ধারাবাহিক
দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ১২
মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।
৪. আরেকটি চেষ্টা
পাচাইয়াপ্পা মুদালিয়ারের জন্ম ১৭৮৪ সালে। খুব গরিব এক গ্রামীণ পরিবারে তাঁর জন্ম। ছিলেন দোভাষী। অর্থাৎ দুটি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। এই দক্ষতার জোরেই ব্রিটিশদের সঙ্গে বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। মাত্র ২১ বছর বয়সেই বিপুল সম্পদের মালিক হন। ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যুর আগে তাঁর অঢেল সম্পত্তি তিনি দান করে যান।
১৮৮৯ সালে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কলেজ। সেটি ছিল শুধু হিন্দুদের জন্য উন্মুক্ত। কলেজটি ১৯০৬ সালের মধ্যে বেশ সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। মাদ্রাজের ব্যস্ত জর্জটাউন এলাকার চায়না বাজার রোডের এই কলেজের বিশাল বিল্ডিংটি ছিল এথেন্সের থিসিউস মন্দিরের আদলে তৈরি। এ কারণেই এর খ্যাতি আরও বেড়ে যায়।
১৯০৬ সালের শুরুর দিকে পাচাইয়াপ্পা কলেজে পড়ার জন্যই মাদ্রাজের এগমোর স্টেশনে এসে নামেন রামানুজন। তিনি তখন ক্লান্ত এবং দিকভ্রান্ত। তাই ঘুমিয়ে পড়লেন স্টেশনের ওয়েটিং রুমে। পরে এক ভদ্রলোক তাঁকে ডেকে তুলে নিজের বাড়িতে নিয়ে খাওয়ান। এরপর পথ দেখিয়ে পাঠিয়ে দেন কলেজে।
ভারতে কলেজ ডিগ্রি মানে শুধু ভালো চাকরি নয়, ভালো ক্যারিয়ারের শুরুও বটে। তবে নির্দিষ্ট কোনো কোর্স শেষ করে এই ডিগ্রি পাওয়া যেত না। ডিগ্রি পেতে হলে পাশ করতে হতো মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি পরীক্ষায়। তখন বিশ্ববিদ্যালয় বলতে শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান বোঝাত না, বরং বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শুধু পরীক্ষা নেওয়ার একটি সংস্থা।
১৮৮৯ সালেপাচাইয়াপ্পা মুদালিয়ারের নামে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কলেজ। সেটি ছিল শুধু হিন্দুদের জন্য উন্মুক্ত। কলেজটি ১৯০৬ সালের মধ্যে বেশ সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
সেই সময়ের এক ইংরেজ লেখক বলেছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় বসা এবং পাস করা ছিল প্রতিটি প্রতিভাবান তরুণের স্বপ্ন।’ কুম্বকোনমের অনেক ছাত্রই ভালো প্রস্তুতির আশায় প্রেসিডেন্সি কলেজে চলে যেত। এটি ছিল দক্ষিণ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার মুকুটমণি।
কিন্তু ডিগ্রির পেছনে ছুটে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ হতো। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অর্ধেক ছাত্রই করত ফেল। এফএ বা ডিগ্রি পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে একই হারে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ত। পাচাইয়াপ্পা কলেজে এফএ পরীক্ষায় ফেলের হার ছিল ৮০ শতাংশ। ১৯০৪ সালে পুরো প্রেসিডেন্সিতে পাঁচ হাজারের কম ছেলে ছিল। মেয়ে ছিল মাত্র উনপঞ্চাশ জন। তেতাল্লিশ কোটি মানুষের মধ্যে বছরে এফএ ডিগ্রি পাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল মেরেকেটে হাজারখানেক।
১৮ বছর বয়সী তাঁদেরই একজন হতে চেয়েছিলেন রামানুজন। কুম্বকোনমে ব্যর্থ হওয়ার এক বছর পর তিনি মাদ্রাজে এসে আরেকবার চেষ্টা করতে চাইলেন।
কিছুদিন তিনি পাচাইয়াপ্পা কলেজ থেকে কয়েক ব্লক দূরে, ব্রডওয়েতে ফলের বাজারের পেছনের এক সরু গলিতে তাঁর ঠাকুমার বাড়িতে ছিলেন। জায়গাটা ছিল স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার ও গুমোট। কিন্তু তবুও একটা স্বস্তি ছিল; অন্তত তিনি আবার কলেজে ফিরতে পারছেন।
রামানুজনের নতুন গণিত শিক্ষক তাঁর নোটবুক দেখে এতই মুগ্ধ হন যে, তাঁকে সোজা প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে যান তিনি। প্রিন্সিপাল সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আংশিক স্কলারশিপ মঞ্জুর করেন। মাঝে আমাশয়ে আক্রান্ত হয়ে তিন মাস কাটাতে হয়েছিল কুম্বকোনমে। তবুও পাচাইয়াপ্পা কলেজে রামানুজনের শুরুর দিনগুলো যেন আশার আলো নিয়ে এসেছিল।
পাচাইয়াপ্পা কলেজে এফএ পরীক্ষায় ফেলের হার ছিল ৮০ শতাংশ। ১৯০৪ সালে পুরো প্রেসিডেন্সিতে পাঁচ হাজারের কম ছেলে ছিল। মেয়ে ছিল মাত্র উনপঞ্চাশ জন।
গণিত শিক্ষক এন. রামানুজাচারিয়ার বীজগণিত বা ত্রিকোণমিতির অঙ্ক করতে দুটি ব্ল্যাকবোর্ড ব্যবহার করতেন। সমাধান করতেন প্রায় ১০ থেকে ১২ ধাপে। কিন্তু রামানুজন নিজের সিট থেকে উঠে গিয়ে মাত্র তিন-চার ধাপে সেটা করে দেখাতেন।
রামানুজাচারিয়ার কানে একটু কম শুনতেন। তিনি মাঝেমধ্যে রামানুজনের অঙ্ক করা দেখে জিজ্ঞেস করতেন, ‘অ্যাঁ, এটা আবার কী?’
তখন বাধ্য হয়ে আবার বুঝিয়ে দিতেন রামানুজন। মাঝে মাঝে শিক্ষক ক্লাসের মাঝখানে থেমে তাঁর দিকে ফিরে বলতেন, ‘রামানুজন, তুমি এ ব্যাপারে কী মনে করো?’
কুম্বকোনমের এই বিস্ময়বালক তখন গাণিতিক সমস্যাগুলো নিয়ে খেলতেন। মনে মনে মূল ধাপগুলো কষে ফেলতেন, কিন্তু বোর্ডে লিখতেন না। ফলে তাঁর সহপাঠীরা পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে যেত।
মাঝেমধ্যে তিনি কলেজের সিনিয়র গণিত প্রফেসর পি. সিঙ্গারাভেলু মুদালিয়ারের সঙ্গে বসতেন। সিঙ্গারাভেলু পাচাইয়াপ্পা কলেজের জন্য বড় প্রাপ্তি ছিলেন। কারণ তিনি আগে ছিলেন বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। তিনি রামানুজনের প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন। দুজনে মিলে গণিত জার্নালের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতেন। রামানুজন যদি কোনোটা সমাধান করতে না পারতেন, তবে সেটা দিতেন সিঙ্গারাভেলুকে। কিন্তু দেখা যেত প্রফেসরও সেটা সমাধান করতে পারতেন না।
রামানুজনের প্রতিভায় সবাই মুগ্ধ হতো, কিন্তু এতে নতুন কিছু ছিল না। এই মুগ্ধতা থেকে বাস্তব কোনো ফলও আসত না। কুম্বকোনমে যা ঘটত, সেটাই ফিরে এল পাচাইয়াপ্পা কলেজে। গভর্নমেন্ট কলেজে তাঁকে ডুবিয়েছিল ইংরেজি। আর এখানে তাঁকে ডোবাবে শরীরবিদ্যা। এই বিষয়টি তাঁর কাছে শুধু বিরক্তিকরই ছিল না, ছিল রীতিমতো বিকর্ষণীয়।
কুম্বকোনমের এই বিস্ময়বালক রামানুজন তখন গাণিতিক সমস্যাগুলো নিয়ে খেলতেন। মনে মনে মূল ধাপগুলো কষে ফেলতেন, কিন্তু বোর্ডে লিখতেন না। ফলে তাঁর সহপাঠীরা পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে যেত।
শারীরবিদ্যার পাঠ্যবই হিসেবে ছিল মাইকেল ফস্টার এবং লুইস ই শোরের ফিজিওলজি ফর বিগিনার্স। তাঁরা দুজনেই ছিলেন কেমব্রিজের শিক্ষক। বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ সালে। উনিশ শতকের শেষভাগে যেভাবে বিজ্ঞান পড়ানো হতো, এই বইয়ের বড় অংশ জুড়ে ছিল সেই সাদামাটা বর্ণনামূলক আলোচনা। যেমন বইটিতে লেখা ছিল, ‘পেটের ওপরের বাঁ দিকে খাদ্যনালির মুখ, যা গলা থেকে বুক ও ডায়াফ্রাম ভেদ করে প্রবেশ করে পাকস্থলীতে...’। বইটিতে ছিল খরগোশের চামড়া ছাড়ানো ছবি, ভেড়ার হৃৎপিণ্ডের বিশাল চিত্র এবং মানুষের মুখ ও জিহ্বার ব্যবচ্ছেদ করা ছবি।
গণিতের বিমূর্ত জগতের সঙ্গে এর কোনো মিল ছিল না। গণিত যদি হয় শীতল, মার্জিত আর্ট ডেকো, তবে ফিজিওলজি ছিল তরল, চর্বিযুক্ত আর্ট নুভো। কট্টর নিরামিষভোজী রামানুজনের জন্য এই জগৎটা ছিল অসহ্য। বইয়ের তৃতীয় অধ্যায় শুরুই হয়েছিল এভাবে: ‘একটি সদ্য মৃত খরগোশ সংগ্রহ করো, যেটির চামড়া ছাড়ানো হয়নি। ওটার চার হাত-পা বোর্ডের সঙ্গে বেঁধে ছোট ধারালো ছুরি ও কাঁচি দিয়ে...’
রামানুজন এই সবকিছুর প্রতিক্রিয়া দেখাতেন অদ্ভুত বিদ্রূপের ভঙ্গিতে। এমন স্বভাব তাঁর সঙ্গে মানানসই ছিল না। একবার প্রফেসর ক্লাসে একটি বিশাল ব্যাঙ অজ্ঞান করে ব্যবচ্ছেদ করছিলেন এবং মানুষের সঙ্গে তার মিল দেখাচ্ছিলেন। হঠাৎ রামানুজন বলে উঠলেন, ‘এই ব্যাঙের মধ্যে সাপটা কোথায়?’ কথাটা শুনে সবাই চমকে ওঠে। সম্ভবত তিনি হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী মানুষের শরীরের ভেতরের ‘নাড়ে’ বা কুণ্ডলিনীশক্তির কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন।
গণিত যদি হয় শীতল, মার্জিত আর্ট ডেকো, তবে ফিজিওলজি ছিল তরল, চর্বিযুক্ত আর্ট নুভো। কট্টর নিরামিষভোজী রামানুজনের জন্য এই জগৎটা ছিল অসহ্য।
আরেকবার পাচনতন্ত্রের ওপর পরীক্ষায় তিনি উত্তরপত্রে মাত্র কয়েক লাইন লিখে খাতা জমা দিয়ে দেন। সেবার খাতায় নিজের নামও লেখেননি। খাতায় যে কয়েকটা লাইন লিখেছিলেন, তারমধ্যে ছিল, ‘স্যার, এটি পাচন অধ্যায় সম্পর্কে আমার হজম না হওয়া উত্তর।’ প্রফেসরের বুঝতে বাকি থাকেনি, খাতাটা কার!
বলাবাহুল্য, রামানুজন ফিজিওলজিতে ফেল করলেন। গণিত ছাড়া সব বিষয়েই তিনি খারাপ করতেন। কিন্তু ফিজিওলজিতে তিনি রীতিমতো রেকর্ড গড়লেন। এই বিষয়ে তিনি পেলেন ১০ শতাংশের কম নম্বর। অন্যদিকে তিন ঘণ্টার গণিত পরীক্ষা তিনি ৩০ মিনিটে শেষ করে বসে থাকতেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হতো না।
১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি আবার এফএ পরীক্ষা দিলেন এবং ফেল করলেন। পরের বছর আবার দিলেন। আবারও ফেল করলেন।
গভর্নমেন্ট কলেজ, কুম্বকোনম, ১৯০৪ এবং ১৯০৫...পাচাইয়াপ্পা কলেজ, মাদ্রাজ, ১৯০৬ এবং ১৯০৭... বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে দক্ষিণ ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রীনিবাস রামানুজনের জন্য কোনো জায়গা ছিল না। তিনি প্রতিভাবান ছিলেন, তা সবাই জানত। কিন্তু তাঁকে স্কুলে টিকিয়ে রাখতে বা একটা ডিগ্রি পাইয়ে দিতে সেটুকু যথেষ্ট ছিল না।
সাধারণ ব্যবস্থা নিজ জায়গা থেকে একচুলও নড়ল না।
১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে রামানুজন আবার এফএ পরীক্ষা দিলেন এবং ফেল করলেন। পরের বছর আবার দিলেন। আবারও ফেল করলেন।
সে সময় উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভারতীয় তরুণদের ডিগ্রির প্রতি এই পাগলামি নিয়ে ইংরেজ লেখক হার্বার্ট কম্পটন লিখেছিলেন, ‘সবাই তো আর ভালো চাকরি পায় না। ফলে তৈরি হয় একদল ক্ষুধার্ত প্রার্থী। তারা ভাগ্যের আশায় অলস জীবন কাটায়। কেউ কেউ শিক্ষার উদ্দেশ্যের চলে যায় সম্পূর্ণ বিপরীত পথে।’
১৯০৮ সালে মনে হচ্ছিল রামানুজনও ঠিক এমন একজন প্রার্থী। স্কুল থেকে ঝরে পড়া বেকার ছেলে। তিনি কুম্বকোনমের বাড়িতেই পড়ে রইলেন।
সময়টা ছিল খুব খারাপ। পাচাইয়াপ্পা কলেজে পড়ার সময় ট্রেনে উঠতে গিয়ে একবার তাঁর টুপি উড়ে যায়। সংস্কৃত শিক্ষক তাঁকে বাজারে গিয়ে আরেকটি টুপি কিনে আনতে বললেন। এই শিক্ষক ছাত্রদের টিকি ঢেকে রাখার ব্যাপারে খুব কড়া ছিলেন। রামানুজন তাঁর কাছে গিয়ে লজ্জিত হয়ে বললেন, টুপি কেনার মতো সামান্য পয়সাও তাঁর কাছে নেই। পরে তাঁর সহপাঠীরা চাঁদা তুলে তাঁকে টুপি কিনে দেয়।
রামানুজনের বাবা মাসে কুড়ি টাকার বেশি কখনো আয় করতে পারেনি। এক টাকায় তখন পঁচিশ সের চাল পাওয়া যেত। গ্রামের কৃষকেরা দিনে চার-পাঁচ আনা আয় করত। তাই অনেকেই রামানুজনের চেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল। কিন্তু রামানুজন যে ব্রাহ্মণ সমাজে মেলামেশা করতেন, সেই তুলনায় তাঁদের অবস্থা ছিল দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি।
তাঁদের পরিবারে কিছু বোর্ডার রাখা হতো। অর্থাৎ, তাঁদের বাসায় থেকে কিছু ছাত্র পড়ত। সেখান থেকে মাসে আরও দশ টাকা আসত। মা মন্দিরে গান গেয়ে আরও কিছু উপার্জন করতেন। তবুও মাঝেমধ্যে রামানুজনকে না খেয়ে থাকতে হতো। প্রতিবেশী এক বৃদ্ধা মাঝে মাঝে তাঁকে দুপুরে ডেকে খাওয়াতেন। তাঁর এক বন্ধু এস. এম. সুব্রহ্মণিয়ামের মা তাঁকে ডেকে দোসা খাওয়াতেন।
রামানুজনের বাবা মাসে কুড়ি টাকার বেশি কখনো আয় করতে পারেনি। এক টাকায় তখন পঁচিশ সের চাল পাওয়া যেত। গ্রামের কৃষকেরা দিনে চার-পাঁচ আনা আয় করত।
১৯০৮ সালে একবার রামানুজনের মা সুব্রহ্মণিয়ামের বাড়িতে গিয়ে হাহাকার করে বললেন, ঘরে এক দানা চাল নেই। তখন সুব্রহ্মণিয়ামের মা তাঁকে খেতে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছোট ছেলে অনন্তরামনকে পাঠালেন রামানুজনকেও ডেকে আনতে। অনন্তরামন তাঁকে তার খালার বাড়িতে নিয়ে গেল। সেখানে তাঁকে পেট ভরে খাওয়ানো হলো ভাত ও মাখন।
টাকা উপার্জনের জন্য রামানুজন পারিবারিক বন্ধুদের কাছে যেতেন। কারও হিসাব মেলানোর কাজ আছে কি না বা ছেলেকে পড়ানো যাবে কিনা, সেই আশায়। মাসিক সাত টাকায় তিনি বিশ্বনাথ শাস্ত্রী নামে এক ছাত্রকে পড়াতেন। সে ছিল গভর্নমেন্ট কলেজের দর্শনের প্রফেসরের ছেলে। প্রতিদিন সকালে শহরের অন্য প্রান্তে সোলাইয়াপ্পা মুদালি স্ট্রিটে গিয়ে তিনি তাকে বীজগণিত, জ্যামিতি আর ত্রিকোণমিতি পড়াতেন।
সমস্যা হলো, তিনি সিলেবাসের মধ্যে থাকতে পারতেন না। আজ একটা অঙ্ক এক নিয়মে করালেন, কাল ছাত্র সেটা ভুলে গেলে সম্পূর্ণ নতুন আরেক নিয়মে করাতেন। শিগগিরই তিনি গণিতের এমন সব গভীর আলোচনায় ঢুকে পড়তেন, যা ছাত্রের স্কুলশিক্ষক কোনো দিন স্পর্শও করেননি।
মাঝেমধ্যে তিনি চলে যেতেন দার্শনিক তর্কে। হয়তো ত্রিকোণমিতির অঙ্ক করতে গিয়ে দেয়ালের উচ্চতা নিয়ে কথা হচ্ছে; রামানুজন বলতেন, ‘উচ্চতা তো আপেক্ষিক বিষয়। একটা পিঁপড়া বা মহিষের কাছে দেয়ালটা কত উঁচু মনে হবে?’
একবার তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘পৃথিবীতে মানুষ আসার আগে পৃথিবীটা দেখতে কেমন ছিল?’
মাঝেমধ্যে রামানুজন চলে যেতেন দার্শনিক তর্কে। তিনি বলতেন, ‘উচ্চতা তো আপেক্ষিক বিষয়। একটা পিঁপড়া বা মহিষের কাছে দেয়ালটা কত উঁচু মনে হবে?’
তিনি ছোটখাটো ধাঁধা দিতেও পছন্দ করতেন। একবার বিশ্বনাথ ও তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, পৃথিবীর ২৫ হাজার মাইল লম্বা বিষুবরেখা বরাবর একটি বেল্ট শক্তভাবে বেঁধে, সেটাকে মাত্র দুই ফুট আলগা করলে বেল্টটা মাটি থেকে কত ওপরে থাকবে? এক ইঞ্চির ভগ্নাংশ মাত্র? নাকি পুরো এক ফুট!
বিশ্বনাথ শাস্ত্রী রামানুজনকে উৎসাহী ও অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষক মনে করতেন। কিন্তু অন্য ছাত্ররা তা মনে করত না। হাইস্কুলের এক সহপাঠী এন. গোবিন্দরাজা আয়েঙ্গার বিএ পরীক্ষার জন্য রামানুজনের কাছে ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস শিখতে চেয়েছিলেন। সেই টিউশনি টিকেছিল মাত্র দুই সপ্তাহ।
ক্যালকুলাসকে দুই ভাবে দেখা যায়। অঙ্কের টুল বা হাতিয়ার হিসেবে অথবা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও অসীমভাবে বড় জিনিসের প্রকৃতি নিয়ে সূক্ষ্ম প্রশ্ন হিসেবে। রামানুজন দ্বিতীয়টিই পছন্দ করতেন। কিন্তু পরীক্ষায় পাসের জন্য দরকার ছিল প্রথমটা।
গোবিন্দরাজা নিজেও বেশ মেধাবী ছিলেন। পরে তিনি ভারতের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হন। তিনি রামানুজন সম্পর্কে লেখেন, ‘তিনি শুধু ইনফিনিটি (অসীম) ও ইনফিনিটিসিমাল (অতি ক্ষুদ্র) নিয়ে কথা বলতেন। আমার মনে হলো, তাঁর এই পড়ানো পরীক্ষায় কোনো কাজে আসবে না। তাই আমি তাঁকে বাদ দিলাম।’
রামানুজন সব স্কলারশিপ হারালেন। স্কুলে ফেল করলেন। এমনকি নিজের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়টির শিক্ষক হিসেবেও ব্যর্থ প্রমাণিত হলেন।
তাঁর কিছুই রইল না।
কিন্তু একটু অন্যভাবে দেখলে, তাঁর কাছে সবকিছুই ছিল। কারণ এখন তাঁর নোটবুক থেকে মনোযোগ সরানোর মতো আর কিছুই ছিল না। সেই নোটবুক, যা প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন উপপাদ্যে ভরে উঠছিল এবং আরও বড় হচ্ছিল।
