দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ১৬

মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।

অধ্যায় দুই

আনন্দে ভেসে বেড়ানো

৭. অনেক হয়েছে

২০ বছর বয়সেও রামানুজন ছিলেন বেশ স্থূল। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি এমনই ছিলেন। আকারে খাটো, ভরাট মুখের ওপর বসানো একটা বড়সড় নাক। মুখে বসন্তের হালকা দাগ। গোঁফ বা দাড়ির বালাই নেই। কপালটা কামানো। তার ওপর জ্বলজ্বল করছে লাল আর সাদা রঙের তিলক। মাথার বাকি ঘন কালো চুলগুলো পেছনে ঝুঁটি করে বাঁধা। সব মিলিয়ে তাঁকে বাস্তবের চেয়েও বেশি গোলগাল আর ভারিক্কি দেখাত।

কিন্তু রামানুজনের এই স্থূলতার মধ্যে কোনো আলসেমি বা জড়তা ছিল না। বরং তাঁর গড়নটা ছিল অনেকটা সুমো কুস্তিগির বা বুদ্ধমূর্তির মতো। ভারী হলেও তাতে একধরনের হালকা ভাব বা নমনীয়তা ছিল। তিনি মাথা উঁচু করে হাঁটতেন। হাঁটার মধ্যে একটা চনমনে ভাব থাকত। শরীরের ভরটা সামনের দিকে পায়ের আঙুলের ওপর দিয়ে চলতেন। তাঁর হাতগুলো ছিল লম্বা। হাতের তালু মখমলের মতো অবাক করা মসৃণ। কথা বলার সময় সরু আঙুলগুলো সব সময় নড়াচড়া করত।

তিনি যখন উত্তেজিত হয়ে কথা বলতেন, তখন শব্দগুলো যেন মুখ থেকে ছিটকে বের হতো। খাওয়ার সময়ও তাঁর কথার স্রোত থামত না। অথচ তিনি বেশ আয়েশ করেই খেতেন। মুখভর্তি খাবার নিয়েই তিনি কোনো আইডিয়া বলে যেতেন। সব সময় তাঁর কালো চোখ দুটো জ্বলজ্বল করত। মাঝেমধ্যে মনে হতো, তাঁর শরীরের বাকি সব অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে; পড়ে আছে শুধু চোখের ওই দীপ্তিটুকু।

রামানুজনের এই স্থূলতার মধ্যে কোনো আলসেমি বা জড়তা ছিল না। বরং তাঁর গড়নটা ছিল অনেকটা সুমো কুস্তিগির বা বুদ্ধমূর্তির মতো। ভারী হলেও তাতে একধরনের হালকা ভাব বা নমনীয়তা ছিল।

মাঝে মাঝে তিনি কলেজেও ঢুঁ মারতেন। এই কলেজই তাঁকে ফেল করিয়েছিল। তিনি হয়তো কোনো বই ধার করতে যেতেন বা কোনো প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করতে। আবার লেকচার শুনতেও যেতে পারেন। কোনো কাজ না থাকলে ঘুরে বেড়াতেন মন্দিরের আশপাশে।

কিন্তু বেশির ভাগ সময় রামানুজন বসে থাকতেন সারণগপানি সান্নিধি স্ট্রিটে, নিজের বাড়ির বারান্দায়। পা দুটো শরীরের সঙ্গে গুটিয়ে নিতেন। কোলের ওপর একটা বড় স্লেট বিছিয়ে পাগলের মতো লিখে যেতেন। শক্ত স্লেট ও পেন্সিলের খসখস শব্দ কানেই তুলতেন না তিনি।

শ্রীনিবাস রামানুজন
ছবি: উইকিপিডিয়া

রাস্তার কোলাহল, গবাদিপশুর ডাক, শাড়ি পরা নারীদের আনাগোনা, খালি গায়ে ঠেলাগাড়ি টানা পুরুষদের হাঁকডাক—কিছুই তাঁকে স্পর্শ করত না। এসবের মাঝখানে তিনি যেন এক প্রশান্তির দ্বীপে বসবাস করতেন। মানুষের কর্মব্যস্ততা তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে যেত, কিন্তু তাঁকে বিরক্ত করত না। তিনি ছিলেন একা এবং মুক্ত। সেই সব পরীক্ষার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত, যা তিনি দিতে চান না। অথবা সেসব বিষয় থেকে মুক্ত, যা তিনি পড়তে চান না।

দক্ষিণ ভারতের প্রধান ইংরেজি পত্রিকা দ্য হিন্দু ১৮৮৯ সালের এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিল, ‘ভারতীয় চরিত্রের মধ্যে পরোক্ষ গুণাবলির উদাহরণের অভাব নেই। ধৈর্য, ব্যক্তিগত মায়া-মমতা, নম্রতা সব সময়ই আমাদের মধ্যে প্রবল। কিন্তু যুগের পর যুগ ভারতমাতা তার সন্তানদের মধ্যে গর্ডন, গ্যারিবল্ডি বা ওয়াশিংটনের মতো কাউকে পায়নি... জীবনের সব ক্ষেত্রে হিন্দুদের দরকার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, সফল হওয়ার অদম্য জেদ এবং সেই প্রচেষ্টায় সবকিছু উৎসর্গ করার মানসিকতা।’

রাস্তার কোলাহল, গবাদিপশুর ডাক, খালি গায়ে ঠেলাগাড়ি টানা পুরুষদের হাঁকডাক—কিছুই রামানুজনকে স্পর্শ করত না। এসবের মাঝখানে তিনি যেন এক প্রশান্তির দ্বীপে বসবাস করতেন।

আপাতদৃষ্টিতে রামানুজনকে জাগতিক সাফল্যের প্রতি উদাসীন মনে হতে পারে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন সেই পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখকের চাওয়া আদর্শ মডেলের মূর্ত প্রতীক।

সফল হওয়ার জেদ এবং সেই প্রচেষ্টায় সবকিছু বিসর্জন দেওয়া হয়তো একটা অসুখী জীবনের রেসিপি হতে পারে। মাঝে মাঝে রামানুজন বারান্দায় উবু হয়ে থাকতেন। রাস্তার ধুলোয় খেলতে থাকা বাচ্চাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতেন। এক প্রতিবেশী সেই দৃষ্টিকে বর্ণনা করেছিলেন শূন্য, ফাঁকা চাউনি বলে। কিন্তু তাঁর ভেতরে তখন আগুন জ্বলছিল।

শ্রীনিবাস রামানুজন
ছবি: উইকিকোট

তিনি যখন খুব গভীরভাবে চিন্তা করতেন, তাঁর মুখটা কুঁচকে যেত। চোখ দুটো ছোট হয়ে আসত। কোনো কিছুর সমাধান বের করতে পারলে মাঝেমধ্যে নিজের সঙ্গেই কথা বলতেন। হাসতেন, খুশিতে মাথা নাড়তেন। কিন্তু ভুল করলে স্লেট পেন্সিলটা হাত থেকে রাখার ধৈর্যটুকুও তাঁর থাকত না। সাবলীল ভঙ্গিতে হাতের কনুইটা শরীরের দিকে ঘুরিয়ে নিতেন। কনুই দিয়েই স্লেটের লেখা মুছে ফেলতেন। কনুইটাই ছিল তাঁর ইরেজার।

রামানুজনকে ঠান্ডা মাথার ধীরস্থির মানুষ বলা যায় না। তিনি যেকোনো সমস্যায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন প্রচণ্ড উদ্দীপনা, প্রাণশক্তি আর তীব্র আগ্রহ নিয়ে।

রামানুজন যখন খুব গভীরভাবে চিন্তা করতেন, তাঁর মুখটা কুঁচকে যেত। চোখ দুটো ছোট হয়ে আসত। কোনো কিছুর সমাধান বের করতে পারলে মাঝেমধ্যে নিজের সঙ্গেই কথা বলতেন।

কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এমন এক যুবক, যে সারা দিন বাড়িতে বসে থাকে। যে দুটো কলেজ থেকে ফেল করে বের হয়েছে। যার কোনো চাকরি নেই। যে এমন সব আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে কথা বলে, যা খুব কম মানুষই বোঝে। আর এমন সব অঙ্ক করে, যা কেউ বোঝে না।

কার কী লাভ তাঁর এই কাজ দিয়ে? তিনি হয়তো জিনিয়াস, হয়তো-বা বদ্ধ পাগল। যা-ই হোক, জীবনের সাধারণ লক্ষ্য থেকে এত বিচ্ছিন্ন একটা কাজে নিজের সময় আর শক্তি নষ্ট করার মানে কী? একটা রেশমি কাপড়ের দোকানের সামান্য করণিক হিসেবে তাঁর বাবা কি নিজের এবং জগতের জন্য তাঁর চেয়ে বেশি ভালো কাজ করছেন না?

রামানুজন এমন সব অঙ্ক করতেন, যা কেউ বুঝতো না
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বাবা-মা তাঁকে সহ্য করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। তাঁরা বিরক্ত আরও অধৈর্য হয়ে উঠলেন। মা ভাবলেন, অনেক হয়েছে, আর না।

১৯০৮ সালের শেষের দিকে রামানুজের মা একটি বিশেষ অস্ত্র প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভারতীয় মনোবিজ্ঞানী আশিস নন্দী এই অস্ত্রকে বলেছেন, ‘ভারতীয়দের বহু যুগের পরীক্ষিত সাইকোথেরাপি—সম্বন্ধ করে বিয়ে।’

চলবে…