ধারাবাহিক
দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি - ১৮
মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।
২. দ্বারে দ্বারে
রামানুজন এখন আর স্কলারশিপ খুঁজছেন না, এমনকি গণিতবিদ হওয়ার সুযোগও নয়। তিনি খুঁজছেন শুধু একটা চাকরি, ভবিষ্যতের একটা সুযোগ, একটা নতুন জীবন। পরের দুই বছর চরম হতাশা তাঁকে পুরো দক্ষিণ ভারত চষে বেড়াতে বাধ্য করল। প্রথমে কুম্বকোনমকে ঘাঁটি বানিয়ে, পরে ধীরে ধীরে মাদ্রাজকে কেন্দ্র করে।
তিনি আবারও ট্রেনের যাত্রী হলেন। টিকিটের জন্য প্রায়ই বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের ওপর নির্ভর করতে হতো। ইংরেজদের জন্য ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস সিটের ভাড়া হয়তো খুব সস্তাই ছিল, কিন্তু রামানুজনের জন্য থার্ড ক্লাসের ভিড়ভাট্টায় চড়ে মাদ্রাজে যাওয়া-আসার ভাড়াই ছিল তাঁর বাবার এক সপ্তাহের বেতনের চেয়ে বেশি। এই টাকা দিয়ে প্রায় ১০০ পাউন্ড চাল কেনা যেত।
শুরুর দিকে তাঁর থাকার কোনো জায়গা ছিল না। তিনি বন্ধুদের বাড়িতেই থাকতেন। একবার এক বন্ধুর বাড়িতে থাকার জন্য জায়গা ভিক্ষা চাইলেন। বন্ধুটি তাঁকে এক বুড়ো সন্ন্যাসীর সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। ১৯১০ সালের দিকে তিনি বিশ্বনাথ শাস্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। একসময় কুম্বকোনমে তাঁকে পড়াতেন রামানুজন।
বিশ্বনাথ তখন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র, থাকতেন ভিক্টোরিয়া স্টুডেন্ট হোস্টেলে। লাল ও কালো ইটের তৈরি এই বিশাল হোস্টেলটির খিলান আর গম্বুজ দেখলে মনে হতো ইংল্যান্ড থেকে আস্ত দালানটাই তুলে আনা হয়েছে। সেখানে গিয়ে উঠলেন রামানুজন। প্রতিদিন সকালে সেখান থেকেই টিউশনির খোঁজে বের হতেন।
ইংরেজদের জন্য ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস সিটের ভাড়া হয়তো সস্তাই ছিল, কিন্তু রামানুজনের জন্য থার্ড ক্লাসের ভিড়ভাট্টায় চড়ে মাদ্রাজে যাওয়া-আসার ভাড়াই ছিল তাঁর বাবার এক সপ্তাহের বেতনের চেয়ে বেশি।
কিন্তু উদাসীন গৃহশিক্ষক হিসেবে তাঁর কুখ্যাতি বোধ হয় আগেই ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ তিনি বেশি ছাত্র পেতেন না। বিশ্বনাথ শাস্ত্রী পরে স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, “রাতে তিনি নিজের জীবনের দুর্দশা নিয়ে বিলাপ করতেন। তাঁকে যখন বলতাম তাঁর মতো প্রতিভাবান মানুষের দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই, একদিন স্বীকৃতি মিলবেই, তখন তিনি উত্তর দিতেন—‘গ্যালিলিওর মতো অনেক মহামানব ইনকুইজিশনে মারা গেছেন, আমার কপালেও দরিদ্র হয়ে মৃত্যু লেখা আছে।’ কিন্তু আমি তাঁকে উৎসাহ দিতাম, সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই সাহায্য করবেন।”
১৯১০ সালের শেষ দিকে রামানুজন ভেঙ্কটনারায়ণ লেনে থাকতেন, পরের বছরও সেখানেই ছিলেন। জায়গাটা ছিল সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনের লাল দালানগুলোর কাছে পার্ক টাউন এলাকা। এবার তিনি তাঁর কুম্বকোনমের দুই পুরোনো বন্ধু কে. নরসিংহ আয়েঙ্গার এবং তার ভাই কে. সারঙ্গপাণি আয়েঙ্গারের আশ্রয়ে ছিলেন। এই বন্ধুর কাছেই দশ বছর আগে পাটিগণিত পরীক্ষায় হেরে গিয়েছিলেন রামানুজন। কুম্বকোনমে থাকার সময় এই দুই ভাই মাঝেমধ্যে তাঁর কাপড়চোপড় ও ট্রেন ভাড়ার খরচ দিত। এখন তারা আবারও তাঁকে সাহায্য করল।
নরসিংহ ছিলেন মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজের ছাত্র। রামানুজন তাঁকে অঙ্ক শেখাতেন। এফএ পরীক্ষা কাছে আসতেই নার্ভাস ও হতাশ হয়ে পড়ছিল নরসিংহ। সে অঙ্কে মোটেও ভালো না। এমনকি পরীক্ষা না দেওয়ার কথাও ভেবেছিল। পরীক্ষার দিন রামানুজন পার্ক টাউন থেকে চার মাইল হেঁটে প্রেসিডেন্সি কলেজে গেলেন। সেখানে বন্ধুকে খুঁজে বের করে বুঝিয়ে পরীক্ষার হলে ঢোকালেন। সাহস দিয়ে শেষ মুহূর্তের কিছু টিপস দিলেন। সেদিন রামানুজন যা-ই বলুন না কেন, তাতে কাজ হয়েছিল। কোনোমতে পাস মার্ক পেয়ে উতরে গিয়েছিল নরসিংহ।
এই ঘটনার কিছুদিন পরেই রামানুজন ঘোড়ার গাড়িতে তাঁর পাচাইয়াপ্পা আমলের বন্ধু আর. রাধাকৃষ্ণ আইয়ারের দরজায় এসে হাজির হলেন। তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হয়তো বছরের শুরুতে করা সেই অপারেশনের ধকল সামলাতে পারছিলেন না। রাধাকৃষ্ণ তাঁকে আশ্রয় দিলেন, ভালো খাওয়াদাওয়া ব্যবস্থা করলেন, ডাক্তার দেখালেন। ডা. নারায়ণস্বামী জানালেন, রামানুজনের সার্বক্ষণিক সেবা-যত্ন দরকার। ফলে রাধাকৃষ্ণ তাঁকে বন্দরের কাছে বিচ স্টেশনে নিয়ে কুম্বকোনমের ট্রেনে তুলে দিলেন।
কিন্তু চলে যাওয়ার আগে রামানুজন এমন কিছু করলেন, যা সারা জীবন মনে রেখেছিলেন রাধাকৃষ্ণ। রামানুজন তাঁর দিকে ফিরে বললেন, ‘আমি যদি মারা যাই, দয়া করে এগুলো পাচাইয়াপ্পা কলেজের প্রফেসর সিঙ্গারাভেলু মুদালিয়ারকে অথবা মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজের ব্রিটিশ প্রফেসর এডওয়ার্ড বি রসকে দিও।’
কথাটা বলেই রামানুজন তাঁর হাতে তুলে দিলেন গণিতে ঠাসা দুটি বড় নোটবুক।
১৯১০ সালের শেষ দিকে রামানুজন ভেঙ্কটনারায়ণ লেনে থাকতেন, পরের বছরও সেখানেই ছিলেন। জায়গাটা ছিল সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনের লাল দালানগুলোর কাছে পার্ক টাউন এলাকা।
রামানুজনের নোটবুকগুলো এখন আর তাঁর গাণিতিক চিন্তার ব্যক্তিগত নোটবুক ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাতাগুলোর মানে বদলে গেল। আগের ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, এই নোটবুকগুলো হয়ে উঠল তাঁর ভবিষ্যতের সম্পদ, তাঁর উত্তরাধিকার, তাঁর চাকরির টিকিট। ওই খাতাগুলোই প্রমাণ করল, রামানুজন ব্যর্থ কেউ নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যার অসাধারণ মেধা পরীক্ষার খাতায় ধরা পড়েনি। তাঁর ইংরেজ বন্ধু নেভিলের ভাষায়, ‘এই খাতাগুলোই ছিল সেই প্রমাণ, যা দেখিয়ে বলা যায়, পরীক্ষায় ফেল করলেই কেউ অযোগ্য হয়ে যায় না।’ গণিতই রামানুজনের আসল শক্তি। সেই শক্তির সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে তার নোটবইগুলো।
প্রয়োজনের তাগিদে রামানুজ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে শুরু করলেন একটা চাকরি আশায়। ফটোগ্রাফারদের যেমন পোর্টফোলিও থাকে বা সেলসম্যানদের স্যাম্পল কেস, রামানুজনের বগলের নিচে তেমনি থাকত তাঁর নোটবুকগুলো। বিয়ের পর গত দেড় বছরে রামানুজন দারে দারে ঘোরা সেলসম্যানে পরিণত হয়েছেন। তাঁর বিক্রির পণ্য ছিল তিনি নিজেই।
ভারতে তখন (এবং এখনো) চাকরির জন্য সুন্দর করে লেখা দরখাস্তের চেয়ে সুপারিশ বেশি কাজে দিত। কোনো বন্ধু সুপারিশ নিয়ে সোজা বড় কোনো কর্তার দরজায় গিয়ে বসে পড়া যেত। দক্ষিণ ভারতের ঘরবাড়িগুলোর ভেতর ও বাইরের সীমারেখা যেমন অস্পষ্ট ছিল, সামাজিক জীবন ছিল তেমনই খোলামেলা। মহান ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করা খুব কঠিন কিছু ছিল না। দিন যতই ব্যস্ততায় কাটুক, একজন চাকরিপ্রার্থীর জন্য সময় ঠিকই বেরিয়ে যেত।
রামানুজনের ইংরেজ বন্ধু নেভিলের ভাষায়, ‘এই খাতাগুলোই ছিল সেই প্রমাণ, যা দেখিয়ে বলা যায়, পরীক্ষায় ফেল করলেই কেউ অযোগ্য হয়ে যায় না।’
রামানুজন সব সময় একই কথা বলতেন—বাবা-মা বিয়ে দিয়েছেন, একটা চাকরি দরকার। কোনো ডিগ্রি নেই, তবে নিজে কিছু গাণিতিক গবেষণা করেছি। মহামান্য স্যার, আমার এই নোটবুকগুলো যদি একটু দেখতেন…।
যে সমাজে ডিগ্রির কদর ছিল সবচেয়ে বেশি, সেখানে এই নোটবুকগুলোই ছিল তাঁর একমাত্র সম্বল। যেখানে লেটারহেডে ডিগ্রির উল্লেখ থাকত, পরিচয়ের সময় ডিগ্রির কথা বলা হতো; সেখানে রামানুজনের পরিচয় ছিল বেকার এবং ফেল করা ছাত্র। একজন বিখ্যাত গণিত প্রফেসর তাঁকে মুখের ওপরই বলে দিয়েছিলেন, বিএ ডিগ্রি ছাড়া তিনি জীবনে কিছু করতে পারবেন না।
তাই নিজেকে বিক্রি করা বা প্রমাণ করা ছিল রামানুজনের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ। কিন্তু দক্ষিণ ভারত চষে বেড়ানোর সময় তিনি এমন কিছু গুণের পরিচয় দেন, যা মানুষকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে বাধ্য করত। মানুষ তাঁকে পছন্দ করত।
মাদ্রাজে তাঁকে যারা চিনেছিল, তাদের মধ্যে একজন পরে বলেন, ‘তিনি ছিলেন খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ও মিশুক। সব সময় মজা করতেন। তামিল ও ইংরেজি শব্দ নিয়ে কৌতুক করতেন, জোকস বলতেন। মাঝে মাঝে বড় গল্প বলতেন এবং নিজেই হাসিতে ফেটে পড়তেন। হাসতে হাসতে তাঁর মাথার ঝুঁটি খুলে যেত। গল্প বলতে বলতেই তা আবার বেঁধে নিতেন। মাঝেমধ্যে পাঞ্চ লাইন বলার আগেই হাসতে শুরু করতেন। গল্প গুলিয়ে ফেলতেন, আবার শুরু করতেন। তিনি ছিলেন প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তাঁর চোখ দুটো ছিল দুষ্টুমিতে ভরা, উজ্জ্বল। যেকোনো বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলতে পারতেন। তাঁকে পছন্দ না করা কঠিন ছিল।’
যেখানে লেটারহেডে ডিগ্রির উল্লেখ থাকত, পরিচয়ের সময় ডিগ্রির কথা বলা হতো; সেখানে রামানুজনের পরিচয় ছিল বেকার এবং ফেল করা ছাত্র।
রামানুজন হয়তো খুব সামাজিক ছিলেন না, কিন্তু তাঁকে দেখলে লাজুক মনে হতো। অনেক বন্ধুর মাঝেও তাঁর মিশুক স্বভাবটা বেরিয়ে আসত। তিনি সামাজিক রীতিনীতি বা অন্যের মেজাজ বোঝার ব্যাপারে খুব দক্ষ ছিলেন না। তাঁর কুম্বকোনমের সহপাঠী এন. হরি রাও বলেছেন, ‘তিনি নোটবুক খুলে আমাকে জটিল সব উপপাদ্য ও সূত্র বোঝাতেন, ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করতেন না যে ওসব আমার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।’ একবার গণিতে ডুবে গেলে তিনি ভুলে যেতেন সামনে কে বসে আছে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই সামাজিক অদক্ষতাই তাঁর মধ্যে একধরনের মুগ্ধতা তৈরি করত। কারণ এর উল্টো পিঠেই ছিল এক নিষ্পাপ সরলতা, অকৃত্রিমতা। এগুলোই সবাই লক্ষ্য করত।
রামানুজনের হাইস্কুল সহপাঠী—যিনি পরে গণিতের প্রফেসর হয়েছিলেন—এন. রঘুনাথন বলেছিলেন, ‘রামানুজন এতই সরল ছিলেন যে তাঁর সঙ্গে কেউ কখনো খারাপ ব্যবহার করতে পারত না। তাঁর রসিকতা ছিল খুব সাধারণ মানের। তাঁর বিনোদন ছিল পুতুলনাচ অথবা গ্রামের যাত্রাপালার মতো। তিনি বন্ধুদের সঙ্গে সারা রাত জেগে থাকতেন এবং জোকস বলতেন।’
মনের কথা মুখে বলতেন তিনি। তাঁর মধ্যে এমন এক নিরহংকার ও স্বচ্ছ ব্যাপার ছিল, যা সব অবিশ্বাস গলিয়ে দিতে পারে। মানুষ তাঁকে পছন্দ করত, সাহায্য করতে চাইত।
কুম্বকোনমে সেই বৃদ্ধা মহিলা যিনি তাঁকে খাওয়াতেন, তিনি গণিতের কিছুই বুঝতেন না। কিন্তু রামানুজনের চোখের সেই দীপ্তি এবং কোনো কিছুর প্রতি তাঁর মগ্নতাই তাঁকে বৃদ্ধার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। এই অকৃত্রিম মগ্নতাই অন্যদের আকৃষ্ট করত।
রামানুজন অনেক বিবেচনা বোধসম্পন্ন ছিলেন বলে যে মানুষ তাঁকে পছন্দ করত, বিষয়টা তেমন নয়। তারা তাঁর গণিত বুঝত না, কেউ কেউ হয়তো পাগল ভাবত; অনেকেই তাঁকে সাহায্য করতে পারেনি, কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে সবাই তাঁকে ভালোবেসেছিল।
