ধারাবাহিক
দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ১৪
মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।
রামানুজনের নোটবুকগুলো ছিল একদম আলাদা। তাঁর নিজস্ব স্টাইলে লেখা। সেখানে প্রচলিত অনেক শব্দেরও নতুন মানে দাঁড়িয়েছিল। যেমন এক্সাম্পল সাধারণত কোনো সূত্রের প্রয়োগ দেখাতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু রামানুজনের কাছে তা ছিল প্রায়ই সম্পূর্ণ নতুন কোনো উপপাদ্য।
আবার করোলারি বা অনুসিদ্ধান্ত সাধারণত অন্য কোনো উপপাদ্য থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে আসে, আলাদা প্রমাণের দরকার হয় না। কিন্তু তাঁর কাছে এটা ছিল সাধারণীকরণ। এর নিজস্ব প্রমাণের দরকার ছিল। তাঁর গাণিতিক সাংকেতিক চিহ্নের সঙ্গে অন্য কারও নোটেশনের মিল খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর।
গণিতে x বা y ব্যবহারের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। একটা সমীকরণের সাহায্যে কোনো গভীর সত্য প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সেটা কোন অক্ষরে লেখা হলো (a, b না p, q), তা পুরোপুরি লেখকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তবুও একটা পরিণত বিষয়ে সাধারণত এক বা একাধিক নির্দিষ্ট নোটেশন সিস্টেম দাঁড়িয়ে যায়। যেমন কোনো গণিতবিদ যদি নতুন কোনো ভেরিয়েবলের জন্য গ্রিক অক্ষর পাই বেছে নেন, তবে অভ্যাসের বশে বা ইতিহাসের কারণে সেটাই স্থায়ী হয়ে যায়।
হাইস্কুলের বীজগণিতের একটা পরিচিত উদাহরণ দেওয়া যাক। দ্বিঘাত সমীকরণের দুটি মূল বের করার সূত্রটি হলো:
কোনো গণিতবিদ যদি নতুন কোনো ভেরিয়েবলের জন্য গ্রিক অক্ষর পাই বেছে নেন, তবে অভ্যাসের বশে বা ইতিহাসের কারণে সেটাই স্থায়ী হয়ে যায়।
এখানে a, b, c ধ্রুবক এবং x চলক। এই রূপটি এতই পরিচিত যে অন্য কিছু ভাবাই কঠিন। কিন্তু ধ্রুবকগুলো যে p, q, r বা m₁, m₂, m₃ হতে পারবে না, তেমন কোনো কথা নেই। আবার রুটের ভেতরের অংশটা দুটি বর্গের বিয়োগফল হিসেবে ভেঙে লেখা যেত, বা রুটকে ভগ্নাংশের পাওয়ার হিসেবে দেখানো যেত। তখন সূত্রটা দেখতে সম্পূর্ণ অচেনা লাগত। যেমন,
গাণিতিক কসরত এখানে বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, এটা দেখতে সম্পূর্ণ অচেনা হলেও আসলে ওই পরিচিত সূত্রটারই হুবহু রূপ। কিন্তু কেউ যদি প্রচলিত নিয়ম না জেনে নিজের মতো করে এই অদ্ভুত নোটেশনে সূত্রটা লেখে, তবে তাকে বোঝা কঠিন হবে। লোকে তাকে অপ্রচলিত বা অদ্ভুত বলে বাতিল করে দিতে পারে।
রামানুজনের নোটবুকগুলো তাঁর সময়ে এবং বর্তমান গণিতবিদদের কাছে ঠিক এভাবেই বিবেচিত হতো। উপবৃত্তীয় ফাংশন বা এলিপটিক ফাংশনের ক্ষেত্রে সবাই ধ্রুবক বা মডুলাসের জন্য ‘k’ ব্যবহার করত। রামানুজন সেখানে গ্রিক অক্ষর বা ব্যবহার করতেন। তাঁর নোটবুকের কোথাও কোথাও ‘n’ ছিল অবিচ্ছিন্ন চলক হিসেবে। পেশাদার গণিতবিদদের কাছে n মানে কখনোই অবিচ্ছিন্ন চলক ছিল না। আবার পাই বলতে সবাই বুঝত, প্রথম x সংখ্যক পূর্ণসংখ্যার মধ্যে কতগুলো মৌলিক সংখ্যা আছে; কিন্তু রামানুজনের খাতায় এই অর্থে এটা কখনোই ব্যবহৃত হয়নি।
রামানুজন যা করেছিলেন, তাতে কোনো ভুল ছিল না। তবে এটা অদ্ভুত ছিল। তিনি অন্য গণিতবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। লন্ডন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির প্রতি মাসের জার্নাল পড়তেন না। গণিত সমাজের সদস্যও ছিলেন না। তাই আজ যখন গবেষকেরা তাঁর কাজ উদ্ধৃত করেন, তখন তাঁদের বলতে হয়, ‘রামানুজনের নোটেশনে’ বা ‘রামানুজনের ধারণাকে স্ট্যান্ডার্ড নোটেশনে প্রকাশ করলে’ অথবা এ ধরনের কিছু।
তিনি ছিলেন এমন এক প্রজাতির মতো, যে মূল বিবর্তনরেখা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। অনেকটা অস্ট্রেলিয়ান একিডনা বা গ্যালাপাগোস কচ্ছপের মতো। তিনি নিজের এক আলাদা ও অনন্য বায়োলজিক্যাল অবস্থানে বাস করতেন।
উপবৃত্তীয় ফাংশন বা এলিপটিক ফাংশনের ক্ষেত্রে সবাই ধ্রুবক বা মডুলাসের জন্য k ব্যবহার করত। রামানুজন সেখানে গ্রিক অক্ষর বা ব্যবহার করতেন।
অন্য গণিতবিদদের কাছে যদি রামানুজনের নোটেশন অদ্ভুত লাগে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে কী মনে হবে? তাঁর নোটবুকের পাতার পর পাতা গাণিতিক চিহ্নের ব্যবহার ছিল ভিনদেশি ভাষার মতো। অথচ সেই জটিল ভাষা বা প্রতীকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ধারণাগুলো অনেক সময়ই ছিল সহজ ও সোজাসাপ্টা।
উদাহরণ হিসেবে রামানুজনের নোটবুকে ছড়িয়ে থাকা f(x) বা অন্যান্য ফাংশনাল নোটেশনের কথা ধরা যাক। এখানে f(x) মানে f গুণ x নয়, বরং x-এর কোনো একটা ফাংশন। অর্থাৎ কোনো একটা কিছু x-এর ওপর নির্ভর করছে। ফাংশনটা কী, তা না বলা পর্যন্ত আমরা জানি না কীভাবে নির্ভর করছে। পরে আমরা বলে দিতে পারি, f(x) = 3x + 1। তখন আমরা জানি, x = 1 হলে f(x) = 4 হবে, x = 2 হলে f(x) = 7 হবে।
কিন্তু গণিতবিদেরা প্রায়ই সুনির্দিষ্ট উদাহরণে যেতে চান না। ফাংশনাল নোটেশন তাঁদের বিমূর্ত জগতে কাজ করার স্বাধীনতা দেয়। সেখানে তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট উদাহরণের দাসে পরিণত হন না।
ফাংশনাল নোটেশনে φ (ফাই) মানে কোনো একটা ফাংশন যা a এবং b-এর ওপর নির্ভর করে। f(3) মানে x-এর মান 3 বসালে ফাংশনটির মান যা হয়। g(-x) মানে x-এর মান -1 বসালে যা হয়, বা x = 2 হলে 2 বসালে যা হয় তাই। এমন মোটা দাগের তুলিতেই গণিতবিদেরা তাঁদের জগৎকে রাঙান।
আবার মাঝেমধ্যে তিনি f(x)-কে নির্দিষ্ট কোনো ফাংশন হিসেবে ধরে নিতেন। তারপর তার অদ্ভুত সব বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করতেন। প্রথম নোটবুকের ৭৫ নম্বর পৃষ্ঠায় রামানুজন লিখেছিলেন:
φ(x) + φ(-x) = 1/2 φ (-x2)
এটি আগে সংজ্ঞায়িত একটি নির্দিষ্ট ফাংশনের জন্য। ধরুন, x = 1/2 এবং x = -1/2-এর জন্য ফাংশনটির মান বের করে যোগ করলেন। সেই যোগফল হবে x = -1/4-এর মানের অর্ধেকের সমান। রামানুজনের সমীকরণটি এই কথাটাই আরও সাধারণভাবে, আরও কম কথায় বলে দিচ্ছে। প্রকাশ করছে ফাংশনটির গাণিতিক বৈশিষ্ট্য।
ফাংশনাল নোটেশনে φ (ফাই) মানে কোনো একটা ফাংশন যা a এবং b-এর ওপর নির্ভর করে। f(3) মানে x-এর মান 3 বসালে ফাংশনটির মান যা হয়।
রামানুজন এবং অন্যান্য গণিতবিদেরা কেন এই আপাত অদ্ভুত ভাষা ব্যবহার করেন, এটাই তার একটা বড় কারণ। আসলে অনেক কথা বলার পরিবর্তে সংক্ষেপে লেখার জন্যই গণিতবিদেরা এই ভাষা ব্যবহার করেন। প্রথম নোটবুকের ৮৬ পৃষ্ঠায় এবং আরও অনেক জায়গায় যখন রামানুজন গ্রিক অক্ষর সিগমা (Σ) লেখেন, তখন তিনি বোঝান সমষ্টি বা যোগফল।
একটা ছোট নোটেশন হয়তো বলছে: ‘x-কে k-তম ঘাতে নিয়ে k দিয়ে ভাগ করলে যে রাশি পাওয়া যায়, এরকম সব পদের যোগ করতে হবে। এখানে k-এর মান ১ থেকে শুরু করে অসীম পর্যন্ত।’ অর্থাৎ: ‘k দেখলে সেখানে ১ বসিয়ে লিখে রাখতে হবে। তারপর ২ বসাতে হবে এবং আগেরটার সঙ্গে যোগ করতে হবে... এভাবে চলতে থাকবে অনন্তকাল।’
এটাকে কথায় না লিখে গাণিতিক সংকেতে লেখা অনেক সহজ:
গণিতে এমন সব সহজ ধারণা আছে, যা অদ্ভুত সব পরিভাষার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। আপনি কি এমন একটা সিরিজ চান, যেখানে সংখ্যাগুলো একবার ধনাত্মক ও একবার ঋণাত্মক হবে? খুব সহজ। শুধু (-1)k জুড়ে দিন। k-এর মান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নটা নিজে থেকে প্লাস-মাইনাস হতে থাকবে। অথবা যদি শুধু বিজোড় সংখ্যা চান, তাহলে 2n + 1 লিখলেই কাজ শেষ। n = 0 হলে মান হবে 1, n = 1 হলে মান হবে 3 এবং n = 2 হলে মান হবে 5…।
ছোট, সুন্দর এবং সংক্ষিপ্ত।
আপনি কি এমন একটা সিরিজ চান, যেখানে সংখ্যাগুলো একবার ধনাত্মক ও একবার ঋণাত্মক হবে? খুব সহজ। শুধু (-1)k জুড়ে দিন।
আপনি যদি ইংরেজি না জানেন, তবে চাকরির দরখাস্তও লিখতে পারবেন না। এমনকি কিং লিয়ারও লিখতে পারবেন না। কিন্তু শুধু ইংরেজি জানলেই কি শেক্সপিয়ারের নাটক লেখা যায়? রামানুজনের নোটবুকের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। পেশাদার গণিতবিদদের কাছে তাঁর হিজিবিজি হাতের লেখা বা নোটেশন বোঝাটা ছিল সবচেয়ে কম কঠিন কাজ। কিং লিয়ার-এর ইংরেজির মতো আসল কাজটা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি ওই ভাষায় কী বলতে চেয়েছেন, সেটা উদ্ধার করা। তবে তা ছিল প্রচুর খাটুনির কাজ। গাণিতিক সত্তাগুলোকে প্রকাশ করা, সেগুলোর ওপর অপারেশন চালানো, বিশেষ ক্ষেত্রগুলো যাচাই করা এবং জানা উপপাদ্যগুলোকে নতুন জগতে প্রয়োগ করা। কিন্তু এই খাটুনির একটা বড় অংশ ছিল সংখ্যাগত হিসাব-নিকাশ।
কেউ একজন রামানুজন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘প্রতিটি পূর্ণসংখ্যা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু।’ বন্ধুদের সঙ্গে মানুষ যেমন সময় কাটাতে পছন্দ করে, তিনি তেমনি সংখ্যার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন।
এমনকি তাঁর প্রকাশিত নোটবুকগুলোতেও দেখা যায়, অন্যরা যা বিমূর্ত রেখে দিতেন, রামানুজন সেটাকে নির্দিষ্ট সংখ্যার রূপ দিতেন। সংখ্যা বসিয়ে দেখতেন ফাংশনটা আসলে কেমন আচরণ করে। কিছু কিছু পৃষ্ঠা যেখানে Σ বা f(x)-এর বদলে ৬১ বা ৩৫৩৩ সংখ্যার ছড়াছড়ি, সেগুলো দেখলে অবাক হতে হয়। দেখে কোনো গাণিতিক গবেষণাপত্র মনে হয় না, বরং মনে হয় ক্লাস ফোরের বাচ্চার হোমওয়ার্কের খাতা। এগুলো ছিল নিছক সংখ্যার কসরত।
তিনি প্রচুর পরিশ্রমও করতেন। গবেষক বি এম উইলসনের মতে, রামানুজনের সংখ্যাতত্ত্বের গবেষণার আগে প্রায়শই বিশাল সব সংখ্যার টেবিল তৈরি করা থাকত। সেসব সংখ্যা দেখে বেশির ভাগ গণিতবিদই ভয়েই পিছিয়ে যেতেন।
কেউ একজন রামানুজন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘প্রতিটি পূর্ণসংখ্যা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু।’ বন্ধুদের সঙ্গে মানুষ যেমন সময় কাটাতে পছন্দ করে, তিনি তেমনি সংখ্যার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন।
‘ভয়ে পিছিয়ে যেতেন’ বাক্যটার মধ্যে যেমন শ্রদ্ধা আছে, তেমনি হয়তো এক চিমটি বিদ্রূপও আছে। যেন অবাক হয়ে ভাবছেন, রামানুজনের মতো একজন জিনিয়াস কেন নিছক পাটিগণিতের মতো সাধারণ কাজে এত সময় দেবেন? অথচ রামানুজন ঠিক সেটাই করছিলেন, যা মহান শিল্পীরা করেন। নিজেদের কাজের গভীরে ডুবে যাওয়া। তিনি সংখ্যার সঙ্গে এক ধরনের অন্তরঙ্গতা তৈরি করছিলেন। ঠিক যে কারণে কোনো চিত্রশিল্পী রঙের মিশ্রণ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকেন, কিংবা কোনো সুরকার অবিরাম সারগাম বাঁধেন, তেমনি রামানুজনও পড়ে থাকতেন সংখ্যা নিয়ে।
তাঁর এই গভীর ভাবনার ফলও তিনি পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেই বায়োলজিক্যাল গবেষকের মতো, যিনি ল্যাবে রাত জাগেন বলে এমন সব জিনিস দেখতে পান, যা অন্যরা মিস করে যায়। তাঁর বন্ধুরা হয়তো পরে স্মৃতিচারণা করবেন যে তিনি কীভাবে স্কুলের কঠিন অঙ্কগুলো চোখের পলকে সমাধান করে দিতেন। কিন্তু রামানুজন নিজে যে সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতেন, সেগুলো তাঁর কাছে ততটাই কঠিন ছিল, যতটা স্কুলের অঙ্ক তাঁর বন্ধুদের কাছে ছিল। তাঁর সাফল্য শুধু হঠাৎ করে আসা কোনো ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা থেকে আসেনি। এটা ছিল তাঁর কঠোর পরিশ্রমের ফল। এতে সময়ও লেগেছিল প্রচুর।
আর পরিহাসের বিষয় হলো, স্কুলের পরীক্ষায় ফেল করার পর ‘সময়’ জিনিসটা তাঁর কাছে ছিল অফুরন্ত।
