ধারাবাহিক
দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ২২
মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।
৫. পোর্ট ট্রাস্টে জীবন
জার্নাল অফ দ্য ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটিতে রামানুজনের প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে তিনি বিশ্ব গণিতে নিজের জায়গা করে নেন। যদিও এটা তেমন বড় বিষয় ছিল না। কিন্তু মানুষ তাঁকে খেয়াল করতে শুরু করেছিল।
পরের বছর শুরুর দিকে মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজের ছাত্র কে. এস. শ্রীনিবাসন সামার হাউসে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। শ্রীনিবাসন তাঁকে কুম্বকোনম থেকেই চিনতেন। তিনি বললেন, ‘রামানুজু, লোকে তো তোমাকে জিনিয়াস বলছে!’
রামানুজন উত্তর দিলেন, ‘জিনিয়াস! আমার কনুই দেখ। ওটাই তোমাকে আসল গল্প বলবে।’ তাঁর কনুই খসখসে, ময়লা ও কালচে ছিল। বিশাল স্লেটের ওপর লেখার সময় তিনি ন্যাকড়ার পরিবর্তে কনুই দিয়ে মুছতেন। কাজের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকায় ওটাই ছিল সবচেয়ে ভালো উপায়। তিনি হেসে বললেন, ‘আমার কনুই-ই আমাকে জিনিয়াস বানাচ্ছে!’
শ্রীনিবাসন জানতে চাইলেন, ‘তুমি কাগজ ব্যবহার করো না কেন?’ রামানুজন বললেন, ‘সামর্থ্য নেই।’ রামচন্দ্র রাওয়ের দেওয়া টাকায় সংসার চলে ঠিকই, কিন্তু তাতে কি আর শখ মেটানো যায়? কাগজের যা দাম! আর তাঁর যা চাহিদা, তাতে মাসে চার রিম কাগজ লাগবে।
রামানুজন উত্তর দিলেন, ‘জিনিয়াস! আমার কনুই দেখ। ওটাই তোমাকে আসল গল্প বলবে।’ তাঁর কনুই খসখসে, ময়লা ও কালচে ছিল।
সামার হাউসের আরেক বন্ধু এন. রামস্বামী আইয়ার (প্রফেসর নন) রামানুজনের কাগজের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করতে পারেন। তাঁর চোখের সামনে ভাসত, রামানুজন একটা মাদুরে শুয়ে আছেন, গায়ে ছেঁড়া জামা, লম্বা চুলগুলো একটা সরু সুতো দিয়ে অযত্নে বাঁধা। তিনি অঙ্ক কষে চলেছেন জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মতো। তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে আছে নোটবুক ও সাদা কাগজের স্তূপ। পাচাইয়াপ্পা কলেজের বন্ধু টি. শ্রীনিবাসাচার্য কিছুদিন পরে মাদ্রাজে এসে দেখেন, কাগজের অভাবে তিনি একই কাগজে লাল কালি দিয়ে দুবার লিখছেন।
এ সময় রামচন্দ্র রাও চিন্তিত হয়ে পড়েন। রামানুজনের নোটবুক যদি কিছু হয়ে যায়! তিনি রামানুজনকে অনুরোধ করলেন সব নোটবুকে টুকে রাখতে। রামানুজন তা-ই করলেন। তবে কপি করার সময় তিনি অনেক কিছু নতুন করে সাজালেন, সংশোধন করলেন এবং বাড়তি নোটগুলো মূল লেখার সঙ্গে জুড়ে দিলেন। আজ আমরা যেটাকে রামানুজনের দ্বিতীয় নোটবুক বলি, সেটা এভাবেই তৈরি হয়েছিল।
রামানুজনের মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পর তাঁর স্মরণে প্রকাশিত এক স্মারক বইয়ের অদ্ভুত একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছিল তাঁর জন্মস্থান ইরোডের এক কাগজ ব্যবসায়ী। পুরো এক পাতার সেই বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিল: ‘কাগজ, অমর করে রাখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম’। নিচে লেখা ছিল, ‘ভালো কাগজ মানুষের মহৎ চিন্তাগুলোকে সংরক্ষণ করে এবং ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।’ রামানুজনের জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি আর কী হতে পারে!
রামচন্দ্র রাও রামানুজনকে অনুরোধ করলেন সব নোটবুকে টুকে রাখতে। রামানুজন তা-ই করলেন। তবে কপি করার সময় তিনি অনেক কিছু নতুন করে সাজালেন ও সংশোধন করলেন।
প্রায় এক বছর রামানুজন রামচন্দ্র রাওয়ের দয়ায় চললেন। গণিতের জগতে তিনি তখন বেশ সক্রিয়। ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির জার্নালে একের পর এক সমস্যা পাঠাচ্ছেন। দ্বিতীয় গবেষণাপত্রও শেষ করে ফেলেছেন। কিন্তু দিনশেষে তো তিনি বেকার। এটা তাঁকে ভেতরে ভেতরে পোড়াত। কিছুদিন আগে এক শুভাকাঙ্ক্ষীর মাধ্যমে তিনি মাদ্রাজ অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেলের অফিসে মাসে ২০ টাকার অস্থায়ী চাকরি পান। কিন্তু সেটা কয়েক সপ্তাহের বেশি টেকেনি। ১৯১২ সালের শুরুর দিকে রামচন্দ্র রাও তাঁর অন্য প্রভাবশালী বন্ধুদের কাছে রামানুজনের কথা বললেন। রামানুজন নতুন চাকরির জন্য আবেদন করলেন এভাবে:
স্যার,
আমি জানতে পেরেছি আপনার অফিসে একটি কেরানির পদ খালি আছে। আমি সেই পদের জন্য আবেদন করছি। আমি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেছি এবং এফ.এ. পর্যন্ত পড়েছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক নানা পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। তবে আমি পুরোটা সময় গণিতচর্চা এবং এর উন্নয়নে ব্যয় করেছি। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আমাকে নিয়োগ দেওয়া হলে কাজের প্রতি সুবিচার করতে পারব। তাই বিনীত অনুরোধ, আমাকে এই পদে নিয়োগ দিয়ে বাধিত করবেন।
বিনীত নিবেদক,
আপনার একান্ত বাধ্যগত ভৃত্য,
এস. রামানুজন
রামানুজনের হাতের লেখা স্কুল ছাত্রদের মতোই পরিষ্কার এবং সাধারণ। শুধু একটা বিষয় ছিল অদ্ভুত, ইংরেজি ‘t’ লেখার সময় তিনি ওপরের আড়াআড়ি দাগটা মূল দাগের সঙ্গে না মিলিয়ে ডানদিকে একটু ভাসিয়ে দিতেন। চিঠির সঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিত অধ্যাপক ই. ডব্লিউ. মিডলমাস্টের হাতে লেখা একটি সুপারিশপত্রও ছিল। তিনি রামানুজনকে গণিতে অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন তরুণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই আবেদনপত্র এবং সুপারিশ ছিল নিছকই আনুষ্ঠানিকতা। রামচন্দ্র রাওয়ের সুপারিশে চাকরিটা যে তাঁরই হবে, তা একরকম নিশ্চিতই ছিল।
চিঠির তারিখ ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯১২। রামানুজন তাঁর ঠিকানা লিখেছিলেন—৭, সামার হাউস, ট্রিপলিকেন। চিঠি লেখা হয়েছে মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট্রের চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট বরাবর।
চিঠির সঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিত অধ্যাপক ই. ডব্লিউ. মিডলমাস্টের হাতে লেখা একটি সুপারিশপত্রও ছিল। তিনি রামানুজনকে গণিতে অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন তরুণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
শুরু থেকেই মাদ্রাজ ছিল বাণিজ্যিক বন্দরনগরী। তবে প্রকৃতি তাকে বন্দরের জন্য উপযুক্ত করে তৈরি করেনি। এখানে সমুদ্রের ঢেউ ছিল উত্তাল, ভয়ংকর। সাগরের চোরাবালি ও অদ্ভুত স্রোত ছিল নাবিকদের জন্য মরণফাঁদ। বড় জাহাজ ভেড়ার জন্য প্রাকৃতিকভাবে কোনো পোতাশ্রয় ছিল না। জাহাজগুলো তীরের সিকি মাইল দূরে নোঙর করত। সেখান থেকে মালামাল আনার জন্য ব্যবহার করা হতো মাসুলা বোট। নারকেল আঁশের দড়ি দিয়ে তক্তা বেঁধে তৈরি পঁচিশ ফুট লম্বা চ্যাপ্টা নৌকা। ঢেউয়ের মেজাজ বুঝতে দক্ষ মাঝিরা সেই উত্তাল সমুদ্রে ছোট নৌকা নিয়ে কয়েক টন মাল বোঝাই করে তীরে ফিরত। মাদ্রাজে আসা জাহাজগুলোর মোট ক্ষতির নব্বই শতাংশই হতো এই শেষ সিকি মাইলের বিপজ্জনক রাস্তায়।
তবুও মানুষ হার মানেনি। জোর করে সেখানে বন্দর বানিয়েছিল। ১৭৯৬ সালে তৈরি হয় বাতিঘর। নারকেল তেলের প্রদীপের আলো ১৭ মাইল দূর থেকেও দেখা যেত। ১৮৬১ সালে সাগরের বুকে ১১০০ ফুট লম্বা একটি জেটি তৈরি হয়। ১৮৭৬ সালে শুরু হয় ২৭ টন ওজনের কংক্রিটের ব্লক দিয়ে আয়তাকার কৃত্রিম পোতাশ্রয় তৈরির কাজ। কিন্তু নতুন বন্দরেও অবস্থার উন্নতি হলো না। মাল খালাসের সময় ক্ষতি হতোই। তা ছাড়া বন্দরের প্রবেশপথ দ্রুত বালিতে ভরাট হয়ে যেত।
মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মোট আমদানি-রপ্তানির ৬০ শতাংশই হতো এই বন্দর দিয়ে। প্রতি বছর ১২০০ জাহাজ এখানে ভিড়ত। লোহা, ইস্পাত, যন্ত্রপাতি ও রেলওয়ের সরঞ্জাম আসত ব্রিটেন থেকে। এখান থেকে যেত চামড়া, কাপড়, নীল ও তুলা। শতাব্দীর শুরুতে এই বন্দরে নানা সমস্যা ছিল।
১৮৬১ সালে সাগরের বুকে ১১০০ ফুট লম্বা একটি জেটি তৈরি হয়। ১৮৭৬ সালে শুরু হয় ২৭ টন ওজনের কংক্রিটের ব্লক দিয়ে আয়তাকার কৃত্রিম পোতাশ্রয় তৈরির কাজ।
১৯০৪ সালে পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে আসেন স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং। মাথায় টাক, চোখে ঘুম-ঘুম ভাব, সাদা গোঁফ, অল্প দাড়ি। এই আইরিশ ভদ্রলোকই ছিলেন দক্ষিণ ভারতের প্রথম মোটরগাড়িওয়ালাদের একজন।
১৮৪৯ সালে তিনি আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। পাশ করেন ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজ থেকে। ১৮৭০ সালে ভারত সরকারের প্রকৌশল বিভাগে যোগ দেন। ৩০ বছরেরও বেশি সময় দক্ষিণ ভারতীয় রেলওয়ে ব্যবস্থা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গোদাবরী নদীর বিশাল রেলসেতু তার মধ্যে অন্যতম। ১৯১১ সালে তাঁকে নাইট কমান্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার উপাধি দেওয়া হয়। পোর্ট ট্রাস্টে আসার সময় তিনি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন এস. নারায়ণা আইয়ারকে।
নারায়ণা আইয়ার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না। ব্রিটিশরা ভারতীয় কলেজগুলো তৈরি করেছিল দক্ষ কেরানি বানাতে, ইউরোপীয়দের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের বিকল্প তৈরির জন্য নয়। নারায়ণা আইয়ার ব্রাহ্মণের ছেলে। ত্রিচিনোপল্লীর সেন্ট জোসেফ কলেজ থেকে এম.এ. পাস করে সেখানেই গণিতের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ওখানেই স্যার ফ্রান্সিসের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। পোর্ট ট্রাস্টে তিনি প্রথমে অফিস ম্যানেজার এবং পরে চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট হন। ভারতীয়দের জন্য এটাই সর্বোচ্চ পদ। স্যার ফ্রান্সিস তাঁর ওপর ভীষণ নির্ভরশীল ছিলেন।
১৮৪৯ সালে স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। পাশ করেন ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজ থেকে। ১৮৭০ সালে ভারত সরকারের প্রকৌশল বিভাগে যোগ দেন।
নারায়ণা আইয়ার ১৯৩৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনোই পশ্চিমি পোশাক পরেননি; ধুতি ও পাগড়িই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তাঁর পরিবার একে ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা হিসেবেই দেখত। অথচ তখন পশ্চিমি হাওয়ায় ভারতীয়দের পোশাকও বদল যাচ্ছিল। ১৮৯০-এর দশকে একটি পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, ‘কোট-প্যান্ট ও বুট জুতাই চলাফেরার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। প্রাচ্যের পোশাক আয়েশি ও ধীরগতির জীবনের জন্য, কিন্তু পশ্চিমি পোশাক আত্মবিশ্বাসী ও কর্মচঞ্চল জীবনের প্রতীক।’
১৯১০ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত ভারতীয়রা এই বার্তা বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিল। ১৯১৯ সালে ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির এক ছবিতে দেখা যায়, রামচন্দ্র রাওসহ অর্ধেকের বেশি মানুষ স্যুট-কোট পরে আছেন। কিন্তু নারায়ণা আইয়ার সামনের সারিতে মাটিতে বসে আছেন। গায়ে আলখাল্লা ও মাথায় পাগড়ি।
তাঁর পরিবারের কাছে তিনি অত্যন্ত সৎ, মিতভাষী এবং মর্যাদাবান মানুষ ছিলেন। তাঁকে দেখলে একটু ভয়ই লাগত। তিনি মনেপ্রাণে ভারতের স্বাধীনতা চাইতেন, তবে নীরবে। তাঁর বাড়িতে দুই ডজন কাজিন, ভাইবোন ও আশ্রিত মানুষ থাকত। তিনি নীরবে সবার অভাব মেটাতেন। বাইরে তিনি পুরোদস্তুর সনাতন হিন্দু হলেও ভেতরে পুষে রাখতেন এক অনুসন্ধিৎসু ও স্বাধীন মন।
স্যার ফ্রান্সিস ও নারায়ণা আইয়ার ভবিষ্যতে রামানুজনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু ১৯১২ সালের ১ মার্চ, আবেদনের তিন সপ্তাহ পর, রামানুজন শুধু জানলেন, তিনি তাঁদের অধীনে ক্লাস থ্রি, গ্রেড ফোরের কেরানির চাকরি পেয়েছেন। মাসে বেতন তিরিশ টাকা।
১৯১৯ সালে ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির এক ছবিতে দেখা যায়, রামচন্দ্র রাওসহ অর্ধেকের বেশি মানুষ স্যুট-কোট পরে আছেন। কিন্তু নারায়ণা আইয়ার সামনের সারিতে মাটিতে বসে আছেন।
এতদিন জানকী তাঁর স্বামীর কাছ থেকে দূরেই ছিলেন। রাজেন্দ্রামে বাবার বাড়ি ও কুম্বকোনমে শশুর বাড়ির মধ্যে আসা-যাওয়া করতেন। এতদিনে শিখেছেন সংসারধর্ম। ১৯১২ সালের শেষ দিকে সাবালিকা হলেন। রামানুজনের একটা স্থায়ী চাকরি হলো। অবশেষে তাঁরা সত্যিকারের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে জীবনযাপন শুরু করলেন।
ট্রিপলিকেনের সামার হাউস থেকে রামানুজনের নতুন অফিস ছিল প্রায় তিন মাইল দূরে। তাই চাকরি পাওয়ার কয়েক মাস পরে তিনি জর্জটাউন এলাকার সাইভা মুথিয়া মুদালি স্ট্রিটে দাদির সঙ্গে একটি ছোট বাড়িতে উঠলেন। বিয়ের তিন বছর পর এখানেই জানকী এবং কোমালাতাম্মাল এসে যোগ দেন।
১৯০৬ সালে প্রিন্স অব ওয়েলস আসার আগ পর্যন্ত জর্জটাউন ‘ব্ল্যাক টাউন’ নামে পরিচিত ছিল। স্থানীয় মানুষেরা এখানে থাকত। দুর্গের ভেতরে থাকত ইউরোপীয়দের। একে বলা হতো হোয়াইট টাউন। জর্জটাউনের ঘিঞ্জি রাস্তায় শহরের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ গাদাগাদি করে থাকত। অথচ শহরের তুলনায় ব্ল্যাক টাউন ছিল মাত্র ৯ শতাংশ জায়গা। গরু, মহিষ, মুরগি ও ছাগল স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াত রাস্তায়। মিস্ত্রিরা ছোট দোকানের সামনে উবু হয়ে বসে ঠুকঠুক করে টিন পেটাত; পাশের রাস্তায় হয়তো বস্তাভর্তি শস্য নিয়ে জট বাঁধাত মহিষের গাড়ি। এরপর ছিল গহনার দোকান, কাপড়, তেল, ঝুড়ি বা ফলমূলের আড়ত...সবকিছুর চালিকাশক্তি ছিল পেশিবহুল মানুষের শ্রম। খালি পা, খালি গা, পরনে শুধু ধুতি। ঘামে ভেজা শরীরে ঠেলত ঠেলাগাড়ি। পিঠে ভারী বোঝা নিয়ে কুঁজো হয়ে হাঁটত। ধুলোমাখা রাস্তায় চাবুক মেরে পশুদের তাড়িয়ে নিয়ে যেত।
১৯০৬ সালে প্রিন্স অব ওয়েলস আসার আগ পর্যন্ত জর্জটাউন ‘ব্ল্যাক টাউন’ নামে পরিচিত ছিল। স্থানীয় মানুষেরা এখানে থাকত। দুর্গের ভেতরে থাকত ইউরোপীয়দের। একে বলা হতো হোয়াইট টাউন।
সাইভা মুথিয়া মুদালি স্ট্রিটের সেই ছোট্ট বাড়িটির ভাড়া ছিল মাসে তিন টাকা। সেখানে রামানুজন ও তাঁর পরিবার ঠাসাঠাসি করে দিন কাটাতেন। জানকী তখনো কিশোরী হননি। রামানুজনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল খুব কম। সারা দিনে হয়তো রামানুজন একবার সাবান বা কাপড়টা চাইতেন। জানকী রাতে শাশুড়ির ভয়ে তাঁর পাশে ঘুমাতেন। রামানুজন ও জানকী কখনো একা থাকার সুযোগ পেতেন না। কোমালাতাম্মাল কুম্বকোনম গেলেও পাহারাদার হিসেবে রেখে যেতেন দাদিকে।
তখন এটা তেমন অস্বাভাবিক ছিল না। সন্তান না হওয়া পর্যন্ত নতুন বউয়ের অবস্থান ছিল অনেকটা দাসীর মতো। শাশুড়ির হুকুম তামিল করাই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ।
পরে রামচন্দ্র রাও বলেছেলে, রামানুজনকে পোর্ট ট্রাস্টে নামমাত্র একটি চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এটা কি শুরু থেকেই এমন ছিল, নাকি পরে হয়েছিল, তা অস্পষ্ট। তবে নির্দিষ্ট সময় অফিসে হাজিরা দেওয়াটাই রামানুজনের জন্য ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। সামার হাউসের এক বন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি প্রায়ই দেখতাম তিনি বিচ রোড দিয়ে দৌড়ে অফিসে যাচ্ছেন। গায়ে কোট, বাতাসে ধুতি উড়ছে, লম্বা চুল খুলে গেছে, কপালে জ্বলজ্বল করছে ত্রিশূল আকৃতির তিলক। তরুণ জিনিয়াসের নষ্ট করার মতো সময় নেই, তিনি সবসময়ই ব্যস্ত।’
জানকী পরে বলেছিলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার আগে রামানুজন অঙ্ক করতেন, অফিস থেকে ফিরেও অঙ্ক করতেন। মাঝেমধ্যে সারা রাত জেগে ভোর ছটা পর্যন্ত চলত গণিতচর্চা। তারপর ঘণ্টা দুই ঘুমিয়ে আবার অফিসে দৌড়। অফিসে তাঁর কাজ ছিল হিসাব মেলানো ও নগদ টাকার হিসাব রাখা। কিছুদিন তিনি বন্দরের হিসাবরক্ষাকারী কেরানি হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তবে কাজটা মোটেও কঠিন ছিল না। শিগগিরি তিনি অফিসেই অঙ্ক করার অলিখিত অনুমতি পেলেন। নারায়ণা আইয়ার ও স্যার ফ্রান্সিস ব্যাপারটা দেখেও না দেখার ভান করতেন। বলা যায় তাঁরা প্রশ্রয়ই দিতেন!
জানকী পরে বলেছিলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার আগে রামানুজন অঙ্ক করতেন, অফিস থেকে ফিরেও অঙ্ক করতেন। মাঝেমধ্যে সারা রাত জেগে ভোর ছটা পর্যন্ত চলত গণিতচর্চা।
শোনা যায়, একবার এক বন্ধু কাজের সময় রামানুজনকে ডকের কাছে প্যাকিং পেপার খুঁজতে দেখেছিলেন। ওগুলোতে তিনি অঙ্ক করতেন। আরেকবার নারায়ণা আইয়ারকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন স্যার ফ্রান্সিস। তিনি গম্ভীর মুখে জানতে চাইলেন, এই জরুরি ফাইলের ভেতর অঙ্কের পাতাগুলো কীভাবে ঢুকল? আইয়ার কি অফিসের সময় নষ্ট করে অঙ্ক করছেন? নারায়ণা আইয়ার আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, এই হাতের লেখা তো তাঁর নয়, নিশ্চয়ই রামানুজনের কাজ। স্যার ফ্রান্সিস হেসে ফেললেন। তিনি আগে থেকেই জানতেন এটা কার কাজ।
নারায়ণা আইয়ার শুধু বস ছিলেন না, তিনি ছিলেন রামানুজনের সহকর্মী। ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির সদস্য এবং কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রামানুজনের কদর বুঝতেন। সন্ধ্যায় তাঁরা ট্রিপলিকেনে আইয়ারের বাড়ির দোতলার বারান্দায় বসে স্লেটে খসখস করে অঙ্ক কষতেন। অনেক সময় মাঝরাত পর্যন্ত চলত সেই স্লেট পেন্সিলের শব্দ। অন্যদের ঘুমেও সমস্যা হতো। মাঝেমধ্যে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠতেন রামানুজন। হ্যারিকেনের আলোয় স্বপ্নের ভেতর পাওয়া কোনো সূত্র টুকে নিতেন।
নারায়ণা আইয়ার নিজেও বেশ ভালো গণিত জানতেন। কিন্তু রামানুজনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি শার্লক হোমস এবং ওয়াটসনের মতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেতেন। অনেকগুলো ধাপ মনে মনে করে ফেলতেন রামানুজন। আইয়ার বলতেন, ‘তুমি যদি অন্যদের বোঝাতে চাও, তাহলে আমার স্তরে নেমে এসো। তোমার দুই ধাপের মাঝখানে অন্তত দশটা ধাপ লিখে বুঝিয়ে দাও।’
রামানুজন অবাক হয়ে বলতেন, ‘কেন? এটা কি স্পষ্ট নয়?’ আইয়ার বলতেন, ‘না, এটা মোটেই স্পষ্ট নয়।’ তিনি ধৈর্য ধরে রামানুজনকে দিয়ে ব্যাখ্যা লিখিয়ে নিতেন।
খুব দ্রুত রামানুজনের পরামর্শদাতা, মেন্টর এবং বন্ধু হয়ে উঠলেন নারায়ণা আইয়ার। জানকী বলেছিলেন, ‘আইয়ার বলতেন, কিছু লোক রামানুজনকে সাধারণ কাঁচের টুকরো মনে করে, কিন্তু খুব শিগগিরই তারা দেখবে সে একটা হিরে।’ তিনি স্যার ফ্রান্সিসকেও নিজের দলে ভিড়িয়েছিলেন, তাঁকেও বানিয়ে ফেলেন রামানুজনের সমর্থক।
স্যার ফ্রান্সিস এবং তাঁর যোগাযোগের কারণেই ১৯১২ সালের মাঝামাঝি রামানুজন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার নজরে এলেন। সারা জীবন তিনি ব্রিটিশদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেছেন, কিন্তু এবার সব কিছু বদলে যেতে শুরু করল!
