তবে হয়তো জিটা ফাংশনের সব বেজোড় মানকেই অমূলদ প্রমাণ করা যাবে। তবে এই লেখায় সেই প্রমাণের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত সমাধান হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
এই সমস্যার গুরুত্ব বোঝার জন্য একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। কোনো সংখ্যার মান দশমিক আকারে হিসাব করে অনেক ঘর পর্যন্ত লেখা সম্ভব। কিন্তু তাতে প্রমাণ হয় না যে সংখ্যাটি অমূলদ। প্রমাণ করতে হয়, যত দূরই হিসাব করা হোক না কেন, সংখ্যাটিকে দুটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাত হিসেবে ঠিকঠাক লেখা সম্ভব নয়।
আপেরি এমন দুটি অসীম ধারা খুঁজে পেয়েছিলেন, যেগুলোর সাহায্যে সংখ্যাটির মানকে এমনভাবে সীমাবদ্ধ করা যায় যে এর অমূলদতা প্রমাণিত হয়।
একা দৌড়ানোর সমস্যা
ধরুন, একটি বৃত্তাকার মাঠে কয়েকজন দৌড়বিদ দৌড়াচ্ছেন। সবার গতি আলাদা। কেউ দ্রুত দৌড়ান, কেউ ধীরে। তবে প্রত্যেকের গতি একই থাকে। অর্থাৎ, কেউ হঠাৎ গতি বাড়াচ্ছেন না, আবার কেউ থেমেও যাচ্ছেন না। এবার প্রশ্ন হলো, দৌড়াতে দৌড়াতে কি এমন একটি মুহূর্ত আসবে, যখন কোনো একজন দৌড়বিদ বাকি সবার থেকে যথেষ্ট দূরে থাকবেন?
এই প্রশ্ন থেকেই এসেছে ‘লোনলি রানার কনজেকচার’। বাংলায় একে আমরা বলতে পারি ‘একাকী দৌড়বিদের অনুমান’। নামটা মজার, তাই না? মনে হতে পারে, বৃত্তাকার মাঠে সবার সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে একজন একা হয়ে গেলেন, তাতে সমস্যা কী। কিন্তু এখানে একাকিত্ব বলতে মনের অবস্থা বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে মাঠে অন্য দৌড়বিদদের তুলনায় তাঁর অবস্থান।
বিষয়টি বুঝতে একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, একটি বৃত্তাকার মাঠে তিনজন দৌড়বিদ দৌড়াচ্ছেন। একজন প্রতি মিনিটে এক চক্কর দেন, আরেকজন দুই চক্কর, অন্যজন তিন চক্কর। তাঁরা একই জায়গা থেকে দৌড় শুরু করেছেন। কিছু সময় পর তাঁদের মধ্যে দূরত্ব বদলাতে থাকবে। কখনো তাঁরা কাছাকাছি আসবেন, আবার কখনো দূরে সরে যাবেন।
ধরুন, একটি বৃত্তাকার মাঠে তিনজন দৌড়বিদ দৌড়াচ্ছেন। একজন প্রতি মিনিটে এক চক্কর দেন, আরেকজন দুই চক্কর, অন্যজন তিন চক্কর। তাঁরা একই জায়গা থেকে দৌড় শুরু করেছেন।
গণিতবিদেরা জানতে চান, দৌড়বিদদের গতি আলাদা হলে এমন কোনো সময় কি অবশ্যই আসবে, যখন তাঁদের একজন অন্যদের থেকে যথেষ্ট দূরে থাকবেন? সমস্যাটির আসল বক্তব্য আরও নির্দিষ্ট। বৃত্তাকার মাঠে প্রত্যেক দৌড়বিদের ক্ষেত্রে এমন একটি মুহূর্ত থাকা উচিত, যখন তিনি অন্যদের থেকে অন্তত একটি নির্দিষ্ট অনুপাতের দূরত্বে থাকবেন। কতজন দৌড়বিদ আছেন, তার ওপর এই দূরত্বের শর্ত নির্ভর করে। এই অনুমানটি ১৯৬৭ সাল থেকে গণিতবিদদের ভাবাচ্ছে। এত বছরেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এখানেও একটি মজার ব্যাপার আছে। দৌড়বিদদের গতি জানলে কম্পিউটারে তাঁদের অবস্থান হিসাব করা যায়। কিন্তু কয়েকটি উদাহরণে অনুমানটি সত্যি প্রমাণিত হলেই যে সব সম্ভাব্য অবস্থায় এটি সত্যি হবে, তা নয়। গণিতে কোনো নিয়ম সব ক্ষেত্রেই সত্যি কি না, তা প্রমাণ করতে হয়। আবার অনুমানটি ভুল প্রমাণ করতেও একটি নির্দিষ্ট উদাহরণই যথেষ্ট। এমন কিছু দৌড়বিদের সংখ্যা ও গতির সমন্বয় খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে অনুমানটির শর্ত পূরণ হবে না। এখন পর্যন্ত এমন পাল্টা উদাহরণও পাওয়া যায়নি।
বৃত্তাকার মাঠে প্রত্যেক দৌড়বিদের ক্ষেত্রে এমন একটি মুহূর্ত থাকা উচিত, যখন তিনি অন্যদের থেকে অন্তত একটি নির্দিষ্ট অনুপাতের দূরত্বে থাকবেন।
জোন্সের গিঁটের অনুমান
পকেটে ইয়ারফোন রাখলে কেমন জট পাকিয়ে যায়, তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন। এখন প্রশ্ন হলো, ইয়ারফোন কি সত্যিই জট পাকিয়েছে, নাকি দেখতে জটিল হলেও আসলে ওটা একটি সাধারণ গোলাকার লুপ?
বাস্তবে ইয়ারফোন হাতে নিয়ে গিঁট খুলে দেখা যায়। কিন্তু গণিতবিদেরা এমন পদ্ধতি চান, যার সাহায্যে গিঁট না খুলেই গাণিতিকভাবে বোঝা যাবে সেটি আসলেই গিঁট কি না। এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো বহুপদী। বহুপদী মানে এমন একটি গাণিতিক রাশি, যেখানে বিভিন্ন ঘাতের চলক ও সংখ্যা যোগ-বিয়োগ করা হয়। যেমন, x2+2x+1 একটি বহুপদী।
১৯৮৪ সালে গণিতবিদ ভন জোন্স গিঁটের সঙ্গে এমন বহুপদী যুক্ত করার একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ফলে গিঁটের গণিতের সঙ্গে বীজগণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়। এই আবিষ্কারের জন্য পরে তিনি ফিল্ডস মেডেলও পান। কিন্তু পদ্ধতিটি কীভাবে কাজ করে?
প্রতিটি গিঁটের সঙ্গে একটি বিশেষ বহুপদী যুক্ত করা যায়। দুটি গিঁটের বহুপদী আলাদা হলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, গিঁট দুটি এক নয়। অর্থাৎ, বহুপদীটি গিঁট চেনার একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সমস্যা হলো, দুটি আলাদা গিঁটের বহুপদী একই হতে পারে। ফলে বহুপদী একই হলেই যে গিঁট দুটি একই, তা বলা যায় না।
১৯৮৪ সালে গণিতবিদ ভন জোন্স গিঁটের সঙ্গে এমন বহুপদী যুক্ত করার একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ফলে গিঁটের গণিতের সঙ্গে বীজগণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়।
এবার সবচেয়ে সহজ গিঁটটির কথা ভাবুন। এটি আসলে কোনো গিঁটই নয়। একটি সাধারণ বৃত্তের মতো লুপ। গণিতবিদেরা একে বলেন আননট (unknot)। অর্থাৎ গিঁটহীন লুপ। এর জোন্স বহুপদীর মান ১।
এখন প্রশ্ন হলো, এমন কোনো সত্যিকারের জটিল গিঁট কি থাকতে পারে, যার জোন্স বহুপদীও ১? অর্থাৎ, দেখতে গিঁটের মতো হলেও এই পদ্ধতিতে তাকে সাধারণ বৃত্ত থেকে আলাদা করা যাবে না? গণিতবিদেরা সন্দেহ করেন, এমন গিঁট থাকতে পারে। কিন্তু এখনো তার প্রমাণ বা নির্দিষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়নি।
কেন একটি উদাহরণই গুরুত্বপূর্ণ? ধরুন, আপনি বললেন, একটি বিশেষ যন্ত্র দিয়ে সব তালা খোলা যায়। কেউ যদি এমন একটি তালা দেখাতে পারেন, যেটি ওই যন্ত্র দিয়ে খোলা যায় না, তাহলেই আপনার দাবিটি ভুল প্রমাণিত হবে। একইভাবে, সত্যিকারের একটি গিঁটের জোন্স বহুপদী ১ পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, শুধু এই বহুপদী দিয়ে সব ক্ষেত্রে গিঁট শনাক্ত করা যায় না। এখানেও তাই। গণিতবিদেরা এমন একটি উদাহরণ খুঁজছেন, যা তাঁদের ধারণাকে নিশ্চিত করবে অথবা প্রচলিত ধারণা বদলে দেবে।
ধরুন, আপনি বললেন, একটি বিশেষ যন্ত্র দিয়ে সব তালা খোলা যায়। কেউ যদি এমন একটি তালা দেখাতে পারেন, যেটি ওই যন্ত্র দিয়ে খোলা যায় না, তাহলেই আপনার দাবিটি ভুল প্রমাণিত হবে।
ভোটে সবাই কি ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব পেতে পারেন
এবার গণিতের এমন একটি সমস্যায় আসা যাক, যার সঙ্গে আপনার পরিচিত কোনো ঘটনা মিলিয়ে নেওয়া সহজ। ধরুন, একটি শহরে এক হাজার মানুষ থাকেন। তাঁরা ভোট দিয়ে ১০ সদস্যের একটি পরিষদ গঠন করবেন। প্রত্যেকে নিজের পছন্দের যতজন প্রার্থীকে ইচ্ছা ভোট দিতে পারবেন।
প্রশ্ন হলো, পরিষদটি কীভাবে গঠন করলে সবার মতামতের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব হবে? একটি সহজ ধারণা হলো, কোনো বড় গোষ্ঠীর মানুষ যেন পরিষদে তাদের সংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব পান। যেমন, শহরের ৩০০ মানুষ যদি একই ধরনের মতামত ধারণ করেন, তাহলে পরিষদে তাঁদের প্রায় তিনটি আসনের সমান প্রভাব থাকা উচিত।
কিন্তু বাস্তবে একজন ভোটার কতটা প্রতিনিধিত্ব পেলেন, তা কীভাবে বুঝবেন? ধরুন, আপনি ১০ জন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনে তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন জয়ী হলেন। তাহলে আপনার পছন্দের একজন প্রতিনিধি পরিষদে জায়গা পেলেন।
এবার ধরুন, শহরের ৩০০ মানুষ মিলে নিজেদের পছন্দের তিনজন প্রার্থীর একটি আলাদা দল তৈরি করলেন। এই তিনজনের সবাইকে নির্বাচিত করা হলে তাঁদের গোষ্ঠীর প্রত্যেকে হয়তো নিজের পছন্দের দুজন প্রার্থীকে পরিষদে পাবেন। কিন্তু মূল পরিষদে তাঁদের পছন্দের মাত্র একজন প্রতিনিধি আছেন।
শহরের ৩০০ মানুষ যদি একই ধরনের মতামত ধারণ করেন, তাহলে পরিষদে তাঁদের প্রায় তিনটি আসনের সমান প্রভাব থাকা উচিত।
ওই দলের প্রত্যেক সদস্যের ক্ষেত্রেই যদি এমন হয় যে মূল পরিষদের তুলনায় তাঁদের নিজেদের প্রার্থীদের তালিকায় বেশি পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত হতেন, তাহলে তাঁরা আপত্তি জানাতে পারেন। তাঁদের যুক্তি হবে, ‘আমাদের জন্য যে তিনটি আসন যথেষ্ট ছিল, সেগুলো দিয়ে আমরা নিজেদের আরও ভালো প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারতাম। তাহলে পুরো পরিষদে আমাদের প্রতিনিধিত্ব এত কম কেন?’
এখানে একটি বিষয় খেয়াল করুন। দলটি কিন্তু তিনটির বেশি আসন চাইছে না। তাদের হাতে যে তিনটি আসন আছে, সেগুলো দিয়েই নিজেদের সদস্যদের পছন্দকে আরও ভালোভাবে প্রতিনিধিত্ব করানো সম্ভব বলে তারা মনে করছে। এ ধরনের কোনো দল যদি আলাদা প্রার্থী তালিকা করে বর্তমান পরিষদের চেয়ে নিজেদের সদস্যদের ভালো প্রতিনিধিত্ব দিতে পারে, তাহলে পরিষদটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
গেম থিওরির ভাষায় এমন কোনো দলের আপত্তি নেই, এমন পরিষদকে বলা হয় কোর-এর মধ্যে থাকা পরিষদ। সহজ করে বললে, এমন একটি পরিষদ, যেটিকে কোনো দলই নিজেদের জন্য আরও ভালো বিকল্প দিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না।
২০১৬ সালে কম্পিউটারবিজ্ঞানীদের একটি দল প্রশ্ন তুলেছিলেন, প্রতিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রেই কি এমন অন্তত একটি পরিষদ পাওয়া সম্ভব? অর্থাৎ, এমন একটি পরিষদ কি সব সময় গঠন করা যাবে, যেটির বিরুদ্ধে কোনো দলেরই ন্যায্য আপত্তি থাকবে না? প্রশ্নটি শুনতে সহজ হলেও এর উত্তর খুঁজতে প্রায় এক দশক লেগে যায়।
দলটি কিন্তু তিনটির বেশি আসন চাইছে না। তাদের হাতে যে তিনটি আসন আছে, সেগুলো দিয়েই নিজেদের সদস্যদের পছন্দকে আরও ভালোভাবে প্রতিনিধিত্ব করানো সম্ভব বলে তারা মনে করছে।
কারণ, একটি পরিষদ ন্যায্য কি না, তা যাচাই করতে হলে সম্ভাব্য সব ভোটার এবং তাদের পছন্দের সব প্রার্থী তালিকার সঙ্গে তুলনা করতে হতে পারে। ভোটারের সংখ্যা ও প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য সমন্বয়ের সংখ্যাও দ্রুত বেড়ে যায়।
ধরুন, একটি শ্রেণিতে ৩০ জন শিক্ষার্থী আছে। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নিয়ে বিভিন্ন দল গঠন করা যায়। এবার ৩০ জনের জায়গায় ৩০০ জন হলে কত রকম দল হতে পারে, একবার ভাবুন! শুধু দল গঠনের সম্ভাবনাই এত বেশি যে প্রতিটি দল আলাদা করে পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকেরা আগে ছোট ছোট নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমস্যাটি সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। ২০২৫ সালে একটি গবেষণায় ১৫ জন প্রার্থী থাকা নির্বাচনের মতো সীমিত ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু সব নির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য একটি সাধারণ উত্তর তখনো পাওয়া যায়নি।
ধরুন, একটি শ্রেণিতে ৩০ জন শিক্ষার্থী আছে। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নিয়ে বিভিন্ন দল গঠন করা যায়। এবার ৩০ জনের জায়গায় ৩০০ জন হলে কত রকম দল হতে পারে, একবার ভাবুন!
অবশেষে ১০ সেপ্টেম্বর জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে কর্মরত তিন গবেষক arXiv.org-এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাঁরা প্রমাণ করেন, প্রতিটি নির্বাচনের জন্য এমন একটি ন্যায্য পরিষদ পাওয়া সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, পরিষদটি খুঁজে বের করার একটি কার্যকর পদ্ধতিও তাঁরা দেখান।
এই পদ্ধতির বিশেষত্ব হলো, প্রতিটি সম্ভাব্য গোষ্ঠীকে আলাদা করে পরীক্ষা করতে হয় না। গাণিতিক প্রমাণ থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়, পদ্ধতিটি যে পরিষদ তৈরি করবে, সেটি ন্যায্য। এই কাজে গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছেন। তবে শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর করেননি। তাঁদের নিজেদের গাণিতিক চিন্তা ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি তাঁরা লিন নামের একটি প্রুফ অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করে প্রমাণটি যাচাই করেছেন।
প্রুফ অ্যাসিস্ট্যান্ট হলো এমন একটি কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থা, যা গাণিতিক প্রমাণের ধাপগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে সাহায্য করে। কেউ একটি প্রমাণ লিখলেই সেটি সঠিক ধরে নেওয়া হয় না। প্রমাণের প্রতিটি ধাপ গ্রহণযোগ্য কি না, সেটিও যাচাই করা যায়। এই সমস্যার সমাধান দেখায়, গণিত শুধু সংখ্যা নিয়ে হিসাব করার বিষয় নয়। ভোটের ন্যায্যতা নিশ্চিত করার মতো সামাজিক সমস্যাতেও গণিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রুফ অ্যাসিস্ট্যান্ট হলো এমন একটি কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থা, যা গাণিতিক প্রমাণের ধাপগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে সাহায্য করে।
কঠিন সমস্যার সমাধান এত গুরুত্বপূর্ণ কেন
এই পাঁচটি সমস্যার দিকে তাকালে একটি বিষয় বোঝা যায়। গণিতের কঠিন প্রশ্ন মানেই বিশাল কোনো সমীকরণ নয়। মাঝেমধ্যে প্রশ্নটি হতে পারে তিনটি ঘনের যোগফল নিয়ে বা একটি বৃত্তাকার মাঠে দৌড়বিদদের অবস্থান নিয়ে। এসব সমস্যার কিছু সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন, কারণ সম্ভাবনার সংখ্যা অনেক বেশি। কিছু সমস্যায় আবার এমন গাণিতিক যুক্তি দরকার, যা আগে কেউ খুঁজে পাননি। কম্পিউটার দিয়ে অনেক হিসাব করা যায়, কিন্তু সব সম্ভাব্য ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম সত্যি কি না, তা প্রমাণ করতে হয়।
এআইয়ের অগ্রগতির ফলে গণিতবিদেরা এখন নতুন ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন। এআই কখনো হিসাব করতে পারে, কখনো নতুন ধারণা দিতে পারে, আবার কখনো প্রমাণের কাজে সাহায্য করতে পারে। তবে কোনো সমাধান সত্যি কি না, তা যাচাই করা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এআইয়ের অগ্রগতির ফলে গণিতবিদেরা এখন নতুন ধরনের সহায়তা পাচ্ছেন। এআই কখনো হিসাব করতে পারে, কখনো নতুন ধারণা দিতে পারে, আবার কখনো প্রমাণের কাজে সাহায্য করতে পারে।
এ কারণেই ৫০টি সমস্যার তালিকায় এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছে, যেগুলোর সমাধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব। এতে ভবিষ্যতে মানুষ কিংবা এআই কেউ কোনো সমাধান দিলে সেটি যাচাই করার সুযোগ থাকবে। হয়তো আগামী কয়েক বছরে এই তালিকার আরও কিছু সমস্যার সমাধান হবে। হয়তো কোনো সমস্যার উত্তর খুঁজতে নতুন গাণিতিক পদ্ধতি তৈরি করতে হবে। আবার কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গণিতের এমন নতুন দরজা খুলে যেতে পারে, যার কথা কেউ এখনো ভাবেননি।
গণিতের সৌন্দর্য এখানেই। কখনো একটি ছোট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষের জ্ঞানের বিশাল জগৎ বদলে যায়। আর সেই উত্তর খোঁজার কাজেই এখন মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
