দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ২১

মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।

তৃতীয় অধ্যায়

পৃষ্ঠপোষকের সন্ধানে

[১৯০৮ থেকে ১৯১৩]

৪. জ্যাকব বার্নোলি ও তাঁর সংখ্যা

পাঁচ বছর আগের ঘটনা। ১৯০৬ সালের শেষ দিকে মাদ্রাজ, মাইশোর, কোয়েম্বাটুরসহ দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন কলেজের অধ্যাপকদের কাছে একটি চিঠি আসে। চিঠির লেখক ভি. রামস্বামী আইয়ার। তিনি ‘ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি’ নামে একটি সমিতি বানানোর প্রস্তাব দেন।

এই প্রস্তাবের পেছনে ছিল এক ধরনের অভাববোধ। রামানুজন হাতেগোনা যে কয়টা বই পেতেন, তার ওপরই নির্ভর করেই কাজ করতেন। ভারতের অন্য গণিতবিদদের অবস্থাও তেমনই। ইউরোপ বা আমেরিকার উন্নত জার্নাল বা বই তাঁদের হাতে পৌঁছাত না। রামস্বামীর পরিকল্পনা ছিল, এই সমিতির চাঁদা দিয়ে বিদেশি বই ও জার্নাল কিনে সদস্যদের দেবেন। বছরে মাত্র হাফ ডজন মানুষ পঁচিশ রুপি করে চাঁদা দিলেই সমিতির কাজ শুরু করা যায়।

শেষ পর্যন্ত সমিতির যাত্রা শুরু হয় ২০ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে। সবাই গণিতচর্চার জন্য ক্ষুধার্ত ছিলেন। প্রথমে এর নাম দেওয়া হয় অ্যানালিটিক্যাল ক্লাব। পরে নাম বদলে রাখা হয় ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি। শিগগিরই তারা নিজেদের একটি জার্নাল বের করল। বারো বছরের মাথায় ক্লাবের সদস্য দাঁড়াল ১৯৭ জন। তখন তাদের সংগ্রহে ছিল ৩৫টি ইউরোপীয় ও আমেরিকান জার্নাল।

এ তো গেল আধুনিক কালের কথা। কিন্তু ব্রিটিশরা আসার হাজার হাজার বছর আগেও ভারতীয়রা গণিতচর্চা করত। সপ্তম শতাব্দীর আগে পশ্চিমের দেশগুলো যখন রোমান সংখ্যার গোলকধাঁধায় আটকে ছিল, ভারত তখন আধুনিক সংখ্যাপদ্ধতি চালু করে ফেলেছে। বিশেষ করে শূন্যের আবিষ্কার ছিল তাদের বিশাল অর্জন। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে শূন্যের ধারণা জন্মালেও বইয়ে স্থান পায় তৃতীয় শতাব্দীতে। নবম শতাব্দীতে গোয়ালিয়রের এক মন্দিরের দেয়ালে শূন্যের স্পষ্ট ব্যবহার পাওয়া গেছে। সেখানে একটি ফুলের বাগানের দৈর্ঘ্য ২৭০ একক বোঝাতে শূন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।

সপ্তম শতাব্দীর আগে পশ্চিমের দেশগুলো যখন রোমান সংখ্যার গোলকধাঁধায় আটকে ছিল, ভারত তখন আধুনিক সংখ্যাপদ্ধতি চালু করে ফেলেছে।

ভারতীয় গণিত চর্চার মূলে ছিল বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান। বৈদিক অনুষ্ঠানের সঠিক সময় বের করতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব লাগত। আর গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ঠিক করতে লাগত বীজগণিত, জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতি। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া আর্যভট্ট পাইয়ের নির্ভুল মান বের করেছিলেন। তারও ১৫০ বছর পরে এসে ব্রহ্মগুপ্ত এমন সব উপপাদ্য রেখে গেছেন, যা আজও তাঁর পরিচয় বহন করে।

ভারতের এই ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ছিল, কিন্তু গ্রিসের চেয়ে একদম আলাদা। গ্রিকরা, বিশেষ করে ইউক্লিড জোর দিতেন আনুষ্ঠানিক প্রমাণে; স্কুলের জ্যামিতিতে আমরা ধাপে ধাপে যে উপপাদ্য প্রমাণ করি, সেই পদ্ধতিতে। কিন্তু ভারতীয়রা জোর দিত ফলাফলের ওপর। সেই ফলাফল কীভাবে এল তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং কী এল, তা মুখ্য।

আনুষ্ঠানিক প্রমাণের ছাঁকনি না থাকায় ভারতীয় গণিত ছিল মিশ্র ধরনের। কিছু জিনিস ছিল একদম নিখুঁত, আবার কিছু একেবারে ভুল। ভারত নিয়ে লেখা এক বইয়ে জনৈক মুসলিম লেখক লিখেছেন, ‘হিন্দু গণিত হলো মুক্তার খোলস ও টক খেজুরের মিশ্রণ...দামি স্ফটিক ও সাধারণ নুড়িপাথরের জগাখিচুড়ি।’ অর্থাৎ ভালো-মন্দ মিলিয়েই ছিল ভারতীয় গণিত।

বিংশ শতকে সেই মুক্তা ও স্ফটিকগুলো চাপা পড়ে যায় কালের ধুলোয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারত গণিতের ময়দানে টিকে থাকলেও, এখন তা শুধুই ইতিহাস। ইদানীং তারা বিশ্বের গণিতের ভাণ্ডারে তেমন কিছু যোগ করতে পারেনি।

ভারত নিয়ে লেখা এক বইয়ে জনৈক মুসলিম লেখক লিখেছেন, ‘হিন্দু গণিত হলো মুক্তার খোলস ও টক খেজুরের মিশ্রণ...দামি স্ফটিক ও সাধারণ নুড়িপাথরের জগাখিচুড়ি।’

শুধু উপমহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে কেরালার একদল প্রতিভাধর গণিতবিদ সেই অন্ধকারের মাঝে কিছুটা আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল। ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির জন্ম হয়তো নতুন কোনো রেনেসাঁ নিশ্চিত করতে পারত না, প্রতিষ্ঠাতারাও নিশ্চয়ই তেমন কোনো আশা করেননি। তাঁরা পশ্চিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে উন্মুখ ছিলেন। কারণ তাঁরা জানতেন, অতীতের বন্দনা গেয়ে বর্তমানের ঘাটতি মেটানো যাবে না।

ঠিক এই সময় রামানুজন গণিতবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯১১ সালে ধীরে ধীরে ডানা মেলতে শুরু করল তাঁর নতুন এক জগৎ। আগের বছরই চাকরির খোঁজে তিরুকৈলুর গিয়ে সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা রামস্বামী আইয়ারের সঙ্গে দেখা করেছেন। এখন রামস্বামী আইয়ারের নতুন জার্নালের তৃতীয় ভলিউমে প্রকাশিত হচ্ছে রামানুজনের গবেষণা। অন্য অনেক গণিত পত্রিকার মতো এই জার্নালেও পাঠকদের জন্য থাকত চ্যালেঞ্জিং ধাঁধা।

রামানুজন সেখানে দুটি প্রশ্ন দেন। তার মধ্যে ২৮৯ নম্বর প্রশ্নটি তুলনামূলক সহজ।

তিনি পাঠকদের কাছে জানতে চান—ওপরের সমীকরণের মান কত?

প্রশ্নটা দেখতে সাধারণ পাটিগণিতের মতো মনে হলেও এই সমীকরণে কোনো x বা y নেই, শুধুই সংখ্যা। সমীকরণের প্রকাশের পর ৬ মাসে আরও তিনটি নতুন জার্নাল এল, কিন্তু কেউ রামানুজনের প্রশ্নের সমাধান দিতে পারেনি। শেষে রামানুজন নিজেই এর উত্তর পাঠান। মূল সমস্যাটা লুকিয়ে আছে শেষের তিনটি ছোট বিন্দুতে (...)। এই তিনটি বিন্দুর মানে বর্গমূলের এই ধারাটি অসীম পর্যন্ত চলবে।

১৯১১ সালে ধীরে ধীরে ডানা মেলতে শুরু করল রামানুজনের নতুন এক জগৎ। আগের বছরই চাকরির খোঁজে তিরুকৈলুর গিয়ে সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা রামস্বামী আইয়ারের সঙ্গে দেখা করেছেন।

বহু বছর আগে একটি সাধারণ উপপাদ্যের উদাহরণ হিসেবে এই সমস্যাটি তৈরি করেছিলেন রামানুজন। তাঁর প্রথম নোটবুকের ১০৫ নম্বর পৃষ্ঠায়, ১২ নম্বর অধ্যায়ের চতুর্থ সমীকরণটি ছিল এরকম:

এই সমীকরণের মানে, যেকোনো সংখ্যাকে x, n ও a দিয়ে ভাগ করলে ওই সংখ্যাকে অসীম বর্গমূলের ধারায় প্রকাশ করা যায়। যেমন, ৩-কে (x + n + a) হিসেবে কল্পনা করা যায়, যেখানে x = ২, n = ১ এবং a = ০। এই মানগুলো সমীকরণে বসালে ২৮৯ নম্বর প্রশ্নটা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, ওই অঙ্কটার উত্তর ছিল ৩। তবে রামানুজনের ওই বিশেষ সমীকরণ ছাড়া এটা বের করা সম্ভব ছিল না।

রামানুজনের আপাত কঠিন এই সমস্যাটি তাঁকে বরাবরই মুগ্ধ করত। এই প্রশ্নটি যদি অসীম না হয়ে ১০, ১০০ কিংবা ১০০০ পর্যন্ত গিয়ে থেমে যেত, তাহলে খুব সহজেই কেউ ক্যালকুলেশন করে উত্তর বের করতে পারত। কিন্তু রামানুজনের প্রশ্নটা ছিল অসীম সিরিজ নিয়ে। অর্থাৎ এই সিরিজ কখনো শেষ হবে না। এর বর্গমূলের সংখ্যাও অসীম।

এক অর্থে এটা ছিল স্ববিরোধী কথা। কোনো সংখ্যা কীভাবে অসীমের সমান হতে পারে? অসীম তো এমন কোনো জায়গা নয়, যেখানে পৌঁছানো যায়, কিংবা এমন কোনো সংখ্যা নয়, যা সমীকরণে বসানো যায়। তাই কোনো গাণিতিক রাশি অসীমে গিয়ে কেমন আচরণ করবে, তা বোঝা মানে এক অজানা জগৎ দেখার চেষ্টা করা।

রামানুজনের চেয়ে গভীরভাবে এই জগৎকে কেউ খোঁজেনি, কেউ চেনেনি।

রামানুজনের প্রশ্নটা ছিল অসীম সিরিজ নিয়ে। অর্থাৎ এই সিরিজ কখনো শেষ হবে না। এর বর্গমূলের সংখ্যাও অসীম।

গণিতের অনেক প্রক্রিয়াকে অসীম পর্যন্ত টেনে নেওয়া যায়। ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি জার্নালে রামানুজনের সমস্যাটি ছিল বর্গমূলের ভেতরে বর্গমূল নিয়ে। তখনও এ বিষয় নিয়ে খুব বেশি চর্চা হয়নি, এখনো না। কিন্তু রামানুজন ভগ্নাংশের ভগ্নাংশ নিয়েও গবেষণা করতেন। সবকিছুর ওপরে ছিল ইনফিনিটি সিরিজ। তাঁর নোটবুকের প্রায় প্রতিটি পাতায় ইনফিনিটির দেখা মিলত। ১৯১১ সালের পরে জার্নালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বড় গবেষণাপত্রেও এর ছড়াছড়ি ছিল। এক গণিতবিদ লিখেছিলেন, ‘রামানুজনের প্রথম প্রেম ইনফিনিটি সিরিজ।’

অসীম ধারার উপস্থিতি বোঝাতে তিনটি বিন্দু (...) ব্যবহার করা হয়। রামানুজন প্রায়ই সংক্ষেপে লিখতেন ‘&c’। মানে সংখ্যাগুলো একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মেনে অনন্তকাল ধরে যোগ হতে থাকবে। যেমন:

১ + ২ + ৩ + ...

এখানে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে পরের সংখ্যাটি হবে ৪, তারপর ৫, এবং এভাবে চলতেই থাকবে।

তবে এটা বেশি মজার নয়। কারণ অসীম সংখ্যক সংখ্যা যোগ করলে যোগফলও অসীমই হবে। কিন্তু অসীম ধারা তখনই আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন এগুলো অসীমের দিকে না গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো মানে এসে থামে। যেমন:

১ + ১/২ + ১/৪ + ১/৮ + ...

এখানে পরের সংখ্যাটি হবে ১/১৬, ১/৩২, এবং এভাবে কমতে থাকবে। গ্রিকরাও জানত, অনন্তকাল ধরে যোগ করলেও প্রতিটি সংখ্যা আগেরটির চেয়ে এত দ্রুত ছোট হয়ে যাবে যে, অসীম সংখ্যক সংখ্যা যোগ করার পরেও যোগফল হয় মাত্র ২। যত বেশি সংখ্যা যোগ করা হবে, তত ২-এর কাছাকাছি যাওয়া যাবে। একে বলে কনভার্জ করা।

অসীম সংখ্যক সংখ্যা যোগ করলে যোগফলও অসীমই হবে। কিন্তু অসীম ধারা তখনই আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন এগুলো অসীমের দিকে না গিয়ে নির্দিষ্ট কোনো মানে এসে থামে।

শুধু পরের সংখ্যা ছোট হলেই যে সিরিজ কনভার্জ করবে, তা কিন্তু নয়। যেমন:

১ + ১/২ + ১/৩ + ১/৪ + ...

এটি দেখতে আগেরটির মতো মনে হলেও কনভার্জ করে না। যত সংখ্যা যোগ করবেন, যোগফল তত বাড়তেই থাকবে। হয়তো ভাবছেন যোগফলও ২ হবে। কিন্তু মাত্র চারটি সংখ্যা যোগ করলেই ২-কে ছাড়িয়ে যাবে। তাহলে কি ৩ হবে? এগারোটি সংখ্যা যোগ করলে ৩-কে ছাড়িয়ে যাবে। তাহলে ১০? ১২ হাজার ৩৯০টি সংখ্যা যোগ করলে ছাড়িয়ে যাবে ১০-কে। অর্থাৎ, আপনি যেকোনো সংখ্যাই ধরুন না কেন, এই ধারাটি তাকে ছাড়িয়ে যাবে। এর যোগফল অসীম; কিন্তু কনভার্জ করে না। তাই গণিতবিদদের আগ্রহ শুধু কনভার্জ করা ধারায়।

মাধ্যমিকের ত্রিকোণমিতিতে সাইন, কোসাইন বা ট্যানজেন্ট আমরা সমকোণী ত্রিভুজের বাহুর অনুপাত হিসেবে শিখি। গণিত বইয়ে এসব কোণের মানের তালিকা থাকে। যেমন, ৩০ ডিগ্রি কোণের সাইনের মান ০.৫০০০। নাবিকরা সাগর পাড়ি দিতে বা ইঞ্জিনিয়াররা মেশিন বানাতে এই চার্ট ব্যবহার করেন।

অথচ এই একই ত্রিকোণমিতিক ফাংশনগুলোকে ইনফিনিটি সিরিজ হিসেবে প্রকাশ করা যায়। তবে সে জন্য থিটা কোণকে (θ) ডিগ্রির বদলে রেডিয়ানে প্রকাশ করতে হবে। যেমন:

এখানে ফ্যাক্টরিয়াল ৫ (৫!) মানে ৫ × ৪ × ৩ × ২ × ১ = ১২০।

৩০ ডিগ্রির সাইনের মান জানতে চান? সমীকরণে রেডিয়ান মান (π/৬ বা প্রায় .৫২৩৬) বসিয়ে দিন। মাত্র তিনটি পদ যোগ করলেই পাবেন ০.৫০০০২, যা আসল মান ০.৫০০০০০-এর খুব কাছাকাছি। অর্থাৎ ধারাটি খুব দ্রুত কনভার্জ করে।

একটু যোগ-বিয়োগ করে অসীম পর্যন্ত চললে দেখা যাবে, ত্রিভুজের বাহু ভাগ করে যে মান পাওয়া যায়, এই অদ্ভুত ধারা থেকেও সেই একই মান আসছে। এই অপ্রত্যাশিত সংযোগই গণিতবিদদের, বিশেষ করে রামানুজনকে আকর্ষণ করেছিল। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল বার্নোলি সংখ্যা। এই সংখ্যাকে অসীম ধারার মাধ্যমেই সংজ্ঞায়িত করা হয়। তাই রামানুজনের গবেষণাপত্রের প্রতিটি পাতায় ছড়িয়ে ছিল এসব ধারা।

৩০ ডিগ্রি কোণের সাইনের মান ০.৫০০০। নাবিকরা সাগর পাড়ি দিতে বা ইঞ্জিনিয়াররা মেশিন বানাতে এই চার্ট ব্যবহার করেন।

জ্যাকব বার্নোলি ছিলেন ১৭ ও ১৮ শতকের বিখ্যাত এক গণিতবিদ পরিবারের সন্তান। তাঁর পরিবার সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে এসেছিল। লিবনিজ এবং নিউটনের পরে ক্যালকুলাসকে আরও উন্নত করেন বার্নোলি। তাঁর নামেই এই সংখ্যার নামকরণ করা হয়। বার্নোলি সংখ্যাগুলো e-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। পাইয়ের মতো e একটি বিশেষ গাণিতিক ধ্রুবক। e-কে সংজ্ঞায়িত করা হয় এভাবে:

e সম্পর্কিত বীজগাণিতিক রাশিকে অসীম ধারায় প্রকাশ করতে হলে প্রতি পদের সহগকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। প্রতিটি পদের সামনে যে সংখ্যাগুলো বসে, সেগুলো সহগ। যেমন, 3x + 1/2x2 = 12 সমীকরণে x-এর সহগ 3 এবং x2-এর সহগ ½। ১৭১৩ সালে বার্নোলির মৃত্যুর পর তাঁর প্রকাশিত আর্স কনজেক্টান্ডি বইয়ে এই সহগগুলো প্রথম দেখা যায়। এগুলোকে বলে বার্নোলি সংখ্যা। বার্নোলি সংখ্যাগুলো লিখতে একটু ঝামেলা আছে, কারণ বিভিন্ন সময়ে এগুলো লেখার নিয়ম বদলেছে। তবে প্রচলিত একটি পদ্ধতিতে এগুলোকে Bn আকারে লেখা হয়। শুরুর কয়েকটি বার্নোলি সংখ্যা হলো:

B1 = -1/2,

B2 = 1/6,

B4 = -1/30,

B6 = 1/42। (প্রথমটি ছাড়া সব বিজোড় পদের মান শূন্য)।

রামানুজন প্রায় আট বছর আগে জি.এস. কারের সিনোপসিস বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে এগুলো প্রথম দেখেন। তিনি হয়তো তখন বার্নোলি সংখ্যার নাম জানতেন না। ১৯০৪ সালে তিনি ক্যালকুলাসের ডেফিনিট ইন্টিগ্রালের মান বের করার সময় এই সংখ্যাগুলো বারবার ব্যবহার করেন। তাঁর প্রথম নোটবুকের ৩০ ও ৩১ নম্বর পৃষ্ঠায় এবং দ্বিতীয় নোটবুকের ৫ম অধ্যায়ে এর উল্লেখ আছে।

১৭১৩ সালে বার্নোলির মৃত্যুর পর তাঁর প্রকাশিত আর্স কনজেক্টান্ডি বইয়ে এই সহগগুলো প্রথম দেখা যায়। এগুলোকে বলে বার্নোলি সংখ্যা।

রামানুজন এই সংখ্যাগুলোকেই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক গবেষণাপত্রের বিষয়বস্তু বানালেন। বিজ্ঞানে বা চিকিৎসায় কোনো আবিষ্কারের সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে যেমন অমরত্ব পাওয়া যায় (মানুষ তাঁকে মনে রাখে), গণিতেও তাই। বার্নোলি সংখ্যাগুলোর নাম বার্নোলি হয়েছে কারণ গণিতের নানা ক্ষেত্রে এগুলো বারবার আসে। এগুলো কোনো অর্থহীন সংখ্যার সারি নয়, এদের মধ্যে সম্পর্ক আছে। সেই সম্পর্কগুলোই নতুন করে আবিষ্কার করেন রামানুজন।

তাঁর গবেষণাপত্রের নাম ছিল সাম প্রপার্টিজ অব বার্নোলিস নাম্বারস (বার্নোলি সংখ্যার কিছু বৈশিষ্ট্য)। ধাতুর যেমন ভৌত বৈশিষ্ট্য থাকে, রামানুজন তেমনি এই সংখ্যার গাণিতিক বৈশিষ্ট্য বের করেন। বার্নোলি সংখ্যাগুলো থাকে ভগ্নাংশ হিসেবে। রামানুজন দেখলেন, এই ভগ্নাংশগুলোর হর সবসময় ৬ দিয়ে বিভাজ্য। যেমন, B32 = 770932104121/510 (এখানে ৫১০-কে ৬ দিয়ে ভাগ করলে হবে ৮৫)। তিনি আগের বার্নোলি সংখ্যা ব্যবহার করে নতুন সংখ্যা বের করার বিকল্প পদ্ধতিও দেখান। ১৮টি সেকশনের মধ্যে ৬ নম্বর সেকশনটি শুরু হয়েছিল এভাবে:

৬. n যদি জোড় সংখ্যা হয় কিন্তু শূন্য না হয়, তবে:

(i) Bn সব সময় ভগ্নাংশ হবে। সেই ভগ্নাংশকে (Bn/n) সবচেয়ে সরল আকারে লিখলে তার ওপরের সংখ্যাটা হবে মৌলিক সংখ্যা,

(ii) Bn-এর হরে ২ এবং ৩ উৎপাদক হিসেবে একবার এবং শুধু একবারই থাকবে,

(iii) 2n(2n – 1)Bn/n একটি পূর্ণসংখ্যা এবং 2(2n - 1)Bn একটি বিজোড় পূর্ণসংখ্যা হবে।

 রামানুজনের গবেষণাপত্রটি এভাবেই জার্নালের ১৭ পৃষ্ঠা জুড়ে ছিল। এতে ছিল আটটি উপপাদ্য। তিনটির প্রমাণ ছিল, দুটি ছিল অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে। বাকি তিনটি শুধু অনুমানের ভিত্তিতে লেখা।

রামানুজনের গবেষণাপত্রের নাম ছিল সাম প্রপার্টিজ অব বার্নোলিস নাম্বারস। ধাতুর যেমন ভৌত বৈশিষ্ট্য থাকে, রামানুজন তেমনি এই সংখ্যার গাণিতিক বৈশিষ্ট্য বের করেন।

রামানুজনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের ডেস্কে যাওয়া মাত্র ঝামেলা শুরু হয়। পরে একজন বলেছেন, ‘মি. রামানুজনের পদ্ধতিগুলো ছিল খুব সংক্ষিপ্ত, একেবারে নতুন ধরনের। লেখা এত অস্পষ্ট ও অগোছালো যে সাধারণ পাঠকের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়।’ সোজা কথায়, গবেষণাপত্রটি ছিল ভীষণ এলোমেলো। অথচ এ কথা যিনি বলেছিলেন, তিনি ছিলেন রামানুজনের কাজের বড় ভক্ত।

ব্যাঙ্গালোরের সেন্ট্রাল কলেজের গণিত অধ্যাপক ও জার্নালের সম্পাদক এম. টি. নারায়ণ আয়েঙ্গার পরে স্বীকার করেন, ‘রামানুজনের লেখা সম্পাদনা করা মোটেও সহজ ছিল না।’ পাণ্ডুলিপিটি তাঁর এবং লেখকের মধ্যে তিনবার আদান-প্রদান করতে হয়েছিল।

নিজের সব কাজের মতোই প্রথম পেপারে রামানুজন এমন সব জিনিসের মধ্যে সংযোগ খুঁজে পেয়েছিলেন, যা আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন। পরে অন্য গণিতবিদেরা এর অনেক কিছুই সত্য বলে প্রমাণ করেন; কিন্তু রামানুজন প্রমাণের ধার ধারেননি। যেটুকু প্রমাণ তিনি দিয়েছিলেন, তা-ও ছিল অসম্পূর্ণ।

এটা কি জি.এস. কারের প্রভাব? বেশির ভাগ গবেষক তাই মনে করেন। কার তাঁর বইয়ে শুধু ফলাফল লিখেছেন, প্রমাণ দেননি বা দিলেও খুব সংক্ষেপে। রামানুজনও সেই ধারা বজায় রেখেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি দাবি করেছিলেন n-তম বার্নোলি সংখ্যার লবকে n দিয়ে ভাগ করলে তা সবসময় মৌলিক সংখ্যা হবে। কিন্তু কোনো প্রমাণ দেননি। তিনি এটা বিশ্বাস করতেন। অন্য এক গণিতবিদ বলেছিলেন, ‘তিনি গাণিতিক সাক্ষ্যপ্রমাণকেই যথেষ্ট মনে করতেন, অন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন আছে বলে মনে করতেন না।’

ব্যাঙ্গালোরের সেন্ট্রাল কলেজের গণিত অধ্যাপক ও জার্নালের সম্পাদক এম. টি. নারায়ণ আয়েঙ্গার পরে স্বীকার করেন, ‘রামানুজনের লেখা সম্পাদনা করা মোটেও সহজ ছিল না।’

রামানুজন প্রমাণের পরোয়া করতেন কি না, তা তর্কের বিষয়; কিন্তু এটা সত্যি যে তিনি প্রমাণ ছাড়াই চমকপ্রদ সব ফল পেতেন।

ঘটনাক্রমে, এই নির্দিষ্ট উদাহরণের ক্ষেত্রে রামানুজন ভুল ছিলেন। যেমন, B20-কে ২০ দিয়ে ভাগ করলে যে সংখ্যাটা পাওয়া যায়, তার লব ১৭৪৬১১। রামানুজনের কথা মতো, সংখ্যাটি মৌলিক হওয়ার কথা। কিন্তু এটি মৌলিক সংখ্যা নয়। ২৮৩ ও ৬১৭ গুণ করলে এই সংখ্যাটি পাওয়া যায়।

তবে এটি ছিল ব্যতিক্রম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রামানুজনের বিশ্বাস পুরোপুরি সঠিক ছিল। বার্নোলি সংখ্যার পেপারে, নোটবুকগুলোতে, চিঠিপত্রে বা অন্যান্য প্রকাশিত গবেষণায় তিনি ছিলেন বিস্ময়করভাবে নির্ভুল।

চলবে…

টীকা

১. ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি ভারতের অন্যতম পুরোনো গণিত সংগঠন। ১৯০৭ সালে এটি ভি. রামস্বামী আইয়ার প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক গণিতচর্চার ভিত্তি গড়ে তুলতে এই সংগঠনের ভূমিকা অপরিসীম। রামানুজনের শুরুর দিকের গবেষণাপত্রগুলো এই সংগঠনের জার্নালে প্রকাশিত হয়।

২. আর্যভট্ট প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি রচনা করেন আর্যভটীয়। সংখ্যা পদ্ধতি, ত্রিকোণমিতি এবং পাইয়ের মান নির্ণয়ে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনিই প্রথম গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর আবর্তন করে এবং এ কারণেই দিন-রাত হয়।

৩. ব্রহ্মগুপ্ত প্রথমবার শূন্যকে একটি স্বতন্ত্র সংখ্যা হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর রচিত ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অমূল্য দলিল। বীজগণিত ও জ্যামিতিকে সুসংবদ্ধ রূপ দিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

৪. ইউক্লিডকে বলা হয় জ্যামিতির জনক। এই গ্রিক গণিতবিদ মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় কাজ করতেন। জ্যামিতিকে বিক্ষিপ্ত ধারণা থেকে বের করে যুক্তি ও প্রমাণের শক্ত কাঠামোয় দাঁড় করানোর কৃতিত্ব তাঁরই। তাঁর লেখা এলিমেন্টস বইটি ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী গ্রন্থ। প্রায় দুই হাজার বছর জ্যামিতি শিক্ষার মূল পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এটি।

৫. আল-বেরুনী একাদশ শতাব্দীর পর্যটক ও পণ্ডিত। তাঁকে বলা হয় ‘প্রথম ভারততত্ত্ববিদ’। তিনি দীর্ঘকাল ভারতে অবস্থান করে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং এ দেশের বিজ্ঞান ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর বিখ্যাত কিতাবুল হিন্দ গ্রন্থে তিনি তৎকালীন ভারতীয় গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার ভূয়সী প্রশংসা করার পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়েও গঠনমূলক সমালোচনা করেছিলেন।