দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি - ১৩

মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।

অধ্যায় দুই

আনন্দে ভেসে বেড়ানো

৫. নোটবুক

‘একটি সূত্রের প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি আরও অনেকগুলো সূত্র আবিষ্কার করতেন। সেই ফলাফলগুলো লিখে রাখা দরকার। তাই তিনি একটা নোটবুক তৈরির কাজ শুরু করেন।’ অনেক বছর পর রামানুজনের বন্ধু নেভিল এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন। রামানুজনের বিখ্যাত নোটবুকগুলোর জন্মবৃত্তান্ত এর চেয়ে ভালোভাবে আর বলা যায় না। ১৯০৪ থেকে ১৯০৭ সাল—কলেজে পড়ার সেই নড়বড়ে বছরগুলোতে কারের সিনোপসিস বইটি সমাধান করতে করতেই তিনি প্রথম এই নোটবুক লেখা শুরু করেন।

রামানুজনের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই একটা কাজ করেন। তিনি রামানুজনের জীবনের খুঁটিনাটি তথ্য ও সাল-তারিখ সব নিজ হাতে লিখে রাখেন। সেই লেখাগুলো এখনো অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত আছে। সেগুলো দেখলে কম্পিউটারের আগের এক পৃথিবীর কথা মনে পড়ে। তখন কাটাকুটি করা এত সহজ ছিল না। শুরুর দিকের লেখাগুলো অনেক অগোছালো ছিল। একদম কাঁচা হাতের লেখা। কিন্তু যতবার কপি করা হয়েছে, ততবার সেগুলো আরও পরিচ্ছন্ন হয়েছে, হয়েছে আরও গোছানো এবং সুন্দর।

১৯০৫ সাল, রামানুজনের বয়স তখন ১৭; জন্ম হলো ছোট ভাই তিরুনারায়াননের। সেই বিখ্যাত গণিতবিদ রামানুজন তাঁর ভাইকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, মজার সব গল্প বলতেন আর সারাক্ষণ তাকে খ্যাপাতেন

রামানুজনের নোটবুকের জন্মও সম্ভবত এভাবেই হয়েছিল।

আজ আমাদের হাতে রামানুজনের প্রকাশিত নোটবুকগুলো আছে। এর মধ্যে প্রথম নোটবুকটি সম্ভবত তৈরি করেন ১৯০৭ সালে। রামানুজন পাচাইয়াপ্পা কলেজ ছাড়েন তখনই। পরে কেউ একজন বলেছিলেন, এটি লেখা হয়েছিল অদ্ভুত সবুজ কালিতে। ২০০ পৃষ্ঠার বেশি ঠাসা ছিল জটিল সব গাণিতিক সূত্রে। হাইপারজিওমেট্রিক সিরিজ, ভগ্নাংশ, সিঙ্গুলার মডিউলির মতো সব বিষয় ছিল সেখানে…

কিন্তু প্রথম নোটবুকটি শুধু কিছু এলোমেলো নোটের সমষ্টি ছিল না। এটি পরে আরও বড় হয়ে পরিণত হয় দ্বিতীয় নোটবুকে। বিষয় অনুযায়ী ভাগ করা হয় আলাদা আলাদা অধ্যায়ে। উপপাদ্যগুলো ধারাবাহিকভাবে নম্বর দেওয়া হয়। সব দেখে মনে হয়, রামানুজন তাঁর কাজগুলো আবার গুছিয়েছেন। হয়তো চাকরির জন্য কাউকে দেখাবেন বলে সাজিয়েছিলেন সুন্দরভাবে।

পরে কেউ একজন বলেছিলেন, এটি লেখা হয়েছিল অদ্ভুত সবুজ কালিতে। ২০০ পৃষ্ঠার বেশি ঠাসা ছিল জটিল সব গাণিতিক সূত্রে। হাইপারজিওমেট্রিক সিরিজ, ভগ্নাংশের মতো সব বিষয় ছিল সেখানে…

অর্থাৎ, নোটবুকটি সম্পাদনা করা ছিল। এতে ভুল ছিল না বললেই চলে। আগেই সেগুলো শুধরে নিয়েছিলেন রামানুজন। প্রতি পৃষ্ঠায় ১৫ থেকে ২০ লাইনে সাজানো লেখা ছিল। একদম ঝকঝকে পরিষ্কার। পড়ার জন্য চোখ কুঁচকানো লাগত না। এই নোটবুকগুলো আসলে কোনো রাফ খাতা নয়, একদম মিউজিয়ামের প্রদর্শনীর মতো।

অন্তত শুরুটা তিনি এভাবেই করতে চেয়েছিলেন। প্রথম দিকে বেশ নিয়ম করে লিখতেন। অধ্যায় ভাগ করে নিতেন, লিখতেন পাতার শুধু ডান পাশে। কিন্তু শেষে মনে হয় তাঁর সেই ধৈর্য আর থাকেনি। তিনি কিছু পাতার উল্টো পিঠে রাফ করতে শুরু করলেন। সেখানে এমন সব ফলাফল লিখলেন, যা তখনো কোনো ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়নি।

গাণিতিক হিসাব-নিকাশ জমতে শুরু করল। হাতের লেখা হয়ে গেল অগোছালো। কোথাও কাটাকুটি, কোথাও আবার লেখাগুলো আড়াআড়ি না গিয়ে লম্বালম্বিভাবে পাতার ওপর-নিচে লেখা।

শ্রীনিবাস রামানুজন
ছবি: উইকিপিডিয়া

রামানুজন হয়তো প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, নোটবুকটা একদম টিপটপ রাখবেন। কিন্তু হঠাৎ হয়তো কোনো নতুন আইডিয়া মাথায় এসেছিল। হাতের কাছে কোনো কাগজ না পাওয়ায় নোটবুকের সাদা পাতাগুলোই লিখে ভরে ফেলেছেন।

এর মধ্যেই আমরা কল্পনা করতে পারি, হারিয়ে যাওয়া সেই সবচেয়ে পুরোনো নোটবুকগুলোর কথা। সেগুলো প্রকাশিত নোটবুকের আগে তৈরি হয়েছিল। রামানুজন কারের বইয়ের উপপাদ্যগুলো প্রমাণ করতে বসেছিলেন। কিন্তু খুব শীঘ্রই তিনি কার’কে ছাপিয়ে এগিয়ে যান অনেক দূর। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে নতুন সব উপপাদ্য দেখতে পান। এমন সব জায়গায় বিচরণ করলেন, যেখানে কার তো দূরের কথা, সম্ভবত আর কেউ কখনো যায়নি।

তাঁর মস্তিষ্ক থেকে প্রতিদিন নতুন নতুন উপপাদ্য বেরিয়ে আসছিল। তখন তিনি সেগুলো লিখে রাখার কথা ভাবলেন। বছরের পর বছর পার হলো। বিভিন্ন সংস্করণের মধ্য দিয়ে সেই শুরুর দিকের অগোছালো হিজিবিজি লেখাগুলোই বদলে গেল। ধীরে ধীরে পরিণত হলো আজকের এই বিখ্যাত নোটবুকে। আজ গণিতবিদদের কাছে এটা রীতিমতো একটা গবেষণাশিল্প।

রামানুজন কারের বইয়ের উপপাদ্যগুলো প্রমাণ করতে বসেছিলেন। কিন্তু খুব শীঘ্রই তিনি কার’কে ছাপিয়ে এগিয়ে যান অনেক দূর।

‘দুটি বাঁদর একটা বাগান থেকে পেয়ারার চেয়ে তিন গুণ বেশি কলা চুরি করেছে। তারা যখন সেই পেয়ারা খেতে শুরু করবে, তখন দেখল বাগানের মালিক লাঠি হাতে চুপিচুপি এগিয়ে আসছে। তারা হিসাব করে দেখল, মালিকের তাদের কাছে পৌঁছাতে সোয়া দুই মিনিট (২১/৪ মিনিট) লাগবে। প্রথম বাঁদরটা মিনিটে ১০টা পেয়ারা খেতে পারে। সে তার ভাগের পেয়ারাগুলো মোট সময়ের তিন ভাগের দুই ভাগ সময়ে (২/৩) শেষ করল। তারপর দ্বিতীয় বাঁদরকে কলা খেতে সাহায্য করল। তারা ঠিক সময়ের মধ্যেই খাওয়া শেষ করে পালিয়ে গেল। যদি প্রথম বাঁদরটি পেয়ারার চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে কলা খেতে পারে, তবে দ্বিতীয় বাঁদরটি কত দ্রুত কলা খেতে পারে?’

রামানুজনের সময়ের কয়েক বছর আগের একটি ভারতীয় গণিত বইয়ে এই চমৎকার ছোট্ট সমস্যাটি ছিল। প্রথমে একটু অদ্ভুত মনে হতে পারে, তবে বাঁদরের জায়গায় শিয়াল আর পেয়ারার জায়গায় আঙুর বসালেই বোঝা যায় ব্যাপারটা। শিক্ষকেরা গণিতের নিরস ক্লাসকে একটু প্রাণবন্ত করতে মাঝেমধ্যে এ ধরনের অঙ্ক দিতেন। বলাই বাহুল্য, সমাধান করা যতই কঠিন হোক না কেন, রামানুজনের নোটবুকের গণিতের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না।

রামানুজনকে গণিতে আগ্রহী করতে পেয়ারা চিবানো বাঁদরের দরকার ছিল না। তাঁর কাছে সমীকরণটাই ছিল মূল কথা! সমীকরণের প্যাটার্ন এবং রূপ তাঁকে আনন্দ দিত। নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যার উত্তর বের করায় তাঁর কোনো আনন্দ ছিল না, সমীকরণটাকে উল্টে-পাল্টে দেখেই যত আনন্দ! কবি যেমন শব্দ আর উপমা নিয়ে খেলেন, শিল্পী যেমন রং ও রেখা নিয়ে, দার্শনিক যেমন ধারণা নিয়ে; তেমনি রামানুজনও খেলতেন সমীকরণ নিয়ে।

রামানুজনকে গণিতে আগ্রহী করতে পেয়ারা চিবানো বাঁদরের দরকার ছিল না। তাঁর কাছে সমীকরণটাই ছিল মূল কথা! সমীকরণের প্যাটার্ন এবং রূপ তাঁকে আনন্দ দিত।

রামানুজনের জগৎটা ছিল অন্য রকম। সেখানে সংখ্যার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল। রসায়নের ছাত্ররা যেমন বিভিন্ন মৌলের ধর্ম শেখে, পর্যায় সারণিতে তাদের অবস্থান বা পারমাণবিক গঠন শেখে; তেমনি সংখ্যারও নিজস্ব ধর্ম আছে। সেই ধর্মই তাদের আলাদা আলাদা শ্রেণি বা ক্যাটাগরিতে ফেলে।

যেমন ২, ৪ ও ৬ জোড় সংখ্যা, আবার ১, ৩ ও ৫ বিজোড় সংখ্যা। ২, ৩ ও ১৭ পূর্ণসংখ্যা, ১/৪ বা ৩.৭৭৮ ভগ্নাংশ। আবার ৪, ৯, ১৬ বা ২৫ পূর্ণবর্গ সংখ্যা। তবে ৬ আর ৫-এর মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। ৬-কে আপনি অন্য দুটি সংখ্যা (২ এবং ৩) দিয়ে গুণ করে পেতে পারেন, কিন্তু ৫-কে শুধু ১ এবং ৫ দিয়েই পাওয়া যায়। গণিতবিদেরা ৫ এবং এর মতো সংখ্যাগুলোকে বলেন মৌলিক সংখ্যা। আর ৬ এবং অন্য যেসব সংখ্যা মৌলিক সংখ্যা দিয়ে তৈরি, সেগুলোকে বলেন যৌগিক সংখ্যা।

এরপর আছে অমূলদ সংখ্যা। এদের পূর্ণসংখ্যা বা পূর্ণসংখ্যার অনুপাত হিসেবে প্রকাশ করা যায় না। যেমন পাইয়ের মান ৩.১৪১...বা । আপনি দশমিকের পর যতই এগোন না কেন, এর মান সব সময়ই এই মানের কাছাকাছি থাকবে; কখনো শেষ হবে না। অন্যদিকে ৩, ১/২ বা ৯১১/১৬ হলো মূলদ সংখ্যা।

আর যেসব সংখ্যা অসম্ভব বা আজব মনে হয়, সেগুলোর কী হবে? যেমন ঋণাত্মক সংখ্যার বর্গমূল? আমরা জানি, মাইনাসকে মাইনাস দিয়ে গুণ করলে প্লাস হয়। তাহলে কোনো সংখ্যাকে সেই একই সংখ্যা দিয়ে গুণ করে কীভাবে মাইনাস পাওয়া সম্ভব? সাধারণ কোনো সংখ্যা দিয়ে এটা সম্ভব নয়।

গণিতবিদেরা ৫ এবং এর মতো সংখ্যাগুলোকে বলেন মৌলিক সংখ্যা। আর ৬ এবং অন্য যেসব সংখ্যা মৌলিক সংখ্যা দিয়ে তৈরি, সেগুলোকে বলেন যৌগিক সংখ্যা।

এদের বলা হয় কাল্পনিক সংখ্যা। এদের জন্য ব্যবহার করা হয় i চিহ্ন। যেমন  = 4  = 4i। দেখা গেছে, অন্য সংখ্যার মতোই এদের নিয়েও কাজ করা যায়। অ্যারোডাইনামিকস বা ইলেকট্রনিকসে এদের প্রচুর ব্যবহার আছে।

গণিতে এটা প্রায়ই ঘটে। শুরুতে যা তুচ্ছ, খামখেয়ালিপনা বা প্যারাডক্স মনে হয়, পরে দেখা যায় সেটাই গাণিতিকভাবে অর্থবহ এবং বাস্তবে খুব কাজের। ছোটবেলায় ১, ২, ৭-এর মতো সাধারণ সংখ্যার সঙ্গে পরিচয়ের পর হঠাৎ যখন কেউ -১ বা -১১-এর মতো ঋণাত্মক সংখ্যার কথা শোনে, তখন একটু খটকা লাগতেই পারে। কিন্তু একটু ভাবলেই এটা মেনে নেওয়া সহজ। যদি ‘t’ তাপমাত্রা কোনো কিছু বাড়ে, কিন্তু তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি কমে যায়, তবে আপনি তো আর t = ৬ লিখতে পারবেন না। তখন -৬ লেখাই তো স্বাভাবিক। একইভাবে, কাল্পনিক সংখ্যা এবং অন্যান্য অদ্ভুত গাণিতিক ধারণাও আসলে খুব যৌক্তিক।

রামানুজনের নোটবুক ছিল গণিতের এক বিশাল প্রান্তর। কিন্তু এই প্রান্তর ছিল প্রায় পুরোটাই বিশুদ্ধ গণিতের। ভবিষ্যতে এগুলো কোনো কাজে লাগবে কি না, তা নিয়ে রামানুজনের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। বাঁদর আর পেয়ারার অঙ্ক দেখে তিনি হয়তো হাসতেন। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের ধানের ফলন বাড়ানো, পানির ব্যবস্থা উন্নত করা বা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় অবদান রাখা এসব ব্যবহারিক বিষয় নিয়ে তিনি ভাবতেন না।

তিনি গণিত করতেন শুধুই গণিতের জন্য। রামানুজন ছিলেন একজন শিল্পী। আর সংখ্যা ছিল তাঁর রং ও তুলি। তাদের সম্পর্ক প্রকাশের গাণিতিক ভাষাই ছিল তাঁর ক্যানভাস।

চলবে…