ধারাবাহিক
দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি - ১৯
মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।
১৯১০ সালের শেষ দিকে রামানুজন কুম্বকোনম থেকে উত্তরের ট্রেন ধরলেন। মাদ্রাজ যাওয়ার মাঝপথে ভিল্লুপুরম স্টেশনে নামলেন। সেখান থেকে ট্রেন বদলে গেলেন ২০ মাইল পশ্চিমে তিরুকৈলুর শহরে। ৯ হাজার জনসংখ্যার এই শহরটি ছিল জেলার সদর দপ্তর। সেখানে ভি. রামস্বামী আইয়ার ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কাজ করতেন। রামস্বামীর কাছে যাওয়ার বিশেষ কারণ ছিল, তিনি একজন গণিতবিদ এবং সম্প্রতি ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা। সবাই তাঁকে প্রফেসর বলে ডাকত। যদিও তিনি কোনো কলেজের শিক্ষক ছিলেন না। ছাত্রাবস্থায় তিনি ইংল্যান্ডের এডুকেশনাল টাইমস-এ গাণিতিক প্রবন্ধ লিখতেন এবং সম্পাদকেরা তাঁকে প্রফেসর ভেবে সম্বোধন করতেন। সেই নামটাই রয়ে গেছে।
বরাবরের মতো রামানুজন নোটবুক বগলে হাজির হলেন। প্রফেসর সেটা দেখলেন। তিনি ছিলেন জ্যামিতিক বিশেষজ্ঞ। কিন্তু তাঁর সামনে রামানুজন যে গণিত রাখলেন, তা ছিল অনেকটাই অচেনা। তবুও অনেকদিন পর স্মৃতি হাতরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তাঁর নোটবুকের অসাধারণ গাণিতিক ফলাফল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।’
এর মানে কি তিনি রামানুজনকে চাকরি দিয়েছিলেন? মোটেই না। পরে তিনি লিখেছিলেন, ‘রাজস্ব বিভাগের নিচু পদের চাকরিতে তাঁর প্রতিভাকে নষ্ট করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না।’ তাই তিনি রামানুজনকে মাদ্রাজে তাঁর গণিতবিদ বন্ধুদের কাছে সুপারিশপত্র দিয়ে পাঠিয়ে দেন।
প্রফেসর যাদের কাছে রামানুজনকে সুপারিস করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন পি. ভি. শেষু আইয়ার। চশমা পরা এই মানুষটি আগে গভর্নমেন্ট কলেজে রামানুজনের প্রফেসর ছিলেন। ১৯০৬ সালের পর তাঁদের আর দেখা হয়নি। এখন চার বছর পর শেষু আইয়ার মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে চলে এসেছেন। রামানুজন সেখানে নোটবুক হাতে দেখা করলেন। তবে এবার সঙ্গে ছিল রামস্বামী আইয়ারের সুপারিশপত্র। শেষু আইয়ারের কাছ থেকে তিনি আরও কিছু সুপারিশ ও যোগাযোগের ব্যবস্থা করে বের হলেন।
ডেপুটি কালেক্টর ভি. রামস্বামী আইয়ার লিখেছিলেন, ‘রাজস্ব বিভাগের নিচু পদের চাকরিতে তাঁর প্রতিভাকে নষ্ট করার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না।’
এরপর গেলেন এস. বালকৃষ্ণ আইয়ারের কাছে। তিনি তখন সাইদাপেটের টিচার্স কলেজে গণিতের লেকচারার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। রামানুজন তাঁকে অনুরোধ করলেন, তাঁর ইংরেজ বস মিস্টার ডডওয়েলের কাছে একটা কেরানির চাকরির জন্য সুপারিশ করতে। বেতন যত কমই হোক, যেকোনো চাকরিই তাঁর চলবে।
বালকৃষ্ণ তাঁকে কফি খাওয়ালেন, নোটবুক দেখলেন এবং যথারীতি কিছুই বুঝলেন না। পরে রামানুজনের হয়ে তিন-চারবার ডডওয়েলের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। বালকৃষ্ণ পরে দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমি যথেষ্ট বড় কেউ ছিলাম না’। অর্থাৎ প্রভাব খাটানোর মতো ক্ষমতা তাঁর ছিল না।
ডিসেম্বরে রামানুজন গেলেন আর. রামচন্দ্র রাওয়ের কাছে। তিনি সত্যিই যথেষ্ট বড় মাপের মানুষ ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করে মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রভিন্সিয়াল সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। এখন তিনি নেলোর শহরের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর। সে বছরই দেওয়ান বাহাদুর উপাধি পেয়েছেন। ব্রিটিশদের নাইট উপাধির সমান এ উপাধি। এত কিছুর পরেও তিনি ছিলেন একজন গণিতবিদ, ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির সেক্রেটারি, প্রচুর অর্থ ও ক্ষমতার মালিক। ভারতে কাজ উদ্ধারের জন্য রামচন্দ্র রাও ছিলেন একদম পারফেক্ট অভিভাবক।
রামানুজন ঠিক কীভাবে তাঁর দেখা পেয়েছিলেন, তা পরিষ্কার নয়। তবে সবাই একমত যে রামচন্দ্র রাওয়ের ভাগ্নে আর. কৃষ্ণ রাও ছিলেন শেষ মাধ্যম। বন্ধু রাধাকৃষ্ণ বলেছিলেন, তিনি তাঁর শ্বশুরের মাধ্যমে ব্যবস্থা করেছেন। শেষু আইয়ার দাবি করেছিলেন, তিনি পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন।
ডিসেম্বরে রামানুজন গেলেন আর. রামচন্দ্র রাওয়ের কাছে। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করে মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রভিন্সিয়াল সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন।
আর নেভিল পরে অনুমান করেছিলেন, শেষু আইয়ার চিঠি দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু রামানুজন হয়তো সেটা ব্যবহার করতে লজ্জা পাচ্ছিলেন। হয়তো এই প্রভাবশালী মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে তাঁর একটু বাড়তি ধাক্কার দরকার ছিল। আর সেই ধাক্কাটা দিয়েছিলেন সি. ভি. রাজাগোপালাচারি।
রাজাগোপালাচারি রামানুজনের চেয়ে মাত্র কয়েক মাসের বড়। একই শহরে বড় হয়েছেন, একই স্কুলে পড়েছেন। ১৯০২ সালে স্কুলের টিফিনের সময় ক্লাসের এক বড় ভাই রাজাগোপালাচারিকে একটা অঙ্ক দিয়েছিলেন রামানুজনকে দিয়ে করানোর জন্য। রামানুজন যদি এতই স্মার্ট হয়, তাহলে এটা সমাধান করে দেখাক। প্রশ্নটা এমন:
√x + y = 7
√y + x = 11
দেখতে সাধারণ দুই চলকের সমীকরণ মনে হলেও এটি ছিল জটিল চতুর্থ ঘাতের সমীকরণ। যেকোনো সাধারণ ১৪ বছরের কিশোরের জন্য এটা অত্যন্ত কঠিন। রাজাগোপালাচারি পরে বলেছিলেন, ‘আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না যখন রামানুজন আধা মিনিটের মধ্যে মাত্র দুই ধাপে উত্তর বলে দিয়েছিলেন।’
আসলে রামানুজন সম্ভবত অঙ্কটা কষে বের করেননি। তিনি শুধু তাকিয়েছিলেন এবং অনুমান করেছিলেন যে উত্তরটা এমন হবে। মনে মনে কয়েকটা সম্ভাবনা যাচাই করতেই সমাধানটা তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। সমাধান x = 9, y = 4। এটা ছিল গাণিতিক অন্তর্দৃষ্টির খেলা। তবুও রাজাগোপালাচারি মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁরা বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন।
বছর গড়াতে রাজাগোপালাচারি আইনজীবী হওয়ার চেষ্টা করলেন। রামানুজন তখন হাবুডুবু খাচ্ছেন। তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু এখন, ১৯১০ সালে, প্রায় এক দশক পর মাদ্রাজে হঠাৎ তাঁদের দেখা হলো।
রাজাগোপালাচারি পরে বলেছিলেন, ‘আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না যখন রামানুজন আধা মিনিটের মধ্যে মাত্র দুই ধাপে উত্তর বলে দিয়েছিলেন।’
হতাশ রামানুজন বন্ধুকে তাঁর ব্যর্থতার কথা জানালেন। বললেন, তাঁর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কেউ তাঁকে মূল্যায়ন করে না। তিনি বোম্বের বিখ্যাত গণিতবিদ প্রফেসর সালধানাকে ও ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটিকে চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। তাই এক বন্ধুর দেওয়া টিকিটে তিনি আজ রাতেই কুম্বকোনম ফিরে যাচ্ছেন।
রাজাগোপালাচারি রামানুজনকে যেতে দেয়নি। রামানুজন হয়তো তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর কাছে রামচন্দ্র রাওয়ের একটা চিঠি আছে, কিন্তু তিনি সেটা ব্যবহার করেননি। রাজাগোপালাচারি তখন নিজেই তাঁকে রামচন্দ্রের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। রামানুজনের তখন মাদ্রাজে থাকার টাকাও ছিল না। বন্ধুই তাঁকে নিজ খরচ মাদ্রাজে রাখার ব্যবস্থা করেন।
অবশেষে রামচন্দ্র রাওয়ের সঙ্গে দেখা হলো। রামচন্দ্র রাও পরে সেই সাক্ষাতের বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবে:
“কয়েক বছর আগে আমার এক ভাগ্নে—যে গণিতের কিছুই বোঝে না—আমাকে বলল, ‘মামা, আমার এক দর্শনার্থী আছে যে গণিত নিয়ে কথা বলে। আমি তার কিছুই বুঝি না। তুমি কি দেখবে তার কথার কোনো মূল্য আছে কি না?’ আমার গাণিতিক জ্ঞানের অহমিকায় রামানুজনকে আমার সামনে আসার অনুমতি দিলাম। খাটো, অদ্ভুত দর্শন চেহারা, মোটা, না-কামানো দাড়ি, বেশি পরিষ্কার নয়। কিন্তু একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো, তার জ্বলজ্বলে চোখ। বগলে একটা জীর্ণ নোটবুক নিয়ে সে ঘরে ঢুকল।”
রামানুজন বললেন, কেউ তাঁকে মূল্যায়ন করে না। তিনি বোম্বের বিখ্যাত গণিতবিদ প্রফেসর সালধানাকে ও ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটিকে চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।
রাজাগোপালাচারির মতে, রামানুজন তিনবার সেই মহান ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। প্রথমবার রামচন্দ্র রাও কয়েক দিনের জন্য রামানুজনের কাগজপত্র রাখতে চাইলেন। দ্বিতীয়বার তিনি বললেন, তিনি রামানুজনের মতো উপপাদ্য আগে কখনো দেখেননি। কিন্তু যেহেতু তিনি এগুলোর আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছেন না, তাই আশা করেন এগুলো নিয়ে রামানুজন তাঁকে আর বিরক্ত করবেন না।
কিন্তু রামানুজন তাঁকে আবার বিরক্ত করেছিলেন।
তৃতীয়বার রামচন্দ্র রাও সোজাসাপ্টা বললেন, রামানুজন হয়তো আন্তরিক, কিন্তু তিনি যদি নৈতিক প্রতারক নাও হন, তবে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারক। অর্থাৎ, রামচন্দ্র রাও সন্দেহ প্রকাশ করলেন, রামানুজন নিজেই জানেন না তিনি কী নিয়ে কথা বলছেন।
তাঁর দুই বন্ধু ফিরে আসতে চাইলে রামানুজন বোম্বের বিখ্যাত গণিতবিদ প্রফেসর সালধানার সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রের কথা উল্লেখ করলেন। সালধানাও বলেছিলেন তিনি সাহায্য করতে পারবেন না। কিন্তু রামানুজনের পাঠানো কাগজের মার্জিনে তিনি লিখেছিলেন, সূত্রগুলো সত্যিই কৌতূহলউদ্দীপক। সমস্যা হলো, এত অচেনা বিষয়ের ওপর কাজ করা কারও পেছনে তিনি তাঁর নিজের খ্যাতি বাজি রাখতে চান না।
এটা খুব বড় কোনো প্রশংসা নয়। রামানুজন সারা জীবন এসব কথাই শুনতে হয়েছে—‘তোমার কাজ বোঝা যাচ্ছে না, তুমি জিনিয়াস নাকি পাগল তা-ও বলা যাচ্ছে না’। সালধানার কথাও এর চেয়ে খুব ভিন্ন কিছু ছিল না। রামচন্দ্র রাও একই কথা বললেন। শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তিনি রামানুজনকে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সালধানার মন্তব্যে অন্তত এটুকু পরিষ্কার, রামানুজন আর যা-ই হোন, পাগল নন।
তৃতীয়বার রামচন্দ্র রাও সোজাসাপ্টা বললেন, রামানুজন হয়তো আন্তরিক, কিন্তু তিনি যদি নৈতিক প্রতারক নাও হন, তবে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারক।
নাছোড়বান্দা রাজাগোপালাচারির জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। তিনি সালধানার মন্তব্য ব্যবহার করে রামচন্দ্র রাওয়ের সন্দেহ দূর করার সুযোগ দেখলেন। তাঁরা চতুর্থবারের মতো ফিরে গেলেন। রামানুজনের ভাগ্য তখন সুতায় ঝুলছে। প্রথমে রামচন্দ্র রাও রেগে গেলেন। কিন্তু তারপর তাঁকে সালধানার চিঠি এবং রামানুজনের কিছু সহজ কাজ দেখানো হলো।
রামচন্দ্র রাও পরে লিখেছিলেন, ‘এগুলো প্রচলিত বইয়ের জ্ঞানের বাইরে ছিল। আমার আর সন্দেহ রইল না যে তিনি অসাধারণ মানুষ। তারপর ধাপে ধাপে তিনি আমাকে উপবৃত্তীয় ইন্টিগ্রাল ও হাইপারজিওমেট্রিক সিরিজের জগতে নিয়ে গেলেন। সবশেষে তাঁর ডাইভারজেন্ট সিরিজ আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে বাধ্য করল। ডাইভারজেন্ট সিরিজ তখনো পৃথিবীর কাছে অপরিচিত। শেষে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি কী চান।’
রামানুজন উত্তর দিলেন, তিনি বেঁচে থাকার এবং কাজ করার জন্য সামান্য কিছু টাকা চান। রামচন্দ্র রাওয়ের ভাষায়, ‘তিনি অবসর চান। সহজ কথায়, তিনি চান কোনো পরিশ্রম ছাড়াই যেন তাঁকে সাধারণ খাবারটুকু দেওয়া হয়, যাতে তিনি তাঁর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।’
