ইউএফও মহাকাশের রহস্যময় আগন্তুক
ওরা আসে একটি দুটি তিনটি করে। কখনোবা ঝাঁক বেঁধে। ওরা আসে রুপালি আগুনঝরা রাতে কিংবা ঘোর অমাবস্যার ভুতুড়ে রাতে। পিরিচের মতো, চাকতির মতো জিনিসগুলো ঘুরে বেড়ায় নির্জন জঙ্গলে, বিরান জলাভূমিতে, সাগরে-পাহাড়ে কিংবা ঊষর মরুর বুকে। মাঝেমধ্যে জিনিসগুলো হানা দেয় লোকালয়ে। টুপ করে দু–একজনকে তুলে নেয়। উন্নত ল্যাবে নিয়ে গিনিপিগ বানায় তাঁদের। তাঁদের কেউ চিরতরে হারিয়ে যান, কেউ ফিরে আসেন বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা নিয়ে। তাঁরা বলেন অবিশ্বাস্য সব কাহিনি, যা হয়তো কল্পবিজ্ঞানের সিনেমা কিংবা গল্পেই ঘটা সম্ভব।
গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে উড়ন্ত সসার বা ইউএফও দেখার গল্পগুলো ডালপালা মেলতে শুরু করে, আশি-নব্বইয়ের দশকে এসে তা পরিণত হয় গুজবের মহিরুহে। ইউএফও বা উড়ন্ত চাকতি দেখার অভিজ্ঞতার গল্প বলে সাধারণ মানুষও রাতারাতি খ্যাতির তুঙ্গ স্পর্শ করেন, তেমনি বিখ্যাত সব মানুষও সস্তা জনপ্রিয়তার লোভ সামলাতে না পেরে যোগ দেন গুজবের মিছিলে। ফলস্বরূপ দুনিয়াজুড়ে নিজেকে ইউএফও চাক্ষুষকারী বলে দাবি করা লোকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে; এলিয়েন, উড়ন্ত চাকতি বা ভিনগ্রহে প্রাণ নিয়ে গুঞ্জন ধীরে ধীরে শোরগোলে পরিণত হচ্ছে। ফলে এটাই এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হিসেবে। কতটুকু সত্যি আর কতটুকু বাস্তবতা মিশে থাকে এসব গল্পে?
২০ জুলাই ১৯৬৯। চাঁদের পথে পাড়ি দিচ্ছিলেন তিন নভোচারী। নীল আর্মস্ট্রং, এডুইন অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্স। অন্যরা দেখেননি, দেখেছেন কেবল অলড্রিন, তেমনটাই তিনি দাবি করেছেন বহু পরে। কী দেখেছিলেন সেদিন অলড্রিন? চাঁদে যাওয়ার পথে নাকি ভিনগ্রহীদের সুপারক্র্যাফ্ট দেখেছেন। দেখেছেন এলিয়েনও। অলড্রিনের এই দাবি কেউ বিশ্বাস করেনি। তবে অনেক অখ্যাত লোকের কথা মানুষ বিশ্বাস করেছে। ম্যাগাজিন, টেলিভিশন কিংবা সিনেমায় এমনভাবে এলিয়েনদের বিষয়গুলো দেখানো হয়েছে, যেন মিথ্যা নয় সেসব কাহিনি।
২০ জুলাই ১৯৬৯। চাঁদের পথে পাড়ি দিচ্ছিলেন তিন নভোচারী। নীল আর্মস্ট্রং, এডুইন অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্স।
শুরুটা হয়েছিল রসওয়েল দুর্ঘটনা থেকে। ৫ জুলাই ১৯৪৭ সাল। ঝড়বৃষ্টির রাত। নিউ মেক্সিকোর রসওয়েল এলাকার লোকজন সেই বৈরী রাতে অদ্ভুত একটি আলো দেখতে পান। এর কিছুক্ষণ পরই ভয়ংকর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। সেই রাতে ব্রাজেল নামের এক খামারির বেশ কিছু ভেড়া হারিয়ে যায়। তিনি ভেড়া খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করেন বিস্ফোরণস্থল। সেখানে পড়ে আছে লোহালক্কড়ের স্তূপ। ব্রাজেলের খামারে কোনো টেলিফোন কিংবা রেডিও ছিল না। তাই আগের কয়েক দিন কী নিয়ে মিডিয়ায় তোলপাড় হচ্ছে, সেটি জানতে পারেননি তিনি। পরদিন তিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে জঞ্জালগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আসেন। পরে যখন জানতে পারেন, বেশ কিছুদিন ধরে এই এলাকার আকাশে এক রহস্যময় ডিস্ক বা চাকতি দেখা গেছে, তিনি স্থানীয় পুলিশের শেরিফকে খবর দেন। শেরিফ তখন খবর দেন রসওয়েল আর্মি এয়ারফিল্ডকে। তারা এসে ধ্বংসাবশেষগুলো নিয়ে যায় এবং বিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে আরও কিছু নমুনা সংগ্রহ করে উদ্ধারকারী দলটি।
১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই সরকারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, বেশ কিছুদিন ধরে যে উড়ন্ত ডিস্ক বা চাকতি দেখা যাচ্ছিল, সেটি এখানেই বিধ্বস্ত হয়েছে। পরদিনই অবশ্য বদলে যায় প্রেস বিজ্ঞপ্তির ভাষা। রসওয়েল ডেইলি রেকর্ড-এ দেওয়া নতুন বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ধ্বংসাবশেষটা ছিল একটি আবহাওয়া বেলুনের, যেটা ওই ঝড়ের রাতে বিধ্বস্ত হয়। তখনো মহাকাশে কোনো স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয়নি। রাডার বা আবহাওয়াসংক্রান্ত যন্ত্রপাতি তখন আকাশে স্থাপন করা হতো বেলুনের পিঠে চাপিয়ে। তা ছাড়া বেলুন বিধ্বস্ত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ততক্ষণে গুজব যা রটার রটে গেছে। গুজবের আগুনে একবার ঘি পড়লে সে আগুন নেভানো দায়। তখন শুরু হয় গুঞ্জন—উড়ন্ত চাকতিটা কী? কোথা থেকে এল। এর আগে মার্কিন এয়ার ফোর্সের ৫০৯তম বোমারু দল দাবি করেছিল, ১ জুলাই তারা উড়ন্ত চাকতি দেখেছিল। সেগুলোর গতি এতটাই বেশি ছিল, তখনকার কোনো আকাশযানের পক্ষে এত গতিতে চলা সম্ভব নয়।
৫ জুলাই ১৯৪৭ সাল। ঝড়বৃষ্টির রাত। নিউ মেক্সিকোর রসওয়েল এলাকার লোকজন সেই বৈরী রাতে অদ্ভুত একটি আলো দেখতে পান। এর কিছুক্ষণ পরই ভয়ংকর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা।
তাহলে কী এ জিনিস? দুইয়ে–দুইয়ে চার মেলাতে দেরি হয়নি। পৃথিবীর কোনো আকাশযান যখন এত গতিতে চলতে পারে না, তাহলে নিশ্চয়ই পৃথিবীর বাইরে থেকে আসা কোনো যান। সেই যান যারা তৈরি করতে পারে, তারা নিশ্চয়ই মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান! কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস আর টিভি সিরিজের কল্যাণে ভিনগ্রহী এলিয়েনের গল্প তখন ব্যাপক জনপ্রিয়।
দুই
বার্নি ও বেটি হিল দম্পতি বাস করতেন বোস্টনে। বার্নি পেশায় পোস্টম্যান, বেটি শিশুকল্যাণকর্মী। তাঁরা ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬১ সালে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূর থেকে বাড়িতে ফিরছিলেন। বাসায় ফেরার পর তাঁরা খেয়াল করেন, প্রায় সাত ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অথচ তাঁরা প্রায় ফাঁকা রাস্তায় যে গতিতে গাড়ি চালিয়েছেন, তাতে মোটেও তিন ঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। ব্যাপারটা তাঁরা খেয়াল করেন পরদিন। পরের পাঁচ দিন এটি নিয়ে তাঁরা দুর্ভাবনায় ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অনেক চেষ্টাচরিত করে একসময় তাঁরা হারিয়ে যাওয়া চার ঘণ্টার স্মৃতি খুঁজে পান। তারপর দাবি করেন, মাঝপথে এক বনের মধ্যে আক্রান্ত হন ভিনগ্রহীদের দ্বারা। চাকতির মতো বড়সড় একটি আকাশযান এসে তাঁদের পথ রোধ করে। আটক করে তাঁদের নিয়ে যায় বনের মধ্যে এক ল্যাবরেটরিতে। সেখানে তাঁদের অপারেশন টেবিলে নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। আগন্তুকেরা স্বীকার করে, তারা ভিনগ্রহের প্রাণী।
এই অভিজ্ঞতার খবর পরের কয়েক দিনে সংবাদমাধ্যমে ঝড় তোলে। একদল লোক, যাঁরা নিজেদের ইউএফও গবেষক মনে করেন, তাঁরা বার্নি ও বেটি হিল দম্পতির গল্পটাকে সত্যি বলে প্রচার করেন। দাবি করেন, এলিয়েন ও ইউএফওর অস্তিত্বের পক্ষে এটি এক অকাট্য প্রমাণ।
বার্নি ও বেটি হিল দম্পতি ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬১ সালে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূর থেকে বাড়িতে ফিরছিলেন। বাসায় ফেরার পর তাঁরা খেয়াল করেন, প্রায় সাত ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
পরে বেটি সেলিব্রিটিতে পরিণত হন, পত্রিকা-ম্যাগাজিনে নিয়মিত ছাপা হয় তাঁর সাক্ষাৎকার ও ছবি। বিভিন্ন সেমিনারে তিনি এলিয়েনদের নিয়ে, ইউএফওর বর্ণনা দিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। বেটি দাবি করেন, এলিয়েনদের দলনেতাকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, তারা কোথা থেকে এসেছে। জবাবে ভিনগ্রহীরা একটি ম্যাপ দেখিয়েছিল, মহাকাশের ম্যাপ। সেই ম্যাপ বেটি মনে রেখেছিলেন, পরে সেটি আঁকতেও সক্ষম হন। সভা-সেমিনারে সেই ম্যাপ দেখিয়ে মানুষকে বিস্মিত করেন। বিস্মিত হয়েছিলেন নাকি একদল অ্যাস্ট্রোফিজিস্টও।
এ পর্যন্ত পৃথিবীর সব দিক থেকেই ইউএফও দেখার দাবি করা হয়। কিছু ঘটনা নিয়ে অতটা আলোচনা হয় না। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা নিয়ে হইচই হয় আজও। ১৯৭৮ সালের ২১ অক্টোবর। ২০ বছর বয়সী তরুণ বিমানচালক ফ্রেডরিক ভ্যালেন্তিন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে উড়াল দিয়েছিলেন কিংস আইল্যান্ডের উদ্দেশে। সন্ধ্যা ৬টা ১৯ মিনিটে যাত্রা শুরু করেন, কিন্তু ছেচল্লিশ মিনিটের মধ্যে তাঁকে শরণ নিতে হয় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের। কারণ, তাঁর পিছু ধাওয়া করেছে আরেকটি বড়সড় প্লেন। ট্রাফিক কন্ট্রোলারের কাছে ফ্রেডরিক জানতে চান, ঠিক এই সময় এদিকে কোনো প্লেন চলার কথা আছে কি না। ট্রাফিক থেকে জানানো হলো, কোনো বিমান চলাচলের খবর তাঁর জানা নেই।
ফ্রেডরিক জানান, তাঁর থেকে শ তিনেক মিটার ওপর দিয়ে প্লেনটা চলেছে। তবে সরলরেখা বরাবর তাঁকে অনুসরণ করছে না—কখনো তাঁকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, কখনো খুব কাছে চলে আসছে, কখনো দূরে—যেন একটি খেলা খেলছে। অবশ্য কন্ট্রোলার যখন ধাওয়াকারী প্লেনটার আকার জানতে চান, তখন ফ্রেডরিক দাবি করেন, ওটা কোনো প্লেন নয়। ধাতব কাঠামোর অন্য কোনো আকাশযান। কিন্তু সেটি দেখতে ঠিক কেমন, জানানোর আর সুযোগ পাননি ফ্রেডরিক। ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও কন্ট্রোল অফিস তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেনি। কন্ট্রোলার ধরে নেন, ফ্রেডরিকের বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছে।
বেটি দাবি করেন, এলিয়েনদের দলনেতাকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, তারা কোথা থেকে এসেছে। জবাবে ভিনগ্রহীরা একটি ম্যাপ দেখিয়েছিল, মহাকাশের ম্যাপ।
দ্রুতই রেসকিউ টিম ছুটে যায় ফ্রেডরিককে উদ্ধার করতে। চার দিন একনাগাড়ে আটটি রেসকিউ প্লেন ও সামুদ্রিক জাহাজ জল ও স্থল মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার জায়গা চষে ফেলে। কিন্তু টিকিটির দেখা মেলেনি ফ্রেডরিক বা তাঁর প্লেনের। এমনকি তাঁর প্লেনের খণ্ডাংশেরও খোঁজ মেলেনি।
তখন এটি নিয়ে হইচই পড়ে যায়। চলে বিস্তর গবেষণা। সত্যিই কি কোনো রহস্যময় যান পিছু নিয়েছিল ফ্রেডরিকের? নানা রকম তত্ত্ব দেওয়া হয় তখন। কেউ কেউ দাবি করেন, ফ্রেডরিক আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু যিনি কিছুক্ষণ পর আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন, তিনি কেন উড়ন্ত সসারের কথা বলতে যাবেন? যুক্তির কথা। তাহলে হয়তো তিনি নিজেই পালিয়ে কোথাও গিয়ে আত্মগোপন করেছেন। অথবা যান্ত্রিক ত্রুটি বা জ্বালানির অভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে তাঁর প্রশিক্ষণ বিমান। কিন্তু শেষমেশ কোনো তত্ত্বই ধোপে টেকেনি।
এর পরপরই একদল লোক দাবি করেন, তাঁরা ইউএফও গবেষক। ফ্রেডরিকের বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে ভিনগ্রহীদের আক্রমণে। তাঁদের একজন নাকি আকাশে একটি চাকতির মতো কিছু একটি উড়তেও দেখেছেন। শুধু দেখা নয়, সেই দলের একজন রয় ম্যানিফোল্ড একটি ছবি দাখিল করেন প্রমাণ হিসেবে। রয় পেশায় একজন চিত্রশিল্পী। ছবি তোলার নেশাও আছে। ১ জুলাই আকাশে একটি চাকতি উড়তে দেখে তিনি সেটির ছবিও তুলে ফেলেন। সেই ছবি সাময়িক দ্বিধা তৈরি করে বটে, কিন্তু সেটি যে উড়ন্ত চাকতি, তার অকাট্য প্রমাণ সেটি নয়।
রয় পেশায় একজন চিত্রশিল্পী। ছবি তোলার নেশাও আছে। ১ জুলাই আকাশে একটি চাকতি উড়তে দেখে তিনি সেটির ছবিও তুলে ফেলেন।
তিন
সাত দশক ধরে হাজার হাজার ইউএফও দেখার দাবি উঠেছে পৃথিবীজুড়ে। এগুলোর বেশির ভাগ চাকতি, ডিস্ক বা সসার আকৃতির বলে দাবি তাঁদের। কিন্তু এগুলোর কমন নাম আনআইডেনটিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট। সংক্ষেপে ইউএফও বা অজানা উড়ন্ত বস্তু। এই নামের সঙ্গে সসার, ডিস্ক বা চাকতির আক্ষরিক কোনো সম্পর্ক নেই। তবু ইউএফও মানেই কেন সেটি চাকতি আকৃতির হতে হবে? শুরুতেই ভিনগ্রহীদের দেখার দাবি যাঁরাই করেছিলেন, তাঁরাই বলেছেন, চাকতির মতো উড়ুক্কু যান দেখেছেন। পরে সিনেমা, টিভি সিরিজ আর উপন্যাসের কল্যাণে ভিনগ্রহী যান মানেই এখন উড়ন্ত চাকতি। এর শুরুটা হয়েছিল মার্কিন বিমানচালক কেনেথ আর্নল্ডের একটি অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৪৭ সালের ২৪ জুন। আর্নল্ড তাঁর হালকা এয়ারক্রাফট নিয়ে ওয়াশিংটন থেকে উড়াল দিয়েছিলেন ইয়াকিমার একটি ন্যাশনাল পার্কের দিকে। সেখানে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে বলে খবর ছড়িয়েছে। তারই খোঁজে উড়াল দেন আর্নল্ড।ধ্বংসাবশেষ খুঁজে দিতে পারলে মিলবে পাঁচ হাজার ডলার পুরস্কার। কিন্তু মাঝপথে ঘটে বিপত্তি। কিসের যেন ঝলকানি আসে থেমে থেমে। পড়ে তাঁর ছোট্ট বিমানের ওপর। কিছুক্ষণ ধরে তিনি ঝলকের উৎস খোঁজার চেষ্টা করেন। বেশি সময় লাগেনি। দেখতে পান সাতটি আকাশযান পিছু নিয়েছে তাঁর। সেগুলোর গা থেকে প্রতিফলিত আলোই তাঁর বিমানের ওপর পড়ছে।
এ ঘটনা তিনি জানান এয়ার ইন্টেলিজেন্সের সদস্যের কাছে। কেমন দেখতে সেগুলো, তার একটি ধারণাও দেন। অবশ্য এ নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেন তিনি। কখনো বলেন সেগুলো দেখতে জেট বিমানের মতো ছিল, কখনো বলেন সেগুলো দেখতে ডিস্ক বা চাকতির মতো। তাঁর দাবি ছিল, এগুলোর গতি এতটাই বেশি, পৃথিবীর কোনো আকাশযানের পক্ষে এত গতিতে চলা সম্ভব নয়। তিনি নাকি সেসব উড়ন্ত চাকতির আকারও মেপেছিলেন।
১৯৪৭ সালের ২৪ জুন। আর্নল্ড তাঁর হালকা এয়ারক্রাফট নিয়ে ওয়াশিংটন থেকে উড়াল দিয়েছিলেন ইয়াকিমার একটি ন্যাশনাল পার্কের দিকে।
ফ্লাইং ডিস্ক, উড়ন্ত চাকতি বা সসারের ধারণা তখন থেকেই ডালপালা মেলে। ইউএফও মানেই যে চাকতি আকারের, এ ছবি তৈরি হয় আর্নল্ডের সেই ঘটনার পর থেকেই। এর কিছুদিন পরই ঘটে রসওয়েল দুর্ঘটনা।
শুধু এগুলোই নয়। পৃথিবীতে আপাতদৃষ্টে যত রহস্যময় ঘটনা বা নিদর্শন আছে, সব কটির সঙ্গে লেগে যায় ইউএফও এবং ভিনগ্রহীর যোগসাজশ। যেমন বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এলাকায় এত এত দুর্ঘটনা কেন ঘটে? নিশ্চয়ই ওখানে ভিনগ্রহীরা আস্তানা গেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনহেঞ্জ বা মিসরের পিরামিড সে যুগের মানুষ কীভাবে তৈরি করল? নিশ্চয়ই ভিনগ্রহীরা এসে গড়ে দিয়েছে। রাতারাতি ফসলের খেতে ক্রপ সার্কেল কারা তৈরি করে? নিশ্চয়ই ভিনগ্রহীরা? নইলে এরিয়া ফিফটি ওয়ান নিয়ে মার্কিন সরকার এত রাখঢাক করে কেন?
ওখানে নিয়মিত ইউএফও নামে এলিয়েনদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। কেউ কেউ আবার মনে করেন, রসওয়েল দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয় যে ভিনগ্রহী যান, সেটি গবেষণার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে এরিয়া ফিফটি ওয়ানের ভেতর। এমনকি এলিয়েনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল রসওয়েলে। সেই দেহ ব্যবচ্ছেদ ও সেটি নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হচ্ছে এরিয়া ফিফটি ওয়ানের ভেতর।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এলাকায় এত এত দুর্ঘটনা কেন ঘটে? নিশ্চয়ই ওখানে ভিনগ্রহীরা আস্তানা গেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনহেঞ্জ বা মিসরের পিরামিড সে যুগের মানুষ কীভাবে তৈরি করল?
চার
এই যে এত এত গুঞ্জন, এখনো প্রায় প্রতিদিন উড়ন্ত সসার দেখার দাবি আসছে সংবাদমাধ্যমে, এর কি আসলে ভিত্তি আছে? প্রজেক্ট ব্লুবুক নামে একটি মিশন হাতে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। সেটির মূল উদ্দেশ্য হলো ইউএফও দেখার দাবিগুলো খতিয়ে দেখা (এ নিয়ে বিস্তারিত থাকছে ‘ইউএফও ফাইলস’ লেখায়)। আমরা বরং গুজবের ব্যবচ্ছেদ করতে পারি, বিজ্ঞানীদের এ বিষয়ে কী মত, সেগুলো আলোচনা করতে পারি।
কসমসখ্যাত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট নিল ডিগ্র্যাস টাইসন মানতে নারাজ এখনই ভিনগ্রহীরা এসে আনাগোনা করছে পৃথিবীতে। তাহলে কেন এত গুজব, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন টাইসন। তিনি চারটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন এসব গুজবের। প্রথম ব্যাখ্যায় তিনি দাবি করেছেন, ইউএফও দেখার দাবি যাঁরা করেন, তাঁদের বড় একটি অংশ মানসিকভাবে অসুস্থ। তাঁর দাবি, এসব মানুষ আসলে কল্পনার জগতে বাস করেন। আরেক শ্রেণির লোক আছেন, ইচ্ছা করেই ইউএফওর ব্যাপারে মিথ্যা রিপোর্ট করেন। আরেক শ্রেণির লোক আছেন, যাঁরা হয়তো দেখছেন-শুনছেন, যা যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ও পর্যবেক্ষণ জ্ঞান না থাকায় সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনাকেই রহস্যময় বলে মনে করছেন এবং সেভাবেই রিপোর্ট করছেন। আর চতুর্থ দলের লোকেরা হয়তো সব দিক থেকেই পারফেক্ট। তাঁদের সবকিছুই ঠিকঠাক, তাঁরা হয়তো আসলেই এমন কিছু দেখছেন, আপাতদৃষ্টে তার কোনো সমাধান নেই। প্রকৃত রহস্যময় ঘটনা সেগুলো। কিন্তু রহস্যময় ঘটনা, আপাত ব্যাখ্যাহীন কোনো ব্যাপার মানেই সেটি ভিনগ্রহীদের ঘাড়ে দায় চাপাতে হবে, এমন দিব্যি কে দিয়েছে? এ প্রশ্নই রেখেছেন নীল ডিগ্র্যাস টাইসন। চোখের দেখা মানেই সেটি অকাট্য প্রমাণ, এমন ভাবলে ভুল হবে বলে মনে করেন বিখ্যাত এই অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট।
কসমসখ্যাত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট নিল ডিগ্র্যাস টাইসন দাবি করেছেন, ইউএফও দেখার দাবি যাঁরা করেন, তাঁদের বড় একটি অংশ মানসিকভাবে অসুস্থ।
তিনি লেটার্স ফর্ম অ্যান অ্যাস্ট্রাফিজিসিস্ট বইয়ে লিখেছেন:
‘মনে রাখতে হবে, কোনো দাবিদাওয়ার সপক্ষে প্রদত্ত অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল হলো চাক্ষুষ সাক্ষ্যপ্রমাণ। কোর্ট-কাছারিতে চাক্ষুষ সাক্ষ্যের চূড়ান্ত মূল্য থাকলেও বিজ্ঞানের আদালতে চাক্ষুষ সাক্ষ্যপ্রমাণ মোটামুটি মূল্যহীন। অনেক দিন ধরেই মনোবিজ্ঞানীরা জানেন যে তথ্য আহরণের মাধ্যম হিসেবে মানবীয় ইন্দ্রিয়গুলো খুবই অকার্যকর। কে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, সেটি বড় কথা নয় বা তিনি যত সম্মানীয় ব্যক্তিই হোন না কেন, তিনি যদি মানুষ হন, তাহলেই তাঁর পর্যবেক্ষণ ত্রুটিযুক্ত হতে বাধ্য। আরও মনে রাখতে হবে, যেসব ক্ষেত্রে প্রমাণের সপক্ষে তেমন কোনো জোরালো তথ্য থাকে না, সেই সব ক্ষেত্রে উৎসাহীদের ব্রহ্মাস্ত্রই হলো “ষড়যন্ত্র” কিংবা “ধামাচাপা তত্ত্ব” মানবমনের আরেকটি দুর্বলতা জানা আছে, না জেনে তর্ক করা। এটি মনোবিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিকেরা অনেক আগে থেকেই জেনে গেছেন। নাসা স্পেস মিশনের কোনো কোনো ভিডিওতে স্পেস শাটলের জানালার বাইরে অব্যাখ্যাত কিছু বস্তুর আনাগোনা দেখা যায়। এসব ভিডিও বেশ জেনুইন, তবে সঙ্গে সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে ইউএফওর “ইউ” অর্থ হলো “অজ্ঞাত”। যখন জানাই আছে যে আপনি যেটা দেখছেন, সেটি কী, আপনি তা জানেন না, তখন সেটি জানেন বলাটা কোনোক্রমেই যুক্তিযুক্ত কোনো সিদ্ধান্ত পারে না। এমনকি ওই অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তুগুলোকে অবধারিতভাবে গ্রহান্তরের উন্নত প্রযুক্তিধারী “বুদ্ধিমান” আগন্তুক, যারা গোপনে পৃথিবীবাসীকে দেখতে এসেছে, ধরে নেওয়াটাও কোনো যুক্তিতেই পড়ে না…ওই সব উড়ন্ত বস্তু সত্যিই বুদ্ধিমান এলিয়েন হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ নেই। এমন প্রমাণ চাই, যা বিজ্ঞানের কাঠগড়ায় টিকে থাকবে। যেমন এলিয়েনরা বিভিন্ন মিডিয়া সেন্টারে আসছে, তাদের উন্নত প্রযুক্তি আমাদের দেখাচ্ছে, মিস্টার প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডির সঙ্গে রোজ গার্ডেনে চা-নাশতা খাচ্ছে…।’
কোপার্নিকাস বলেন, পৃথিবী নয়, সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র। ব্রুনো বলেছিলেন, পৃথিবী বিশেষ কোনো গ্রহ নয়। মহাকাশে অজস্র গ্রহের মতো এটিও নিতান্ত সাধারণ একটি গ্রহ।
পাঁচ
মহাবিশ্বে কি আমরাই একা? এ প্রশ্নের উদ্ভব আজকের নয়। সরাসরি না বললেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এ প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছিল সেই ষোড়শ শতাব্দীতে। কোপার্নিকাস আর জিওর্দানো ব্রুনোর হাত ধরে। কোপার্নিকাস বলেন, পৃথিবী নয়, সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র। ব্রুনো বলেছিলেন, পৃথিবী বিশেষ কোনো গ্রহ নয়। মহাকাশে অজস্র গ্রহের মতো এটিও নিতান্ত সাধারণ একটি গ্রহ। সরাসরি বলেননি, সাধারণ গ্রহ বলার মানে এমন গ্রহ আরও থাকতে পারে, যেখানে প্রাণও আছে। এমনটা খুবই স্বাভাবিক। ব্রুনোর ভাবনা ছিল যুগান্তকারী, তাই তাঁর কথা সমাজ মানতে পারেনি। নিজেদের অস্তিত্বসংকটে পড়েছিলেন সমাজপতিরা, তাই ব্রুনোকে হত্যা করে সত্য আড়াল করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছিলেন।
সময় সামনের দিকে এগিয়েছে। বদলে গেছে বিজ্ঞানের ইতিহাস। এখন সাধারণ মানুষও মেনে নেয়, মহাবিশ্বে সূর্যের মতো অগণিত নক্ষত্র যেমন আছে, আছে অজস্র গ্রহ। তার সংখ্যা বিলিয়ন বিলিয়ন। এত এত গ্রহ-নক্ষত্রের ভিড়ে একটি-দুটি, এমনকি কয়েক হাজার কিংবা লাখ পৃথিবীর মতো গ্রহ থাকা সম্ভব, যেগুলোতে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী আছে। আসলেই কি তা–ই?
ইতালীয়-মার্কিন বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি এ ধরনের কথা শুনে একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা–ই যদি হয়, তাহলে ওরা কোথায়? আপাতনিরীহ ধাঁচের এই প্রশ্নই জন্ম দিয়েছিল একটি বড় প্যারাডক্সের।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ড্রেক একটি অঙ্ক কষেছিলেন। মহাবিশ্বের কতগুলো বুদ্ধিমান থাকতে পারে, তার একটি হিসাব কষা যায় এই সমীকরণে।
ব্যাপারটা এমন, মহাবিশ্বে বিলিয়ন বিলিয়ন গ্যালাক্সি আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে সেসব গ্যালাক্সিতে কত নক্ষত্র আছে আর গ্রহের কত সংখ্যা ভাবতে গেলেও মাথা ঘুরবে। এসব নক্ষত্রের সব নিশ্চয়ই একসঙ্গে জন্মায়নি। সব কটি গ্রহের বয়সও নিশ্চয়ই এক নয়। তা–ই যদি হয়, পৃথিবীর অনেক আগেই হয়তো অনেক গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে। সেগুলোতে বুদ্ধিমান প্রাণীর আবির্ভাবও নিশ্চয় অনেক আগেই ঘটেছে। সেসব গ্রহের প্রাণীরা নিশ্চয়ই মানুষের চেয়ে উন্নত বুদ্ধির। তাদের প্রযুক্তিও নিশ্চয়ই উন্নত। তা-ই যদি হয়, কোনো কোনো গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর এত দিনে পৃথিবীতে চলে আসার কথা। কিন্তু আমরা তাদের দেখছি না কেন? এ প্রশ্নই এখন ফার্মি প্যারাডক্স নামে জনপ্রিয়। তাই বলে কি যাঁরা ইউএফও দেখার দাবি করছেন, এগুলোই কি ফার্মি প্যারাডক্সের জবাব? না বোধ হয়।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ড্রেক একটি অঙ্ক কষেছিলেন। মহাবিশ্বের কতগুলো বুদ্ধিমান থাকতে পারে, তার একটি হিসাব কষা যায় এই সমীকরণে। এটি একটি সম্ভাবনা সমীকরণ। এতে কতগুলো চলক পাশাপাশি গুণ করা হয়েছে। এসব চলকের গুণফল করলে যে ফল পাওয়া যাবে, সেই–সংখ্যক প্রাণধারী গ্রহ থাকার সম্ভাবনা আছে মহাবিশ্বে। সমীকরণটি গত ৬০ বছরে কেউ বাতিলের কথা বলেনি। তবে এই সমীকরণ প্রণয়ন করা হয়েছিল শুধু আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতে বুদ্ধিমান সভ্যতার হিসাব করার জন্য। সমীকরণটা হলো:
N=R*.fp.ne.fl.fi.fc.L
যেখানে, N হলো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে মোটামুটি বুদ্ধিমান সভ্যতার সংখ্যা, যে সভ্যতার প্রাণীরা বিদ্যুৎ–চুম্বকতরঙ্গ বিতরণ করতে পারে।
R*—বুদ্ধিমান প্রাণের অনুকূল নক্ষত্র গঠনের হার।
fp—গ্রহব্যবস্থা রয়েছে, এমন নক্ষত্রের শতকরা হার।
ne—যেসব তারার গ্রহব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোর গ্রহগুলোর সংখ্যা, এসব গ্রহের আবার বুদ্ধিমান প্রাণ ধারণের সম্ভাবনা থাকতে হবে।
fl—অনুকূল পরিবেশের কারণে প্রাণের আবির্ভাব ঘটেছে, তাদের শতকরা হার।
fi—বুদ্ধিমান প্রাণ রয়েছে, এমন গ্রহের শতকরা হার।
fc—বিদ্যুৎ–চুম্বকতরঙ্গ পাঠাতে সক্ষম, এমন প্রাণের বিকাশ হওয়া গ্রহের শতকরা হার।
L—একটি সময়, যে সময় ধরে বুদ্ধিমান প্রাণীরা তাদের উপস্থিতির প্রমাণ দিতে পারে।
এটি একটি সম্ভাবনা সমীকরণ। এতে কতগুলো চলক পাশাপাশি গুণ করা হয়েছে। এসব চলকের গুণফল করলে যে ফল পাওয়া যাবে, সেই–সংখ্যক প্রাণধারী গ্রহ থাকার সম্ভাবনা আছে মহাবিশ্বে।
ড্রেক সমীকরণ ছাড়াও আছে কার্দাশেভ স্কেল। মহাবিশ্বে যদি আরও বুদ্ধিমান প্রাণ থাকে, কার কতটুকু বুদ্ধি, তা মাপজোখের স্কেল তো চাই। ১৯৬৪ সালে রুশ বিজ্ঞানী নিকোলাই কার্দাশেভ একটি স্কেলের হিসাব দাখিল করেছিলেন। এই হিসাব অনুযায়ী মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান প্রাণী থাকবে তিন ধরনের বা তিন টাইপের। পরে আরও দুটি টাইপ বাড়ানো হয়। এর মধ্যে সর্বনিম্ন হলো টাইপ–১ সভ্যতা। এই সভ্যতার প্রাণীরা মানুষের চেয়ে ১ লাখ গুণ বেশি শক্তি কাজে লাগাতে সক্ষম। সে হিসাবে মানবসভ্যতার স্কেল ০.৭। টাইপ–২ সভ্যতার প্রাণীরা তার নাক্ষত্রিক জগতের পুরো শক্তি কাজে লাগাতে সক্ষম। টাইপ–৩ সভ্যতার প্রাণীরা টাইপ–২ থেকে যোজন যোজন এগিয়ে। পুরো গ্যালাক্সির শক্তি তারা কাজে লাগাতে সক্ষম। টাইপ–২ থেকে তারা ১০ বিলিয়ন গুণ এগিয়ে। টাইপ–৪ সভ্যতার কথা ভাবাও কঠিন। তারা পুরো মহাবিশ্বের শক্তি কাজে লাগাতে পারে। ব্ল্যাকহোলের ঘটনাদিগন্তের ভেতরেও থাকবে তাদের বিচরণ। আর পঞ্চম, অর্থাৎ সর্বোচ্চ টাইপের প্রাণীরা প্যারালাল ইউনিভার্সেও হানা দিতে পারে। অর্থাৎ হাইপোথেটিক্যালি যতগুলো মহাবিশ্ব থাকা সম্ভব, সব কটির শক্তি তারা কাজে লাগাতে পারবে।
এগুলো সবই হাইপোথিসিস। কিন্তু বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের মত কী এ বিষয়ে?
সদ্য প্রয়াত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং কয়েক দশক ধরে এলিয়েনদের নিয়ে কথা বলেছেন। মহাবিশ্বে উন্নত প্রাণ থাকার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তাই বলে এ যুগে পৃথিবীতে যেসব ইউএফও বা ফ্লাইং সসার দেখার দাবি ওঠে কিছুদিন পরপর, তিনি সেগুলো মানতে নারাজ। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করেছেন, ভিনগ্রহের কোথাও না কোথাও হয়তো প্রাণের উন্মেষ ঘটেছে, তারা হয়তো আমাদের বিশ্বে পাড়ি দেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জনও করে ফেলেছে। কিন্তু তার মানে এই নয়, চাকতি আকৃতির উড়ুক্কু যানেই চেপে পৃথিবীতে আসবে তারা।
১৯৬৪ সালে রুশ বিজ্ঞানী নিকোলাই কার্দাশেভ একটি স্কেলের হিসাব দাখিল করেছিলেন। এই হিসাব অনুযায়ী মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান প্রাণী থাকবে তিন ধরনের বা তিন টাইপের।
হকিং বুদ্ধিমান প্রাণের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি বলেছেন, পৃথিবীতে প্রাণ এসেছে বহু আগে। সেই তুলনায় মানুষের আবির্ভাব অনেক অনেক পরে। ডাইনোসর পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে। গ্রহাণুর আঘাতে বেশির ভাগ বড় প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। তারপর গত সাড়ে ছয় কোটি বছরে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তার আগে প্রতি দুই কোটি বছরে পৃথিবী প্রাণের বিলুপ্তির মতো বড় বড় দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছে। অর্থাৎ সাড়ে ছয় কোটি বছরের স্থিরতা মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশে সাহায্য করেছে। হকিং মনে করছেন, মহাবিশ্বে প্রাণধারণে সক্ষম, এমন গ্রহের এত দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকাটা বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও যদি কোনো প্রাণ এ পথ উতরেও যায়, তাদের গ্রহের পরিবেশ, আবহাওয়া, এমনকি নিজেদের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের হয়তো আমরা কখনোই খুঁজে পাব না। তবে হকিং আশাও দেখিয়েছেন।
ছয়
ইউএফওর গুজবকে যাঁরা বিজ্ঞানের সূক্ষ্ম সম্ভাবনা দিয়ে পাস করাতে চান, তাঁদের নিরাশ হতে হবে মার্টিন রিজের কথা শুনলে। তিনি দেখিয়েছেন, কেন ভিনগ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণীর আবির্ভাব কঠিন। অনেকেই মনে করেন, ভিনগ্রহে প্রাণের আবির্ভাব যদি হতেই হয়, তাহলে সেটিকে গোল্ডিলকস জোনে থাকতে হবে। ঠিক পৃথিবীর মতো। এই শব্দ এসেছে ইউরোপিয়ান রূপকথা ‘গোল্ডিলকস ও তিন ভালুক’ গল্প থেকে। সে গল্পে আর না যাই। ব্যাপারটা হলো, ভিনগ্রহে যদি মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর আবির্ভাব ঘটতেই হয়, তাহলে সেই গ্রহের নক্ষত্রটা হতে হবে সূর্যের মতো। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব যতটা, ঠিক ততটা দূরত্বে থাকতে হবে। তাপমাত্রা পৃথিবীর সমান হতে হবে। থাকতে হবে বায়ুমণ্ডল, চাঁদের মতো উপগ্রহ এবং অন্য আট গ্রহের মতো এতগুলো ভাইবোন। ব্যাপারটা কঠিন, কিন্তু ২০ বিলিয়ন গ্যালাক্সির কোথাও এ রকম গোল্ডিলকস জোনে থাকা গ্রহ পাওয়া যাবে না, সে কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবে রিজ দেখিয়েছেন অন্য হিসাব। প্রথমে এককোষী প্রাণের আবির্ভাব ঘটে, তারপর ধীরে ধীরে আসে বহুকোষী প্রাণী।
হকিং বুদ্ধিমান প্রাণের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি বলেছেন, পৃথিবীতে প্রাণ এসেছে বহু আগে। সেই তুলনায় মানুষের আবির্ভাব অনেক অনেক পরে।
একসময় পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে ডাইনোসররা। কয়েক কোটি বছর। এ জন্য কিন্তু তাদের মানুষের সমান বুদ্ধিমান হতে হয়নি। গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবী আক্রান্তের সময় বহু প্রজাতির সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে যায় ডাইনোসরও। কিন্তু ডাইনোসরের বিলোপ যদি না হতো, তাহলে কি মানুষ টিকে থাকতে পারত ডাইনোসরের সঙ্গে? এটি বোধ হয় আরেকটা প্যারাডক্স। অর্থাৎ ভিনগ্রহে প্রাণ আছে কি নেই, সে বিতর্ক শেষ হওয়ার নয়। প্রাণ না থাকলে ভিনগ্রহীদের পৃথিবীতে আসা, উড়ন্ত সসারের আনাগোনাও ভিত্তিহীন হয়ে যায়। ধরে নিলাম, ভিনগ্রহে প্রাণ আছে। তাই বলে কি ইউএফও দেখার ঘটনাগুলো সত্যি?
মার্কিন সরকার কী বলছে? মার্কিন সরকার অজানা উড়ন্ত বস্তুর খবরটাকে উড়িয়ে দেয়নি। বরং সম্প্রতি ইউএফও–সংক্রান্ত গবেষণার কিছু ফাইল প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত থাকছে পরের লেখায়। তবে মার্কিন সরকার ইউএফও মানে ফ্লাইং সসার, সেটি মানতে নারাজ। বরং মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁরা স্বীকার করেন, কিছু না কিছু মার্কিন আকাশে দেখা যায়, এটি ঠিক। দুর্ভাগ্য হলো, তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আগে থেকে এগুলোর হদিস পায়নি। এটি ভিনগ্রহীদের যান হওয়ার চেয়ে শত্রুর নজরদারি কর্মকাণ্ড বলা ভালো। এগুলোর অস্তিত্ব আগেভাগে জানতে না পারাও নিজেদের গোয়েন্দা-ব্যর্থতা। এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে, পার্ল হারবার আক্রমণ কিংবা নাইন–ইলেভেন ঘটনার কথা গোয়েন্দারা আগেভাগে জানতে পারেননি। তার জন্য মার্কিনদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। ঠিক এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার বা গোয়েন্দা বাহিনী এসব ঘটনার ওপর নজর রাখে। অর্থাৎ মার্কিন সরকার যে ইউএফও নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করে, এটি সত্যি। তবে গুজব হিসেবে যেটা প্রচলিত, সেই এলিয়েনের কারণে এ গবেষণা নয়।
মার্কিন সরকার ইউএফও মানে ফ্লাইং সসার, সেটি মানতে নারাজ। বরং মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁরা স্বীকার করেন, কিছু না কিছু মার্কিন আকাশে দেখা যায়, এটি ঠিক।
তাহলে মানুষ যে গুজবের কথা বলে, সেগুলো কেন ছড়াল?
প্রথমেই আসা যাক বার্নি ও বেটি হিলের কথাই। তাঁরা দাবি করেছেন, সে রাতের চার ঘণ্টার কথা তাঁদের স্মরণে ছিল না। পাঁচ দিন পর মনে পড়ে। মনে পড়ল, তা–ও আবার ভিনগ্রহীদের কথা। বেটি হিলের ভাষ্য থেকে এলিয়েনের চেহারা–আকৃতি আলাদা কিছু মনে হয়নি। তাঁদের কথা থেকে মনে হয়, তাঁরা একদল মানুষের খপ্পরে পড়েছিলেন। তাঁরা যদি ভিনগ্রহীও হন, তাহলে সেগুলো দেখতে মানুষের মতোই ছিল।
তা ছাড়া বার্নি আর বেটির কথাবার্তার স্ববিরোধ ছিল। তাঁরা দাবি করেন, ইউএফও আর ভিনগ্রহী দেখে তাঁরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেটি যেভাবে ভিনগ্রহীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের বসবাস কোথায় জিজ্ঞাসা করেছেন, তাতে মনে হয় না ভয়ের ছিটেফোঁটাও ছিল। বেটি পরবর্তী জীবনে সেলিব্রিটিতে পরিণত হন, পত্রিকা আর টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেন, নানা জায়গায় বক্তব্যের জন্য ডাক আসে। এসব দেখেশুনে বোঝা যায়, খ্যাতি আর অর্থ—দুটিতেই তিনি ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন। সে জন্য চারটি ঘণ্টার হারানো সময় আর ইউএফওর কল্পনাটক ফাঁদলে মন্দ কী!
ফ্রেডরিকের ব্যাপারটার চাক্ষুষ কোনো প্রমাণ নেই। পাঁচ বছর পর তাঁর বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। ইউএফও গবেষক বলে দাবি করা লোকজন ছাড়া ফ্রেডরিকের দুর্ঘটনার জন্য আর কেউ ইউএফওর যোগসাজশ দেখেননি। এমনকি ফ্রেডরিকের বাবাও এর পেছনে ইউএফওর যোগসাজশ দেখেননি। তাহলে ফ্রেডরিক কেন ফ্লাইং সসার দেখার দাবি করেন। ফ্রেডরিকের বাবার মতে, ফ্রেডরিক ইউএফও নিয়ে ফ্যাসিনেটেড ছিলেন, ইউএফও বা উড়ন্ত সসার সম্পর্কে কোনো লেখা পেলে গোগ্রাসে গিলতেন। সংগ্রহ করতেন এ ধরনের বই। মোটকথা, ইউএফও নিয়ে বাতিকগ্রস্ত একজন তরুণ যখন দুর্ঘটনায় পড়ছেন, তখন তাঁর বিকারগ্রস্ত হয়ে হ্যালুসিনেশন হওয়া অবাস্তব কিছু নয়।
ফ্রেডরিকের বাবার মতে, ফ্রেডরিক ইউএফও নিয়ে ফ্যাসিনেটেড ছিলেন, ইউএফও বা উড়ন্ত সসার সম্পর্কে কোনো লেখা পেলে গোগ্রাসে গিলতেন। সংগ্রহ করতেন এ ধরনের বই।
বিখ্যাত স্ট্রিংতত্ত্ববিদ মিচিও কাকু তাঁর ফিজিকস অব দ্য ইমপসিবল বইয়ে ইউএফও দেখা নিয়ে নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা করেছেন। তিন বলতে চেয়েছেন, মানুষ যখন কোনো বিষয় খুব বেশি চর্চা করে, তখন সে–সংক্রান্ত নানা সিম্বলিক জিনিস দেখতে শুরু করে। সাধারণ কোনো উড়ন্ত বস্তুর ভেতরেও তখন ইউএফওর ছায়া দেখা অসম্ভব কিছু নয়। কাকু একটি মজার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন তাঁর লেখায়। এক হ্যালোইনের রাতে একটি রেডিও প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। সেই প্রোগ্রামে একদল ধারাভাষ্যকার এইচ জি ওয়েলসের ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি অবলম্বনে মঙ্গলবাসীদের পৃথিবী আক্রমণের খবর প্রচার করতে থাকে। সেই রাতে বহু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে অনেক লোক সে রাতে ইউএফও দেখার দাবি করেছিলেন পরদিন। অথচ পুরো ব্যাপারটাই ছিল সাজানো নাটক।
যার অস্তিত্ব নেই, মানুষ সে বিষয়ে কল্পনা করতে পারে না। তা নিয়ে হ্যালুসিনেশনও সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষ কল্পিত দানব ড্রাগনের অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও তার চেহারা কল্পনা করতে পারে। কারণ, বইয়ে, ম্যাগাজিনে বা টিভিতে তার ছবি দেখেছে। মানুষ বিগফুটও কল্পনা করতে পারে। তাই বিশ্বজুড়ে ড্রাগন বা বিগফুট দেখেছে দাবি করা মানুষের সংখ্যা কম নয়।
১৯৪৭ সালে আর্নল্ড উড়ন্ত চাকতির বর্ণনা দেওয়ার আগে উড়ন্ত চাকতি কেউ দেখেছেন, দাবি করা লোক পাওয়া যায় না। আর্নল্ড ভিনগ্রহীদের আকাশযানের চাকতি আকৃতির চেহারা জনমানসে দাঁড় করিয়ে দিলেন, তারপর রসওয়েলের বিমানবাহিনীর লোকেরা ফ্লাইং সসার দেখতে পেলেন! প্রশ্ন হতে পারে, এতে আর্নল্ডের লাভটা কী ছিল? খ্যাতি ও ইতিহাস। সত্যি হোক, মিথ্যা হোক, ইউএফওর সঙ্গে আর্নল্ডের নাম চিরতরে যোগ হয়েছে। উড়ন্ত চাকতি দেখার দাবি না করলে কে চিনত তাঁকে?
বিখ্যাত স্ট্রিংতত্ত্ববিদ মিচিও কাকু তাঁর ফিজিকস অব দ্য ইমপসিবল বইয়ে বলতে চেয়েছেন, মানুষ যখন কোনো বিষয় খুব বেশি চর্চা করে, তখন সে–সংক্রান্ত নানা সিম্বলিক জিনিস দেখতে শুরু করে।
সাত
গুজবে সবচেয়ে বড় লাভ একশ্রেণির নন–ফিকশন লেখকদের। যাঁরা পত্রিকায় রসিয়ে রসিয়ে গুজবকে বাস্তব বলে চালানোর চেষ্টা করেন নিজেদের পত্রিকার কাটতি বাড়াতে। একশ্রেণির লেখক আছেন, যাঁরা গুজবকে সত্যি বলে প্রমাণ করতে দিস্তার পর দিস্তা কাগজ খরচ করে বই লেখেন। মিথ্যা যুক্তিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে সত্যি ভাবতে বাধ্য করেন পাঠককে। তারপর একশ্রেণির বিজ্ঞানীর মুখ দিয়ে সেই গুজবের ব্যাখ্যা দেওয়ান। মজার ব্যাপার, সেসব বিজ্ঞানীর নামও কেউ শোনেনি। স্টিফেন হকিং, কিপ থর্ন, নিল ডিগ্র্যাস টাইসন কিংবা মিচিও কাকুর মতো বিজ্ঞানীদের কখনো বলতে শুনবেন না ইউএফও, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল কিংবা রসওয়েল দুর্ঘটনার সঙ্গে অলৌকিকতা বা ভিনগ্রহীদের যোগসাজশ আছে। এমনকি ভিনগ্রহের প্রাণ নিয়ে রীতিমতো যাঁরা তত্ত্ব দিয়েছেন, সেই ফ্রাঙ্ক ড্রেক কিংবা নিকোলাই কার্দাশেভও কখনো ইউএফও বা উড়ন্ত সসারের বিষয়টাকে সত্যি বলে দাবি করেননি।
পৃথিবীতে যত রহস্যময় ঘটনা আছে, সব কটির কিছু না কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। যেগুলোর ব্যাখ্যা এখন নেই, তার মানে এই নয়, ভবিষ্যতে ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। সমস্যাটা হলো গুজব ছড়ানোর গতি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছড়ানোর চেয়ে অনেক বেশি। আর গুজব বিশ্বাস করতে মাথা খাটানোর খুব একটা দরকার হয় না, দরকার হয় না বেশি ভাবাভাবিরও। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শুনতে ধৈর্য লাগে। সেই ধৈর্য সবার থাকে না।
এরিক ফন দানিকেনের মতো একশ্রেণির লেখক মানুষের এই মনস্তত্ত্বটিকে পুঁজি করে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেন। বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয় তাঁর বইয়ের কোটি কোটি কপি।
মোটকথা, বিজ্ঞানমনস্কতার অর্থ হুট করে কোনো কিছু বিশ্বাস না করা, গুজবে গা না ভাসানো। বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিরা নতুন কোনো তথ্য যখন জানতে পারেন, সেটি যেমন ফুৎকারে উড়িয়েও দেন না, তেমনি সঙ্গে সঙ্গে সেটি বিশ্বাসও করেন না। তাঁরা বরং অপেক্ষা করেন, যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, তারপর বৈজ্ঞানিক রেফারেন্স খুঁজে নিশ্চিত হয়ে তবেই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের পথে পা বাড়ান। গুজবে কান দেবেন না।