দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি - ১৫

মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।

অধ্যায় দুই

আনন্দে ভেসে বেড়ানো

৬. ঈশ্বরের ভাবনা

১৮০৭ সাল। রামানুজন তাঁর এফএ পরীক্ষায় শেষবারের মতো ফেল করার এবং ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সেই দমবন্ধ করা কঠোরতাও হাড়েহাড়ে টের পাওয়ার ঠিক ১০০ বছর আগের কথা। উইলিয়াম থ্যাকার নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক ভারতে অনুবাদক, বিচারক এবং সরকারি আমলা হিসেবে কাজ করতেন। ক্যানারা, মালাবার এবং সিডেড জেলার ওপর তাঁর রিপোর্টে তিনি লিখলেন:

‘ইংল্যান্ডে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার হলো, সম্পদের একটা বড় অংশ কিছু নির্দিষ্ট পরিবারের হাতে থাকবে, যাতে তারা ধনী হতে পারে; রাষ্ট্রের সেবা ও সুরক্ষার জন্য সিনেটর, জ্ঞানী ব্যক্তি এবং বীর তৈরি করতে পারে। অন্যভাবে বললে, খাজনার একটা বড় অংশ সম্ভ্রান্ত এবং ভদ্রলোকদের পকেটে যাওয়া উচিত। তারা পার্লামেন্টে, সেনাবাহিনীতে, নৌবাহিনীতে এবং বিজ্ঞান ও অন্যান্য পেশায় দেশের সেবা করবে। এই সম্পদের কারণে তারা যে অবসর, স্বাধীনতা এবং উচ্চাদর্শের চর্চা করতে পারে, তা ব্রিটেনকে গৌরবের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। তারা বহুদিন এটা উপভোগ করুক।’

‘কিন্তু ভারতে, প্রচুর সম্পদের কারণে মানুষের মনে যে ঔদ্ধত্য, স্বাধীনতা এবং গভীর চিন্তার উদ্রেক হয়, তা অবশ্যই দমন করতে হবে। এগুলো সরাসরি আমাদের ক্ষমতা ও স্বার্থের বিরোধী। প্রকৃতির নিয়ম এবং সব সরকারের অতীত অভিজ্ঞতাই বলে, এ বিষয়ে আর বেশি কথা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। আমাদের এখানে জেনারেল, রাজনীতিবিদ বা আইনপ্রণেতার দরকার নেই। আমাদের দরকার পরিশ্রমী চাষাভুষা। আমাদের যদি অস্থির ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী আত্মার দরকার হতো, তবে মালাবার অঞ্চলে তেমন লোকের অভাব নেই। তা দিয়ে পুরো উপদ্বীপ ভরে ফেলা যেত।’

ইংল্যান্ডে স্বাভাবিক ব্যাপার হলো, সম্পদের একটা বড় অংশ কিছু নির্দিষ্ট পরিবারের হাতে থাকবে, যাতে তারা ধনী হতে পারে; রাষ্ট্রের সেবা ও সুরক্ষার জন্য সিনেটর, জ্ঞানী ব্যক্তি এবং বীর তৈরি করতে পারে।

থ্যাকারের এই মনোভাব যদি ভারতে ব্রিটিশ শিক্ষানীতির দর্পণ হয়, তবে রামানুজনের চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হতে পারে না। রামানুজনের কাছে মনে হতেই পারত যে কলেজের উদ্দেশ্যই হলো তাঁর ঔদ্ধত্য, স্বাধীনতা এবং গভীর চিন্তাকে দমন করা। সন্দেহাতীত কিন্তু অদ্ভুত প্রতিভার কাউকে লালন করতে ভারতের উচ্চশিক্ষার এই ব্যর্থতা একটা পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ হতে পারে। কীভাবে আমলাতান্ত্রিক সিস্টেম, নীতি ও নিয়মকানুন সত্যিই মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, তা দেখানো হবে সে বইয়ে।

ব্যক্তিগতভাবে মানুষ হয়তো রামানুজনকে পছন্দ করত, সম্মান করত। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক সিস্টেম তাঁর জন্য কোনো জায়গা খুঁজে পায়নি। কারণ, এই সিস্টেমের নকশাই করা হয়েছিল এমন সব বুদ্ধিমান, চৌকস তরুণ তৈরি করার জন্য, যারা ব্রিটিশ প্রভুদের দেশ শাসনে সাহায্য করবে। থ্যাকারের সাবধানবাণীর সেই অস্থির ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী আত্মাদের জন্য এখানে কোনো জায়গা ছিল না।

শ্রীনিবাস রামানুজন
ছবি: উইকিপিডিয়া

একদিক থেকে দেখলে, ১৯০৪ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর রামানুজন হাবুডুবু খেয়েছেন। স্কুলের বাইরে, ডিগ্রিহীন, চাকরিহীন এবং অন্য গণিতবিদদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগহীন অবস্থা।

কিন্তু তবুও, গ্লাসটা কি অর্ধেক খালি ছিল, নাকি অর্ধেক ভরা?

ঊনবিংশ শতাব্দীর গণিতবিদ জ্যাকোবি বিশ্বাস করতেন, তরুণ গণিতবিদদের বরফশীতল পানিতে ফেলে দেওয়া উচিত। হয় তারা সাঁতার শিখবে, নয়তো ডুবে মরবে। অনেক ছাত্র অন্যের কাজ আয়ত্ত না করা পর্যন্ত নিজেরা কিছু চেষ্টা করতে চায় না। ফলে খুব কম ছাত্রই স্বাধীনভাবে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে।’ ই. টি. বেল তাঁর মেন অব ম্যাথমেটিকস বইয়ে এমনই লিখেছেন।

১৯০৪ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর রামানুজন হাবুডুবু খেয়েছেন। স্কুলের বাইরে, ডিগ্রিহীন, চাকরিহীন এবং অন্য গণিতবিদদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগহীন অবস্থা।

রামানুজন বছরের পর বছর ধরে সেই বরফশীতল পানিতে একাই সাঁতার কেটেছেন। এই কষ্ট আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতা কি তাঁর ভালো করেছিল? এগুলো কি তাঁর স্বাধীন চিন্তাকে উসকে দিয়েছিল? তাঁর প্রতিভাকে শানিত করেছিল?

ভারতে নিশ্চয়ই কেউ তখন এমনটা ভাবেনি। কিন্তু ফলটা শেষমেশ তেমনই হয়েছিল। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা তাঁকে প্রথাগত ছক থেকে বেরিয়ে নিজের মতো করে বিকশিত হতে বাধ্য করেছিল। সমাজের যে শেকল তাঁকে গতানুগতিক রাস্তায় বেঁধে রাখত, তিনি তা থেকে মুক্ত ছিলেন।

টানা পাঁচ বছর রামানুজন একাই গণিত চর্চা করে গেছেন। তিনি কোনো গাইডেন্স পাননি, কোনো উৎসাহ পাননি। টিউশনি করে পাওয়া সামান্য কিছু টাকা ছাড়া আর কোনো অর্থকড়িও পাননি। কিন্তু তিনি পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে থাকলেও পরিবার তাঁকে খুব একটা নিরুৎসাহিত করেনি। অন্তত তাঁকে থামিয়ে দেওয়ার মতো চাপ দেয়নি।

শ্রীনিবাস রামানুজন
ছবি: উইকিপিডিয়া

বলা যেতে পারে, ভারত তাঁর ভেতরের এই নিঃসঙ্গ জিনিয়াসের জন্য একটু জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল; ঠিক যেভাবে এ দেশ ঋষি, মরমী সাধক বা সন্ন্যাসীদের জায়গা দেয়। তাঁর বন্ধুরা, মা, এমনকি বাবাও তাঁকে সহ্য করেছেন। চাকরি খুঁজে কিছু একটা করে দেখানোর জন্য অতিরিক্ত চাপাচাপি করেননি।

রামানুজনের শুরুর দিকের বছরগুলোকে নেভিল বলেছেন ‘ভবঘুরে দিনগুলো’। এক অর্থে কথাটা ঠিকই। অনেক দিক থেকে ১৯০৯ সাল থেকে কিছু বছরই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়। রামানুজন গণিতের মধ্যে এমন এক আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন, যা এতই আরামদায়ক ছিল যে তিনি সেখান থেকে আর বের হতে চাইতেন না। এটি তাঁকে বুদ্ধিবৃত্তিক, নান্দনিক এবং মানসিকভাবে তৃপ্ত করত। প্রমাণ বলছে, আধ্যাত্মিকভাবেও।

রামানুজনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা তাঁকে প্রথাগত ছক থেকে বেরিয়ে নিজের মতো করে বিকশিত হতে বাধ্য করেছিল। সমাজের যে শেকল তাঁকে গতানুগতিক রাস্তায় বেঁধে রাখত, তিনি তা থেকে মুক্ত ছিলেন।

অগণিত গল্প পরে সাক্ষ্য দেয়, রামানুজনের মধ্যে গণিত ও দর্শন পাশাপাশি শুয়ে ছিল। একে অপরের সঙ্গে জড়িত ছিল অঙ্গাঙ্গিভাবে। শোনা যায়, পাচাইয়াপ্পা কলেজে পড়ার সময় এক অসুস্থ শিশুর বাবা-মাকে সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, বাচ্চাটাকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে। তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মানুষের মৃত্যু কেবল নির্দিষ্ট একটা স্থান-কালের সংযোগবিন্দুতেই হতে পারে।’ আরেকবার স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন, রক্তে লাল হয়ে যাওয়া এক পর্দার ওপর একটি হাত উপবৃত্তীয় ইন্টিগ্রাল লিখে যাচ্ছে।

রামানুজন একটা ধারণা প্রায়ই প্রচার করতেন। ধারণাটি ছিল 2n – 1 রাশি নিয়ে। এক বন্ধুর স্মৃতিচারণা অনুযায়ী রামানুজন ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘এই রাশি আদি ঈশ্বর এবং বিভিন্ন দেবতাকে নির্দেশ করে। যখন n শূন্য, তখন রাশিটির মান শূন্য। অর্থাৎ কিছুই নেই। যখন n-এর মান ১, তখন রাশিটির মান এক। অর্থাৎ অসীম ঈশ্বর বা একত্ব। যখন n-এর মান ২, তখন রাশিটির মান ৩, মানে ত্রিত্ববাদ। আবার n-এর মান ৩ হলে রাশিটির মান ৭। অর্থাৎ সপ্তর্ষিমণ্ডল। এভাবেই চলতে থাকে।’

আধ্যাত্মিক বা দার্শনিক ফ্যান্টাসির প্রতি রামানুজনের সব সময় একধরনের টান ছিল। কুম্বকোনমে সত্যপ্রিয় রাও নামে এক জিমনেস্টিকস শিক্ষক ছিলেন। তাঁর জ্বরের ঘোরের মতো প্রলাপকে কেউ পাত্তা দিত না। তিনি কাবেরী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতেন। মাঝে মাঝে হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে পড়লে তাঁকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো।

বেশির ভাগ মানুষ তাঁকে এড়িয়ে চলত। কিন্তু রামানুজন নয়। তিনি মাঝে মাঝে তাঁর জন্য খাবার সংগ্রহ করতেন। কেউ কেউ ভাবত, এমন পাগলকে প্রশ্রয় দিয়ে রামানুজন নিজেও বুঝি পাগল হতে চলেছেন।

এক বন্ধুর স্মৃতিচারণা অনুযায়ী রামানুজন ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘ 2n – 1 রাশি আদি ঈশ্বর এবং বিভিন্ন দেবতাকে নির্দেশ করে।'

কিন্তু রামানুজন ব্যাখ্যা করতেন, হ্যাঁ, তিনি জানেন লোকটা হ্যালুসিনেশনের সমস্যা আছে। সে ছোট ছোট জীব দেখতে পায়। কিন্তু তিনি নিশ্চিত ছিলেন, পূর্বজন্মে সত্যপ্রিয় অনেক পুণ্য করেছিলেন। অন্যরা যাকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিত, রামানুজনের কাছে তা ছিল মহাবিশ্বের এক অত্যন্ত উচ্চমার্গের দর্শন।

পরে ইংল্যান্ডে থাকার সময় রামানুজন শূন্য এবং অসীমের ওপর ভিত্তি করে বাস্তবতার একটি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন। যদিও তিনি যা বোঝাতে চাইতেন, তাঁর বন্ধুরা তা কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। মনে হতো শূন্য মানে পরম বাস্তবতা, আর অসীম হলো সেই বাস্তবতার অসংখ্য প্রকাশ।

এই দুটির গাণিতিক গুণফল,° × 0, কোনো একটি সংখ্যা নয় বরং সব সংখ্যা, যার প্রতিটি একেকটি সৃষ্টির প্রতীক। দার্শনিক বা গণিতবিদদের কাছে হয়তো এই ধারণাটি বোকামি মনে হতে পারে। কিন্তু রামানুজন এর মধ্যে অর্থ খুঁজে পেতেন।

পি সি মহালনবিশ নামে একজনের সঙ্গে রামানুজনের দেখা হয়েছিল কেমব্রিজের এক রুমে। রামানুজন তখন শীতে কাঁপছেন। পরে তিনি রামানুজন সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘রামানুজন দার্শনিক প্রশ্নগুলো নিয়ে এত উৎসাহের সঙ্গে কথা বলতেন যে মাঝেমধ্যে আমার মনে হতো, গাণিতিক সূত্রের নিখুঁত প্রমাণের চেয়ে তিনি তাঁর দার্শনিক তত্ত্বগুলো প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই বেশি খুশি হতেন।’

শ্রীনিবাস রামানুজনের কাছে সংখ্যা এবং সেগুলোর গাণিতিক সম্পর্কগুলো মহাবিশ্ব গঠনের সূত্র দিত
ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমে একটা পুরোনো বিতর্ক আছে, গাণিতিক বাস্তবতা কি গণিতবিদেরা তৈরি করেন, নাকি এটি আগে থেকেই স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল থাকে এবং গণিতবিদরা শুধু তা আবিষ্কার করেন?

রামানুজন ছিলেন পুরোপুরি দ্বিতীয় দলের মানুষ। তাঁর কাছে সংখ্যা এবং সেগুলোর গাণিতিক সম্পর্কগুলো মহাবিশ্ব গঠনের সূত্র দিত। প্রতিটি নতুন উপপাদ্য ছিল সেই অসীম রহস্যের আরও এক টুকরো উন্মোচন।

সুতরাং রামানুজন কোনো বোকামি করেননি, চালাকি করেননি, এমনকি সুন্দর করে গুছিয়ে মিথ্যাও বলেননি। পরে তিনি তাঁর এক বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘আমার কাছে কোনো সমীকরণের কোনো অর্থ নেই, যদি না তা ঈশ্বরের কোনো ভাবনা প্রকাশ করে।’

চলবে…