বাষ্পায়ন কী, এটা কীসের ওপর নির্ভরশীল

কঠিনকে তরল ও তরলকে বাষ্পে পরিণত করতে তাপের মূল ভূমিকা আসলে কী?ছবি: ওয়ার্কিবুকস ডটকম

পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ২৩

কঠিন বস্তুকে তাপ দিলে একসময় তা তরলে রূপান্তরিত হয়। আবার তরলে তাপ প্রয়োগ করলে তা গ্যাসে রূপান্তরিত হয়। এজন্য বস্তুকে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছাতে হয়। যেমন, বিশুদ্ধ কঠিন লোহাকে অনবরত তাপ প্রয়োগ করুন। তাপমাত্রা ১৫৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে তা তরলে পরিণত হবে। তারপর আরও তাপ দিন, কিন্তু অত সহজে তরল লোহা বাষ্পে পরিণত হবে না। তাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখুন। ফলে তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে। একসময় তা ২৮৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাবে। তখন তরল লোহা বাষ্পে পরিণত হবে। অর্থাৎ লোহার গলনাঙ্ক ১৫৩৮ ও স্ফুটনাঙ্ক ২৮৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানি বা বরফের ক্ষেত্রে তা যথাক্রমে শূন্য ও ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কিন্তু সব সময় এই নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় না পৌঁছেও কঠিন থেকে তরল এবং তরলকে বাষ্পে রূপান্তর করা সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, কঠিন বস্তুকে সরাসরি বাষ্পে পরিণত করাও সম্ভব।

কীভাবে সম্ভব? কঠিনকে তরল ও তরলকে বাষ্পে পরিণত করতে তাপের মূল ভূমিকা আসলে কী?

তাপ এক ধরনের শক্তি। সেই শক্তি প্রয়োগ করে বস্তুর আণবিক বা পারমাণবিক বন্ধনে বারবার আঘাত করা হয়। ফলে বস্তুর আণবিক বা পারমাণবিক বন্ধন কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। নির্দিষ্ট একটা তাপমাত্রায় গিয়ে কঠিন বস্তুর এই বন্ধন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ফলে কঠিন পদার্থ তরলে রূপান্তরিত হয়।

বিশুদ্ধ কঠিন লোহাকে অনবরত তাপ প্রয়োগ করুন। তাপমাত্রা ১৫৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে তা তরলে পরিণত হবে। তারপর আরও তাপ দিন, কিন্তু অত সহজে তরল লোহা বাষ্পে পরিণত হবে না।

তেমনি একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় গিয়ে তরলের আন্তঃআণবিক আকর্ষণও শিথিল হয়ে আসে। ফলে তরল গ্যাসে পরিণত হয়। বন্ধন বা আকর্ষণ ভাঙার জন্য এখানে শক্তি হিসেবে তাপ ব্যবহার করছি। তাপের বদলে অন্য শক্তিও কিন্তু ব্যবহার করা যায়। তখন তাপ ও তাপমাত্রার এই নিয়ম আর বস্তু মানবে না। যথেষ্ট শক্তি পেয়ে গেলে স্ফুটনাঙ্কে না পৌঁছেও বস্তু তরল থেকে বাষ্পে পরিণত হতে পারে।

যেকোনো বস্তুর পৃষ্ঠের অণুগুলো তাপমাত্রা পেলে আগে মুক্ত হয়। কারণ বাড়তি শক্তি পেলে অণুগুলোর গতিশক্তি বেড়ে যায়। বাইরের অণুগুলোর একদিকে এমনিতেই ফাঁকা। ফলে সেখানকার অণু সহজেই আণবিক বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসে। খুব পুরু কোনো বস্তুর চেয়ে পাতলা ও ছড়ানো বস্তুর অণুগুলো সহজেই এভাবে মুক্ত হতে পারে।

ধরা যাক, তীব্র শীতের এক দিন। একটা ভেজা কাপড় শুকাতে দিয়েছেন। তাপমাত্রা এত কম, তবুও কাপড়টা খুব শিগগির শুকিয়ে যাবে। অর্থাৎ কাপড় থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যাবে। এমনকী পুকুর বা নদীর পানিও এ সময় জলীয় বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে দেখবেন। এটা কেন হয়?

যেকোনো বস্তুর পৃষ্ঠের অণুগুলো তাপমাত্রা পেলে আগে মুক্ত হয়। কারণ বাড়তি শক্তি পেলে অণুগুলোর গতিশক্তি বেড়ে যায়। বাইরের অণুগুলোর একদিকে এমনিতেই ফাঁকা।

কারণ বাতাসের ধাক্কা। বাতাসের অণুগুলো পানির পৃষ্ঠতলের অণুকে বারবার ধাক্কা দেয়। সেই ধাক্কায় একসময় পৃষ্ঠতলের অণুগুলোর গতিশক্তি বেড়ে যায়। ফলে আণবিক বন্ধন মুক্ত হয়ে বাষ্পে পরিণত হয়। স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছানোর আগেই তরল বাষ্পে পরিণত হওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলে বাষ্পায়ন। সুতরাং বাষ্পায়ন ও বাষ্পীভবন এক নয়, এটা মনে রাখতে হবে। স্ফুটনাঙ্কের তাপমাত্রায় তরল বাষ্পে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাষ্পীভবন বলে।

বাষ্পায়ন বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এর একটা হলো বাতাসের প্রবাহ। বাতাসের প্রবাহ বেশি হলে বাষ্পায়ন বেশি হয়। আরেকটা হলো তরলের একদম ওপরের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল। পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল যত বেশি হবে, বাষ্পায়ন তত বেশি হবে। তরল তত দ্রুত শুকিয়ে যাবে।

তরলের প্রকৃতির ওপরও বাষ্পায়ন প্রক্রিয়া নির্ভরশীল। তরলের স্ফুটনাঙ্ক যত কম, বাষ্পায়ন সেখানে তত বেশি। তাই পানি যত সহজে বাষ্পায়িত হয়, তরল লোহার বাষ্পায়ন সেখানে প্রায় অসম্ভব। উষ্ণতাও বাষ্পায়নের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। পানি ও পানির পৃষ্ঠতলের কাছাকাছি বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা যত বেশি, বাষ্পায়ন তত বেশি।

বাষ্পায়ন বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এর একটা হলো বাতাসের প্রবাহ। বাতাসের প্রবাহ বেশি হলে বাষ্পায়ন বেশি হয়। আরেকটা হলো তরলের একদম ওপরের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল।

বাতাসের চাপ বাষ্পায়নে বাধা দেয়। তাই তরল সংলগ্ন বায়ুচাপ যত কম, বাষ্পায়ন তত বেশি হবে।

তবে এসবকিছুকে ছাপিয়ে আরেকটা ব্যাপার বড় হয়ে ওঠে। সেটা হলো বাতাসের শুষ্কতা। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি হলে বাষ্পায়ন কম হবে। অন্যদিকে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ যত কম, বাষ্পায়ন তত বেশি। কারণ শুষ্ক বাতাস পানি থেকে জলীয় বাষ্প দ্রুত শোষণ করে। তাই বর্ষাকালে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বেশি হলেও বাষ্পায়ন কম হয়। কারণ অতিরিক্ত বাষ্প ধারণ করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা বায়ুমণ্ডলের অণুগুলোর মধ্যে থাকে না।

অন্যদিকে, শীতকালে বায়ুমণ্ডল ও তরলের উষ্ণতা অনেক কম। কিন্তু বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও খুব কম। তাই সহজেই তরলকে বাষ্পীভূত করে সেই বাষ্প বায়ুমণ্ডল শোষণ করতে পারে।